নিজস্ব তারিখ সন গণনার গৌবরময় ইতিহাস খুব কম জাতির-ই আছে। বাঙালিদের রয়েছে সেই সমৃদ্ধির গৌরবগাথা ইতিহাস কালের সাক্ষী বঙ্গাব্দ। আপন মহিমায় বাঙালির বঙ্গাব্দ বহমান শৌর্যবীর্যের উজ্জ্বল স্বর্ণ শিখরে। বাঙালি হৃদয় ছাড়িয়ে আজ সারা বিশ্ববাসীর প্রাণের জোয়ারে ভাসে প্রতিটি বঙ্গাব্দের বর্ষবরণ।
অনেকের মতে বঙ্গাব্দের প্রবর্তন হয় স্বাধীন বাংলার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নৃপতি শশাঙ্কের শাসনামলে ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দে। আবার প্রচলিত মতবাদ হচ্ছে ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ মোগল বাদশা আকবরের শাসনামলে। বিষয়টি নিয়ে যত মতাদর্শই থাকুক না কেন সম্রাট আকবরের শাসনামলে ফসলি সন বঙ্গাব্দ যে নতুন মাত্রা পেয়েছিল সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। বাংলা সন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশে প্রচলিত একই সময়ে শুরু হওয়া পঞ্জিকাগুলোরই একটি ঐতিহ্যপূর্ণ পঞ্জিকা বঙ্গাব্দ।
সম্রাট আকবর দিলির সিংহাসনে আরোহণের সময় এ উপমহাদেশে অনেকগুলি সনের প্রচলন ছিল, যেমন- শকাব্দ, কলাব্দ, বিক্রমাব্দ, শালিবাহন অব্দ, সংবৎ, গুপ্তাব্দ, হষব্দি, পালাব্দ, লক্ষণ সংবদ, জালালী সন, সিকান্দার সন ইত্যাদি। এগুলো সবই ছিল আঞ্চলিক। বর্তমানে ইংরেজি সাল নামে প্রচারিত খ্রিষ্টাব্দ কিন্তু ইংরেজ জাতির ক্যালেন্ডার নয়। এটি গ্রেগারিয়ান ক্যালেন্ডার ভুক্ত খ্রিষ্টীয় সন বা খ্রিষ্টাব্দ। আমাদের এ উপমহাদেশে বর্তমানে মোটামুটি তিনটি সন বহুল প্রচলিত। খ্রিষ্টাব্দ, বঙ্গাব্দ এবং হিজরি সন।
বিক্রমাদিত্য খ্রিষ্টপূব ৫৭ হতে প্রবর্তন করেন ‘বিক্রমাব্দ’, খ্রিষ্ট জন্মের ৪ বছর পুর্ব হতে ‘খ্রিষ্টাব্দ’ প্রবর্তন করেন স্কাইথিয়ান, সম্রাট কনিষ্ক ৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রবর্তন করেন ‘শকাব্দ’, সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত ‘গুপ্তাব্দ’ প্রবর্তন করেন ৩২০ খ্রিষ্টাব্দে, ‘ত্রিপুরাব্দ’ প্রবর্তিত হয় ৬২১ খ্রিষ্টাব্দে, ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা:) ‘হিজরি’ সন প্রবর্তন করেন ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে, ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে মঘ রাজা ‘মঘি’ সন প্রবর্তন করেন ও ১১১৮ খ্রিষ্টাব্দে সেন রাজা বিজয় সেন ‘লক্ষণাব্দ’ প্রবর্তন করেন।
১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৯৬৩ হিজরিতে মোগল বাদশা আকবর মসনদে অধিষ্ঠিত হন। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে চান্দ্র বছর হিজরির পরিবর্তে একটি সৌর সাল উদ্ভাবনের লক্ষ্যে তখনকার দিনের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী নবরতœ আমীর ফতেহ উলাহ সিরাজীকে দায়িত্ব দেয়া হয় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে।
বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর প্রশাসনিক কর্মকান্ডে ব্যাপকভাবে হিজরি সন ব্যবহৃত হলেও এর বাইরে শকাব্দ, বিক্রমাব্দ, লক্ষণাব্দ প্রচলিত ছিল। বাংলা সন যখন প্রতিষ্ঠার সময় বাংলাদেশে লক্ষণাব্দ প্রচলিত ছিল। তৎকালীন সনগুলো সৌর বছরের হিসেবে প্রচলিত থাকলেও সৌর মাসের প্রচলন ছিল না। ফলে রাজস্ব কর্মকর্তা আমীর ফতেহ উলাহ সিরাজী সম্রাটের নির্দেশে সৌর মাসের প্রবর্তন করেন। তিনি শকাব্দের মাসের নামসমূহের সাথে মিল রেখে বাংলা সনে মাসের নামকরণ করেন। শকাব্দ বাংলা সনের একটি প্রাচীন নাম। আনুমানিক ৭৮ খ্রিষ্টাব্দে শাহি পালন নামক একজন রাজার স্মৃতিকে সামনে রেখে শকাব্দের প্রচলন হয়।
শকাব্দ থেকে বাংলা সনের উৎপত্তি
শকাব্দ মাস ব্যুৎপত্তি বাংলা মাস বৈশাখ বিশাখা নক্ষত্র বৈশাখ জেঠ জেঠা নক্ষত্র জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় আষাঢ়া নক্ষত্র আষাঢ় শাওন শ্রাবণ নক্ষত্র শ্রাবণ ভাঁদো ভাদ্রপদ নক্ষত্র ভাদ্র কুওয়ার আশ্বনী নক্ষত্র আশ্বিন কার্তিক কার্ত্তিক নক্ষত্র কার্তিক আঘ্য অগ্রাইহনী অগ্রহায়ণ পৌষ পুষ্য নক্ষত্র পৌষ মাঘ মঘা নক্ষত্র মাঘ ফাগুন ফাগুনী ফাল্গুন চৈত চিত্রা চৈত্র
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক তাঁর প্রবন্ধে বাংলা সন প্রবর্তনের সময় মহারাষ্ট্রের শকাব্দ পঞ্জিকা হতে মাসগুলোর নাম গ্রহণ করা হয়েছে এমন বক্তব্যে দ্বিমত পোষণ করেন এবং বাংলা মাসের নামগুলো ষোড়শ মহাজনপদের সময়ে চিহ্নিত মহাকাশের নক্ষত্রগুলো নাম থেকে নেয়া হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন।
ফতেহ উলাহ সিরাজী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, হিজরি সালের অবয়বকে ঠিক রেখে, বর্ষ গণনা ২৫৪ দিনের পরিবর্তে ৩৬৫ দিন ধার্য করে ১৫৮৫ সালে বাদশাহ আকবরের কাছে পেশ করেন। আকবর তা অনুমোদন করলে চলতি হিজরি মোতাবেক ৯৬৩ সাল থেকে বাংলা বছরের সূচনা হয়। হিজরি সালের প্রথম দিন পহেলা মহররমের বদলে বাংলা সালের সূচনা হয় পহেলা বৈশাখ থেকে। ফলে হিজরি সালের সৌররূপ বাংলা সাল ইসলামী উত্তরাধিকার ধারণ করে পথ-পরিক্রমা শুরু করে। সৈয়দ আশরাফ আলীর মতে বঙ্গাব্দ প্রচলিত হয় ১৯৮৪ সালের ১০ বা ১১ মার্চ। তবে মুনতাসীর মামুন-এর মতে ‘সম্রাট আকবর বাংলায়, বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন ১০ মার্চ ১৫৮৫ সালে (৯৯২ হিজরি ৮ রবিউল আওয়াল)। কিন্তু তা কার্যকর হয় ১৬ মার্চ।’ এই নতুই বর্ষপঞ্জিটি প্রথমে তারিখ-ই-এলাহী নামে প্রচলিত ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল আকবরের বিজয়কে মহিমান্বিত করে রাখা এবং একটি অধিকতর পদ্ধতিগত উপায়ে রাজস্ব আদায়ে সহায়তা করা। নতুন এ সালটি আকবরের রাজত্বের ঊনত্রিশতম বর্ষে প্রবর্তিত হলেও গণনা শুরু করা হয় ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ নভেম্বর হতে। কারণ এদিন তিনি দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে হিমুকে পরাজিত করে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
এর পূর্বে মুঘল সম্রাটগণ রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে হিজরি বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করতেন যা কৃষক শ্রেণির জন্য অসুবিধাজনক ছিল। চান্দ্র সৌর বর্ষের মধ্যে ১১/১২ দিনের ব্যবধান ছিল। এ কারণে ৩১ চান্দ্রবর্ষ ৩০ সৌরবর্ষের সমান ছিল। এ সময় রাজস্ব আদায় হতো চান্দ্রবর্ষ অনুযায়ী অপর দিকে ফসল সংগ্রহ হতো সৌরবর্ষ অনুযায়ী। চন্দ্রনির্ভর হিজরি বর্ষ সৌরনির্ভর বঙ্গাব্দ হতে ১১ দিন কম। তবে বাংলাবর্ষ ও গ্রেগোরিয়ান বর্ষের মধ্যে পার্থক্য খুবই কম, এ দু’টিই সৌরনির্ভর। বাংলা সনের সাথে ৫৯৩ যোগ করলে খ্রিষ্টীয় সন পাওয়া যায়।
