‘এই সময়ের কবিতা’- এই অভিধাটি বিশেষ কোনো তাৎপর্যে ব্যবহার করা হয়নি। কেননা, কবিতার সমকাল থাকতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একজন কবি যেহেতু জীবন্ত সংজ্ঞা সেহেতু তার একটি কাল থাকতেই হয় এবং তার সেই কালের বস্তুগত ও ভাবগত অনুধ্যানগুলোর অন্তরঙ্গ উপস্থাপন কবিতা-শিল্পে মূর্ত হয়ে ওঠে। এই অর্থে কবিতার একটি সমকাল আছে। এই আপাত স্থূল দিকটি বিবেচনায় রেখে নিবন্ধের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘এই সময়ের কবিতা’। এর নাম যদি দেওয়া হয় ‘সমকালের কবিতা’ তাহলেও অর্থের তেমন কোনো ইতরবিশেষ হবে না। কিন্তু আলোচনার পরিধি কবিতায় সমকালীনতা নয়-বরং কবিতা। এই সময়ে যারা কবিতা লিখছেন, কবিতা সৃষ্টির প্রেরণায় যারা কঠিন এক বস্তুতান্ত্রিকতার সময়েও কল্পনাপ্রতিভার আরাধ্য কবিতা-শিল্পের আশ্রয়ে অভিভূত হয়ে আছেন, তাদের সেই সৃষ্টির স্বরূপ বুঝে নেয়ার আনন্দে এই লেখার আয়োজন।
ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধ থেকে বিংশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত আমাদের দেশে সাহিত্য সমালোচনার একটি ধারা তৈরি হয়েছিল। বস্তুনিষ্ঠ সেই সমালোচনায় অনেক কবি-সাহিত্যিক অনুপ্রাণিত হয়েছেন। অনেকে নিজের শক্তি ও দৌর্বল্যের পরিচয় পেয়ে প্রযতেœর জায়গাগুলো আবিষ্কার করতে পেরেছেন। আবার সে সময় সমালোচনার এমন একটি ধারা তৈরি হয়েছিল যাকে বস্তুনিষ্ঠ বলা যাবে না কিছুতেই। ‘শনিবারে চিঠি’ পত্রিকার সম্পাদক সজনীকান্ত রায় এই ধারার বহুল পরিচিত ব্যক্তিত্ব। জীবনানন্দ দাশ ও কাজী নজরুল ইসলামের মতো যুগান্তকারী কবিদের তিনি যে ভাষায় সমালোচনা করেছেন তা কখনো কখনো ভব্যতার সীমা লঙ্ঘন করেছে। এই ধরনের সমালোচনা মোটেই কাম্য নয়।
স্বল্পপ্রজ পত্র-পত্রিকার সেই যুগে লেখকদের সংখ্যাও ছিল অতি অল্প এবং লেখার সংখ্যা স্বল্পতম। ফলে লেখালেখির জগতের একটি সামগ্রিক চিত্র পেয়ে যাওয়া কষ্টকর ছিল না। কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিপুল বিকাশ ও মুদ্রণশিল্পের অবিশ^াস্য ডিজিটালাইজেশনের এই যুগে মুদ্রিত পত্রপত্রিকা ও গ্রন্থাদির সংখ্যা বিপুল। এই বিপুল সংখ্যক পত্রপত্রিকা ও গ্রন্থাদি থেকে আলোচনাযোগ্য লেখা খুঁজে নেয়া সময়সাধ্য ব্যাপার। এ ছাড়া গত শতকে সমালোচনার একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। সমালোচনা হজম করে প্রতিনিয়ত নিজেকে অতিক্রম করে যাওয়ার চেষ্টাও ছিল লেখকদের মধ্যে। বিরূপ সমালোচনার জবাবে কোনো কবি-সাহিত্যিক তখন সমালোচকের মাথায় বাড়ি দিতে যাননি। কিন্তু এখন সেই যুগ আর নেই। সমালোচকের মাথায় বাড়ি দিতে যাওয়া কিংবা তার পিছনে গুণ্ডা লাগিয়ে দেয়া অসম্ভব নয় আর। এছাড়াও আছে নানা রকম হিসাব-নিকাশের ব্যাপার- প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ লাভালাভের হিসাব। আবার সমালোচনার শ্রীও এমন হয়েছে যে পারস্পরিক পিঠ চুলকানোর মধ্যেই এর সীমা যেন নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। এখানেও আছে সেই একই বিষয়- স্বার্থের বিচিত্র টানাপড়েন। ফলে সমালোচনা সাহিত্য যেমন মৃতপ্রায় তেমনি সমালোচনার কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে বিকশিত ও খ্যাতিমান লেখকের সংখ্যাও হ্রাস পাচ্ছে দিন দিন। এই পরিণতি শিল্প-সাহিত্যের জন্য মোটেই কল্যাণকর নয়। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য সমালোচনার পথ অবারিত হওয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে দায় আছে সমালোচকের, সম্পাদকের এবং কবি-সাহিত্যিকের। যদি এই ত্রিবেণী সংযোগে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় তা হলে শিল্প-সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্র পরিপুষ্ট হবে। এই উদ্দেশ্য সামনে রেখে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আমি এই লেখায় হাত দিয়েছি। আনুকূল্য পেলে চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাবো।
‘কালি ও কলম’ শীর্ষক মাসিক পত্রিকাটি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির পরিতোষণ করে এসেছে। বিস্ময়কর নিষ্ঠা, সততা ও নির্মোহতার সঙ্গে লেখা নির্বাচন করে নির্ভুলভাবে মুদ্রণ করা হয় এই পত্রিকাটিতে। ফলে যাদের লেখা মুদ্রিত হয় তাদের আনন্দিত হওয়ার ও গর্ববোধ করার কারণ আছে। ২০১৬ সালে যখন লিখতে বসি তখন আমার হাতের কাছে ছিল পত্রিকাটির ত্রয়োদশ বর্ষের চতুর্থ সংখ্যা [জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩; মে ২০১৬]। এই সংখ্যায় কবিতা মুদ্রিত হয়েছে তেরোটি। মোহাম্মদ রফিকের ‘সৌভাগ্য’, কালীকৃষ্ণ গুহর ‘অজানায়’, মোহাম্মদ সাদিকের ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, মাহবুব সাদিকের ‘নদী ভাঙা নদীর সন্তান’, রাতুল দেব বর্মণের ‘ভ্রামণিক’, ইকবাল আজিকের ‘তিনি আছেন’, সৌরভ দের ‘অপরূপকথা : এক’, সৌভিক রেজার ‘ছায়ালোক-৩’, টোকন ঠাকুরের ‘অফ দ্য রেকর্ড’, সেলিম মাহমুদের ‘রূপকথা’, নূজ-উল-আলম লেনিনের ‘সব কিছু ঠিক আছে?’, আলোময় বিশ্বাসের ‘সমুন্নত দুঃখগুলি’, দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায়ের ‘১৯৮০’ এবং আলোক সেনের ‘সূর্যজন্মের দিক’।
মোহাম্মদ রফিক ‘সৌভাগ্য’ কবিতায় জীবনসায়াহ্নের কিছু মিশ্র অনুভূতিকে কয়েকটি মাত্র পঙ্ক্তির মধ্যে ধরতে চেয়েছেন। জীবন অনন্ত। কিন্তু ব্যক্তিজীবন চিরস্থায়ী নয়। ‘অসমাপ্ত কাব্য ফেলে চলে যাওয়া/মানব নিয়তি, /দুর্ভাগ্যের অবসান কবে হবে /জানে না তা ক্ষিতি’। ব্যক্তিজীবন চিরস্থায়ী হওয়ার আকাক্সক্ষা সৌভাগ্যের কি না দুর্ভাগ্যের তার পরিচয় আছে মহাভারতের আদিপর্বে যযাতির জীবনে। নিজের জরাগ্রস্ততা পুত্র পুরুকে দিয়ে পুরুর যৌবন গ্রহণ করে এক হাজার বছর সুখ ভোগ করার পর তিনি এই সত্য লাভ করেন যে, কাম্যবস্তুর উপভোগে কামের উপশম হয় না। পৃথিবীর সমস্ত ধন ও সমস্ত রমণী সম্ভোগ করলেও পরিতুষ্টি আসে না। সুতরাং অসমাপ্ত কাব্যই জীবনের অনিবার্য নিয়তি। এই নিয়তিকে অতিক্রম করার প্রত্যাশা সৌভাগ্যের নয়- প্রকৃতি বিরুদ্ধ। হতাশার এই অনুভাবনার পরেই কবি মোহাম্মদ রফিক সৌভাগ্যের চিরায়ত সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি লিখেছেন :
তবু-বা সৌভাগ্য এতটুকু, অবশেষ
রইবে যা অম্লান
চিরায়ত কিছু নয় যা ধন বা মান
কর্মের হবে না অপমান!
