ঈদ মানে আনন্দের উৎসব, খুশির দিন। ‘ঈদ’ আরবি শব্দ; অর্থ ফিরে আসা। খুশি ও আনন্দের সংবাদ নিয়ে ঈদ বার বার ফিরে আসে, সেজন্য ঈদ। ‘ঈদ’ এর বাংলা প্রতিশব্দ না থাকায় এটি এখন বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দ। সে হিসেবে ‘ঈদ’ শব্দটি খুশি ও উৎসব অর্থে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অর্থাৎ বাংলা ‘ঈদ’ শব্দের অর্থ হলো খুশি, উৎসব। আরবি অর্থ ফিরে আসা। আবার ‘ঈদগা’ বলতে নামাজের জায়গাও বুঝানো হয়। অর্থাৎ যে জায়গা বা স্থানে ঈদের নামাজ পড়া হয়ে থাকে সে জায়গাকে ‘ঈদগা’ বলা হয়। ‘ঈদ’ শব্দের অর্থ ফিরে আসা আর ‘গা’ অর্থ জায়গা বা স্থান। তাহলে অর্থ দাঁড়ায় ফিরে আসার স্থান। মুসলমানরা নামাজের জন্য বছরে দু’বার যেখানে একত্র হতে ফিরে আসে সেটিই ‘ঈদগা’।
পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানরা ঈদকে ভিন্ন ভিন্ন নামে সম্বোধন করে থাকেন। বাংলা, উর্দু, হিন্দি এবং মালবী ও ইন্দোনেশিয়ার মতো অস্ট্রেনেশীয় ভাষায় আত্মত্যাগের আর একটি আরবি শব্দ ‘কোরবান’। এসব দেশে ঈদুল আজহাকে বলা হয় ‘কোরবানির ঈদ’। আফগানিস্তান ও ইরানে বলা হয় ‘ঈদে কোরবান’। চীনা ভাষায় ঈদুল আযহাকে বলা হয় ‘কোরবান জিয়ে’। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ানরা বলেন ‘হারি রাইয়া কোরবান’। তুর্কিরা বলেন ‘কোরবান বাইরামি; একই কথা বলেন আজারী তাতারী, বসনীয় ও ক্রোয়েশীয়রা। ইয়েমেন, সিরিয়া, মিশরসহ উত্তর আফ্রিকার দেশসমূহে বলা হয় ‘ঈদুল কবির’। হাঙ্গেরির মুসলমানরা ঈদকে বলেন ‘আলদোজাতি’ আর জার্মানিরা বলেন ‘অপফেরকেস্ট’। যে নামেই ঈদকে পরিচিত করানো হোক না কেনো সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ঈদের তাৎপর্য অভিন্নরূপে প্রকাশ পেয়ে থাকে।
আরব সমাজ যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত। পৌত্তলিকতা ও অগ্নি উপাসক হিসেবে আরবরা নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করে নিয়ে অন্ধকারের অতলগহ্বরে ক্রমান্বয়ে তলিয়ে যাচ্ছে। মানবিক মূল্যবোধহীন মানবচরিত্র, মানুষে মানুষে পার্থক্য তৈরি; নারীর অবমূল্যায়ন; হিংসা-হানানহানি, বিবাদবিসম্বাদ ইত্যাদি সামাজিক অনাচার আরবকে করে তুলেছিল নরকসাদৃশ্য। এই নরকসাদৃশ্য আরব সমাজে জন্মলাভ করেছিল নৈতিকতা বিবর্জিত উৎসব-পার্বণ ও লোকজমেলাসমূহে আয়োজন করা হতো আনন্দবিনোদনের জন্য যতসব বিচিত্র ও বীভৎস অনুষ্ঠানাদি। সেদিক থেকে ‘ওকাজ’ মেলা ছিল অগ্রগামী। এর পাশাপাশি আরব অগ্নিপূজকদের ‘নওরোজ’ এবং পৌত্তলিকদের ‘মিহিরজান’ ছিল উল্লেখযোগ্য উৎসব অনুষ্ঠান। এসব উৎসব ও মেলাতে মদীনাবাসীসহ সমগ্র আরবরা অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বিকৃত বিনোদনে মেতে উঠতো। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. মদীনায় হিজরত করার পরও মুসলমানরা এসব উৎসবে অংশগ্রহণ করতেন। উৎসবগুলো ছিল আরবসমাজের উচ্চবিত্তদের কর্তৃক রচিত খেয়ালিপনার উৎসব। ‘আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ’ গ্রন্থের এক হাদিসে এসেছে আনাস রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, (এসব উৎসবে অংশগ্রহণকারী) ‘মুসলমানদেরকে মহানবী সা. ডেকে জিজ্ঞেস করলেন এসব উৎসবের তাৎপর্য কী? মদীনাবাসী উত্তর করলেন এদিনে আমরা খেলাধূলা আমোদফুর্তি করি। রাসূল সা. বললেন, আল্লাহ পাক আমাদেরকে এরচেয়ে উত্তম দু’টি দিবসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, একটি ঈদুল আজহা অন্যটি ঈদুল ফিতর’ (সুনানে আবু দাউদ)। কুরুচিপূর্ণ বিকৃত বিনোদনের মাঝে এ দুটি দিন ছিল আল্লাহর রহমত হিসেবে মুসলমানদের জন্য বিশেষ উপহার। এই হাদিস থেকে জানা যায়, আরবে ঈদ উদযাপনের সূত্রপাত হয় তখন থেকেই। পবিত্র কোরআনের সূরা হাশরের সাত নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘রাসূল সা. তোমাদের জন্য যা এনেছেন তা তোমরা গ্রহণ কর আর তোমাদের জন্য যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকো’। সুতরাং ঈদ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিম ও বিশ্ববাসীর জন্য মূল্যবান এক উপঢৌকন।
মুসলমানগণ যে ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে ঈদ উদযাপন করে থাকেন সেই ভিত্তির একমাত্র সূত্র হচ্ছে কোরআন ও হাদিস। পবিত্র কোরআনের সূরা কাউসারে বলা হয়েছে ‘(হে রাসূল) নিশ্চয় আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি। সুতরাং আপনি আপনার রবের উদ্দেশে নামাজ আদায় করুন এবং কোরবানি করুন। আপনার দুশমনরাই পরাজিত’। এ আয়াতে নামাজ ও কোরবানির বিষয়টি ঈদের সাথে সংশ্লিষ্ট। নামাজের মাধ্যমে ঈদ উদযাপনের বিষয়টি একাধিক হাদিসে এসেছে। হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেন, রাসূল সা. ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হতেন। অতঃপর নামাজ পড়ে ঈদের উৎসব শুরু করতেন (মুসলিম)। বারাআ রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল সা.কে ভাষণ দিতে শুনেছি; তিনি বলেছেন, আজকের এই দিনকে যে কাজ দিয়ে শুরু করা উচিত তা হলো প্রথমে আমরা নামাজ আদায় করবো তারপর ফিরে আসবো ও কোরবানি করবো। যে এ রূপ করবে সে আমাদের রীতি সঠিকভাবে পালন করবে (বুখারী)। এ দুটি হাদিস থেকে জানা যাচ্ছে; প্রথমে নামাজ বা ইবাদত বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তারপর আনন্দ-উৎসব পালন করা। এ আনন্দ শরিয়তের সীমারেখার ভেতরে থেকে উদযাপন করা। রাসূল সা. মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঈদের নামাজ ত্যাগ করেননি। রাসূল সা. সর্বপ্রথম ঈদের নামাজ আদায় করেন রমযানের সিয়াম (রোযা) ফরজ হবার পর অর্থাৎ দ্বিতীয় হিজরির শাওয়াল মাসের ১ তারিখে। এ ঈদই ছিল মুসলিম উম্মাহর উদযাপন করা প্রথম ঈদ। ঈদের নামাজ প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ওয়াজিব। রাসূল সা. ঈদের দিন যেভাবে নিজেকে প্রস্তুত রাখতেন সেভাবে প্রস্তুত থাকাটা মুসলমানদের জন্য সুন্নাত। ঈদের এ প্রস্তুতি ফজরের নামাজ থেকে আরম্ভ করা উত্তম। যেমন খুব ভোরে বা সকালে ঘুম থেকে ওঠা। মেসওয়াক করা। গোসল করা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় পরা। সুগন্ধি ব্যবহার করা। ফজরের নামাজের পর বেশি বিলম্ব না করে ঈদগাতে যাওয়া এবং যাওয়ার আগে মিষ্টদ্রব্য আহার করা ও ফিতরা আদায় করা। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না থাকলে ঈদের নামাজ মসজিদে না পড়ে ঈদগাহে পড়া। পায়ে হেঁটে এক রাস্তা দিয়ে গিয়ে অন্য রাস্তা ধরে ফিরে আসা এবং সমস্ত রাস্তায় মৃদুস্বরে তাকবির পড়া। কিন্তু ঈদুল আজহার দিন উচ্চস্বরে তাকবির পড়া।
হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খেয়ে রাসূল সা. বাইরে বের হতেন না। একটি বর্ণনায় আছে তিনি বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেয়ে ঘর থেকে বের হতেন (বুখারি)। আবার ঈদুল আযহার দিন নামাজের আগে কোনো কিছুই খেতেন না। বুখারির অন্য একটি হাদিসে রয়েছে রাসূল সা. ঘর থেকে তাকবির দিতে দিতে পায়ে হেঁটে এক পথে ঈদগাহে যেতেন এবং অন্যপথে ফিরতেন। বুখারির আর একটি হাদিস থেকে জানা যায় রাসূল সা. দুই ঈদের নামাজ আদায় করতেন আযান ও ইকামাত ছাড়াই এবং নামাজের পরে খুতবা পড়তেন। মুসলিম শরিফের হাদিসে রয়েছে রাসূল সা. ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের দিন সূরা কাফ ও সূরা কামার পড়তেন। ঈদ উদযাপনের ভিত্তি হিসেবে এসব হাদিসের গুরুত্ব মুসলমানদের নিকট অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রমযান মাস পূর্ণ করে রোযা রাখার পর শাওয়াল মাসের ১ তারিখ সকালের দিকে ঈদুর ফিতরের নামাজ পড়তে হয় এবং যিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদুল আযহার নামাজ পড়তে হয়।
ঈদ মুসলমানদের জন্য খুশির বার্তা নিয়ে ফিরে আসে বলেই ঈদ আনন্দের উৎসব। খুশির সেই বার্তা হচ্ছে, এই দিনে আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলমানদের অপরাধসমূহ (আল্লাহর সাথে অংশীদারিত্ব, খুন, ধর্ষণ, অধিকারহরণসহ বড় অপরাধ ব্যতীত) ক্ষমা করে দেয়া হয়। সেজন্যই ঈদ বিশ্বমুসলিমদের জন্য আনন্দের; খুশির উৎসব। অপরাধের দায় থেকে মুক্ত হতে পারলে নিজেকে হালকা মনে হয়; নিজের ভেতরে একধরনের পুলক অনুভূত হয় সেই সাথে আনন্দ অনুভব করা যায়। ঈদের দিনে এই সাধারণ ক্ষমাপ্রাপ্তি মুসলমানদের জন্য আনন্দের। এ ছাড়া আনন্দের আর অন্য কোনো কারণ ঈদের মধ্যে নেই। অপরাধের শাস্তি থেকে মুক্তি পাবার যে আনন্দে সেটিই সবার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের।
মুসলমানদের কোনো উৎসবই হৈহুল্লোড় ও রঙ তামাশার নয়। প্রত্যেকটি উৎসবই শান্তি ও সৌহার্দ্যরে প্রতীক। এসব উৎসবের মধ্যেই মুসলমানদের জন্য ইবাদত পরিপূর্ণ করার অবকাশ থাকে। আতশবাজি পোড়ানো, পটকা ফাটানো, ঢাকঢোলকাঁসাই বাজানো কিংবা রঙ ছিটানো, গানের আসর, মদের আড্ডা বসানোর মতো কোনো আয়োজন ঈদের আনন্দের সাথে যুক্ত হতে পারে না। আনন্দ অবগাহনের জন্য যদি এসব বিষয়ের সাথে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করা হয় তবে মুসলিম হিসেবে ঈদের তাৎপর্যকে অপমান অপদস্থ করা হয় এবং যেটির বিনিময়ে আনন্দের বন্দোবস্ত হয় সেই ক্ষমাপ্রাপ্তিতে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ঈদের ইতিহাস অনেক পুরাতন হলেও বাংলাদেশে ঈদ উদযাপনের বর্ণাঢ্য আয়োজন কখন থেকে শুরু হয়েছে তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে মুসলমানদের আধিপত্য সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পর মুসলিম জনসংখ্যাবহুল এলাকাগুলোতে হয়তো সমবেতভাবে ঈদ উদযাপন করার সুযোগ ঘটে সেটিও হয়তো মধ্যযুগের শেষপ্রান্তে এসে হবে হয়তো। এর আগে মুসলিম বাদশাহগণ কর্তৃক আয়োজিত ঈদগাতেই সাধারণ মুসলমানরা অংশগ্রহণ করে থাকতে পারেন।
