দশকের বিভাজনে কবি ও কবিতা রেখাকে সম্পূর্ণতা দানের বিষয়টি শুধু যে বিতর্কিত তা নয়, আলোচনার সুবিধার্থে প্রাসঙ্গিকও বটে। দশক বিভাজন বা আলোচনা সর্বপ্রথম কে করেছিলেন তার সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া না গেলেও, কথিত আছে বুদ্ধদেব বসু আলোচনার সুবিধার্থে দশক শব্দটি প্রথমে ব্যবহারে আনেন। কবি ও কবিতা তাত্ত্বিক দরবারে দশক নিয়ে বহু আলোচনা বহু তর্ক-বিতর্ক হয়। আসলে দশক বিভাজনটা কবি ও কবিতার সুস্পষ্টতার জন্য। যদিও কালজয়ী কবি ও কবিতার বেলায় দশক বিভাজন খাটে না। দশকের অনেক ঊর্ধ্বে তাদের অবস্থান।
অরুণ পাঠকের মতে, যে কোনো সময়ের কবিতা বিচার করার জন্য যে তিনটি বিষয়কে অবশ্যই সামনে রাখতে হয়। প্রথমটি হলো- ১. কবিতা রচনার সমকালীন ইতিহাস। বর্তমানে তার স্থানিক পরিসীমাটি বিশ্বব্যাপী। ২. ওই সময়ের কর্ম বা গঠনগত রূপ। ৩. কবির ব্যক্তিগত জীবন। এই তিনটি ধারা সাপেক্ষে যে কোনো দশকের কবিদের আলোচনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দশকটারই কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য আমাদের সামনে চলে আসে। এই দশকের কবিদের কাব্য সূচনাকাল কারো দশকের শুরুতে, কারো মাঝে কারো বা অতি সম্প্রতিকাল। এদের অনেকেরই কবিতায় রাজনৈতিক বিভাজন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নৈতিক অবক্ষয়, অর্থনৈতিক দৈন্যতা স্পষ্ট, আছে প্রেম-ভালোবাসার গুঞ্জন। বাস্তব ও পরাবাস্তবতার সুর।
আপন মাহমুদ
মায়ের উদ্দেশ্যে বাবা যে চুমুটা ছুড়ে দিয়েছিলেন বাতাসে/শুনেছি, সেই হাওয়াই চুমুটা থেকেই জন্ম নিয়েছিল। পৃথিবীর প্রথম প্রজাপতি।
মা, পৃথিবীর যে কোন নারী থেকে যাকে কখনোই আলাদা করা যায় না- তাকে খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত-বিভ্রান্ত সেই প্রজাপতিটার ডানা থেকে যখন টুপটাপ ঝড়ে পড়েচিল রঙের আকুতি-রঙের সেই অপচয় ঘোচাতেই সম্ভবত জন্ম হয়েছিল পৃথিবীর আর সব প্রজাপতির
মাকে বাবা খুঁজে পেয়েছেন সেই করে। অথচ, তার মুখের দিকে তাকিয়ে কখনোই মনে হয়নি- জীবনে একটাও প্রজাপতি তার খোঁপায় বসেছে।
(মা প্রজাপতি ও অন্যান্য ছায়া/ সকলের দাঁড়ি কমা)
এই হলো রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবুল হাসান ও সুকান্ত ভট্টাচার্যের দেখানো পথে অকালে যাত্রা করা কবি আপন মাহমুদের স্বাভাবিক ভঙি বা প্রকাশ। পরস্পরাবাহিত স্থির চিত্রগুলোর মানবিক মূল্যবোধ সম্পূর্ণ নতুনভাবে যেন উপস্থাপনার কৌশল। এ সময়ে মানুষের চিন্তার পটপরিবর্তন মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে যায় কিংবা পাল্টাতে বাধ্য হয়। ভাবনার বোধোদয়ে উদঘাটন হতে পারে সিগমন্ড ফ্রয়েড তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে অথবা কাল মার্কসের প্রভাব বলয়ের বৃত্তকে ভেঙে দেখার বাসনায়, কবিতা হয়ে ওঠে আন্তঃদ্বন্দ্ব ও ভাঙন সচেতন প্রয়াসময়, ঘটতে থাকে প্রচার প্রকাশ ও প্রকরণের মাত্রাতিরিক্ত রূপান্তর। ক্রমেই দূরে সরে পূর্বের আলো। এই সময়ের কবিতায় প্রেম আসে অন্যভাবে, স্বভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যেমনিভাবে স্বভাব তৈরি হয়, ভোগের বিরুদ্ধে মজবুত অবস্থান নিয়ে যেভাবে ভোগ্য পণ্য হয়ে ওঠে পৃথিবী ঠিক সেভাবে নয়, অবিশ্বাস্য অতিসত্বর, বাস্তব কিংবা অবাস্তব প্রকাশের মাধ্যমে। যেমন আপন মাহমুদের মা প্রজাপতি ও অন্যান্য ছায়ায় তার বাস্তবতা মিশে আছে। মায়ের প্রতি বাবা কিংবা বাবার প্রতি মায়ের প্রেমের উপমা হিসেবে একটা প্রজাপতি ছিলো। ছিলো রঙের মিলন বাহার। তারপরও বাবার কাছে মনে হয়েছে মায়ের পৃথিবীতে কখনই রং আসেনি, আনন্দ আসেনি।
আপন মাহমুদ শুধুমাত্র যে প্রেম ও ভালোবাসাকে প্রয়োজনের অধিক বহন করেছেন এমন নয়, সমাজ ও বাস্তবতাকে সুকৌশলে স্যাটেয়ার ও করেছেন।
আমরা যখন পরম মমতায় পাখা মেলে সজীবতা উড়াতে চাই, ভাসাতে চাই প্রবহমান ¯্রােতে, দৌড়াতে চাই কষ্টকীর্ণ মাঠ-ঘাট, উৎপাদন করতে চাই সৃজনশীলতার শাখা-প্রশাখা, প্রসেস, প্রমীতি, তন্ময় ও মানুষের উদ্ভাস তখনই জল ঢেলে ঢেলে সজীব করতে হয় পারিবারিক বাগান। কর্পোরেট পোশাকের ভেতরে দুঃখগুলো বন্দী রেখে, সকাল সন্ধ্যা ঘামশ্রম দিয়ে হয়ে উঠতে হয়Ñতাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমি এখন একটা সুশীল ফলগাছ-নিয়মিত অফিসে যাই-বাড়িতেও টাকা পাঠাই। আমার আর বটগাছ হওয়া হলো না।
(বটগাছ। সকালের দাঁড়ি কমা)।
চেনাগত শব্দ হলো মুক্তি ও স্বাধীনতা। সেটি যখন অবচেতন হয়ে যায় তখন আমরা আর আমরা থাকি না। হয়ে যাই অন্য কেউ। নষ্ট হয় মৌলিক সত্তা। বেড়ে উঠতে হয় যৌক্তিক আবহে। সম্ভবত আপন মাহমুদ যৌগিক পৃথিবীতে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি বলেই ত্যাগ করেছেন কবিতার আশ্রম। আমাদের প্রেম ও মহাব্বত। আপন মাহমুদ বাংলা কবিতার অন্যরকম এক বিনির্মাণ।
ইমতিয়াজ মাহমুদ
