মানব জীবন বৈচিত্র্যে ভরপুর। এখানে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, লড়াই-সংগ্রাম খুব কাছাকাছি থাকে। এই জীবন কখনো হয়ে ওঠে ফুলের মত সুন্দর; আবার কখনো হয়ে ওঠে দুঃসহ। তবুও মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, জীবনের কাছাকাছি থাকতে চায়। চিরন্তন এই সত্যকে আলিঙ্গন করেই সৃষ্টি হয়ে মহৎ শিল্পের। তাই বলা যায় যে, জীবনের অনিবার্য উপস্থিতি সার্থক শিল্পের পূর্বশর্ত। জীবনবিমুখ সৃষ্টি কখনোই সফল শিল্প হতে পারে না। তাই শিল্পীকে বার বার জীবনের কাছে যেতে হয়। হোক সেই জীবন, আনন্দের কিংবা বেদনার। গণমানুষের জীবনচিত্র সবচেয়ে বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে শিল্পের সে মাধ্যমটিতে, নিঃসন্দেহে তার নাম চলচ্চিত্র। তাইতো বর্তমানে বিনোদনের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারকারী মাধ্যমটির নামও চলচ্চিত্র। সৃষ্টিলগ্ন থেকেই চলচ্চিত্র সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকতে চেয়েছে এবং এখনো আছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সিনেমাই বাংলাদেশের মানুষের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের চিরায়ত জীবন নিয়ে এগিয়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র।
বাংলাদেশী সিনেমার ইতিহাসে কিংবদন্তি এক অভিনেতার নাম ইলিয়াস কাঞ্চন। ইলিয়াস কাঞ্চন নামটির কারণেই এক সময় হাউজফুল থাকত বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলো। রাজ্জাক পরবর্তী বাংলা সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়কও ইলিয়াস কাঞ্চন। একের পর এক সফল ছবিতে অভিনয় করে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ইলিয়াস কাঞ্চন সেই বিরল প্রতিভার অধিকারী এমন একজন নায়ক, যার রয়েছে যে কোন চরিত্রে অভিনয়ের এক সহজাত প্রতিভা। তাইতো তাকে অ্যাকশন, রোমান্টিক বা পারিবারিক গল্পের অভিনেতা বলা যায় না। বলতে হয় অলরাউন্ডার বা কমপিট অভিনেতা। শুরুর দিকে তার যাত্রা এতটা মসৃণ ছিলো না। বরং ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তাঁকে পড়তে হয়েছে দুর্দান্ত প্রতিযোগিতার মুখে। ১৯৭৩ সালে প্রখ্যাত পরিচালক সুভাষ দত্তের ‘বসুন্ধরা’ ছবির মাধ্যমে তার অভিনয় জীবনের শুরু। এরপর বহু পথ পাড়ি দিয়ে, প্রচন্ড পরিশ্রম করে ক্যারিয়ারের শীর্ষে পৌঁছে যান। তার অভিনয় জীবনে ৮০’র দশক বাংলা সিনেমার ছিল স্বর্ণযুগ। তখন রাজ্জাক, ফারুক, আলমগীর, সোহেল রানা, উজ্জ্বল, ওয়াসীম ও জাফর ইকবালদের মত কালজয়ী সব নায়ক পর্দা কাঁপাতেন। তাদের সাথে সমান তালে অভিনয় করে ইলিয়াস কাঞ্চন নিজেকে নিয়ে যান শীর্ষে। যা এই প্রজন্মের অনেক তরুণ নায়কের কাছে হতে পারে অনুপ্রেরণা। একজন ইলিয়াস কাঞ্চন হয়ে ওঠার পেছনে তার রয়েছে অজস্র সংগ্রাম। এক্ষেত্রে একটি ঘটনার উলেখ করা যায়। লাঠিয়াল ছবিতে একটি চরিত্রে অভিনয় করার কারণে শুনতে পান ছাত্র-ছাত্রীদের টিপ্পনী। একদিন রিকশা করে নীলক্ষেত এলাকা পার হওয়ার সময় ছাত্র-ছাত্রীদের টিপ্পনী; ঐ দ্যাখ, বাংলা সিনেমার হিরো। সেদিন ইলিয়াস কাঞ্চন গুরু সুভাষ দত্তের কাছে বলেন- গুরু, আমি আর অভিনয় করব না। গুরু সুভাষ দত্তের পরামর্শে সেদিন নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার এক সংগ্রামে নিয়োজিত করেন। আধুনিক সিনেমার জন্য শারীরিকভাবে নিজেকে তৈরি করার জন্য নাচ ও ফাইট শিখতে চলে যান ভারতে।