অনিঃশেষ বেদনার দান করে গ্রহণ বর্জন
মৃত্যুহীন নয় প্রাণ
যেটুকু বা রয়ে যাবে পদক্ষেপ শব্দে ও বাণীতে
বিলায় অমৃত ঘ্রাণ
কর্ম, শব্দ আর বাণী- এর মধ্যে বেঁচে থাকে মানুষ। বিশেষ করে যিনি কবি, শব্দ আর বাণী যার নিত্য সহচর তার জন্য অমরত্বের এই হলো চিরায়ত নিয়তি। সুতরাং প্রদীপের শিখা নিভে গিয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে এলেও ‘নয়নের তারা জ্বলে ভ্রমে ও বিভ্রমে/হাত পেতে নাও সেই দান’।
কবিতাটির বোধের মধ্যে রাবিন্দ্রিক প্রেরণা স্পষ্টতই অনুভব করা যায়। আর কাব্যভাষার মধ্যে কিছু সঙ্গতিহীনতা। ‘নিয়তি’ এর সঙ্গে অন্তমিল প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বহু ব্যবহৃত একটি পুরনো শব্দ ‘ক্ষিতি’। পুরনো শব্দ নতুন অভিব্যঞ্জনায় ব্যবহৃত হতেই পারে। সে- ক্ষেত্রে শব্দটি তার প্রাচীনত্ব ত্যাগ করে নতুন কোনো তাৎপর্যে নতুন হয়ে ওঠে। কিন্তু ‘সৌভাগ্য’ কবিতায় শব্দটির ললাটে সেই সৌভাগ্য হয়নি। তেমনিভাবে ‘রইবে’, ‘অম্লান’, ‘অনিঃশেষ বেদনার দান’, ‘বহ্নিমান’ ইত্যাকার শব্দ ও শব্দবন্ধ প্রাচীনতাকে অতিক্রম করে নতুন কোনো তাৎপর্যে অভিসিক্ত হয়ে ওঠেনি।
‘সৌভাগ্য’ কবিতার সঙ্গে বোধের কোনো এক গোপন সম্পর্কসূত্রের অভিধা পেতে পারে কালীকৃষ্ণ গুহের ‘অজানায়’ শীর্ষক কবিতাটি। ‘অজানায়’ না-হয়ে কবিতাটির নাম ‘খেলাঘর’ও হতে পারত। এতে মাহমুদুল হকের ‘খেলাঘর’ উপন্যাসের সঙ্গে দ্বন্দ্ব হওয়ার আশঙ্কা ছিল না। কিন্তু সে যাই হোক কবিতাটির মূল সুরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পৃথিবী নামক গ্রহটিতে মানব-মানবীর অহর্নিশ খেলাঘর ভাঙা-গড়ার খেলা। কালীকৃষ্ণ গুহ লিখেছেন :
খেলাঘর বাঁধছি ভাবো
খেলাঘর ভাঙছি আবার
কে যে আজ খেলার সাথি
জানি না, কী-ইবা জানি-
না-জানার নির্জনতার
কত-যে জ্যোৎস্নাধারা
কত-যে তমালতরু
নিহিত প্রেমকাহিনি।
কবিতার ওই গড়নের মধ্যে কতটু কবিতা আর কতটুকু বক্তব্য তা অনুভব করা যায়। মনে হয় কবিতাকে ছাড়িয়ে যেতে চায় কবির বক্তব্য প্রকাশের প্রবণতা। কিন্তু প্রায় শেষ পর্যায়ে কবি যখন বলেন, ‘অপরূপ খেলার সাথি/বহুদূরে তার বসবাস’ তখন ‘সৌভাগ্য’ কবিতার অন্য এক নিয়তিকেই যেন কবি চিরায়ত সত্যের অভিব্যঞ্জনা দান করতে চান। মেদ বিবর্জিত এই কবিতার মধ্যে ভাবনার বহুতর পরত নেই, পাঠান্তরে ভ্রমণের পথগুলো বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত নয়।