কবি বহুভাবে সচেতন। সচেতনতা ও কৌশল কবিকে নতুনের দিকে ধাবিত করে থাকে। শ্রুতিময় কবিরা আত্মগত মজ্জায় নিমগ্ন সন্ধি পাঠের মতো স্তরে স্তরে বিন্যাস ছাপ রেখে যান অতি যত্নে। কবিতার গঠনগত টেকনিক দারুণ বৈপ্লবিক রূপান্তর কিংবা চেতনাগত পার্থক্য ঘটিয়ে থাকেন অনেকই নিঃশব্দে, নীরবে। এই নিঃশব্দ ও নীরবতা একজন প্রকৃত কবির বোধের উদঘাটন করিয়ে থাকে, যাকে আমরা শক্তি বলেও সনাক্ত করতে পারি। শব্দ সজ্জায়, শব্দের দৃশ্যে, পঙক্তি বিন্যাসে কিংবা ধ্বনিগত দ্যোতনায় ভিন্ন ধাঁচের এক আবহ তৈরিতে সক্ষম হয়। বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পী ও কলাকৌশলীদের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন আপন সত্তাকে। এরপরই তিনি আসল অবচেতন স্তরের অলৌকিক কিংবা লৌকিক অনুভূতিকে কথ্য ভাষায় ব্যবহার করে অগ্রাহ্য করলেন পুরাতন সব পদ্ধতি। শোনালেন নতুন বীণা। গিটারের ছয়টি তারের স্পন্ধনে মোহিত করতে থাকলেন সাহিত্য অঙ্গন। শব্দের ধ্বনিগুণের পাশাপাশি চিত্রগুণ, অঙ্কনগুণ, কল্পনাগুণকে সামনে আনতে থাকলেন নিখুতভাবে, এমন কতগুলো গুণের সম্মিলিত প্রয়াসে যোগ হতে থাকল গম্য-অগম্য বোধের আলাদা জগৎ। এই কবিতা দৃশ্যগত জগৎ অতিক্রম করলে শ্রবণের জগত ধারণ করে, সেটিও অতিক্রম করলে কল্পনা বিকাশ ঘটায়। এরপর সেখান থেকে চেতন অবচেতনের এক সুন্দর নির্মাণ করেন। তিনি প্রথম দশকের অন্যতম কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ।
খোদা আমাকে মানুষ বানালো।
আমি হতে চেয়েছিলম বই।
বাংলা বই। লাল মলাট।
মোমের আলোয় বালকেরা
আমাকে গলা ছেড়ে পাঠ করতো।
বাংলা বই। মোমের আলোয়।
খোদা আমাকে মানুষ বানালো।
কেউ পড়তে পারে না।
(বই/পেন্টাকল)
অথবা পেন্টাকলের প্রথম কবিতা ‘যাত্রা’ ও পড়া যেতে পারে। “পর্তুগালের কোন বন্দর থেকে জাহাজটা ছেড়েছিল। ষোল শতকের এক দুপুরে জাহাজে কয়জন নাবিক ছিলো তা জান যায়নি। তবে সেখানে একুশটা চোর, সাতটা দস্যু, তেরটা ভরঘুরে আর একজন কবি ছিলো। তাদের কারো গন্তব্য ম্যানিলা। কারো মাদাগাস্কার। সবশেষে জাহাজটা সন্দ্বীপ বা মংলা পৌঁছবে এমন কথা ছিলো। কোথাও পৌঁছানোর আগে জাহাজটা আমার মগজের মধ্যে ডুবে গেছে।”
কবিতাগুলোতে এক ধরনের সরলতা বিরাজমান, পড়তে পড়তে ভিন্ন বা অন্য জগতে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা ব্যাপক কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের। সরল ও একমাত্রিক দৃশ্যগুলোতে অবলোকন করতে করতে আরেকটা দৃশ্য সামনে এসে দন্ডায়মান হয়, সেটা বিশাল এক ধাক্কা বা মোড়। সেই মোড় পাঠককে পূর্বের ভাবনা থেকে নতুন এক ভাবনার জগতে প্রবেশ করায়। সেখানে জ্বলে উঠে নতুন দৃশ্য। যা সম্পূর্ণ রহস্যে ঘেরা। আর এই রহস্যই কবিতা। কবিতার প্রাণ রহস্য। রহস্য তখনই প্রাণবন্ত হয় যখন সেটায় গল্প থাকে। ইমতিয়াজ মাহমুদের প্রতিটি কবিতায় গল্প আছে, আছে ভাব-বোধ ও দর্শনের খেলা। সেখানে দর্শন স্পষ্ট খেলা করে। হাসতে হাসতে কঠিনকে সহজভাবে বলতে পারেন। ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতায় প্রেম-ভালোবাসা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিকতা পর্যন্ত বহুভাবে বিস্তৃত।
এই ধারাকে অন্তর্মুখী ধরা বলা যায়, এই ক্ষেত্রটি বেশ বড় ও বিস্তুত। আর এ ধারা থেকে বেরিয়ে আসে বিচিত্রমুখী কবিতার উদ্ভাস চিত্রকল্প এবং ভাববোধ ও বোধ সমন্বিত সমাজ ইতিহাস যাপিত জীবন ও বাস্তবতা।
জাহিদ সোহাগ
বদলাতে থাকে সাহিত্যের ইতিহাস ও ধারা। যদিও সাহিত্য ও সৃজনসত্তা ইবাদতের মতোই আবাধনার, এতে গতানুগতিক ধারাকে ধাক্কা দিয়ে কাল্পনিক জগতে প্রবেশ করিয়ে চিন্তার দ্বার উন্মোচন করার আরেক নাম কল্পনা। কবি মনের কল্পনা সৌরজগতের চেয়ে বড় ও মহান, যদিও সর্বক্ষেত্রে তা সমানভাবে প্রযোজ্য নহে, এতে ভাবনাটা আপেক্ষিকতার খাতে বকেয়া, কথা হল, কবিতা ইমাজিনেশন বা কল্পনা থেকেই চিত্রকল্পের ভিত্তি তৈরি হয়। বদলাতে থাকে সাহিত্যের রূপ ও রস। বদলাতে বদলাতে তৈরি হয় অন্য এক অবয়ব। যেখানে সেই শুধু মাত্র পা দিয়ে হাঁটে, চোখ দিয়ে ইশারা করে, হাত দিয়ে নাড়াচাড়া, শ্রবণ করে, এরপরই এটাকে আমরা পরিপূর্ণতা বলি। কথা হলো, বাস্তবে পরিপূর্ণতা কতটুকু হয় বা আছে তাও আবার বোধগম্য নয় একজন কবির। কবির দায়িত্বও নয়। জড়নবৎঃ খবব ভৎড়ংঃ দায়িত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, অ ঢ়ড়বঃ রং বংংবহঃরধষষু ধহফ ধপপরফবহঃধষ পড়ষষবপঃড়ৎ ড়ভ রসঢ়ৎবংংরড়হ ধহফ শহড়ষিবফমব. কবিতার ওসঢ়ৎবংংরড়হ যতটা ঊংংবহঃরধষ ততটা শহড়ষিবফমব নয়।
জাহিদ সোহাগের কবিতায় এমন বাস্তবতা সত্যিই দৃশ্যমান। যখন তিনি বলতে পারেন,
আমাকে তুমি ডাকলে, খুলে তো যাবেই, খুলে তো যায়ই
হাঁটু অব্দি ডুবে থাকা ঘাসে, বাতাসের ঢেউ এসে শয্যা পাতে
এইখানে যুদ্ধর মাংসমেদ, কোনো কোনো পুষ্প তবু ফোটে-
আমাকে তুমি ডাকলে, এমন তো হবেই, এমন তো হয়ই
আমরা দু’জন দাঁড়িয়েছিলাম, সেই ছায়ার দিকে, জ্বলে তিরতির কাঁপে
কাঁপে, শীতকালের সূর্যটা
আমাকে তুমি ডাকলে, এক দুরূহ পাথর চলে আসে কাছে
(তুমি/ব্যাটারি চালিত ইচ্ছা)
বাস্তব ইমাজিনেশন যখন সামনে হাজির হয় তখন মনে হয় সত্যি সত্যেই সিগমন্ত ফ্রয়েড আমাদেরকে চিন্তার গ্যাঁড়াকলে আটকে দিচ্ছেন। কখন কখন মুক্তি মিলছে। যদিও সেই মুক্তির মিছিলের প্রথমেই কবি।
এই হলো কবি জাহিদ সোহাগের কাব্যশক্তি। সাবলীল গতি ও প্রকৃতি। বারবারই রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন কবিতায়। এই আশ্রয়ের স্বভাবও সাবলীল ও সত্য-সুন্দরের প্রকাশ যখন বলেন, ‘দাঁড়াতেই হয় শেষে আয়ুব সম্মুখে/ যেখানে শরীর নেই-আছে চিৎকার। এক অসহনীয় সময়ের উল্লেখ এখানে রয়েছে। শরীরবিহীন চিৎকার প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হচ্ছে। মানুষ সীমাহীন কষ্টের ভেতর দিয়ে নিজেকে ব্যাটারি চালিত যন্ত্র ভাবছে আর দীর্ঘ পথ অতিক্রম করছে। শরীরবিহীন চিৎকার সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতীক।
রাতের চেয়েও ঘন কোনো নারী; তাকে
চুপিচুপি বলি
সে উত্তর দেয় দেহাভাসে; যেন সে
দেহের নিচে জিরাফের দীর্ঘ নীরবতা
বুনে দিতে চায়।
-মুন্ডু কই?
