নিরীক্ষায়, বাচনে ও প্রতিজ্ঞায় শুধু কবিতা নয়, সাহিত্যের অন্যান্য শাখাতেও এ পরিবর্তন তিরোহিত নয়। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ তান্ডব, লাহোর অধিবেশন, দেশভাগের উত্তেজনায় কবিতায় রাজনীতি-সংশ্লিষ্টতা প্রগাঢ় হয়। কবিতা তখন আকৃতি পায় নানাভাবে, নানাজনের কাছে। বিভাগ-পরবর্তী পূর্ব-বাংলায় ক্রমশ এ ইঙ্গিতটি স্পষ্ট হতে থাকে; পূর্ব-বাংলার স্বতন্ত্র ভৌগোলিক পরিমন্ডলে। সেখানে আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫), ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪), আবুল হোসেন (১৯২২-১৯১৪) তাঁদের আকাক্সক্ষার স্বরূপে কবিভাষা নির্মাণ করতে থাকেন। সেজন্য বাংলাদেশের কবি এবং কবিদের ভিত্তি সাতচল্লিশোত্তর কালে। যেটা বাংলাদেশের কাব্যসাহিত্যে নির্ধারিত। কিন্তু এ বাস্তবতাটি নির্ণিত ‘ব্রাত্য’-বাঙালির আন্তর চেতনায়। এক পর্যায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানের কর্মক্ষমতা ও ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে বসে অবাঙালি উর্দুভাষী মুসলমানরা। বাঙালিদের পুঁজি করে রাষ্ট্রীয় শাসনযন্ত্রের যাবতীয় সুযোগ ও স্বার্থসুবিধা তারা ভোগ করে। দেশভাগ-পরবর্তী শাসন-ত্রাসন ও পাঞ্জাবি-শক্তির আধিপত্য এক পর্যায়ে পূর্ব-বাংলা যেন নতুন ‘উপনিবেশ তত্ত্বে’র জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। বায়ান্নতে ভাষার জন্য চূড়ান্ত আন্দোলন এবং সাফল্যের ভেতর দিয়ে শুরু হয় বাঙালির বিরুদ্ধে অবাঙালি শাসন-ক্ষমতা অপনোদনের প্রাথমিক ভিত্তি। এরপর নানাভাবে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বঞ্চনার আন্দোলন দৃঢ়তর হয়। এক পর্যায়ে তা সাংস্কৃতিকভাবেও ভিত্তি অর্জন করে। বিশেষত রবীন্দ্র-বিরোধীতা, নজরুল-সংস্কার প্রচেষ্টা; এসবের বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ক্রমশ পাঞ্জাবি শাসকদের ধর্মের রাজনীতি, ধর্মের নামে শোষণ প্রক্রিয়ার স্বরূপও দ্রুত চিনে ফেলে পূর্ব-বঙ্গভাষী জনতা। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাহিত্য শক্ত ভিত্তি অর্জন করে। কারণ, বিপন্ন অস্তিত্বের যাবতীয় স্বপ্নসুখের অবলম্বন সাহিত্য। এর সঙ্গে পুঁজিবাদী অর্থনীতির উপর ও ভেতর কাঠামোর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ায় গঠিত ব্যক্তি-মনস্তত্ত্ব বাংলাদেশের সাহিত্যকে করে তোলে বিচিত্রমুখি। কখনও তা অস্তিত্বের কথা বলে, কখনও স্বাধীন-স্বায়ত্তশাসনের ভেতরে নিজের মুক্তিরমন্ত্রটি পাঠ করে। যতোই মুক্তিযুদ্ধের দিকে এগুতে থাকে ততোই পূর্ব-বাংলা বাঙালি মধ্যবিত্তের ভেতরে নাগরিক চেতনা এবং এতদ্সংক্রান্ত সাহিত্য বিচিত্র অšে¦ষায় প্রাঞ্জল হয়ে পড়ে। ফলত, বিভাগোত্তর সাহিত্যসূত্রটি নির্ণিত হয় অস্তিত্বসংকট ও আত্মপরিচয়ের নিরীক্ষা-পরিবৃত্তে। বাংলাদেশের কবিতার ভিত্তিটি এ বাস্তবতার ভেতর দিয়েই এগুতে থাকে।
‘নতুন কবিতা’ (১৩৫৬) সংকলন পরবর্তীতে হাসান হাফিজুর রহমানের উদ্যোগে ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ (১৯৫৩) সংকলন বের হয়। তরুণতর কবিরা এসব সংকলনে নিজেদের প্রকৃত স্থানটি চিনে নিতে পারেন। জিল্লুুর রহমান সিদ্দিকী (১৯২৮-২০১৪), শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬), বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর (জ. ১৯৩৬)সহ অন্যরা এসব সংকলনে তাঁদের প্রকৃত স্থানটি চিনে ফেললেন। যদিও সে ডামাডোলে অনেকেই অনিশ্চিতের মধ্যে পড়েন। কায়েম করেন দ্বিজাতিত্ব বা মুসলিম ঘরানার সাহিত্য কিংবা প্রেরণায় দাঁড়িয়ে যান ‘কায়েদে আযম’। গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪), তালিম হোসেন (১৯১৮-১৯৯৯), মুফাখ্খারুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ অনেকটা ঝুঁকিহীন থেকে যান। মধ্যযুগের মুসলমানদের দোভাষী পুঁথির আবর্তেই তাঁদের বিশ্বাস স্থাপিত হয়। ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তানের পর্যাবৃত্ত তাঁদের অবসাদ যেমন দেয় তেমনি প্রেরণার উৎসটি দখল করে। কেউবা সংশয়ে হয়ে যান নাগরিক কবি, গণমানুষের কবি। পঞ্চাশ বা ষাটের প্রারম্ভে বাংলাদেশের কবিতায় এক রকমের তারল্য, সাংবাদিকসুলভ পরিচর্যা বিধৃত হতে থাকে। তারও কারণ, অস্থিরতা কিংবা কবিবুদ্ধির জগতটি কায়েম না-হওয়া। এখানেই ঐ ‘নতুন কবিতা’র গুরুত্ব। যদিও সেখানেও ইসলামী চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক মনস্ক দুরকমের কবিরাই ছিলেন; কিন্তু ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনের পরে তাঁদের আর দ্বিধা থাকেনি। যার উত্তুঙ্গ জাগরণ ষাটের বিচিত্রমুখি অনেক কবির মধ্যে মেলে। কেউ নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকার নাগরিকতা কেউবা বেছে নেন গ্রামজীবনের শাশ্বত জীবনপথ। তবে ইসলামী বা ‘পাক’ভাবাদর্শের লেখকরা শীঘ্রই অবসিত হন। প্রচলিত আন্দোলন-সংগ্রামের ধারায় কিংবা জাতিত্ব চেতনায় তাঁরা আর একাত্ম যেমন হননি তেমনি অনৈক্যে অপসৃত হয়ে পড়েন। বিপরীতের প্রবল উর্বর মৌল ধারায় পাওয়া যায়; সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫), সানাউল হক (১৯২৪-১৯৯৩), আবদুল গনি হাজারী (১৯২৫-১৯৭৬), আতাউর রহমান (১৯২৫-১৯৯৯), আবদুর রশীদ খান (জ. ১৯২৭), মাহবুব উল আলম চৌধুরী (১৯২৭-২০০৭), জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শামসুর রাহমান, আজিজুল হক (১৯৩০-২০০১), হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩), আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯), আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১), আবুবকর সিদ্দিক (জ. ১৯৩৪), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬), আল মাহমুদ (জ. ১৯৩৬), মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (১৯৩৬-২০০৮), মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্ (১৯৩৬-২০১৩), আবু হেনা মোস্তফা কামাল (১৯৩৬-১৯৮৯), বেলাল চৌধুরী (জ. ১৯৩৮), ওমর আলী (১৯৩৯-২০১৫), শহীদ কাদরী (১৯৪২-২০১৬), মোহাম্মদ রফিক (জ. ১৯৪৩), রফিক আজাদ (১৯৪৩-২০১৬), আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০), আসাদ চৌধুরী (জ. ১৯৪৩), মহাদেব সাহা (জ. ১৯৪৪), নির্মলেন্দু গুণ (জ. ১৯৪৫), আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫), মুহম্মদ নূরুল হুদা (জ. ১৯৪৯) প্রমুখকে। বায়ান্ন থেকে একাত্তর তথা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সাহিত্য কার্যক্রম পাঠকদের আশান্বিত করে। কবিতায় অর্জিত হয় অনেক বড় ভিত্তি। যুক্ত হয় বাঙালির আন্তর্জাতিক সম্পর্কসূত্র। এক্ষেত্রে বিভাগোত্তর কালপর্বে বাংলাদেশের যে কবিতাচর্চা সেটা পঞ্চাশ-ষাটে রাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থার উজানস্রোতের যাত্রা। কবিরা নিজেদের ভিত্তিভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন, পথ খুঁজে পাচ্ছেন, চিনিয়ে নিচ্ছেন তার জাতিসত্তা, রাষ্ট্রে অধিকারসমেত আচরণের ক্ষেত্র ইত্যাদি। কবিতায় শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ বা সৈয়দ শামসুল হক শুরু করেন ওই একই মৌল প্রবাহে। বাঙালি মুসলমান চেতনার প্রসারতার ক্ষেত্রটি তৈরি হয়ে যায়, এরপর ষাটের শেষদিকে অনেক কবি আমাদের কবিতার অঙ্গনে বারিবর্ষণ করেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ তীক্ষè, প্রগাঢ় ও অনুগত; রচিত চিত্রকল্প বাকবিন্যাসে ঝংকৃত, ছন্দের প্রবহমানতা কাক্সিক্ষত, পাঠ ও পুনর্পাঠ দৃঢ়।
২.
আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫) তীক্ষè সমাজমনস্ক এবং গভীর সংবেদনশীলতায় কবিভাষা নির্মাণ করেছেন। বিভাগ-পূর্বকালে বেরিয়েছিল তাঁর প্রথম কাব্য রাত্রি শেষ (১৯৪৭)। অসাম্প্রদায়িক মননে, কোনো আদর্শবাদীতার ঊর্ধ্বে চলে নিরন্তর কাব্যচর্চা। চল্লিশের সমাজমনস্কতা, আত্মরতি থেকে অবমুক্তি তাঁর কবিমনস্কতার প্রধান ও অনিবার্য বৈশিষ্ট্য। তাঁর কবিতার বিষয় : শাশ্বত ও গ্রামীণ মূল্যবোধ, নাগরিক জীবনের কৃত্রিমতাকে অস্বীকার, নগর মধ্যবিত্তের অস্তিত্বচেতনা। ১৯৪৭ থেকে ১৯৮৫ কয়েক দশকের কাব্যচর্চায় তাঁর প্রথম কাব্যে কবি বলেছেন, ‘১৯৩৮-১৯৪৬ পর্যন্ত পরিধিতে রাত্রি শেষ লিখিত। … বাংলা কবিতা যখন সমাজসম্পৃক্ত এক নতুন সংজ্ঞায় নতুন দিগন্তে উত্তীর্ণ হচ্ছে।’ ছায়া হরিণ (১৯৬২) কাব্যটি তাঁর দ্বিতীয় কাব্য। ছায়াহরিণ আসলে স্বপ্নের ছায়া, অনুষঙ্গি-অনুগামী মনন আর পরিশুদ্ধ চেতনার ছায়া; ‘হরিণ’ এখানে প্রতীকী শুধু নয়, প্রাচীনতার-শুভ্রতার-সুন্দরের ইমেজিক ফর্ম, যেটা লালন ও আকর্ষণের বিন্দুপূর্ব-বাংলার রূপটিও এর মধ্যে দৃশ্যমান, আমাদের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষার বাতিঘরও এ হরিণ। দু’হাতে দুই আদিম পাথর (১৯৮০) কাব্যচর্চায় আহসান হাবীব নগর জীবনের মানুষ। মধ্যবিত্ত জীবন প্রবণতায় ফেলে আসা অতীত, নস্ট্যালজিয়া, কৃতার্থতার আহ্বানএসব আছে এ কাব্যে। দীর্ঘ সময়ে কবিঅভিজ্ঞতা, এ দেশের সত্তরের বাস্তবতা, অনিশ্চিতি, অনিরাপত্তার প্রকরণ তৈরি হয়। আত্ম-অস্তিত্ব নিয়ে প্রেরণার প্রত্যাদেশ পান কবি। লেখেন “আমি কোনো আগন্তুক নই”। এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, প্রসিদ্ধি পায়, কারণটি চিত্ররূপময় গ্রামীণ ক্যানভাসের ঘনবুননিতে নির্মাণ। মধ্যবিত্ত শুধু চীৎকারে নয়, চেতনার অন্তঃস্তলের প্রতিকৃতিটিতে আর অনিবার্য আবেগের সূত্রানুসন্ধানে – যেটি কবিচেতনায় হয়ে উঠেছে প্রখর ও প্রদীপ্ত :
আসমানের তারা সাক্ষী
সাক্ষী এই জমিনের ফুল, এই
নিশিরাইত বাঁশবাগান বিস্তর জোনাকি সাক্ষী
সাক্ষী এই জারুল জামরুল, সাক্ষী
পূবের পুকুর। তার ঝাকড়া ডুমুরের ডালে স্থিরদৃষ্টি
দু’হাতে দুই আদিম পাথর কাব্যে, এ শ্রেষ্ঠ কবিতাটি ছাড়া “আমি আছি”, “আবহমান”, “যতবার ভোর হলো”,“সারস”,“কিছু কিছু চিত্রকল্প আছে”,“যাবার আগে”, “তুমি যখন বলো” সুন্দর কবিতা। এসব কবিতায়, প্রকৃতির অভিব্যক্তি ব্যক্তি-সত্তাকে ঘিরে। সে ব্যক্তির স্বরূপটি বাংলাদেশের আধা-পুঁজি ও আধা-সামন্ত সমাজ-আশ্রিত। মধ্যবিত্ত এখানে অচরিতার্থ, স্বার্থবুদ্ধিচালিত, কৃত্রিম, কৃতঘ্ন, প্রতারিতও বলা চলে। সমাজ-সম্ভূত ইত্যাকার বিষয়সমূহ এ কবিতাগুলোতে অনির্বচনীয় ইঙ্গিত সৃষ্টি করেছে। গদ্যপংক্তিটি আহসান হাবীবের পক্ষে ‘ভোরের রোদ পোহাতে পোহাতে যারে/ যতদূর ইচ্ছে চলে যা’ কিংবা ‘শরীরে রাখিস ধরে সময়ের ভয়াল প্রতিমা’ এসব কী মাত্রার আধুনিক সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না
“পরিক্রম এবং অবস্থান প্রসঙ্গ” থেকে বিদীর্ণ দর্পণে মুখে (১৯৮৫) অবতীর্ণ হলে মধ্যবিত্তের যাবতীয় প্রবণতার স্বরূপটি আমাদের চোখে পড়ে। এখানে কবি-অভিজ্ঞতা আরও কঠোর-কঠিন। বিশুদ্ধতার স্মারক স্তম্ভটি উন্নত মাত্রার, রুচি-আরাধ্য। তবে কবি ফিরে আসেন প্রাচীনে, অতীতে, বড় হওয়া স্বপ্নের ভেতরে। পূর্ণাঙ্গরূপে নিজের প্রবণতায় হাজির, তবে সেখানে অবগাহন হয় রাজনীতি, স্বার্থবুদ্ধি। কবির রূপকল্প সে পথেই তৈরি। চিলকে ওঠা প্রকৃতি, আর তার ডানায় কবির স্বপ্নমাখা রাজহংস যেন ছুটে চলে। এমনটা তো মধ্যবিত্তই। নিজেরই দর্পণ। কিন্তু বিদীর্ণ, তা কেন? হতাশার ক্লান্তির সৃষ্টি, সমসাময়িকতার ভেতরে। নিজের সময়কে পারেন না মেলাতে। এক রকমের তপ্ত দীর্ঘশ্বাস আছে, একাকী লেখার ধ্বনিটুকু যেন আত্মার আরতি। ঐ তপ্তধ্বনির ভেতরে জীবনীশক্তি নিয়ে তুমুল আশাবাদ।
প্রাচুর্যময় কবি আবুল হোসেন (১৯২২-২০১৪) চল্লিশে শুরু করলেও বেড়ে উঠেছেন পঞ্চাশ ও ষাটের অভিজ্ঞতায়। রবীন্দ্র-নজরুল সান্নিধ্যধন্য, বাংলাদেশের কবিতার প্রত্যুষ-লগ্নের কবি তিনি। দীর্ঘকবিতা পরিক্রমায় তিনি নিজস্ব ভাষারীতিতে সমকালকে নবায়ন করেছেন, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। পুরোদস্তুর নাগরিক। ‘ফুসফুসে সীলমোহর’, ‘থ্যাতলানো থাম’, ‘ট্রাম-মোটর’, ‘পোড়া চামড়া’, ‘বেয়নেট’ এমন চলতিশব্দ দিয়ে প্রথম বিপ্লব ঘটান কবি। ফ্রি-ভার্সের সার্থক প্রয়োগ করেছেন তিনি। কবিতাকে নামিয়ে এনেছেন দৈনন্দিন ব্যবহার্যের মুখে। পূর্ব-পাকিস্তানি কবিতার প্রস্তুতি-ভিতে, নতুন সৃষ্টিতে; তারুণ্যের প্রেরণা নিয়ে তাঁর বীজবপন – অতঃপর অগ্রসর ও উত্তরণ। অনুভূতির স্তরে একালের রাজনীতি, বাস্তবতা স্বীকারে আসে : ‘যায় যায়, সব যায়/ ধর্ম, সত্য, নীতির কঙ্কাল আজ ধুলোয় লুটোয়।/ মানুষের বেশে ঘুরে বেড়ায় হায়েনা সারাদেশে’ – এরূপ ভাষ্যে তিনি সাবলীল এবং মার্জিত। রবীন্দ্র প্রশংসাধন্য নব-বসন্ত (১৯৪০) কলকাতায় ছাপা হয়, এন্টিক কাগজে। আবু সয়ীদ আইয়ুব, বুদ্ধদেব বসুসহ অনেকের সাহচর্য তাঁর আধুনিক রুচি গঠনে সাহায়তা করেছে। মূলধারা-অনুবর্তী কবিতার মতো আবুল হোসেন ছন্দ বা আঙ্গিকের প্রথানুগ পরিচর্যা করেননি, ফলে তাঁর কবিতার পাঠক বেশি নয় – মুক্তছন্দ ব্যবহার করেন, অন্ত্যমিল-মধ্যমিল রাখেন, অনুপ্রাস ব্যবহার করেন। আমরা জানি, সফল গদ্যকবি সমর সেন (১৯১৬-১৯৮৭)। কিন্তু তাঁর মতো বেপরোয়া ছন্দ ভাঙ্গেননি আবুল হোসেন, প্রথাবদ্ধ ছন্দের ভেতরেই নিজস্ব কারুকাজ সম্পন্ন করেছেন। বিরস সংলাপ (১৯৬৯) (১৯৪০ থেকে ১৯৬৯ সময়ে লেখা), হাওয়া, তোমার কি দুঃসাহস (১৯৮২), দুঃস্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্নে (১৯৮৫), Selected Poems of Abul Hussain (১৯৮৬), এখনও সময় আছে (১৯৮৬), নির্বাচিত কবিতা (১৯৯৭), রাজ রাজড়া (১৯৯৭), আর কিসের অপেক্ষা (২০০০), রাজকাহিনী (২০০৪), যাবার আগে (২০১০) আবুল হোসেনের কাব্যগ্রন্থ। তাঁর অনুবাদ কবিতা : ইকবালের কবিতা (১৯৫২), আমার জন্মভূমি (১৯৭৮), অন্য ক্ষেতের ফসল (১৯৯০)। আবুল হোসেনের কবিতাসমগ্র বেরিয়েছে ২০১০ সালে। ‘সারারাত খেটে চিত্রকল্প ঘেঁটে/ উপমার আলোজ্বলা পথে গেছি হেঁটে’ – অলঙ্কার ব্যবহারেও একই রকম সচেতনতায় পংক্তির বিনির্মাণ চলেছে। কার্যত বিরস সংলাপই কবির প্রকরণ-নির্ভর গ্রন্থ, পরের কাব্যগ্রন্থে বোধ করি তারই অনুবর্তন পরিলক্ষিত:
