বৃদ্ধ নাবালক মাথা উঁচু করে সোজা হয়ে হেঁটে উঠোন পেরিয়ে ভেতর বাড়ির ঘরের কাছে এসে দেখে গ্রামের কয়েকজন বসে আছেন দাওয়ায়, সঙ্গে খাবার। পোলাওয়ের গন্ধ পেয়েছে সে দূর থেকেই, এখন চোখে পড়ে দাওয়ায় সাজিয়ে রাখা খাবারের ঢাকনা দেয়া পাত্রগুলি। সে না দেখেই বলতে পারে পাত্রের ভেতরে আছে পোলাও, মুরগি, মাছ এবং হয়ত খাসি কিংবা গরুর মাংসও। যারা কয়েকদিন থেকে খাবার নিয়ে আসছেন এইসবই আনেন, কেননা তারা গ্রামের অবস্থাপন্ন মানুষ। এইসব দামি খাবার তার পরিবারে কেবল বছরে একবার ঈদের সময়ই কিছুটা রান্না হয়, সেও পরিমিত মাপে। তাও যদি তার বাবার জমিতে ভালো ফসল হয়, হাটে বিক্রি করে ভালো রোজগার হয়। বৃদ্ধ নাবালকের বাবা প্রৌঢ় তমিজুল ধনী তো নয়ই, মধ্যবিত্তও বলা যাবে না। তবে বছরে একবার তিনি নাবালগ এবং ছোট ভাই কাসেমের জন্য পোলাও, মুরগি রান্নার আয়োজন করতে বলেন তাদের মাকে। নিজে কম খান, কিন্তু দুই ছেলেকে বছরে অন্তত একদিন ভালো খাওয়ানোর সখ তার সাধ্যকে ছাড়িয়ে গেলেও সেই অভ্যাস রেখেছেন তিনি। এখন প্রায় প্রতিদিনই নাবালকদের বাড়ি গ্রামের অবস্থাপন্ন পরিবারগুলো থেকে ভালো খাওয়া তাদের বাড়ি আসছে। সেসব তার জন্য আনলেও বাবা, মা, ভাই-বোন, পরিবারের সবাই খেতে পারে, কেননা তার ছোটবেলা থেকেই খাবার কোনো রুচি নেই। গত এক সপ্তাহ থেকে তাদের বাড়িতে যেন একটা উৎসব লেগে আছে, সবসময় লোকজন আসছে। সঙ্গে থাকছে খাবারের পুঁটুলি। শুধু শীতলপুর গ্রামের পরিবারগুলি না, আশপাশের গ্রাম থেকেও অচেনা পরিবারের মানুষ নিয়ে আসছে খাবার। সবার মুখেই আফসোস। তারা বৃদ্ধ নাবালকের বাবা প্রৌঢ় তমিজুলের কাঁধে হাত দিয়ে সান্ত্বনার কথা বলেন। নাবালকের জন্যই তাদের এ বাড়িতে আসা এবং খাবার আনা কিন্তু তারা বেশিক্ষণ তারা তার মুখের দিকে তাকাতে পারেন না। যেন সঙ্কোচ বা জড়তা তাদের আড়ষ্ট করে রাখে। চোখে-মুখে প্রচ্ছন্ন ভয়ের ছাপ ভালো করে দেখলেই বোঝা যায়। তার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তারা অস্বস্তিতে পড়েন যেন এবং অচিরেই একটা অজুহাত বের করে অন্যদিকে তাকান। ক্ষণিকের জন্য নাবালকের চেহারা দেখলেও তারা সাপ দেখে আঁতকে ওঠার মত চমকে যান যেন। আপনা থেকেই তাদের চোখ নিমিলিত হয় এবং তারা ঘাড় ফিরিয়ে একটা কিছুর ওপর দৃষ্টি ফেলেন।
বৃদ্ধ নাবালকের বাবা প্রৌঢ় তমিজুল বেশ লজ্জায় পড়েন। পঞ্চাশ বছরের মানুষটি ব্যস্ত হয়ে পড়েন গ্রামের অবস্থাপন্ন কৃষকদের এবং গঞ্জের গণ্যমান্য ব্যবসায়ীদের তার বাড়িতে দেখে। তাঁদের কোথায় বসাবেন, কি করে আপ্যায়ন করবেন তার দিশা পান না তিনি। তাঁরা হেসে বলেন, ব্যস্ত হওয়ার কিছু নাই। আমরা তো বাইরের কেউ না, মেহমানদারি করার লাগি ব্যস্ত হন ক্যান? দেখা-শোনা কম হয়, কিন্তু আমরা তো পড়শি। আমাদের লগে মেহমানদারি