শুধু দেহ দেহ করে সে তার মস্তক টাঙিয়ে রাখে ওই লাইটপোস্টে
যেন সে সারারাত জ্বলবে-নিচে, আমরা দেখি নীল নীল তারা।
(তারকা/ ব্যাটারি চালিত ইচ্ছা)
কাজী নাসির মামুন
কাজী নাসির মামুন প্রথম দশকের অন্যতম একজন কবি, সহজ সরল ভাষায় জীবনের হালকা মেজাজ ও মর্জিকে নানান অনুষঙ্গে অগোচরে অবলীলাক্রমে লিখে যাচ্ছেন। সেই পরতে আছে চেনা পরিচিত মাটির ঘ্রাণ। যে ঘ্রাণে তীব্র উচ্চারণের পাশাপাশি গোপনস্বরে জীবনের ক্লেদাক্ত চিত্রগুলোকে তুলে ধরেছেনঅবলীলাক্রমে।
এই যে তাবৎ শুরু আমাদের আদিকাল চিহ্নিত মহাকালের ভেষজ পত্র শুরু হয় “লখিন্দরের গান” কাব্যগ্রন্থের পরম্পরা কবিতায়।
এখানে মরণ অস্থির গায়ে দহকলসের পাতা
বাকল খুলেছে মহাকাল ঋষি, ভেষজনীল ছাতা।
মাটির ডেরায় ডিমের আদল, ঘুমাও পরম গুরু
তোমাকে ফোটাই দাদাজানের পাখি, এখানে তাবৎ শুরু…
(পরস্পরা/লখিন্দকে গান)
এই কথাই পরম সত্য যখন ‘পরম্পরা’ সামনে আসে বারবার। কিছু মুহূর্ত শতাব্দীকাল ব্যাপ্তি বিস্ময়ের সীমারেখা পার করানোর কৌশল বাহবা যোগ্য নিশ্চয়। কিন্তু তার চেয়েও সীমাহীন বোধের বড় ব্যাপার কাজীর কবিতা ঘিরে বিরাজ করে পরিপূর্ণ এক স্তব্ধতা, অনুচলাচলের দৃশ্যহীন দৃশ্য যা এই ব্রহ্মান্ডের শক্তি। যাকে বলা যেতে পারে কব্জির জোর বা শক্তি। এখানে অনায়াসে তিনি পার পেয়ে যান। সেই জন্যই অফুরান শব্দের সকরুণ সুরএ লেখেন একই বইয়ের অন্য কবিতায়-
যতটুকু ফেরা যায় সবটুকু রোদের গরিমা
কপালে মেখেছি। আজ শ্রমের অধিক
আলস্য মোড়ানো হাঁটা। চর্চিত পুঁথির পাতা
গলার মাদুলি।
কাজী নাসির মামুনের কবিতার মানচিত্রে দশকের ব্যাপ্তি অনেক বড়। যেমন বিভিন্ন ভাব-ভঙ্গি ও অনুষঙ্গের কবিতায় প্রাচুর্যে ভরা এ সময়ের কবিতা। সমগ্র বাংলা ভাষাভাষীর অন্তর জুড়ে বিরাজমান এ সময়ের কবিতার পঙক্তি। স্বভাবতই এই সময়ের কবিদের নির্মাণভঙ্গি ও ভাষা ভঙ্গি অনেক বৈচিত্র্যময়, সফল ও তাৎপর্যময়। শতাব্দীর শুরুটা যেমন হওয়ার দরকার ঠিক তেমনই হচ্ছে। মধ্যযুগ থেকে শুরু করে গত উনিশ শতকের শেষাংশ এবং এ সময়ের কাব্যভাষায় সম্পূর্ণ ভিন্নতর প্রয়াস যেনো কাজী নাসির মামুনের উপস্থাপনায়। কাজীর হাতে গ্রাম যেখানে সজীব ও প্রাণবন্ত-
তেলসুরভির পথে পথে একদিন
শর্ষের হলুদ বাড়ি দেখা গিয়েছিল।
চোখের ধন্দেতে মনে হলো
ফুলে ফুলে রাত নেমেছে পথের দাওয়ায়।
(বসন্ত মায়ের কথায় ফুলঝুরি/লখিন্দরের গান)
ফজলুল হক তুহিন
ইন্দ্রয়ের গিটারে বাজে না তার বেঁচে থাকার সঙ্গীত
ইন্দ্রিয়ের মিটারে ওঠে না তার গতির নীল ইঙ্গিত
তার ইন্দ্রিয়ানুভূতি ঠিক যেন আমাদের মূল্যবোধ।
বস্তুত সে বয়সের রোদে পুড়ে পুড়ে মাংসের কয়লা
কাগজ চামড়া ফেটে বেরিয়ে আসতে চায় সরল কঙ্কাল।
(বুঝিনা কি প্রয়োজন/ ফেরা না ফেরা)
ফজলুল হক তুহিনের কবিতার আঙ্গিকে শ্রুতি সংগ্রামের প্রত্যক্ষ বা সরাসরি দান। দু’একটি শব্দে দৃশ্যে, রচনা, ছোট-বড় পঙক্তিবিন্যাস, শব্দ থেকে শব্দের তাৎপর্য, অন্তর্নিহিত সত্তা উদ্ধার পর্ব, যৌক্তিক অনুভূতিকে ভাঙন চিত্রমালায় ফুলের গোছায় সাজিয়ে এসবই পেয়েছেন তুহিন। বলা যেতে পারে, প্রত্যক্ষ শ্রুতিপর্বে যুক্ত না থেকেও প্রান্তিক ভাববোধ, ভাষা, সরলতা, শব্দ, চয়ন, শব্দের প্রাত্যহিক ব্যবহার ও আঙ্গিক সুকৌশলে ব্যবহার করেছেন কবিতার পরতে পরতে। এ কথা বলতেই হবে কবির নিজস্ব আঙ্গিক কাব্যচরিত্রের উপযোগী বলেই ধীরে ধীরে তা নিজস্ব সম্পদে পরিগণিত হয়েছে।
এই কবির সমাজ পাঠ এসেছে ইতিহাস ও যাপন থেকে। ইতিহাসের সারবেত্তা কিংবা বিস্তৃতি বা পরিব্যাপ্তিতা তিনি নিজেকে যাচাই বাছাই করে নিয়েছেন অথবা নিতে চেয়েছেন। ড. ফজলুল হক তুহিন কাব্য রচনার প্রথমদিক থেকেই একটা দার্শনিক প্রতীত-ছায়া দেখিয়ে যাচ্ছেন। শব্দের ভেতর তিনি যে ছবির জগৎ রচনা করেছেন, দৃশ্যজুড়ে যে ভাবের উদয় ঘটিয়ে চলছেন তা যেন অনুভূতির দারুণ বর্ণমালা, আর এভাবেই পরিষ্কার হয় তাঁর আবেগ ও ভাবনা।
দেশীয় সমাজ-মস্তিষ্কের সঙ্গীতে যে অবগাহন থাকার কথা ছিল তা যেনো কালো মিছিলের মুখে বিলীন। আমরা হারতে ও হারাতে বসেছি সকল নিজস্বতা। অপশক্তির অপছায়ায় বেড়ে উঠছে অনন্ত। যেখানে ছায়া নেই মায়া নেই। শুধুই হিংস্রতা আর হিংস্রতা। যেখানে পুড়ে কয়লা হয় সভ্য সমাজের কঙ্কাল। অথচ সেই এক হাজার একজন বন্দীর মতো ঘটনা, যারা প্রত্যেকে নিজেকে একা ভাবতে থাকে। এভাবেই সবাই বাঘ ও সিংহের মুখের খাবার হবে ভাবে। যারা জানে না নিজেদের শক্তিমত্তার কথা। যেমনি আমরাও বুঝি না কবিতা শক্তির কথা।
সে এক প্রবল সর্বনাশ
আমাকে জড়িয়ে নেয় নেশায় আঠায়
পারি না ছড়িয়ে যেতে নেশার লাটাই
ফিরে ফিরে আসে সেই ফাঁস।
(সর্বনাশ সিরিজ /ফেরা না ফেরা)
এখানে সমাজমনস্ক রাজনৈতিক সচেতন, চাপা অসহায়বোধ, ইচ্ছেমতো নিজস্ব জগৎ তৈরি করতে পারা না পারার চাপা ক্ষোভ রয়েছে। এই সত্যকে সুন্দরভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন কবি।
নদীর নগরে বাস করি, নদীর পানিতে চাষ
বিষের বাতাসে বসবাস ছেড়ে নদীতে নিঃশ্বাস।
নদী নাও মাছ পাখি-এই সব নিয়ে বেঁচে আছি
নগরে বসতি, তবু আছি প্রকৃতির কাছাকাছি।
চর ভাঙে চর গড়ে পলিতে উর্বর চরাচর
সবুজ ধানের শীষে, কাশবনে বিমুগ্ধ অন্তর।
(নদীর নগরে/সরাও তোমার বিজ্ঞাপন)
ড. তুহিন ছন্দ মিলনে বেশ পারঙ্গম অথচ প্রচলরীতিকে অমান্য করণেই তিনি তাঁর ভাষাচাঁদ গড়ে তুলেছেন। এখানে স্পষ্টতর ভাষায় বলতে হয়, ভাবাবেগ উচ্চারিত নয় বলেই অনেক সময় দেখলে হয় নিরাসক্ত জীবন সম্পর্কে। এখানে প্রবল দর্শন থাকলেও নিরাসক্ততা নেই সত্য। ছন্দ কবিতায় সহজবোধ্যতা, নিজস্বতা, সবই আছে এই কবির কবিতায়।
-মাগো, অসহ্য যন্ত্রণা বুকে জটায়ুর মতো
-কেনো রে কী হলো আবার কুক্ষণে?