সম্রাট আকবরের আমলে প্রতি মাসের প্রতিটি দিনের এক একটি নাম ছিল, যা স্মরণ রাখাই ছিল কষ্টসাধ্য বিষয়, আর এই স্বতন্ত্র নাম দিয়েই সারা মাসের পরিচিতি হতো। পরবর্তীকালে এক পর্তুগিজ পণ্ডিতের সহায়তায় সম্রাট শাহজাহান একক মাসকে চারভাগে ভাগ করে সাত দিনে সপ্তাহ গণনা শুরু করেন। এতে সপ্তাহের প্রতিদিনের স্বতন্ত্র নাম প্রবর্তিত ও প্রচলিত হয়। যা বর্তমানে প্রচলিত। যেহেতু আমাদের বাংলা সন সৌর মাসভিত্তিক, তাই দিন মাস এগুলি গ্রহ নক্ষত্র পুঞ্জ থেকেই গৃহীত হয়েছে। যেমন দিন রবি (সূর্য) সোম (চন্দ্র) মঙ্গল (মারস) বুধ (মারকারি) বৃহস্পতি (জুপিটার) শুক্র (ভেনাস) শনি (স্যাটার্ন) আবার লক্ষত্রপুঞ্জ থেকে মাসগুলি হচ্ছে বৈশাখ (বিশাখা) জৈষ্ঠ (জেষ্ঠা) আষাঢ় (আষাঢ়া) শ্রাবণ (শ্রবণা) ইত্যাদি। প্রথম দিকে মাসগুলি ফারওয়ারদিন, উর্দিবাহিশ, খোরদাদ, তীর, মুরদাদ, শাহারিবার, মেহের, আবান, আজার, দে, বাহমান এবং ইসফান্দ নামে পরিচিত ছিল। পাশ্চাত্য বর্ষপঞ্জির মতোই বাংলা সপ্তাহের শুরু হতো রবিবার হতে।
বাংলা সনের প্রকৃত প্রবর্তক ও সময়কাল নিয়ে রয়েছে কিছুটা মতবিরোধ। পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক লেখা হতে জানা যায়, মুঘল সম্রাট আকবরের সময় তার সভাসদ আমির ফতেউল্লা সিরাজী ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পঞ্জিকাটির প্রচলন করেছিলেন; তিনি হিজরি সন অনুযায়ী খাজনা আদায়ের অসুবিধা দূর করার জন্য চান্দ্র হিজরি বছরকে সৌর বছরে রূপান্তরিত করে বাংলা সনের জন্ম দেন, এই তথ্যটি সঠিক নয়। তিনি বাংলা সমতলে চলতি বাংলা পঞ্জিকাকে খাজনা আদায়ের বছর হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন মাত্র।
ম. ইনামুল হক-এর মতে, খ্রিষ্টীয় ৬ শতকের শেষ দশকে রাঢ়-বঙ্গে শশাঙ্ক নামক এক শক্তিশালী রাজার উত্থান হয়। শশাঙ্ক মগধের রাজা মহাসেন গুপ্তের মৃত্যুর পর (৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) গৌড় ও মগধ দখল করে নেন এবং পঞ্চ গৌড়েশ্বরের রাজাকে পরাজিত করে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। রাজা শশাঙ্ক ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান মুর্শিদাবাদের ১০ কিঃমিঃ দূরে কর্ণসুবর্ণ (বর্তমান কানসোনা) নামক স্থানে তার রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। আর এই ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দেই বাংলা পঞ্জিকার সূচনা হয়েছে।