মুহাম্মদ (সা.) থেকে আরম্ভ করে উমাইয়া খেলাফত পর্যন্ত ঈদ মুসলিম সমাজে উৎসব-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আড়ম্বরপূর্ণভাবে পালিত হয়ে এসেছে এবং ঈদের মৌলিকত্বও প্রায় বরাবরের মতোই অব্যাহত ছিল মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে। তখন ঈদ উদযাপিতও হয়েছে মুসলিম জাতীয়তাবাদের শক্তি নিয়ে মুসলিম রাজত্বে। সুতরাং মুসলিম সা¤্রাজ্যসমূহে ঈদ ঘটা করে সম্মিলিতভাবেই উদযাপিত হওয়া ছিল স্বাভাবিক। পরে যখন মুসলমানরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান গ্রহণ শুরু করেন তখন সেসব এলাকায় সাথে সাথে মুসলমানরা মুসলিম জাতীয়তাবাদের শক্তিতে আবির্ভূত হতে পারেননি; এই শক্তি অর্জন করতে তাদের সময় লেগেছে বহু বছর। ভারতবর্ষও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সে জন্য ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের মধ্যে ঈদ তার পূর্বের ধারাবাহিকতাকে সংগঠিত করতে পারেনি। গোটা ভারতবর্ষে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটেছে মোগলদের সময়ে। মুহাম্মদ বিন কাসেমের নেতৃত্বে ভারতবর্ষে মুসলমানদের প্রবেশ (৭১১ খ্রি.) ঘটলেও ঈদগা মাঠে গিয়ে সমবেতভাবে ঈদের নামাজ আদায়ান্তে ঈদ উদযাপন করার পরিবেশ তখনও ছিল না। সে সময়গুলোতে মুসলমানদের ঈদ পারিবারিক গণ্ডির ভেতরে রাজদরবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ অবস্থা সুলতানি আমল পর্যন্ত চলতে দেখা যায়; তবে ধীরে ধীরে মুসলিম জাতীয়তাবাদী শক্তিতে মুসলমানরা বলিষ্ঠ হতে থাকে। মোগলদের সময়ে মোগলরা ক্ষমতার শীর্ষে চলে আসে। এ সময় মুসলিম জনসংখ্যা অপ্রতুল হওয়ায় রাজদরবার কেন্দ্রিক ঈদগাতেই তাদের ঈদ উদযাপন করতে হতো। তবে ঈদ, নামাজ, রোযা, দানখয়রাত ইত্যাদি ইসলামী বিধিবিধান যথারীতি মুসলমানদের আচার আচরণে সর্বত্রই শোভা পেতো। মোগল শাসন বঙ্গদেশ পর্যন্ত পৌঁছার আগেই এ অঞ্চলে মুসলমানদের আনগোনা তো ছিলই এবং তারা ইসলামী আচার আচরণেও অভ্যস্ত ছিলেন।
১২০৪ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানরা রাজনৈতিকভাবে বঙ্গদেশে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। এ অঞ্চলটিতে মুসলিম সুফি, দরবেশ, সাধকরা ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে উত্তর ভারত হয়ে আগমন করেন। আর বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বণিকরা এসেছিলেন সরাসরি আরব থেকে আরাকান হয়ে চট্টগ্রাম নৌবন্দরের মাধ্যমে এই বাংলায়। অধিকাংশ ঐতিহাসিক এসব তথ্যের সাথে সহমত পোষণ করেন। ধর্ম প্রচার ও বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আগমন করা এইসব মানুষ ছিলেন তুর্কি ও আরব বণিক। তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে রোজা, নামাজ ও ঈদের সূত্রপাত ঘটেছে বলে মনে করা যেতে পারে। সে সময় এখনকার দিনের মতো অত আড়ম্বরপূর্ণ ঈদ এদেশে পালন হতো না। অর্থাৎ বর্তমানে মুসলিম সমাজে ঈদ যে উৎসবের রূপ নিয়েছে এমন উৎসবের সাথে ঈদ উদযাপনের কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না। এ দেশে রোজা পালনের প্রথম ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় ‘তাসকিরাতুল সোলহা’ নামক গ্রন্থে। এ গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী আরবদের জনৈক শেখউল খিদা হিজরি ৩৪১ মোতাবেক ৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আগমন করেন। এর আগে শাহ সুলতান রুমি নেত্রকোনা এবং বাবা আদম শহীদ বিক্রমপুরের রামপালে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। শেখউল খিদা চন্দ বংশীয় রাজা শ্রীচন্দের শাসনকাল ৯০৫-৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আগমন করেন বলে জানা যায়। তাদের প্রভাবে এত ঘটা করে উৎসবের