সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: কেন আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে গল্পটার জন্য কোনক্রমেই জাপান প্রযোজ্য নয়?
ইশিগুরো : ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ লিখতে শুরু করার সময় আমি উপলব্ধি করি যা লিখতে হবে তার একটা সারকথা থাকবে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আমি মনে করি এটা আপনার কাছে খুবই যথাযথ ছিল, আর এতেই আপনি বহুরূপী সামর্থ্য প্রদর্শন করতে সমর্থ হয়েছেন।
ইশিগুরো : আমি মনে করি না বহুরূপীর মতো কোন কিছু আছে। যা আমি বলেছি তা একই বইয়ে তিন বার লিখেছি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আপনি এটা মনে করেন কিন্তু যারা আপনার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পড়েছেন তারা জাপানিদের বিষয়টিকে অনুধাবন করেছেন অন্যভাবে।
ইশিগুরো : ওটার কারণ মানুষ শেষ জিনিসটাকে প্রথমে দেখে। আমার ক্ষেত্রে সারমর্ম সেটা হয়েছিল না। আমি জানতাম যে এটা কোন কোন ক্ষেত্রে বিন্যাসটাকে প্রাইমো লেভিতে সরাইয়া লওয়া হয়। আর এতে আপনারা বইটাকে সরিয়ে রেখেছিলেন। আমি কিন্তু আর্টিকে অনুষ্ঠিত দ্য টেম্পেস্টের একটা বড় ধরনের পারফরম্যান্সে গিয়েছিলাম। অধিকাংশ লেখক সচেতনভাবে তাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক নির্দিষ্ট জিনিস করেছিলেন আর অন্যেরা কম সচেতন হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আমার ক্ষেত্রে, আমি বর্ণনা করতে পছন্দ করেছিলাম। তা ছিল বিন্যাসমূলক। আপনারা যতœ সহকারে একটা বিন্যাস করতে পছন্দ করে থাকেন। কারণ তাতে আবেগপ্রবণতা ও ইতিহাসের প্রতিধ্বনির সব ধরনের বিন্যাস সন্নিবেশিত হয়। সে সময়ের আমার লেখা উপন্যাসের জন্য তা ছিল অস্বাভাবিক।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : তা কি সম্বন্ধে ছিল?
ইশিগুরো : এ বিষয়ে আমি বেশি কিছু বলতে চাই না। প্রথম পর্যায়ে কিন্তু এটাকে উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করতে হয়েছিল। কিছুদিন ধরেই আমি একটি উপন্যাস লিখতে চাচ্ছিলাম, যা সমাজ মনে রাখবে কিংবা ভুলে যাবে। সমাজ কিভাবে সব কিছু মনে রাখে আর ভুলে যায় সে সম্বন্ধে একটা উপন্যাস লিখতে আমি সময় নিতে চেয়েছিলাম। এক সময় আমি লিখেছিলাম মানুষ কিভাবে অস্বস্তিদায়ক স্মৃতিগুলোকে মনের কোণে ফিরিয়ে আনে। একটা সমাজের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় ওইগুলোকে হয় মনে রাখে অথবা ভুলে যায়। কখন ভুলে যাওয়া ভাল। আসলে স্মৃতিগুলো চেতনায় বারবার ফিরে ফিরে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সে একটা চিত্তাকর্ষক ঘটনা ঘটেছিল। আপনি যুক্তি দেখাতে পারেন যে দ্য গলে সঠিক কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে আমাদের প্রয়োজন দেশকে পুনরায় কাজে ফিরিয়ে নেয়া। আসুন কে যুদ্ধের সহযোগিতা করেছিল আর কে করেছিল না তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করা থেকে আসুন আমরা বিরত হই। আসুন আমরা বিষয়টা অন্য সময়ে ভাবার জন্য রেখে দিই। কিছু কিছু মানুষ বলেছিল যে ওটা করলে আইন দুর্বল হয়ে পড়বে। আর তা থেকে বড় ধরনের সম্যার সৃষ্টি হবে। আমি যদি ফ্রান্সের উপর লিখতাম তবে একটা বই হয়ে যেত। কিন্তু ওই বিষয়ে লেখার জন্য অনেক সমস্যা ছিল। সমস্যা কাটিয়ে ওই বিষয়ে লেখার জন্য আমি কিন্তু হাল ছেড়েছিলাম না।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আপনি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে?
ইশিগুরো : উপন্যাস লেখার জন্য সম্ভাব্য সমাধান খুঁজে পেয়ে ছিলাম ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটেনে একটি ঘটনার মাধ্যমে। রোমানদেরকে সরিয়ে অ্যাংগ্লো স্যাক্সেনরা ক্ষমতা গ্রহণ করে। কেউই জানে না কেল্টদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল। গণহত্যা ও নির্যাতনের ফলে কেউই জানে না কেল্টদের ভাগ্যের কথা। সেই সব ঘটনাগুলো আমার আধুনিক উপন্যাসের রসদ জুগিয়েছিল। মানুষ গ্ল্যাডিয়েটর কে যেন দেখতে পেয়েছিল আধুনিক অনুষঙ্গে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ তে ইংরেজ জাতিকে কিভাবে উপস্থাপন করলেন।
ইশিগুরো : এটা আমার স্ত্রীর একটা কৌতুকের ফলে শুরু হয়েছিল। একজন সাংবাদিক আমার প্রথম উপন্যাসের জন্য সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিলেন। বিষয়টা হাস্যস্পদ হতো যদি না ওই লোকটি ভেতরে না এসে জিজ্ঞাসা করতেন। তার প্রশ্ন ছিল, আমার উপন্যাস সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেছিলে আমি আমার বাটলারকে রূপক হিসাবে দেখানোর ভান করেছি কিনা। তার প্রশ্ন শুনে আমরা বেশই মজা পেয়েছিলাম। তারপর থেকে বাটলারকে রূপক হিসাবে ভাবার ধারণা আমার মনে আসে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : রূপক হিসাবে ভাবার কারণ কী ছিল?
ইশিগুরো : দুটো জিনিস ছিল: একটা ছিল ইংরেজ বাটলার। সে খুবই গম্ভীর। তার সামনে যাই ঘটুক না কেন তাতে তার কোন প্রতিক্রিয়া ছিল না। অন্যটি ছিল যে বাটলার ছিল অন্য কারো প্রতীক। সে বলে আমি কারো একজনের প্রতীক।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : আপনি কি জেভসের ভক্ত?
ইশিগুরো : জেভসের প্রভাব তো ভালই ছিল। শুধু জেভসের প্রভাব নয়। ফিল্মগুলোর পটভূমিতে সব বাটলারের অঙ্গভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছিল। তারা ছিল মজাদার। কিন্তু তার মাঝে চরকিবাজি ছিল না। তারপর থেকে একজন আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের জন্য লিখতে আমি খুবই সচেতন হলাম। আমার মাঝে একটা প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। আমার মনে বিলেতি উপন্যাস সম্পর্কে বিশেষ অনুভূতির সৃষ্টি হলো।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনি কি যথেষ্ট গবেষণা করেছিলেন?
ইশিগুরো: হ্যাঁ, আমি কিন্তু বিস্মিত হয়েছিলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত এদেশের চারকবাকরদের নাগরিক অধিকার দেখে। আমি ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ উপন্যাসে তা উপস্থাপন করতে চেষ্টা করেছি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: ওই বইয়ে এবং অন্যান্য উপন্যাসে আপনি প্রধান প্রধান চরিত্রগুলোকে ঘটনাবহুল অনুষঙ্গে তুলে ধরেছেন। চরিত্রগুলো কিন্তু ভালবাসার অভাব বোধ করেছে।
ইশিগুরো: আমি জানি না ভালবাসার অভাব বোধ করেছিল কিনা। সে সময়টা ভিন্ন ধরনের ছিল। তারা নিশ্চয়ই পেছন ফিরে তাকিয়ে চিন্তা ভাবনা করেছিল। সে সময়টা তাদের ভাবনাচিন্তা করার মতো সময়ই ছিল। ওহ, তা ছিল তাদের ভাগ্যের ব্যাপার। জীবনের জন্য যে ভালবাসা একান্ত প্রয়োজন তা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছিল।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: কেন আপনি মনে করেন এই সমস্ত চরিত্রগুলো একের পর সৃষ্টি করেছেন?