আমার চারপাশে মরা, আধমরা,
মানুষের কি পাহাড়, ইলেকট্রিক কাঁটা তার,
ওপড়ানো গাছ, ধ্বসে পড়া দেয়াল, পাজর ভাঙা
রাস্তায় ছড়ানো ছিটকানো ঝড়,
প্রতীক, চিত্রকল্প ছাড়াও বাক্যবিন্যাসে, distortion, inversion-এ আবুল হোসেন ব্যতিক্রমী, ত্রিশোত্তর কবিকুলের পরিবাহী। ‘পিরামিড’, ‘মমি’, ‘মূষিক’, ‘হাওয়া’, ‘ঘোড়সওয়ার’, ‘স্বগত’ – প্রভূতমাত্রায় আধুনিক অলঙ্কারে ভূষিত ও ব্যঞ্জিত। পূর্ণাঙ্গ সচেতন অর্থেই তা কাব্যপংক্তিতে বিরাজিত। কবিতার ছন্দের পরীক্ষাতেও একই ভাষ্য প্রযোজ্য। বাঙালি মুসলমানের হাতে এমন কাব্য-পরিচর্যা একদিকে যেমন সাহসী অন্যদিকে তেমনি অভিনব। নব-বসন্তের রোমান্টিক রঙে কবি এখনও প্রীতিময় ও স্বতঃধার।
সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২) কবিতাচর্চার প্রথমদিকে ইসলামি আদর্শকে ধারণ করেন কিন্তু পরে রোম্যান্টিক আবেগ ও বুদ্ধির সমন্বয়ে কবিতা লেখেন। চাহার দরবেশ ও অন্যান্য কবিতা (১৯৪৪) গ্রন্থে প্রথমদিকের আদর্শভিত্তিক কবিতাগুলো আরবি-ফারসি শব্দের প্রচুর্যমন্ডিত। পরে পাশ্চাত্য কবিদের মনন তাঁর কবিতায় যুক্ত হয়। শব্দের অনুষঙ্গে যুক্ত করেন আধুনিক মাত্রা। ‘তিনিই বাংলা কবিতার আধুনিক শিক্ষক’ [আবিদ আনোয়ার]। কবি বলেন ‘আমার আধুনিকতা আমার ধর্মচর্চায় কোন ব্যাঘাত উৎপন্ন করেনি, বরঞ্চ সাহায্য করেছে। বিশ্বাস বিনয়ে এবং অন্তর্গত চৈতন্যের সাহায্যে মানুষ আধুনিকতার উন্মোচন ঘটায়। একটি কথা আমি বিশ্বাস করি যে, আধুনিকতা কখনো বিশ্বাস ও প্রার্থনার বিপরীতে কিছু নয়।’
প্রাচীন দুর্গের কক্ষের
শীতল অন্ধকারের মতো,
আমি সময়ের স্বাদ হারিয়েছি
জাতিগত অবচেতনের (Phylogenic unconscious) সংশ্লেষে কবি এভাবে প্রবৃত্তীয় তাড়নাকে প্রকাশ করেন। রোম্যান্টিক হয়ে কবি সময়কে পুনরুৎপন্ন করেন:
ক্রমান্বয়ে উত্তোলিত অন্ধকারে
মুমূর্ষু চেতনায় আমার সময়
আদিম জন্তু হ’ল।
এক ধরনের এ্যানিমার [পুরুষের নারীসত্তা] ভেতর ‘অন্ধকার’কে প্রতœ-মুদ্রণ করেন কবি। জীবনানন্দ দাশের ধারাটি এ পর্যায়ে অনুরুদ্ধ হলেও সৈয়দ আলী আহসান তাকে বিদ্র-প ও উপহাসের ভেতর দিয়ে সমকালীন করে তুলেছেন। প্রশ্নবিদ্ধও করেছেন। এ পর্যায়ে তার প্রকরণও যথারীতি হয় না, গৎবাঁধা থাকে না। প্রকাশভঙ্গি চরণে অন্যতররূপে উদ্ভাসিত হয়। তা পর্যবসিত হয় পরা-অনুভূতির ভেতরে:
সহসা ঘুম ভেঙে সকাল বেলায় যে রৌদ্রকে পাই যা জানালার কপাটে ধাক্কা খেয়ে
টুকরো হয়ে আমার মশারী ছুঁয়ে যায়, তাও যেন তার অস্তিত্বের আলোর কণা।
এভাবে কবি ক্রমশ পাল্টান, আধুনিকতার অবিনাশী রেখায়। চিত্রকল্পভূমে রঙিন করে তোলেন অনুভূতির ‘আশ্চর্য উষ্ণতা’সমূহ। কবির প্রজাতিগত স্মৃতি (চযুষড়মবহরপ সবসড়ৎু) বা প্রতœ-অবশেষ (ধৎপযধরপ ৎবসহধহঃং) ই তার মানস-পরিক্রমণ। আমার পূর্ব-বাংলার ¯িœগ্ধ অনুভবের ভেতরও পূর্বোক্ত এই কল্পনার বসতি বিদ্যমান। যেটি নারীকে কেন্দ্র করেও হয়ে উঠেছে বহুস্তরীভূত, সৌকর্যমন্ডিতÑ ‘নতুন নারীর ক্ষেত্রে উরু পুষ্ট লাঞ্ছনা চেয়েছি/ মূর্ছিত নদীর ¯্রােতে দাবানল করেছি সন্ধান’। চিত্রকল্পের মধ্যে আলো-অন্ধকার, সমুদ্র-আকাশ, গাছ-পাখি যেমন আবহমানত্ব পায় তেমনি জিজ্ঞাসারও মাত্রাবন্দি হয়। সাধারণত প্রকৃতিই সর্বজ্ঞ হয়ে আসে তাঁর কবিতায়। সৈয়দ আলী আহসানের পূর্ব-বাংলার কবিতায় রূপ-রীতির আলেখ্য নির্মিতি পায় স্নিগ্ধ ও প্রশান্তিময় ইন্দ্রিয়চেতনার ব্যাপ্তিতে। অনেক আকাশ (১৩৬৬), একক সন্ধ্যায় বসন্ত (১৩৬৯), সহসা সচকিত (১৩৭৩), উচ্চারণ (১৯৬৮), আমার প্রতিদিনের শব্দ (১৯৭৪), কাব্য সমগ্র (১৯৭৪), সমুদ্রেই যাব (১৯৮৭), রজনীগন্ধা (১৯৮৮), নির্বাচিত কবিতা (১৯৯৬) সৈয়দ আলী আহসানের কাব্যগ্রন্থ।
পঞ্চাশের নবীন কবি মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্ (১৯৩৬-২০১৩)। একাধারে দোভাষী পুঁথির সম্পদকে কাজে লাগিয়ে কবিতা লেখায় উদ্যোগী অন্যদিকে বাংলা কাব্যধারায়ও বুদ্ধি-বিবেকী বিশ্বস্ততা অর্জন। মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্ কাব্যআঙ্গিকে দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। নিঃসন্দেহে তিনি জীবনানন্দীয়। সনেট, অক্ষরবৃত্ত, গদ্য ছন্দে লিখেছেন। প্রেমকে পরিশুদ্ধ করে এক ধরনের ধ্রুবপদের জন্ম দিয়েছেন তিনি। প্রথম কাব্য জুলেখার মন (১৯৫৯) থেকে কবিচেতনা উত্তরিত। অন্ধকারে একা (১৯৬০), রক্তিম হৃদয় (১৯৬৬), আপন ভুবন (১৯৭৪), মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্র কাব্যসম্ভার (১৯৮০), বৈরিতার হাতে বন্দী (১৯৯৬) প্রভৃতি।
বিভাগোত্তরকালে ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা কবিতার স্বতন্ত্রধারা তৈরিতে আবদুল গনি হাজারী (১৯২৫-১৯৭৬) অন্যতম। ষাটের দশকেই রচনা করেছেন তিনি তিনটি কাব্যগ্রন্থ। সামান্য ধন (তারিখবিহীন, সম্ভবত ১৯৫৯), সূর্যের সিঁড়ি (১৯৬৫), জাগ্রত প্রদীপে (১৯৭০)। এ কাব্যগ্রন্থগুলো আবদুল গণি হাজারীর কবিসত্তাকে নির্মাণ করেছে। তাঁর কবিচৈতন্য সম্পর্কে বলা চলে : আবদুল গণি হাজারী যে জীবন পটভূমির উন্মোচন ঘটিয়েছেন কবিতায় তা কখনো নৈরাশ্যে আকুল হয় না, পঙ্গু হয়ে যায় না বেদনার গহীন অতলে Ñ পঞ্চাশ-ষাটের দশকের কতিপয় আত্মভূক, অতীতচারী ও বৃহন্নলারূপী কবিকর্মীর মতো।’ গণি হাজারীর ব্যক্তি জীবনাভিজ্ঞতা কাব্যচর্চার ক্ষেত্রে প্রধান অবলম্বন। পূর্ব-পাকিস্তান সরকারের দমন-নিপীড়ন এবং চন্ডনীতির সমালোচনা করে কালপেচাঁর ডায়েরী রম্যরচনা লেখেন। এছাড়া বন্দী বিবেক নামে যুক্তিনিষ্ট একটি গ্রন্থে সমাজ, দেশ-রাজনীতি, কাব্য সমালোচনা করেন। কবির কাব্য সমালোচনায় এক পরিমার্জিত উন্নত কাব্যবোধের সন্ধান মেলে।