-একটা পাথর বুকে চেপে বসে আছে হিমালয় হয়ে
নড়ে না চড়ে না একদম-আকাশের দিকে
জ্বলন্ত সূর্যের দিকে চিৎ হয়ে তাকিয়ে আছি নির্বাক।
(পাথর/সরাও তোমার বিজ্ঞাপন)
এই হলো, কবি ফজলুল হক তুহিন। স্বদেশকে মায়ের মতোই বুকে আগলে রাখছেন। ভালো বেসেছেন সন্তানের মতো। যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ খুবই স্বযতেœ। যেনো ব্যথায় জর্জরিত না হয় স্বদেশ। স্বদেশের মানুষ। বলা যায় এই মৃত্তিকার কবি ফজলুল হক তুহিন।
আলতাফ শাহনেওয়াজ
রাত্রির অদ্ভুত নিমগাছের কবি নির্লিপ্ত নয়ন। নিজের নাম নিয়েই যেনো বলেছেন রাত্রির অদ্ভুত নিমগাছের “আঁখি” কবিতায়-
খুব ভুল হলো- পথে ভাসা সন্ধ্যা, আলো আর আকাশ আমার
মৃত্যু খুঁড়ে ছিনিয়ে এনেছে
এক পাগল বহ্নি, উন্মাদ রাজহাঁস
মায়া…
বাতাসের সর্দার অদূরে ভায়োলিন মোড়ানো শরীরে
রংধনু গাছ
তার গতিবেগ অন্ধপ্রায়
জ্বালিয়ে দিচ্ছে সাঁঝগরিমা- চোখগুলো।
নাম পাল্টিয়ে নিজেকে পাল্টাননি এটাই কবির সার্থকতা। আমরা দেখতে পাই কিভাবে নির্লিপ্ত নয়নকে ছাড়িয়ে ছাপিয়ে আলতাফ শাহনেওয়াজ আরো নতুন শক্তিমত্তায় ভিন্ন মেসেজ নিয়ে হাজির হয়েছেন পরবর্তী কবিতার বই “আলাদিনের গ্রামে”। রাত্রির অদ্ভুত নিমগাছ কোথায় ছিল পাঠক তা হন্যে হয়ে খুঁজেছিলেন। অবশেষে সেই গোপন রহস্য নিজেই ফাঁস করলেন যে, রাত্রির অদ্ভুত নিমগাছ হল আলাদিনের গ্রামে।
রাত্রির অদ্ভুত নিমগাছ দেখতে কেমন? তার রং কী, চরিত্র কী, বৈশিষ্ট্য কী? এ গাছ কথা বলতে পারত? আমাদেরকে ছায়া বা মায়া বিলিয়ে দিতে পারত? এতকিছু দিতে না পারলেও সম্ভবত পারতেন
অপ্রস্তুত তৃষিত শীত ঘটনা ঝরাপাতা রচনার শব্দে
শুয়ে আছে- আমাদের জীবনে বন্ধুর প্রয়োজন নেই,
মিথ্যার সর্বশেষ বিকেলে এসো অপেক্ষা করি…
আলতাফ শাহনেওয়াজের কবিতার মধ্যে রাজনীতি, নৈতিকতায় বহুত্ববাদীর একটি দার্শনিক অবয়ব লক্ষণীয়। এখানে বস্তুবাদ এবং পরাবাস্তববাদ জীবনের দৃশ্যায়ন ঘটে দ্বান্ধিকতার ভেতর বারবার। ফুটে ওঠে জীবনের বিস্তীর্ণ মাঠে অখ-তা ও মহীসাম্যের প্রতিস্থাপন। এর বাইরেও সমাজতাত্ত্বিক মতবাদের ভিতগুলোকে তিনি সজোরে বড় নাড়াতে নাড়াতে এগিয়ে এসেছেন বা চলেছেন সামনের দিকে। ব্যক্তি পরিচয় যেখানে খানখান করে দিচ্ছে, মহাজাগতিক রহস্যের সঙ্গে একাকার হয়ে যাচ্ছে রাত্রির অদ্ভুত নিমগাছ এবং আলাদিনের গ্রাম। এই সৃজন সম্ভাবনাময় আমি শব্দের কিংবা আমরা শব্দের স্থায়িত্ব না দিয়ে ব্যাপারটিকে সর্বজনীন করে দিয়েছেন। তাঁর কবিতা পড়তে গেলে বিনির্মাণের ধারা বিবরণী থেকে তাঁকে বারেবারে ছুঁয়ে দেখতে হবে। কারণ কবিতার প্রবণতা বহুমুখী। সমস্ত সম্ভাবনা ও ভাবনাগুলোকে ঠেলে ঠেলে এগিয়ে গেছেন আলতাফ শাহনেওয়াজ। আলাদিনের গ্রামের ৪ নং সনেট-
ভাষাহীন গ্রামে তুমি অন্ধ আলাদিন
আগেই তৃষিত ছিলে তিষ্ঠ তারপর
বক্ষজুড়ে ছাতি ফাটে-পানির চিৎকার,
জলের কোনো নদী নেই, তীরে বিঁধে আছো!
