আমার বিলেত যাওয়ার কথা শুনে কবিবন্ধু রাজু আলাউদ্দিন আমাকে বলেছিলেন আমি যেন তার বন্ধু তারিকুল আলম খানের সাথে যোগাযোগ করি এবং লন্ডনে তারিকের আতিথ্য গ্রহণ করি। তারিক একজন শক্তিমান দাবারু, খেলোয়াড় জীবনে অনেকগুলো চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে তিনি একবার বিলেতে এসেছিলেন। তখনই এদেশ তার ভালো লেগে যায়। দেশে ফিরে তিনি পুনর্বার বিলেত আসেন এবং বিলেতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় শহরে থাকতে মনোস্থির করেন। আমি এডিনবরা থেকে ফোনে তার সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। তিনি একজন অত্যন্ত অমায়িক মানুষ, আমাকে লন্ডনে যাওয়ার অগ্রিম আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখেন, মাঝে মাঝেই টেলিফোনে খোঁজ নেন। আমি কয়েকবারই লন্ডন হয়ে আমার চিকিৎসক বন্ধুদের বাড়ি গিয়েছি, কিন্তু লন্ডনে পত্তন গেড়ে তারিকুল আলম খানের সাথে দেখা করার ফুরসত পাইনি। জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে আমি প্রথম যেবার লন্ডন যাই এবং দু’দিন আমার বন্ধু জাহিদুল ইসলামের বাসায় থাকি তখনও ফুরসত মেলেনি। আজ যখন আমার দেশে ফিরে যাওয়ার দিন ঘনিয়ে আসছে, তখন দেখা করার সুযোগও কমে আসছে। তারিক আগেই বলে রেখেছিলেন, একটি দিন তিনি আমাকে নিয়ে লন্ডনে ঘুরবেন এবং এমন কিছু দেখাবেন যা সচরাচর পর্যটকদের চোখ এড়িয়ে যায়। এ বছর মার্চের ২৪ তারিখ আমি তার জন্য তুলে রেখেছিলাম।
লন্ডনে আমি থাকছি সংহতি সাহিত্য পরিষদের সভাপতি কবি ইকবাল হুসাইন বুলবুলের বাসায়। গতকালই এখানকার কবি-লেখকগণ টাওয়ার হ্যামলেটে আমাকে একটি সংবর্ধনা দিয়েছে। ভোরবেলা প্রাতঃরাশ পর্ব সেরে বুলবুল ভাই আমাকে কাছের রেলস্টেশন Ponders End-এ নামিয়ে দিলেন। এখানে ক্যামব্রিজ থেকে ট্রেন আসে। আমার কাছে যে oyester কার্ড ছিলো, তাতে টাকা ভরে নেই। লন্ডনের সবাই বলে এটা সাশ্রয়ী। সারাদিন ভ্রমণের জন্য সর্বোচ্চ অঙ্কের একটি টাকা কেটে রাখবে, অতঃপর পরদিন ভোর চারটা পর্যন্ত সব ভ্রমণই ফ্রি। ছোট স্টেশনটির এ প্রান্তে আমরা যখন টিকেটঘরের ভেতর কার্ডে টাকা ভরছিলাম, সে মুহূর্তে ওপাশে ট্রেন চলে আসে। বুলবুল ভাই ও আমি ওভারব্রিজ ধরে ছুটতে থাকি। ট্রেন ছেড়ে দেয়ার আগ মুহূর্তে ট্রেনে চড়ি, তবে আমি একা, বুলবুল ভাই এসেছিলেন আমাকে স্টেশনে পৌঁছে দিতে।
এনফিল্ডে যেখানে ইকবাল হুসাইন বুলবুলের বাড়ি, সেটা লন্ডনের পঞ্চম জোন বা সার্কেলের অন্তর্গত। এ অঞ্চল থেকে সেন্ট্রাল লন্ডনে পৌঁছানোর মুখ লিভারপুল স্ট্রিট স্টেশন। কথা হয় সেখানে আমি তারিকের সাথে দেখা করবো। প্রথম স্টেশন Tottenham Hale, ঐধষব, একজন বয়স্ক মানুষকে জিজ্ঞেস করি টটেনহাম হটস্পার ফুটবল দলের স্টেডিয়াম ও ক্লাব এখানে কি না? তিনি উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ, তবে আরও উত্তরে।’ রেললাইন থেকে তা দৃষ্টিগোচর হলো না। পরের স্টেশন Clapton ঝোপঝাড়, খোলা প্রান্তর, উপত্যকার মতো ঢেউখেলানো মাঠ নিয়ে মনে হবে গ্রামাঞ্চল, তবে এও বৃহত্তর লন্ডনের অন্তর্গত। Hackney Downs স্টেশনে তেমন ভিড় নেই, হাতে গোনা কয়েকজন ওঠে, নামে না প্রায় কেউ, সবাই কেন্দ্রমুখী। আমার সম্মুখে ওপাশের সিটে দু’জন আকর্ষণীয়া সুন্দরী ছোটযন্ত্র মোবাইল নিয়ে মগ্ন। তাদের একজর ইঁদুরমুখী অর্থাৎ সুঁচালো চোখমুখ, অন্যজন ঘোড়ামুখী, অর্থাৎ প্রশস্ত অবয়ব। বহুবছর আগে একবার কোথায় যেন পড়েছিলাম, বিলেতের মেয়েদের ইঁদুরমুখী এবং ঘোড়ামুখী-এ দু’ভাগে ভাগ করা যায়।
লিভারপুল স্ট্রিট বেশ বড় স্টেশন, আমার ধারণার চেয়ে ঢের বড়। চারিপাশে আধুনিক মানুষের শশব্যস্ত ছুট, মজার ব্যাপার ওই কর্মতাড়িত কোলাহলে কেউ কাউকে চেনে না, মানুষের চেয়ে ট্রেন বেশি আপন। ওই জনপ্রবাহে আমার চোখ তারিককে খুঁজতে থাকে, মোবাইলে দু’বার কথা হয়, পরে দোতলায় ওভারব্রিজের উপর তাকে আবিষ্কার করি। সে আসার আগেoyster card-এর ব্যালান্স জেনে নেই, জানতে পারি ত্রিশ মিনিটের ওই ভ্রমণে ৫.৫ পাউন্ড খরচ হয়ে গেছে। রেলস্টেশনে লন্ডন শহরের একটি ম্যাপ খুঁটিয়ে দেখি, যাতে Shoreditch, Barbican, St. Luke’s, Holborn, Clarkenwell, Newingtonপ্রভৃতি লন্ডনের বড় বড় এলাকার নাম ও লোকেশন মুদ্রিত আছে। একেবারে কেন্দ্রে অর্থাৎ জোন ১-কে বলা হয় The City। লন্ডনে আগত পর্যটকেরা ওই অঞ্চলেই বেশিরভাগ ঘুরে বেড়ায়, আমরা যে অঞ্চলে আছি তার নাম Shoreditch, সেখানেই আমরা ঘুরবো। ম্যাপে দেখলাম লন্ডনকে বিভক্ত করে সাপের মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া টেমস নদীর উপরে অনেকগুলো সেতু- টাওয়ার ব্রিজ, লন্ডন ব্রিজ, সাউথওয়াক ব্রিজ, ব্ল্যাকফ্রাইয়ার্স ব্রিজ, ওয়াটারলু ব্রিজ প্রভৃতি।
স্টেশন চত্বরেই তারিক একটি ভাস্কর্যের দিকে আমার দৃষ্টি ফেরান। The Railway Children নামের শিল্পসৃষ্টিটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান holocast থেকে বাঁচানোর জন্য যেসব ইহুদি শিশুকে ট্রেনে চড়িয়ে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের স্মরণে নির্মিত। ভাস্কর্যটি দেখে মায়া জাগে। তারিক প্রস্তাব করেছিলেন যাত্রার শুরুতেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নির্মিত একটি টানেল দেখার, আমার সাড়া না পাওয়ায় তিনি মাটির উপরে থাকাই শ্রেয় মনে করেন। লিভারপুল স্টেশনের পেছনেই একটি উঁচু চত্বরে ভেনাসের একটি বিশাল আধুনিক ভাস্কর্য, এর নাম Broadgate Venus, সমীহ ও বিস্ময় জাগায়। চারপাশে বনেদি ভিক্টোরিয়ান ভবনসমূহের মাঝে খোলা চত্বর, যেখানে সময় কাটাতে লোকজন আসে। তারিক জানালেন প্রেমপর্বে তিনিও তার হবু স্ত্রীকে নিয়ে এখানে অনেকবারই বেড়াতে এসেছেন। একটি ভবনের সিকিউরিটি গার্ড এসে বলল, ভবনটি ছেড়ে দাঁড়াতে হবে, কেননা সেটি একটি প্রাইভেট প্রপার্টি। আমরা একটু বিস্মিতই হই, কেননা সে সসয়ে বাইরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। অপমানের চেয়ে বৃষ্টি ভালো মেনে আমরা নেমে যাই। নামতেই কয়েকটি কালো পাথর খন্ডের মিলিত কোলাজে নির্মিত ঞধষশরহম Talking Ladies নামের ভাস্কর্যটি দেখি। লম্বা করে দাঁড় করিয়ে দেখা প্রস্তরখ-সমূহের লৈঙ্গিক পরিচয় পাওয়া যায় নিচের দিকে তাকালে, সেগুলোর পায়ে মেয়েদের জুতো পরানো।