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১) শক্তিমান কবি। তাঁর কবিতা ইতিহাসের মাত্রায় যুক্ত – পঞ্চাশের কবি-ব্যঞ্জনায়, বাক্-বৈদগ্ধ্যে ও ব্যক্তিত্বে। তিনি বরাবরই সহজ ও স্বাভাবিক। গাম্ভীর্য ও প্রচ্ছন্ন গর্বের স্বীকারোক্তি আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি (১৯৮১) লিখে নিজের অস্তিত্বের-ঐতিহ্যের ঘোষণা দেন। অনবদ্য, প্রাণোচ্ছল এক বার্তা ধ্বনিতরঙ্গে দ্রুত মরমে পৌঁছায়; ছড়ায় সর্বস্তরে – মুখে মুখে। তারপর সাতনরী হার (১৯৫৫), কখনো রং কখনো সুর (১৯৭০), কমলের চোখ (১৯৭৪), সহিষ্ণু প্রতীক্ষা (১৯৮২), বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা (১৯৮৩), আমার সকল কথা (১৯৯৩), মসৃণ কৃষ্ণ গোলাপ (২০০২), খাঁচার ভিতর অচিন পাখি। ছড়ার ছন্দে তাঁর বেশি আগ্রহ; গ্রামীণ প্রকৃতি ভেসে বেড়ায় – ফেলে আসা কাতরতায়। আবেগের নিঃশ্বাসে শহুরে চিত্তে ভর করে গ্রাম। প্রকরণে পাওয়া যায় দ্রুত লয়ের, হ্রস্ব পংক্তিমালা। উপনিবেশ-উত্তর কৃষিনির্ভর অর্থনৈতিক বাস্তবতার পরিমন্ডলে অস্তিত্বের সংস্কৃতিকে তুলে আনেন কবিতায়। ‘মা’-কে বিপুল করে তোলেন আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। ‘কুমড়ো ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা’য় যে গার্হস্থ্য মমতা, স্নেহ-আশ্বাস মেলে তা কবির দীর্ঘ অবসরে আশিতে এসে পায় প্রগল্ভতা ও প্রার্থনার প্রতিরূপ। এ সময়ে যুক্ত হয়েছে পুনরুক্তিনির্ভর প্রাত্যহিকতা আর কাব্যকথার দীর্ঘায়ত অবয়ব। স্বদেশ স্বকাল বার্তাকেই মুক্তিযুদ্ধোত্তর কবিতায় এমন প্রকরণে যুক্ত করেন। বিশেষ করে “বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা” কবিতাটিতে ‘বৃষ্টি’ ও ‘সাহসী পুরুষ’ যেন প্রফেটিক ভাষ্যে উদ্যাপিত। একটা আলোকবর্তিকা আর প্রত্যাবর্তনকামী পুরুষ – সে যেন ফিরে এসেছে অপাপবিদ্ধ চেতনায় সামূহিক শান্তি পুনরুদ্ধারের জন্য। ‘স্থিতধী বৃক্ষের মতো/ ঊর্ধ্বমুখে প্রার্থনা করেছি/ আমি সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা করেছি’ টোটেম ব্যঞ্জনায় ‘বৃক্ষ’ জ্যোতির্ময়রূপে পরিগণিত। মাটিভূমির সংস্কার সত্যে একপ্রকার স্তোত্রগীত মরমে পৌঁছয়। সেখানে সব ভ্রান্তির অবসান যেমন হয় তেমনি আশাবাদও ব্যক্ত হয়। প্রধানত লোকায়ত নন্দন তাঁর কবিতার অনেকটা অংশ জুড়ে পরিবেশিত। এতে করে শাব্দিক ইমেজ ও অনিবার্য প্রতœ-কাঠামোটি কবিসত্তার চেতন-অবচেতন স্তরে পরিচর্যা পায়। এক্ষেত্রে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ছন্দ বেশ ধ্বনিময় এবং সোচ্চার-সুললিত। কিছু ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিমার কবিতাও আছে। যা তাঁকে আলাদা মাত্রিকতা দেয়।
বাংলাদেশের কবিতায় সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) একটা বলয়ের অধিকারী, নিজস্ব সে বলয়ে অনুগামী করেছেন প্রজন্মান্তরের কবিদের। উদাহরণে পরানের গহীন ভিতরে (১৯৮১)র সনেটগুচ্ছ কিংবা একবারে দিব্য উন্মীলন তাঁর কাব্যনাট্যের ভাষ্য। এসবে বিশ্লেষণমাত্রা হয়ে উঠতে পারে বহুমাত্রিক। যেন ভরা নদীর মতো উপরিপৃষ্ঠে সৌম্য-শান্ত কিন্তু ভেতরে স্রোতস্বিনীর গতি। সৈয়দ শামসুল হক কাব্যপ্রকরণে বিভাগোত্তর পূর্ব-বাংলা, মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরের বাংলাদেশকে স্বরূপে চিহ্নিত করেন। সেজন্য স্বদীক্ষিত, স্বচিহ্নিত তার কবিপ্রত্যয়। এ পর্যায়ে তাঁর নতুন রূপ পলিমাটির প্রান্তজিজ্ঞাসা। প্রত্যন্ত হয়ে ওঠা। সমকাল চিহ্নিত দেশাত্মধারাটি সৈয়দ শামসুল হকের মধ্যে প্রাণবন্ত। এ বিষয়টিতে কবি প্রকট। অনেকাংশে বলা যায় কবির সামূহিক চেতনা আসলে দেশ-ঐতিহ্য অস্তিত্বে নিরঙ্কুশ নিবেদিত। অর্জন কিংবা প্রাপ্তির মূলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব, তার জন্ম-পরবর্তী বেড়ে ওঠা, যতœ ও শৈশব অতিক্রান্ত কালবৃন্তে বাঙালি হিসেবে আমাদের প্রতিষ্ঠিত প্রেরণা – সবকিছুর মর্মমূলে থাকে বাংলাদেশ হওয়ার পথটিতে প্রতিরোধ শক্তিকে চিনে নেওয়ার পর্যায়টি। কবি এখানে আপোষহীন, আবর্তিত। পৌনঃপুনিক তাঁকে প্রান্ত স্পর্শ করে ঐ একই কারণেই। আর দায়বোধের জায়গাটিতেও তিনি নিরন্তর হয়ে ওঠেন। প্রাসঙ্গিক অর্থে, ‘আমি জন্মগ্রহণ করিনি’ কবিতাটি উচ্চারণে আনা যেতে পারে :
অসংখ্য কীট – কোটি কোটি কীট –
এবং সেই কীটের ভেতরে, হায় কি ভাগ্য কিম্বা দুর্ভাগ্য –
একটি এখন দ্রুতগামী বাসে চড়ে ভ্রমণ করছে দুঃখের এই বাংলাদেশে,
এমন ক্রান্তিকালের বাংলাদেশের জন্মকে কবি দেখেন এরূপ ভঙ্গিতে :
আমাকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে ন’মাস ন’দিনের আগেই,
কারণ কাম কোনো সন্তানের জন্ম দিতে পারে না যেখানে চলেছে যুদ্ধ। আরও তীক্ষèধী স্বরে বলেন :
আমি জন্মগ্রহণ করিনি, আমাকে জন্ম দেয়া হয়েছে,
কিন্তু ‘একটি জন্মে’র কথা বলেন, যে জন্মের অপেক্ষায় অধীর কবি, গরবিনি দেশ যে জন্মের প্রতীক্ষায় আছে। কবির জন্মগ্রহণ সেই প্রত্যয়ে, যেখানে ‘সমস্ত দেয়ালের আলোচালের শাদা আল্পনার ভেতরে,/ স্বপ্নের বর্ণমালার তরংগে ও সন্নিহিতিতে’… ‘একটি জন্ম দেবার জন্যে – রবীন্দ্র, কি মুজিব, কি জয়নুল।’ সেখানেই কবির অবিচ্ছেদ্য আশাবাদ ‘আমি জন্মগ্রহণ করব… ’ পৌনঃপুনিক ধ্বনিত। এখানে মূল্যায়ন তাঁর কল্পিত প্রত্যয়টির।
বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা (১৯৬৯)-য় সৈয়দ শামসুল হকের কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমাদের নজরে আসে। বৈশাখে রচিত পংক্তিমালায় খেদোক্তির চেয়ে বেশি আছে নির্মিত জীবনের সংবাদ। পুনরায় উচ্চারিত হয় কবিতা লেখার বয়স। কবিতার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয় রোপিত জীবন। নিরন্তর প্রবাহিত সময়ধ্বনি একের ভেতর দিয়ে যেন প্রবিষ্ট হয় সর্বত্র, হয়ে ওঠে সর্বাধিক। আমরা মিলিত হই আমাদের পরিশুদ্ধ জীবনের সঙ্গে, আবৃত্তিতে ভর করি কালের জিজ্ঞাসু বৃত্তে। কতো নিবিড় আর মায়াবী সে আয়োজন :
বাংলার যুবক ঘুমে,
জননী ও কবি, রামসাগরের জলে
