ওয়াহিদ জামান
মনপাখি
মনের কাছে মন দিয়েছি
কীসের আমার ভয়,
মনতো আমায় ছেড়ে যেতে
পারবে না নিশ্চয়।
মনের সুখে চুপেচুপে
হাসে আমার মন,
মনই আমার সুখের সাথী
সেইতো আপনজন।
মনের দুখে কাঁদে সদা
আমার মনপাখি,
মনের পানে সারাক্ষণই
চেয়ে আমি থাকি।
ওগো মনপাখি…
মনের ইচ্ছা আকাশ দেখার
আমার ইচ্ছাও তাই,
তাইতো আমি জোছনা রাতে
আকাশ দেখতে যাই।
কী যে ভালো লাগে আমার
নদীর কলতান,
সেটাও নাকি অনেক আগের
মনের আহবান।
মন তো আমায় চেনে অনেক
আমিও চিনি তারে,
মান অভিমান ছেড়ে সেথায়
ফিরি বারেবারে।
শাহাদাৎ সরকার
কৃষ্ণচূড়ার লাল
কৃষ্ণচূড়া কি করে তুই হলি এতো লাল?
কোন লালিমায় লাল হয়েছে লাল শিমুলের ডাল?
অরুণ আভা ক্যামনে হলো লাল রঙেতে মাখা?
সেই ইতিহাস সব অন্তরে দেখছি আজো রাখা।
সেদিন ছিলো একুশ তারিখ ফেব্রুয়ারি মাস
মায়ের ভাষা মেখেছিলো সবুজ খুনের ঘাস।
রাজপথেতে এসেছিলো লাল রঙেরই বন্যা
সেই মিছিলে পেয়েছিলাম তিতুমীরের কন্যা।
তিতুমীরের সেই মেয়েটির পাইনা আজো খোঁজ।
তাঁরই কোলের ছেলেরা আজ জাগছে হররোজ।
সেই ছেলেরা খুন হোলে ভাই কেউ বলে না কথা
অত্যাচারে মরছে মানুষ এটাই স্বাধীনতা?
কোথায় আছে দেশ-জনতা প্রতিবাদী দল?
কোথায় গেল অগ্নিপুরুষ? চক্ষু ছলোছল।
রফিক. শফিক, সালাম, বরকত স্বপ্ন দিলে ঢেলে
মায়ের ভাষা এলো ফিরে মুক্ত পাখা মেলে।
মুহাম্মদ ইব্রাহিম বাহারী
আমার বাংলাদেশ
কলসি কাখে গাঁয়ের বধু
ঝিনিক ঝিনিক নুপুর শুধু
বাজনা বাজে রাঙা ঠোঁটে
মন ভোলানো হাঁসি ফোটে
রুপের নাহি শেষ-
আমার বাংলাদেশ।
রাতের শেষে সূর্য হাঁসে
শিশির ঝরে সবুজ ঘাসে
পাতায় পাতায় দোয়েল নাচে
হঠাৎ দূরে হঠাৎ কাছে
সুখেরি আবেশ-
আমার বাংলাদেশ।
ধানের ক্ষেতে ফড়িং নাচে
ফিঙের বাঁসা সজনে গাছে
রাতের বেলা চাঁদের বুড়ি
আলো ছায়ায় লুকো চুরি
মায়ায় ভরা দেশ-
আমার বাংলাদেশ।
নদীর কূলে কাশের ফুলে
বাতাস পেয়ে হেলে দুলে
ভাটিয়ালির সুরের ভেলায়
চরের বুকে জোসনা খেলায়
সুখ যে অনিমেষ-
আমার বাংলাদেশ।
ওসমান মাহমুদ
মন তোর বাড়ি কই
শরতের মেঘ তুই
নাকি শাদা কাশফুল
ক্ষণে ক্ষণে নীল পথে
কোথা উড়ে যাস ফুল?
নাকি তুই সারি বক
উড়ে যাস নীলজুড়ে
মায়া ভরা কার হাসি
শাপলার বিলজুড়ে?
তুই কিরে সবুজের
মাঠে ছোটা রোদ্দুর
মন পাখি তোর বাড়ি
আর কতো! কদ্দূর?
শাহজাহান মোহাম্মদ
গাঁয়ের স্মৃতি
সেই আমার গাঁয়ের স্মৃতি ভুলি কেমন করে
সেসব স্মৃতি বুকের ভেতর আছে থরেথরে।
ছোটবেলার বন্ধু ক’জন পুকুর জলে গিয়ে
এপার ওপার হতাম কত্ত ডুব সাঁতার দিয়ে।
ঘুড়ির সাথে উড়ে যেতাম নীল আকাশের মাঝে
সংগী হতো রংধনুটা সকাল দুপুর সাঁঝে।
বাবার সাথে বটের হাটে যেতাম শনিবারে
কেনা বেচায় ব্যস্ত সবাই কাঞ্চন নদীর ধারে।
মোয়া-মুড়ি গুড়ের জিলাপী ছোট্ট বোনের তরে
ঠোংগায় ভরে দিতো কাকু দুই পয়সা ধরে।
এসব কিছুর পরেও যেন পাইনি তার মন
হয়নি আনা মাটির পুতুল গোমড়া মুখে বোন।
কেমন করে ভুলি আমি বাংলা মায়ের নাম
সবুজ শ্যামল মাটির গন্ধে আমার প্রিয় গ্রাম।
আলম সিদ্দিকী
অগাধ ভালোবাসা
মন উর্বরা মাটি আমার মন উর্বরা মাটি
বাংলা মায়ের মাটির মতো একেবারেই খাঁটি
মনমাটিতে ফলতে পারে সবচে খাটি সোনা
আছে কেবল মিঠাপানি নেই সাগরের নোনা।
রোপণ করি ফুলের বাগান বাংলা মায়ের চাষা
ফুলের ঘ্রাণে মাতাবো দেশ এটাই চাষার আশা
মনের মাটি উর্বর বলে ফসল ফলে ভালো
ভালো মনের মানুষেরাই জ¦ালিয়ে রাখে আলো।
মনের মাটি নানা রকম এঁটেল দোয়াশ পালি
মনে আমার নেই তো পাথর নেই তো চোরাগলি
আরও উর্বর করে তুলি সবুজ সবুজ সারে
সুগন্ধি ফুল তাই সহজে মন ফোটাতে পারে।
বাহারি ফুল ফুটতে পারে মানবজাতির মনে
ফুল ফোটানোর চিন্তা তবে থাকতে হবে পণে
মন মাটিতে গাছগাছালি ডালে পাখির বাসা
মনের ভেতর আছে আমার অগাধ ভালোবাসা।
ফারুক নওয়াজ
বলল কি হাওয়া, বলল কি নদী
কতদিন তুমি কবিতা লিখোনি এই…!
কে যেন বলল। তাকালাম, দেখি নেই।
বলল কি হাওয়া? বলল কি গাছ?
বলল কি নদী? ডাকা বুকো মাছ?
দূরের পাহাড়? নাকি ঝিঁঝিঁদের মেয়ে…?
ঘাড়টা ঘুরিয়ে থাকলাম বৃথা চেয়ে।
হ্যাঁ, ঠিকই ওরা, ওরাই বলতে পারে;
বহুদিন আমি ঘুরিনি নদীর ধারে।
শটিবনে থাকে পিউ-পিউ পাখি…
নিশিবকগুলো করে ডাকাডাকি…
কাশবনে শাদা হাঁসছানাগুলো
ডানা নেড়ে খেলা করে…
তাদের সঙ্গে দেখা নেই গত
একটি বছর ধরে!
ইমলি পাতায় ঝিরিঝিরি মিঠে হাওয়া
ঘুমলী ঘুঘুর ঢুলুঢুলু চোখে চাওয়া
মউলের বনে মৌটুসিদের মেলা…
দেখা হয় নাই বৃথাই গিয়েছে বেলা।
আপাঙের ঝোপে শিশির ঝরেছে রাতে
ময়ূর নেচেছে ঝিলিমিলি পাখনাতে…
দেখা হয় নাই একটি বছর
তাদের কাহারো সাথে–
তাইতো মাথায় কবিতা আসেনি
কলম ওঠেনি হাতে।
গিয়েছে শরৎ শেফালি-সুরভি
হাওয়ায় গিয়েছে মিশে;
কতদিন আহা আবেগ দোলেনি
দোয়েলের মধু-শিসে!
চুপিচুপি আজ কে-যে বলে গেল
কবিতা গেছো কি ভুলে?…
কার কাছে বলি; কেন যে আমার
ঘুম এসে যায় শুলে!
আল মাহমুদ
ভুলে যেতে হবে
একটি কবিতা চেয়ে আছে মুখপানে
আমি তারে সাধি আমি তারে বাঁধি
আমি তারে সাধি যৌবনে গানে গানে।
ভালোবাসি তারে স্মৃতির মিনারে
ছুঁতে চাই তারে বুকের ভিতরে।
আমি ডাকি তারে; সে জবাব দেয়Ñ
মনে প্রাণে
সবখানে।
আমি তো একাকী শুধু চেয়ে থাকিÑ
তার মুখপানে।
সব শেষ হলোÑ সন্ধ্যা ঘনালো
বেলা শেষ তবে, দূরে যেতে হবে
ভুলে যেতে হবে নাম ও ঠিকানা
নাহি কোনো মানা।
মুহম্মদ নুরুল হুদা
পিপাসার্ত ঢেউ
দূরের দুয়ারে জেগে একাকী দুজন
বাহুতে রেখেছি বাহু, বাহুর কূজন।
যত তুমি দূরে যাও, তত কাছে আসো
ধরার অধরা হয়ে মন টিপে হাসো।
যুক্ত হই মুক্ত হই আপনা কয়েদি,
অর্ধ-মিল সিদ্ধ যদি হে দিলদরদী।
কানুর বাঁশিতে ঝরে বেদনার হীরে,
মুখোমুখি দুই দুঃখী যমুনার তীরে।
বেহুলার হাতে কাঁধে বেহাল বেহালা;
জাগে না লখাই আর, দেহে তার তালা।
আমার ভেতরে তবু তোমার শানাই,
আমাকে বানাই তাই তোমার কানাই।
পাশাপাশি বয়ে যাই, কারো নই কেউ;
আমরা তৃষ্ণার জল, পিপাসার্ত ঢেউ।
নির্মলেন্দু গুণ
একা
কবে থেকে আকাশ দাঁড়িয়ে আছে একা,
তার বুক থেকে খসে পড়েছে কত তারা।
বেঁচে থাকলে আরো কত তারাই খসবে,
তা নিয়ে আকাশ কি দুঃখ করতে বসবে?