মোহাম্মদ সাদিকের ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’ শীর্ষক কবিতাটি রবীন্দ্র-ভাবনার অনেকগুলো পর্যায় উন্মোচনে কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে উঠেছে। অম্ল-মধুর অনুভবে গল্প আর কবিতা এবং কবিতা আর গল্প একাকার হয়ে লাভ করেছে কবিতার শরীর। এই কবিতাদেহে আশ্রয় লাভ করেছেন রবীন্দ্রনাথ- যৌবন থেকে বার্ধক্যের দীর্ঘ রবীন্দ্রনাথ। শুরু থেকে বারতম পঙ্ক্তি পর্যন্ত গদ্য বা গল্প- গদ্য-কবিতা নয় নিশ্চয়। উদাহরণ দিই :
প্রাচীনকালে আর্যদের ধারণা ছিল
বঙ্গের লোকজন পাখির ভাষায় কথা বলে
মুঘলরা এক সময় ভাবত
বঙ্গে আসা আর আত্মহত্যা করা সমান কথা
তবু আপনাকে নিয়োগ দেয়া হলো পূর্ববঙ্গে।
এই বিবরণের মধ্যে কবিতা নেই, আছে তথ্য। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কবিতা লিখতে গেলে কবিতার টানেই তথ্য ও বিবরণ তুচ্ছ হয়ে যায় একসময়। এই কবিতার মধ্যেও সেই টান কিংবা কবিতার সেই চাপ ও তাপ লক্ষ করা যায়। আর এখানেই বিবরণের ভিতর থেকে উঠে আসে বেদনার পঙ্ক্তিমালা। কবি সাদিক লিখেছেন :
লোকে বলে জমিদার, সুখী মানুষ কিন্তু
দুঃখের কালো বোটের মধ্যে পদ্মার বাতাসে
আমরা শুনেছি আপনার আলখাল্লার দীর্ঘশ্বাস
বেদনার তালিমারা জোব্বা পরে আপনি
যখন শিলাইদহে এসে নামেন
তখন আপনার হাতে একতারা
পায়ে খড়ম, ফকির রবীন্দ্রনাথ আপনি
আর সেখানেই
শাহজাদপুরের মেঠোপথে বালিকা রতন এসে
কোমরে আঁচল পেঁচিয়ে আপনার পথ
আগলে দাঁড়ায়। হাসতে হাসতে বলে-
‘আজ পাশা খেলব রে শ্যাম’…
কবির এই অনুভবপুঞ্জের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের জীবনের এক অন্তর্গূঢ় স্বরূপের আর্কেটাইপ লক্ষ করা যায়। আর তার পরের পঙ্ক্তিগুলোর মধ্যে সেই চিরায়ত রবীন্দ্রনাথ আপন স্বভাবে মূর্তমান হয়ে ওঠেন যেখানে জাগতিক ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে তাঁর উত্তরণ ছিল ‘বহুদূরে/একটি নদীর দিকে/ একটি রাত্রির দিকে…’।