ছলছল ঘুম একা দাঁড় বেয়ে যায় –
পদ্মার ইলিশ ঘুমে, কিশোরীর স্তন
ঘুমে পূর্ণিমার মতো হতে চায়, দূরে
আমনের ধান মাথা নাড়ে।
এরূপে প্রবহমান চেতনাসত্তা আরও ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে সংলাপের কারণে। এক পর্যায়ে তা হয়ে ওঠে একজন নায়কের স্মৃতিতর্পণ, সর্বসাকুল্যে যা কবির বর্ণবিভাময় আত্মপ্রতিকৃতি। সেখানে শুধু বাচনিক প্রয়াস নয়, নির্মিত অবয়বটি প্রত্যক্ষযোগ্য ও অনুকরণীয় হয়ে ওঠে। পুরাণ, ইতিহাস, ঐতিহ্য বা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ছন্দে অবলীলায় উঠে আসে। গ্রহণ করে আলঙ্কারিক মাত্রা। তখন তা শুধু বিশেষ না হয়ে নির্বিশেষ পর্যায়ে পৌঁছায়। পরিবেশিত হয় সার্বজনীন হয়ে। সৈয়দ শামসুল হকের রীতিটিতে যৌনতা, মনস্তত্ব, আর্থ-সমাজের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, শ্রেণিস্তর পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি বিষয়গুলো বিধৃত। তবে এসবের কোনোটাই আরোপিত নয়। প্রবহমান যাত্রাপথে, জীবনের টানে আটকা পড়ে ছন্দোবন্ধনে। চৈতন্যের মূর্তিটি ভেতর থেকেই সামগ্রিক সংস্কার, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, ইতিকথা বা পুরাবৃত্তের অঙ্গীকার ঘোষণা করে। কবির আলেখ্যটি সেখানে নির্বিকার এবং সংহত। আমাদের অস্তিত্বের স্পর্শটিই হয়ে ওঠে মুখ্য। এমনটি শুধু একজনের ব্যক্তিবীক্ষা নয়, আমাদের সামষ্টিক সম্বন্ধসূত্র, কাল এবং ঐতিহ্যের অংশীদার। বৈশাখে রচিত পংক্তিমালার যে ধারাবিবরণী, আয়োজনের যে বিপুলতা তা এ সময়-বাস্তবতার একজন ব্যক্তির সূক্ষ্ম সুকুমার প্রবণতার অন্তরিন্দ্রিয় উচ্চারণ। বাংলাদেশের গৃহকাতর নাগরিক মধ্যবিত্ত, ‘স্মৃতি’ বা ‘হিমহাওয়ার’ আনন্দ অšে¦ষী মুখফেরা আবেগ – এ বাংলার ‘নদী-মাঠ-ক্ষেত’ ভালোবাসার চিরন্তন আহ্বান এক লহমায় সামষ্টিক ও সামূহিক করে তোলেন সৈয়দ শামসুল হক। এর সংহত-পরিশীলিত শিল্পসৌকর্য পরম ও মহান। প্রবহমান জীবনের মতো অতীত-বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে নিজেকে প্রসারিত করেন। এজন্য পুরনো আঙ্গিকেরই ঘটান নবতর-উত্থান।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬)। প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল কবিতার চর্চা করেছেন। ‘নিজেরই সত্তা দিয়ে বুঝতে হলে তাঁর কবিতা দিয়েই… তিনি শামসুর রাহমান। তাঁর কবিতা পড়লে মনে পড়ে poetry of earth is never dead – তবু পৃথিবীকে আরো ভালবাসতে হয় – আবারও’। অতলস্পর্শী এক গভীর বিশ্বাস, গাঢ় অকৃত্রিম ভালোবাসায় বাঙময় হয়ে ওঠে তাঁর রচনা। শামসুর রাহমানের কবিতার বিষয় : নাগরিক মধ্যবিত্ত চেতনা, রাজনৈতিক অনুষঙ্গ, স্বদেশ ভাবনা পাঁচের দশকের কবিতা, বেরিয়েছিল ষাটে; প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে কাব্যভাবে গ্রন্থভুক্ত সীমানায়। এরপর কবিতার বই বের হয় প্রত্যেক দশকে; আমৃত্যু। শামসুর রাহমানের কবিতায় নগরজীবন, নাগরিকতা, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর বিচিত্র প্রয়াসে প্রবণতা-নির্ভর হয়ে গভীর ভাবে (রফবধ) দীপিত হয়ে ওঠে। নাগরিক মনোজগতের বিচিত্র বিষয়, সূক্ষ্মতর সুকুমার অনুভূতি, মধ্যবিত্তের প্রেম-নৈরাশ্য-গ্লানি-হতাশা, তার রাজনৈতিক শর্তসমূহ, রাষ্ট্রীয় শাসন-শোষণ ব্যবস্থা সবকিছু accumulation of detail এবং the sharpness of selected detail ’-এর শব্দবন্ধে তুল্যমূল্য জ্ঞান করেছেন। শামসুর রাহমান কাব্যনন্দনে ক্রমাগত হয়েছেন পরিবর্তিত। ষাটের অভিঘাত তাঁকে এদিকে চালিত করে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে তিনি হয়ে চললেন পরিবর্তিত। এবার স্বদেশ সময় ও সমাজ আছড়ে পড়ল তাঁর কবিতায়। ১৯৬৪ তে প্রকাশিত রৌদ্র করোটিতে কাব্যে প্রকটভাবে মিলল সমাজ ও স্বদেশ। তবে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপাত্মক হয়ে উঠল কবিতা। কারণ, তখন আইয়ুবের শাসন পূর্ণাঙ্গরূপে কায়েম হয়েছে। শামসুর রাহমানের আঙ্গিকে ত্রিশোত্তর কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ, কালো অন্ধকার, সেই ঘোড়াটা এসব সংবেদনশীল শব্দবন্ধ জীবনানন্দ দ্বারা আলোকিত। কবির, পশ্চিম ইউরোপীয় প্রভাব নতুন কী! প্রধান বিষয়; চিত্রকল্পের তীব্রতায় প্রকাশমান যুৎসই শব্দ। সেখানে আধুনিক কবি নিজের সমাজ বাস্তবতায় গোটা বিশ্ব ঘেঁটে শব্দকে ছেনে বের করবেন; আর প্রয়োগে হবেন নিরঙ্কুশ স্পন্দনসিদ্ধ – কবিতার বাস্তব-অবাস্তবতা ইমেজের ভেতর; অন্তর্গত ছন্দের ধ্বনি-ঝঙ্কারে। সেটা যদি কবি যথার্থ করতে পারেন তবেই সিদ্ধি। মোট কথা, কবির Ethos কে জানাই জরুরি। শামসুর রাহমান বিংশ শতাব্দীর শেষপাদের কবি; এ সময়ে তথ্য বিপ্লব, বিজ্ঞান ও সাহিত্যের নানারকমের তৎপরতা তিনি অবলোকন করেছেন – তাই জীবনানন্দ নন; ঘোষিত মার্কসবাদী নন কিন্তু সমস্ত বাধা অতিক্রমী স্বাধীনচেতা মুক্তিকামী সাহসী কবি। সেজন্য মুক্ত বিহঙ্গের মতো, সমস্ত মিথ-ঐতিহ্য ঘেঁটে – শব্দ তুলে এনেছেন। একেবারে বাস্তবতাকে প্রকাশের জন্য – হরিৎ প্রান্তর, জেব্রার ধ্বনি যতোই অযৌক্তিক হোক; এসময়ে এমন পংক্তি কেউ কি অস্বীকার করবে! সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার প্রয়োগের সততা; প্রকাশের ক্ষমতা আর জীবনের জন্য বলার চেষ্টা – যেটা শামসুর রাহমানের কবিতায় প্রকাশিত। শামসুর রাহমানের প্রকরণে এলিয়ট কথিত ‘ট্যালেন্ট এন্ড ট্রাডিশনে’র ব্যত্যয় ঘটেনি। আধুনিক শর্তে নগরের বিচ্ছিন্নতা, অবক্ষয়, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, আত্মকেন্দ্রিকতা, নৈঃসঙ্গ্য এসেছে; শামসুর রাহমানের কবিতায় তা আছে – কিন্তু কিছুই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। তাঁর রাজনীতি ও রাষ্ট্রদর্শন সবই উৎকৃষ্ট কবিতার জন্য। সে কারণে অনেক চিত্রশিল্পীর নামও কাব্যভাষা হয়েছে; অনেক ইজমের সঙ্গে সম্পৃক্তি সৃষ্টি হয়েছে আবার মাঠের-প্রান্তরের আন্দোলনেরও সংযুক্তি ঘটেছে। মোট কথা, রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রের