না, বসবে না, আমি বলছি, লিখে নাও,
আকাশকে তো মহান মানি এ-কারণেই।
মনুষ্যবৎ হলে কি মানুষ তাকে মানতো?
প্রিয়জন চলে গেলে মানুষই ব্যথিত হয়,
আকাশ নির্বিকার, আকাশ কখনও নয়।
তোমরা মানুষ, তাই সহজেই দুঃখ পাও,
হে ঈশ্বর, আমাকে আকাশ করে দাও।
আল মুজাহিদী
প্রত্যুষের উল্কিআঁকা হাত দু’টো
সমুদ্রের সুনীল জোয়ার বুকে ক’রে আমি আবার ফিরে আসবো।
সুপ্রাচীন টেরাকোটা নিয়ে আবার ফিরে
আসবো। আমি তলব করবো সভ্যতাকে তোমার উদ্দেশে
আমি গেথে তুলবো পার্থিব প্রাসাদ।
এই পৃথিবীর হৃৎপিন্ড ও হৃদয় জুড়ে তোমার
শোণিত ধারা স্পন্দমান।
হিরোশিমা, আমি তোমার একান্ত সন্নিকটে
এ্যাডাম কোথায়? ঈভ? সেই মানবী কোথায়?
এ্যাডামের বাম পাঁজরের হাড় দিয়ে যে মানবীর জন্ম
সেই প্রেয়সী নারীর সন্ধান করতে এসেছি আমি
হিরোশিমা, তাকে বাঁচিয়ে রাখো জন্ম-জন্মাবধি
মানবজাতির অস্তিত্বের কোরক ফাটিয়ে
তুমি জেগে ওঠো। অ-মানবকে অন্তর্বর্তী কোরো না মানবজাতির।
আমি প্রত্যুষের উল্কিআঁকা হাত দু’টো
উপহার দিতে এসেছি তোমাকে।
তুমি এই হাত দু’টো বুকে তুলে নাও
হিরোশিমা।
ফরহাদ মযহার
চলো যাই
ফরিদা আমাকে তুমি দূরবর্তী কোনো দ্বীপে নিয়ে যেও। সেখানে সকালে
শঙ্খের পেয়ালায় চা খাবার খুব সাধ, ধরো আমরা সারারাত আকাশের তলে
জ্যোৎ¯œায় জলপরীদের ব্যস্ত হুটোপুটি দেখে খুব ক্লান্ত হয়ে ভোরে
যখন বিশ্রামে যাবো তখন দুজনে মিলে দেখবো দূরে উৎফুল্ল জাগে শুকতারা।
অথচ ততোক্ষণে আমাদের সমস্ত চোখের পাতা ভারী হয়ে যাবে ব্যস্ত ঘুমে
চতুর্দিক নোনা জল, তীরে নারিকেল বীথি, ওরই মধ্যে বেজে উঠল শাঁখ।
প্রাগৈতিহাসিক সেই শঙ্খের গর্জনে নীলাভ বিন্দুর সেই শুকতারাটিকে মনে হবে
সত্যি সত্যি গ্রহ। অথচ তুমি তো জানো, কম্পাসের বান্ধবী এই মেয়েটিকে আমি কতো
অন্তরঙ্গভাবে চিনি, সারারাত বুকে নিয়ে তাকে যথাসাধ্য বন্দী রাখা
কিছুটা সম্ভব, কিন্তু যখনই শঙ্খ বাজে ভোরবেলা সে আমার আগে ঘুম থেকে
উঠে গিয়ে আকাশে দাঁড়িয়ে থাকে। দূরে তাকে মনে হয়, অথচ সে অত্যন্ত কাছেরÑ
কাছেও দূরের নানা সূক্ষ¥ পার্থক্য নিয়ে পন্ডিতে প্রবন্ধ লেখে, কবিরা কি পারে?
কিছুই হলো না বলা, কতোদিন চলে গেলো, আর কবে? নিজেকে ভেবেছি অতিশয়
বুদ্ধিমান, কবিতা লিখেছি বহু, অতএব ভাষার ওপর আছে জবর দখল, ভাবতাম
অক্ষরের কান চেপে ধরে আমি বলবো যা বলতে চাই। আজ বারবার মনে হয়
এমনকি এই শঙ্খ ও নক্ষত্রের গল্পও আমরা কোনোদিন করি নাই, সকালে যখন চা খাই
নাশতা খাই তখনও বলতে গিয়ে বারবার ছোটখাটো কেচ্ছাও বলিনি
এই অপারগতার মধ্যে এ জীবন কেটে গেলো। বলো দেখি, আর কি কখনো হবে বলা?
তাই বলি একবার চলো যাই দূরবর্তী দ্বীপে, প্লিজ চলো যাই ঘর ছেড়ে দূরে একবার
জ্যোৎ¯œায় জলপরীদের সঙ্গে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি, দেখি পদ্যে বলতে পারি কিনা…
মোহাম্মদ রফিক
উতলা
আজ রাত। সৃষ্টির প্রপাত যেন
আমাকে আমুন্ডু গ্রাস করে নিল।
অন্ধকারে জ্বলে উঠল বিদ্যুতের ফণা
ঢেলে গেল বিষ মাংসে হৃৎপিন্ডে-হৃদয়ে
উজ্জীবন, ঘটে বিস্ফোরণ জরায়ণে,
তাই বলি, অকাল-মৃত্যুকে ক্ষমা করে দিও।
মিশে রইব স্বদেশের বেহুলা শরীরে,
ভেসে যাব গাঙুড়ের জলে।
ময়ুখ চৌধুরী
সরীসৃপগুলো
রাত্রি নয়; ঘড়ির কাঁটার সরীসৃপ
প্যাঁচিয়ে লতিয়ে ওঠে কেঁপে ওঠে চতুষ্পদ চেয়ারের ভূত।
মনে পড়ে বৃক্ষজন্ম, ভালো ছিল মৃত্তিকার পাললিক স্নিগ্ধ অন্ধকার
সেখানে মুখোশ কিংবা অকৃতজ্ঞ চক্ষুগুলো পৌঁছোতে পারে না।
একাধিক মুখোশের সঙ্গে একদিন
সহজ-সরলভাবে মিশেছিল ছন্দের মতন
ওপরে ওঠার সিঁড়ি, প্রতিটি পাঁজর তার ক্ষতবিক্ষত।
এই পথ বেয়ে গেছে সরীসৃপগুলো। রেখে গেছে তারা
প্রেতের হাসির প্রতিধ্বনি।
মানুষের মুখ বললে এখন আর কিছুই বুঝি না।
হাসান হাফিজ
শীতের অলঙ্ঘ্য সত্য
শীতে চাই উষ্ণ ওম, এই গ্রহে যা কিনা দুর্লভ
চাইলেও পাওয়া যায় না, লম্বমান না-পাওয়া মিছিল
গরিবের দিনপঞ্জি দুঃখে দুঃখে সমাকীর্ণ কাটে না সময়
দিন যায় না, রাত্রিও অনন্ত দীর্ঘ জাড়ের কামড়ে লুব্ধ
হি হি কষ্টে কম্পন দুর্ভোগই সার, কাব্যকান্তি কিছুমাত্র নেই
শীতঋতু কেন তুমি এতটা আগ্রাসী পর,পাষাণপ্রতিম?
তোমার হৃদয়ে কেন জাগে না মমতাঢেউ কেন তুমি ধ্বংস পরায়ণ?
আবেগ প্রস্তরীভূত সাধ আহ্লাদ ছুটি নিয়ে সুদূরে উধাও
কুয়াশায় ভাগ্যলিপি ছেঁড়াখোঁড়া পান্ডু নাও স্থবির চড়ায়
আহা শীত, শত্রু তুমি, কোনোমতে আত্মীয়তা পাবো না তোমার
আফসোসে হতাশ্বাসে ভরা থাকছে আটপৌরে দুর্বহ জীবন…
জাহাঙ্গীর ফিরোজ
সৌরভ
রাতের আলিঙ্গনে ফুল
করুণ গানের মতো জানালায়
ছড়াল সৌরভ
দ্বিপ্রহরের চাঁদ ঠান্ডা আলো ঢেলেছে শয্যায়
গল্পের পাতা থেকে কোথাও কী রাতজাগা পাখি
নীল সমুদ্রের মতো আকাশের শূন্যতা ছুঁয়ে উড়ে গেল!
