সোজা কথায় আরাধ্য দেবী বা দেবতার মূর্তিকে প্রতিমা; স্থির, নিথর, বা গতিহীন অচঞ্চল মূর্তিকে মূর্তি; আর গতিময় চঞ্চলরূপ ও অভিব্যক্তিনির্ভর মূর্তিকে ভাস্কর্য বলা যায়। প্রতিমা, মূর্তি, ভাস্কর্য সবই মূর্তি। তবে রূপভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিতি পেয়ে থাকে। প্রতিমা, মূর্তি বা ভাস্কর্য বলতে বুঝায় কোনো বস্তুর গড়নে সুন্দর রূপ সৃষ্টি করা যা তিন মাত্রার (Three dimension in general) হয়। প্রতিমা, মূর্তি বা ভাস্কর্য মাত্র একটি বস্তু হতে তৈরি হতে পারে আবার অনেকগুলি খন্ডিত বস্তুর সমন্বয়েও হতে পারে। মূর্তির ধ্যান, রূপতত্ত্ব, ততক্ষণ কৌশল, যন্ত্রচালনা প্রশিক্ষণ, পদ্ধতি, ছন্দ, তাল, ভারসাম্য, অস্থিবিদ্যা, ঘনত্ব, অনুপাত ইত্যাদি প্রয়োগের মাধ্যমে যে শিল্পকর্ম তৈরি হয় সেটিই মূর্তি, প্রতিমা বা ভাস্কর্য। বলাবাহুল্য যেহেতু প্রতিমা, মূর্তি ও ভাস্কর্য একই স্কেলে তৈরি হয়ে থাকে সেদিক থেকে প্রতিটি ভাস্কর্যের মধ্যেই প্রতিমা ও মূর্তির কাঠামো বিদ্যমান। কাজেই ভাস্কর্যকে ধরেই আলোচনায় অগ্রসর হওয়া যেতে পারে।
উল্লেখ্য, অসমতল বিন্যাসের দ্বারা কোনো স্থূল উপকরণ থেকে যখন কোনো রূপ সৃষ্টি করা হয় সেই রূপটিকেই বলা হয় মূর্তি বা ভাস্কর্য। আদিম গুহাবাসী মানুষের দ্বারা অঙ্কিত গাত্রচিত্র বা গুহাচিত্র ছাড়া প্রাচীন যুগ পর্যন্ত শিল্পকলা বলতে যে নমুনা সংগ্রহ করা গেছে তা বস্তুুতপক্ষে ভাস্কর্য, স্থাপত্য ও কারুশিল্প। সেদিক থেকে মূর্তি বা ভাস্কর্যশিল্প সভ্যতা বিকাশে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে।
শিল্পকর্মের মাধ্যম অনুযায়ী বিশ্লেষণ করে বলা হয় মূর্তি, প্রতিমা বা ভাস্কর্য একটি ত্রিমাত্রিক বস্তু, চিত্র অপেক্ষা অধিক শ্রমসাধ্য। অঙ্কিত চিত্রের চেয়ে একটি মূর্তি বা ভাস্কর্য অনেক বেশি Concrete Imagery এবং দর্শক মনে দীর্ঘ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারদর্শী। ভাস্কর্যে যে ত্রিমাত্রিক গুণ পাওয়া যায় সেটি দর্শকের মনে স্থায়ী Impact তৈরি করে। শিল্পের মাধ্যম হিসেবে ভাস্কর্য চিত্র অপেক্ষা বেশি গতিশীল এবং এর স্থায়িত্ব কয়েকগুণ বেশি। যেকোনো চিত্র আকর্ষণ সৃষ্টি করে সমতলে বা একদিকে আর ভাস্কর্যের শিল্পগুণ তিনদিকে। মূলত ভাস্কর্যের ত্রিমাত্রিকতা (Surface Values) বস্তুর গঠন ও গড়ন (Plasticity) বস্তু সদৃশ (Textural quality) প্রাণবন্ততা সবকিছুই চিত্র অপেক্ষা অনেক বেশি হয়ে থাকে। বাংলার প্রাচীন ভাস্কর্যের উপাদান ছিল পোড়ামাটি, কাঠ, পাথর, ধাতু ইত্যাদি। সাধারণভাবে এইসব উপকরণগুলো দিয়েই তৈরি হয়েছে প্রাচীন ভাস্কর্যসমূহ। আধুনিক যুগে Plastic, Fiber glass, Paper, Plastic clay ইত্যাদি নানান উপকরণ ব্যবহার করে ভাস্কর্য তৈরি করা হয়। ভাস্কর্য ত্রিমাত্রিক হয়ে থাকলেও Low relief, high relief এমন কি Curbed ও হয়ে থাকে।
