আজ মুনিমের বিয়ের রাত। বহুল পরিচিত বাসর রাত। মুনিমের মধ্যে এ নিয়ে কোন উচ্ছ্বাস নেই। নির্লিপ্ত ভাব দেহ মনে। সারাদিনের ব্যস্ততা আর ভ্রমণের ক্লান্তি চোখে মুখে। তবে অন্যদের ঠাট্টা মশকরায় মাঝে মাঝে হেসে উঠছে। তবে বড্ড শুষ্ক হাসি। কোন জোশ নেই তাতে। রাত এগারোটা বেজে গেছে। মুনিম একা ক্লান্ত নয়। বাড়ির সকলেই পরিশ্রান্ত। তবুও ছেলেমেয়েরা বিয়ে বাড়িতে কোথা হতে যে এত উদ্দীপনা পায়? তাদের হই হুল্লোড় আর চেঁচামেচিতে মনে হচ্ছে যেন কেবল সন্ধ্যা। এইমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সেরে উঠলো মুনিম। কাল বাড়িতে বৌভাত অনুষ্ঠান। সেই আয়োজন নিয়েই যত পরিকল্পনা।
কোন মতে ছাড়া পেয়ে একটু একা হওয়ার সুযোগ খুঁজছিল। কিন্তু সুযোগ কোথায়? ঘরে এখনও ভিড়। লোকজনের বৌ দেখা শেষ হয়নি। অবশ্য ঘরে ঢোকার মতো কোন উৎসাহ এ মুহূর্তে মুনিমের মধ্যে নেই। সে চাচ্ছে সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে একা হতে। বন্ধুর ফোন তার এই কাজ সহজ করে দিলো। কথা বলতে বলতে সবার অলক্ষে ছাদে উঠে গেল। যাওয়ার সময় নিজ ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো কে যেন তার বউকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে। এত বড় মেয়েকে মুখে তুলে খাওয়াচ্ছে দেখে তার হাসি পেলো। কী অদ্ভুত আদরের বাহার!
ছোট্ট এক চিলতে ছাদ। ভাগ্যিস এদিকে কারও নজর পড়েনি। সবাই উঠানে দাপাদাপি করছে। ছাদ থেকে বাড়ির চারিপাশটা দেখলো। বাগানে একটা গরু আর ২টা খাসি বেঁধে রাখা। বোঝা যাচ্ছে কাল ওগুলো ভোজন হবে। বাগানে টিন দিয়ে ঘিরে ছোট একটা চত্বর করা হয়েছে। কাল প্যান্ডেল করে আরও সাজানো হবে। বাড়ির উঠানে তাকিয়ে লক্ষ করলো কেউ কেউ এঘর সেঘর বেশ ব্যস্ত যাতায়াত করছে। বিয়ে বাড়িতে হুড়োহুড়ি করা মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাব। সহজ কাজটাও ব্যস্ত করে ফেলে। ছোট পুলাপানের অবস্থা বেগতিক। তাদের বাজার থেকে কী যেন নিয়ে আসতে বলা হয়েছিল। ভুল করে অন্য কিছু নিয়ে এসে এখন বকা শুনছে। তবে কাজে কর্মে তাদেরও উৎসাহের কমতি নেই।
একমাত্র মুনিমের কেন যেন কোন উৎসাহ নেই। মুখ শুকনা করে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। নববধূর অবস্থা কেমন সেটা জানার সুযোগ হচ্ছে না। এখনও তেমন কথা হয়নি মুনিমের। ফেরার সময় গাড়িতে অল্পস্বল্প কথা হয়েছে। গাড়িভর্তি লোকজনের টিকা টিপ্পনীতে সহজ হওয়া কঠিন। কখন ঘর খালি হবে জানে না সে।
বিয়ের রাতের এই ক্ষণের জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে অনেক দিন। যখন আবেগ ছিল তখন সে বিয়ের সুযোগ পায়নি। কাউকে বলতেও পারেনি বিয়ের কথা। আজ এতদিন পরে এসে মনে হচ্ছে সবই যান্ত্রিক। বিয়ে করতে হয় তাই করা। বিয়ে করেও কি শান্তি আছে? সামাজিক নানা প্রসঙ্গে সে বিব্রত, ভীত সন্ত্রস্ত।
অনার্স মাস্টার্স শেষ করে আরও চার বছর পার করেছে মুনিম। নানা চড়াই উতরাই মাড়িয়ে আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। এদেশে অনার্স মাস্টার্স পাস করা প্রাইমারি শিক্ষার মতো। ন্যূনতম এতটুকু থাকার পরে চাকরির জন্য তৈরি হতে হয়। কেন এত দীর্ঘ লেখাপড়ায় সে তৈরি হতে পারলো না? এসব ভেবে সে খুব অস্থির হতো। এখন একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল।