তার পাখার বাতাস
হূ হূ বুকভাঙা সঙ্গীতের টান।
চার যুগ আগে শোনা ভুলে যাওয়া গান
অলৌকিক ডিস্ক থেকে উঠে এলে
কবির অন্তরে যে গান রচিত হল
সেখানে তো ফুল নেই পাখি নেই শুধু হাহাকার
গুমোট কান্নার ধ্বনি জ্যোৎস্না পাবিত প্রান্তরে
পিয়ানোর রিডে চঞ্চল আঙুলে উতলা খঞ্জনার নাচ
রাত শেষ হলে ক্লান্ত দেহটি ঘুমে ডুবে গেল।
পুলক হাসান
ভেবেছিলাম
ভেবেছিলাম তোমার ঐ প্রজাপতি হৃদয়
তুলে রাখবেই কিছু সোনা রোদ
যাতে জীবনের জলসাঘরে নিত্য ওঠে চাঁদ
বহে রাত্রি নিমগ্ন সরোদ থেকে সুরের
ধ্রুপদী স্রোত আর পাথর হয় কুসুমিত
পৃথিবীর বুক থেকে নেমে যায়
ক্লান্তি জরা অবসাদ।
এখন দেখি সেই একাকী পাখি
শূন্যে মেলে দিয়ে আঁখি
পথের দিকে তাকিয়ে শুধু রয়
জল ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়।
জাহিদ হায়দার
আবদুল খালেক আর মোবাইল ব্যবহার করবে না
সহজ মানুষ আবদুল খালেকের জন্যে
আমাদের কিছু করা দরকার।
বিপদে পড়া মানুষের দিকে হাত না বাড়ালে
হাত না থাকাই ভালো।
নীল জামার বুকপকেটে মোবাইল।
আসবে সুন্দরের ফোন।
অপেক্ষা বসন্তের কুশলসম্মত।
কোকিলও ছিল খুব মানবিক।
পার্কের তমালতলায় খালেক ভাসছিল পুষ্পকল্পস্রোতে।
শাকিরা নামের এক অষ্টাদশী ঝরনা ফোন করবে। এলো।
ফুল ফোটার গীতিনাট্যে খালেকের হৃদয় বজে ওঠে।
‘আমি তোমাকে ভালোবাসি না আর’,
বলে দূরের সুন্দর আমাদের খালেককে
ঝরনাপীড়িত পাথর করে দিল।
প্রেমের সমকালীন বজ্রপাতে
তমালের সব পাতা মুহূর্তে পুড়ে যায়।
পড়শি আর বন্ধুরা দেখে,
খালেক বুকপকেটে মোবাইল রাখছে না।
নদীকে শুধু নদী, হরিণকে শুধু হরিণ নয়
তাদের অন্য যাপন ও স্বপ্নকথা আছে ব’লে মনে করে খালেক।
শান্তির পক্ষে আর যন্ত্রের নিঃশব্দ থাবার বিরুদ্ধে
সে কথা শুনতে আর ভাবতে ভালোবাসে।
অশান্তির শহরে হচ্ছে শান্তিসম্মেলন।
খালেক ‘জ্বালাও পোড়াও’ স্লোগানের ভেতর
আলোচনা শুনতে গেছে।
প্যান্টের সামনের পকেটে ছিল মোবাইল।
‘সাম্রাজ্যবাদীরা চায় না পৃথিবীতে শান্তি আসুক,’
এই কথার পরের আসল কথা শুরু হতেই
হোয়াইট হাউজে কাজ করা তার এক বন্ধুর কল আসে।
স্মার্টফোন ছিল ভাইব্রেশন মোডে।
তীব্র কম্পনে খালেকের বোকা বোকা শিশ্ন ভয়ে কেঁপে ওঠে।
‘প্রজনন ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে না তো?’
অশান্তির ঢেউ খালেকের মানস সরোবরে !
ট্রেনে খালেক। জানলার পাশে। বাড়ি যাচ্ছে।
বাঁ হাতে শাদা ফোন। কী ভেবে কামরার চারদিক তাকায়।
সব যাত্রীর হাতে রঙবেরঙের সুন্দর মোবাইল।
কেউ কেউ গেম খেলায় ব্যস্ত। কারো কানে হেডফোন।
হয়তো বাজনার চিৎকার শুনছে।
ভাই কথা বলছে না বোনের সাথে। বোন ভায়ের।
শিশুটি মার সাথে। মা শিশুর।
পাশে বন্ধু, যদি হয়ে থাকে, কথা বলছে না বন্ধুর সাথে।
হঠাৎ খালেকের প্রিয় রিংটোন গেয়ে ওঠে :
‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’,
ফোন ধরতেই হুকুম শোনে, ‘কাল বিকালে দুই লাখ রাখবি,
বস কইছে, না দিলে গুম।’
হিমালয়ের শীত ছোট ছোট ঢেউ তুলে
তার মাথার ঘিলুতে নাচে, নাচতেই থাকে।
প্যান্টের ব্যাক পকেটে খালেক রেখেছিল ফোন।
নিজের জন্যেই ফুল কিনছিল। ফোন বেজে ওঠে।
নরম মাংসের চাঁদ কম্পনে ভীত।
তার মনে হয়, ‘পাথর পড়েছে।
পায়ুদ্বারের ক্ষতি হলে কী করবো।’
মধ্যরাত। খালেক স্বপ্ন দেখছে :
তিনজন চোখহীন মানুষ তাকে উন্নতমানের স্মার্টফোন
বানাবার জন্য ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে একটি ইস্পাতের
বাড়িতে ঢুকাচ্ছে। ঘুম ভেঙে যায়। ভয় খামচে ধরে।
পানি খেয়ে আবদুল খালেক শপথ করে :
‘আমি সহজ থাকতে চাই, জাতীয় আর আন্তর্জাতিক
ফোনকলে, কম্পনে থাকবো না আর।’
ফোন থেকে সিম খুলে ফ্যালে।
এখন শান্তিতে ঘুমাবে সে।
মাহমুদ কামাল
শব্দটি এখনো অটুট
পাখির ধ্বনির সাথে
নদীর স্রোতের সাথে
ফুলের পাপড়ি থেকে ডানা
একদিন এইসব লেখা হতো
নারীর শরীর মেখে এই শব্দাবলী।
তাকে আমি সে সময় এভাবে দেখেছি।
‘ফুল পাখি নদী আজ কাব্যে উধাও’
পড়ন্ত বেলায় সেই তুমি
নতুন উপমায়
দাঁড়ালে সামনে এসে প্রকৃতি ছাড়িয়ে
নতুন প্রকৃতি তুমি,উন্মাদনা রক্তস্রোত হয়ে
এই তুমি সেই তুমি নও।
তারপরও শব্দটি এখনো অটুট
‘প্রেম’Ñশরীরে ও মনে।
মতিন বৈরাগী
কিছুই নেইনি আমি
দেখো, খালি হাত; কিছুই নেইনি আমি রয়ে গেলো
খোলা তরবারি
সোনাদানা, সামন্ত-সান্ত্রি-সিপাই কিছু নাই, আর
তোষামোদকারী, কূটচাল-পারিষদ
দেখো রাজ্যের হাহাকার ক্রন্দনধ্বনি পায়ে পায়
আর সব ঝরে গেছে পড়ে আছে ধুলার ধুলায়
দেখো
কিছুই নেইনি আমি সব থেকে যাবে কোনো যাদুঘরে
আমার ফরমান সিলমোহর মাথার উষ্ণীষ
রয়ে গেছে স্তবস্তুতির কবিকুল ক্লৈব্যশিল্পী
ইতিহাস লিখিয়েরা; আর যত তস্কর বুদ্ধিজীবী
লোলুভ গবেষক
আমিই যাচ্ছি একা আমার গন্তব্যে
কিছুই নেইনি আমি, না রাজ্য না সিংহাসন
দেখো, এই হাত শূন্য, ঝুলে আছে –
মাটি চেয়ে আছে কোদালের মুখে
গোরখোদকের দিকে আরও একবার
কিছুই নেইনি আমি-
মুজিবুল হক কবীর
আঙুলের ইশারায়
শূন্যে তাকাই
কুয়াশা-আক্রান্ত বারান্দা থেকে
কর্মক্লান্ত হাত বাড়াই,
আঙুলের ইশারায় খ্রিস্টপূর্ব চাঁদটিকে বাঁকাই ধনুকের মতো,
মুছে ফেলি নক্ষত্র-রাজ্য, ইথারে ভাসে ভিন গ্রহের গল্প কতো,
জমাট-বাঁধা মেঘ শুয়ে রয় নিরঙ্কুশ ঘাসের ওপরে।
হালকা জ্যোৎ¯œা নামে চরাচরে,
খোলা আকাশকে মনে হয় আমার প্রিয়
পাঠশালায় ব্যবহার-করা রাফ খাতার প্রথম পাতা,
আঁকিবুকি আঁকিÑউড়ন্ত পাখি ঝাঁক-বেঁধে আসে ভোরের আকাশে।
আমি কে? আমার আঙুলে কী রয়েছে জাদুর স্পর্শ?
আমার আঙুলের ইশারায় স্টিফেন হকিংস
হারিয়ে যায় ব্ল্যাক হোলের ভিতরেÑ
মধ্য আকাশে দাঁড়ায় আর্যভট্ট ‘শূন্য’ লয়ে,
বুদ্ধের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসে আ¤্রপালী,
যমুনার পাড়ে অপেক্ষায় থাকে রাধিকা
হাওয়ায় ওড়ে তার বৃন্দাবনী আঁচল;
আমি কে?