প্রতিক্রিয়াশীল রূপ অঙ্কনে রাষ্ট্রের সঙ্গে সমাজের, সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির, ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির দ্বন্দ্বকে – কবিতায় প্রাণিত করাই কবির কাজ। আর এ দ্বন্দ্বচিহ্নিত সমাজের শ্রেণিস্তরবিন্যাসও কবিকে প্রসন্ন ইমেজে দাঁড় করাতে হয়। কারণ, উৎপাদনশক্তি ও সম্পর্কই শ্রেণিস্তরকে তৈরি করে। নিও-ক্রিটিকদের যে ধারা আমাদের কবিতায় তিরিশ থেকে শুরু হয়েছিল, তা-ই রাহমানে আরও প্রকটিত ও অভিব্যক্তময়। চেতনার দ্বন্দ্বময় ধারাটি প্রবহমান ও সময়-ক্ষেপনে উতরোল। নিও-ক্রিটিক ধারার লক্ষণসমূহ এলিয়টিয়, এখানে আছে : স্বগত ভাষণ-একক সংলাপ-মনোলগ (‘আমি’), ধ্রুববাক্য (‘এ-শহর টুরিস্টের কাছে পাতে শীর্ণ হাত যখন তখন,/ এ-শহর তালিমারা জামা পরে, নগ্ন হাঁটে খোঁড়ায় ভীষণ’, উল্লেখপরায়ণ, উল্লম্ফন প্রভৃতি। রাহমানের কবিতা যে নব্য-বাস্তববাদী তত্ত্বের আলোয় চকিত চিনে নেওয়াও সম্ভব। সেখানে আরও অনেক জ্ঞানতত্ত্ব যুক্ত করা সম্ভব। বিশ শতকের উত্তর-উপনিবেশ চিন্তা, নারীবাদী চিন্তা, মার্কসবাদী ধারণা, অস্তিত্ববাদী-প্রতীকবাদী ধারণা প্রভৃতিতে। তবে এসব ধারণা একটির ভেতরেই বহুমুখী রূপ রচনা করেছে। উত্তর-উপনিবেশ চিন্তায় কলোনি বা উপনিবেশ-উত্তর ধারণাটি যখন ব্যাপকভাবে রাহমানের কবিতায় আসে তখন অপরতা বা স্যবলটার্ন চিন্তা, যেখানে শ্রেণিচেতনা, উগ্র-শ্রেণিবিচ্যুতি, ভাষার মুক্ত এলাকা (ভৎবব ঢ়ষধু) সৃজন নিয়ে কাজের সুযোগ থাকে। এবং তাতে করে কবিতা পায় ভিন্ন টেক্সট। উপর্যুক্ত দুটি সমালোচনায় [‘বসড়ঃরাব’, ‘ড়নলবপঃরাব পড়-ৎবষধঃরাব’]-এর বাইরেও শামসুর রাহমান তার কবিতায় যে সামাজিক-রাজনৈতিক সীমানাসমূহ নির্দিষ্ট, তাও যুগোপযোগী জ্ঞানচর্চায় অবহেলিত বা গৌণ নয়। প্রসঙ্গত উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তায় বন্দী শিবির থেকে কাব্যে সংযোগ করেন ভিন্ন মাত্রা। শুধু এই একটি কবিতাগ্রন্থই নয়, ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা কিংবা বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়-এ কর্তৃত্বের বিপরীতে উঠে আসে সাধারণ মানুষের মর্যাদা। আর মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই শুধু নয় রাষ্ট্রীয় অধিকারের বলয়ে নিয়ে আসেন দৃঢ়প্রত্যয়। বর্ণ-শ্রেণি-বিত্তের অর্থজ্ঞাপক ধারণা ভাষা-চিহ্নে মুক্তএলাকা নির্ধারণপূর্বক উগ্র শ্রেণিচ্যূতি ঘটিয়ে দ্বৈত-বৈপরীত্যে আনে নতুন অর্থে। সেখানে ‘নূর হোসেন’ হয়ে ওঠে গণ-জনতার প্রতীভূশক্তি। বাংলাদেশ নূর হোসেনের একক চেতনায় সমস্ত মানুষকে এক হয়। যেভাবে আসাদের শার্ট, সফেদ পাঞ্জাবী জনতার সারিতে উঠে আসে : ‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সুর্যাস্তের/ জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট/ উড়ছে হাওয়ায় নিলীমায়।’ কর্তৃত্বের এমন সংঘশক্তি পরিবর্তিত চেতনায় অবহেলিত মানুষের প্রেম, আবেগ হয়ে ওঠে সৃজনশীল। সৃষ্টি হয় নতুন চেতনাকাঠামো (ঢ়ধৎধফরমসরপ)। শামসুর রাহমানের কবিতার সাহিত্য-সমালোচনা চিন্তার মার্কসবাদ, নারীবাদ তত্ত্বের ধারণাও একই প্রবণতায় চিন্তাসূত্র রচনা করে। ‘বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে’ কিংবা ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার ভেতরেও পুনর্গঠিত হয় মিখাইল বাখতিনকথিত ‘কার্নিভাল চেতনা’। শোষণ বা কর্তৃত্বের বিপরীতে নিম্নবর্গীয় জনতার শ্রেণিভিত্তি প্রতিষ্ঠার উৎসবে গড়ে ওঠে সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির ভিত্তি। শ্রমজীবীর শ্রেণিমর্যাদার বিচ্যুতির মতো নারীরও ঘটে স্থানচ্যুতি। সূর্য পুরুষ হলে নারী চাঁদ, আলো যদি হয় পুরুষ অন্ধকার নারী, পুরুষের স্থান উপরে হলে নারীর নীচে – এমন ভাষিক যুগ্মবৈপরীত্যে নারী অবহেলিত। নারী পুরুষের সহজাত হয়ে ওঠে পুরুষ কর্তৃত্ব থেকে। সিমন দ্য বোভেয়ার (১৯০৮-১৯৮৬) বা কেট মিলেট (জ. ১৯৩৪) তত্ত্বে নারীর মনস্তাত্ত্বিক মূল্যবোধটি ব্যাপকভাবে সাহিত্যে আসে। আর সেটি রাহমানের কবিতাতেও যুক্ত করে স্বতন্ত্র স্বর। নারীর বিচ্যুতির, শ্রেণিমর্যাদার প্রশ্নটি তৈরি হয়, বিভিন্ন ইমেজের প্রতীকায়নে।
বাংলাদেশের কবিতায় তিনি স্বভাবজাত, ‘সিদ্ধিদাতা গণেশ’ আলাউদ্দিন আল আজাদ (১৯৩২-২০০৯)। ‘উগ্র আধুনিক না বলে অত্যাধুনিক প্রগতির সংজ্ঞায় যাঁরা নিজেকে আখ্যায়িত করেতে চান আলাউদ্দিন আল আজাদ সেই শ্রেণীভুক্ত দ্বিধা নেই’ এমনটি কবি সম্পর্কে ‘নতুন কবিতা’র ভাষ্য। চিনে নেওয়া যায় কবির প্রকরণবিশ্বাসটি :
শিয়রে এলার্ম্
জ্বলে, বারান্দায় কুকুরের চোখে শুকতারা, জাগো জাগো
রাজেন্দ্রাণী সুন্দর প্রাসাদে, নগ্নতার আবরণ দাও
দূরে ফেলে দাও দূরে, বিছানায় পরিশ্রান্ত মিলনান্ত
শাড়ির সাড়ায়
১৯৪৯ সময়ে এ নির্মিত পংক্তিমালা অনেক ইতিহাসঋদ্ধ মূল্যায়ন পেতে পারে। ‘জাগো জাগো…’ – আদিধ্বনির উপাসক আহ্বান। স্থানিক আবর্তে মূর্তমান। ইতিহাসখ্যাত কবিনন্দিত কবিতা “স্মৃতিস্তম্ভ” রচিত ২৬/০২/১৯৫২ তে।
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান (১৯৩৬-২০০৮) লিখেছেন দুর্লভ দিন (১৯৬১), শঙ্কিত আলোক (১৯৬৮), বিপন্ন বিষাদ (১৯৬৮), প্রতনু প্রত্যাশা (১৯৭৩), ভালবাসার হাতে (১৯৭৬), ভূমিহীন কৃষিজীবী ইচ্ছেতার (১৯৮৪), তৃতীয় তরঙ্গে (১৯৮৪), কোলাহলের পর (১৯৯০), ধীর প্রবাহে (১৯৯৩), ভাষাময় প্রজাপতি (১৯৯৭)। প্রেম, দেশাত্মবোধ, যুগযন্ত্রণা, বুর্জোয়া আগ্রাসন এসব বিষয় কবিচিন্তনে সঙ্গতি-অসঙ্গতির প্রশ্ন তোলে। প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধের বিলুপ্তি, স্নায়ু-আঘাত, অন্ধকারের অবসানে মুক্তির আলেখ্য তাঁর কবিতার প্রতিপাদ্য :
সান্ত¡নার কথা নয় : আমরা সূর্যের আয়ু পেয়েছি ক্রান্তির জলধারে;
প্রসাধিত কারুকলা নগ্ন হবে জনালয়ে; শিল্পিত মনের পারাপারে।
আমরা একাগ্র হবো- তার বাণী একীভূত যুগ্নতার ভিতে
সঞ্চারিত। মিত্রালী গানের মন্ত্র জীবিত প্রেমের পরিধিতে।