ইশিগুরো: আমার নিজের মনোসমীক্ষণ ছাড়া আমি কোন প্রশ্নের জবাব দিতে পারি না। কখনোই আপনার একজন লেখককে বিশ্বাস করা উচিত নয় যদি তিনি আপনাকে বলেন কেন তিনি নির্দিষ্ট থিম ব্যবহার করেছেন।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী : ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ এর জন্য আপনি বুকার প্রাইজ লাভ করেন। এই অর্জন কি আপনার মধ্যে কোন পরিবর্তন এনে দিয়েছিল?
ইশিগুরো: ‘যখন আমি অ্যান আর্টিস্ট অব দি ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড প্রকাশ করলাম তখন পর্যন্ত আমি একজন অখ্যাত লেখক হিসাবে ছিলাম। এই উপন্যাসটি প্রকাশের ছয় মাস পরে সব কিছুর পরিবর্তন ঘটল। আমি প্রথমে হুইটব্রেড অ্যাওয়ার্ড আমি পেলাম। তারপর আমরা একটা আনসারিং মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত নিলাম। হঠাৎ করেই লোকজন আমাকে চিনতে শুরু করল এবং আমাদেরকে ডিনারে আমন্ত্রণ জানাতে থাকল। তার তিন বছর পর আমি বুকার পুরস্কার পেলাম। সে সময় থেকে আমি জানতে শিখলাম মানুষের সঙ্গে বিনয় প্রকাশ করা উচিত।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: একজন লেখকের জীবনে প্রচার-প্রচারণা, বুক ট্যুর, সাক্ষাৎকার, রিভিউ ইত্যাদি কি তার লেখায় প্রভাব ঘটায়?
ইশিগুরো: তা আপনার লেখার উপর দুই ভাবে কার্যকরী হয়। একটা হচ্ছে যে তা আপনার লেখালেখির ক্ষেত্রে তৃতীয় মাত্রা দান করে। অপরটি হচ্ছে যে আপনি আপনার প্রচুর সময় ব্যয় করতে পারেন। আপনার উপাদানে কেন সব সময়ই তিনপাওয়ালা বিড়াল থাকে কিংবা একটা কবুতরের সঙ্গে কী কার্যকরণ থাকে? আপনার কাজের মধ্যে থাকতে পারে অসচেনতা। আমি মনে করি আমার মধ্যে উদ্ভট ধারণাও থাকতে পারে। আপনাকে কাজ শুরু করতে হবে অনেক অনেক আত্মসচেতনতার মাধ্যমে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনি যখন লিখতে থাকেন তখন আপনি কি অনুবাদকদের সমস্যার কথা ভাবেন?
ইশিগুরো: আপনি নিজেকে পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন অংশে দেখতে পেলে আপনার মনে পড়বে সে দেশের ভাষায় ঠিকঠাক অনুবাদ জানেন কি না। মাঝে মধ্যে আপনি একনাগাড়ে চার দিন ডেনিশদের একটা বই ব্যাখ্যা করে কাটাতে পারেন। আমি নির্দিষ্টভাবে ব্রান্ড নেমস ও অন্যান্য কালচারের রেফারেন্স পয়েন্ট উদাহরণ হিসেবে দিতে পছন্দ করি না। কারণ তারা ভৌগোলিক অনুষঙ্গে অনুবাদ করেন না।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনার কি রাইটিং রুটিন আছে?
ইশিগুরো: আমি সচরাচর সকাল দশটা থেকে প্রায় ছয়টা পর্যন্ত লিখি। চারটা পর্যন্ত আমি চেষ্টা করি ইমেল, টেলিফোন ব্যবহার না করার।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনি কি কম্পিউটারে কাজ করেন?