দিকভ্রান্ত মানুষ নইÑ পদতলে
পিঁপড়ের গান নয়, সমুদ্রের গর্জন শুনিÑ
মধ্যরাতে তুমিও আমার পাশে এসে দাঁড়াও নীরবে
হারাও তোমার অনুভব,
দ্যাখো আমার কর্মযজ্ঞÑ অজ্ঞ নও তুমি।
আমার আঙুলের ইশারায়
তুমি হও নন্দনবিলাসী,
অজানা ফুলের গন্ধ আসে
পাথর-ফেটে যায় জল-ফোয়ারায়;
রূপান্তরে খুঁজি তোমাকেই।
আবদুল হাই শিকদার
বালিকা কাহন
প্রাণবতী
মায়াবতী
মেঘবতী বালিকা,
অন্তরে
কি কি আছে
দাও তার তালিকা।
সেই সব
নিয়ে টিয়ে
সাথে এক মালিকা
উড়ে উড়ে
যাব দূরে
মাগুরার শালিখা।
যেতে দেখি
পদ্মায়
পানি নেই খালি গা,
বলি ওরে
কংস রে
এইবার বালি খা,
ধুকে মরে
ইয়াকুবে
মোটা হয় কালিকা।
তারপর
মৌমাছি
হাতে নিয়ে জালিকা-
বলি তারে
প্রেমময়ী
তুমি ভব চালিকা।
জল দাও
ফল দাও
নইলে এ গালি খা
এই কথা
বলে গেছে
ধুবড়ির আলি খাঁ।
রেজাউদ্দিন স্টালিন
হেমন্তের অসমাপ্ত প্রকল্প
বহুদিন মনোভূমি খসড়া পড়ে আছে
হেমন্তের অসমাপ্ত জলরং প্রকৃতি অবধি
রাত্রির গর্ভে গুনগুনিয়ে ওঠে সেই শব্দ ও দৃশ্যকল্প
বহুদিন রোবটচন্দ্র হাঁটছে
অসীম নৈঃশব্দ কাঁধে ভোরের পেছনে
পরিত্যক্ত জলাভূমি জিভ দিয়ে চেটে নিচ্ছে
ঘাসদের গোপন শিশির
শুয়ে আছে শান্তশুদ্ধ নক্সীনদী বাঁধের শাসনে
এলুমোনিয়ামে ধোয়া তার পবিত্র শরীর
দূরে তন্দ্রাচ্ছন্ন নৌকার গুলুইয়ে বাঁধা
জেলেদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাড়ি
সবুজ পোশাক পরা বৃক্ষসেনাদের ব্রেকফাস্ট শেষে
ফেলে যাওয়া টিস্যুপত্র
কুড়িয়ে নিচ্ছে পাতাকুড়ানি ওয়েটার
আর অর্ধেক কুয়াশাশিশু ঘরে ফিরছে
নার্স মায়ের পেছনে পেছনে
বাকিরা গ্রামাঞ্চলে উড়ন্ত সসার
মনোভূমি জুড়ে এইসব খসড়া ঘোরে ফেরে
হতাশার-স্মৃতির
ক্রোধ ও ক্লান্তির
বিষাদেরও কিছু
একত্রে গুছিয়ে তোলা দুঃসাধ্য দুরূহ
যেখানে যেভাবে আছে অসমাপ্ত প্রকল্প হয়ে থাক।
জাফরুল আহসান
মেয়েটি
যাপিত জীবনে যোগ-বিয়োগের জটিল অংক কষে
না বলা কথার স্বপ্নেরা ভিড় করেছিলো অবশেষে;
ভাষার আড়ালে অসুখী ব্যথার অনুবাদ ভুল করে
উপরের সিঁড়ি ছুঁয়েছিলো সেও, ইচ্ছের হাত ধরে।
জটিল জীবনে জটলা পাকানো দহনে পীড়নে হায়
সমীকরণের ফলাফল বুঝি এভাবেই ভেসে যায়;
দুঃসময়ের পানকৌড়ি এক ভ্রুকুটি নাচায়ে হাসে
নাও খানি তার থই থই জলে জলের গভীরে ভাসে।
ধূসর আঁধারে মেয়েটির চোখ বুজে আসে বারবার
দাঁতাল শুয়োর খাবলে নিয়েছে যতটুকু পুঁজি তার;
মরণের আগে মরেছে মেয়েটি নিছক খেলার ছলে
বিষের অনলে চিতা জ্বলে আজ মানুষ দানব হলে।
শিহাব সরকার
বাঈজি বাড়িতে
ভালোবাসা ফিরে এলে পথগুলো থৈথৈ
ঝালরে-নকশায় ভেসে যায় কত গন্দোলা
চারিদিকে সেরেনাদ, যুবক ভুলেছে হৈচৈ
ভোর থেকে শুরু বজ্র-বিদ্যুতে মনদোলা।
ঘাট থেকে সিঁড়ি বেয়ে বাঈজি দরোজা
ভিতরে ঘুঙুর, শিউলির ঘ্রাণ আসে
হীরা পান্না হবে তুমি আজ ধরো যা
লণ্ঠনে চিনিনি, ঘোমটা খসেছে প্রাতরাশে।
এটা খারাপ পাড়া, নেচে নেচে ক্লান্ত নারী।
শহরের ভিতরে গুপ্ত শহরে
যেতে চেয়েছি কতবার, ছেড়েছি বাড়ি
গন্দোলা করে যাই, ছাইপাঁশ গিলি নীল নহরে।
আশেপাশে ঘোরে অশরীরী, তারা না করে
বাঈজির ভিতরে জাগি অথৈ সাগরে।
মনজু রহমান
আমিও তুলারাশির জাতক
তুমিও রহস্যে রহস্যে শীতের বিন্দু ছিঁড়ে, ফেলতে
চাইছো উজানমুখি পাহাড়ের ঢালে!
ভাবলাম, এতো শুভার্থী আমার, গড়িয়ে পড়বো!
যে কোনো রহস্য তুলে নিবে নিজের চাতালে!
আমিও যে রহস্যের নার্ভ টিপে টিপে বেড়ে উঠেছি
জলপদ্মকে ভেবেছি সেই সব রহস্যের ভ্রু
কতো নামে ডেকেছি তোমাকে; তবুও বুদ্বুদ জলে
খুললে না তোমার ছড়ানো দীঘল ঊরু!
তবে কি আমি ঢালের বিচালি! রিপু ঢাল নিচের
স্রোতবাহী নদী; সেই হবে আমার ঠিকানা?
রহস্য কি টানবে না রহস্য? নদীস্রোত নিবে না
কোন বেহুলা সঙ্গী আমার, তাও জানি না!
জানি, তোমার রহস্যারণ্যে কতোটা এগোবো আমি
জলশ্যাওলায়, জলফাঁপর সিঁড়ি দেবো পাড়ি?
রহস্য, আমিও সংকল্পে, আমিও তুলারাশির জাতক
ঠিক পৌঁছাবো, কাক্সিক্ষত উত্তাল জলজবাড়ি…
সোলায়মান আহসান
মাশুক
হয়তো গিয়েছো ভুলে জীবনের সাত দুর্বিপাকে
নিজের পেশায় বুঁদ, কিম্বা মুগ্ধ বিত্ত আর মোহে
সময়কে মেপে মেপে ব্যস্ততাকে নিয়েছো যে সহে
গড়তে প্রাসাদোপম রঙিন একক স্বপ্নটাকে।
অতীতের বাউন্ডেলে জীবনের সঙ্গী ছিলো যারা
পাহাড়-পর্বত-ঝর্ণা ভ্রমণের প্রিয় কোন স্মৃতি
মনে পড়ে আমিও যে ছিলেম, সম্পর্ক ও প্রীতি?
হয়তো বেসেছো ভালো জীবনকে, হয়ে আত্মহারা।
এভাবেই ভুলে যায় ফেলে আসা অতীত বেবাক
‘কফি হাউজের গান’ গাইবার যাও ছিলো সুখ
‘আমরা ভীষণ প্রিয় প্রিয়জনে’- আর সব থাক
যতোই ডাকুক আজ পান্থজন- মাশুক মাশুক!
আমার সময় কম তাকাবার যতোই তাকাক
ভোগের পেয়ালা যদি পূর্ণ হয়, হোক না বিমুখ।
আইউব সৈয়দ
সবুজ আড্ডার রিনিঝিনি
মধ্যদুপুরের রোদের মতো বেজে উঠল সবুজ আড্ডা, প্রেরণা আর
লাবণ্যে কর্মময় আহা। আশ্চর্য যোজনে দ্রোহের ভঙ্গিমায় দোলে। অজস্র
শিল্পের সাথে আশ্রয় নিয়েছে ধনাঢ্য স্পর্ধা। শেমিজ পরা সুরভি
ঢেউ তোলে দেখি প্রাণমন পান্ডুলিপির আচরণে। যুতসই কবিপাঠে
বুনে যায় শ্রমের কাব্যিক কথন। আড্ডারু ইতিহাস চর্চার রূপময়ী
পাঁচালীর কথা বললো। কলসিভরা অবমূলায়নের সুযোগ নেই কোনো। ওই তো
উত্তরাধুনিক যুগ রাঙ্গা- নতুন গতিধারার রসতৃষ্ণাগুলো মনের শিরায় সবিস্তারে
বাঙ্ময়- ধূূমায়িত চায়ে কলোলিত করছে ভূমি। এফোঁড় ওফোঁড় ধোয়াশা নয়
প্রশস্ততা; রিজোয়ানী নগরে সুঢৌল শব্দ পায় বাতাসের ছন্দ। ফলত জরিদার
গদ্য-পদ্য গর্ব ও বিজয়বেশে টোকা দেয় সমবায়ী উত্তরমেঘের ন্যায্য অধ্যায়ে।
মোশাররফ হোসেন খান
শীত নাকি আগ্নেয় প্রপাত
এবার শীতে ক্ষেত ভরা তরতাজা সবজির বদলে
লকলকিয়ে উঠছে বুক ভরা কষ্টের লতা গুল্ম।
নাড়ার আগুনেও উষ্ণ হয় না ব্যথাতুর হৃদয়!
এটা কি শীত? নাকি আগ্নেয় প্রপাত!
পুকুর নদীতে শীতের কুয়াশা আর ভাপ ওঠার বদলে
ক্রমশ দীর্ঘতর হচ্ছে মানুষের দীর্ঘশ^াস
কোথায় হারিয়ে গেল গোটা বাংলার শীতের বৈভব!
যে মৌসুমে চলার কথা পিঠা পায়েসের ধুম
সেখানে চলছে নিঝুম নীরবতা আর মৃত্যুর ঘুম!
ভয়ে সাইবেরিয়ার অতিথি পাখিরাও আজ
গুটিয়ে নিয়েছে ডানা।
পাখি শিকারের বদলে এখন অনেকেই
মানুষ হত্যাকেই বেশি তৃপ্তির বলে মনে করে।
আহা! শীতের বিরহী পাতারাও কেবল ক্রন্দনরত
তারা ঝরে শুধু ঝরে…
তুমিই বলোÑ
এটা কি শীত? নাকি আগ্নেয় প্রপাত!