এরপর দিনভর আমরা যে শিল্প নিয়ে মেতে থাকি তার নাম street art আমার জানা ছিলো না তারিকুল আলম খান এ শিল্পের একজন বোদ্ধা, তার সংগ্রহে স্ট্রিট আর্টের এক বিপুল সমাবেশ রয়েছে। যেহেতু স্ট্রিট আর্ট সড়কের দেয়ালে আঁকা হয়, সংগ্রহ মানে ক্যামেরায় তুলে নেয়া ছবি। সরডিচ ও টাওয়ার হ্যামলেট এলাকার অলিতে-গলিতে যত স্ট্রিট আর্ট রয়েছে সব তারিকের চেনা, মুখস্থ। কেবল তাই নয়, তিনি ছবিগুলোর ইতিহাস এবং এর শিল্পীদের বৃত্তান্তও জানেন। অমন শিল্পবোদ্ধা মানুষকে নিয়ে শিল্পসফরে বেরুলে যা হয়, চোখ ও মগজ ভরে ওঠে অনাবিল দৃশ্যছবিতে, অনাবিষ্কৃত রতœভান্ডার খুঁজে পাবার আনন্দে চিকচিক করে চোখ।
প্রথমেই দাঁড়াই ইতিহাসের মঞ্চে। সড়কের উপরে দেয়ালে লেখা নিম্নোক্ত কথাটি, On this site stood Curtain Theatre (1577-1599) where William Shakespeare performed Henry V, Romeo & Juliet acted on stage himself. আমার শরীর বেয়ে একটা স্রোত বয়ে যায়, যার নাম হতে পারে ইতিহাসের কম্পন। লেখাটির ঠিক উপরে রোমিও-জুলিয়েটের ছবি আঁকা। যিনি এঁকেছেন তিনি বিখ্যাত, নাম Otto Schade. পাশেই একটি কার্টুন চরিত্র, Mr. Simpson, যার বুকে তলোয়ার বাঁধা, নিচে লেখা The pencil is mightier than…। এ শিল্পীও প্রখ্যাত, এঁর নাম John Digh । আমরা যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম সেখান থেকে সুস্পষ্ট দেখা যায় ওপাশের সড়কের দেয়ালে ঠিক নয়, একটি বাড়ির বাইরের দেয়ালে, সড়ক থেকে অনেকটা উঁচুতে ছোট ছোট পঁনব দিয়ে আঁকা একটি ছবি। তারিক আমাকে জানান Invader নামের এ শিল্পীর সমস্ত ছবিই ছোট ছোট কিউব দিয়ে আঁকা, দেখলেই বোঝা যায় তাঁর ছবি। মূলধারার শিল্পীদের মতো প্রত্যেক ‘সড়ক শিল্পীর’ নিজস্ব প্যাটার্ন, থিম ও স্টাইল রয়েছে। তাঁর নাম Invader হওয়ার কারণ তিনি রাতের আঁধারে সবার অলক্ষ্যে ছবি এঁকে যান, কেউ তাকে আজতক দেখেনি। নামটিও ছদ্মনাম। সাধারণত স্ট্রিট আর্ট ক্ষণস্থায়ী, পর্যাপ্ত দেয়াল না থাকায় কিছুদিন পরপর একজনের শিল্প মুছে আরেকজন ছবি আঁকেন। তবে Otto Schade, John Digh, Invader-এরা প্রত্যেকেই শ্রদ্ধাভাজন শিল্পী হওয়ায় এদের কাজগুলো, যেমন এই তিনটি কাজ, অনেকদিন ধরে সংরক্ষিত রয়েছে। তারিক সব বৃত্তান্ত জানেন, ক্যামেরা নিয়ে তিনি এসব অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান। সংযোজন, পরিবর্তন তার শিল্পমুগ্ধ চোখে ধরা পড়ে যায়।
আজ কত যে শিল্পীর ছবি দেখি, আমার স্নায়ুকোষ এবং ক্যামেরা ভরে ওঠে জীবনে প্রথম দেখা অগনতি শিল্পীর শিল্পকর্মের সম্ভারে। তারিক তোলেন কেবল নতুন কিছু পেলে, কেননা পুরনো সব ছবিই তার সংগ্রহে আছে। একেকজন শিল্পীর আঁকার একেক স্টাইল। যেমন Vhils নামের শিল্পী ইটের দেয়াল থেকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ইটের কণা তুলে মানুষের অবয়ব ফুটিয়ে তোলেন। মজার ব্যাপার এসব মানুষ কেউ বিখ্যাত নন, সাধারণ। সাধারণ মানুষের মুখই Vhils-এর প্রিয়, বিখ্যাতরা তাকে টানেনি। অবহেলিতদের শিল্পে তুলে আনা উত্তরাধুনিক শিল্পধারার একটি বৈশিষ্ট্য। Robbo Team নামে একটি চিত্র দেখালেন তারিক। Robbo কে বলা হয় করহম King of Street Art; এটি এঁকেছেন রব্বোর ভক্ত কোনো শিল্পী। রব্বো এখন গুরুতর অসুস্থ, ছবি আঁকতে অসমর্থ। স্ট্রিট আর্ট প্রতিষ্ঠিত শিল্পকলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মতো। একে বহুকাল শিল্প বলে স্বীকৃতি দেয়নি প্রথাগত শিল্পমহল, কিন্তু এখন স্ট্রিট আর্ট স্বীকৃত শিল্প। তারিক আমাকে জানালেন স্ট্রিট আর্টের ইমেজ যেখানে পজিটিভ, সেখানে গ্রাফিতির ইমেজ কিছুটা নেগেটিভ। রেলশেডে বা স্টেশনের কিছুটা পেছনে, ট্রেন যেসব এলাকা দিয়ে স্টেশনে ঢোকে, সেসব দেয়ালে মানুষ যে নামস্বাক্ষর থেকে শুরু করে বিবিধ শব্দ, যেমন love, A+B, ছবি, শ্লোগান ইত্যাদি লিখে রেখে যায়, সেসবকে বলা হয় গ্রাফিতি। ইদানীং গ্রাফিতিও শিল্পের স্বীকৃতি পাচ্ছে। কেবল রঙে আঁকা চিত্র নয়, স্ট্রিট আর্ট বহু বিভিন্ন প্রকার ও মাধ্যমের হতে পারে। কেউ মুখোশ টাঙিয়ে রাখছে, কেউ ছোট ছোট ভাস্কর্য, কেউবা কাগজ দিয়ে তৈরি করছে ত্রিমাত্রিক শিল্প। স্ট্রিট আর্টকে উদ্দেশ্যহীন মনে হতে পারে, কিন্তু প্রতিটিরই একটি মেসেজ রয়েছে।
সড়কের উপরে একটি বেঞ্চিতে বসে তারিককে এ বছর বইমেলায় প্রকাশিত আমার ‘প্রহরের প্রস্তাবনা’ বইটি উপহার দেই। সে আমাকে অবাক করে অনেকগুলো কলম ও পেনড্রাইভ উপহার দেয়। এরপরে আমরা নিকটস্থ একটি গ্যালারিতে প্রবেশ করি। এর শিল্পী Pure Evil ছদ্মনামে ছবি আঁকেন, তাকে তারিক চেনেন। আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলে আমরা একত্রে ছবি তুলি। খুব প্রশস্ত নয়, এমন একটি স্টুডিও তার আঁকা ছবিতে ঠাসা। ছোট ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে নিচে যাই, সেখানেও ছবির স্তূপ। এ শিল্পীর আঁকা বর্তমান সিরিজটির থিম হচ্ছে ক্রন্দনরত রমণীমুখ; অনেকগুলো ছবি একই প্রকার, আমার ভালো লাগেনি। এখানেই আগে এ শিল্পীর একটি স্টুডিও ছিল, এখন স্টুডিও দুটো, অর্থাৎ একটি বেড়েছে। তারিকের মন্তব্য পসার বেড়েছে, অর্থাৎ ভালো বিক্রি হচ্ছে ছবি, নইলে সরডিচ এলাকায় দুটো স্পেস ভাড়া নিয়ে স্টুডিও বা গ্যালারি চালানো ব্যয়সাধ্য। তারিক আরও বলে, Pure Evil ও একজন স্ট্রিট আর্টিস্ট, কিন্তু সে এখন প্রথাগত শিল্পীদের মতো বাণিজ্যিক, বিদ্রোহী নন।