ইশিগুরো: আমার দুটো ডেক্স আছে। একটা লেখার জন্য ঢালু ডেক্স আর একটা কম্পিউটার ডেক্স। ১৯৯৬ সাল থেকে কম্পিউটার ব্যবহার করছি। যদিও তা ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। আমি রাইটিং ডেক্সে বসে কলম দিয়ে লিখতেই পছন্দ করি। লেখার সময় আমার কাছে কেউ থাকুক আমি পছন্দ করি না। খসড়া ড্রাফটে বড় ধরনের গড়বড় থাকে। আমি সব কিছু প্রথমে কাগজেই লিখি। আমার মনে কোন আইডিয়ার জন্ম হলে তা কাগজে টুকে নেই। বিষয়ের উপর পুরোপুরি ধারণা এলে আমি তা ড্রাফট করে ফেলি। আমি যাই লিখি না তা সচেতনার সঙ্গে লিখে থাকি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: লেখার সময় আপনি কতবার ড্রাফট করেন?
ইশিগুরো: আমি খুব কমই তৃতীয়বার ড্রাফট করে থাকি। তবে বলতে হয় কোন ব্যক্তিগত প্যাসেজে ক্ষেত্রে বারবার ড্রাফট করতে হয়।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনার প্রথম তিনটি বই এবং দ্য আনকনসোল্ড ইতিবাচক রিভিউ হয়েছে যা খুব কম লেখকের ক্ষেত্রেই ঘটে। যদিও আপনার সুন্দর কাজের জন্য কিছু কিছু সমালোচকের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছেন। আবার অন্যেরা বলেছে তাদের পড়া বইগুলো সবচেয়ে খারাপ। এতে আপনার অনুভূতি কী?
ইশিগুরো: আমি মনে করি আমার প্রথম তিনটি বইয়ের সমালোচনা সম্ভবত যথেষ্ট সাহসের কাজ হতো না। আমি অনুভব করতাম সত্যের প্রতিধ্বনি। শেষ পর্যন্ত দ্য নিউইয়র্কার এ ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ উপন্যাসের একটি রিভিউ প্রকাশ পায়। ওই রিভিউটি ছিল অসাধারণ।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: সেটা খুবই সঠিক ছিল।
ইশিগুরো: হ্যাঁ। ভাল হয়েছিল। রিভিউটা তালগোল পাকানো ছিল না। আমার কাজকে সাহসী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। প্রত্যেকটা বিষয়কে বেশই নিয়ন্ত্রিত ভাবে করা হয়েছিল। অন্য লোকেরা অবশ্যই সঠিক ভাবে সমালোচনা করতে পারতেন না। কি দারুণ সমালোচনা। সমালোচনার প্রতিধ্বনি আমি অনুভব করেছিলাম। একই উপন্যাস বারবার সংশোধন করেও আমি নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ প্রকাশের সামান্য কয়েকদিন পর আমার স্ত্রী ও আমি একটি সুলভ মূল্যের খাবারের দোকানে বসে আলোচনা করছিলাম। আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক পাঠকদের জন্য কেমনভাবে উপন্যাস লেখা দরকার এবং বিশ্বজনীন অনুষঙ্গকে কিভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। আমার স্ত্রী বললেন যে স্বপ্নের ভাষাই হচ্ছে বিশ্বজনীন ভাষা। প্রত্যেকেই একথা সমর্থন করে