যাদের উঠোনগুলো ভরে যেত সোনালি ধানে
যে বাড়ি মৌ মৌ করতো খেজুর গুড়ের ঘ্রাণে
চাতকী চাহনিতে যে গৃহিণীরা তাকিয়ে থাকতো
বলদের পিছে দাবড়িয়ে ছোটা কিষাণের দিকে
কিংবা ছেলে তার কখন আসবে ফিরে,
তারা আজ খিল এঁটে বসে থাকে ঘরে।
তাদের বুক কাঁপে থর থরÑ
কোথা থেকে যেন ভেসে আসে
মায়ের কান্নার রোল পর পর…
বিশুষ্ক গলায় সন্ত্রস্ত হৃদয়ে কাশে
হায়! থপ থপ পায়ে কোনো হন্তারক যেন আসে!
এটা কি শীত? নাকি আগ্নেয় প্রপাত!
ছোলা পোড়া খেসারি পোড়ার
সাথে খেজুরের রস এখন আর হয় না খাওয়া,
বিষাদে বিদায় নিয়েছে মটরশুঁটি, শর্ষে ফুল,
রসের বদলে রক্তে রক্তে জোয়ার এখন নদীর দু’কূল!
এমনি দুঃসহ কালÑ
বিল ঝিলেও বসে না আর ঢাড়স বকের ঝাঁক
হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে
মাচাসহ ডাগর লাউ-পুঁয়ের চাল।
থর থরিয়ে কাঁপছে যারা
তারা শীতে নাকি তারও অধিক আতঙ্কে!
একবার জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো
কোথায় হারিয়ে গেল এখন
আমাদের অতি চেনা বহু গৌরবের শীত মৌসুম?
চারপাশ থেকে খবর আসে ক্রমাগত
হত্যা খুন আর গুম!
এটা কি শীত? নাকি আগ্নেয় প্রপাত!
শুধু বাংলা বা এশিয়া কেন,
পৃথিবীর কোথাও কি আছে এতটুকু মৌসুমী সুখ?
বৈরী আগুনে ঝলসে গেছে তাদের কমনীয় মুখ।
ঐ দেখো জ¦লন্ত চুলায় শোক তাপ যন্ত্রণা বেদনার
কেমন হচ্ছে রান্না, কেউ কি শুনতে পাওÑ
বিশে^র মানুষ ও মানবতার কান্না!
এই শীতেও হিমালয় থেকে ঝরছে যেন আগ্নেয় প্রপাত!
চারপাশে ঘুরছে কেবল কাক শকুন মশা আর মাছি,
আমি তবু আশান্বিত বুকে
একদল ঘোড় সওয়ারির প্রতীক্ষায় দূরে-বহুদূরেÑ
এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি!
খালেদ হোসাইন
তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই
তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই,
তাই তোমাকে নিয়ে কবিতা লেখি।
আমি যখন জেগে থাকি, তুমি আমার সঙ্গে থাকো
আমি যখন ঘুমিয়ে থাকি, তুমি আমার সঙ্গে থাকো।
আমি যখন স্বপ্ন দেখি, দেখি কেবল তোমাকে।
আমি যখন জেগে উঠি, দেখি কেবল তোমাকে।
আমার কোনো তন্ত্র-মন্ত্র নেই, তুমি ছাড়া
আমার কোনো স্বরযন্ত্র নেই তুমি ছাড়া
আমার নিশ্বাস তোমার দিকে ধেয়ে যায়
প্রশ্বাস তোমাকে ছুঁয়ে আমার কাছে আসে।
সন্ত্রাসে বিধ্বস্ত জনপদে দাঁড়িয়ে আমি ভাবি
তোমার কথা
দ্রব্যমূল্যের বিপর্যয়ে দাঁড়িয়ে আমি ভাবি
তোমার কথা
আকাশে বোমারু বিমান, মাটিতে স্থল-মাইন
রক্ত ও লাশের মাখামাখি
আমি তোমাকে ডাকি, তোমাকেই।
আকাশে মেঘ, মাটিতে জোছনা
বাতাসে চন্দনঘ্রাণ
আমি তোমাকে ভাবি, তোমাকেই।
আমি বেঁচে থাকতে চাই কেবল তোমার জন্যে
আমি মরে যেতে চাই কেবল তোমার জন্যে
তুমি ছাড়া আমার আর কিছু নেই
তাই আমি তোমাকে নিয়ে বেঁচে থাকি।
জানি, আমার নিশ্বাস তোমার নিরাপত্তাব্যূহ পার হতে পারে না
আমার প্রশ্বাস তোমাকে স্পর্শ করতে পারে না, তবু
তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই,
তাই তোমাকে নিয়ে কবিতা লেখি।
মাসুদ খান
কবি
থেমে গেছে গভীর গুজবে-ভরা জঙ্গলের ফিসফিস-ধ্বনি।
তুখোড় তুফানে ঢেউয়ে-ঢেউয়ে মারমুখী যে-দরিয়া ছিল
এইখানে একদিন, সেও সরে গেছে দূরে।
যে-পাহাড় ছিল ঝরনা-ঝরানো
যে-পর্বত ছিল যুক্তাক্ষরে জটিল
ভোঁতা হয়ে মিশে গেছে তারা সমতলে।
এখন কোথাও কোনো শব্দ নেই আর,
নিসর্গ মিউট করে দিয়েছে সব।
কবিকে চ্যালেঞ্জ করে নিসর্গস্বৈরিণী।
সখেদে গ্রহণ করে কবি সে-চ্যালেঞ্জ। আর সেই থেকে-
টুপ করে ঝরল কি একবিন্দু শিশির কোথাও
মিহি শব্দ তুলে ফুটল কি ফুলের কোনো কুঁড়ি-
স্রেফ ওইটুকু সূক্ষ্ম শব্দ, অতটুকু ধ্বনি গ্রেফতারের লোভে
তেজস্ক্রিয় শজারুর মতো
ওৎ পেতে, উৎকর্ণ উৎকণ্ঠ হয়ে বসে থাকে কবি
তীক্ষè শলাকার মতো সবকটি সুবেদী অ্যান্টেনা
খাড়া করে দিয়ে একযোগে
ঝোপের আড়ালে, গিরিকন্দরে, পথের বাঁকে, সিংহের বাংকারে,
শেয়ালের গুহায়, সেতুর নিচে, দ্বীপান্তরে, নদীবন্দরে, অরণ্যমর্মে,
বনের উৎকেন্দ্রে-কেন্দ্রে…
যেই ঝিলকে ওঠে ধ্বনির ফুলকি কোথাও
কিংবা আধো-আধো যেই ফুটতে চায় শব্দের অঙ্কুর,
অমনি অ্যামবুশ ভেঙে ক্ষিপ্র চৌকশ চিতার
ভঙ্গিতে লাফিয়ে পড়ে কবি,
খাবলা দিয়ে তুলে এনে কবিতায় বসিয়ে দেয়
সদ্য-ফোটা ফুটফুটে শব্দের অঙ্কুর।
তমিজ উদ্দীন লোদী
পুরনো স্লেটের মতো
পুরনো স্লেটের মতো মুছে যাচ্ছে লেখাগুলো
স্মৃতিও কি মুছে যাচ্ছে?
সারস উড়ে যাবার দৃশ্য, পানিউড়ি কিংবা শামুক-ভাঙা
পাখিদের মৎস্য শিকার
সবই কি মুছে গেলো স্মৃতি সরোবর থেকে অকস্মাৎ?
দুপুরের ঢুপি পাখি, নীরবে ঝরে যাওয়া হিজল কি জারুল ফুল
আঠায় জড়ানো টি-কাঠি, গোল মার্বেলের গড়িয়ে যাওয়া,
গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, লুকোচুরি খেলা
ইরেজার দিয়ে মুছে গেছে কেউ।
খুব অপরিহার্যের মতো মুচি বাড়ি, ঘোষ পাড়, ক্ষৌরকার
কামারের হাপর টানার শব্দ, স্বর্ণকারের সোনালি শিল্পকর্ম
বৈচিত্র্যপিয়াসী আমাদের জনপদ
হারিয়ে কি গেল খুব নিরিবিলি?
যেন চোখ ঠেরে, পাশ কাটিয়ে, সতর্কে পেরিয়ে যাওয়া অন্ধকার
ক্রমশ বিবর্ণ হয়ে যাওয়া দেয়ালের মতো সম্পর্কের রঙ!
যেন ধসে যাওয়া পোড়া বাড়ি, প্রতিধ্বনিময়
একটি অপ্রাকৃত হাসি চারিয়ে যাচ্ছে চারপাশে।
বিস্মৃত পর্দায় কাঁপে পবিত্র রক্তের দাগ
শুধু পড়ে থাকে দীর্ঘশ্বাসের উদ্ভাস
বিষণœতায় নেমে যায় ততোধিক বিষণœ কোনো দিন।
সমূহ বিভ্রমের ভেতর কেঁপে ওঠে ছেঁড়াখোঁড়া সম্পর্কের সুতো
শোক জেগে ওঠে, শিরিষ পাতার ভেতর ডেকে যায় ক্লান্ত এক পাখি।
ইকবাল করিম রিপন
নাচতে নাচতে আজ উঠোন বাঁকা
কেন যেন মনে হয়
নাচতে নাচতে আজ উঠোন বাঁকা
আধবোনা ফসলের পুরোনো ফসিল
নিত্য মাঠে মাঠে
ফাঁকা বিস্তারে আত্মনিয়মে
হননের গল্প বুনে চলছে।
চাষীরা অশ্বডিম্ব হাতে
কেন যেন গুপ্তধন লুকোয়, আর
লেনদেন চুকিয়ে বুকিয়ে
দাদনের বারোমাসি হাহাকার
আষাড়ী গল্পের রসে
লুপ্ত অঙ্গ বের করে চষে…
কোথাও কোন গড়মিল নেই
সব ঠিকঠাক এই প্রহরে
গঞ্জে শহরে
বিস্তর বয়ানে রটেছে রঙ্গ
এই বঙ্গ-বাদ্শালয়ে,
হোজ্জার গ্রেক্ষাগৃহ হাউজফুল
তবে কি হোজ্জা এসেছে এই বঙ্গে!
গোলাম কিবরিয়া পিনু
সমুদ্রের জেলে
সমুদ্রের জেলে আমিÑ হই জলগামী
পিঠমোড়া কষ্ট নিয়ে
দিন পার করি, রাত পার করিÑ শক্ত হাতে জাল ধরি
কালাপানি-নোনাজল-অকূলপাথার!