চিরকাল তিনি মুক্তিযুদ্ধের শক্তি ও সৌন্দর্যকে কবিতার দেহসৌষ্ঠবে নির্মাণ-বিনির্মাণ করে চলেছে আর এই পলল-গঠিত মৃত্তিকায় সমৃদ্ধ ভূখণ্ডের মেহনতি মানুষের আর্তি ও আনন্দকে। তিনি মাহবুব সাদিক। ‘নদীভাঙা নদীর সন্তান’ কবিতায় তাঁর মমত্বের সেই সুর ও সংবেদনা কাব্যভাষার এক অতলস্পর্শী ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। বিস্ময়কর এই কবিতাটির মধ্যে উৎসব আর ধ্বংস, আনন্দ আর বেদনা যাদুমন্ত্রে একাকার হয়ে যায়। নদীভাঙা মৈজুদ্দির জীবন হয়ে উঠে ভাঙা-গড়ার যুগলবন্দী। স্বপ্নের সুন্দর আর জাগরণের ধ্বংস কোথায় যেন মিলেমিশে এক হয়ে যায়। বিপরীত মিলিত হয় ঐক্যের সৌন্দর্যে। কবি মাহবুব সাদিক লিখেছেন :
সে কিছু শুনেছে বুঝি সংগোপন ঘুমের গভীরে
মেঘ যেন ডাকে গুরু-গুরু –
দক্ষিণের অন্ধকার থেকে উত্তরের দিগন্তপ্রান্তে
ফুটতে ফুটতে যায় শব্দের টাটকা খই-
নাকি পরশু-র যাত্রাপালায় গহরজানের গানে
জাদুতে-পাওয়া মৈজুদ্দির দশটি আঙুল
তবলায় এখনো তোলে প্রাণকাড়া ধ্বনির নহর?
গহরের গান আর তবলার বোলে
সে রাতে আসর মাত- জীবনের প্রাপ্তিপাত্র
কানায় কানায় ভরা আনন্দের আয়োজনে;
এই শব্দ, শব্দের জাদুমন্ত্র কিংবা গহরজানের সংগীতের প্রাণকাড়া ধ্বনির লহর বা তবলার বোল সবই স্বপ্ন, আনন্দিত জীবনাভিজ্ঞান। ওর প্রকৃত রূপ হলো কীর্তিনাশার প্রলয়যজ্ঞ। ভয়ঙ্কর কীর্তিনাশার প্রবল স্্েরাত আর ঢেউ গড়ায়-নাচে, পাক খায় রাতের বাতাসে। উন্মত্ত নদীর টানে তীর ধ্বংসে যায়। আর মৈজুদ্দি গড়িয়ে যায় নদীর দিকে, রাতের অন্ধকারে। ‘আবদ্ধ জলের কোনো ডোবা নয় বহতা জীবন’- মৈজুদ্দির এই অবচেতন ভাবনাও অস্থির হয়ে ওঠে। গড়িয়ে যেতে যেতে সে দশ আঙ্গুলে আঁকড়ে ধরে ভঙ্গুর মাটির পরত। ‘পায়ের তলায় আতিপাতি খোঁজে কোনো খাঁজ-/ইস্পাত কঠিন/দুইটি সুদৃঢ় হাত সে বাড়ায় অস্তিত্বের দিকে…;’ আবার সে ঘরবাধে কীর্তিনাশার তীরেই। জঙ্গম জীবনের সমগ্র রূপ রূপায়ণে কবি মাহবুব সাদিক বিস্ময়কর জীবনাভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। আর সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে আছে জীবনের বহুতর সমগ্রতার বোধ। সেই বোধের প্রতিটি রং, রেখা, স্বাদ-গন্ধ শব্দের সীমানায় প্রমূর্ত করে তোলার জন্য তিনি যে কাব্যভাষার আশ্রয় গ্রহণ করেন সেই ভাষা যেন কোনো এক জাদুমন্ত্রে আপনা থেকেই কবিতার রূপ পরিগ্রহ করে। তার ভেতরে প্রবহমান থাকে আনন্দ¯্রােতধারা ও বেদনার বহুতর ধ্বনিময়তা। প্রতিটি শব্দকে তিনি প্রাণময় করে তোলেন বোধের অনেকান্ত রঙের প্রলেপে, কিন্তু কিছুতেই তা মেদভ্রারাক্রান্ত নয়। কবির এই অসাধারণ পরিমিতিবোধ ও সমগ্রতার অনুভব তরুণ কবিদের জন্য প্রেরণা হতে পারে।