তোমার ভেতরে একা বসে নমরুদ
জ্বেলে দেয় অষ্টধাতু, মোমের রমণী;
…. মিতালি দোসর তুমি এসো আলাদিন
এই দেহ ফুলগাছ, কাঁটা হয়ে বসো।
আলাদিনের গ্রাম পড়তে পড়তে মনে হতে থাকে পাঠকৃতিকে বিশেষত্ব দিতেই কবিতাগুলি এগিয়েছে নিজস্ব ভাষাতে, নিজস্ব ভঙ্গিতে, নিজস্ব ব্যঞ্জনায়; শব্দ ও সুষমায়। শব্দগুলোর অর্থ কেবল এই কবিতার জন্য তোলা, অন্যদিকে উচ্চারণ, ব্যাকরণ আর ছবি সাজাবার কাজটি করে গেছে তাঁর কবিতার শব্দ তৈরির বিশেষ ভুবন। একটি বিনির্মাণ পদ্ধতিতে তৈরি ভাষাগুণে তিনি আল্পনা তৈরি করেন। একটি নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত দ্যোতনার মাধ্যমে উন্নয়ন কাজ চলে অদ্ভুত নিমগাছ আলাদিনের গ্রামের।
জারিক জাফরান
প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার ভেতর জীবন-যাপন করেও নিজেকে আলাদা দূরত্বে রেখে শব্দ নির্মাণ ও শব্দ বুননের যে চর্চা প্রয়োজন তা সহজ ও সাবলীল ভাবে করে যাচ্ছেন কবি জাকির জাফরান। তিনি সুখ-দুঃখ, দহন ও যন্ত্রণার স্পর্শে সমাজ রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিকতাকে একই প্লাটফর্মে দেখতে ও দেখাতে চেয়েছেন। জীবনেও বোধে ও আনন্দ অবারিত; আর, সে গল্প শুরু থেকে আজও শেষ হয়নি। হওয়া না হওয়ার মাঝে দুলছে বাস্তব-অবাস্তব ছবি, বিশ্ব কাঠামোর চৌদিকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে চাপা প্রতিবাদ, ক্ষোভ নিজস্ব স্বভাবে অনিন্দ্য হয়েছে। যখন বিপর্যস্ত মানবতা তখন পুনঃমাত্রায় গিটারে সুর তুলে ঠেকাতে চাইছেন ভাঙন: আমাদের মুক্তি-আমাদের স্বাধীনতা। অন্যদিকে রয়েছে প্রত্যাশার হাতছানি-মাঝ সমুদ্রে পতিত হয়ে যেমনি ভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখে মানুষ। এসব তিনি সাজিয়েছেন অনুভব ও কল্পনার শব্দে, চিন্তা ও শব্দের স্বাধীনতায়।
আজ বাবা অঙ্গ শেখচ্ছিলেন
বললেন : ধরো ডালে বসা দুটি পাখি থেকে
শিকারির গুলিতে একটি পাখি মরে গেল
তবে বেঁচে থাকলো কয়টি পাখি?
অঙ্কের বদলে এই মন চলে গেল
বেঁচে থাকা সে নিঃসঙ্গ পাখিটির দিকে
আর মনে হলো তুমি আজ স্কুলেই আসোনি।
(চিঠি/ সমুদ্রপৃষ্ঠা)
গল্পচ্ছলে চলে এসেছে বেদনার কথা। প্রেমের কথা। নিহত পাখিটির সঙ্গীর কথা। এই হল জীবপ্রেম। তখনই সামনে দাঁড়ায় স্বামী বিবেকানন্দ। বলতে থাকেন জীবে প্রেম করে যে জন, যে জন সেবিছে ঈশ্বর। প্রেম মানুষের আদি অকৃত্রিম স্বভাবকে সবসময়ই নিয়ন্ত্রণ করেছে। কবির প্রেমবোধ সাধারণের প্রেমবোধ থেকে স্বতন্ত্র, গভীর ও মজ্জাগতভাবে অনন্য বলেই যে প্রেমকে নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন কবি।
ঘর মানে শুধুই ঠিকানা নয়
নয় শুধু ধূসর খেয়াল
ঘরের ভেতরও নদী বয়
নারী ছাড়া নদী ছাড়া
ঘর মানে শুধুই দেয়াল
(ঘর/ নদী এক জন্মান্ধ আয়না)
জাকির জাফরানের কবিতায় শব্দদ্বয়কে একত্রিত করে নান্দনিক উত্তরণের সংকেতকে তৈরি করেছেন- মিলন মনোবিকাশ একত্রিত করে, এমন কবিতার বাধ্য পাঠক ডুবে গিয়ে আবিষ্কার করতে থাকেন নতুনের; যাদের মনকে আঁকছেন, পাঠকও তার একটি অংশ ও আঙ্গিক। অংশ ও আঙ্গিকের আলোচনায় কবিতায় এসেছে নতুন মাত্রা ও সম্মোহন। জাগতিক রস ও রহস্যে আবৃত্ত সত্তা। তিনি ভেঙে দিতে পারছেন পুরাতন অভ্যাস। মহাজাগতিক রহস্যও কখনো কখনো উঁকি দিয়ে যায় জাকির জাফরানের কবিতায়। এই কবিতা এগিয়ে গেছে নিজস্বতায়-শব্দ ও প্রকরণে-ভাষাতেও।
আদিত্য নজরুল
আদিত্য নজরুলের কবিতায় প্রেম ও মানুষের বন্দনা মূল ও মুখ্য। তাই তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা ভাবেই বলতে বা ভাবতে হয়, তিনি সুন্দরের তারে বীণা বাজিয়ে চলছেন অবিরত, এই বোধ একার বোধ না, যেভাবে মানুষ হয়েছে, যেখানে মানুষ হয়েছে আমাদের বস্তুপুুঞ্জের সমাজে একটা ধরতে গেলে আরেকটার বড়ই অভাব, ইংরেজি জানা থাকলে গণিতে দূর্বল, ভূগোল পারলে ইতিহাস নাই হওয়ার মতো। তো আমরা যেখান থেকেই উঠে আসি না কেন, কথাটায় একটা জড়তা জড়িয়ে আছে। অবমাননাও বলা চলে, আমরা যারা বেঁচে আছি সেটা আমার একার নয় সামগ্রিক আমাদের বেঁচে থাকা।
মালিবাগ-মগবাজার ফ্লাইওভার ব্রিজ সরকার খুবই যত্ন সহকারে টাকা খরচ করে গড়ে তুলছেন, এটাতে নির্ধারিত প্রজন্ম বা গোষ্ঠী বা শ্রেণি হালকা বা কঠিন কাজে শ্রম দিচ্ছে, যিনি এই প্রজেক্টের মূল দায়িত্বে সেই ইঞ্জিনিয়ার সিগারেট খাচ্ছেন পাশের দোকানে, আর রাজমিস্ত্রি মালমশলাগুলো উলট-পালট করে মিশিয়ে দিচ্ছে মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে। এতে রয়েছে কিছুটা প্রতিবাদ, কিছুটা হতাশা আবার আনন্দও। আর এই তিনের ভেতরে কবি আদিত্য নজরুল।
স্পন্দনহীনতার ভেতর দিয়ে কোনো কোনো
সৌন্দর্য অনুভব করা যায়
দেহের প্রতিটি অঙ্গ ধারণ করে যে সৌন্দর্য
তার নাম বহুমুখী বাঁক…
…একদিন ঈশ্বরকে জিজ্ঞেস করলাম
মানুষকে কখন প্রকৃত সৌন্দর্যমন্ডিত মনে হয়?
বৈক্রমে জবাব পেলাম:
অনুতপ্ত হলেই তার সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়।
(মানুষ প্রকৃত সৌন্দর্য/ফেরার কোনো তাড়া নেই)
এমন সুন্দর যেমন শাশ্বত, বেদনাও তেমনি শাশ্বত। সুখ আনতে গেলে দুঃখকে দূরে ঠেলেই আনতে হয় বা পেতে হয়। সেটিও আদ্বিত্য’র কবিতা থেকে আমরা পেতে পারি- একই বইয়ের ‘সহজ কাজ’ কবিতায় দেখা যায়-
সুখী হতে চাই
দয়া করে বলো কিভাবে সুখী হবো?
বললেন লোকটি
এক্কেবারে সহজ কাজ এটি…..