মুনিম তার লক্ষ্য ঠিক করতে পেরেছে মাস্টার্স শেষ করে। যখন পুরোদমে চাকরি খোঁজায় মন দিয়েছে তখন। কখনও তার গন্তব্য ঠিক ছিল না। যান্ত্রিকতার মতো পড়াশোনা করে গেছে। ভাবতো লেখাপড়া শেষ করেই বিয়ে করবে। কিন্তু বাস্তবতার জাঁতাকলে কেটে গেছে চারটি বছর! আগের কালে পরিবারগুলো ছিল গৃহস্থ বা ব্যবসায়ী পরিবার। উত্তরাধিকার সূত্রে পারিবারিক সহায় সম্পত্তি দেখাশোনার ভার পড়তো ছেলেদের কাঁধে। অল্প বয়সেই সেই দায়িত্ব পাওয়া হতো। বিয়ে করতে তাই দেরি হতো না। আর এই যুগে চাকরি নামক সোনার হরিণ পেতেও দেরি, সেই সাথে থিতু হতেও দেরি।
পাত্রী ঠিক করতেও লেগেছে ছয় মাস। কী আজব সব চিন্তা ভাবনা! শাশুড়ির পড়াশোনাও এখানে বিবেচ্য বিষয় হয়ে যায়। বাড়ির সবার সম্মতি পেলে তবে যেন ছেলে মেয়ের হ্যাঁ না এর প্রশ্ন। শৃঙ্খলা আর সম্মান প্রদর্শনের স্বার্থে অন্যদের মতামতের গুরুত্ব দিয়েছে মুনিম। দেরি হলেও সবার মুখে যেন হাসি থাকে।
ভাবনায় এবার ছেদ পড়লো মুনিমের। মুঠোফোন কখন থেকে গুগু শব্দ করে যাচ্ছে। ফোন রিসিভ করে জানালো যে নিচে নামছে। উঠানে যাওয়ার আগে আবার এক পলক তাকালো। এবার চলছে শাড়ি গহনার বয়ান। বর্ণনার তীব্রতা শুনে বুঝলো উহা কত গুরুত্বপূর্ণ! এসবের পেছনে পরিশ্রমের গল্প কেউ জানবে না। শুধু সুন্দর অসুন্দরের গল্প হবে। এসব ঠাটবাট তার কাছে নকল মনে হয়। জোর করে আনন্দে থাকার চেষ্টা।
উঠানে যেতেই ছোট ফুপু খপ করে হাত চেপে ধরলেন। ঘরের দিকে টেনে নিয়ে চললেন। হালকা মুড়ামুড়ি করলেও রক্ষা হলো না। সোজা ঘরে গিয়ে সবাইকে বের হয়ে যেতে বললেন। ফুপুর কাণ্ড দেখে সবাই হাসতে লাগলো। চললো আরেক দফা রম্য বাগ্বিতণ্ডা। ফুপু হাত ছেড়ে দিয়ে সোফায় বসতে দিলেন। নববধূর কাছে গিয়ে কানে কানে কী যেন বললেন। বেরিয়ে যাওয়ার সময় গেট লাগিয়ে দিতে তাগাদা দিলেন।
মুনিম ধীরে ধীরে উঠে গেট লাগিয়ে এসে আবার সোফায় বসলো। চকিতে চেয়ে দেখলো বউ হাঁটু দু’হাতে জড়িয়ে রেখে নত মুখে বসে আছে। সোফায় বসে দীর্ঘ একটা শ্বাস ছাড়লো। ঘরের চারিদিকে তাকালো। এত সাজিয়েছে কেন? ঘরের দেয়াল আর বিছানার চারিধার প্রচুর ফুল দিয়ে সাজানো। ঘরটা পুরা জবরজং করে রেখেছে। কত যত্ন নিয়ে পেরেশান হয়ে এসব করেছে ছোটরা। কিন্তু ঘরে এক গ্লাস পানি রাখতে ভুলে গেছে। হুম, প্রয়োজনের চেয়ে ভাব দেখানোতে উস্তাদ সবাই।
কাল বহু মানুষ আসবে। অতিথি ও বাড়ির লোক সবাই খুব হয়রান হবে। কিন্তু কুশল বিনিময় ও দুপুরে ভুঁড়িভোজ ছাড়া আর কিছু কি হয়? কত দূরদূরান্ত থেকে পরিচিত ও আত্মীয়রা আসবে কিন্তু হাউ কাউ ছাড়া ফলদায়ক তেমন কিছু এসবে হয় বলে তার মনে হয় না। খাওয়াটাই যেখানে প্রধান বিবেচ্য বিষয় সেখানে অন্যকিছু খোঁজা অযথা।
অনমনা মুনিম হঠাৎ হাতের স্পর্শ পেলো। বউ বিছানা থেকে উঠে পাশে এসে বসেছে। কপালে হাত দিয়ে সোফার হাতলে ধ্যান করা ছুটে গেল। একটু বিব্রত হলো। বউকে অপেক্ষায় রেখে ওর এসব ছাইপাঁশ চিন্তা করা উচিত হয়নি। পাশ ফিরে তাকালো বউয়ের দিকে। বউ তার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।
: তুমি কী ভাবছো আমি তা জানি।
: কী জানো তুমি?