Andy Warhol পপ কালচারের জনক, তবে তিনি তারিকের পছন্দের শিল্পী নন। তারিকের বরং পছন্দ Bank Sy যিনি গোটা পৃথিবীতেই সুপরিচিত, অসামান্য রসবোধ আর শক্তিশালী মেসেজের জন্য। অনেকেই, যেমন তারিক নিজেই, Bank Sy কে দুনিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত স্ট্রিট আর্টিস্ট মনে করেন। স্ট্রিট আর্টিস্ট হলে কী হবে, Bank Sy র কোনো কোনো কাজ লক্ষ লক্ষ ডলারে বিক্রি হয়। একবার চোরেরা লন্ডনের দেয়ালে আঁকা তাঁর একটি চিত্রকর্ম পুরো দেয়ালসহ কেটে নিউইয়র্কে নিলামে মিলিয়ন ডলারে বিক্রির চেষ্টা চালিয়েছিল। আরেকজন শিল্পী, এর নাম Stik, লম্বা দেহের ওপর বসানো বড় গোল মাথার সরলভাবে আঁকা কার্টুনচিত্র, তার বৈশিষ্ট্য তিনি দুটি রঙে আঁকেন, প্রায়শঃই রঙ দুটি হয় সাদা ও কালো। বেশ বড় ক্যানভাসে তিনি ছবি আঁকেন, দালানের নিচ থেকে ছাদ পর্যন্ত। Noir একজন ফরাসি শিল্পী যার আঁকাআঁকির কোনো প্রথাগত শিক্ষা নেই, নিজের মতো করে মানুষের মুখ আঁকতেন বার্লিন ওয়ালে, ওই লৌহপ্রাচীরের অবরুদ্ধতা ও বিভাজনের প্রতিবাদে। বার্লিন ওয়াল ভেঙে গেলে সে দেয়ালে নিরন্তর অজস্র প্রতিবাদী মুখ আঁকা Noir বিখ্যাত হয়ে যান। তিনি একজন কমিশনড স্ট্রিট আর্টিস্ট অর্থাৎ টাকার বিনিময়ে রেস্তোরাঁ, পাব, দোকানে ছবি এঁকে দেন। এখানে একটি কফিশপের বাইরে তার আঁকা চিত্র দেখলাম। ওখানেই Ravington নামের অর্ধউন্মুক্ত পানশালার বাইরের দেয়ালে বেশ কিছু শিল্পীর কাজ, পুরো দেয়ালটিই একটি বড় ক্যানভাস, পানশালাটিকে শিল্পশালার মর্যাদা দিয়েছে। সেখানে আরেকটি দেয়ালে পাঁচটি বালকের একই ভঙ্গিতে দাঁড়ানো Don’t Shoo চিত্রটি গাজায় ইসরাইলি গণহত্যার প্রতিবাদে আঁকা। স্ট্রিট আর্টের শিল্পীরা বেশিরভাগই প্রতিবাদী, কারো প্রতিবাদ রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, কারও সামাজিক অসাম্যের বিরুদ্ধে। একটি পরিত্যক্ত কম্পাউন্ডের দেয়ালে বেশ কিছু ছবি দেখলাম, কয়েকটি দেয়াল ভাঙা, সেসবে আঁকা চিত্রগুলো ভেঙে পড়া ইটের সাথে খন্ড-বিখন্ড। একটি শিল্পবিনাশী বুলডোজার দানবকে দেখলাম, ওই প্রাঙ্গণে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণে তৎপর।
একটি বড় সড়কের পাশে চলে আসি। ওপাশটাই যে বাঙালি পাড়া ইস্ট লন্ডন, জানতাম না। এপাশে Howard Griffin নামক একটি চিত্রশালায় প্রবেশ করি। প্রবেশপথটি সরু টানেলের মতো, ভেতরে আর্ট গ্যালারিটিও তেমন বড় নয়, একটি আবদ্ধ গুদামঘর যেন। সেখানে Mehdi Ghandyanloo নামের একজন ইরানি চিত্রশিল্পীর চিত্রপ্রদর্শনী চলছিল। মেহেদির দুই ধরনের ছবি দেখতে পেলাম, বড় ক্যানভাসে আঁকা তৈলচিত্র আর ছোট ফ্রেমের ফ্রেসকো জাতীয় কাজ। তৈলচিত্রগুলোর একটিই থিম- পিপীলিকার মতো মানুষের মাথার উপরে অতিকায় সব পাথর ঝুলে আছে। জনগণের মাথার উপর চেপে বসা জগদ্দল পাথরের মতোই স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র শৈল্পিক প্রতিবাদ। ছোট ফ্রেমে তাঁর কাজ একেবারেই আলাদা, ছোট ছোট কাচের টুকরোর কোলাজ দিয়ে তৈরি মিনিয়েচার ভাস্কর্য কাচের ফ্রেমে আটকানো। তাঁর তিনটি চিত্রের একটি ভিউকার্ড সেট বিক্রি হচ্ছিল এক পাউন্ড দামে, সহজেই তা কিনি। চিত্রশালাটির ভেতর The Dog Who Changed My Life নামের বইটি দেখি, লিখেছেন John Dollan । যে শিল্পীর জীবনবৃত্তান্ত এতে অঙ্কিত তার নামও John, ঔড়যহ, জর্জ নামের পোষা কুকুরটিকে সম্মুখে রেখে তিনি লন্ডনের স্কাইলাইন, ল্যান্ডস্কেপ আঁকতেন। প্রতিটি ছবির সম্মুখভাগে কুকুরটিকেও আঁকতেন। আজ তিনি বিখ্যাত, সঙ্গে তার কুকুরটিও, ওই বই একটি প্রমাণ। Borondo নামের শিল্পীর আঁকার ধরন ও মিডিয়া একেবারেই আলাদা। তিনি প্রথমে কাচের উপর সাদা রঙ লেপ্টে দেন, পরে ব্লেড দিয়ে কেটে কেটে বের করে আনেন মানুষের অবয়ব। নিজের নামের আদ্যাক্ষর অর্থাৎ ইংরেজি বর্ণমালার দ্বিতীয় বর্ণ উল্টে রাখা এই শিল্পীকে খুব বড় মাপের মনে করেন তারিক।
আমাদের গলা শুকিয়ে এসেছিল, তৃষ্ণা মেটাতে বড় সড়কের ওপাশে যে পানশালায় ঢুকি সেখানে কাটানো সময় ছিল এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। বড় কাচের গ্লাসে দু’পাইন্ট বিয়ার নিয়ে দু’জন বসি আর কাচপাত্রে ধীরে ধীরে চুমুক দেই। পানশালাটির ভেতর বসেছিলো পাঁচজন বিস্ময়কর সুন্দরী। ঈশ্বরের নিজ হাতে গড়া, যেন তারা স্বর্গের অপ্সরী, উর্বশী বা মেনকা, এক আশ্চর্য রূপময় জগৎ তৈরি করেছিল।
রূপশালা থেকে বেরিয়ে বাঙালি পাড়া ব্রিকলেনে ঢুকি। এই সেই ব্রিকলেন যেখানে বাংলাদেশিরা কয়েক প্রজন্ম ধরে বাস করছে, যাকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন মনিকা আলী। ব্রিকলেনও স্ট্রিট আর্টিস্টদের আঁকাআঁকির এক প্রিয় জায়গা, এ সড়কের সকল শাখা-প্রশাখায় স্ট্রিট আর্ট ছড়ানো। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে যাচ্ছিল, তারিক আমাকে নিয়ে একটি ইহুদি দোকানে ঢোকেন যেখানে ফ্রোজেন গরুর মাংস স্লাইস করে কেটে রুটির ভেতর ভরে স্যান্ডউইচ বানিয়ে বিক্রি হয়। চাহিদা বেশ, আমাদের লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার কিনতে হলো। Take Away দোকানটির ভেতরে বসার ব্যবস্থা নেই, অগত্যা আমরা আহারের জন্য বেছে নেই ব্রিকলেনের শুরুর দিকটায় যে পার্কটি রয়েছে সেটি। একটি বেঞ্চিতে বসে স্ট্রিট আর্ট নিয়ে কথা বলতে বলতে স্যান্ডউইচ খাই, সম্মুখেই ট্রেন লাইন, কিছুক্ষণ পরপর ছুটে যাওয়া ট্রেন দেখি। আমাদের আলোচনার ভেতর তাদের দ্যুতি ও বৈভব নিয়ে উঁকি দেন পানশালার পাঁচ সুন্দরী। তারিক চেয়েছিলেন আমাকে নতুন খাবারের আস্বাদ দিতে, কিন্তু একটু লবণাক্ত খাবারটি তেমন উপভোগ্য হয়নি। বুঝি শিল্পে উদার হলেও খাবার-দাবারে আমি খুবই সনাতনপন্থী। ব্রিকলেনে ধীরপায়ে বিকেল নেমে আসে।
২.