যেদিন জলকেটে
দু’ভাগ করতে পারতে সেদিন থেকেই
পরিপূর্ণ সুখী
মানুষ ভাবতে পারো নিজেকে।
সুখের মোহে জল কাটার যে আনন্দ তা এক কথায় অসাধারণ। এরপরই আনন্দ, এরপরই দুঃখের চিরমুক্তি।
ছুঁয়ে দাও যদি
অনুভূতিগুলো মাতৃত্বের স্বাদ নিয়ে
জন্ম দেয় ভালোবাসা
তুমি ছুঁয়ে দিলে দুঃখ হয়ে যায় জল।
(জলের উৎস/ ফেরার কোনো তাড়া নেই)
আমাদের ষাট-সত্তরের বাংলা কবিতায় ছিল বাস্তব-পরাবাস্তব মুক্তিযুদ্ধ-প্রেম-ভালোবাসায় সম্মোহন। আশির কবিতায় ছিলো পূর্বের ছোঁয়া। নব্বইয়ের কবিতায় ছিলো স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপরেখা। এসবের ভেতর দিয়ে কবি আদিত্য নজরুল নতুনভাবে আমাদের সামনে হাজির করছেন নর-নারীর সম্পর্কের চূড়ান্ত ভাঙন কিংবা সহাবস্থানের চরম রকমের অস্থিরতা, দাম্পত্য জীবনের নানা অনিশ্চয়তার অনুষঙ্গ, লিবিডোতত্ত্ব, ফয়েডীয় অস্থির আতুরতা কিংবা নিষিদ্ধ শাস্ত্রের আধিক্য। তবে এসব কিছুকে ছাপিয়ে আদিত্য নজরুল গেছেনে মানুষের বন্দনা, চেয়েছেন মুক্তি, দিয়েছেন ভালোবাসা এভাবেই হয়ে উঠেছেন ভালোবাসময় একজন আধুনিক প্রাণের কবি মন।
মিজানুর রহমান বেলাল
কবিতা হলো শব্দের মিথস্ক্রিয়া। শব্দের অভিনব খেলা। এমন খেলার ভেতর দিয়েই সামনে প্রতীয়মান হয় দার্শনিকতার প্রবহমানতা। প্রতিবাদের হাতিয়ার। মননশীলতার ছোঁয়া। সৌন্দর্য প্রকাশের অভিনবত্ব। দৃশ্য কাল ও দৃশকাব্য রচনার চমৎকারিত্ব কৌশল। বস্তুত পৃথিবীর ঠিকরানো আভা এবং আধুনিক জীবনের তিক্ত গ্লানি, কলুষতা মাখা দৃঢ় অভিজ্ঞতা বারবার কবিতায় প্রসারিত হয়েছে মিজানুর রহমান বেলারের কবিতায়। যৌন বাসনার মহাপৃথিবী তা কবির অভিজ্ঞতা ও প্রকাশভঙ্গিতে উঠে আসে ভিন্নতর ব্যঞ্জনায়, সৌন্দর্য ও নিখুঁত বর্ণনায়। বর্তমান সমাজ আধুনিকীকরণ ও যন্ত্রসমাজ বা বামন মানুষকে করে তুলেছে আরো ছোটো তা আমরা দেখতে পাই এই সময়ের কবি মিজানুর রহমান বেলালের কবিতায়; নিজস্বতায়। যেখানে থাকে রূপকের আশ্রয়-প্রশ্রয়।
নাবিক বলে- সমুদ্রের বালিচরে দাঁড়িয়ে, সমুদ্রের গভীরতা পরিমাপ করা যায় না।
নাবিক বলে- সমুদ্রে সাঁতার না কেটে, লবণাক্ত জলের সাথে সখ্যতা হয় না।
নাবিক বলে- কূলে দাঁড়িয়ে সুদূরে ভেসে যাওয়া জাহাজের হুইসেল শুনে
নিজেকে সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন ভাবা আর আরব্য রূপকথার নায়ক ভাবা একই কথা।
(সমুদ্রে ফেরা নাবিকের গল্প/ জন্মান্ধের জবানবন্দি)
মিজানুর রহমান বেলালের কবিতায় সরলতা রয়েছে। সরলতা ভেতরে রয়েছে বেশ রহস্যের বেড়াজালও। সেই দুর্ভেদ্য বেড়াজালে পাঠক এসে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য।
কেউ কি বিশ্বাস করবে-আমার হাতের পাঁচটি আঙুল সমান!
এই রহস্যের কারণ এখনো উদ্ধার করতে পারিনি- তাই দীর্ঘদিন যাবৎ হাসিনি।
বহুকাল থেকে মগজের বাম পিঠে, নিস্তেজ ভাবনাগুলিÑকখনো খয়েরি, কখনো বেগুনি
(আঙুল রহস্য/ জন্মান্ধের জবানবন্দি)
এই কবিতায় নিবিড় ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভালোবাসার জীবনে রয়েছে দারুণ প্রতিভাস। যেখানে উচ্চকিত দ্রোহ ও প্রতিবাদ নেই। নেই দৈন্যতার সংশয়। অথচ আবেগঘন উচ্চারণ জীবনের সংমিশ্রণে খানখান হয়ে যাওয়া জগৎ কবিরা নির্মাণে যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে থাকেন। সেই নির্মাণ কখনও কখনও সাধারণের আশ্রয়ের ছায়াভূমি কিংবা মনোভূমি হয়ে থাকতে পারে। কবিতার মাঠে সময়জ্ঞানের উদ্ধত কিংবা সংযমী ফণা নিয়ে বিষধর সাপ যেন হিস হিস শব্দ করে ওঠে। শেয়ার মার্কেট, অনুৎপাদক শিল্প, ফটকাবাজার, তথ্যপ্রযুক্তি, স্যাটেলাইট, মাল্টিমিডিয়াসহ এমন বৈশিষ্ট্য সামনে রেখে কবি বেলালের কাব্যময় হাতে সক্রিয় হয় কলম।
এই কবির বোধ আর উচ্চারণ অতি সাধারণ হলেও সাধারণ না। যখন তিনি বলেন, “মানুষের ভিতর অবিকল মানুষ হেঁটে যাচ্ছে-বহুকাল আগে থেকেই।” তখন এই উচ্চারণ আর সাধারণ থাকেনি। আমরা পাই প্রতিবাদের স্বর বা বাণী। শোককুমারী কবিতায়- “ কালো কালো ছায়া দলবেঁধে হাঁটে-মানুষের পাশ দিয়ে/ ছায়ার পিছনে মানুষ হাটে মুদ্রার সড়ক পুনরুদ্ধারে…
বর্তমান সময়ে একজন কবি চাইলেই নিজেকে দ্রুত গতিতে পাল্টাতে পারেন। সেটা তথ্য প্রযুক্তি কিংবা ভিন্ন কোন কারণে। নির্দিষ্ট চিন্তার মধ্যে কেউ আর সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাস্তব বা পরাবাস্তবতার দিকে ছুটে যান। কখনও প্রকৃতি আবার কখনও নিসর্গ আটকে ধরেন। থামিয়ে দিতে চান মানুষের মিথ্যা আশ্বাস ও উচ্চারণ কবি সেই সেই সত্যের কাছাকাছি হাঁটতে বা বসতে পারেন।
পিয়াস মজিদ