আমি সেই জলদাসÑ ঘাস পেরিয়ে যাই
আমি সেই মালোÑ কালোমেঘ দেখতে দেখতে যাই
আমি কৈবর্তÑ শর্ত পূরণে যাই
প্রলয়মেঘের ভেতর মেঘধ্বনি শুনি
বারিপাতের ভেতর বজ্রধ্বনি শুনি।
দাহদিন ও হিম ঋতুতেÑ
ঘরছাড়া হয়ে ট্রলারে নৌকায় থেকে
ঝুঁকি নিয়ে উঁকি মেরে আকাশটা দেখি
উপকূল-দুল পরে নেইÑ তরঙ্গসঙ্কুল
শারীরিক সামর্থ্য-সাহস ছাড়া আমাদের কোনো সম্পদ নেই
নেই রেডিও সিগন্যাল, নেই দিগদর্শন
নেই লাইফজ্যাকেট, নেই বাঁচার অস্ত্র
জোনাক জ্বলে নাÑ জলদুস্যুর সার্চলাইট জ্বলে!
টহলদার কার নিরাপত্তা দেয়?
আমাদের শোণিতধারায়Ñ দায় নিয়ে
অপরের আমিষ-চাহিদা পূরণ করতে থাকি
মহাজন সমুদ্রের চিল হয়ে নজরদারি করে
মাছশিকারি পাখিরা মাথার উপর
কুমির ও হাঙ্গর হাঁ করে থাকে!
ঘুরণজালের ভেতর মাছের লাফালাফি দেখতে দেখতে ভাবি
এখনো আমরা ভাগ্যশাসিতÑ
ঋতু পরিবর্তনের পরওÑ আমাদের পরিবর্তন নেই
জলস্ফীতির ভেতর আমাদের দুঃখের স্ফীতি দেখে
তিমি ও সিলমাছও কাঁদে!
বসন্তবাতাস উপকূলবর্তী হতে পারে না বলেই
আমরা এখনো ফড়িং ও রাজহাঁস হতে পারি না!
শাহীন রেজা
মরাগাঙ্গে জীবনের পাল
চোখের আড়ালে ছিলে কতোরূপ হয়নি তো দেখা
অযুত প্রাণের কথা হয় নাই কবিতায় লেখা
পাখিরা গিয়েছে ডেকে তবু ফুল ফোটে নাই গাছে
দেখিনি আলোর ছবি তার বুকে কতো প্রেম আছে
হয়নি ডাহুক আঁকা জলবনে নিকষ আঁধার
কেবলি হয়েছি মনে এ জীবন শুধুই বাধার
আকাশে ছিলোনা ‘তারা’ মেঘলোকে বিনাশের ডাক
পুড়েছে দিনের রাখি পুড়ে পুড়ে হয়ে গেছে খাক
দুপুর আরতি ফেলে শালিকেরা পালিয়েছে দূরে
বেজেছে বিরান বাঁশি স্বকরুণ পলাতক সুরে
সেসব এখন স্মৃতি কোন এক দুঃখময় কাল
তোমার ছোঁয়াতে আজ মরাগাঙ্গে জীবনের পাল
এসেছো প্রণয় তুমি নেড়ে নথ আকালের ভূমে
তোমাতে জীবন আঁকি তোমাতেই সুগভীর চুমে।
শিমুল মাহমুদ
প্রেম ও প্রেমহীনতার কবিতা
আমার জাহাজি দাদাঠাকুর বোতলের ভেতর এক টুকরো প্রেমপত্র লিখে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন ভারত সাগরে। শুনেছি সেই থেকে কবিতার জন্ম। দুশো বছর পর দাদিঠাকুরণ সেই বোতলবন্দি প্রেমপত্র খুঁজে পেয়ে লুকিয়ে রাখলেন কোন এক কালো পাথরের বাক্সে। আমি সেই কালো পাথরের বাক্সটি খুঁজছি। আমি তোমাকে ভালবাসার আগে কালো পাথরটির ঢাকনা সরিয়ে দেখতে চাই কী লেখা ছিল বোতলবন্দি-লিপিচিহ্নের ভেতর। কবিতা অর্থ, প্রেম। আর প্রেম অর্থ, শ^াস ও প্রশ^াসের সাথে ঝরতে থাকা লিপিচিহ্নের অদৃশ্যপাঠ উদ্ধার।
রেজা ফারুক
বন-অরণ্য
আচমকা শীত নামে ডুয়ার্সে, দেরাদুনে
শীত নামে জলসিঁড়ি ফোয়ারার মর্মরিত প্রাণে
দূর দূরান্তরে বরফাচ্ছাদিত পাইনের শাখার মতো
থামে রৌদ্রহারা আবছায়া ভোরে টয় ট্রেন
দোয়েলের শিসের মতো হিল্স্টেশনে !
ঝম্ঝমে একহারা বৃষ্টি নামে তোমার রিসোর্টে
আর তুমি তোমার ছায়ার উপচ্ছায়া থেকে খুটে খুটে
নীলাভ তারার শবনম:
খুলে তুলে রাখো কুয়াশার মিহিন টিপয়ে
বলো করৌঞ্জ, বলো ক্রিসেন্থিমাম
তোমাদের মনোগ্রামহীন চেঞ্জের আকাশ জুড়ে
ওড়ে কার সিল্কি হাওয়ার কেশর থেমে থেমে
আর এক ভবঘুরে ঘু ঘু
খুব বিকেল বেলার দিকে
খুব সন্ধ্যে বেলার মৃদু জ্যোৎস্নার জাফরানি রেলিঙে ঝুঁকে
দেখে কী নিটোল স্লিভ্লেস মেঘেদের কোমল মস্লিন
লাল স্কার্ট পরা এক মর্নিং রোজের ঠিক থুত্নির কাছে
তখনো কী ফুটেছিলো তরুণীর রিস্ট্ওয়াচের মতো
কালো বেল্টে মোড়ানো পার্ক স্ট্রিট!
ঝোড়ো তরুণের মতো আচমকা শীত নামে
ক্যাফেটেরিয়ার বিষন্ন টেবিলে টেবিলে
মনোরেলে বেজে ওঠে শিশিরের মতো উজ্জ্বল
ভায়োলিন, পিয়ানো, গিটার
ডায়মন্ড হারাবার থেকে সল্টলেক্
ক’ ফার্লং দূরে
কতোটা ওপরে উঠে নেমে আসে ফুরফুরে
নিজের বুকের কাছে রেইনট্রির ঘন লাল চূড়ো !
বন অরণ্য থেকে ফিরে তুমি পাখির লেজের মতোন ক্ষীণ
তোমাদের হট্টিটি পাখি ডাকা
মফস্বল শহরের গলায় জড়ানো ধূসর মাফলারের মতো
নিভৃত নদীর কাছে এসে পেয়েছো কী
তোমার লাল, নীল হারানো মার্বেল
ইন্টারভেল্ টানা দিবসের ঝাপ্সা স্কেচ্ থেকে
ঝরে পড়ে চক্খড়ি দিয়ে আঁকা নার্সারি মন
ফিঙের পুচ্ছের মতো ছোট্ট হিল্স্টেশন
আজো কী রেখেছে হৃদয়ে পুষে
তোমার কুহকডোবা কারচুপি ছায়ার বর্ষণ!
হাফিজ রশিদ খান
আমার কৃষ্ণাভ নায়িকারা
আমার কৃষ্ণাভ সেই নায়িকারা হারালো কোথায়
জেগে আছি যাদের ভালোবাসার একরত্তি স্নিগ্ধ সভ্যতায়
স্মৃতির ভেতরে মর্মরিত কৃষ্ণাভ সুদর্শনারা
তোমরা কী বহুদূর চলে গেছ ম্যাড়ম্যাড়ে
চাটগাঁ শহর ছেড়ে
অজপাড়া গাঁয়ের কিনারা
ভুলে সব রঙিন ইশারা
চারদিক ঝোপালু পুকুরে সিনান করছ লুকিয়ে-লুকিয়ে
তেজি রোদ আর খোলা হাওয়াকে গতর দেখিয়ে
তোমাদের চোখের বিদ্যুৎরেখা
কাঁচুলির পিছে উষ্ণ উত্তেজনার গভীর দেখা
আজো আমাকে উজ্জ্বল প্রেমিক সাজিয়ে রাখে
পুষ্পাঞ্জলি হয়ে তাই হাজার পাপড়ি মেলে
বসে থাকি এই শহরের বাঁকে-বাঁকে
আশা, যদি নিয়ে যাও মোরে
ঝলমল জরদ হাসিতে বিয়ে বার্ষিকীর গোপন বাসরে …
রহমান হেনরী
স্টেশনের গল্প
বহুকাল কোনও ট্রেন আসে না; প্লাটফর্মসহ উড়ে গেছে স্টেশনÑ
যেখানে রেল লাইন ছিলো, সমান্তরাল আর অস্পষ্ট
রেখার নিশানা পড়ে আছে; কাত হয়ে পড়তে পড়তেও
ঝুলে আছে একটা বোর্ড, সেখানে, মুদ্রিত পৃষ্ঠার মত
সারিবদ্ধ লেখাগুলোÑট্রেনের সময়সূচি;
পরিবর্তন আর অনিবার্য বিলম্বের গল্পগুল্ওো বিস্মৃত নই—
তবু, জানি, বর্ণিত সূচির কোনও না কোনও একটা ধরে
নিশ্চিত চলে আসবে তুমি;কিন্তু
সময়সূচি তো যেকোনও চব্বিশ ঘন্টার জন্য!