ব্রিকলেন বেশ দীর্ঘ এক সড়ক, যাকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। একভাগে রয়েছে বাঙালিদের একাধিপত্য, অন্যভাগে বহুসংস্কৃতির মিশ্রণ। এই বিভাজন তৈরি করেছে ওল্ড ট্রুম্যান ব্রিউয়ারি নামের একটি মদ তৈরির কারখানা। Allan Gardenনামক পার্কে বসে ইহুদি দোকানের তৈরি সল্ট বিফ স্যান্ডউইচ খেয়ে আমি ও তারিকুল আলম খান বের হই ব্রিকলেনের স্ট্রিট আর্ট দেখতে।
ওল্ড ট্রুম্যান ব্রিউয়ারির কাছেই একটি পুরনো সংগ্রহযোগ্য সামগ্রীর (Antique) মার্কেট আছে, তারিক আমাকে তা দেখাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটি বন্ধ। এর নাম Backyard Mark (Ej)T । শপিংমলটির নামের শেষাংশের অর্থ আমি বুঝিনি। আমরা প্রথমেই আরেক বিখ্যাত স্ট্রিট আর্টিস্ট জড়ধর একটি বাড়ির একপাশের পুরো পিঠ জুড়ে আঁকা বিরাট সজারুর ছবিটি দেখি। Roa জীবজন্তুর ছবি এঁকে বিখ্যাত, সেসব ছবির জন্তুর অবয়ব বেশ জান্তব, প্রথাগত চিত্র নয়। লন্ডন অলিম্পিকের সময়ে রোয়ার আঁকা একটি বৃহদাকায় সারস পাখির ছবি কর্তৃপক্ষ কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলো, কেননা যে বৃহৎ দালানে জড়ধ ছবিটি এঁকেছিলেন তা ছিল পুরনো, শ্যাওলা ধরা ও বিবর্ণ। নগরীর সৌন্দর্য বাড়াতে নগরকর্তারা তা করেছিলেন, ঘরে অতিথি এলে গৃহস্থ যেভাবে কার্পেটের নিচে ধুলো লুকিয়ে ফেলেন ঠিক সেভাবে। মজার ব্যাপার হলো অলিম্পিক দেখতে আসা পর্যটকেরা দলে দলে এসে সেই ছবিটিই খুঁজতে থাকে, পরে তাদের দাবির মুখে কর্তৃপক্ষ সারস পাখির গা থেকে পর্দা সরিয়ে নিতে বাধ্য হন।
আমি উৎসাহ নিয়ে ব্রিকলেনের দোকানপাট দেখতে থাকি। বাঙালি নামের সব দোকানের সাইনবোর্ডে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা হরফ দেখলাম। সড়কের সরু পিঠে, রেস্টুরেন্টগুলোর আলোজ্বলা অভ্যন্তরে, বিপণিবিতানে স্বদেশী মানুষদের মুখ দেখে মনেই হবে না আপনি বিলেতে আছেন। লন্ডনে একটুকরো বাংলাদেশ এই ব্রিকলেন। বাংলাদেশীদের এই জড়োবদ্ধ হয়ে বসবাস করা, যাকে gheto বলা হয়, তারিক এর বিরোধী। তারিকের মত হলো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভেতরে ছড়িয়ে পড়তে হবে, গ্রহণ করতে হবে স্থানীয় ও বহুজাতীয় সংস্কৃতি, নইলে একঘরে হয়ে থাকতে হবে। তারিক নিজেও শ্বেতাঙ্গ পরিবেষ্টিত এলাকায় বসবাস করেন। এই ব্রিকলেন ও টাওয়ার হ্যামলেটে ইংরেজি ভালো করে না জেনেও জীবন পার করে দেয়া যায়, এমনকি প্রমিত বাংলা না জেনেও, কেননা এখানে বসবাসরত নব্বইভাগ বাংলাদেশি সিলেট অঞ্চল থেকে আগত।
আমরা পশ্চিম দিকে খুলে যাওয়া একটি লেন ধরে এগুই। Loading Bay নামক ভবনে The Art of Brick নামের প্রদর্শনী চলছিলো। এই ব্রিক হচ্ছে lego, মূলত লেগো দিয়ে তৈরি ভাস্কর্যের প্রদর্শনী। ইচ্ছে ছিলো দেখার, উচ্চ প্রবেশমূল্য (১৬ পাউন্ড) আমাদের নিবৃত্ত রাখে। সেখানে বিপণিসারির দু’পাশে যেখানেই খালি দেয়াল পেয়েছে স্ট্রিট আর্টিস্টরা সেখানেই নিজ নিজ সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখে গেছে। আমরা একটি বড় চত্বরে এসে দাঁড়াই আর মুখোমুখি হই বিভিন্ন স্ট্রিট ভাস্কর্যের। এর মাঝে সবচেয়ে দৃষ্টিগ্রাহ্য হলো একটি বাড়ির ছাদে বড় লোহার গোলকের আঘাতে বিধ্বস্ত মোটরকারের ভাস্কর্যটি। যদিও কৃত্রিম, তবু চোখে না পড়ে উপায় নেই সে শিল্পের অভিঘাত। এ চত্বরে অনেকগুলো open-air রেস্টুরেন্ট রয়েছে, আমোদিত সময় কাটানোর এক রঙ্গমঞ্চ যেন প্রস্তুত!
ব্রিকলেনের একটি আবদ্ধ সড়কের শেষপ্রান্তে অনেক শিল্পীর আঁকা ছবি রয়েছে দেখলাম। সেখানে কোনটা রেখে কোনটা দেখি অবস্থা হয় আমার। শিল্পীদের ছবির বিষয়বস্তু ও আঁকার স্টাইলের বিভিন্নতা সুস্পষ্টরূপে ধরা দেয় এমনি পাশাপাশি রাখা দেয়াল ক্যানভাসে। Misha Most-এর ছবিতে দেখা যায় পেছনে যুদ্ধের লেলিহান আগুন ও বিভীষিকা, কিন্তু মানুষ মেতে আছে কম্পিউটার গেম, ফেসবুক ইত্যাদি শিশুতোষ বিষয় নিয়ে। সে ভুলে থাকলেও যুদ্ধদানব তার পেছনেই উঁকি দিচ্ছে। Martin Ron সব ছবিতে শক্ত হেলমেট পরা শ্রমিকদের চিত্র আঁকেন। এখানে অঙ্কিত তার Queen’s Guard ছবিটি বেশ অস্বাভাবিক, কেননা রানীর সেপাই মাথায় পরে আছে শ্রমিকের হেলমেট, তার পোশাক নেই, খালি গা এবং সে দাঁড়িয়ে আছে উল্টোভাবে। Jim Vigion জাহাজ, সমুদ্র, জলোচ্ছ্বাস, সামুদ্রিক ঝড় প্রভৃতির ছবি আঁকেন, তাঁর ছবিতে গতিময়তা ফুটে ওঠে দুর্দান্ত, তাঁর তুলি সমুদ্রঝড়ের মতোই গতিশীল। আমার অনিবার্য মনে পড়ে যায় শিল্পী শাহাবুদ্দিনের ছবির কথা। এখানে শিল্পী Czen এর একটি কাজ রয়েছে। Buble নামের শিল্পী ছবি আঁকেন বিন্দু (dot) দিয়ে।
একটি জায়গায় দেখলাম রঙতুলি নয়, স্রেফ স্টিকার দিয়ে সড়ক শিল্প তৈরি করা হয়েছে। স্ট্রিট আর্টিস্টদের অনেক পাগলামি রয়েছে, যা দেখে একবার তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার স্ট্রিট আর্টকে সমাজবিরোধী কাজ বলে অভিহিত করেছিলেন। পরে প্রবল সমালোচনার মুখে তিনি তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নেন। এটা সম্ভবত বলেছিলেন স্ট্রিট আর্টিস্টদের অনুমতি ব্যতিরেকেই মানুষের বাড়ির দেয়ালে আঁকাআঁকি করার কারণে। ওই ‘দুষ্কর্ম’ একেকটি দেয়ালকে কী শিল্পসুষমায় ঢেকে দেয় তা জানে শিল্পবোদ্ধারা। দুঃখের বিষয় টনি ব্লেয়ারের মতো শিল্পবোধহীন লোকেরা এর মূল্য বোঝে না। মনে পড়লো সড়কের ওপারে ছেড়ে আসা রিভিংটন পাবের আগে, অর্থাৎ সরডিচ এলাকায় প্লাস্টিক দিয়ে বানানো একটি জটিল কাজ দেখেছিলাম। এর শিল্পী বিখ্যাত চলচ্চিত্র ঈরঃরুবহ কধহব-এর নামে নামস্বাক্ষর করেন। এখানে কিছুকাল আগে এক বালক আত্মহত্যা করেছিল। ম্যুরালটি বালকের স্মৃতির প্রতি উৎসর্গিত। এখানে দেয়ালের ভেতর বর্গাকার খুপরি বানিয়ে লাল প্লাস্টিকে মোড়ানো ছোট প্রার্থনার বেদি (যড়ষু ংযৎরহব) তৈরি করা হয়েছে, যেখানে লোকেরা এসে মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এরা ‘হরে কৃষ্ণ’র ভক্ত। একটি স্থানে দেখলাম প্রেমিক-প্রেমিকেরা তাদের প্রেমের দীর্ঘস্থায়িত্ব কামনা করে ষড়াব ষড়পশ ঝুলিয়ে রেখেছে। তারিক জানালেন, সেটাও একপ্রকার স্ট্রিট আর্ট। এসব তালার ভারে প্যারিসে একটি সেতুর ৎধরষরহম নাকি ভেঙে পড়েছিলো।
আমরা পশ্চিম পার্শ্ব হতে পুনর্বার ব্রিকলেনের সরু কোমর পেরিয়ে পূর্বদিকে প্রসারিত বাহু ধরে এগুই। সেখানে প্রথমেই চোখে পড়ে চধঁষ উড়হংসরঃয-এর দেয়ালচিত্র। তিনি আঁকেন সাম্প্রতিক সব চরিত্র (পড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু পযধৎধপঃবৎং), যেমন সম্প্রতি প্রয়াত ঝঃধৎ ঞৎবশ ছবির বিখ্যাত চরিত্র গৎ. ঝঢ়ড়পশ-এর ছবি এঁকেছেন। তার ভাষ্য উদ্ধৃত আছে ছবির সাথে, যেখানে তিনি বলেছেন, ঐঁসধহং ধৎব ভধংপরহধঃরহম। চযষবমস নামক শিল্পী নিজের কল্পনা দিয়ে বিভিন্ন চরিত্র সৃষ্টি করেন, আঁকেন এমন সব ছবি যার সাথে বাস্তবের মিল নেই। ইনিও বড় ক্যানভাস, মানে বড় দেয়াল, নিয়ে আঁকেন। তাঁর কল্পিত অদ্ভুত চরিত্রসমূহ, তাঁর আঁকার রীতি এমনই আলাদা যে তাকে সনাক্ত করতে বেগ পেতে হয় না। তারিক জানালেন আরেক শিল্পী, যার নাম ইড়ৎধহফড়, একজন সত্যিকারের বড় শিল্পী। খধঢ়রুঃড়ষধও শক্তিমান শিল্পী, তাঁর ছবিতে মানবিক গল্প ফুটে ওঠে; দারুণ নিখুঁত তাঁর ছবি।
আমরা ইষরঃু নামের পুরনো জিনিসপত্রের এক দোকানে ঢুকি। দোকানটি বিশাল, তার সংগ্রহ ভান্ডারও অপরিমেয়। কী নেই সেখানে? কমদামি পুরনো পোশাক-আশাক, জুতো, গৃহসামগ্রী, ঘর-সাজাবার উপকরণ, শিশুদের খেলনা, এন্টিকস ইত্যাদি হাজারো দ্রব্যের বিপুল সমাহার। একপাশে ারহঃধমব নামের একটি কফিশপ আছে, সেখানে পুরনো বইপত্র, ম্যাগাজিন বিক্রির জন্য রাখা। কফি খেতে খেতে কোনো একটি বই বা ম্যাগাজিন তুলে নিয়ে স্বচ্ছন্দে পড়া যায়। বহুবিভিন্ন রঙ ও ডিজাইনের গাউনের একটি কোনায় পুতুলের মতো সুন্দর এক জাপানি মেয়েকে দেখে মোহিত হই। সে একেকটি পোশাক পরে আর সম্মুখের আয়নায় ঘুরে ঘুরে নিজেকে দেখে। নিজের রূপে মুগ্ধ মেয়েটি খেয়াল করে তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি আমি। সে এত অনিন্দ্যরূপসী যে সব পোশাকেই তাকে পুতুলের মতো সুন্দর মনে হয়। স্মিত হেসে সে তার পোশাক বদলানোর খেলায় মেতে থাকে, আমিও চলৎশক্তিরহিত!