করণের কাম নাই। আপনে বহেন দেখি মিয়াভাই। গ্রামের মানুষেরা তার মত সামান্য কৃষকের বাড়ি এসে এমন তমিজ করে কথা বলেন যে দেখে আর শুনে বৃদ্ধ তমিজুল বড়ই কৃতজ্ঞবোধ করেন। এতে তার ভেতরের বিনয়ী ভাবটা আরো গঢ় এবং উচ্ছ্বসিত হয়। তিনি গায়ের পাঞ্জাবির খোটা দিয়ে মুখ-ছোখ মোছেন। কাঁদেন কি না বোঝা যায় না, তবে আবেগে তাঁর স্বর বুজে আসে। কেউ বলেন, তাহলে এই শ্যাষ? কিছুই করার নাই? বৃদ্ধ তমিজুল বলেন, চেষ্টার তো শেষ করি নাই। অনেক আগেই ডাক্তার কইছেন এই রোগের কোনো চিকিৎসা নাই। এই কথা আপনারাও শুনিছেন। তারপরও আমি চিকিৎসার লাগি চেষ্টার কম করি নাই। জামি বেইচাও শহরে গেছি ছেলেরে লইয়া। শুধু জেলা শহর না, ঢাকাতেও গেছি বড় ডাক্তারের সন্ধানে। হেই কথাও আপনাদের অজানা নাই। বাবার কথা শুনে বৃদ্ধ নাবালক মাথা নেড়ে সায় দেয়। হ্যাঁ, তার বাপজানের চেষ্টার ত্রুটি নাই। মনে হয় তিনি এখনো হাল ছাড়েন নাই।
গণ্যমান্যদের মধ্যে কেউ বলেন, সময় যখন ঘনায়্যা আসতিছে, বাড়িতে মিলাদ পড়ান। কোরান খতম করা হোক। এ ছাড়া এখন আর করণের কিইবা আছে?
তাঁর কথা শুনে পাশ থেকে একজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, হ। হাচা কথা কইসেন ভাই। পরোয়ারদেগার বান্দাদের নিয়ত দেখবার লাগি কতো প্রেকারের পরীক্ষা নেন তা কে কতি পারে। বেশুমার হলিও তার কি হিসাব করা যায়? আমাগো মতো সামান্য মানুষ, পাপী-তাপী তার বান্দা তার মহিমার কতটুকুই বা সন্ধান পাই? কখনো দাওয়ায় বসে, কখনোবা ঘরের ভেতর থেকে বৃদ্ধ নাবালক সবার কথা শোনে। তাকে নিয়ে কথা হলেও সে কিছু বলতে গিয়েও বলে না। কেননা, এইরকম কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করে সে দেখেছে তার কথা শুনে মেহমানদের অনেকে ভীত আর আড়ষ্ট হয়ে যান। তারা চুপ করে থাকেন যেন একটা গায়েবি আওয়াজ শুনতে পেলেন।
গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেব আনে, সঙ্গে মক্তবের তালেবান কয়েকজন তারা দাওয়ায় মাদুর পেতে কুরআন শরিফ খুলে রেহালে রেখে সুর করে সূরা পড়তে থাকে। এক সপ্তাহ থেকে তারা প্রায় নিয়মিত আসছে। বৃদ্ধ নাবালক লোকের সমাগম দেখে বড়ই সঙ্কুচিত হয়ে যায়, সে লজ্জাবোধ করে। তার জন্য এতো মানুষ কতো কষ্ট করতিছে! এর আগেও তাদের বাড়ি গ্রামের মানুষের আসা-যাওয়া ছিল। ব্যাপারটা জানার পর শুধু তাদের শীতলপুর গ্রাম না, আশপাশ গ্রাম থেকেও মানুষ এসেছে দেখার জন্য। তাদের গ্রামের এক ধূর্ত মানুষ তার বাবাকে শলাপরামর্শ দিয়েছিল লোকদের কাছ থেকে তাকে দেখার জন্য চাঁদার টাকা নিতে। যুক্তি দিয়েছিল ছেলের চিকিৎসায় অনেক টাকা যাচ্ছে, এইভাবে কিছু আয় হলে তার বাড়তি খরচ মেটানোর একটা উপায় হবে। তার বাবা সেই শলাপরামর্শ কানে নেন নাই। বলেছেন ছেলেকে দিয়ে আমি ব্যবসা করলে আল্লাহ বেজার হবেন। বৃদ্ধ নাবালক সবই দেখে এবং সবই শুনতে পায়। সে তার বাবাকে বলে তিনি যেন অযথা খরচ-পাতি না করেন। যারা তাদের বাড়ি এসেছেন তাদের উদ্দেশ্যেও সে বলেছে, আপনারা কেন কষ্ট করতেছেন? একবার আসলিই হলো, এতোবার আসার কি প্রেয়জন? কিন্তু তাতে বইরের লোকের আনাগোনা থেমে যায়নি। তারা এসেছেন তাদের বাড়ি, সান্ত্বনা দিয়েছেন তার বাবা তমিজুলকে। তাদের কথা শুনতে শুনতে নাবালকের ভেতরে বেশ একটা অপরাধবোধ জেগে উঠেছে। তার জন্যই এতো আহাজারি, দুঃখ প্রকাশ। নিজের কাজ ফেলে রেখে তাদের বাড়ি এসে যে সময় কাটান তাঁরা তার যে মূল্য অনেক তা সে বোঝে। এই কারণেই ভেতরের অপরাধবোধটা জেগে ওঠে তার। এইভাবে চলছে গত সাত বছর ধরে। এক সপ্তাহ হল গ্রামের আর বাইরের থেকে আসা মানুষের যেন ঢল নেমেছে। সবই তার জন্য। এখন গ্রামের আর গ্রামের বাইরের মানুষ খালি হাতে আসেন না, সঙ্গে থাকে খাবার। নানাপদের ভালো ভালো খাবার, যার কিছু তাদের পরিবারে বছরে একবারই রান্না হয়। এখন তাদের জন্য আনা এইসব খাবার যেন প্রতিদিনই ঈদের আমেজ নিয়ে আসছে। কিন্তু তাদের পরিবারে কোনো আনন্দ বা উচ্ছ্বাস নাই বরং শোকের ছায়া যেন ক্রমেই বড় হচ্ছে। আফসোস! যার জন্য এইসব থরে থরে সাজানো খাবার সেই বৃদ্ধ নাবালক কিছুই খেতে পারে না। ছোটবেলা থেকেই মানে যখন সে চার বছরের তখন থেকেই সে খুব কম খায়। এ কথা দুঃখের সঙ্গে জানিয়েছে সবাইকে তার বাবা প্রৌঢ় তমিজুল। হ্যাঁ, সত্যই তাই বটে। খাবারের জন্য কখনো লালচ ছিল বলে তার স্মরণে আসে না। ভাবতে গিয়ে বৃদ্ধ নাবালক বড় করে শ্বাস ফেলে। চেষ্টা করেও সে কখনো যথেষ্ট খেয়ে বাবা-মাকে সন্তুষ্ট করতে পারে নাই। এই কারণে তার মনে বড়ই অনুতাপ এবং কষ্ট। সারা জীবন, এই পর্যন্ত, সে বাবা-মায়ের খুশির জন্য কিছুই করতে পারে নাই, এমনকি খাবার খেয়েও না। তারা তার জন্য কি না করেছেন? জমি-জমা বিক্রি করে শহরে নিয়ে গিয়েছেন, একবার দুইবার না, কয়েকবার। শুধু শুধু টাকা নষ্ট করেছেন তারা, এ কথা তার মনে হয়েছে শেষের দিকে যখন সব আশা বিদায় নিয়েছে। কিন্তু তার বাবা-মা আশা ছাড়েন নাই। শহরের ডাক্তারের ওষুধ ছাড়াও তার জন্য এনেছেন পীর সাহেবের পানি-পড়া, তাবিজ আর মাদুলি। পানি-পড়া খেয়েছে সে বাবা-মাকে খুশি করার জন্য যখন তার মনে কোনো বিশ্বাস ছিল না। এখন গলায়, কোমরে তাগা দিয়ে বাঁধা অনেক তাবিজ আর মাদুলি। কোনোটাই কাজে আসে নাই কিন্তু বাব-মাকে খুশি করার জন্য সে একটাও ফেলে দেয় নাই, শরীরে অস্বস্তিবোধ করলেও। এমনিতেই তার ভেতর অপরাধবোধ জমে উঠেছে বাবাকে চিকিৎসার জন্য খরচ-পাতি করতে দেখে। অবাধ্য হয়ে সেই অপরাধের ভার সে বাড়াতে চায় নাই।
