বাংলাসাহিত্য আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র আলাউদ্দীন আল আজাদ (৬ মে ১৯৩২ – ৩ জুলাই ২০০৯)। গ্রামীণ জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও বেঁচে থাকার চিরন্তন, নিরন্তর সংগ্রাম, নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া, প্রেম-ভালোবাসা, তা থেকে উদ্ভুত সমস্যা, নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি বিবিধ বিষয় উঠে এসেছে তাঁর বিভিন্ন গল্পের বিষয় হিসেবে। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর সফল পদচারণা থাকলেও তিনি অধিক পরিচিত ছোট গল্পকার হিসেবে। গ্রামের অভিজাত বনেদি পরিবারে তাঁর জন্ম হলেও আর্থিক অসচ্ছলতা সার্বক্ষণিক তাঁর সঙ্গী ছিলো। মাত্র দেড় বছর বয়সে মা এবং দশ বছর বয়সে বাবাকে হারান। তখন থেকেই তাঁর একাকী জীবন। তাই জীবনের অভিজ্ঞতার কথাগুলোই তাঁর প্রথম দিককার গল্পগুলোর বিষয়বস্তু। এবং উত্তরকালের গল্পগুলোতে নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের বিভিন্ন দিক। যে সাহিত্যিক পরিবেশে তিনি আমাদের সাহিত্যক্ষেত্রে প্রবেশ করেন তা উল্লেখ করা দরকার। তিনি শওকত ওসমান, আবু ইসহাক, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আবু রুশদ, শামসুদ্দীন, আবুল কালাম, শাহেদ আলী, সরকার জয়েনউদ্দীন প্রমুখের প্রায় কাছাকাছি সময় কথাসাহিত্য চর্চা শুরু করেন। ১৯২৩ সালে ‘কল্লোল’ পত্রিকা প্রকাশনা সূত্রে ‘কল্লোল’ যুগের সূচনা হয়। এ সময় ‘প্রগতি (১৯২৭), শনিবারের চিঠি (১৯২৪), কালি কলম (১৯২৪), বিচিত্রা (১৯২৭), পরিচয় (১৯৩১), পূর্বাশা (১৯৩২), কবিতা (১৯৩৫) ইত্যাদি পত্রিকার প্রকাশ, রবীন্দ্র পরবর্তী আধুনিক কবিদের উত্থান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বোত্তর পাশ্চাত্য সাহিত্যের অভিঘাতে বাঙালির জীবনবোধ ও সাহিত্য চেতনায় একটা বড় পরিবর্তন ঘটে। এই সময়ের সাহিত্যকে তাই ‘কল্লোল যুগের সাহিত্য’ বলা হয়। এবং এ সময়ের লেখকগণ ‘কল্লোলগোষ্ঠী’ নামে পরিচিত। কল্লোলের সাধনা ছিল নবীনতা সব বাধার বিরুদ্ধে নির্ধারিত বিদ্রোহ, সমাজের দুর্বল ভিত্তিকে সমূলে উৎখাতের আন্দোলন। ‘কল্লোলগোষ্ঠী’ আমাদের সাহিত্যে যে বিষয়বৈচিত্র্য, অঙ্কিত প্রকরণ, ভাষাবিন্যাস ও আন্তর্জাতিক ভাবচিন্তার সমন্বয় ঘটিয়েছিলো তাঁর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তাছাড়া রুশ বিপ্লব (১৯১৭) এর প্রভাব ও বাংলাসাহিত্যে বিশেষভাবে পড়ে। কল্লোলযুগের অন্যান্য লেখকের মতো আল আজাদও এ প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। এবং সমাজতান্ত্রিক চেতনা ও উত্তালবিক্ষুব্ধ সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে নাড়া দিয়েছিলো। ’৪৩ এর দুর্ভিক্ষ, ’৪৬ এর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ’৪৭ এর দেশভাগ তাঁর মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া জাগায়। তাঁর প্রথম দিককার গল্পগুলোতে এর প্রভাব লক্ষ করা যায়।
আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন, ‘আলাউদ্দীন আল আজাদ প্রথম গল্পকার, যিনি অতি অল্প বয়সে খ্যাতি অর্জন করেন।’ সমাজতন্ত্র ও শ্রেণিচেতনা তাঁর গল্পের প্রধান বিষয়। মানুষকে দেখার যে চক্ষু ও তাকে বিশ্লেষণের যে অভিপ্রায় তা তাঁর গল্পগুলোতে ঘুরে ফিরে পাওয়া যায়।
পঞ্চাশ দশকে আমাদের সাহিত্য শিল্পীরা সম্মিলিতভাবে সাহিত্য স্রোত নির্মাণ করেছিলেন, তা ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী চেতনাসমৃদ্ধ, আলাউদ্দীন আল আজাদ এই চেতনা স্রোতে মনীষাদীপ্ত পদক্ষেপ রেখেছিলেন, বিশেষত কথাসাহিত্যে।
ব্যক্তিজীবনের বিশেষত শৈশবের দুঃখ, কষ্ট, সংগ্রাম, বিশেষ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বিচিত্র ঘটনার হাজারো গল্পে ভরা ছিলো। এই পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক আবহের কারণে অতি অল্প বয়সে আলাউদ্দীন আল আজাদ সাহিত্য ভুবনের অভিযাত্রী হন। তিনি নিজে বলেন, ‘আমার কিশোর হাতের সবুজ কলম থেকে আমার ছোটগল্পের জন্ম।’ (শ্রেষ্ঠ গল্প ভূমিকা) ‘আমার সাহিত্যজীবনের গোড়া থেকে আঙ্গিক ও প্রকাশ বৈচিত্র্যের মায়াজালে ধরা পড়েছি, সেখানে ছোটগল্প আমার স্থির ভালোবাসা। ছোটগল্প আমার বিকল মেধাবী রক্তধারা।’ (নির্বাচিত গল্প, কৈফিয়ৎ)। তাঁর এই স্বীকারোক্তি থেকে প্রকৃতি অবলোকন পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ থেকে, সমাজ সংগঠনের রূপ জেনেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে।
তাঁর ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন, পারিপার্শ্বিক জীবনের প্রতিরূপ তাঁর গল্পের মধ্যে স্পষ্টতই খুঁজে পাওয়া যায়। এবার আসি তাঁর গল্প আলোচনায়।
আলাউদ্দীন আল আজাদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অন্যতম একটি গল্প ‘সুন্দরী, সুন্দরী’। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের কিছুকাল পূর্বে রচিত গল্পটিতে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার চিত্র পাওয়া যায়। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সত্তর বছর বয়সী এক বুড়ি। এক কালে যার নাম ছিল ‘বুচি’। সময়ের স্রোতে সে নাম হারিয়ে গেছে। তার বাবা ছিল জাত চাষি এবং সাহসী। সেবার অকাল বৃষ্টিতে জমি জমা সব ভেসে যায়। ইচ্ছা থাকলেও মহাজনের খাজনা দিতে পারেনি কিন্তু মহাজন সে কথা মানতে চাইলো না। একদিন কাছারি থেকে পাইক পেয়াদা এসে ঢোল বাজিয়ে জমিজমা নিলাম ডেকে চলে গেল। তিনি এ অন্যায় সহ্য করলেন না। একটা বাঁশ নিয়ে ছুটে গেলেন। কিন্তু তারা ছিলো সংখ্যায় ভারী। সাতজন জোয়ান মানুষ দিয়ে তার বুকের উপর চাপা দিল। সেই ধাক্কা সহ্য করতে পারলেন না। তিনি মারা গেলেন। সুন্দরীর এসব কথা মনে পড়ে। সে বুড়ো বয়সে দেখল গ্রামের মানুষ খাজনা দিতে না পারায় জমিদার আবার পুলিশ পাঠায়। তারা তাঁবু ফেলে গ্রামের মানুষকে রাতের অন্ধকারে ধরবে, কঠিন শাস্তি দেবে। কিন্তু তাদের গোপন কথা সুন্দরী শুনে ফেলে। সে গ্রামবাসীকে দূরে পাঠিয়ে দেয় এবং নিজে ঘরে শুয়ে থাকে। পুলিশ তার ঘরের বেড়া ভেঙে প্রবেশ করলে সে দায়ের কোপ মারে। মহাজনের চামচা শ্রেণির লোক বলে ‘সুন্দরীই সকল কিছুর মূল।’ এর কারণেই গ্রামবাসী খাজনা দেয়নি। সুন্দরী সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিল। তার অন্যতম কারণ সে চেয়েছিল বিদ্রোহ করতে। বাপের মৃত্যুর প্রতিশোধ সে নিতে চেয়েছিল। তার এই বিদ্রোহ ছিল জমিদারদের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। বাংলার মানুষ চিরকালই শ্রেণিবিন্যাস ও ইংরেজ শাসন- শোষণের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন করেছে। দেশকে জাগিয়ে তুলেছে। এখানে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
‘কাঠের নকশা’ (১৯৪৭) গল্পটিও তাঁর প্রতিবাদী চিত্তের সৃষ্টি। এখানে যেমন পাওয়া যায় নিম্নশ্রেণির মানুষের জীবন, দুঃখ, দুর্দশা, স্নেহ-ভালোবাসা, ঠিক তেমনি পাওয়া যায় সমাজের সুবিধাবাদী শ্রেণির পরিচয়। গল্পটিতে শ্রেণিবৈষম্যের চিত্রটি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন দুটি লাইনের মাধ্যমে-
‘নতুন রুপোর হার চকচক করছে গলায়, হাতে চিকন কারুকাজের চুড়িগাছি। আমার পরনের ময়লা লুঙ্গিটার দিকে নজর পড়তেই ওর সাথে আমার ফারাকটা সহজেই বুঝতে পারি।’
গল্পকথনের বাবা মেঘনাপাড়ের একটি গ্রামের রাজমিস্ত্রিদের সর্দার। তার বেশ নামডাক। মেঘনা সেতু নির্মাণের সময় বাঙালিদের মধ্যে তাকেই কাজ দেওয়া হয়। তার সাথে সবার ভালো সম্পর্ক। সে ভালো নকশাও করতে পারে। তার স্ত্রী বলে নকশা করে লাভ কি। কোন উপরি পাওনা তো হয় না। তখন সে বলে-‘দালান যারই হোক, আমার কাজ আমি করব না? আমার মন যা চাই তা করব আমি। সেই দালানের বারান্দায়ও হয়ত বসতে দেবে না। তবু আমার কাজ থাকবে, আমার কাজ!’
এ কথাগুলোর মধ্য দিয়ে যেমন তার কাজের প্রতি নিষ্ঠার পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি দিব্যালোকের মত স্পষ্ট হয় শ্রেণি বৈষম্যের চিত্র। নকশা আঁকা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসার একটা নিখাদ স্কেচও পাওয়া যায়।
হঠাৎ একদিন তার বাবা গম্ভীর হয়ে যায়। সবদিকে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বিকালে মিছিল হবে। সকল শ্রমজীবী মানুষ এসে জড়ো হয়। সবাই মজুরি বৃদ্ধির জন্যে মিছিল করছে। এরই মধ্যে গন্ডগোল হলে তার বাবাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং সব দোষ তার উপর উঠে। এদিকে তার বাবা যে রহমানকে কাজ দিয়েছিলো সে সুযোগ বুঝে আজ অনেক বড় লোক। সে সুযোগ খুঁজছিলো গল্পকথকের বাবার করা নকশাগুলো নেয়ার। প্রথমে অনেক টাকা দিয়ে সেগুলো কিনতে চাইলেও গল্পকথকের মায়ের অসুস্থতার