সড়কটির শেষপ্রান্তে একটি মনোলোভা রেস্টুরেন্ট আছে, সেখানে একটি দেয়ালে, ওই রেস্তোরাঁর বিপরীতে, একগুচ্ছ মহিলা শিল্পীর আঁকা ছবি রয়েছে। এদের মিলিত নাম ঋবসসব ঋরবৎপব। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদ তাদের ছবির মূল বিষয়। কিছু ছবি নতুন বলে তারিক তার ক্যামেরায় তুলে নেন। এখানে একটি চিত্রকর্ম দেখি যা দু’জন শিল্পী ঝধশর ্ ই-র মিলিত কাজ। ক্যানভাসের দু’পাশে দু’জন দুটি ছবি এঁকেছেন। তারিক জানালেন এরা এভাবেই যৌথছবি আঁকেন, আর যুক্ত থাকেন শিল্পপরিক্রমায়।
আমরা ব্রিকলেনের শিল্পসম্ভার দেখে দেখে আরেকটি বড় সড়কে এসে পড়ি। এ অঞ্চলকেই টাওয়ার হ্যামলেট বলা হয়। ওপাশের পার্কটি সুপরিচিত, নাম আলতাফ আলী পার্ক। আলতাফ আলী নামের এক নিরীহ বাঙালিকে এ পার্কে খুন করেছিল কিছু বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ। এ ঘটনায় আলোড়ন ওঠে ব্রিটেনে, পরে তার স্মৃতিতে এ পার্কের নাম রাখা হয়। এরই এক কোনায় শহীদ মিনার বানিয়েছে বাংলাদেশীরা, একুশে ফেব্রুয়ারি ছাড়াও বাঙালির বিভিন্ন উৎসব, বিশেষ দিনে এখানে মানবমেলা বসে। পার্কটি যত না পার্ক তার চেয়ে বেশি মাঠ, শহীদ মিনারের দিকটায় গাছের বড় বড় গুঁড়ি পড়ে থাকতে দেখলাম।
সন্ধ্যালগ্নে তারিক আমাকে নিয়ে ছোটেন বাংলা টিভির স্টুডিওপানে। সেখানে আমার একটি ষরাব সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ার কথা। এর আয়োজনও বন্ধু তারিকুল আলম খানের। লন্ডন অলিম্পিক মহাযজ্ঞের অত্যন্ত সন্নিকটে স্ট্রাটফোর্ডে বাংলা টিভির স্টুডিওতে যেতে আমাদের বেশ ক’বার টিউবরেল বদল করতে হয়। সে এক গোলকধাঁধা আমার জন্য। শেষ যে ট্রেনে চড়ি সেটা চালকবিহীন। বাংলা টিভির স্টুডিওতে সময়মতোই পৌঁছাই আমরা। সেখানে দেখা পাই কবি মিলটন বিশ্বাসের। তিনি কবে আমার এমবিএ ক্লাসের ছাত্র ছিলেন, আমি ভুলে গেছি, মিলটনই মনে করিয়ে দিলেন। আমার সাক্ষাৎকার নিলেন তরুণ কবি ও ছড়াকার রেজোয়ান মারুফ, শিল্পসাহিত্য বিষয়ক অনুষ্ঠানটির তিনিই উপস্থাপক। মারুফ বেশ সপ্রতিভ, তার প্রায় সকল প্রশ্নই কবিতা বিষয়ক হলেও অনিবার্যভাবে চলে আসে আমার বিলেত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। ১৫ মিনিট করে দু’টি পর্বে বিভক্ত অনুষ্ঠানটির মাঝে ৫ মিনিট বিজ্ঞাপন বিরতি ছিল। অনুষ্ঠান শেষে তারিক আমার তাারিফ করেন সপ্রতিভ সব উত্তর দেওয়ার জন্য। বাংলা টিভির পরিসর দেখে আমার অবাকই লাগলো, কত কম পরিসর, স্বল্প লোকজন ও সামান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে আজকের দিনে একটি টেলিভিশন চ্যানেল চালানো সম্ভব! আর কী বিপুল জনসম্পদ, জায়গা, যন্ত্রপাতি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে বিটিভি বছরের পর বছর কী বিরক্তিকর সব প্রোগ্রাম উপহার দিয়ে চলেছে।
আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই সেই ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আমার এক ছাত্রী রহমত আরা জেবিন তার স্বামীর সাথে লন্ডনে থাকে। ফেসবুকে আমার বিলেত আগমনের স্ট্যাটাস দেখে সে আমাকে অনুরোধ জানিয়েছিলো আমি যেন লন্ডনে এসে একবেলা হলেও তার আতিথ্য গ্রহণ করি। কম সময়ের মধ্যে সেটা করে উঠতে পারবো কিনা এই ধন্ধে থাকি। সৌভাগ্যক্রমে বাংলা টিভির স্টুডিও যে এলাকায় সেখান থেকে জেবিনের এলাকা চড়ঢ়ষধৎ খুব দূরে নয়। আমরা পুনর্বার চালকবিহীন ট্রেনে চড়ে পপলার স্টেশনে এসে নামি। জেবিনের স্বামী নয়ন এসে আমাদের নিয়ে যায়। লন্ডনে এখন জনসংখ্যার চাপেই বহুতল ভবন উঠছে নান্দনিক শোভা নিয়ে। পুরনো দিনের মতো পাথরনির্মিত নয়, এদের কাঠামো ধাতুনির্মিত, কাচ আর অ্যালুমিনিয়ামের যৌথ ব্যবহারে বাড়িগুলো চমৎকার। জেবিনরা এমনি একটি অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে থাকে। ওদের অ্যাপার্টমেন্টটি এত ঝকঝকে নতুন আর ফিটিংস এত আধুনিক যে, মনে হলো কোনো পাঁচতারা হোটেলের স্যুটে এসেছি। জেবিনের স্বামী কম্পিউটার প্রকৌশলী, সে একটি ওঞ কোম্পানিতে কাজ করছে। জেবিন নিজেও খুব ভালো ছাত্রী, কাজ খুঁজছে কিন্তু মনমতো মিলছে না। কথা ছিলো রান্না হবে বাঙালি ঘরানার, ব্যঞ্জন হবে স্বল্পসংখ্যক। রান্না বাঙালি ঘরানারই হলো, তবে ব্যঞ্জন বহুপদ, এত বেশি যে সামান্য করে নিয়েও সব পদের স্বাদ নিতে পারলাম না। ইকবাল হুসাইন বুলবুল ভাইকে অনুরোধ করি ভুঁড়িভোজনে যোগ দিতে। তিনি তখন হার্টফোর্ডশায়ারে, অনেক দূরের পথ, তবু তিনি আমার অনুরোধ রাখলেন, পাক্কা দেড় ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে চলে এলেন জেবিন-নয়ন গৃহে।
আমাদের চমৎকার আড্ডা হলো। রাত গভীর হলে জেবিন-নয়নকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিই। পথে পপলার স্টেশনে তারিককে নামিয়ে বুলবুল ভাই আমাকে নিয়ে ছোটেন এনফিল্ডের উদ্দেশ্যে। তারিকুল আলম খানকে ধন্যবাদ জানাতে ভুলি না; লন্ডনের পথে একটি অসামান্য দিন এ শিল্পবোদ্ধার সাথে কাটলো। পথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয় উদারমনা, প্রগতিশীল আদর্শের কবি মানুষটির সাথে। এসব অনাত্মীয় মানুষেরা কখন নীরবে হয়ে ওঠেন আত্মার আত্মীয়!
৩.
প্রখ্যাত সাহিত্যিকরা যে শয্যায় নিদ্রাদেবীর আনুকূল্য পেয়ে নিরুদ্বিগ্ন ঘুমিয়েছেন, আমিও গত দু’রাত সে শয্যায় নিদ্রাদেবীর আনুকূল্য পেয়ে ঘুমিয়েছি। সাধারণত অতিপ্রত্যুষেই আমার ঘুম ভাঙে, বুলবুল ভাইয়ের ছেলেরাও খুব ভোরে স্কুলে চলে যায়, যে কারণে গতকাল ওদের দেখা পাইনি। আজ পেলাম, দু’ভাই স্কুলের পোশাক পরে প্রস্তুত। বালকদ্বয় অতীব মায়াময়, কেবল তাদের বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, আচরণে ভারি নম্র তারা। ওদের মা নাস্তা তৈরি করে আনছিলেন, ছোটটি সম্মুখের বড় পর্দায় কার্টুনছবি দেখছিলো, বড়টি আমার সাথে সহজভাবে গল্প করে চলে। ওদের দেখে আমার নিজের বালকদ্বয়ের কথা মনে পড়ে, মনটা হু হু করে ওঠে; ক’দিন পরেই তাদের দেখতে পাবো, সে এক প্রশান্তি!
সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে বুলবুল আমার সঙ্গে প্রাতঃরাশে যোগ দেন। তার সাথে বিলেতের রাজনীতি, সাহিত্যচর্চ্চা, আত্মপরিচয়ের সংকট, প্রবাসী জীবন ইত্যাদি বহুবিধ বিষয়ে আলাপ হয়।
গতকাল সারাদিন ঘুরেছি তারিকুল আলম খানের সাথে। আজকের দিনটি বরাদ্দ ওসামা এস এম খানের জন্য। দুই খানের প্রথমজন আমার বন্ধু, দ্বিতীয়জন আমার ছাত্র। কাল যার বাসায় দাওয়াত খেয়েছি সেই রহমত আরা জেবিন আমার বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সময়ের ছাত্রী। তুলনায় ওসামা আগে আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর পড়িয়েছি সেই ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র, অর্থাৎ সে আমার শিক্ষকতা জীবনের প্রথম পর্বের ছাত্র। ওসামা অসাধারণ ভালো ছাত্র, যাকে পষধংং ঃড়ঢ়ঢ়বৎ বলা হয়, সে তাই। আন্ডারগ্র্যাজুয়েটে তার ঈএচঅ ৩.৯৯ (৪.০ এর মধ্যে), অর্থাৎ বীপবষষবহঃ। ওসামা এখন ইংল্যান্ডের দক্ষিণে অবস্থিত সাউদাম্পটন সোলেন্ট ইউনিভার্সিটির একটি ফ্যাকাল্টির অ্যাসোসিয়েট ডিন। যথারীতি তার সাথে দেখা করারও উৎসমুখ সেই লিভারপুল স্ট্রিট স্টেশন।
গতকালের মতোই বুলবুল ভাই আমাকে চড়হফবৎং ঊহফ স্টেশনে নিয়ে আসেন। গতকালের মতোই ড়ুংঃবৎ কার্ডে টাকা ভরে নেই, তবে এবার আর ট্রেন আসে না। গতকাল তার সুখপ্রদ বাসগৃহে ফিরে এসেছি, আজ আর সে অবকাশ নেই। চাকালাগানো সবুজ সুটকেসটি আর হাতে বহনযোগ্য কালো ব্যাগটি নিয়েই বেরুই। একটি ট্রেন আসার কথা, টিকেটঘরের পাশে অয়েস্টার কার্ড পাঞ্চ করে রেলসেতু পার হয়ে ওপাশের প্লাটফর্মে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, মাইকে ঘোষণা এলো ট্রেনটি বাতিল। এর পরের ট্রেন ১০:১৯ মিনিটে অর্থাৎ কুড়ি মিনিট পরে। অগত্যা সেটার জন্য অপেক্ষা করি, কিন্তু সেটিও বাতিল। উপায়? বুলবুল ভাই আমাকে নিয়ে ছোটেন এনফিল্ডের অন্যপার্শ্বে ঝড়ঁঃযনঁৎু নামক যে রেলস্টেশন আছে তার দিকে। এখানে অবশ্য ট্রেন বিড়ম্বনায় পড়তে হয় না। কবি ইকবাল হুসাইন বুলবুলের কাছ থেকে বিদায় নেই। বিদায়বেলা তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন, আমাকে অনেকক্ষণ বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে রাখেন। তার অসামান্য আন্তরিকতা ও প্রাণের টান আমাকে র্স্পশ করে।
লিভারপুল স্টেশনটি হয়ে উঠেছে কমলাপুর রেলস্টেশনের মতো যেখানে এলে শহরের মুখ দেখা যায়। ওসামা আগেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলো, ট্রেন বাতিল হওয়ায় আমারই দেরি হলো পৌঁছাতে। বহুবছর তাকে দেখিনি, সময়ের পরিক্রমায় প্রভূত পরিবর্তন হয়েছে তার দেহ ও অবয়বে। শুশ্রুমন্ডিত মুখখানি চিনতে হয়তো বেগ পেতে হতো, কিন্তু ট্রেন লাইন থেকে বেরুবার মুখটায় সে দাঁড়িয়েছিলো, সে-ই আমাকে সনাক্ত করলো।
যাত্রা সহজ করার জন্য ওসামা আমার হাত থেকে চাকালাগানো সবুজ সুটকেসটি তুলে নেয়। আমি কালো ব্যাগটিকে পিঠে ঝুলিয়ে নেই। পরিকল্পনামাফিক আজ আমাদের লন্ডনের জাদুঘরসমূহ ঘুরে দেখার কথা, ওসামা সে অনুরোধই রেখেছিলো। লিভারপুল স্ট্রিট স্টেশন থেকে সেন্ট্রাল লাইন ধরে আমরা চলে আসি ঐড়ষনড়ৎহ স্টেশনে, যা থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে ব্রিটিশ মিউজিয়াম। যেতে যেতে আমাদের কথা হয়। ওসামা প্রবল উৎসাহে ওর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটানো জীবনের কথা বলে, বলে ক’জন বাংলাদেশী স্কলার ছাত্রের সাথে কাটানো অমলিন দিনরাত্রির কথা। তারা ওসামার চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় হলেও বন্ধুর মতোই মিশেছে। এদের দু’জন মোহাম্মদ আকবর ও আমিরুল ইসলাম খান বিদেশের দুটো ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান, তৃতীয়জন মাহবুব মজুমদার আছেন ইজঅঈ-এ। অমর্ত্য সেন, রবার্ট সি. মর্টন প্রমুখ প্রখ্যাত নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদকে ওসামা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছে। শুনে বেশ রোমাঞ্চিত হই যখন ওসামা বলে ক্লাসে যাওয়ার পথে প্রায় প্রত্যহই জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিন্সের সাথে তার দেখা হতো। হকিন্স, নিউটনের মতোই, ক্যামব্রিজের খঁপধংরধহ চৎড়ভবংংড়ৎ ড়ভ গধঃযবসধঃরপং ছিলেন। যদিও সে সম্মাননা ছিলো আজীবনের, হকিন্স ইচ্ছে করেই পদটি ছেড়ে দেন। অক্সফোর্ডের সাথে তুলনা করতে গিয়ে ওসামা বলে অক্সফোর্ড যেখানে লিবারেল আর্টসের জন্য দুনিয়াখ্যাত, সেখানে ক্যামব্রিজের সুখ্যাতি বিজ্ঞানের জন্য। অবশ্য একথাও জুড়ে দেয় জন মেনিয়ার্ড কেইন্স ও আলফ্রেড মার্শালের মতো ডাকসাইটে অর্থনীতিবিদেরা ক্যামব্রিজের ফসল। সিডনি সাসেক্স কলেজে ওসামার একজন সহপাঠী যে কক্ষে থাকতো সে কক্ষে একসময় থাকতেন চার্লস ডারউইন। আইজ্যাক নিউটন ছিলেন বিখ্যাত ট্রিনিটি কলেজের ছাত্র। ক্যামব্রিজে তার নিজের পিএইচডি গবেষণার কথা বলতে গিয়ে ওসামা জানায় তার সুপারভাইজারের ছিল অসম্ভব গধঃয প্রীতি, যার তাগিদে দু’বছর কঠিন সব অঙ্ক ওসামাকে শিখতে হয়েছিলো। দু’বছর পরে ওসামা ওর থিসিসের ড্রাফট প্রেজেন্ট করার জন্য সুপারভাইজারের অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি তা দেননি, বরং ওসামাকে আরও অঙ্ক শেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন রাগ করে ওসামা গবেষণার কাজটি ছেড়ে দেয়। সে কাজটি যে সঠিক হয়নিÑ তা তাকে বলি। ওসামাও একমত হয়।
লন্ডনের ব্লুমসবারি এলাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ মিউজিয়াম ১৭৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। এটি প্রকান্ড, এখানে দর্শনার্থীদের ভিড়ও প্রচন্ড। বেশিরভাগই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী। জাদুঘরগুলোতে প্রবেশমূল্য নেই, সে এক সুবিধা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিলো, তার মাঝেই ওসামা আমার ছবি তুলে দেয়। আমরা য়ঁবঁব ধরে উৎসাহী ভিড়ের সাথে ভেতরে প্রবেশ করি। প্রবেশপথ প্রশস্ত হলেও মানুষের ভিড় তাকে করে তুলেছে কঠিনপ্রবেশ্য। সোজা অপর পার্শ্বের দরোজা দিয়ে বেরুলে যে খোলা চত্বর সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে দর্শনার্থীগণ, যার বেশিরভাগই কিশোর-কিশোরী, দলবেঁধে ইতিহাসের প্রতœ দেখতে এসেছে। ইতিহাস শেখার জন্য জাদুঘরের চেয়ে উৎকৃষ্ট স্থান আর কী হতে পারে? বাইশ বছর আগে এখানে যখন এসেছিলাম তখন ভেতরের চত্বরটি পুরোটাই ফাঁকা ছিলো, এখন সেখানে এক অনিন্দ্য ফড়সব নির্মিত হয়েছে। আমরা ব্যাগ নিয়েই ঘুরছিলাম, জাদুঘরের একজন কর্মী এসে সেগুলো লকারে রেখে আসতে অনুরোধ জানান। ৩ পাউন্ডের বিনিময়ে ওসামা ব্যাগ দুটো লকারে রেখে আসে। আমি থেকে যাই ব্রিটিশ মিউজিয়ামের অন্যতম আকর্ষণীয় অহপরবহঃ ঊমুঢ়ঃ অংশে। সেসময়ে ঢাকা থেকে আমাকে পাগলের মতো আমার যমজ পুত্রদের একজন প্রান্ত ফোন করে, ‘বাবা, তুমি কোথায়?’ আমার মনে পড়লো গত তিনদিন ধরে আমি রিভর সংযোগের বাইরে। দ্রুত তাকে আশ্বস্ত করি, বলি, ‘আমি ভালো আছি বাবা।’