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে ইলিয়াস কাঞ্চন অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তবে সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ, বিশেষ করে খেটে খাওয়া দিন মজুর, কৃষক, শ্রমিক, ড্রাইভার, ইত্যাদি চরিত্রে দক্ষতার সাথে অভিনয় করেন। বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানান দিক তার ছবিতে সফলভাবে ফুঠে উঠেছে। নিম্ন আয়ের এসব মানুষরাও স্বপ্ন দেখে, তারাও বড় হতে চায়, তারাও চায় তাদের সন্তান যেন মানুষের মত মানুষ হতে পারে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের সেই স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে। কখনো অসুস্থ রাজনীতি কখনো প্রচলিত সমাজ তাদের এই সংগ্রামে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবুও নিম্নবর্গের এসব মানুষ থেমে থাকে না। তারা ঠিকই তাদের লড়াই চালিয়ে যায়। যেমন, আমজাদ হোসেন পরিচালিত সুন্দরী সিনেমায় সৎ ভাইবোনদের অত্যাচার আর অনাদরে বেড়ে ওঠা সেই যুবক, নিঃস্ব হয়ে যে কিনা বেরিয়ে যায় রাস্তায়। যার মুখে বিখ্যাত সেই গান, কী করে বলিব আমি, আমার মনে বড় জ্বালা। এরকম জ্বালা নিয়েই নিরন্তর সংগ্রাম করে যায় বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ।
বাংলা সিনেমার অপরাজিত নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। প্রান্তিক মানুষের জীবনচিত্র তার অভিনীত বেশির ভাগ সিনেমায় দেখা যায়। যেমন, চাঁদকুমারী চাষার ছেলে সিনেমায় কৃষকের ছেলে কিংবা স্বার্থপর সিনেমার সেই সরল কৃষক বড় ভাই, যে কিনা নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে ছোট দুইভাইকে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠায়। কিন্তু শিক্ষিত দুই ভাই তার বিশ্বাস ভঙ্গ করলেও ইলিয়াস কাঞ্চন বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের জীবন পর্যন্ত বিপন্ন করতে কার্পণ্য বোধ করেন না। এখনো গ্রামবাংলার সহজ সরল পরিবারগুলোতে এমন চিত্র অহরহ দেখা যায়। যেখানে সংসারের বড় ভাই তার দায়িত্ব পালনে বিন্দুমাত্র পিছপা হয় না। কৃষিজীবী বাংলার সমাজ ব্যবস্থার এ রকম বহু চিত্র দেখা যায় ইলিয়াস কাঞ্চন অভিনীত বিভিন্ন চলচ্চিত্রে। নিকাহ্, শাস্তির বদলে শাস্তি, আঁখি মিলন ইত্যাদি তার এই ধারার জনপ্রিয় চলচ্চিত্র।
চলচ্চিত্র একটি চলমান প্রক্রিয়া। এখানে সেলুলয়েডে জীবনের বিভিন্ন ঘটনাকে অভিনয়ের মাধ্যমে দেখানো হয়। ইলিয়াস কাঞ্চন অভিনীত বিভিন্ন কালজয়ী সিনেমায় গ্রাম বাংলার অন্ত্যজ মানুষের নির্মম সমাজ বাস্তবতার চিত্র দেখা যায়। যেমন- আয়না বিবির পালা ঠিক তেমনি একটি সিনেমা। এখানে দেখনো হয় যে, এক সরল গ্রাম্য যুবক দালালের মাধ্যমে বিদেশে যেতে চায়। কিন্তু দালালের প্রতারণায় তার আর বিদেশ যাওয়া হয় না। এরকম বহু ঘটনায় বাংলাদেশের অজস্র মানুষ তাদের ভিটেমাটি বা শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়।
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে ইলিয়াস কাঞ্চন প্রায় ৩৫০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। একদিকে তিনি যেমন এফডিসি কেন্দ্রিক কমার্শিয়াল ছবি অন্যদিকে শিল্পমান সমৃদ্ধ সাহিত্যনির্ভর সিনেমায়ও অভিনয় করেছেন সমান তালে। যেমন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরের অমর ছোট গল্প ‘শাস্তি’ অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মিত ‘শাস্তি’ সিনেমায় দিনমজুর দুখিরামের চরিত্রে তিনি অনবদ্য অভিনয় করে মানুষের হৃদয় জয় করে নেন। আসকার ইবনে সাইখের কাহিনী অবলম্বনে বাদল খন্দকার পরিচালিত বিদ্রোহী পদ্মা সিনেমায় নিম্নবর্গের কৃষক চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন। তার অভিনীত অন্যান্য সাহিত্যনির্ভর সিনেমার মধ্যে আবু সাইদের নিরন্তর অন্যতম।