দুই শতাব্দী অপেক্ষায় আছিÑ
এখন, এমন একটা ঘড়ি চাই— যার কাঁটাগুলো
সেকেন্ড-মিনিট-ঘন্টার বদলে: দিন, মাস ও বছরের;
এমন একটা ক্যালেন্ডার প্রয়োজন
যেখানে তারিখের ঘরে বছর, মাসের ঘরে শতাব্দী—
জানি, আসবেই ট্রেন; আমরা তোমারই প্রতীক্ষায় আছি;
টোকন ঠাকুর
শীতপত্র
এই পত্রে কমবেশি কুয়াশা লেগে থাকবে সেটাই সহজ প্রকল্প
যেহেতু মাকড়সার জালের সঙ্গে কুয়াশার একটি ইঙ্গ-মার্কিন চুক্তি রয়েছে
এই পত্রে কমবেশি শিশিরও জড়িয়ে যাবে সেটাই সরল গল্প
কেননা, সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়েও একদিন চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ে
আমি সতর্ক, যথা কুয়াশার কথা লিখছি না, কুয়াশাই আমার সঙ্গে
পথে পথে রহস্য প্রস্তাব করছে
আমি সজ্ঞান, তথা শিশিরের কথাও লিখছি না, শিশিরই আমাকে বরং
নিঃশব্দে পতন শেখাচ্ছে
পত্রে আমি তোমার কথাও লিখছি না, তুমিই শাদা কাগজের উপর
লেখা হয়ে হয়ে যাচ্ছ
পত্রে আমিও সময়ের কথাও লিখছি না, ঘড়ির কাঁটাই কালো কালো অক্ষরে
নৈশ-ধারণাকে ঘনীভূত করে তুলছে
যদিও, আমি লিখতে চেয়েছিলাম, একটি হলুদপাতা ঝরানৃত্য কোথায় শিখেছে?
প্রেমিকমনের ছাপচিত্রে অসংক্ষিপ্ত অভিপ্রায় জানাতে চেয়ে পত্রে আমি
বাল্যমাঠের শর্ষেফুলে প্রজাপতির রঙিন আত্মজীবনী লিখতে চেয়েছিলাম
যদি আত্মহত্যা করি তো এই পত্র আত্মহত্যার আগে লেখা অসংলগ্ন চিরকুট :
আমার মৃত্যুর জন্য এবারের অপার্থিব শীতকালই দায়ী।
শামীম রেজা
আমি এক সাগরে ভাসা ক্রীতদাস
এই সমুদ্র মায়ার, এই সমুদ্র ধাঁধার
ক্রীতদাস- ক্রীতদাসী হয়ে এই সমুদ্রে ভাসছে
আমারই মা-ভাই-বোন
অভিবাসী স্বপ্নে বিভোর, সাঁতার না জানা এ-সব স্বজন।
শ্বেতপদ্ম হাতে জন্মেছিলে, মুক্ত-স্বাধীন দেশে, আমার মতন।
গভর্মেন্ট ফেরারি এখানে, বুদ্ধিজীবীরা বাকুড়ার পুতুল সকল
ক্যাফে জ্বলছে, চলছে সংসদ; বারে নাচছে বয়সী বেশ্যা
মুদ্রা জমছে কতিপয়ের হাতে, যারা মানুষ নামে নকল।
স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে নীলজল, সাক্ষী টুনা-ফিস, হার্পুন মাছ
শ্রম লুট হবার আগেই শরীর হারিয়ে
বসে আছে যেন মৃত অক্টোপাস।
চোখ টিপে হাসছে আন্দামান, আচেহ প্রদেশ;
রক্তের ঢেউগুনে দুঃস্বপ্নের স্বদেশ; থ্যাঁতলানো সময়
রক্তপায়ী দালাল ঘুরছে যেন মৃত দূত করছে প্রণয়।
ও ফুল গাডিওলাস, তুমি কি গাডিয়েটরদের চেনো?
যারা ভাসছে মালয় সাগর আর আন্দামানে
আমিও যেন ভাসছি তাদের সাথে, তারা কি বেঁচে আছে এখনও?
মৃত্যু জাদুকরের মুখের ভিতর লুকানো এক শকুন
ঘুমের ঘোরে পরজন্মের কাফনের পাখি ওড়ে মনে আমার
শোনো প্রণয়িনী পাখি ওগো বুবুন
ওড়ার ঠিকানা জানা নেই যে পাখির ডানার
সেই পাখি আমি; দেখো ওরা ভাসছে অথৈ নোনাজলে
আয়ু রেখা মুছে গেছে যার, স্বপ্নজীবী চোখের গভীরে
সে যে নিহত শিকার।
আমিনুল ইসলাম
অপ্রস্ফুটিত দুপুর
প্রভাতী পাহাড়ে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে ঝর্ণা
চারপাশে কুয়াশা রঙের ছায়া
বাঘ সাপ শেয়ালের চোখ
হাতের তালুতে সূর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সময়
অর্ধ-আবৃত পৈথানে
ছোঁয়ামাত্র রাজকুমারীর চোখ মেলে
জেগে উঠবেন পরী
জেগে উঠেই হয়ে যাবেন স্রোত ঢেউ বাঁক;
কিন্তু কোথাও কোনো নৌকার ছায়া নেই।
ভীরু সকাল হয়ে কাঁপছে অপ্রস্ফুটিত দুপুর!
সায়ীদ আবুবকর
বলো তারপর কোথায় আমরা যাবো
এত মৃত্যু, এত লাশ
এত ধ্বংসযজ্ঞ, এত সর্বনাশ
আর ছোপ ছোপ এত রক্তের উপর দিয়ে হেঁটে
হয়তো বা স্বপ্নের সে গেটে
পৌঁছে যাবো ঠিকঠিকই, যে রহস্যময় গেট খুললেই
সাফল্যের সাজঘর-
তারপর?
বলো তারপর কোথায় আমরা যাবো? ধু-ধু নীল
আকাশে কেবলি ওড়ে আজ বাজপাখি, শকুন ও চিল।
জীবনের রাজপথে ক্ষুধার্ত শেয়াল ডাকে।
সেই ডাক
টেনে আনে ঝাঁকে ঝাঁকে
কি-বীভৎস বন্য সব সাদা কাক!
মানুষের কান
শুনতে পায় না আর কোনো কোকিলের গান।
মানুষের চোখ
দেখতে পায় না আর সবুজা অরণ্য কোনো, শুধু দ্যাখে
বৃক্ষহীন, পুষ্পহীন এক জ্বলন্ত নরক।
এইসব জাহান্নাম পার হয়ে হয়তো সে সফলতা,
যার কথা
বলে চলে আমাদের ওষ্ঠ ও অন্তর-
তারপর?
বলো তারপর কোথায় আমরা যাবো?
যে-অর্জনে মানুষের খুন লেগে থাকে;
যে-অর্জন সভ্যতাকে
করে যায় ছিন্নভিন্ন, বিকলাঙ্গ, হীন;
যে-অর্জনে বাড়ে শুধু মানুষেরই দুর্ভোগ-দুর্দিন;
যে-সাফল্যে পথে পথে পড়ে থাকে অগণন মানুষের লাশ-
তাই নিয়ে হয়তো বা বিজয়উল্লাস
করা যায় পথে পথে, হয়তো বা সেইসব লাশের উপর
সদম্ভে দাঁড়িয়ে গাওয়া যায় বিজয়সঙ্গীতও- কিন্তু তারপর?
তারপরও আমরা কি রয়ে যাবো
মানুষের জাতি? তারপরও আমরা কি বয়ে যাবো
মানুষের মন, সুকঠিন আমাদের বুকের ভিতর,
নাকি আমরাও শেষমেশ হয়ে যাবো
দুই পেয়ে এক নিকৃষ্ট ইতর?