ফিরে এসে ওসামা আমায় জানায় সারা দুনিয়া থেকে লুট করে আনা এসব প্রতœ ব্রিটিশ সরকার নাকি ফেরত দিতে শুরু করেছে। জাদুঘরের এক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করে এর সত্যতা মিললো না। ওসামাকে বলি, হ্যাঁ, লুণ্ঠন করে এনেছে সত্যি, কিন্তু এওতো সত্যি ব্রিটিশরা তা সযতেœ সংরক্ষণ করে চলেছে। নইলে হয়তো ধ্বংস হয়ে যেত অনেক পুরাকীর্তি ও সভ্যতার স্মারক। আজ মূর্খ তালেবান ও ইসলামিক স্টেটের বর্বররা যেভাবে অমূল্য ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি ধ্বংস করে চলেছে তাতে মানবজাতির ঐতিহ্য বলে কিছু থাকবে না। এখানে আছে বলেই সারা দুনিয়ার মানুষ এসে এসব দুষ্প্রাপ্য প্রতœরতœভান্ডার দেখতে পাচ্ছে। ঐতিহ্যপ্রিয় ব্রিটিশরা এসব রক্ষা করবে একথা নিশ্চিত। ব্রিটিশ মিউজিয়াম এত সুবিশাল, তার প্রতœভান্ডার এত সমৃদ্ধ যে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখতে গেলে কেবল পুরো দিন নয়, পুরো সপ্তাহ কেটে যাবে। ওসামা আমায় জানালো লন্ডনে থাকাকালীন একটি নিবেদিত সপ্তাহ সে এ জাদুঘরে কাটিয়েছিলো, ভোরে প্রবেশ করতো, রাতে বাড়ি ফিরে যেতো। মনোযোগী ছাত্রের মতো ইতিহাসের পাঠ সে নিয়েছে। আমার হাতে সময় নেই, দু’ঘণ্টার ভেতর এক দ্রুত পরিক্রমা শেষে বেরিয়ে আসি। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য সাউথ কেনসিংটনে অবস্থিত ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম। ঐড়ষনড়ৎহ থেকে পিকাডেলি লাইন ধরে যাই, প্রথমে আমরা ভুল করে জঁংংবষ ঝয়ঁধৎব চলে গিয়েছিলাম, পরে পিকাডেলি লাইন ধরি।
দুপুরের তখন পূর্ণ যৌবন, প্রভাতের মনখারাপ করে দেওয়া বৃষ্টি সরে গিয়ে আনন্দময় সোনালি রৌদ্র ফুটেছে, সাউথ কেনসিংটনকে দেখাচ্ছে অপূর্ব। লন্ডনের এ বনেদি পাড়ায় অনেকগুলো দেশের দূতাবাস অবস্থিত। ভিক্টোরিয়ান যুগে নির্মিত এখানকার অলঙ্কারিত স্থাপত্যের বনেদি ঘরবাড়ির ভাড়া আকাশচুম্বী। দুই বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টের দাম এক মিলিয়ন পাউন্ডের কাছাকাছি; হল্যান্ড পার্কে ৩/৪ বেডরুমের ফ্ল্যাটের দাম হতে পারে অবিশ্বাস্য ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন পাউন্ড। কেবল আরবের শেখরাই এসব কিনতে পারে, তারা কিনছেও। এরা আর ধনাঢ্য চীনারা লন্ডনে প্রচুর ৎবধষ বংঃধঃব কিনেছে। ওসামা বলল, ক্যামব্রিজের সেই আড্ডার একজন এখানে একটি ১০ ী ১২ বর্গফুটের স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে (সাত তলায়, লিফটবিহীন) থাকতেন। ভাড়া ৯০০ পাউন্ড, আর সেটা ২০০৩ সালের কথা।
ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে ঢোকার আগে ওসামা আমায় প্রস্তাব দেয় দুপুরের আহার সেরে নেয়ার। ক্রমাগত হাঁটাহাঁটি আর ভারি ব্যাগ বহনে ক্লান্ত শরীর স্বভাবতই ক্ষুধায় কাতর ছিলো, আমি সানন্দে রাজি হই। সে আমাকে নিয়ে যায় কাছেই একটি লেবানিজ রেস্তোরাঁয়, উদ্দেশ্য ভিনদেশী খাবারের আস্বাদ গ্রহণ। গতকালের সল্ট বিফ স্যান্ডউইচ খাবার কথা স্মরণে আসে, তবু রাজি হয়ে যাই। পরে দেখি ওসামার পছন্দ আর আমার সায় ভুল কিছু ছিলো না। রেস্তোরাঁটি বেজায় জনপ্রিয়, এর চমৎকার অভ্যন্তরভাগ ভোজনবিলাসী মানুষের আমুদে ভিড়, বেয়ারাদের কর্মব্যস্ততা, দেয়ালের অজস্র ম্যুরাল, খাবারের ঘ্রাণ ইত্যাদিতে পরিপূর্ণ। ভাবি কী বিপুল পরিমাণ খাদ্য প্রতিনিয়ত খেয়ে চলেছে মানুষ। ভেতরে ঠাঁই না পেয়ে আমরা রেস্তোরাঁটির বাইরের দেয়াল ঘেঁষে পেতে রাখা ছায়াঢাকা চেয়ার-টেবিলের একটিতে বসি। তাতে উপরিলাভ হেঁটে-চলা মানুষের প্রাণময় সারি দেখা। ওসামা আইউবির দিনগুলো স্মরণ করে আর আমার প্রশংসা করে। তাকে বলি, সে যে আজ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন, সেটা তার শিক্ষক হিসেবে আমার জন্য গর্বের বিষয়। তার ‘বিখ্যাত’ নামটি নিয়ে সে কোনো ঝামেলার মুখোমুখি হয় কি না জানতে চাইলে ওসামা জানায় একবার নিউইয়র্ক বিমানবন্দরে পুলিশি জেরা ও তল্লাশির সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। ওসামা জানালো বাংলাকে ব্রিটিশ ভাষাসমূহের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ হলো কেউ যদি বাংলায় কোনো তথ্য চায়, তবে সে তা পাবার অধিকার রাখে। একইভাবে ইসলামও ব্রিটিশ ভধরঃয-এর অন্তর্ভুক্ত। আর কেউ নয়, স্বয়ং রানী হচ্ছেন সকল ব্রিটিশ ভধরঃয এর ফবভবহফবৎ। লেবানিজ খাবার মন্দ নয়, হতে পারে ক্ষুধার আধিক্য, হতে পারে পরিবেশের প্রভাব, আমার বেশ ভালো লাগে তা। প্রথমে ডিশে যা সাজিয়ে এনেছিলো তা ছিল ধঢ়ঢ়বঃরুবৎ, পরে মেইন ডিশ এলে বুঝি প্রচুর খাবারই আমাকে খেতে হবে। বিলের পরিমাণ খাবারের সাথে পাল্লা দিয়ে উঁচু, চোখ কপালে তোলার মতই, ৩৮ পাউন্ড।
ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের বিশাল উঁচু ছাদের নিচে প্রথমেই যা থমকে দেয় তা এক অতিকায় ডাইনোসরের কঙ্কাল। এই দানবীয় জন্তুগুলো ভূ-পৃষ্ঠ হতে ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, টিকিয়ে রেখেছে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামগুলোকে, কেননা প্রতিটি প্রাকৃতিক ইতিহাসের জাদুঘরের প্রধান আকর্ষণ তারা। স্টিফান স্পিলবার্গের সিনেমার টিকেটের কাটতি আর এ ধরনের জাদুঘরের আকর্ষণ বাড়াতে ডাইনোসরদের জুড়ি নেই। নিচে হেঁটে বেড়ানো ক্ষুদ্র মানুষদের মাথার উপর অতিকায় স্বৈরাচারী রাষ্ট্রনায়কের ন্যায় সে তার ভয়ঙ্কর মুখ বাড়িয়ে রইলো। বস্তুত ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামটি ডাইনোসর শাসিত বলেই মনে হলো। একটি প্রকান্ড এলাকা তাদের জন্য বরাদ্দ, সেখানে ডাইনোসরদের যত প্রকার প্রজাতির ফসিল আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে তার সবগুলোই মানুষের আগ্রহ ও শিশুদের আতঙ্কের প্রান্তে স্থাপন করা হয়েছে। এমনকি সর্বশেষ প্রান্তে টিরানোসিরাসের যে মূর্তি স্থাপিত, তার গায়ে কৃত্রিম চামড়া লাগিয়ে পূর্ণরূপই দেওয়া হয়েছে, তাতে যান্ত্রিক লিভার, শব্দ আর বিদ্যুতের কারসাজিতে এক জীবন্ত দানবের আতঙ্ক ছড়ানোর প্রয়াস দেখলাম। তবে মজার ব্যাপার কোনো কোনো শিশু বয়স্কদের মতো নির্ভীক, আর কোনো কোনো বয়স্ক শিশুর মতোই সন্ত্রস্ত। জাদুঘরটিতে জগতের প্রায় সকল প্রাণীরই ফসিল রয়েছে, কিন্তু তাদের সবাইকে গৌণ করে রেখেছে ভূগোলে অদৃশ্য কিন্তু ইতিহাসে চঞ্চল এই দানবগুলো।