তারা যে কালচার থেকে আসুক না কেন! তার কয়েক সপ্তাহ পর থেকে আমি, আমাকে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম, স্বপ্নরাজির ব্যাকরণ কী? তারপরই আমরা দুজনে আমাদের বাড়ির একটি রুমে একান্তে আলোচনা করছিলাম। আমাদের পাশে অন্য কেউ ছিল না। একজন তৃতীয় ব্যক্তি এই দৃশ্যে হাজির। দরজায় একবার কড়ানাড়া। কেউ একজন ভেতরে এলে আমরা বলে উঠলাম, হ্যালো। স্বাপ্নিক মন বড়ই অসহিষ্ণু এ ধরনের ঘটনায়। মূলত আমরা রুমটাতে নিরিবিলিতে বসে আলাপ করছিলাম। তারপর হঠাৎ করে আমরা সচেতন হয়ে পড়লাম একজন তৃতীয় ব্যক্তি রুমে প্রবেশ করায়। লোকটি আমার কনুয়ের কাছে বসল। ছোটখাটো একটা বিস্ময়ের অবতারণা হলো, আমরা ওই ব্যক্তি সম্বন্ধে সচেতন ছিলাম না। আমরা উঠে দাঁড়িয়ে সোজা চলতে থাকলে লোকটাও উঠে দাঁড়াল। আমি ভাবলাম মজার ব্যাপার তো। আমি দেখতে পেলাম স্মৃতি ও স্বপ্নের মাঝে সমান্তরাল রেখা যেন দেখতে পাচ্ছি। স্বপ্নরাজির ভাষায় আমি একটি গল্প লিখে ফেললাম। মানুষ রূপকধর্মী গল্প পড়তে অভ্যস্ত। কয়েক মাস ধরে টুকরো টুকরো ঘটনা লিখে আমি একটা ফোল্ডার তৈরি করলাম। এক সময় সেই সব টুকরো টুকরো ঘটনার ভিত্তি করে আমি একটা উপন্যাস লেখার জন্য প্রস্তুত হয়েছি আমি অনুভব করলাম।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: কখন আপনি আপনার লেখা লেখেন, আপনি কি গল্পের প্লটের উপর ভিত্তি করে লিখে থাকেন?
ইশিগুরো: দুটো প্লট আছে। রাইডার নামে একজন লোকের গল্প। লোকটি বেড়ে উঠে একটা অসুখী বাবা মায়ের পরিবারে। বাবা মা’ বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার উপক্রম। লোকটি ভাবে একমাত্র সে তার বাবা মায়ের অসুখী অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে। ফলে সে চমৎকার পিয়ানিস্টের কাজে ইতি টানে। সে ভাবল যদি সে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসার্ট পার্টি ছেড়ে দেয় তবে অন্যকাজ করে আয় উপার্জনের মাধ্যমে তাদের পরিবারের ভাঙন রোধ করতে পারবে। অবশ্যই তার এই সিদ্ধান্ত নিতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। তার বাবা মায়ের মধ্যে যা ঘটবার অনেক আগেই ঘটে গিয়েছিল।
ব্রোডস্কাই নামে একজন বৃদ্ধের গল্প। সে একটা ভালো সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে। সে ভেবেছিল তার জীবনের ভালবাসা পুনরুদ্ধার করতে পারবে। কিন্তু পারেনি। এই দুটো গল্পই আমাদের সমাজের।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনার কট্টর সমালোচকদের প্রতি আপনি কেমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন?