সাধারণভাবে ভাস্কর্য এবং মূর্তির মধ্যে ভাবগত পার্থক্য রয়েছে। সব মূর্তিই ভাস্কর্য কিন্তু সব ভাস্কর্যই মূর্তি নয়। মূর্তি হলো কোনো বস্তুর প্রতিকৃতি, যার মধ্যে কোনো প্রকার অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটে না। কিন্তু ভাস্কর্যের বিষয়বস্তুতে অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটে। বস্তুর ভেতরের অবস্থা যখন মূর্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় অর্থাৎ যে মূর্তিতে বস্তুর ভেতরের অবস্থা বা অন্তর্নিহিত ভাব যেমন- রাগ, হাসি, হিংস্রতা, ঘৃণা, গতি, ক্ষিপ্রতা, স্থবিরতা ইত্যাদি প্রকাশ পায় তখনই সে মূর্তি ভাস্কর্য হয়ে ওঠে। প্রাচীন শিল্পকলাতে মূর্তি (Statue) এবং ভাস্কর্য (Sculpture) উভয়েরই সমাবেশ দেখা যায়। মহাস্থানগড়, নালন্দা, পাহাড়পুর, ময়নামতি, জগদল বিহারসহ সব ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধারকৃত শিল্পকর্মের মধ্যে ভাস্কর্যের (Sculpture) সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এসব দেবতা বা প্রতিমা মূর্তিও বটে। পাহাড়পুরে প্রাপ্ত মূর্তিসমূহের অধিকাংশ দেয়াল গাত্রের সোভাবর্ধনের নিমিত্তে তৈরি করা হয়েছিল বলে অনুমান করা যায়। যেহেতু এগুলো নিয়মিত অর্চনা হতো না সেহেতু এসব মূর্তির পৃষ্ঠপট ও শিরশ্চক্রেরও প্রয়োজন পড়তো না। নিয়মিত পূজা অর্চনার জন্য প্রতিমার পেছনে চালি এবং শিরশ্চক্র তৈরি করা হতো যা মূর্তির সোভাবর্ধনে সহায়ক হতো।
পাহাড়পুরসহ প্রাচীন বাংলার বেশির ভাগ ভাস্কর্য তৈরি হয়েছিল মাটি, কাঠ, ধাতু ও কালো কষ্টি পাথর দিয়ে। মাটি ও কাঠ দিয়ে তৈরি ভাস্কর্য তেমন একটা পাওয়া না গেলেও পাথরের ভাস্কর্য উদ্ধার করা হয়েছে প্রচুর পরিমাণে। অষ্টধাতু, কাঠ, পোড়ামাটি, সোনা, রূপার ভাস্কর্যও অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়। তবে প্রাচীন শিল্পকলাতে অন্যান্য শিল্পকর্ম থেকে ভাস্কর্যই একটি স্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল এবং পাথরের ভাস্কর্য দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল।
মোটিফ বা বিষয়বস্তু এবং শিল্পশৈীলর দিক দিয়ে বিবেচনা করলে প্রাচীন ভাস্কর্যগুলোকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। এক. লোক-ভাস্কর্য, দুই. অভিজাত ভাস্কর্য, তিন. এ দুইয়ের মাঝামাঝি।