রাতুল দেব বর্মণের ‘ভ্রামণিক’ শীর্ষক কবিতাটি সুখপাঠ্য। ছন্দময় কবিতাটির আটসাট কাব্যভাষার মধ্যে চেতন-অবচেতনে নিত্য পরিব্যাপ্ত ভ্রমণাকাক্সক্ষার মানবীয় রূপ ধরা দিয়েছে। কয়টি পঙ্ক্তি তুলে ধরি:
ভিতরে সাগরের উত্তাল সন্তরণ পাহাড়ের হাতছানি
ঝরনার গায়ে দেখে মেঘবতী হিমালয় নারী,
কোথাও জঙ্গলপাঠ শেষে মহুয়াবনের নিচে
একা হয়ে পান করে মহুয়া মাদল পানি,
কবিতার এই অবয়রের মধ্যে প্রবলভাবে মানুষের অন্তর্গত তৃষ্ণার পরিচয় আছে। সেই তৃষ্ণা জীবন ও জগৎকে দেখার তৃষ্ণা, মহুয়াবনের নিচে মহুয়া মাদল পানি পান করার তৃষ্ণা, সবুজের ভিতরে বসন্তনারীকে দেখার তৃষ্ণা। কিন্তু পরিণতি নির্মম। তৃষ্ণার জল নেই কোথাও যেন। তাই ‘ভাসতে ভাসতে নাবিকের সাথে/যায় প্রৌঢ়-যুবক- দেখে/ধানসিঁড়ি জীবনানন্দহীন হয়ে পড়ে আছে।’
লক্ষণীয় রাতুল দেব বর্মণ প্রেরণার একটি বিন্দুতে প্রগাঢ় হয়ে উঠেন এবং কাব্যভাষার মধ্যে সেই দৃঢ়তাকে নিশ্চয়তা দান করেন। ‘হিমালয় নারী’, ‘জঙ্গলপাঠ’, ‘তৃষ্ণাবন’, ‘বসন্তনারী’, ‘অরণ্য-রোদ’, ‘প্রৌঢ়-যুবক’ ইত্যাকার কাব্যভাষা তাঁর অনুভব-বিন্দুর প্রগাঢ়তা ও বিস্তারকে অনিবার্য করে তোলে।
রাবিন্দ্রিক ঈশ্বরভাবনার আরেক রূপ অনুভব করা গেল ইকবাল আজিকের ‘তিনি আছেন’ কবিতায়। বিষয়ের দিক থেকে ইকবাল আজিজের কবিতা নতুন কোনো ভাবনার অবতারণা নয়। বিচিত্র রূপে ঈশ্বরের এই অস্তিত্ব অনুভূত হয়েছে যুগে যুগে। কিন্তু তিনি কাব্যদেহের যে সৌষ্ঠবের মধ্যে সেই প্রেরণাকে ধরতে চেয়েছেন তা প্রশংসার দাবিদার। কাব্যভাষার এমন এক গড়নের সঙ্গে ইকবাল আজিজের নিবিড় পরিচয় আছে যা নিরবচ্ছিন্ন, তীব্র গতিশীল ও স্বচ্ছতোয়া। ফলে অনিবার্যভাবেই তাঁর কবিতা পাঠ মানেই হলো ছন্দের আস্বাদ পাওয়া, ¯্রােতের মধ্যে পা রাখা এবং আনন্দ অনুভব করা। কয়টি পঙ্ক্তি উল্লেখ করি :
বিশ্ব যখন শূন্যমাঝে লুপ্ত ছিল
তিনি ছিলেন শূন্য হয়ে-
তারপরে সব আঁধার গেল আলো হলো
