ড. আব্দুর রহিম প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নৈষ্ঠিক গবেষক। বাংলা বানানের কথা (১৯৯৮), বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস : রোমান্স প্রসঙ্গ (২০০৭), ভাষা ও সাহিত্য : কতিপয় প্রবন্ধ (২০০৯), রবীন্দ্র-উপন্যাস যোগাযোগ প্রসঙ্গে (২০১২) প্রভৃতি গ্রন্থ প্রণয়নের মাধ্যমে তিনি পাঠকের গবেষণা-প্রবণদৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তারই ধারাবাহিকতায় এবার অবসর প্রকাশনী সংস্থা থেকে প্রকাশ পেল ‘বাংলাদেশের ভাষা-পরিকল্পনা’ (১৯৭১-২০১৬) শীর্ষক চমৎকার একটি গবেষণালব্ধ প্রবন্ধগ্রন্থ। এটি মূলত তাঁর পিএইচ.ডি থিসিস পেপারের সংশোধিত ও পরিমার্জিতরূপ। গ্রন্থটি প্রণয়নে আটটি অধ্যায় সন্নিবেশিত হয়েছে। গ্রন্থটির কেন্দ্রীয় আলোচনা ভাষা-পরিকল্পনা বিষয়ক; যা মূলত সমাজভাষাবিজ্ঞান ও ফলিত বা প্রায়োগিক ভাষাবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। আরো খোলাসা করে বলা যায়- গ্রন্থটিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন ভাষার অবস্থাগত সমস্যা অনপুঙ্খভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আলোচনায় এসেছে বিভিন্ন ভাষার অবয়বগত সমস্যা, বাংলাদেশের ভাষা পরিস্থিতির স্বরূপ অর্থাৎ এখানে কী কী ভাষা কেন, কিভাবে শিক্ষা দেয়া হয়- তা বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচিত হয়েছে বাংলাদেশের ভাষা শিক্ষাদান পদ্ধতির ত্রুটি, অবহেলিত ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীর ভাষার কিভাবে উন্নয়ন সাধন করা যায় তার প্রস্তাবনা ও প্রাঞ্জল বিশ্লেষণ। প্রকৃতপক্ষে ভাষা-সমস্যার সমাধানকে সামনে রেখেই ভাষা-পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু কেন যে পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয় না তা একটা মোটাদাগের প্রশ্ন। এর কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টাও এ গ্রন্থে চমৎকারভাবে অনুসন্ধিৎসা-দৃষ্টিতে আলোচিত হয়েছে।
গ্রন্থটির প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম ‘ভাষা- পরিকল্পনা : স্বরূপ ও পরিধি’। এখানে গ্রন্থকার বলার চেষ্টা করেছেন Language Planning বা ভাষা-পরিকল্পনার পদ্ধতিগত আলোচনা বিশ শতকের মাঝামাঝিতে হলেও এর সূত্রপাত মূলত পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী ব্যাকরণের সময় থেকে (আনুমানিক খ্রি.পূর্ব ৫০০ অব্দ)। ভাষা-পরিকল্পনা অভিধাটি (Term) উরিয়েল ওয়াইনরাইশ (Uriel Weinreich)সর্বপ্রথম ১৯৫৭ সালে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিনারে ব্যবহার করেন। আইনার হাউগেন (Einer Haugen) ১৯৫৮ সালের নভেম্বর মাসে আমেরিকান নৃতাত্ত্বিক অ্যাসোসিয়েশনের এক প্রবন্ধে তা প্রথম ব্যবহার করেন। এর পর থেকে বিভিন্ন দেশে-মহাদেশে ভাষা-পরিকল্পনা সংজ্ঞার্থ-স্বরূপ বিন্যাস নিয়ে চলছে নানা পদ্ধতিগত আলোচনা । তবে এক কথায় এর উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। কেউ কেউ বলেন, ‘ভাষায় বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে এবং এসব সমস্যা সমাধানের জন্য উত্তম-সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ভাষা-পরিকল্পনা বলা হয়।’ তবে এটাই শেষ কথা নয়। গবেষক ড. আব্দুর রহিম এ অধ্যায়ে ব্লুমফিল্ড, রুবিন, জের্নুড, ফিশম্যান, ক্যারাম, ব্রায়ন ওয়াইস্টাইন, ফার্গুসন প্রমুখ ভাষাবিজ্ঞানীর ভাষা-পরিকল্পনা বিষয়ক মতামত পর্যালোচনা করেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম ‘বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতি একটি সমাজ-ভাষাবৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা’। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে অনেকেই প্রত্যাশা করেছেন যে, স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে বাংলাই হবে প্রধান ভাষা এবং সর্বস্তরে বাংলাভাষার প্রচলন হবে। আমাদের সে প্রত্যাশা এখনো পূর্ণ হতে পারেনি। কোন বাস্তব অবস্থায় সেটা সম্ভব হয়নি গ্রন্থকার এ বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দিয়ে চমৎকার বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। বাংলা ভাষা এখনো অর্থোপার্জনের ভাষা হয়ে ওঠেনি। ফলে তা সামাজিক প্রভাব ও প্রতিপত্তির ভাষা হিসেবে গড়ে ওঠেনি। এজন্য গ্রন্থকার ড. আব্দুর রহিম দাবি তুলেছেন বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হলে বাংলা ভাষাকে অর্থোপার্জনের ভাষায় পরিণত করে সমাজে তার চাহিদা বৃদ্ধি করতে হবে। এই অধ্যায়ে প্রাসঙ্গিকভাবে বাংলাদেশের উপভাষা, প্রমিত ভাষা, ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীর ভাষা, ভাষাঋণ, কোড- নির্বাচন, কোড-সরণ, কোড মিশ্রণ ও কোড পরিবর্তন সম্পর্কে প্রাঞ্জল ভাষায় তথ্য সমৃদ্ধ আলোচনা উপস্থাপন করেছেন লেখক।
‘বাংলাদেশের ভাষাসমূহের মর্যাদা পরিকল্পনা : স্বরূপ ও পরিধি’ নামক তৃতীয় অধ্যায়ে রয়েছে ভূমিকা ও দুটি পরিচ্ছেদ। মূলত পৃথিবীর অনেক ভাষাকেই তার মর্যাদার জন্য কিংবা টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হয়েছে। বাংলাও এর ব্যতিক্রম নয়। অস্তিত্বের লড়াইয়ে যেসব ভাষা টিকে থাকতে পারেনি তারা একসময় হারিয়ে গেছে। মধ্যযুগে ব্রাহ্মণ সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- বাংলা ভাষার ধর্মচর্চা ‘‘করলে রৌরব নামক নরকে যেতে হবে- ভাষায়াং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ। মুসলিম সমাজেও সতেরো শতক পর্যন্ত শাস্ত্রকথা বাংলায় অনুবাদের বিরোধিতা করা হয়েছে। বাংলা ভাষা বর্তমান পর্যায়ে উন্নীত হবার পেছনে রয়েছে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। গ্রন্থকার তথ্য বিন্যাসের মাধ্যমে সে ভূমিকায় ইতিহাস উপস্থাপন করেছেন। অধ্যায়টির প্রথম পরিচ্ছেদের শিরোনাম ‘বাংলাদেশের শিক্ষায় ভাষা-পরিকল্পনা। বিভিন্ন ভাষায় পারস্পরিক অবস্থাগত সম্পর্ক বা ভূমিকা নির্ণয়ই আলোচ্য পরিচ্ছেদের প্রকৃত উদ্দেশ্য। বাংলাদেশের শিক্ষায় ভাষা- পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গ্রন্থকার আব্দুর রহিম তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন যথা- (ক) ভাষা ও শিক্ষা (খ) শিক্ষায় ভাষা- সমস্যা (গ) শিক্ষায় ভাষা-নীতি। কুদরত-ই- খুদার শিক্ষাকমিশন (১৯৭৪) থেকে শুরু করে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর (২০০৯) নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশনের সংক্ষিপ্ত অথচ জ্ঞানগর্ভ আলোচনা এখানে সংযোজিত হয়েছে। পরিচ্ছেদের সমাপ্তি টানা হয়েছে এভাবে- ‘মূলত শিক্ষার মাধ্যমে সমগ্র জাতির উন্নয়ন সাধন করতে হলে শিক্ষাক্ষেত্রে এক বা অভিন্ন ভাষানীতি চালু করা অত্যাবশ্যক।’ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের শিরোনাম ‘বাংলাদেশের প্রশাসনে ভাষা-পরিকল্পনা স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে প্রশাসনে বাংলা প্রচলনের জন্য বিভিন্ন সরকারের আদেশ নির্দেশ এবং কর্মসূচিগুলোর বিস্তারিত আলোচনা এখানে স্থান পেয়েছে।
‘বাংলাদেশের ভাষাসমূহের অবয়ব পরিকল্পনা’ হল ভাষার বর্ণমালা, বানান, উচ্চারণ, প্রতিবর্ণীকরণ, পরিভাষা, অভিধান, ব্যাকরণ ইত্যাদি নির্ধারণ, সমস্যাসমূহ দূরীকরণ, প্রমিতকরণ, শুদ্ধতা অশুদ্ধতা বিচার-বিশ্লেষণ ইত্যাদি। এসব বিষয়ে গ্রন্থকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনাপূর্বক সময়োপযোগী বুদ্ধিদীপ্ত মূল্যায়ন পাঠককে উপহার দিয়েছেন।