আমেজে ঈদ পালন না হলেও ব্যক্তিগতভাবে রোজা, নামাজ, ঈদ পালন হয়েছিল তা অস্বীকার করা যায় না। একটি ইতিহাস থেকে জানা যায় ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে সুবেদার শাহসুজার নির্দেশে তার প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাসেম ভূমি থেকে প্রায় তিন মিটার উঁচুতে একটি ঈদগা নির্মাণ করেন। ঈদগার পশ্চিম দিকে প্রায় চার মিটার উঁচু করে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে সেখানে মেহরাব ও মিনার তৈরি করেন। ঈদগাটি রাজদরবার, আদালত, বাজার ও সৈন্য ছাউনির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিল। প্রথম প্রথম সুবেদার, নায়েব, নাজিম ও মোগলদের অভিজাত কর্মকর্তা এবং তাদের আত্মীয় বন্ধুরাই এই ঈদগাহে নামাজ আদায় করতে পারতেন। পরে ঈদগাটি সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এই ধারা উনিশ শতক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। সাধারণ দরিদ্র মুসলমানদের অনেকেই আমির ওমরাদের এসব ঈদগাহে নামাজ আদায় করতে পারতেন না। ঈদের দিন হইচই আনন্দ উল্লাস হতো মোগল ও বনেদি পরিবারের উচ্চপদস্থ এবং ধনাঢ্য মুসলমানদের মধ্যে। সেখানে সাধারণ মুসলমানদের অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ না থকলেও অপেক্ষাকৃত দরিদ্র মুসলমানদের সাথে একটু দূরত্ব তো ছিলই। সে জন্য ঈদ এই বঙ্গদেশে সামাজিক বা জাতীয় উৎসবে রূপান্তর হতে সময় লেগেছে। তবে মোগলদের সময় ঈদ যে সমবেতভাবে উদযাপন হতো সেটা বুঝা যায় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে খোলামেলা গণমুখী শাহি ঈদগাহের উপস্থিতি দেখে।
মোগলদের ঈদ উদযাপনের দৃশ্যসংবলিত হাতে আঁকা অনেক চিত্র ইতিহাসের দলিল হিসেবে রয়েছে। সেসব চিত্রে ঈদ উদযাপনের আনন্দ কোলাহলের পরিবেশ তুলে ধরা হয়েছে। এ রকম একটি চিত্রে স¤্রাট বাবরকে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা যায়। সুলতানদের ঈদ উদযাপনের কথা জানাতে গিয়ে তাবাকাৎ ই নাসিরীর লেখক মিনহাজ উস সিরাজ জানিয়েছেন, সুলতানরা রমযান মাসে ধর্মীয় আলোচনার জন্য ধর্মপ্রচারক নিযুক্ত করতেন। বাংলাদেশে ঈদ উদযাপনের সবচেয়ে পুরাতন বর্ণনা পাওয়া যায় মির্জা নাথানের লেখায়। তিনি উল্লেখ করেন, সন্ধ্যায় মোমবাতির আলোয় যখন চাঁদ দেখা যেতো তখন শিবিরে বেজে উঠতো শাহি তূর্য রণসিঙ্গা, গোলন্দাজ বাহিনী ছুড়তে থাকতো গুলি। সন্ধ্যে থেকে মাঝরাত অবধি পর্যন্ত চলতো আতশবাজি, শেষ রাতে হতো কামান দাগানো। মোগলদের ঈদ উদযাপন হতো তিন দিন ধরে। সুবেদার ইসলাম খানের সেনাপতি মির্জা নাথানের বর্ণনা থেকে এসব তথ্য পাওয়া যায়। দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলির সময় ত্রিপুরা জয় করা হয়। ঈদের দিন নবাব মুর্শিদ কুলি খুশি হয়ে মুদ্রা বিতরণ করতেন। ঢাকার কেল্লাহ থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে ঈদগাতে যাওয়ার পথে ছড়ানো হয়েছিল রাজকীয় মুদ্রা।
স্যার টমাস মেটকাফের ব্যবস্থাপনায় আঁকা ছবিতেও মোগলদের ঈদ উদযাপনের দৃশ্য অবলোকন করা যায়। মেটকাফ ছিলেন দরবারের সদস্য। স¤্রাট বাহাদুর শাহ জাফর স্যার টমাস মেটকাফকে দায়িত্ব দিয়ে ঈদের শোভাযাত্রার একটি ছবি আঁকিয়ে নেন। মেটকাফ মুসলিম আর্কিটেকচারের ওপর গবেষণা ও চিত্রাঙ্কনের ব্যবস্থা করেন। কাগজে আঁকা এই চিত্রটির মাধ্যম ছিল কালি, তুলি এবং রঙ। ১২ ফোল্ডের দীর্ঘ স্ক্রুল চিত্রে দেখা যায় স¤্রাট বাহাদুর শাহ জাফর, তার ছেলে, আত্মীয়স্বজন, মেটকাফ ও অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত রয়েছেন। চিত্রে দেখা যায় অমাত্যবর্গ সুসজ্জিত হাতির পিঠে অবস্থান করছেন। এই চিত্রটি অঙ্কন করেন চিত্র শিল্পী মাযহার আলি।