সমাজে শোষক চরিত্রের জনপ্রতিনিধিরা প্রায়ই জনসেবার নাম করে প্রান্তিক মানুষদের বিভিন্ন ভাবে শোষণ করে। ইলিয়াস কাঞ্চন তার বেশ কিছু সিনেমায় এ সমস্ত মুখোশধারী জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে তীব্র লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। যেমন, শাস্তির বদলে শাস্তি, সিপাহী, কমান্ডার, বেপরোয়া অন্যতম। সিপাহী সিনেমায় একজন মুক্তিযোদ্ধা সৎ পুলিশ অফিসার চরিত্রে তার দুর্দান্ত অভিনয় আজো মানুষের মুখে মুখে। সমাজের সর্বশ্রেণীর মানুষেরা আজও মুক্তিযুদ্ধের সুফল থেকে বঞ্চিত। দেশ স্বাধীনের পর রাজাকারেরা খোলস পাল্টে এমপি, মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। নির্মম এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। কমান্ডার, ঘাতক এই ধারার অন্যতম জনপ্রিয় চলচ্চিত্র।
ছেলে কার, স্নেহের প্রতিদান, কুসুম কলি, দুর্জয় গ্রাম বাংলার পারিবারিক গল্পের অসাধারণ সব সিনেমা। এসব ছবিতে ইলিয়াস কাঞ্চনের চরিত্রানুযায়ী অভিনয় ছিল প্রাণবন্ত। যেমন, ছেলে কার ছবিতে সন্তানহীন ড্রাইভারের চরিত্রে তার অভিনয় ছিল অসাধারণ। কুসুমকলি সিনেমায় গ্রামীণ প্রেমিকের চরিত্রে তার অনবদ্য অভিনয় আজো মনে রেখেছে বাংলার সিনেমাপ্রেমী দর্শক। এ ছবির পিরিতি করিয়া, আমি যাবোগো মরিয়া গানটি এখনো মানুষের মুখে মুখে। প্রেমের প্রতিদান, বাঁশিওয়ালা, স্নেহের প্রতিদান, শর্ত এ ধারার অন্যতম জনপ্রিয় সিনেমা।
১৯৮৬ সালে ‘পরিণীতা’ ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। ফোক কাহিনীনির্ভর বাংলা সিনেমার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়কও এই ইলিয়াস কাঞ্চন। তার অভিনীত ১৯৮৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তোজাম্মেল হক বকুলের ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বাধিক ব্যবসা সফল ছবির স্থান দখল করে রেখেছে। শঙ্খমালা, প্রেম যমুনা, গাড়িয়াল ভাই এই ধারার অন্যতম সব জনপ্রিয় সিনেমা। যেমন গাড়িয়াল ভাই ছবিতে উত্তরবঙ্গের একজন গাড়িয়ালের চরিত্রে তার অভিনয় ছিল অনবদ্য। এ ছবির কান্দিসনারে বিন্দিয়া, কী আর হইবো কান্দিয়া আজো মানুষের মুখে মুখে।
একজন ইলিয়াস কাঞ্চন শুধু পর্দায় প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি বাস্তবে সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ১৯৯৩ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ছুটে চলছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের বহু মানুষ প্রাণ হারায়। এর প্রতিরোধে কাঞ্চন নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। ফলস্বরূপ ২০১৮ সালে সমাজ সেবায় সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এভাবেই ইলিয়াছ কাঞ্চন পর্দার নায়ক থেকে সত্যিকারের নায়কে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান সংকট কাটাতে ইলিয়াস কাঞ্চনের মত শক্তিমান অভিনেতাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করি। তাহলেই চলচ্চিত্র ফিরে পাবে তার হারানো জৌলুস।
জয়তু বাংলা চলচ্চিত্র, জয়তু ইলিয়াস কাঞ্চন।