সুযোগে ঔষুধ কেনার টাকা জোগাড়ের জন্যে তার কাছে গেলে সে তাচ্ছিল্য করে এবং অল্পদামে কিনতে চায়। অর্থাৎ সে ছিলো সুযোগসন্ধানী এক চরিত্র। দু’বছরের মধ্যে সে অনেক টাকা রোজগার করে। যা আমাদের সমাজে সবসময় বর্তমান। যেদিন সে নকশাগুলো নিতে যায় গল্পকারের মা ঘুম থেকে জেগে যায় এবং বাধা দেয়। সে বলে-‘ কিছু না হোক, কোন কাজেই না আসুক, তবু এগুলো আমার কাছেই থাকবে। আমারই কাছে থাকবে। এই শান্ত অথচ দ্বীপ্ত কণ্ঠের মধ্যে ফুটে উঠেছে স্বামীর প্রতি তার ভালোবাসা।
শ্রেণি সংগ্রামের চেতনা সমৃদ্ধ আরেকটি গল্প ‘মুখোমুখি’ (১৯৪৯)। এ গল্পে আমরা বর্গাচাষিদের জীবন সংগ্রামের চিত্র দেখতে পাই। বানিয়াচং এলাকার জোতদার হাওরের সব জমিজমার মালিক। তিনি হজ করার পর তার বিষয়-আশয় দেখার দায়িত্ব দিয়ে সারাদিন ধর্ম-কর্ম করেন। অন্যান্য বছর বর্গাচাষিরা ধান নিয়ে যায় কিন্তু এ বছর শুকুর কোথা থেকে শুনলো আর ধান দেয়া হবে না।
‘হুনতাছি এবার আমারারে ধান নিতে দিব না। ধানের বদলা কাগজের ছিলিপ দিব। নিজেরার জিলাত গিয়া কাগজের লম্বর দেহাইয়া গুদাম থে ধান লওন লাগব। আর যারা টেহা নিতে রাজি তাদের টেহা দিয়া বিদায় কইরা দিব।’
তখন সবাই প্রতিবাদ করে উঠে। তারা টাকা দিয়ে কি করবে। কারণ তাদের কাছে ধানই সব। এই ধানই তাদের স্বপ্ন। এই ধানের জন্যই তারা বেঁচে থাকে। রহিম বখশ বলে, ‘ধান নিতে দিব না আবার কোন হালা? ধান না দিলে খাইয়াম কী? আমরা না খাইয়া মরুম? হুঁ, খেলা আর কি।’
এবারে ফসল ভালো হওয়ায় সবার মনে বেশ আনন্দ। সবাই ভাবছে বেশ সুখেই কাটবে আগামী কিছুদিন। কিন্তু ফসল কাটা শেষ হলে জোতদারের বড় ছেলে গোমস্তার মাধ্যমে জানায় ধান দেয়া হবে না। তখন গরিব চাষিরা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। নিজের পেটে লাথি পড়লে সবাই যে জেগে উঠে সেই বাস্তবতায় এখানে এসেছে। নিরীহ মানুষগুলো যারা মায়ের অল্প বিচ্ছেদে কান্না করে তারাও যে হিংস্র বাঘের মতো হতে পারে তা দেখেছি। জমিদারের বড় ছেলে লাঠিয়াল ও পুলিশকে খবর দেয় বর্গাচাষিদের দমন করার জন্য। কিন্তু প্রতিবাদী মানুষের সামনে কিছুই টিকতে পারে না। লাঠিয়াল বাহিনী পরাজিত হয়। পালিয়ে যায় জোতদারের ছেলে। পুলিশরা রাইফেল হাতে এলেও চাষিরা ভয় পায় না। তারা এগিয়ে যায়। কারণ তাদের অধিকারই তাদের কাছে সব। এখানে আলাউদ্দীন আল আজাদ শ্রেণিশোষণের স্তম্ভে একটি বড় আঘাত হানেন।
মানুষ সম্পর্কে মানুষের কী বিচার তা জানা যায় তাঁর ‘আঁতুড়ঘর’ গল্পটির মাধ্যমে। এই গল্পে মানুষের ভিতরের মানুষটিকে দেখার যে আকাক্সক্ষা তা বেশ ফুটে উঠেছে। সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যারা জানে না মানুষকে সম্মান দিতে। তারা মানুষের চেয়ে কুকুরকেই বেশি মর্যাদা দেয়। তারা হয়ত কুকুরেরই বংশোদ্ভূত।