পাথরের তৈরি অল্পকিছু ও পোড়ামাটির সমস্ত ফলকগুলো লোক ভাস্কর্যের পর্যায়ে পড়ে। পাথর দ্বারা নির্মিত কিছু ভাস্কর্য রয়েছে যেগুলো গুপ্তযুগের ধারাবাহিকতাকে ধারণ করে পালশিল্পরূপ পরিগ্রহ করেছে, যা দ্বিতীয় পর্যায়ের ভাস্কর্যশিল্প বলে অভিহিত হয়। এই শিল্পকর্মগুলো খানিকটা উন্নত ধরনের। এই দুই ধরন ভাস্কর্যের মাঝামাঝি কিছু শিল্পকর্ম রয়েছে যা শিল্প নৈপুণ্যের দিক দিয়ে অত্যন্ত দুর্বল। তবে সেগুলোকেও ভাস্কর্য বলা হয়।
প্রাচীন বাংলার ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য শিল্পীগণ কিছু কিছু কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন। সেসব কৌশল প্রয়োগ করেই তৈরি হয়েছিল ভাস্কর্যগুলো। সে সময়ে ভাস্কর্য তৈরি করতে গিয়ে শিল্পীদের মনগড়া কোনো সিদ্ধান্ত আমলে নেয়া হয়নি। শিল্পসামগ্রী তৈরির পূর্বে শিল্পীগণকে রীতিমতো শিল্পশাস্ত্র অধ্যয়ন করতে হয়েছে অথবা যেকোনো ভাবেই সেই শিল্পশাস্ত্রের জ্ঞান আয়ত্ত করতে হয়েছে। ভারতবর্ষের শিল্পীদের জন্য শুক্রনীতি (শিল্প আইন) ও শিল্প সম্পর্কিত সমস্ত বই-পুস্তকে কলাশিল্প নিয়ন্ত্রণের যে সকল সূক্ষ্ম ও কঠোর নিয়ম আছে তার বাইরে শিল্পীর স্বেচ্ছাচারিতার বিন্দুমাত্র সুযোগ ছিল না। তবে দেবতামূর্তি বা দেবতাচিত্র ব্যতীত অন্যান্য শিল্পকর্মের ব্যাপারে এই নিয়ম শিথিলযোগ্য ছিল। দেবতাদের ভাস্কর্য বা মূর্তি তৈরিতে ভাস্করদের স্বেচ্ছাচারিতা কোনো ভাবেই বরদাস্ত করা হতো না। আর ভাস্করগণও সে নিয়মকে অবজ্ঞা করতেন না। কাজেই ভাস্কর্য বিদ্যা অনুশীলন করার পূর্বেই ‘শিল্পীকে শাস্ত্রীয় বিধান, মূতির্র ধ্যান, রূপতত্ত্ব ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার পর ততক্ষণ বিদ্যার কলাকৌশল এবং যন্ত্র পরিচালনা আয়ত্ত করতে হতো’। সে জন্য শিল্পীকে শিল্পকর্মের ছন্দ(rhythm), ভারসাম্য (balance), অস্থিদ্যিা (anatomy), ঘনত্ব বা ওজন (modeling), অনুপাত (proportion) ইত্যাদি মূলনীতি সমূহ মেনে কাজ করতে হয়। এটিই ভারতশিল্পের রীতি। ভারত শিল্পশাস্ত্র অনুযায়ী বিষয় ও পদ্ধতিতে প্রাচীন বাংলার ভাস্কর্যের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। যেমন- দেহকান্ড, পূর্ণদেহ, মুখোশ, জন্তুসদৃশ। পদ্ধতি হচ্ছে মডেলিং, কার্ভিং ও মিশ্র। আর উপাদান বা উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মাটি, কাঠ, পাথর, মেটাল বা ধাতু ও ধাতুমিশ্রণ ইত্যাদি। প্রকৃতি অনুসারে প্রাচীন বাংলার ভাস্কর্য দুই প্রকৃতির দেখা যায়। ক. নীরব বা অচঞ্চল, খ. গতিময়।
অচঞ্চল বা ধ্যান মূর্তিগুলো হলো ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, বুদ্ধ এবং অধিকাংশ দেবিমূর্তিই অচঞ্চল হয়ে থাকে। আবার বুদ্ধমূর্তিও অচঞ্চল শান্ত স্বভাবের হয়ে থাকে। যেমন উমামহেশ্বর, গনেশ, জননী ইত্যাদি।