পিয়াস মজিদ কবিতার মধ্যানুপ্রাস, পূর্বানুপ্রাস ও অন্ত্যানুপাস ভেঙে নতুন আঙ্গিকে নিজেকে দাঁড় করানোর চেষ্টায় রত। পূর্বের সব নিয়ম-কানুন তোয়াক্কা না করে বোধ ও ভাবনা দিয়ে ফরমেট ফরম বা আঙ্গিক কবিতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। যে বিষয় বা শিল্পনীতি পরিকর্ষণ দ্বারা আবর্তিত রোমান্টিসিজমকাল পরিসমাপ্তি হওয়ার পর পরাবাস্তব কবিতা লেখার দুঃসাহস দেখিয়েছেন বা দেখিয়ে চলছেন কিংবা কালের টানে নতুন উন্মদনায় শামিল হয়ে আবর্জনা স্তূপ এক পাশে সরিয়ে নতুনভাবে হাসতে পেরেছেন তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। পিয়াস মজিদের কবিতার পূর্বকাল, পরকাল ও সমকাল সমানভাবে আছে শব্দের আঁচে। নিখুত জীবনের ভাঁজে। সমবায় শব্দের ভাবজোট সৃষ্টির অভিনবত্ব বা মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন টানা গদ্যের হাতে। তাতে কাব্য ভাষা বা ভাষার সক্ষমতা অথবা অলঙ্করণ একটু বেড়েছে বলা যায়। সুখবোধ, প্রেমবোধ, ভাববোধ, শব্দগুলো সময় ও ভাষ্যের আশ্রম ছেড়ে খোলামেলা গাদ্যিক ধারণায় রূপান্তর ঘটেছে। আর এসব তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কিংবা প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহারকল্পে বৃদ্ধরা একে শব্দের কাঠিন্য বা বলপ্রয়োগ ভাবতে পারেন, যদিও এটা সময়ের দাবি, আমাদের কৌশল বিদ্যা, তাই একে যন্ত্রণাকৌশল না বলে, বলা যেতে পারে তারুণ্যপাঠ বা তারুণ্যভাষা। এসব পরাবাস্তবতা এখন ভোগ্যপণ্য না হয়ে আনন্দের কারণ হয়ে হাসছে আমাদের সামনে।
চন্দ্রমন্থনের রাতে আবার। খয়েরি খেলায় নীল নিমজ্জন শুধু। বুদ্ধ গয়ার পথে হিংসাসূর্যের বিভা। নরকের ফুল গাছে গাছে। রক্তাভ উষার এলোচুল চুঁইয়ে তিক্ত সুরভি ঝরে। ডানে ত্রসরেনু বাঁয়ে পাপের ত্রিভুজ। সেদিকেই মৃত্যুময়ূর পেখম খুলে দেখায় খাঁজকাটা পরমের গুপ্তজ্ঞান। আমরা মূর্খদের রাজাপ্রজা পিশাচস্রোত ঠেলে উদ্ধার করি বিক্ষত সমুদ্র কণ্ঠা।
(সিরিজ নং-৬/ নাচ প্রতিমার লাশ)
কিংবা একই বইয়ের ৮নং সিরিজের দিকে চোখ ফেরানো যায়-
জলআঁধারে আলো নেমে গেল রাজহংসরূপে। মুক্তাপ্লাবনে ভেসে যাবে মধ্যরজনী গান পিছে রেখে পারুল বন ফুটেছে থোকা থোকা রোদনের ফুল। হাওয়াও আজ হন্তারক। নিরঞ্জন নদীতে ধ্রুপদ, খেয়াল আর যত মিথুন। সুরের শত্রু যে মেয়ে তারও হাতে বেলোয়ারি চুড়ি। ক্ষণপ্রভা তারার নীলিমা দেখে নিদ্রা ভুলে এক অসুখী যুবা নির্বিকার গড়ে যাচ্ছে তাসের পাহাড়। কী সব অলঙ্কারে রাতের গলায় অমিতাভ মৃত্যুর হার।
একটি লাইন কোট না করলে হয় না। ‘পিছে রেখে পারুলবন ফুটেছে থোকা থোকা রোদনের ফুল।’ কিংবা ‘কী সব অলংকারে রাতের গলায় অমিতাভ মৃত্যুর হার।’ সত্যির ই তো পারুলবনে রোদন ফুল ধরে আছে। আমরা তাকিয়ে আছি নির্বিকার ভঙ্গিতে। যেনো কিছু করার নে। মানুষ আহত ও নিহতের মঞ্চে লাফিয়ে পড়ছে আর আমরা দাঁড়িয়ে গুণছি আমিতাদের মৃত্যুর হার। আর ভয়ঙ্কর সভ্যতার গলায় মালা পরিয়ে কেবল হাসছি আমরা। আগেই বলেছি পিয়াস মজিদের কবিতার গোপন ভাঁজ-খুললে বের হয়ে আসবে বিশাল প্রতিবাদ। নতুন ধাক্কা।
১২নং সিরিজের শেষ লাইনে যখন বলেন, অরণ্যসমুদ্র সবাই শুনবে নিশীথ-প্রহার শেষে কী সুরে কাঁদে কুলহারা চাঁদ। তখন দারুণ কাব্যময় সময় আমাদের সামনে দাঁড়ায় আর আমরা হারিয়ে যাই কাব্যসন্ধ্যার সাজানো ঘরে। কবিতার রোমান্টিকতা কি কবিতার প্রতিবাদ পঙক্তির ভেতরে?
কবিতাসৃজনে আনন্দকাব্য বা রস আস্বাদন উদঘাটন ঘটাতে ব্যর্থ হলে কিংবা পাঠকের চাহিদা জোগান বা সংকলন দিতে না পারলে শব্দরা স্তব্ধ হযে যায়, স্বয়ং আদালতের প্রশ্নে বা মানদন্ডে। আধুনিক কবিতায় কাল মূল্যবোধ, দর্শন, আদর্শ, পাথেয় পন্থা পদ্ধতি, উপকরণ উপাদান, উৎসাহ, উদ্দীপনা পিয়াস মজিদের কবিতার ধ্যান বা ধাতস্থবাগান বা প্রিয় জায়গা বলা যেতে পারে-
দ্রাবিড় সৈকত
ঢাকনা খুলেই তুমি জেগে ওঠো ধান-
পাখনা ভুলেই স্মৃতি-
বিস্মৃতি গোলা
ঝোলা দোল শোরগোল ওলট-পালট
ঘটে উর্বরা জল
প্রাণ
থাকনা হুজুগ কাঠে প্রসাধন থাম
পাকনা ঝুঝুক ঘাটে বসামন খাম
প্রীতি প্রত্যুষে
পথ খোলাই থাকে
যারা হাঁটে যারা মাঠে খোলস খন্ডাতে ছক সাজানো বিধান
(৫/ কদাচিৎ কুত্রাপি)
একই বইয়ের ৪৪নং সিরিজ –
বর্গি তোরাই চরকি হয়ে ঘুরিস
পুড়িস আমার মাটি-
নরম হাতে চরম রাতে তোর হায়েনা দাঁতে
শরম যদি থাকে
গরম নদী পাঁকে পড়লে হঠাৎ
উঠলে যাতে ফুটলে সাথে
বলতে দেখি দারুণ দারুণ সাবাস
দিচ্ছো বঁশে
মাথায় কাঁথায় মুরগি রাতায় দিনান্তে নয় প্রীতে।
টাকা কবিতায়ও দ্রাবিড় সৈকত বেশ পারঙ্গম। মুন্সিয়ানা-পরিচয় দেখিয়েছেন। ‘বয়াংসি চরকায় লাঙল কাব্য’ কবিতার ১৫তম পাতায়-
তমলুক মাঝির থইথই হাতে জলঙ্গিনী ভাষা
বিজুরি পিয়াসা নাই ঘাটে বাঁধা ঋতুভেদ কলসী পরান
পাতা পাখোয়াজ মন্দিরা চেউ টলটলে কালান্তর
ময়ূরাক্ষী মন বোন ভাগীরথী ভ্রাতা ভৈরব খড়ি-
কড়ি নয় ধান, সোনার বরণ জপিয়ে জাপায়ে আহা মধু
বিকচ সরোজ বিধু শুকসারি নিকুঞ্জলতা
গাঙ গন্ধে, চলিলুস শে্াতের কারণ
ইছামতী উড়ে যায়, শুশুকেরা কোথা যায়, জানে শ্যাস কবিয়াল পান্থ চারণ।
এই হলো শূন্যের সাম্পানওয়ালা কবি দ্রাবিড় সৈকত। যার কবিতায় বিভিন্ন আঙ্গিনা পথ-প্রান্তর, মাঠ-নদী-ঘাটে। ঘাটে ঘাটে থামতে হয়, এদিক-সেদিক তাকিয়ে ভাবতে হয়, ভাবাতে বাধ্য করেন। তাঁর ভাবনায় স্বদেশ এখনও বার্গীদেয় হাতে, যারা শাসন-শোষণ করছে এই মৃত্তিকা। এই ভীতি শুধু মাত্র একজন কবির। কবির উপলব্ধি সব সময়ই অসামান্য। প্রচলিত দশজনের চেয়ে বেশি। তবে অযৌক্তিক বা অমূলক নয়। কবি কখনো ঘুরেছেন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল। কখনো বা বাড়ির পাশে ভাগীরথী ভৈরবের জলে স্নান সরেন।