‘বাংলাদেশের ভাষাসমূহের ভাষা আয়ত্তীকরণ পরিকল্পনা’ শিরোনামে পঞ্চম অধ্যায়টি প্রণীত। অধ্যায়টি বেশ সংক্ষিপ্ত। উপর্যুক্ত শিরোনামকে সরস করার জন্য গবেষক ড. আব্দুর রহিম উল্লেখ করেছেন যে, ভাষা শিক্ষাদানের নীতিকে ভাষা আয়ত্তকরণ পরিকল্পনা বলা হয়ে থাকে। একটি দেশে কী কী ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়, কখন দেয়া হয়, কেন দেয়া হয় এবং কিভাবে দেয়া হয় ইত্যাদি বিষয় এর অধিভুক্ত। আর এগুলো আলোচনা করেন মূলত সেদেশের শিক্ষাবিদগণ। তারা ভাষা শিক্ষার পাঠ্যসূচি এবং পাঠ্যবই ইত্যাদি নির্ধারণ করেন। আবার মিডিয়া পরিচালকরা নির্ধারণ করেন কী কী ভাষা মিডিয়াতে প্রচারিত হবে। যেমন- বাংলাদেশে বহু ভাষা শিক্ষা দেয়া হলেও প্রচার মাধ্যমে শুধু বাংলা এবং ইংরেজি ভাষা ব্যবহৃত হয়। মূলত মিডিয়া পরিচালকরা, শিক্ষাবিদবৃন্দ, ভাষাবিদগণ প্রমুখ যে ভাষানীতি নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন করবেন তার ওপর শিক্ষার্থীদের ভাষা আয়ত্তীকরণ নির্ভরশীল।
‘বাংলাদেশের আদিবাসীদের ভাষা-পরিস্থিতি ও ভাষা-পরিকল্পনা নামক অধ্যায়ে চাকমা, মারমা, রাখাইন, ত্রিপুরা, মণিপুরি, গারো, সাঁওতাল প্রভৃতি ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীর ভাষা-পরিস্থিতি নিয়ে অনেক বাস্তবমুখী সময়োপোযোগী আলোচনা স্থান পেয়েছে। এসব ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠীর ভাষা-উন্নয়নের জন্য লেখকের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন যে কোনো ভাষাপ্রেমিক ও ভাষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানকে নানাভাবে অনুপ্রাণিত করবে।
বাংলাদেশের ভাষা-পরিকল্পনাকারী যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেমন- বাংলা একাডেমি, বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশে ভাষা সমিতি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের ভূমিকা সম্পর্কে তথ্যসমৃদ্ধ বাণীবিন্যাসে গ্রথিত হয়েছে সপ্তম অধ্যায়ে।
অষ্টম অধ্যায়ের শিরোনাম ‘ডায়গ্লসিয়া ও বাংলাদেশের ভাষা-পরিকল্পনা’ অধ্যায়টির আলোচ্যসূচি ও আলোচনার সাবলীল দৃষ্টিভঙ্গি পাঠককে বেশ কৌতূহল-প্রবণ করে তুলেছে। সাধারণত একটি বাকসম্প্রদায়ে যদি একই ভাষার দু’টি রীতি অর্থাৎ দুটি ভাষারীতিই সুনির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করে তবে তাকে ভায়গ্লসিয়া বা দ্বিবাচন বলে। দ্বিবাচন পরিস্থিতিতে একটি ভাষারীতিকে বলে উচ্চ পরিবৃিত্ত (H) এবং অন্যটিকে বলে নিম্ন পরিবৃত্তি (L)। এ অধ্যায়ে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার ডায়গ্লসিক পরিস্থিতির আলোকে বাংলাদেশে বাংলা ভাষার ডায়গ্লসিক পরিস্থিতির স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন। সাধু ও চলিত কিংবা চলিত ও উপভাষা-যে পরিস্থিতির কথাই বলি না কেন, বাংলা ভাষায় যে ডায়গ্লসিক পরিস্থিতি আছে তা সহজেই বোঝা যায়। ডায়গ্লসিক পদ্ধতিতে বাংলাদেশের ভাষা-পরিকল্পন কিরূপ হওয়া উচিত এতদবিষয়ে লেখকের চমৎকার উপস্থাপনা গ্রন্থের মান ও গ্রহণযোগ্যতাকে আরো সুসংহত করেছে।
বাংলাদেশের ভাষা-পরিকল্পনা নিয়ে সর্বশেষ তথ্যসমৃদ্ধ এই গ্রন্থটি শুধু বাংলাদেশ সরকারকে কিংবা এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানকে ভাষা-পরিকল্পনায় করণীয় দিক সম্পর্কে সচেতন করবে না; বরং শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের শ্রেণি-পেশার মানুষের শৈক্ষিক ও ব্যবহারিক কর্মপরিবেশকে আস্থাশীল করে তুলবে। গ্রন্থটি ২০১৭ সালের আগস্টে অবসর প্রকাশনী সংস্থা থেকে বের হয়েছে। গ্রন্থটির দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ এঁকেছেন প্রতীক ডট ডিজাইন। আশা করি গ্রন্থটি প্রাগ্রসর পাঠকের কালেকশনকে সমৃদ্ধ করবে।