গতিময় মূর্তি হলো- নৃত্যরত শিব অথবা মহিষাসুর মর্দিনী কালীয় দমনে শিশুকৃঞ্চ । এগুলির স্বভাব গতিময়। ভারতশিল্পশাস্ত্রে মূর্তি নির্মাণের লক্ষণাদির উল্লেখ করা হয়েছে। শিল্পগ্রন্থ ‘অগ্নিপুরাণে’ উল্লেখিত হয়েছে যে ভাস্কর তার ধারণাকৃত মূর্তির লক্ষণ ও ভাব ব্যঞ্জনা ভাস্কর্য নির্মাণে প্রস্তুত হওয়ার পূর্বেই শুদ্ধচিত্তে ধ্যানস্থ হয়ে অনুধাবন করবে। সে কারণেই শিল্পগ্রন্থে ভাস্কর্য নির্মাণকে অন্যতম যোগাচার বলা হতো। সমভঙ্গ বা সমপদ, আভঙ্গ, ত্রিভঙ্গ এবং অতিভঙ্গ এ রকম যে কোনো একটি ভঙ্গ মূর্তিমাত্রেই হতে হবে। মূর্তি বা ভাস্কর্য কল্পনার সময় দন্ডায়মান মূর্তির অঙ্গগুলোর প্রয়োগ যেমন বিশেষভাবে হবে তেমনি উপবিষ্ট ভাস্কর্যেরও আসন বিন্যাস, হস্তমুদ্রাসহ মূর্তির কোমর থেকে পা পর্যন্ত বস্ত্রাবৃত ও নানান প্রকার অলঙ্কার সজ্জিত থাকা শাস্ত্রের বিধান মতো হবে। বিশেষ ধ্যানী মূর্তি ব্যতীত বৃদ্ধের আকৃতি দিয়ে কোনো দেবতার মূর্তি নির্মাণ করা শাস্ত্রবিরুদ্ধ। মূর্তির প্রতিটি অঙ্গ নিটল ও মসৃণ হতে হবে যা শাস্ত্রীয় নিয়ম হিসেবে পরিচিত। পদ্মাসন, ভদ্রাসন, বজ্রাসন, বীরাসন, ললিতাসন এবং হস্তমুদ্রার নীরব ভাষায় মনের ভাব প্রকাশও ভারতীয় ঘরানার বৈশিষ্ট্য যা পৃথিবীর অন্যকোনো শিল্পকলায় প্রদর্শিত হয়নি।
শুক্রনীতি গ্রন্থে বলা হয়েছে সব মূর্তির চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ধ্যানযোগের সহায়তা করা। অতএব শিল্পীকে ধ্যানমগ্ন হতে হবে। ভারতীয় ভাস্কর্যশিল্পে হাত ও হাতের আঙ্গুলি বিন্যাস বা মুদ্রার দ্বারা ভাব ব্যঞ্জনা প্রকাশ করা হয়। দক্ষিণী মূর্তিশিল্পে হাতের বিন্যাসকে বলা হয় হস্ত এবং ভারতবর্ষের সবখানে হাতের আঙ্গুলি বিন্যাসকে বলা হয় মুদ্রা। লতাহস্ত, কটিহস্ত, গজহস্ত, অলিঙ্গহস্ত ইত্যাদি হচ্ছে হাতের মুদ্রা। মনের ভাব যেমন অভয়, বিস্ময়, কটক ইত্যাদি ভাব প্রকাশের নিমিত্তে হাতের আঙ্গুলি বিন্যাসকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ভাস্কর্য ভিন্নে অলংকারেরও পার্থক্য করে দেয়া হয়েছে শিল্পশাস্ত্রে। ফিগার কম্পোজ করার সময় পূরুষ মূর্তির সঙ্গে যদি নারী মূর্তি করা হয় তবে নারী মূর্তিকে পূরুষ মূর্তির চেয়ে এক তাল ছোট করে তৈরি করার বিধান রয়েছে। ভারতীয় শিল্পশাস্ত্রের সকল বিধানকে সম্মান দেখিয়ে ভাস্করগণ সকল দেব-দেবির প্রতিকৃতি নির্মাণ করেছেন। উদ্ধার হওয়া প্রতিকৃতিগুলো সে কথাই বার বার প্রমাণ করে। কাজেই প্রাচীন বাংলার শিল্পকলা ছিল শিল্পীগণের সাধনার ফল। এই সাধনার রসদ জুগিয়েছে শিল্পবিদ্যার মূল্যবান গ্রন্থসমূহ।