মৌলভী সাহেব আগেও এসেছেন তাদের বাড়ি, এখন এক সপ্তাহ হল তিনি ঘন ঘন আসছেন। বাইরে থেকে আসা পোলাও, মুরগি এইসব তাকে তমিজের সঙ্গে খেতে দেয়া হয়। তিনি দাওয়ার বসে খেয়ে তৃপ্তির সঙ্গে ঢেঁকুর তোলেন। বদনার পানি ঢালেন প্রৌঢ় তমিজুল, হাত ধুয়ে কুলকুচি করেন মৌলভী সাহেব। তারপর দাওয়ায় আরাম করে বসে বলেন, আলহামদুলিল্লাহ! সবই তার ইচ্ছা। যখন যার যা হবার তাই হবিনে। এর কোনো এদিন-সেদিক নাই। মহান আল্লাহু রাব্বুল আলামিন তাঁর ইচ্ছার অর্থ বোঝে এমন সাধ কার? আমরা শুধু তাঁর তারিফই করতে পারি। কৃতজ্ঞতা জানাই তাঁর অপার মহিমার জন্য। মৌলভী সাহেব গ্রামের বাইরে থেকে এসেছেন, লেখাপড়া জানা মানুষ। তিনি গ্রাম্য ভাষায় কথা বলেন না। যাওয়ার আগে তিনি বৃদ্ধ নাবালকের কেশবিরল মাথায় হাত রেখে দোয়া করেন চোখ বুজে। একসময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন আবেগে শিহরিত হয়ে। তিনি বলেন, হে মাবুদ, তুমিই আমাদের ভরসা। তুমি আমাদের তকদির দিয়া এই দুনিয়ায় পাঠাও। এই দুনিয়া আমাদের সরাইখানা। আমরা এইখানে মুসাফির ছাড়া আর বেশি কি? কেউ আগে যায়, কেউ বা পরে। কিন্তু সবাইকে যেতে হয়। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। এই কথা বলে তিনি একপলক বৃদ্ধ নাবালকের দিকে তাকান। সে ঘরের ভেতরে বসে আছে দরজার সামনে। তার চোখে সবই পড়ে, সে সব কথাই শুনতে পায়।
থানা হেলথ কমপ্লেক্সের যুবক ডাক্তার আসেন, সঙ্গে সহকর্মিনী। তিনিও ডাক্তার। যুবক ডাক্তার বৃদ্ধ নাবালকের বুকে যন্ত্র বসিয়ে দেখার পর কান থেকে সেটা খুলে গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে বলেন, সবই ঠিক আছে। নর্মাল। আশঙ্কার কিছু নাই। শুনে প্রৌঢ় তমিজুলের চোখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি আগ্রহ নিয়ে বলেন, ওই যে শহরের বড় ডাক্তার কয়েছিলেন চৌদ্দ বছর। সেই হিসাবে তো ….। তার কথা শেষ হয় না। যুবক ডাক্তার হাসিমুখে বলেন, সব কথা কি ফলে যায় বাস্তবে? যায় না। দেখবেন চৌদ্দ বছর কেন, বিশ পঁচিশ বছরও পার হয়ে যাবে। কিংবা তারো বেশি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে আমরা আর কতটুকু জানি, বিশেষ করে এইসব ক্ষেত্রে। লাখে একজনের এমন হয়, এ সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানা নেই। যা বলা হয় তেমন করেই যে হবে তা কে জোর দিয়ে বলতে পারে? তারপর একটু সময় নিয়ে তিনি প্রৌঢ় তমিজুলের চোখে চোখ রেখে বলেন, সব ভবিষ্যদ্বাণীই কি ঠিক হয়? শুনে প্রৌঢ় তমিজুলের মুখের ঔজ্জ্বল্যতা আরো বৃদ্ধি পায়। তিনি আবেগবিহ্বল হয়ে বলেন, এমন কি হতি পারে? যুবক ডাক্তার হেসে তার সহকর্মিনীর দিকে তাকান, তারপর তমিজুলকে দেখে বলেন, হতে পারে। অবশ্যই হতে পারে। তমিজুল যুবক ডাক্তার ও তার সহকর্মিনীর উদ্দেশে বলেন, আপনারা কিছু মুখে দিয়া যান। পড়শিরা কতো খাবার আনিছেন। আমরা পরিবারের সবাই দুই বেলা খাইয়াও শ্যাষ করতে পারুম না। যুবক