ইশিগুরো: আমার কখনো ইচ্ছা নেই জেনেশুনে কোন কিছুকে অস্পষ্ট করার। আমি যতদূর পারি উপন্যাসটিকে সহজ করেছি। আমি স্বাপ্নিক যুক্তি দেখাতে চেষ্টা করেছি। একটা স্বপ্নে একটা চরিত্র প্রায়ই চিত্রিত হয় বিভিন্ন লোকের দ্বারা। আমি মনে করি, আমি একটা টেকনিক ব্যবহার করেছি যার মাঝে কিছুটা বিভ্রান্তি আছে। আমি কিন্তু দ্য আনকনসোল্ড একটি শব্দও পরিবর্তন করিনি। আমি বই সঙ্গে করে সফরে বের হলে একদল মানুষ দ্য আনকনসোল্ড কে সাদরে গ্রহণ করে, বিশেষ করে আমেরিকার ওয়েস্ট কোস্ট এর সমালোচকরা। অ্যাকাডেমিকরা আমার অন্য উপন্যাসের চেয়ে এই উপন্যাটির ওপর বেশি লেখালেখি করেন।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: তারপরে আসে হেয়েন উই অয়ার অরফানস এর কথায়। একজন ইংরেজ ডিটেকটিভ ক্রিস্টোফার সম্বন্ধে। তিনি সাংহাই থেকে তার বাবা-মার নিখোঁজ হওয়ার রহস্য আবিষ্কার চেষ্টা করেন।
ইশিগুরো: হোয়েন উই অয়ার অরফানস হচ্ছে আমার ক্যারিয়ারের কয়েকটি উদাহরণের অন্যতম। আমি যখন কোন কিছু লিখতে চাইতাম তখনই বিশেষভাবে সময় ও স্থানের কথা ভাবতাম। তিরিশ দশকের সাংহাইয়ের প্রতি আমার আকর্ষণ ছিল। আজকের দিনে সাংহাই হচ্ছে প্রটোটাইপ কসমোপোলিটিয়ান নগরী। এক সময় আমার পিতামহ ওখানে কাজ করতেন। আমার বাবা ওখানে জন্মগ্রহণ করেন। আশির দশকে আমার বাবা ফটোগ্রাফ অ্যালবামে ফিরে এসেছিলেন। আমার পিতামহ ওখানেই থেকে যান। সেখানে অনেক ফটোগ্রাফার ছিল। আমার বাবা আমাকে বিভিন্ন ধরনের গল্প বলতেন। আমি এক সময় ডিটেকটিভ গল্প লিখতে চেয়েছিলাম। ইংলিশ বাটলারের সঙ্গে বিখ্যাত শার্ললোক হোমস এর গল্পের মিল ছিল। মস্তিষ্কপ্রসূত সম্পর্কের চেয়ে বরং দায়িত্বের প্রতি তিনি নিবেদিত ছিলেন। দ্য আনকনসোল্ড এর মিউজিসিয়ান মতো তার ব্যক্তিগত জগৎটা ছিল ভঙ্গুর। ক্রিস্টোফার ব্যাংকস এর মন তার বাবা মা এর রহস্যের সমাধান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেমে যাওয়া বিষয়ে অদ্ভুত ধরনের ভাবনা ছিল। ওটা হচ্ছে উদ্ভট লজিক যার ওপর ভিত্তি করে আমি হোয়েন উই অয়ার অরফান লিখতে চাইলাম। এটা ছিল আমাদের নিজেদের জগত সম্বন্ধে লেখার প্রচেষ্টা। আমার আসল ধারণা ছিল একটা উপন্যাসের মঝে আর একটি উপন্যাসের ধারা থাকবে। আমি চেয়েছিলাম ব্যাংকস আগাথা ক্রিস্টির পন্থায় অন্য একটি রহস্যের সমাধান করবে। প্রায় এক বছর ধরে এক শত নয় পাতার হোয়েন উই অয়ার অরফানস উপন্যাস লিখে শেষ করলাম। অন্য বইগুলো লেখার চেয়ে হোয়েন উই অয়ার অরফানস লিখতে বেশই কষ্ট হয়।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আমার মনে হয় নেভার লেট মি গো এ কয়েকটা অকালজাত ভার্সন আছে।
ইশিগুরো: হ্যাঁ। ছাত্র, যুবক যুবতী সম্বন্ধে গল্প লিখতে হলে মূল ধারণা অর্জন করতে হয়। আশি বছরের পরিবর্তে তিরিশ বছরের মানব জীবনের কথা তুলে ধরতে হবে। আমি ভাবলাম যে তারা চলছে পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকির মাঝ দিয়ে। পরিশেষে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ছাত্রদেরকে ক্লোন করতে। আমি কারণ খুঁজে পেলাম কেন তাদের জীবন সীমাবদ্ধ। ক্লোন ব্যবহার সম্বন্ধে একটা আকর্ষণ ছিল। লোকজন তাৎক্ষণিকভাবে এ সম্বন্ধে জানতে চাইবে। এটার অর্থ কি একজন মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? এটা হচ্ছে একটা সেকুলার রুট দস্তোয়েভস্কিয়ান প্রশ্নের, আত্মা কি?