শোয়াইব জিবরান
অমরত্ব
তাদের কাপড়ে পুরে পুঁতে ফেলছে লোকে
ছাইভস্ম বানিয়ে উড়িয়ে দিচ্ছে শ্মশানে
এইসব হুমকির সামনে অমরতার সাধনা করছি, দেবা।
ছায়াবন
দৃশ্য গেঁথে গেঁথে চলেছ, দৃশ্যশিকারি।
দৃশ্যের অন্তর্গত বেদনা হতে, বর্শার ফলা চুঁইয়ে
পড়েছে ফোঁটা ফোঁটা, ছায়া।
কমরুদ্দিন আহমদ
পুরাকীর্তি খননের কৌতূহল
দেবিদ্বার থেকে ময়নামতি ওয়ারসিমেট্রি
সংক্ষিপ্ত ভালোলাগার ইতিহাস
আচমন স্বপ্ন গাঁথা গোমতির জলে বহমান
ভালোলাগা থেকেই তো ভালোবাসা হয়
বছর খানিক পর মুঠো ফোনে
জানতে চায় লীলুÑ
হৃদয়ে টিপ জ্বেলে শতোবার
অন্ধকার রাতের খোঁপায়
আজ জানা হলো দাহনের ক্ষত অম্লান
ঝলসে যাওয়া মায়ার বাঁধন
পুরাকীর্তি খননের কৌতূহল
বার্ড-ওয়ারসিমেট্রি-দেবিদ্বার
ভালোবাসার আবাদি সড়কে নাছোড় মড়ক
কাজী নজরুলসহ
সকল প্রেমিক এক ডোরে বাঁধা।
জাকির আবু জাফর
অন্য স্বপ্নের কাহিনী
স্বপ্নের ভেতর ডুবে থাকো তুমি
তোমার ভেতর ডুবে থাকে স্বপ্নরা
এ এক অন্য স্বপ্নের কাহিনী
এ এক অন্য আনন্দের গল্প
যেভাবে তুমি বুক পাতো বাতাসের বুকে
যেভাবে চোখ রাখো বৃষ্টির শরীরে
ঠিক সেভাবেই রাখো হৃদয়ের সব ক’টি নদী
নদীরও আকাশ থাকে
আকাশেরও থাকে নদীগন্ধ মন
যখন আকাশ থেকে নামে জগতের সমস্ত সন্ধ্যার মুখ
কে তখন চোখ রাখে সন্ধ্যার চোখে
সন্ধ্যার আকাশেই জ্বলে ওঠো তুমি
ঠিক জোনাকিরা যেভাবে জ্বলে ওঠে আপন শরীরে
কী স্বপ্ন বুকে নিয়ে জ্বলে জোনাকি
জ্বলতে জ্বলতে কী গান গেয়ে যায় রাতের ডেরায়
জোনাকির আলোর মতো কোমল তোমার স্বপ্নরা
কোমলতায় ভরা স্বপ্নের আঙিনা
কেবল তোমাকে ঘিরে
এবং তোমাকেই ঘিরে
তোমার দুচোখে যতটা আকাশ আছে
সবটাই স্বপ্নের সম্ভ্রান্ত রঙ
তুমি যাও সেই স্বপ্নের ভেতর
যে স্বপ্নরা ডুবে থাকে তোমার বুকে
যেমন নদীরা ডুবে থাকে নদীর ভেতর।
কামরুজ্জামান
পায়ের শব্দ
পরিচিতি কেউ হেঁটে গেলে
তার পায়ের শব্দ টের পাই।
সবারই পায়ের একটি আলাদা শব্দ আছে
তরুণীরা হেঁটে গেলে ছন্দ লেগে থাকে পায়ে
যেন চেনা জানা কোনো নৃত্যর মুদ্রা
তরঙ্গে ফিরছে অবিরাম।
কোনো যুবক হেঁটে গেলে, যেন ভাঙছে পাহাড়
রাজ্যের সমস্ত অপরাধ লুটিয়ে পড়ছে পায়ে।
বাবা যখন হাঁটেন বারান্দায়
আমি বাবার পায়ের শব্দ টের পাই,
বাবা হাঁটছেন মধ্যরাতের অন্ধকারে একাকী।
কেমন গভীর তার পায়ের শব্দ,
যেন বারবার থমকে যাচ্ছে স্তব্ধতার সৌন্দর্য।
এভাবে পরিচিত মানুষগুলোর পায়ের শব্দ
গভীর হতে থাকে নিঝুম স্পর্শহীন রাত্রির মতো।
এমন গভীর হতে হতে ক্রমশই মিলিয়ে যেতে থাকে
দূরে, অনেক দূরে রহস্যময় সীমানার ও’পারে
যেখান থেকে, আর কোন শব্দ
কোনদিন, ফেরে না কখনো।
শেলী নাজ
ক্ষুর
প্রতিটি নারীর হৃদপিণ্ড যেন এক শূন্যতার রাজধানী
জঙধরা আরশিনগর, আমি সে নগরে নিঃস্বতার রাণী
শূন্যতা জাগছে একা, আমি তার একান্ত ময়ূর
ঘুমিয়ে পড়েছি বেদনার নীল মখমলে, জেগে আছে ক্ষুর
চাঁদের বুকের মধ্যে, রাত্রির নীরব বীভৎসতায়, প্রহ্লাদনগরে
সেই ক্ষুর চিরে ফেলে অহল্যা শান্তির মুখ, ঘুমের শহরে
জোছনার অপার নিকেল রক্তের কুহকে একা ভেসে যায়
শূন্যতার রাজকোষ ভরে গেছে বেদনার অপূর্ব মুদ্রায়
সেই মুদ্রা দিয়ে কিনি সাটিনের শয্যা, স্তব্ধতার শিস
মধুর ভেতর থেকে জেগে ওঠে বিষাদপ্রবাহ, মধুমতি বিষ
কামারশালা জাগছে, ফুঁসছে হাপর, আমি সেই স্বর
লুকিয়ে রেখেছি, উচাটন শিরিষের গোঙানির ভেতর
একরত্তি জামার গভীরে ছলাৎছল পৃথিবী কাঁদছে একা
মাস্তুলে চাঁদের লাশ, জেগে আছে কুলুঙ্গিতে শিখা
প্রতিটি নারীই বহন করছে হৃদপিন্ডে বধ্যভূমি, রক্তপুর
পুরুষের ফেলে যাওয়া প্রেমের সাপলতা, ফণা, ক্ষুর!
খুরশীদ আলম বাবু
রোদে পড়া স্বরের গান
কথাশিল্পী নাজিব ওয়াদুুদকে
দিন ফুরোলেই দুঃখ ফুরোবে এমন কথা তো নেই,
দুঃখকে তাই বৃক্ষের মত জানি,
রোদে পোড়া স্বর স্বরবর্ণ হলেই
দুঃখের নদী ডাঙাতেই কানাকানি-
কবে শেষ হবে। ব্যথার শিকলে হবে সব ¯্রােতস্বিনী।
জলে ধোয়া মন জলেতে যায় না গলে,
চোখের তৃষ্ণা কায়াহারা কোলাহলে
বাউরি বাতাসে মর্ত্যে ফোটার মত
করে যায় কাকে ঋণী?
এবারের শীতে তোমাকেই দেখে ভেবেছি অনেক দিন,
ব্যথার চিঠিটা হোক সুবাসিত,
ব্যথাময় দিন হোক না যতই শিল্পিত রঙিন
দিনগুলি সব কাটা-কর্তিত।
রাতগুলি সব ক্ষত বিক্ষত
সীমারের মত গর্দানে দেয় কোপ,
নিয়ম মাফিক প্রতিদিন বাড়ে বাঁচার গুল্ম ঝোপ।
এইভাবে পার হয় মাস পঞ্জিকার-
দিন ফুরোলেই দুঃখ ফুরোবে,
এমন দিব্যি আমাকে দিও না আর।
রোদে পোড়া স্বর রোদেই হোক নির্ভার।
ওমর বিশ্বাস
প্রার্থনা
আগুনের উত্তপ্ততা থেকে বাঁচতে যত প্রার্থনা তোমার কাছে। তুমি
নিয়ত শীতল কর আমার অন্তর। আমাদের অন্তরের উদ্বেগকে
কী করে মেঘ ঠেলেঠুলে রোদ আনে সে কৌশল তুমি যা শিখিয়েছ
আমার যাবতীয় প্রচেষ্টা নিয়োজিত করেছি আমি আগুন থেকে বাঁচতে।
জানি এটুকু যথেষ্ট নয়। কিন্তু তুমিই পারো
কেবল তুমিই পারো বাকি গ্লানি থেকে কালিমামুক্ত করে
ওই হন্তারক আগুনের হাত থেকে রক্ষা করতে। বলো,
এছাড়া আমার আর কিই বা সামর্থ্য আছে মুক্ত বিহঙ্গের মতো
উন্মুক্ত আকাশে নিশ্চিত হয়ে উড়ার
কি বা করার ক্ষমতা আছে আর কারই বা কী করার আছে
আমি তো তোমার এক প্রেমিক বই কিছু নই।
তোমাকেই মালিক বলে জেনেছি।
তোমার ভিতরই খুঁজতে চেয়েছি গভীর প্রেম
আমার ভালোবাসায় কোনো খুঁত নেই, নিখাদ।
তবে তোমার কাছে আমি অস্বীকারকারী নই
তোমার কাছে স্বীকারোক্তিতে নেই কোনো গ্লানি
লজ্জা নেই কিংবা নেই কোনো দ্বিধা
তুমিই তো আমার সকল প্রেম। তাই বলি
আমার অলসতা, আমার ব্যর্থতা সব আমারই। এরাই তো
আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে জ্বালায়। এরাই
আমাকে প্রেমের সমুদ্র থেকে দূরে সরিয়ে রাখে-
এরাই আমার অনেক ক্ষতি করে দেবেÑ এটাও জানি
তবু তুমি আমার অজানা পাপ আমাকে ফিরিয়ে দিও না।
বহুবার বুঝতে চেয়েছি আমার আলস্য, ব্যর্থতাকে
আমার হন্তারককে আমি যতটুকু জানি তার থেকে দূরে থাকতে চাই
তাকে দূরে সরিয়ে
প্রার্থনা তোমার কাছে আমি যেন মুক্ত থাকি
ওই হন্তারকেরা ওই আগুনের কাছে যেন নতজানু না হয়।
কাজী নাসির মামুন
রোহিঙ্গাপুস্তকে আত্মহত্যা লেখা নেই
পেরাংপুরুর এক দুর্লভ শিক্ষক
নীতি ও স্বপ্নস্থ লীলা থেকে দূরে এসে
জেনেছে নিষিদ্ধ শ্লোক: পেরাংপুরুর এক দুর্লভ শিক্ষক
নীতি ও স্বপ্নস্থ লীলা থেকে দূরে এসে
জেনেছে নিষিদ্ধ শ্লোক:
রোহিঙ্গাপুস্তকে আত্মহত্যা লেখা নেই।
আছে জন্ম সুগভীর, বিশ^স্ত সংসার
গৃহের সংহতি আর পীড়ন সহ্যের ফুটনোট।
কোথায় আশ্রয়? কোন নীলিম বিশ^াসে
নিজের স্বদেশ থেকে বিতাড়ন সহ্য হবে তার?
প্রসন্ন হত্যার দিনে
মোরগ ঝুঁটির মতো লাল অভিঘাত
তাকেও পোড়ায়;
জীবন-লঙ্ঘিত জ্ঞান
মিশেছে রক্তের ডামাডোলে:
গলা-কাটা নিরস্ত্র শহীদ শত শত
শ্রীমন্ত তন্দ্রায় খুব সামনে উদোম;
এইসব ভূলুণ্ঠিত মাটির পুতুল
কাঁড়িকাঁড়ি বিধ্বস্ত অতীত, স্বপ্ন আর
অনাথ কবর ফেলে গেলে
কোথায় যিশুর ত্যাগ?
জলাঞ্জলি ফুল ও অনন্ত রক্ত-বীণায় বাজবে?
সে-ও কি দৌড়ায়? সেই দুর্লভ প্রজ্ঞার
নিপীড়িত রক্তের পোষক?
অনঙ্গ বিলাপ, রুক্ষ রঙ্গন অথবা
আত্মস্থ মৃত্যুর অভিশাপে
ত্রস্ত অধিকার ভুলে যেতে হয়;
তখন জীবন মানে পায়ের হিসাব।
কয়লা চেতন আগুনের দিন
নিঃশেষ হবে না আর? প্রসঙ্গ বিলীন হবে নিষ্ফল সংলাপে?