মোগলদের পর ভারতবর্ষের ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন ইংরেজরা। তারা তাদের মতো করে বিভিন্ন উৎসব উদযাপনের ব্যবস্থা করেন। এ সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে ঈদের পরিবর্তে ক্রিস্টমাসডে বা বড় দিন। ইংরেজ ও হিন্দুদের তৈরিকৃত রাজনৈতিক বিড়ম্বনায় পড়ে বাঙালি মুসলমানরা উৎসাহ উদ্দীপনা হারাতে থাকে। ১৭৫৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব বাঙালি মুসলমানদের সমাজজীবনেও বিস্তার লাভ করে। বাঙালি মুসলমান উৎসবপার্বণ পালনে সরকারি পোষকতা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে এবং মুসলিম জাতীয়তাবোধের চেতনা হুমকির মুখে পড়ে। এ সময় ইংরেজ মিশনারিদের প্রভাবে হিন্দুদের মতো বাঙালি মুসলমানদেরও অনেকেই খ্রিস্টধর্মের দীক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করেন। জাতীয়তার শক্তিতে বাঙালি মুসলমান ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে থাকে। ইংরেজ ও হিন্দুরা মিলে ইচ্ছে করেই মুসলিম জাতীয়তাবাদের চেতনাকে দুর্বল করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। সে কারণে ঈদ উৎসবের আড়ম্বরতাও ম্লান হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর স্যার সৈয়দ আহমেদ যে ভূমিকা রাখেন তা প্রণিধানযোগ্য। স্যার সৈয়দ আহমেদের প্রচেষ্টায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নবাব আব্দুল লতিফ (১৮২৮-৯৩) ‘মহামেডান লিটারেরি সোসাইটি’ নামে ১৮৬৩ সালে একটি সাহিত্য সমিতি গঠন করেন। বাঙালি মুসলমানেরা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হোক, স্বাধীন ও স্বকীয় চিন্তাধারায় জাতীয়তাবাদের চেতনা নিয়ে বিকশিত হোক এবং নিজেদের অবস্থার পর্যালোচনার মাধ্যমে জাতীয় জীবনের উন্নতি সাধন করুক এই-ই ছিল এই সমিতি গঠনের উদ্দেশ্য। এসব প্রচেষ্টার ফলে বাঙালি মুসলমানরা বাংলাসাহিত্য সাধনায় আত্মনিয়োগ করে মুসলিম জাতীয়তাবাদের চেতনাকে সমুন্নত করতে সচেষ্ট হোন। ইতোমধ্যে মুসলমান সাহিত্যিকদেরকে দুটি দলে বিভক্ত হতে দেখা যায়। একটি হলো ইংরেজ-হিন্দু-মুসলমান সমন্বয়ে যৌথভাবধারার দল; অন্যটি স্বতন্ত্র মুসলিম জাতীয়তাবাদ ভাবধারার দল। মুসলমান স্বতন্ত্র ভাবধারার মুখপাত্র হিসিবে ১৮৮৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘সুধাকর’ নামক সাপ্তাহিক সাহিত্যপত্র। বস্তুত আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উৎপত্তি এখান থেকেই। এ সময়টাতে মুসলমান জাতীয়তাবাদের চেতনাকে শক্তিশালী করতে আগমন ঘটে বেশ কয়েকজন গদ্য লেখক ও কবি-সাহিত্যিকদের। সুধাকর দলের প্রবীণ লেখক ছিলেন মৌলভী মেয়রাজউদ্দিন আহমদ, পণ্ডিত রিয়াজুদ্দিন আহমদ মাশহাদী, শেখ আব্দুর রহিম ও মুন্সী মোহাম্মদ রিয়াজউদ্দিন। তাদের প্রচেষ্টায় ১৮৮৭ সলে আর একটি গ্রন্থ ‘এসলাম তত্ত্ব’ প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। সুধাকর এর ভাবধারায় এগিয়ে চলে বাংলা সাহিত্য সাধনা। অন্যদিকে মুসলমান জাতীয়তাবাদ সৃষ্টিতে অবদান রেখেছিল বহুবিদ সাময়িক পত্রপত্রিকা। এসবের মধ্যে প্রথম প্রকাশিত শেখ আলীমুল্লাহ সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘সমাচার সভারাজেন্দ্র’। ১৮৩১ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকাটি ছিল দ্বিভাষিক পত্র। ১৮৪৬ সালে প্রকাশ পায় ‘জগদুদ্দীপক ভাস্কর’ (ঞযব ওহফরধহ ঝঁহ)। ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত হয় ‘কোহিনুর’। ‘আল এসলাম’ প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে। ‘সওগাত’ প্রকাশ করেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে। ‘মোসলেম ভারত’ মোজাম্মেল হকের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে, ‘শিখা’ প্রকাশ পায় আবুল হোসেনের সম্পাদনায় ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে। এসব পত্রপত্রিকার মাধ্যমে মুসলিম জাতীয়তাবাদ সৃষ্টিতে অবদান রেখেছিলেন মুসলমান কবি-সাহিত্যকগণ। ধীরে ধীরে বাঙালি মুসলমান আবার মুসলিম জাতীয়তাবাদের ব্যানারে একত্রিত হতে থাকেন এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। রাজনৈতিকভাবে ইংরেজরা ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। মুসলমানরা ফিরে পায় ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার পরিপূর্ণ অঙ্গন। অনুকূল পরিবেশ পেয়ে বাঙালি মুসলমানরা গরিব-ধনী নির্বিশেষে সমবেতভাবে ঈদ উদযাপনের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করতে সক্ষম হন।
উনিশ শতকের শেষ দিকে ঈদের তাৎপর্য ও লক্ষ্য উদ্দেশ্য নিয়ে যারা সাহিত্যাঙ্গনে কলম ধরেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তার কবিতায়, গল্পে ও প্রবন্ধে ঈদের তাৎপর্য পরিষ্কাভাবে ওঠে এসেছে। নজরুলের ভাষায় বাঙালি মুসলমানের ঈদকে বুঝতে পারলে ঈদের তাৎপর্যকে বুঝাও সহজ হতে পারে।
কাজী নজরুল ইসলাম উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন ঈদের প্রকৃত শিক্ষাকে এদেশের মানুষ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে। সে জন্য তিনি ঈদকে সামনে রেখে লিখেছেন গান ও কবিতা।
ইসলাম ধর্ম মানবতার ধর্ম। এ ধর্মের মানুষ যখন নামাজে দাঁড়ায় তখন আমির-ফকিরের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। বাদশা-গোলাম একই কাতারে সমবেত হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা আল্লাহর কাছে মস্তক অবনত করেন। শুধু মাত্র আল্লাহর সাথে মানুষের পার্থক্য করা যায়; মানুষে মানুষে পার্থক্য করার কোনো অবকাশ ইসলাম ধর্মে নেই এবং এই ধর্মের অনুসারীরা সেটা করতেও পারে না। কিন্তু সমাজবাস্তবতায় নজরুল সেটা লক্ষ্য করলেন না। ঈদের শিক্ষা ও তাৎপর্য মানুষের কাছে সেভাবে ধরা পড়েনি যেভাবে ধর্মে ব্যাখ্যা করা রয়েছে। ধর্মের ব্যাপারে নজরুলের ক্ষতটা এখানেই।
মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আয্হা। বছরে এ দু’টি উৎসব মুসলিমদের জীবনে ঘুরেফিরে আসে। আত্মসংযম আর ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর উৎসব দু’টি মুসলিমদেরকে মহিমান্বিত হবার শিক্ষা দেয়। রমযানের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও কোরবানির মধ্য দিয়ে যে লোভ-লালসা পরিহারের বন্দোবস্ত করা হয়েছে সেখান থেকে অর্জিত জ্ঞান বিশ্বমানবতার পথকে উজ্জ্ব¡ল করে তোলে। সে জন্যে ঈদের বার্তা মানবতার বার্তা। অথচ ঈদ এলো কিন্তু মানুষ সেই বার্তা গ্রহণ করতে চাইল না; ব্যক্তিমানুষ মানবিক হতে পারল না, লালসা ছাড়তে পারল না, ভোগের নেশা বিসর্জন দিতে পারল না সে কেমন মুসলমান? তাই তিনি ‘বকরিদ’ কবিতায় বললেন.. ‘অন্তরে ভোগী বাইরে যোগী মুসলমান /সে নয়’। অন্য এক কবিতায় নজরুল বললেন..মনের পশু যে তোর/ আজকে তারে কর জবাহ’।