দুর্লভ দিন থেকে প্রতনু প্রত্যাশা পর্যন্ত কবি প্রবলরকম প্রকৃতিকাতর। দুর্লভ অনুভূতির ভেতরেই প্রত্যাশা খুঁজেছেন। গড়ে নিয়েছেন নিজস্ব ভাষাভঙ্গিমা। ‘পিপাসার মাঠে’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘বৈশাখী’ রোম্যান্টিক কবিতা। গীতসুধারসে পূর্ণ এ পর্বের কবিতাগুলি। পরের পর্বে শঙ্কিত সমাজও প্রেম-অপ্রেম মিলে প্রকাশিত। এক ধরনের তরল টেলিং-এ প্রকরণ ভূষণময়। পরের কাব্যসমূহে কবির প্রত্যাবর্তন, পুনরাবৃত্তিময়। অনতিক্রান্ত। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রধানত গীতিকবি। কবিতায় তাই প্রতিফলিত। রোমাঞ্চ ও রোম্যান্টিক প্রবাহ সদা স্ফুরিত ও সাবলীল। গীতল রস মুখরিত। সমাজ বা শঙ্কিত ভবনাগুলো পরোক্ষরূপে প্রকাশিত। তরল ও সারল্যময়। প্রকৃতিভাবনায় তিনি সার্বভৌম ও আস্তিক, পুণ্যবান। এটিই মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের বৈশিষ্ট্য। তবে শেষ পর্বের কবিতাসমূহ অনুজ্জ্বল।
কবি ও কবিতার সংগঠক, কবিতায় আধুনিক রীতির নিরীক্ষক, বৈশ্বিক কাব্যান্দোলনের যাত্রার অগ্রপথিক হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩)। কবিতায় আত্মনিবেদিত, সার্থক কবিপ্রাণ। এ কর্মযোগীর কাব্য আরাধনা বিভাগোত্তর পূর্ব-বাংলায়। বিমুখ প্রান্তর (১৯৬৩) তাঁর অনবদ্য কাব্যগ্রন্থ। এখানে স্বদেশ-স্বাজাত্যবোধ মাতৃমূর্তির চেতনায় বিচ্ছুরিত। তাছাড়া ব্যক্তি ও সমাজমুক্তির প্রসঙ্গ, উত্তরিত জীবনচেতনা, ‘বৃত্তের সংসার’ থেকে মানুষের মুক্তি কাব্যটিতে অনুপম শিল্পমাত্রা পেয়েছে :
আহা মেলাই না বুক সাদা ও সহজ বুকে কতোদিন
অবাধ স্বভাবে;
কাজের দাঁতের ভীড়ে আমি যেন সময়ের খাদ্যকণা এক।
‘আমি’-সত্তার স্বরূপটি মানস-প্রতীকে পর্যবসিত। সেখানে বহুস্তরীভূত চেতনা । কবির বহিরাশ্রয় সংশ্লেষণ পদ্ধতিতে যুক্ত অভিজ্ঞতা তার আমিকে দ্বিতীয় সত্তায় আমরা করে তোলে। বাইরের অভিজ্ঞতাটুকু মননজাত। আর্ত শব্দাবলী (১৯৬৮), অন্তিম শরের মতো (১৯৬৮), যখন উদ্যত সঙ্গীন (১৯৭২), বজ্রে চেরা আঁধার আমার (১৯৭৬), শোকার্ত তরবারী (১৯৮২), আমার ভেতরের বাঘ (১৯৮৩), ভবিতব্যের বাণিজ্য তরী (১৯৮৩) কাব্যগ্রন্থের এ পরিক্রমায় শব্দের আর্তরূপ, চিত্রলতা, উপমানচিত্ররঞ্জিত। কার্যত, বিষ্ণু দে-উত্তর কর্মপ্রণালী হাসান তার কালের অভিজ্ঞতায় সম্পৃক্ত করে ফেলেন। এটি সজ্ঞান বা নির্জ্ঞান লোকের ঝোঁক, সেটি কায়েম হয়, জ্ঞান ও চিন্তাতাপিত উষ্ণতায়। শামসুর রাহমানের দীর্ঘায়ত ভূমিকা সম্বলিত হাসান হাফিজুর রহমানের অপ্রকাশিত কবিতা বের হয় ১৯৮৬ তে। মূল্যবোধের পরিচর্যায় হাসান মূলত বাঙালি মধ্যবিত্ত মননকে নির্মাণ করেছেন তাঁর কবিতায়। এবং সে বীক্ষণেই শব্দভাষ্যে কিংবা চিত্রকল্প-উপমায় যুক্ত করেছেন আধুনিক মাত্রা। এক্ষেত্রে পাশ্চাত্য কবি টি. এস. এলিয়ট অনিবার্যভাবেই তাঁর কবিবুদ্ধির জায়গাটি দখল করে নেন, অনিবার্য আদর্শের তাগিদে।
বাংলাদেশের কাব্যাঙ্গনে প্রখর প্রভাবিত, ভাটিবাংলার লোকায়ত প্রাণস্পন্দনের কবি আল মাহমুদ (জ. ১৯৩৬)। ‘তিতাস-ব্রহ্মপুত্রপারের জনজীবনকে উপলক্ষ করে সম্মোহনী লোকভাষা’ স্থিতি পায়। তাঁর কবিতার বিষয় : লোকজ জীবনানুষঙ্গ, গ্রামীণ সংস্কার-মূল্যবোধ, মুসলিম ঐতিহ্য-পুরাণ। লোক লোকান্তর (১৩৭০)-এর কবিতাগুলো লেখা হয় ১৩৬১ থেকে ১৩৭০ সালের মধ্যে। কালের কলস (১৩৭৩) ১৩৭০ থেকে ১৩৭৩ সালে। এ দুটি কাব্যের জন্য কবি বাংলা একাডেমী পুরস্কার পান ১৯৬৮ সালে। এরপরে মুক্তিযুদ্ধ, এবং বাংলাদেশের জন্ম। স্বাধীনতা-উত্তর পর্বে রচিত সোনালী কাবিন (১৯৭৩), যেটি ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত রচিত হয়েছিল। সোনালী কাবিন তাঁর সনেটগুচ্ছ। আল মাহমুদের এ তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ কাব্য। সৃষ্টির গোড়া থেকে কবির দিব্যচেতনার শুলুকসন্ধানের প্রচেষ্টায়তার এগুনোর পথ, অনুকরণের পর্যায়, পাঠকনন্দিত হওয়ার ক্ষেত্র পরীক্ষণীয় ব্যাপার।
আল মাহমুদ একটা দিব্যচেতনা নিয়ে ‘নদী’, ‘মেঘ’, ‘নারী’ রচনা করেন। নিয়ে আসেন তাঁর বন্দনার জগতে। একইরূপে ‘ঝড়’, ‘অরণ্য’, ‘বৃষ্টি’, ‘রাত্রি’, ‘নৌকো’, ‘রক্ত’তে আরোপ করেন যৌনতা; তখন জীবনজয়ী রূপটি হয় চিহ্নিত, পরিবেশনায় আসে ভিন্নতা। কবিতা যাবতীয় বিষয়কে স্পর্শ করে। কবিস্বীকৃতিতে থাকে ‘কবিতা লেখা হতে পারে একটি কেবল,/ যেন রমণে কম্পিতা কোনো কুমারীর নিম্ননাভিমূল’। নিত্যদিনের সময়সূত্রকে অর্পণ করেন অনিবার্য ও স্বাতন্ত্র্যের প্ররোচনায়। এক্ষেত্রে কিছু আত্মমগ্নতা বা আত্মলীন অনুভবও স্মরণীয়তা পেয়ে যায়। “তিতাস” তাঁর নিজের নদী, কিন্তু স্বমতপ্রচারে নয়, রসসৃষ্টির অদ্বিতীয় উপায়ে :
এ আমার শৈশবের নদী এই জলের প্রহার
সারাদিন তীর ভাঙে, পাক খায়, ঘোলা স্রোত টানে
যৌবনের প্রতীকের মতো অসংখ্য নৌকার পালে
গতির প্রবাহ হানে।
নদী আর নারীর ব্যাখ্যায়নে অভিন্ন এ আখ্যান। আর সেখানে ‘শবরী তিতাস’, ‘যৌবনের দেশ’ কী তাৎপর্যে মহিমান্বিত। ঐ ‘pastoral exploration’। শুধু ‘নদী’ নয় ‘বৃক্ষ’, ‘পাখি’ অর্জন করে মরমী রূপ। বোধকরি অবচেতন স্তরটি ক্রমশ তাঁকে পয়ারবৃত্তে বেধে ফেলে। টোটেমরূপে এরূপটি তৈরি হলেও, প্রাচীনত্বের পটভূমিটির স্পর্শ ও আশ্রয়, লৌকিক মরীচিকামোহ, পাঠ্যরূপে অঙ্কিত হয়। মিথরঞ্জিত তুলনা অনেকান্ত, যেন রূপাতীত সঙ্গতি, তবে বাস্তবপন্থী।
আল মাহমুদ কালের কলস কাব্যে ‘কলস’কে প্রত্নপ্রতিমায়, পুরাণরূপে প্রতিষ্ঠা দেন, পুরাবৃত্তটিতে আলো-অন্ধকার, জন্ম-মৃত্যুর পরিচর্যায় বিরাট ভূমিপুত্ররূপে যেন জেগে ওঠে। এখানে কবির ইঙ্গিতটি এতই গভীর এবং নৃ-সংশ্লিষ্ট – সেখানে শুধু জাগরণ নয়, সন্দেহ-বিশ্বাস-সংস্কার এক বীক্ষা লাভ করে। সেখানে ঐতিহ্যিক প্রবাহ, অভিজ্ঞতায় লালিত হলেও সার্বজনীন মুরতির স্বতঃপ্রবৃত্ত আকাক্সক্ষাটি কায়েমে আনে। উপমা, প্রতীক, রূপক প্রত্যেকটি সম্ভ্রমের নিখুঁত নিঃশ্বাসকে ধারণ করে :
এই দলকলসের ঝোপে আমার কাফন পরে আমি কতকাল
কাত হয়ে শুয়ে থেকে দেখে যাবো সোনার কলস আর বৃষের বিবাদ?