দ্রাবিড় সৈকতের কবিতার দিকে চোখ ফিরালে দেখা যায়, মূল ধারার ভেতরে নীরব হাঁটছেন তিনি। কবিতার আঙ্গিক বা বিন্যাস নিখুঁত সুন্দর, ঝরাঝাকে সদা স্মার্ট, একটা থার্ড জেনারেশনের মতো লঘু চালের ঠাট্টা ইয়ার্কি মশকরার আস্তরণে মোড়া, তবে ভারি, বাস্তবার্থে যদিও প্রতিবাদী বা স্যাটেয়ারধর্মী কাব্য চাল বিরাজমান। কিন্তু অনেকেই এই কবিকে ভুল বুঝেন বা কবি নিজেকে বুঝাতে পারেননি। যদিও কবি নিজেকে প্রকাশ বা বুঝাতে যাওয়াটা দায়িত্ব নয়।
আগে লেখক ও পাঠকের মধ্যকার সামান্যতম যোগাযোগের একটা ব্যবস্থা ছিলো, এখন সেটা আরো উন্মুক্ত। এখানে এসে যেন কেউ একটা টক্কর অথবা ধাক্কা খায়। এমন প্রলেপ দেখে অনেকেই ঠকে যান। কিংবা প্রতারিত হন? আমরা স্বাভাবিক বা সাধারণ চর্মচক্ষুতে ভাবি বর্ম বা প্রতিরক্ষাব্যূহ, প্রবেশ করলে মিলবে- একটা জনাকীর্ণ বিস্তীর্ণ মাঠের মধ্যে দারুণ শূন্যতা, স্খলন আর ক্ষয়ের বোধ, বিষন্ন সন্ধ্যাকালীন একাকিত্বের মিলন। কেউ হয়তো আগ বাড়িয়ে বলতে পারেন এমন আস্তরণের প্রয়োজনটা কী? বলব কবির বর্ম অরক্ষিত যা সর্বদা নিজেকে বাঁচায়। আর পাঠক তখন ঝকঝক ট্রেনের শব্দে দৌড়ে এসে কামরায় ভিড় করেন। ভিড়ের ভেতরেই হাত তুলে জানান দেন দ্রাবিড় সৈকত ব্যতিক্রম এক সুন্দর নাম।
তাঁর হতে নাড়ানোর মধ্যেই যাত্রীগণ টের পেতে থাকেন এখানে অর্থনীতি আছে, আজ সামন্তবাদ, প্রেম-ভালোবাসা, মিলন ও বিরহ আছে, মিলন ও দ্বন্ধ আছে, আছে সন্ধি শব্দের দারুণ সম্মোহন। যিনি একাই লড়তে এবং লাড়াতে পারেন/জানেন।
“আছামাতী উড়ে গায়, শুশুকেরা কোথায় যায়, জানে শ্যাম কবিয়াল পান্থচারণ” গায়ের ইছামতী নদীর কথা বিবরণ কিংবা সৌন্দর্যনামা সবাই না জানলেও জানেন-কবিয়ালরা, যারা হাজার বছরে পার্বণ ইতিহাস মুখস্ত জানে, তাঁরা আরো জানেন ইছামতীর শুশুকেরা কোথায় যায় বা আছে। দ্রাবিড় সৈকতের শরীরে সেই কাবিয়াল বংশের রক্ত শরত বইছে। ধারা চক্রে ঘুরে এসে জানিয়ে যান আমাদের অতীত বর্তমান। কবিচোখ ম্যাজিক আয়নার মতো, যেখানে অতীত, ভবিষ্যৎ স্পষ্ট বলেই বর্তমানের ভেতর দিয়ে হাঁটতে পারেন/জানেন। দ্রাবিড় সৈকতের কবিতায় আছে এই সুর। সুরের তালে বা মোহে আমোদিত কিংবা আহ্লাদিত জাতি। জাতির কথা-মুখস্থ বলেন কবি দ্রারিড় সৈকত।
এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কবি ফেরদৌস মাহমুদ। তিনি একাধারে শেকড় সচেতন কবি। ঐতিহ্যের সন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন প্রতিনিয়ত। এক মায়াময় ঘোর তৈরি করছেন। ‘সাতশো ট্রেন এক যাত্রী’ জ¦লন্ত উদাহরণ। কাব্যে গল্প বলার ঢং সামনে রেখে সমকাল ও অগ্রজ কবিদের পাশ কেটে নিজেকে সামনে নিয়ে যাচ্ছেন। সেই সামনে যাওয়াটা অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তুত। ফেরদৌস মাহমুদকে নিয়েই দীর্ঘ পরিসরে সৃজনের সর্বোচ্চ মূল্যায়ন দিয়ে প্রবন্ধ লিখলেও তাঁর সম্পর্কে বলা শেষ হবে না।
এছাড়াও চন্দন চৌধুরী এ সময়ের স্বতন্ত্রস্বরের কবি। তিনি মৃদু ভাষায় বলতে থাকেন আধুনিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা। এটা এই কবির সহজাত শক্তিমত্ত্বার দিক। লাল কাঁকড়ার নদী কাব্যগ্রন্থে কবি তার নিজের ঢং দেখিয়েছেন। সেই সঙ্গে জানান দিয়েছেন কব্জির শক্তিমত্তার কথাও। চন্দন চৌধুরীর কবিতায় একধরনের দ্বিধাদ্বন্ধ রয়েছে। পাঠক এমন দ্বিধা নিয়েই সামনের দিকে অগ্রসর হয় এবং সহজে কবিকে ধরার চেষ্টা করে।
এসময়ের আরেক কবি মাদল হাসান। তিনি ঐতিহ্য ও সময় সচেতন কবি। সময়কে অনুষঙ্গ করে কবিতায় অপসংস্কৃতি, অপবিশ্বাস, অন্ধকুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে শিল্পের দাবিকে আরো যোক্তিক ও আরো প্রয়োজনীয় করে তুলেছেন। কারণ, এই কবি জানেন জীবনের কোন উপলব্ধিই মিথ্যা বা অযোক্তিক নয়। জীবনের প্রয়োজনে সত্য বা মিথ্যা স্পর্শ করতে হয়। করতে জহানতে হয়। মাদল হাসানের কবিতাও তার ব্যতিক্রম নয়।
শিল্পবোধ ও শিল্পসচেতন কবি অতনু তিয়াস। বাস্তবে স্বল্পভাষীও। গীতল ছন্দে কবিতায় দারুণ দক্ষ কবি। ‘রাংসার কলরোল’ সেই বাস্তবতার সাক্ষী দেয়।
এছাড়াও সময়কে অনুষঙ্গ করে নিভৃতে চর্চা করে চলছেন জুননু রাইন, অনন্ত সুজন, ইমরান মাঝি, জাহানারা পারভিন, সোহেল হাসান গালিব, আসমা বীথি, আফসার নিজাম, জুয়েল মোস্তাফিজ, তালাশ তালুকদার, আহমদ বাসির, তুষার কবির, মঈন শেখ, ফারুক আহমেদ, বিজয় আহমেদ, মাজুল হাসান, মামুন খান, মাসুদ হাসান, মামুন রশীদ, রাহেল রাজিব, রুদ্র আরিফ, বান্দা হাফিজ, শারদুল সজল, তারিক টুকু, নওশাদ জামিল, শামীম হোসেন, বিপাশা মন্ডল, সফেদ ফরাজী, মিঠুন রাকসাম, সজল আহমেদ, শুভাশিস সিনহা, সিদ্ধার্থ টিপু, সোমেশ^র অলি, এমরান কবির, এমরান হাসান, কাফি কামাল, খালেদ রাহী, জফির সেতু, সাকিরা পারভীন, সৈয়দ শিশির, মাহবুব সোহেল প্রমুখ। এই সময়ের কবিদের কণ্ঠস্বরে উচ্চারিত হয়েছে নতুন কথা ও সুরের ব্যঞ্জনা।