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনি কি সত্যি সত্যি বোর্ডিং স্কুল স্থাপনে আগ্রহী ছিলেন?
ইশিগুরো: শিশুদের জন্য এটা একটা সুন্দর কাজ। লোকজন শিশুদের দায়িত্ব নিতে পারে। বাচ্চাদেরকে নিয়ন্ত্রণে রেখে জানা যেতে পারে বচ্চারা কি জানে ও কি জানে না। আমার মনে হয় আমরা আমাদের শিশুদেরকে প্রকৃত জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। বিভিন্ন উপায়ে শিশুরা বেড়ে উঠতে পারে একটা বুদ্বুদের ভেতর থেকে। আমরা ওই বুদ্বুদকে সঠিকভাবে পরিচালনার চেষ্টা করতে পারি। আমরা শিশুদেরকে অসুখকর খবর থেকে দূরে রাখতে পারি। বাচ্চাদেরকে খারাপ খবরাখবরের ধারে কাছে না রাখার চেষ্টা করতে হয়। এ কাজ করতে হলে বোর্ডিং স্কুল স্থাপন দরকার।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনি দেখেছেন অনেক সমালোচক আছেন যারা উপন্যাসের বিষয় সম্বন্ধে অন্ধকারে আছেন?
ইশিগুরো: প্রকৃতপক্ষে, নেভার লেট গো উপন্যাস সম্বন্ধে ভেবে ছিলাম। আমার নেভার লেট গো আনন্দদায়ক উপন্যাস। আমি এই উপন্যাসে মানুষের ইতিবাচক দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমি কিন্তু তিনজন সুন্দর মানুষকে দেখাতে চেয়েছিলাম। তারা চূড়ান্ত ভাবে উপলব্ধি করে যে তাদের সময় সীমাবদ্ধ। আমি তাদের কাছে চেয়েছিলাম তারা যেন তাদের স্ট্যাটাস বা তাদের বস্তুতান্ত্রিক অধিকার সম্বন্ধে উন্মনা না হয়। আমি তাদের কাছে চেয়েছিলাম সঠিকভাবে পরস্পর পরস্পরের প্রতি যতœবান হয়। আমি বলেছিলাম মানুষের ইতিবাচক দৃষ্টির কথা।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: আপনি কেমন ভাবে আপনার বইয়ের শিরোনাম করতে পছন্দ করেন?
ইশিগুরো: একটা শিশুর নামকরণে একটু সময় লাগলেও প্রচুর বাগি¦তণ্ডা অবতারণা হতে পারে। ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ উপন্যাসের কথা উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। আমি অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত রাইটার্স ফেস্টিভ্যালে গিয়েছিলাম। মাইকেল ওন্ডাতজে, ভিক্টোরিয়ান গ্লেনডিনিং, রবার্ট ম্যাকক্রাম এবং জুডিথ হারজবার্গ নামে একজন ডাচ লেখকের সঙ্গে আমি সমুদ্রসৈকতে বসে ছিলাম। সম্প্রতি শেষ করা আমার নতুন বইয়ের নামকরণের জন্য আমরা সেখানে বসে প্রায় একটা গেম খেলার চেষ্টা করছিলাম। মাইকেল ওন্ডাতজে পরামর্শ দিলেন স্যারলোইন: এ জুইসি টেল নামকরণ করতে। আমি আমার বইয়ে বিষয়বস্তু আবারও বললে জুডিথ হারজবার্গ ফ্রয়েডের একটি ফ্রেজ আওড়ালেন, যার অর্থ স্বপ্নরাজি। তিনি যা বললেন তা হচ্ছে ‘ডেবরিশ অব দি ডে’ এর মতো একটা নামের কথা। সেই নাম থেকেই আমি আমার উপন্যাসের নাম দিলাম ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’। আমার পরবর্তী উপন্যামের নাম দ্য আনকনসোল্ড এবং পিয়ানো ড্রিমস’র মাঝ থেকে একটা পছন্দ করার কথা