ব্রিটিশ মিউজিয়ামের মতো এখানেও ছুট লাগাতে হলো, কেননা আমাদের যেতে হবে ক্যামডেন। লন্ডনে বসবাস করা সকলের মুখেই শুনেছি এই বিশেষ জায়গাটির কথা। ওসামাও বলল। আমার প্রাণ নেচে উঠলো প্রাণহীন জগৎ ছেড়ে অতিপ্রাণ নগরের দিকে ছুটতে। ক্যামডেন হলো লন্ডনের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। লন্ডনের পর্যটক আকর্ষণীয় স্থানসমূহের মাঝে জনপ্রিয়তায় চতুর্থ ক্যামডেনে প্রতি সপ্তাহের ছুটির দিনে অন্তত এক লক্ষ ট্যুরিস্ট আসেন। এখানে বহুবর্ণ, বহুসংস্কৃতি, বহু জাতিসত্তার সম্মিলন ঘটেছে। এর দেয়ালে দেয়ালে শিল্পীদের চিত্রকলা, এর দোকানে দোকানে এন্টিকের ছড়াছড়ি, এর ছাদে ছাদে ভাস্কর্যের বিস্ময়জাগানো সমাবেশ। শিল্পমুগ্ধপ্রাণে আনন্দের ঢেউ ছড়াতে ক্যামডেনের জুড়ি মেলা ভার। যতই দেখি ততই মুগ্ধ হই, বুঝি ক্যামডেন না এলে আমার লন্ডন ভ্রমণ অসম্পূূর্ণ থেকে যেত। ওসামা আমাকে নিয়ে যায় ক্যামডেনের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান ক্যামডেন মার্কেটে। ক্যামডেন লক নামক খালের তীরে বাজারটি রহস্যের এক বিপুল ভান্ডার। সেখানে অনেক ঘোড়ার ধাতব মূর্তি দেখে আমি বিস্ময় প্রকাশ করলে ওসামা জানায় প্রায় ১০০ বছর ধরে এটি ছিলো লন্ডনে আগত ঘোড়াদের প্রধান আস্তাবল। মোটরকারহীন সেসব দিনে ইংল্যান্ডের দূর-দূরান্তের অঞ্চল থেকে পায়ে হাঁটিয়ে ঘোড়াদের রাজার শহর লন্ডনে নিয়ে আসতো ঘোড়া-ব্যবসায়ীরা। লন্ডনে এসে এই ক্যামডেনের বিশাল আস্তাবলে তাদের রাখা হতো। এখন এখানে আর কোনো জীবন্ত ঘোড়া রাখা হয় না, তবে ঘোড়াদের ভাস্কর্য রাখা হয়। সেসবে বিমুগ্ধ আমি প্রাণিজগতের অন্যতম সুদর্শন এই জন্তুকে ভাস্কররা ধাতু গড়ে কিভাবে নির্মাণ করেছেন তা দেখি। বাজারটি এন্টিক সামগ্রীতে পরিপূর্ণ, প্রতœ সংগ্রহকারীদের জন্য স্বর্গ। ওসামা আমাকে একটি ছোট স্প্যানিশ খাবার দোকানে নিয়ে যায়, ময়দাকে সরু করে অনেকটা মোটা নুডলসের মতো খাবার তেলে ভেজে চিনি মিশিয়ে তৈরি করা খাবারটির নাম ‘চুরস’। চায়ের সাথে তা উপভোগ্য হয়ে ওঠে। ওখানে অহহু ডরহবযড়ঁংব-এর একটি স্ট্যাচু রয়েছে। সম্প্রতি এই প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পী আত্মহত্যা করেছেন, তাতে তার প্রতি জনপ্রবাহের সমবেদনার মাত্রা বেড়ে গেছে অত্যধিক।
অয়েস্টার কার্ড আরও টাকা চাচ্ছে, আমি রীতিমতো বিরক্তবোধ করি। পরে বুঝতে পারি আমার যে ব্যালান্স ছিলো তা জোন ৪ পর্যন্ত কভার করে, জোন ৫ নয়, অথচ আমি প্রথম ট্রেনে চড়েছিলাম জোন ৫ থেকে। যাহোক লন্ডনের সুপ্রাচীন ও সুনিয়ন্ত্রিত আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে পৃথিবীর কোটি কোটি পর্যটকের মতো আমাকেও মুগ্ধ করে রাখে। ওসামা জানালো ১৮২৭ সালে শুরু হওয়া এই ভূগর্ভস্থ রেল পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল, সবচেয়ে সুব্যবস্থিত; সুদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে আজতক কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনা (যবধফ-ড়হ পড়ষষরংরড়হ) ঘটেনি। অনেকগুলো লাইন, প্রতিটি আলাদা রঙে চিহ্নিত, ভূগর্ভের বিভিন্ন গভীরতা দিয়ে গেছে। সবচেয়ে গভীরের লাইনটি মাটির নিচে একটি দশতলা দালানের সমান গভীর।
সন্ধ্যা হয়ে আসছিলো, আমাকে যেতে হবে দক্ষিণ লন্ডনের স্ট্রাটহ্যাম কমনে, যেখানে আমার সুদীর্ঘ জীবনের অসামান্য বন্ধু জাহিদুল ইসলাম থাকেন। লন্ডনে কাটানো এই শেষ তিনটি দিনই আমার তার বাড়িতে থাকার কথা, পূর্ব লন্ডনে কবিসংবর্ধনা, বাংলা টিভিতে সাক্ষাৎকার, তারিক ও ওসামার সাথে পূর্ব কমিটমেন্ট, কবি বুলবুলের উষ্ণ আতিথেয়তা ছেড়ে আসতে পারিনি। ওসামা আমাকে প্রায় শেষাবধি পৌঁছে দিতে আগ্রহী, আমিই তাকে নিবৃত্ত করি। তবু সে লন্ডন ব্রিজেস নামক বড় রেলস্টেশন পর্যন্ত আসে। এ স্টেশনের চত্বরে দাঁড়ালে যা চোখে পড়ে তা হলো নতুন লন্ডনের অত্যাধুনিক স্থাপত্যের সুউচ্চ স্কাইস্ক্র্যাপারগুলো। একেকটির একেক রূপ। আমাকে ট্রেনে তুলে তবেই দৃষ্টির আড়ালে চলে যায় পুরনো শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নবীন শিক্ষক মানুষটি। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করি একটি অসামান্য দিন আমাকে উপহার দেয়ার জন্য। কথা ছিলো জাহিদের ওখানে পৌঁছেই আমরা সবাই মিলে সাউথ ব্রম্বলি যাবো যেখানে আমাদের তিনজন চিকিৎসক বন্ধু ডা: জামিল শরীফ, ডা: জাহিদ আনোয়ার, ডা: নেহরিনা দেওয়ান এবং জামিলের সহধর্মিণী শারমিন আমাদের অভ্যর্থনায় এক রেস্তোরাঁয় নৈশভোজের আয়োজন করেছে। ট্রেন ছাড়ার পর আমি বুঝতে পারি ভুল ট্রেনে চড়েছি, ওসামাও এটা বোঝেনি। ট্রেন তখন অনেকদূর চলে এসেছে। আতঙ্কিত হয়ে সহযাত্রীদের পরামর্শে পরবর্তী স্টেশন এৎববহরিপয-এ নেমে পুনর্বার ফিরে আসি লন্ডন ব্রিজেস স্টেশনে। এবার আর ভুল হয়নি, সঠিক ট্রেনেই চড়ি, কিন্তু ততক্ষণে দক্ষিণ ব্রম্বলি যাবার সময় শেষ।
স্ট্রাটহাম কমনে নেমে এক শ্রীলংকান ভদ্রলোকের মোবাইল ধার করে জাহিদকে ফোন করি, কেননা ছবি তুলে তুলে আমার মোবাইলের চার্জ শেষ। বাড়ি ফিরে দীপ্তির কাছে দুঃখ প্রকাশ করি, কেননা ওরা সকলেই প্রস্তুত হয়ে ছিলো দাওয়াতে যাবার জন্য। আমার বোকামির জন্য সেটা ভেস্তে গেলো। জামিল, জাহিদ ও নেহরিনার সাথে দেখা হবার এ যাত্রায় সেই ছিল শেষ সুযোগ।
এবার বিলেত সফরে লন্ডনে আমার শেষ রাত্রি। তাকে অমলিন করে রাখতে জাহিদ আমাকে স্ট্রাটহাম কমনের একটি বিখ্যাত পাবে নিয়ে যায়। পানশালায় যা হয় পানীয়ের সাথে তুমুল আড্ডা, তাই চলে। আমাদের টেবিলে এসে যোগ দেয় একজন চল্লিশছুঁই থাই রমণী। সুরার প্রভাবে মানুষ দিলদরিয়া হয়ে যায়, সেও দিল খুলে তার জীবনের কথা আমাদের জানালো। ইউরোপ, আমেরিকা থেকে অনেক শ্বেতাঙ্গ পুরুষ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে থাইল্যান্ড থেকে, স্থানীয় নারীদের বিয়ে করে নিয়ে আসে। এসব যুগলের বয়সের পার্থক্য হয় অনেকখানি, কেননা প্রৌঢ় বয়সেই শ্বেতাঙ্গ পুরুষেরা তরুণী বা যুবতী মেয়ের সন্ধানে সেসব দেশে যায়। কেবল তরুণ বয়সের আকর্ষণ নয়, নয় কেবল দৈহিক চাহিদার পরিতৃপ্তি, পড়ন্তবেলায় সেবা করার জন্য সাথীও প্রয়োজন। এশিয়ার মেয়েরা স্বামীসেবায় অতুলনীয়, আর ইউরোপীয় মেয়েদের মতো তারা কথায় কথায় বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা ঠুকে দেয় না। বৈবাহিক সম্পর্কের প্রতি তাদের বিশ্বস্ততাও অধিক। যা হোক আমাদের পানশালার ক্ষণিকের বন্ধু অনেকটাই নড়ৎবফ, তা কাটাতেই একাকী পানশালায় আসা। তার সাথে উষ্ণ বিদায়চুম্বন বিনিময় শেষে পানপাত্রের শেষবিন্দু তরল গলাধঃকরণ করে আমি ও জাহিদ ঘরে ফিরে আসি।