: অযথা এসব চিন্তা করে কেন নিজেকে আটকে রাখো?
: কিভাবে জানলে?
: আপা সব বলেছে।
: আপা কখন বললো? আজকে?
: না। তোমার সাথে আমার কথা না হলেও আপার সাথে কিন্তু নিয়মিত কথা হতো। তোমার অনেক কিছু আপার কাছ থেকেই জেনেছি।
: কী ভাবছি বলো দেখি?
: তুমি সব কিছুতেই প্রয়োজন অপ্রয়োজন খুঁজো। যথার্থতা তালাশ করো। আর অবশ্যই এসব ভেবে হতাশায় ভুগো।
: তুমি যেভাবে বলছো যেন এটা খারাপ!
: সব কিছুরই ভালো মন্দ দু’টি দিকই রয়েছে।
: এখানে মন্দ কী দেখলে?
: মনে কষ্ট পাও। কাজে মনোনিবেশ করতে পারো না।
: তাই নাকি!
: মনের মধ্যে কিছু একটা সব সময় খোঁচালে এলোমেলো হয়ে যেতে হয়।
: তাহলে কী করতে পারি?
: আমরা দুজনে মিলে চেষ্টা করবো সবকিছু সহজ করার। তারপরও যা হবে সেটা মেনে নিয়েই পথ চলতে হবে।
: একটা কথা বলি।
: হ্যাঁ বলো।
: তুমি নিজে থেকে এগিয়ে এলে। পাশে বসলে। এরপর এত সহজ হয়ে কথা বলছো কিভাবে?
: কেন তোমার কি খারাপ লেগেছে?
: না না। বরং ভালো লেগেছে। কিন্তু কৌতূহল জেগেছে। মনে হচ্ছে কেউ তোমায় শিখিয়ে দিয়েছে।
: কখনও কোন কিছু কি শূন্য থাকে?
: মানে?
: তুমি এমন তাই আমাকে এগিয়ে আসতে হয়েছে। আমি এমন হলে তুমি এগিয়ে আসতে।
: ও আচ্ছা।
: এটা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি।
: ভাবনাটা তোমার নিজস্ব নিশ্চয়?
: হুম। তবে তোমার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখবো। অপেক্ষায় আছি।
: তুমি এমন প্রত্যাশা করলে কিন্তু আমার ধড়ফড়ানি বেড়ে যাবে।
: বাড়–ক। সেখান থেকেও শেখার আছে।
: আমার পরিবারকে কেমন লাগছে? তোমাকে কিন্তু প্রথম দিকে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে।
: আমি সবসময় ইতিবাচক। তুমি ভয় দেখালেও আমি ভয় পাবো কেন?
: আমি সতর্ক করতে চাইছি।
: সবাইকে আমার ভালো লেগেছে। আর তুমি নিজের চিন্তা করো। আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না।
: আমাকে সহ্য করতে পারবা?
: কেন তুমি অসহ্য কিছু করো নাকি?
: না মানে নিজেকে নিয়েও ভয় হয়।
: ভয় সংশয় ঝেড়ে ফেলো। এবার কিছু সম্ভবনার কথা বলো।
: আজকের রাতে একমাত্র সম্ভাবনা তুমি। পেরেশান ছিলাম। তোমার কথা শুনে ভালোলাগা কাজ করছে। আমার অধৈর্যের ধৈর্য তবে কাজে এসেছে।
: কিভাবে?
: কেন, তোমাকে পেয়ে!
: ও খোদা!
মুনিম নববধূর হাতে হাত রাখলো। বউ লাজরাঙা অনুভূতি পেয়ে হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইলো। পারলো না। তাই কি আর ছাড়া যায়?