অন্ধভিখারী সলিমদ্দি এবং তার সাত-আট বছরের ছেলে হাসু ঝড়বৃষ্টির মধ্যে সন্তান সম্ভবা বউ রহমজানকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসে। পরক্ষণে সন্তান প্রসব করে। কুকুর থাকার জায়গাটি নিরাপদ স্থান বলে মনে করলেও আসলে তা নিরাপদ নয়। সলিমদ্দি যখন আজান দেয় তখন বাড়ির সাহেবসহ সবাই ছুটে আসে। এবং সাহেব চাকরদের হুকুম দেন আগামীকাল সকালেই যেন আপদগুলোকে বাইরে রাস্তায় সরিয়ে দিতে। ‘যত্তোসব রাবিশ, শুয়োরের বাচ্ছারা বিয়োবার আর জায়গা পায় না…।’ মানুষের মানবতাবোধ যে নষ্ট হয়ে গেছে তা তিনি এ গল্পের মাধ্যমে দেখিয়েছেন। কুকুর আর মানবসন্তানের মধ্যে কোন ফারাক নেই।
আলাউদ্দীন আল আজাদের অসাধারণ সাহিত্য মেধার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর ‘শিষ ফোটার গান’ গল্পটিতে। রবীন্দ্রনাথ ছোট গল্পের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে,/ শেষ হইয়াও হইল না শেষ।’ ছোটগল্পের সংজ্ঞাটির যথার্থ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে এই গল্পটি। গল্পটিতে আমরা আলাউদ্দীন আল আজাদের প্রতিবাদী চেতনার একটি রূপ দেখতে পাই। গরিব বর্গাচাষি মজিদ, মমিনার সাথে তার বিয়ে হয়েছে মাত্র ছয় মাস। কিন্তু অভাবের কারণে মজিদ বৌ-এর মুখে কখনোই হাসি ফুটাতে পারে না। তাই সে মায়ের দেয়া জেওরগুলো বিক্রি করে মিঞা থেকে দুইকানি জমি বর্গা নেয়। কিন্তু তাতেও হয় না রক্তচোষা মিঞার। সে ধানের অর্ধেকও ভাগ নিবে। মজিদ আশায় বুক বাঁধে কখন তার চারার ধানের শিষ আসবে। এক রাতে সে কিসের যেন গান শুনতে পায়। তার গাছে দেখা যায় সাদা সাদা ধানের শিষ। সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। তার মতো সব কৃষকের মুখে হাসি ফুটে। সবাই সুখের স্বপ্ন দেখতে থাকে। কারণ সবাই নিজের ঘরের টিনের চাল বা গাছ বিক্রি করে এই দিনটির জন্যে জমি বর্গা নিয়েছে। সে মনছুরের সাথে পরামর্শ করে এবারের ধান না দেয়ার। ধান যখন পাকা আরম্ভ করে, একদিন মিঞা আসে। সে হিসেব করে এবারে কত টাকা পাবে। কারণ এবার ধান ভালো হয়েছে। মজিদ সাথে সাথে প্রতিবাদ করতে চাইলো কিন্তু করল না। এভাবেই গল্পটি শেষ হয়। কিন্তু গল্পটি পাঠকের মনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়। ‘এরপর কি হলো?’ সেটার উত্তরও হয়ত তিনি গল্পের একটি উক্তিতে ইঙ্গিত দিয়েছেন,‘ সুরুজ উঠতাছে মণি, সুরুজ!’
বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের যে ভিত্তি তৈরি হয়েছে তাতে একজন পাঠকের চোখে আলাউদ্দীন আল আজাদের যেসব বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে তা হলো তাঁর বর্ণনার শিল্পমাধুর্য, ভাষা ও বাক্যের অভিনবত্ব। এবং সাথে সাথে প্রতীকধর্মী চিত্রকল্পের ব্যবহার। বাংলার সৃজন মাটি ও মানুষ তাঁর গল্পে যেমন কথা বলে তেমনি জীবনের বিভিন্ন চিত্রগুলো ফুটে উঠে তাঁর তুলির আঁচড়ে। বাংলা ছোটগল্প সাহিত্যে যে ধারা তিনি সৃষ্টি করে গেছেন।
তাতে বলা যায়, তিনি বাংলা ছোটগল্পের একজন সৃজনশীল কারিগর।