তিনি তখন আলো হলেন;
তিনি তখন বিশ্বমাঝে ছড়িয়ে দিলেন আপন বিভা
হয়তো বিকাশ সৌরঝড়ে-
হয়তো বিকাশ বস্তু ঘিরে।
তত্ত্বগত এই বিবরণের মধ্যে কবিতার আস্বাদ পাওয়া যায়। বোঝা যায়, ইকবাল আজিজ তত্ত্ব লেখেন না, কবিতা লেখেন- সমৃদ্ধ কবিতা। আরও কয়টি পঙ্ক্তি তুলে ধরি :
মানবজাতির শ্রমের মাঝে ইতিহাসের পদধ্বনি-
তিনি আছেন সকল শ্রমে একটু যেন আলোর খনি।
তিনি আছেন আপন মনে একা-একা-
আশায় থাকি হয়তো পাবো গভীর ধ্যানে তাঁহার দেখা।
কিন্তু এই কবিতার মধ্যে ভাষায় কিংবা বিষয়ভাবনায় কবি ইকবাল আজিজকে পাওয়া যায় না সবটুকু। কাব্যভাষা ছড়াক্রান্ত এবং আলস্য ও চটুল আনন্দে ভরপুর।
সৌরভ দে ‘অপরূপকথা এক’ কবিতায় চিরদিনের একটি সত্যের অবতারণা করেছেন, আর তা হলো সুন্দরের মৃত্যু নেই। স্বর্গলোকের সবচেয়ে সুন্দর যারা, যারা সংগীতজ্ঞ, স্বর্গীয় বৈদ্য এবং প্রণয়-সংস্কৃতির ঋদ্ধ পুরুষ সেই গন্ধর্বদের প্রণয়ের পটভূমিতে লেখা কবিতাটিতে কতগুলো প্রতীকের ভিতর দিয়ে চিরকালের সুন্দরের কথা এবং শাশ্বত যৌবনের কথা মূর্ত হয়ে উঠেছে। গান্ধর্বী নামে কেউ আছে কি নেই সে বিতর্ক মুখ্য নয় বরং পৃথিবীর কোনো সুন্দরী নারীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নভোভ্রমণে বেরোতেন গন্ধর্বগণ আর রচিত হতো এক একটি প্রণয়কাব্য। ইচ্ছাবিবাহ, ইচ্ছাবিচ্ছেদ, ইচ্ছাবয়স- এইসব স্বাধীনতার মধ্যে চিরকালের সুন্দরের একটি আখ্যান তৈরি করেছেন কবি সৌরভ দে। কবিতাটির মধ্যে একটি বিস্ময়কর কাব্যভাষা ব্যবহৃত হয়েছে। শব্দটি হলো পুরুষগন্ধ। ‘গান্ধর্বী এক কাঠুরের পুরুষগন্ধে মুখ রেখে/ভুলে গেলেন গন্ধর্বের কথা’।
সৌভিক রেজার ‘ছায়ালোক-৩’ নামক পরিবেশবাদী কবিতাটি সুখপাঠ্য। বিশেষ করে তিনি যখন বলেন, ‘শুকনো ডালপালায় আগুন আর/আগুন থেকে যে ধোঁয়া, তাতে নিজের ছায়াও ক্রমে-ক্রমে অন্ধকারে/ হরিয়ে যায়।’
টোকন ঠাকুর আর আলোময় বিশ্বাস দুঃখ নিয়ে কবিতা লিখেছেন। টোকন ঠাকুরের কবিতার নাম ‘অফ দ্য রেকর্ড’। টানা গদ্যে লেখা, যেমনটি সৌভিকও লিখেছেন। টোকন দুঃখকে প্রাণময় করেছেন, ব্যক্তিত্ব দান করেছেন এবং দুঃখের আখ্যান রচনা করেছেন আর সেই আখ্যানের সমাপ্তি টেনেছেন এভাবে : ‘একদিন তোমাকে বলব, কোন প্রহরে রচিত প্রতিটি দুঃখই নিটোল/কবিতা!’