শিল্পকলার অন্তর্গত স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্র এই তিনটি শিল্পশাখার যেসব শিল্পগ্রন্থ পাওয়া যায় তার মধ্যে স্থাপত্য বিদ্যার জন্য ‘মানসার’, ‘ময়মত’ ও শিল্পরতœ প্রসিদ্ধ। চিত্র বিদ্যার জন্য ‘চিত্রার্ণব’, ‘মূলস্তম্ভ নির্ণয়’, ‘সারস্বতীয়ম’, ‘বিষ্ণুধর্মোত্তর’ উল্লেখযোগ্য। ভাস্কর্যের জন্য ‘কাশ্যপীর’ ‘শুক্রনীতি’ ইত্যাদি শিল্পশাস্ত্রের অতীব প্রামাণ্য গ্রন্থ।
প্রাচীন বাংলায় শিল্পকর্ম করা একটি পেশা হিসেবে মর্যাদা পায়। অর্থাৎ জীবিকা নির্বাহের উপায় হচ্ছে শিল্পী হওয়া। ধনী ও অভিজাত শ্রেণীর অনুগ্রহ এবং পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্পীগণ শিল্পকর্ম করে থাকতেন। সেজন্য সমাজের উচ্চশ্রেণীর মনোরঞ্জনের দিকে বেশি নজর রাখতেন তারা। কিন্তু শিল্পবস্তু তোষামোদী বা আদিষ্টের বস্তু নয়। শিল্পকর্ম শিল্পীর মন থেকেই হওয়া উচিত। কিন্তু প্রাচীন বাংলার শিল্পীগণ সে স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারতেন না। বিশেষ করে পাথর ও ধাতুর মূর্তি নির্মাণে শিল্পীগণের নিজস্ব কোনো চেতনা কাজ করতো না। কারণ পাথর ও মেটাল বা ধাতুর ভাস্কর্য নির্মাণ ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ধনসম্পদ অর্থবিত্তে প্রাচুর্য সম্পন্ন ব্যক্তিরা পাথর ও ধাতুর মূর্তি নির্মাণ করে নিতেন। আর সেজন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের খেয়াল-খুশি, মেজাজ-মর্জির ওপর শিল্পীদের মূর্তি নির্মাণ নির্ভর করতো। এতে ইচ্ছে মতো শিল্পকর্ম করার স্বাধীনতা শিল্পীগণের ছিল না। এসময় শিল্পের শৈল্পিকীকরণ অপেক্ষা ধর্মনিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেয়া ছিল একজন শিল্পীর একনিষ্ঠ কর্তব্য। তবুও উদ্ধার হওয়া প্রাচীন বাংলার শিল্পকর্মগুলো শিল্পগুণে অনন্য।
ভাস্কর্য শিল্প আদিতে যে উদ্দেশে তৈরি করা হতো সে মোটিফ পরবর্তীতে আর স্থির থাকে নি। অর্থাৎ শিল্পের শুরুতে শিল্পের মোটিফ ছিল আদিম মানুষদের জাদুবিশ্বাস বা জীবিকা কিংবা জীবন ধারনের উদ্দেশ্যে পশুপ্রাণীকে হত্যা করে মাংস সংগ্রহ করা। সে কারণে শিকার উপযুক্ত প্রাণীর ছবি এঁকে বা মূর্তি তৈরি করে তাতে জাদু-মন্ত্র বা বাণ মেরে শিকারকে আয়ত্তের মধ্যে আনা। সময়ের ব্যবধানে মানুষ কৃষিকাজ শিখে নিল এবং কৃষিপণ্য উৎপাদন করতে শিখলো, তখন শিল্পকলার মোটিফ হতে লাগলো ধর্ম। বর্তমানে ভাস্কর্যের বিষয় বিচিত্র। আবিষ্কৃত প্রাচীন বাংলার শিল্পকর্মসমূহের মোটিফ দেখা যায় ধর্মবিশ্বাস। উদ্ধার হওয়া মূর্তিসমূহ নন্দনতাত্ত্বিক আঙ্গিকে একান্তভাবে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মমত থেকে সৃষ্টি। ধর্মীয় দেব-দেবির মোটিফ ছাড়াও রয়েছে রাক্ষস-দৈত্য, মিথুন, শারীরিক নানান ধরনের ক্রিয়া, সমাজজীবনের নানাবিধ ঘটনা, পৌরাণিক গল্প-উপাখ্যানের বিষয় ভিত্তিক মূর্তি, মাতৃকা মূর্তি, নৃত্যরত নারী, বাদক ইত্যাদি। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মমতের মোটিফ মতের মূর্তি প্রজ্ঞাপারমিতা, পদ্মপাণি, অবলোকিতেশ্বর, বুদ্ধ, উমামহেশ্বর, বোধীসত্য, মঞ্জুশ্রী, তারা ইত্যাদি। ব্রাহ্মণ্য ও হিন্দু উভয় সমাজেই স্বীকৃত এমন সব মূর্তির মধ্যে রয়েছে যক্ষ-যক্ষিনী, বিষ্ণুমূর্তি। হিন্দু বা ব্রাহ্মণ্যবাদী মূর্তির মোটিফ হচ্ছে- শিব, গণেশ, কার্তিক, মনসা, সরস্বতী, গঙ্গা, লক্ষ্মী, কালি, চন্ডী, দুর্গা ইত্যাদি। এসব মূর্তিকে প্রতিমা রূপে গ্রহণ করা হয়। দেবতার বাহন মোটিফ হচ্ছে- ঘোড়া, ইঁদুর, ময়ূর, হাস, হনুমান, শূকর, গাধা, মেষ ইত্যাদি। আছে পদ্মসহ বিভিন্ন ফুলের মোটিফ। এ রূপ নানান ধরনের মোটিফে আবিষ্কৃত প্রাচীন বাংলার ভাস্কর্য ও মূর্তির সমাজ ও শিল্পতাৎপর্য প্রণিধানযোগ্য হয়ে ওঠে যা ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ। এই বিশ্বাস থেকে পরবর্তীকালে একাত্মবাদে উত্তরণ ঘটেছে বাংলার অধিকাংশ মানুষের।
তথ্যসূত্র:
১. কল্যাণকুমার গঙ্গোপাধ্যায়, বাংলার ভাস্কর্য, কলকাতা: সুবর্ণরেখা, ১৯৮৬।
২. দীনেশচন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, (প্রথম খন্ড), কলকাতা দে‘জ পাবলিশিং, ১৯৩৫।
৩. নির্ম্মলকুমার ঘোষ, ভারত শিল্প, কলিকাতা : ফার্মা কে এল এম প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৯৫।
৪. নির্মাল্য নাগ, শিল্প চেতনা, কলকাতা: ২০ কেশব সেন স্ট্রিট, তা.বি.।
৫. নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালির ইতিহাস, (আদিপর্ব), কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৩৫৬ বাং।
৬. মনীন্দ্রভূষণ গুপ্ত, শিল্পে ভারত ও বহির্ভারত, (দ্বিতীয় খন্ড), কলিকাতা : পশ্চিম বঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, ১৯৮২।
৭. রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ), কলকাতা : জেনারেল পিন্টার অ্যান্ড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৯৮।
৮. শ্রী কৃষ্ণলাল দাস, শিল্প ও শিল্পী, কলিকাতা : পশ্চিম বঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, ১৯৮২।
৯. সরসীকুমার সরস্বতী, পাল যুগের চিত্রকলা, কলিকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৭৮।
১০. ভিক্ষু সুনীথানন্দ, বাংলাদেশের বৌদ্ধ ভাস্কর্য (খ্রিষ্টীয় ৪র্থ হতে ১২ শতক), ঢাকা : এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ১৯৯৯।
১১. ড. মোস্তফা শরীফ আনোয়ার, “বাংলাদেশের ভাস্কর্যের ঐতিহাসিক পটভূমি”