ডাক্তার সহকর্মিনীর দিকে হাসিমুখে তাকান। তারপর তমিজুলের দিকে ফিরে বলেন, খাওয়া যায়। হ্যাঁ, আপনে বলছেন যখন খাওয়া যায়। তারা দুই জন দাওয়ায় বসে বেশ তৃপ্তির সঙ্গে প্লেটে দেওয়া পোলাও, মুরগি এইসব খান। একটা কুকুর এসে উঠানে দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ে আর জিব দিয়ে লালা ঝরায়। কয়েকটা কাক কর্কশ স্বরে ডেকে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায়। জোরে বাতাস এলে শজনেগাছের ডালে ঝুলে শজনে ডাঁটাগুলো নড়ে।
বৃদ্ধ নাবালক ঘরের ভেতর দরজার সামনে বসে থাকে। তার চোখে পড়ে সবকিছু। সে শোনে ডাক্তার আর তার সহকর্মিনীর কথা। তারা দু’জন খুব মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে। তার বাবা বড় চামচ দিয়ে তাদের প্লেটে খাবার রাখছেন। তারা উচ্ছ্বসিত হয়ে প্রায় এক সঙ্গে বলেন, খুব ভাল রান্না। আপনার ছেলে এসব কিছুই খেতে পারে না? বড়ই আফসোসের কথা। প্রৌঢ় তমিজুল বৃদ্ধ নাবালকের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকান। সে মেহমানদের খাওয়া দেখছে। তার চাউনি খুব নির্লিপ্ত। তিনি ডাক্তারদের উদ্দেশে বলেন, ছেলে তো ছোটবেলা থেকে কম খায়। এখন খাবারে অরুচি আরো বেশি হইসে বলি মনে হয়। খাওয়া শেষে ডাক্তার দু’জন হাত ধুয়ে মুখ মুছে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন, প্রায় এক সঙ্গে। যুবক ডাক্তার বলেন, ঢাকায় যে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন তিনি তাহলে এই কথা বলেছিলেন? চৌদ্দ বছর বয়স হলে …. । তিনি কথা শেষ করেন না, মাথা ঘুরিয়ে চকিতে একবার বৃদ্ধ নাবালকের দিকে তাকিয়ে নেন। প্রৌঢ় তমিজুল বলেন, জি। তিনি সেইমতো কয়েছিলেন। চৌদ্দ বছর। এই সময় একজন হাতে বোতলসহ উঠোনে এসে তাদের দিকে এগিয়ে বলেন, পীর সাহেবের পানিপড়া নিয়া আইছি। বৃদ্ধ তমিজুল একটু বিব্রত হয়ে যুবক ডাক্তারের দিকে তাকান। ডাক্তার বলেন, হ্যাঁ। এসবও কাজে দেয়। কোনটা কাজে দেয়, কোনটা দেয় না, তা কি কেউ জোর দিয়ে বলতে পারে? দু’জন উঠোনে নেমে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। প্রৌঢ় তমিজুল তাদের পেছনে এসে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকেন। যে কুকুরটা উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেটা ঘেউ ঘেউ করে ডাক দিয়ে বাইরে চলে গেল। গোয়াল থেকে হাম্বা ডাক দিয়ে উঠল গরু। বাড়ির উনুন থেকে কালো ধোঁয়া উঠে একটু ওপরে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। আকাশটা পরিষ্কার নীল, পেজার তুলার মতো কয়েকটা সাদা মেঘ ভেসে আসছে।