উঠল। একজন বন্ধু ও আমার স্ত্রী আমাদের মেয়ের সঠিক নাম নাওমি দিয়েছিলেন। আমরা মেয়ের নাম আসামি ও নাওমির মধ্যে কোনটি রাখবো তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে ছিলাম। আমার বন্ধুটি বলল যে আসামি শব্দটা সাদ্দাম ও আসাদ শব্দের মিশ্রণের মতো। তৎকালে আসাদ ছিলেন সিরিয়ার ডিক্টেটর। সে আবার বলল, দস্তোয়েভস্কি বেঁচে থাকলে তোমার উপন্যাসটির নাম দ্য আনকনসোল্ড পছন্দ করতেন। অন্য দিকে, এলটোন জন অবশ্যই পছন্দ করতেন পিয়ানো ড্রিমস। তাই আমি তোমার উপন্যাসের নাম দ্য আনকনসোল্ড দিতে বলি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: প্রকৃতপক্ষে আপনি দস্তোয়েভস্কির ভক্ত।
ইশিগুরো: হ্যাঁ। উনিশ শতকের ডিকেন্স, অস্টেন, জর্জ এলিয়ট, চারলোট্ট ব্রোনট, উল্কি কলিনস এর উপন্যাসগুলো আমি প্রথম ইউনিভার্সিটিতে পড়েছিলাম।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: তাদের সম্বন্ধে আপনি কি বলতে পছন্দ করেন?
ইশিগুরো: বোধের দিক থেকে তারা বাস্তববাদী। আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি সেই পৃথিবী কম বেশি গল্প সৃষ্টি করে চলেছে। বর্ণনায় একটা আস্থা থাকে। বর্ণনায় প্লট, গড়ন ও চরিত্রে ঐতিহ্যগত উপাদানকে ফুটিয়ে তুলতে হয়। বাল্যকালে প্রচুর পড়িনি অথচ সে সময়ই প্রচুর পড়াশোনা করে ভিত মজমুত করার প্রয়োজন ছিল। চারলোট্ট ব্রোনটের ভিলেট্টি ও জেন আইরে, দস্তোয়েভস্কির চারটা বড় নভেল, চেকভের ছোটগল্প, টলস্টয়ের ওয়ার এন্ড পিস, ব্লি হাউস, জেন অস্টিনের উপন্যাসগুলো আপনাকে পড়ে আপনার ভিত মজবুত করতে হবে। আমি প্লাটোকে পছন্দ করি।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: কেন?
ইশিগুরো: তার সক্রেটিক ডায়ালগের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, কি ঘটে; একজন লোক রাস্তা দিয়ে একা হেঁটে যাচ্ছে আর ভাবছে সে সব কিছু জানে। সক্রেটিস সেই লোকটির পাশে বসে তার সর্বজ্ঞ হওয়ার ধারণাকে নির্মূল করে দেন। কখনো কখনো লোকজন বিশ্বস্ততার সঙ্গে বিশ্বাসকে মনে গেঁথে রাখে, তা কিন্তু ভুল হতে পারে। আমার প্রথম দিকের বইগুলোতে এই বিষয়টা তুলে ধরেছি যে লোকজন ভাবে তারা সব জানে। সেখানে সক্রেটিসের উপস্থিতি নেই। তারা নিজেরাই নিজেদের সক্রেটিস। প্লাটোর ডায়লগে একটা প্যাসেজ আছে, যাতে সক্রেটিস বলছেন যে আদর্শবাদী লোকজন প্রায়ই হয়ে থাকে মনুষ্যদ্বেষী যখন তারা দুই কিংবা তিনবার হতাশায় পড়ে। প্লাটো পরামর্শ দেন এটা হতে পারে ভালো শব্দের অর্থ খোঁজার মতো। আপনি ছিটকে ফিরে এলেও আপনার উচিত নয় মোহমুক্ত হওয়া। অনুসন্ধান কষ্টকর হলেও আপনাকে অনুসন্ধানের জন্য দায়িত্ব পালন করেই যেতে হবে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী: সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য অপনাকে ধন্যবাদ।
ইশিগুরো: আপনাকেও ধন্যবাদ।