ইসলাম ধর্মের যে গভীর তাৎপর্য রয়েছে সে তাৎপর্য নজরুল ইসলাম একাগ্রচিত্তে বুঝতে পেরেছিলেন। উদঘাটন করতে পেরেছিলেন আল্লাহর উদ্দেশ্য; মানুষ সৃষ্টির রহস্য এবং ধর্মের মর্মবাণী। ধর্মের সেই মর্মবাণী তিনি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন মানুষ থেকে মানুষে সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে। কাজী নজরুল ইসলাম মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য যে উদ্ধার করতে পেরেছিলেন এবং মানুষের জন্য যে ঈদ সে ঈদের অন্তর্নিহিত যে সংবাদ আত্মস্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তা বুঝতে অসুবিধা হয় না তার বিখ্যাত ঈদসঙ্গীত ‘ও মন রমযানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ’ এই গান থেকে। বিখ্যাত এই গানটি ঈদের তাৎপর্যকে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। তিনি লিখলেন-‘তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাকিদ/ তোর সোনাদানা বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ…’। নজরুল বুঝাতে চেষ্টা করলেন নিজের স্বার্থকে ভূলুণ্ঠিত করার যে শিক্ষা তা হলো মূলত আসমানী শিক্ষা। এ শিক্ষাই ঈদের শিক্ষা। নজরুল ‘শহীদী ঈদ’ কবিতায় বলেছেন.. ‘শহীদের ঈদ এসেছে আজ/ শিরে-থাকে খুন- লোহিত তাজ/ আল্লাহর রাহে চাহে সে ভিখ’। ঈদকে নজরুল নানা ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। সে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ও ভালোবাসার শিক্ষা। ‘ঈদ মোবারক’ কবিতায় বলেন ভোগ নয় ত্যাগ, সঞ্চয় নয় অপচয়-ই হবে ঈদের তাৎপর্য। তিনি বলেন ‘ঈদ্ উল ফিতর আনিয়াছে তাই নব বিধান/ ওগো সঞ্চয়ী, উদ্বৃত্ত যা করিবে দান/ ক্ষুধায় অন্ন হোক তোমার’।
ঈদ নিয়ে ‘নতুন চাঁদ’ কাব্য গ্রন্থে তিনটি কবিতা ‘মোবারকবাদ’, ‘নতুন চাঁদ’ ও ‘কৃষকের ঈদ’ রচিত হয়েছে। ‘নতুন চাঁদ’ কবিতায় কবি বলেছেন-‘চাঁদ আসিছে রে নতুন চাঁদ!/ অপরূপ প্রেম রসের ফাঁদ/ রবে না ধর্ম জাতির ভেদ/ রবে না আত্ম-কলহ-ক্লেদ। নজরুল ঈদের আনন্দ উপভোগ করেননি তিনি উপভোগ করেছিলেন ঈদের মর্মকথা। তিনি বুঝেছিলেন ঈদ মানে মানুষে মানুষে একাকার হয়ে যাওয়া। যে মর্মোপলব্ধিতে ঈদকে নজরুল শহীদী বৈশিষ্ট্যের আধার ভেবেছেন এবং সেই ভাবনা থেকে তিনি লিখেছেন-‘শহীদী ঈদগাহে জমায়েত ভরি’/ এসো আবার ঈদ, চল ঈদগাহে’। ঈদকে শহীদী ময়দান হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে ১৯২৮ সালে ‘শিখা’ পত্রিকার (২য় বর্ষ সংখ্যায়) ছাপা হলো ‘ঊর্ধ্বে আকাশে হানিছে বাজ/ শহীদী ঈদের সেনারা সাজ/ দিকে দিকে চলে কুচকাওয়াজ/ খোলরে নিঁদ মহল’। ঈদের উত্তাল আনন্দের ঢেউয়ে দুঃখী মানুষদেরকে ভেসে যেতে দেখেছিলেন নজরুল নিজের চোখে। সে স্রোতের ভেতর থেকে বঞ্চিত মানুষদেরকে কেউ উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেনি। কিন্তু ঈদ এই শিক্ষা নিয়ে গণমানুষের দ্বারে কখনোই হাজির হয় না। তাই সর্বজনীন এই ঈদোৎসবের মাধ্যমে সকলকে মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্বের মহামিলনে বাঁধতে হবে।