দাওয়ায় বসে বৃদ্ধ নাবালক সব কিছু দেখে, তারা মাথা নিচু হয়ে আসে। ক্লান্তিতে নাকি কৃতজ্ঞতায় তা বোঝা যায় না। একমাত্র সে-ই বোঝে যে দুই চোখ ভিজে উঠেছে। এইসব ভালো মানুষ যারা দেখতে আসছে, খাবার নিয়ে আসছে, সান্ত্বনার কথা বলছে তাদের কথা ভেবে সে বড়ই উতলা বোধ করে। এইসব মানুষের ভালবাসার প্রতিদান হিসেবে সে কিছুই দিতে পারে নাই। কখনো পারবে না। সবাই চলে গেলে সে শূন্য উঠোনের দিকে তাকিয়ে থাকে। কয়েকটা শুকনো পাতা ঘূর্ণি বাতাসে ওপরে উঠছে। কিন্তু সূর্যের তাপ নাই। এখন ঘূর্ণি বাতাস ওড়ার সময় না। সে অবাক হয়ে শুকনো পাতাগুলোর ওপরে ওঠা দেখে। তারপর সে তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলে, তাহলি চৌদ্দ বছর হয়্যা গেল? হ্যাঁ, যা শেষ হবার তাড়াতাড়ি হওয়াই ভাল। এর আর দেরি কি? বৃদ্ধ তমিজুল হা হা করে ওঠেন। বেড়ার ওপর বসে থাকে কাকগুলো কর্কশ স্বরে ডেকে ওঠে। বৃদ্ধ তমিজুল ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন, এমন কথা কতি নাই বাপজান। তিনি নারাজ হবেন। বৃদ্ধ নাবালক বলে, তিনি জন্মের পর থেকিই আমার ওপর নারাজ। এ আর নতুন কথা কী? প্রৌঢ় তমিজুল ছেলেকে থামিয়ে বলেন, অমন করে বলিস না বাপ। তার মর্জি আমরা বুঝি এমন ক্ষমতা নাই। তিনি সব পারেন। রাতকে দিন দিনকে রাত। তার কুদরতির শেষ নাই। বৃদ্ধ নাবালক বলে, তা তো নাই। নাহলে এমন জেবন দিয়ে পাঠাবেন ক্যান তিনি। প্রৌঢ় তমিজুল ব্যস্ত হয়ে বলেন, কইস না, কইস না বাপ। আমরা সামান্য মানুষ। তার ইচ্ছার কথা কতটুকু জানি? কোন্ বান্দাকে দুনিয়ায় কি উদ্দেশ্যে পাঠান তা কি আমরা বুঝি? বুঝি না রে বাপ। বুঝি না। তবে এইটা বুঝি উদ্দেশ্য ছাড়া তিনি কিছু করেন না। মানুষের কথা ছাড়ি দে। এই যে সামান্য পিঁপড়া, উঠানে সার দিয়্যা হাঁটি যাতিছে তাদেরই কি সৃষ্টি তিনি এমনে এমনে করিছেন? কার পেছনে উদ্দেশ্য নাই? আছে, নিশ্চই আছে। দুনিয়ার তাবৎ বিষয়ের পিছনে উদ্দেশ্য আছে। মহান সৃষ্টিকর্তার মনের কথা বোঝার ক্ষমতা সামান্য মানুষের নাই। শোনো নাই এই কথা মৌলভী সাহেব কতোবার কইছেন এই বাড়ি আসি? মনে নাই?
বৃদ্ধ নাবালক বলে, হ্যাঁ। তিনি তা কইছেন। তিনি এ কথাও কইছেন যে আমার বালা মুসিবত সব দূর হয়্যা যাইব। ইনশাআল্লাহ সব কিছু ঠিক হইব। শহরের ডাক্তার কইছেন উল্টা কথা। কোনটারে হাছা বলি মনে করবা? কও তুমি? তারপর সে উত্তরের অপেক্ষা না করে বলে, গ্রামের মানুষ ডাক্তারের কথাই সত্য বলি মানি নিছে। আর তাই এহন একের পর এক বাড়ি থিকা খবার আসতিছে। তাদের সবাই হিসাব করিছে। অনেক দিন থাইকাই করতিছে। চৌদ্দ বছর। তুমি কর নাই বাপজান? প্রৌঢ় তমিজুল বলেন, আমি আশা ছাড়ি নাই বাপ। যে যাই কহুক না কেন। তুইও আশা ছাড়িস না বাপ। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। দুনিয়ায় কত কুদরতি কারবার ঘটতিছে তার সব কি আমরা জানি? ডাক্তার জানেন? পরওয়ারদেগারে মহিমা বোঝে এমন সাধ্য কার? এইসব কথা, যা তমিজুল মৌলভী সাহেবদের কাছ থেকে শুনেছেন, ছেলেকে খুব ভারিক্কি চালে বলেন তমিজুল। এই সময় তার মনে হয় তিনি নন, যেন মৌলভী সাহেবই কথা বলছেন। তিনি আকাশের দিকে তাকান। ভক্তিতে তার চোখ বুজে আসে। বৃদ্ধ নাবালক শ্বাস ফেলে বলে, এইভাবে বাঁচা, এইডারে কি জীবন কওয়া যায়? তারপর দাওয়ায় খাবারগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে, এই যে দিনের পর দিন খাওয়ার নিয়্যা আসতিছান গ্রামের মানুষ তারা কি ভাববে? ঠগবাজ মনে করতি পারে তোমারে, আমারে। না বাপজান। চৌদ্দ বছরই ঠিক থাকুক। সবার হিসাব গোলমাল করি দিলে সমস্যা হবি নে। আমার যাওয়াই ভালা। আর মন টেকে না।
যায় যায় দিনের খবর:
যায় যায় দিন পত্রিকায় বৃহস্পতিবার, ৩ মে ২০১৮ তারিখে প্রতিবেদনের খবর। শিরোনাম : দিনে দিনে বুড়িয়ে যাচ্ছে ১১ বছরের নীতু। খবরটা এরকম : নীতু আখতারের বয়স মাত্র এগারো। তবে তাকে দেখলে মনে হবে ৬০ বছরের বৃদ্ধা। মুখ, শরীরের চামড়া কুঁচকানো, মাথাতেও কোনো চুল নেই। বিরল প্রজেরিয়া রোগে আক্রান্ত নীতু ক্রমেই বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসকদের হিসেবে তার আয়ু আছে আর মাত্র কয়েক বছর। হবিগঞ্জে ২০০৭ সালে নীতুর জন্ম হয়। ছয় ভাই-বোনের সংসারে সে চতুর্থ। তার বাবা কামরুল ইসলাম বলছেন, তিন মাস বয়স থাকতেই তার শরীরের চামড়া শক্ত হয়ে যেতে শুরু করে। তখন স্থানীয় চিকিৎসকদের দেখানো হয়। তাঁরা নানা ওষুধও দিয়েছেন, কিন্তু রোগটি কেউ ধরতে পারেননি। পাঁচ বছর বয়সের সময় ঢাকায় চিকিৎসকরা জানান, নীতু বিরল প্রজেরিয়া রোগে আক্রান্ত। এ ধরনের রোগীদের বেঁচে থাকার গড় বয়স ১৩ বছর। …. তার বাবা কামরুল ইসলাম জানান, নীতুর কথা-বার্তা, চলাফেরা খুব স্বাভাবিক। সে পড়াশুনাতেও ভালো। তবে খাবার-দাবার কম খেতে চায়।
বেঞ্জামিন বাটনের অদ্ভুত জীবন:
লেখক এফ স্কট ফিটজেরাল্ড একটি ছোটগল্প লিখেছেন। নাম : দি কিউরিয়াস কেস অফ বেঞ্জামিন বাটন। বেঞ্জামিন বাটনের অদ্ভুত জীবন। গল্পে বেঞ্জামিন বাটন নামে চরিত্রকে দেখা যায় বৃদ্ধ হয়ে জন্মাতে। তারপর সে ক্রমে প্রৌঢ় হয়, প্রৌঢ়ত্ব থেকে যৌবনে পৌঁছায়। তারপর সে তরুণ বয়স পেরিয়ে কৈশোরে উপনীত হয়। এরপর সে শিশু হয়ে যায়। এই সবই ঘটে খুবই দ্রুত। যখন সে যৌবনে, সেই সময় তার প্রেমিকার সঙ্গে বিয়ে হয়, প্রেমিকা তখন যুবতী। স্ত্রীর যৌবন থাকলেও বেঞ্জামিন যুবক থেকে দ্রুত কৈশোর পেরিয়ে শৈশবে পৌঁছায়। অন্তিমে দেখা যায় যুবতী স্ত্রী শিশু বেঞ্জামিনকে কোলে নিয়ে বসে আছে। অলৌকিক কিংবা খুব কাল্পনিক কিছু লেখেননি ফিটজেরান্ড। জীবনে সায়েন্স ফিকশনের মত ঘটনা ঘটাও আশ্চর্যের কিছু না। ফিটজেরাল্ড বাস্তবকেই তুলে ধরেছেন নিজের অজান্তে। তবে শিরোনাম ঠিক হয়নি। অদ্ভুত জীবন হবে কেন? জীবন জীবনই। তার কোনো বিশেষণের প্রয়োজন পড়ে না।