আলোময় বিশ্বাসও ‘সমুন্নত দুঃখগুলি’ কবিতায় একই ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সমুন্নত দুঃখগুলিই আমার চিত্রকলা।’ কিন্তু এই দুঃখ আর অভিশাপের যে সমান্তরালতা তিনি রচনা করেছেন তাতে বিপরীতের ঐকতান সৃষ্টি হয়নি এবং পরিশেষে সুরনদীর জল আর পারুলের গন্ধ এই অনৈক্যকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলেছে। তবে কবিতাটিতে সমৃদ্ধ কাব্যভাষা, কাব্যভাষার সংহতি ও সুর উপভোগ্য।
সেলিম মাহমুদের ‘রূপকথা’য় ভুল গ্রাম, ভুল মন, ভুল ভ্রমণ। সব ভুল। তবুও ডুবোচর গ্রামে কে এসে থামে! সেখানে প্রাণ আছে, টান আছে, গল্প আছে। ছোট কবিতাটির মধ্যে পেঁচ আছে, কিন্তু কবিতা পাঠের প্রশান্তি পাওয়া যায় না।
নূহ-উল-আলম লেলিন সমাজ-সংবেদনশীল কবি। তিনি কবিতা লেখার জন্য কবি নন, বরং বিপর্যস্ত সমাজ-সভ্যতার স্বরূপ উন্মোচনের জন্য কবিতার আশ্রয় গ্রহণ করেন। ‘সব কিছু ঠিক আছে?’ শিরোনামের কবিতাটিও তার ব্যক্তিক্রম নয়। কবিতার শেষ চারটি পঙ্ক্তি উল্লেখ করি:
সব কিছু ঠিক আছে, ধর্মের কল? পুঁজির শেকল আর অস্ত্রের বল?
মানুষ কী ঠিক আছে? ভাগ্যচক্রে বাঁধা তারা থাকবে চিরকাল?
মানুষ কী পোষ মেনে অন্ধকারে হারাবে ঠিকানা?
সব কিছু যদি ঠিক, তবে কেন বৈরী হাওয়া উত্তরে-দক্ষিণে পুবে ও পশ্চিমে?
রামকিঙ্কর বেইজ, বিনোদবাবু ও গোপাল ঘোষ- এই তিনজন শিল্পী ১৯৮০ সালে দেহত্যাগ করেছেন। দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায়ের কবিতার নাম ‘১৯৮০’। কবির জন্মের পাঁচ বছর পূর্বে এই তিন শিল্পী গতায়ু হলেও পরিণত বয়সে এই তিন শিল্পীর বিদায়ে গভীরভাবে মর্মাহত কবি। তাঁর এই বেদনার দিকটি কবিতায় মূর্তমান হয়ে উঠলেও কাব্যভাষার শৃঙ্খলা ও দার্ঢ রক্ষিত হয়নি। ‘এত দুঃখ- তখনো তো জন্মাইনি যে আমি/জন্মানোর আগে আমি কি কষ্ট পেলাম’ কিংবা ‘পাখির ডানার সাদা এমন ফকফকে সাদা শব্দ কানে লাগে’ ইত্যাদি কাব্যভাষা কবিতার ন্যায়সূত্রকে আপন স্বভাবে বিকশিত হতে দেয় না। কবিতার জন্য আবেগ অনিবার্য। কিন্তু সেই আবেগ যদি সংযমের ভিতর দিয়ে বিকশিত না-হয় তা হলে কবিতা ভাবনার বহুতর সৌন্দর্যে ঋদ্ধ হয়ে ওঠে না।
অলোক সেনের ‘সূর্যজন্মের দিকে’ সুখপাঠ্য কবিতা। ভাবনার উল্লস্ফন অর্থময়তার শৃঙ্খলাকে বিপর্যস্ত করেছে। কিন্তু সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। কাব্যভাষার শৃঙ্খলা ও পরিমিতি নিয়ে ভেবে দেখার অবকাশ আছে।
কবিতাগুলোর নিবিড় পাঠে আমি প্রায় হতবাক হয়েছি। দু-একটি কবিতা ছাড়া অধিকাংশ কবিতার মধ্যে সমকালের বিপর্যস্ত সময়ের উল্লেখযোগ্য কোনো উপস্থাপন নেই। জীবনের প্রায় সর্বাবয়ব জুড়ে সম্ভাবনা ও বিপুল বিপর্যয়ের মধ্যে থেকে কবিগণ কী করে সব কিছু অতিক্রম করে আছেন তা ভাববার বিষয়। মনে হয় মূলোৎপাটিত একটি কাব্যধারা তৈরি হয়েছে যার পায়ের নিচে মাটি নেই এবং আকাশ দূরওয়াস্ত।