৩৬৫ দিনে সৌরবর্ষ গণনা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড। খ্রিষ্টাব্দে অভিবর্ষের বিষয়টি থাকলে বঙ্গাব্দে চালু না থাকায় কার্যক্ষেত্রে অনেক সময় গ্রেগারিয়ান ক্যালেন্ডারে খ্রিষ্টীয় সন এবং বাংলা সৌর মাসের তারিখের বিষয়ে অসুবিধা সৃষ্টি হয়। এ ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতি ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুলাহ এবং উক্ত সভার আহ্বায়ক ছিলেন শ্রীযুক্ত তারাপদ ভট্টাচার্য্য। আরো ছিলেন বাংলা একাডেমির পরিচালক সৈয়দ আলী আহসান, অধ্যক্ষ আবুল কাশেম, শ্রীযুক্ত সতীশ চন্দ্র শিরোমনি জ্যোতিভূষণ, শ্রীযুক্ত অনিনাশ চন্দ্র জ্যোতিষ তীর্থ এবং অধ্যাপক আব্দুল হামিদ। তবে, সৈয়দ আশাফ আলী লেখা হতে জানা যায়, ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ফেব্র“য়ারি বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে মুহম্মদ শহীদুলাহর নেতৃত্বে একটি বঙ্গাব্দ সংস্কার কমিটি গঠিত হয়।
আলোচনা শেষে উক্ত সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, ১৩৭১ সনের বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতি মাস ৩১ দিনে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৩০ দিনে গণনা হবে। কিন্তু এ সিদ্ধান্তে অভিবর্ষ বা লিপইযার সম্বন্ধে মতভেদ দেখা দেয়ায় আরও আলোচনা করা হয় এবং শেষে প্রস্তাব করা হয় লিপইয়ার বা অভিবর্ষ সনের অতিরিক্ত একটি দিনকে চৈত্রমাসে যোগ না করে ফাল্গুন মাসে যোগ করা হোক। তারপর থেকেই সমস্যার জট খুলে যায়। আরো স্বীকার করা হয় যে সম্রাট আকবরের প্রচলিত ফসলি সন থেকেই বর্ষ গণনা করা হবে এবং ১৩৭১ সালের ১লা বৈশাখ থেকেই এভাবে গণনার বর্ষপঞ্জী তৈরি হবে। ১৩৭৩ সনে বাংলা একাডেমি সে মোতাবেক ক্যালেন্ডারও প্রকাশ করে। কিন্তু বাংলা একাডেমির সিদ্ধান্ত তৎকালীন সরকারের অনুমোদিত না হওয়ায় দেশের পঞ্জিকা প্রকাশে নতুন অনুসরণ অসুবিধা সৃষ্টি হয়। দেশ স্বাধীনের পর এ ধরনের অসুবিধা দূরীভূত হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১ দিনের ব্যবধানে এখনো বিদ্যমান। বাংলাদেশের ১৪ এপ্রিল এবং পশ্চিমবঙ্গে ও আসামে ১৫ এপ্রিল নববর্ষ পালন করে থাকে। ভারতের ত্রিপুরা মানপুর উড়িষ্যা, কেরালা, পাঞ্জাব, পশ্চিম বাংলা, আসাম ছাড়াও নেপাল ও শ্রীলঙ্কা বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে নববর্ষ উদযাপন করে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার যেমন- কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার ও হাইল্যান্ডে নববর্ষকে ঐতিহ্যবাহী দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়।
বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সালে বাংলা পঞ্জিকার ক্ষেত্রে শহীদুলাহ কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করে। ১৪ এপ্রিল বছর শুরুর দিন ধার্য করা হয় এবং খ্রিষ্টীয় পঞ্জিকার অধিবর্ষের বছরে ফাল্গুন মাসে একদিন যুক্ত করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
অপর দিকে ভারতেও বাংলা পঞ্জিকা সংস্কারের বেশ কয়েকবার প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। ব্রিটিশ রাজত্বের অবসানের পর সারাদেশের জন্য একটি একই প্রকার পঞ্জিকা প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ভারতীয় সরকার ১৯৫২ সালের নভেম্বরে ড. মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। সরকারের কাছে মেঘনাদ সাহা কমিটির বাংলা পঞ্জিকা (ক) নাক্ষত্রীয় পঞ্জিকার পরিবর্তে ক্রান্তীয় পঞ্জিকা চালুকরণ (খ) বছরের শুরুকরণ বৈশাখের পরিবর্তে চৈত্র থেকে (গ) চৈত্র মাস ৬-৭ দিনে দেরি করে শুরু ও (ঘ) শকাব্দকে জাতীয় পঞ্জিকা ঘোষণার সুপারিশ করেন। কিন্তু উক্ত কমিটির সুপারিশ ভারতীয় সরকার গ্রহণ করলেও ঐতিহ্যবিরোধী হওয়ায় জনপ্রিয় হয়নি। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ড. সাহা কমিটির সুপারিশ পুনর্নিরীক্ষা এবং একটি জাতীয় পঞ্জিকার উদ্দেশে ১৯৮৬ সালে ভারত সরকার আরেকটি কমিটি গঠন করে। ভারতীয় জ্যোতিষী এবং পানচাঙ পণ্ডিতদের মধ্যে একটি দৃঢ়মত এই যে, যেদিন সূর্য তার যাত্রাপথে নাক্ষত্রিক মেষরাশির প্রথম বিন্দুতে পৌঁছায় অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল জাতীয় পঞ্জিকাটির প্রথম দিন করার সুপারিশ করে।
আজকাল বাংলা নববর্ষ হিসেবে ১৪ এপ্রিল খুবই জাঁকজমক পূর্ণভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে উদযাপন করা হয়। বাঙালির নিজস্ব সক্রিয়তায় ভরা আনন্দঘন নববর্ষের প্রতিটি মুহূর্তই মনে করিয়ে দেয় এক সমৃদ্ধির গৌরবগাথা ইতিহাসের কথা।
পাকিস্তানি শাসনামলের ষাটের দশকে আইয়ুবি নিষেধের বেড়া টপকাতে ঢাকার রমনার বটমূলে ‘ছায়ানট’ আয়োজন করে বোশেখ। সেনাশাসনের প্রতিবাদে ‘উদীচী’ শিল্পগোষ্ঠী বোশেখকে কেন্দ্র করে খুঁজে নতুন প্রতিবাদের ভাষা। উদীচীর সাথে যোগ দেয় কবি-সাহিত্যিকেরা। প্রতিবাদের নতুন অধ্যায় যুক্ত করে ১৩৯৪ সালে চারুপীঠ আর যশোর ইনস্টিটিউট। পৌর পার্কের ঘেরাটোপ থেকে শহর জুড়ে শুরু হয় তাদের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।
পূর্বে চৈত্র মাসের শেষ দিনে সমস্ত খাজনা প্রদানের নিয়ম ছিল। পরদিন বৈশাখের প্রথম দিন নববর্ষে জমিদারগণ প্রজাদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করতেন। ব্যবসায়ীরা পুরাতন বছরের লেনদেনের হিসাব মিটিয়ে নতুন বছরে নতুন খাতা অর্থাৎ হালখাতা খোলার প্রধান কাজ ছিল, যা এখানো প্রচলিত আছে। এই দিনটিকে উৎসবের মত পালন করা হতো। বাড়ি বাড়ি বিশেষ খাবার তৈরি করা হতো। নতুন জামা কাপড় পরে ছেলে-মেয়েরা আনন্দ করতো। মেলা, নাচগান উপভোগ করতো। গ্রাম শহর সারাদেশ আনন্দে মুখর হয়ে উঠতো। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় গ্রাম বাংলার অনেক আনন্দময় প্রথাও এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
ইতিহাস পরিক্রমায় আজ যুক্ত হয়েছে, মঙ্গল শোভাযাত্রা, মেলা, আনন্দ উলাস আর বিনোদনের নতুন অধ্যায়। পুরাতনের স্থলে এসেছে লঙ্কা-পেঁয়াজ-টাকি মাছের ভর্তার পান্তা ভাতে এসেছে ইলিশের ভাজি। লুঙ্গি গামছার পরিবর্তে এসেছে লাল সাদার নকশি জামা কাপড়। ঢোল-তবলার পরিবর্তে এসেছে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ধুমধারাক্কার ঝনঝনানি। গ্রামের বৈশাখী উচ্ছ্বাস পৌঁছেছে শহরের গগনচুম্বী অট্টালিকায়। সব কিছুর পরেও বাঙালি হৃদয়ের যে জোয়ার আজ লক্ষ করা যায় তা সত্যি অবর্ণনীয় সুখকর।
বাঙালির মনে প্রাণে ইতিহাস ঐতিহ্যে শৌর্যবীর্যে গেঁথে আছে ৮ ফাল্গুন বা ২১ শে ফেব্র“য়ারি। কিন্তু পহেলা বৈশাখ ১৪ এপ্রিলের হওয়ায় আজ বড়ই বেমানান হয়ে পড়েছে। পহেলা বৈশাখ ১৫ এপ্রিল করা হোক- ম. ইনামুল হকের এ প্রস্তাবটির সাথে সঙ্গতি প্রকাশ করছি।