আল মাহমুদ সোনালী কাবিনে অগ্রসর, আবেগ ঘনীভূত, চেতনায় স্বচ্ছ ও নিরঙ্কুশ। সদ্য স্বাধীন দেশে তাঁর কাব্যবিষয় ঐ আবহাওয়া-জলবায়ু পরিক্রমণে। সেখানেও সনেটে ফিরে আসে শৌর্য-বীর্যগাথা, পুরনো ইতিহাস, আবহমান আবেগসংখ্যার হিসেব। মৃত্তিকা-নারী-ভ্রুণাঙ্কুর, আর কুয়াশা-আলো-অন্ধকার, স্নেহ-মায়া-প্রেম-ভালোবাসা এ কাব্যে তীক্ষèতর। তবে ‘সোনালী’ যৌবন কামার্ত বা জৈবিকতার আধার হয়ে আসে। লোকসংস্কৃতি-লোকসংস্কার, শারীরি-সংসর্গ হয়ে ওঠে অভিন্ন দ্যোতনার সারথি। আল মাহমুদ সুন্দর নামে, চমৎকার কবিভাষ্যে অন্তর্ভৌম ও যৌক্তিক রূপটি সনেটের সীমায় বেধে ফেলেন। যেমন :
হাত বেয়ে উঠে এসো হে পানোখী, পাটিতে আমার
এবার গোটাও ফণা কালো লেখা লিখো না হৃদয়ে;
‘পানোখী’ সুন্দর শব্দপ্রতিমা। লোকায়ত আমেজে এ অসাম্প্রদায়িক লৌকিক রূপটি, সার্বজনীনরূপে অভিষিক্ত। ‘নীল’, ‘দংশন’, ‘সাপ’ এরূপে জৈবিক প্রেরণার পাশাপাশি আমাদের লৌকিক অস্তিত্বকেও তুলে ধরা হয়েছে। ‘কার্পাশের ফল’, ‘গুঞ্জার মালা’, আশৈশবের স্মৃতি, পরিচর্যা কখনও বৈশ্বিক হয়ে ধরা পড়ে। টোটেম-ট্যাবু বিস্তৃত হয় অস্তিত্বকে আকর করে। সামষ্টিক সুরটি বুঝি তিনিই শুনতে পান, আর এ ধারায় চর্যাযুগ, মুকুন্দরামের কাল সবই যেন পরীক্ষিত। কবি সনেটে এ প্রত্যয়সমূহ কী অমায়িক করে তোলেনসেটা ফর্ম-পরীক্ষা করলে কিংবা ভাষার বুননিটি বিবেচনায় আনলে ধরা পড়ে। কাব্যের একটি পংক্তি নিলে গোটা সমাজ-নৃতত্বের অতীত বেরিয়ে পড়ে। পুনরায় বর্তমান যেন নবায়ন হয়, বংশপারম্পরিক বিপদ-বরাভয় কিংবা সংগ্রাম আর কৃষি-অর্থনীতিকে নিয়ে তা কাব্যটিকে নতুনত্ববিলাসী করে তোলে। কবির সনেটে এটি তুমুলমাত্রায় উত্তীর্ণ। সোনালী কাবিনে এ ছাড়াও পয়ারে বা মুক্তক প্রবর্তনার অনেককিছু কায়েম হয়েছে। কিন্তু অনেক কবিতায় জৈবিকচেতনার পুনরাবৃত্তি আছে, সেটি ডিটেলে গেলে আর ঐ পর্যায়ে থাকে না। শরীর-মন-দেহ সবকিছু মিলে অর্কেষ্ট্রা রচিত হতে থাকে। কিন্তু লাল-সবুজ-নীল এমত বর্ণিল প্রভাটি “চোখ”, “উল্টানো চোখ”, “চোখ যখন অতীতাশ্রয়ী হয়”, “আমার চোখের তলদেশে” এগুলোতে সুস্পষ্টভাবে ‘চোখ’ মিথে পৌঁছাতে হবে এবং যথাযথ কার্যকারণটি জানতে হবে। তখনই তা আধুনিক দৃষ্টিচেতনায় ‘টোটেম’তুল্য হয়ে উঠতে পারে। আমাদের চলমান জীবনপথের প্রতিবেশটি তখন অজ্ঞাতবাসে থাকে না। কবির সবচেয়ে আকর্ষণীয়, কবিতাধারায় অনুকরণ বা আনুকূল্যে নয় এমন উপাদানে যেমন তিনি পেয়েছেন উপকরণ, তেমনি আঙ্গিকেও নিয়েছেন স্বকীয়তায় মানিয়ে। বিশেষত,অবচেতন স্তরটিতে কবি পৌঁছেছেন আধুনিক প্রকৃত ও বাস্তবানুগ সিদ্ধিতে। আল মাহমুদের কবিতায় এ রীতিটি বেশিদিন বহাল থাকেনি। সেটাও কি তবে এক বাস্তবতার চাপ। এমন বড় কবিরূপে যিনি শীঘ্রই স্বতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান – একটি একক কবিভাষার নির্মাণগুণে; সেখানে তিনি কীভাবে ‘রমণীর প্রেম আর লাবণীসৌরভ’কে দ্বিতীয় করে তুললেন? অদ্বিতীয়, অখন্ডে তো তাঁকে চাই-ই সবাই। তবে ‘খিলজীদের শাদা ঘোড়ার সোয়ারি’র স্বপ্নটিকেও আমরা যেমন অস্বীকার করতে চাই না তেমনি পূর্বেরটিকেও না। আঙ্গিককে ভেঙ্গে ছত্রখান করে কী লাভ! লোকায়ত পথিকৃত, যে স্বপ্নজাগর প্রহরের কবি, তাকে আরও¯বানাতে বলতে চাই ‘কলসের সোনালী’ প্রতিকৃতি। বহুভাবে ও রকমে। এরূপ ধারাবাহিকতায় তাঁর অন্য কাব্য মায়াবী পর্দা দুলে ওঠে (১৯৭৬), অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না (১৯৮০), বখতিয়ারের ঘোড়া (১৯৮৫), আরব্য রজনীর রাজহাঁস (১৯৮৭), প্রহরান্তের পাশফেরা (১৯৮৮), এক চক্ষু হরিণ (১৯৮৯), মিথ্যাবাদী রাখাল (১৯৯৩), আমি, দূরগামী (১৯৯৪), হৃদয়পুর (১৯৯৫), দোয়েল ও দয়িতা (১৯৯৭), দ্বিতীয় ভাঙন (২০০০), নদীর ভিতরে নদী (২০০১), প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা (২০০৬), তোমার রক্তে তোমার গন্ধে (২০১০), সনেট সমগ্র (২০১৩) প্রভৃতি।
আবদুল মান্নান সৈয়দ করতলে মহাদেশ-এ লিখেছেন : ‘প্রায় তিন দশক জুড়ে বিহার করলেও বেলালকে সম্ভবত ষাটের দশকের কবি বলেই চিহ্নিত করতে হয় শেষ পর্যন্ত। কবি হিসেবে এই দশকেই তিনি পূর্ণ রূপে ও তাপে ফুটে উঠেছেন। … কলকাতায় ষাটের কবিদেরই একান্ত সহবাসী বেলাল, সতীর্থ-পরিবেশক প্রভাব যে জীবনে ও সাহিত্যে কী বিপুল ভূমিকা উদযাপন করে, তা আরও একবার প্রমাণিত হয় বেলাল চৌধুরী (জ. ১৯৩৮)র কবিতায়। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, শমসের আনোয়ার, দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়, তুষার রায়- এঁদের কবিতার সঙ্গে বেলালের কবিতার একটি সামান্য সাযুজ্য ও সাধর্ম আছে- তা হচ্ছে গদ্যকেই কবিতা করে তোলা, ব্যক্তিগত বহুবর্ণে স্ফুরণ ও বিস্ফোরণ ঘটানো, যে কোনো তুচ্ছ দিনানুদৈনিক জিনিসকে কবিতায় উত্তীর্ণ করা।’ তাঁর প্রথম কবিতার বই নিষাদ প্রদেশে (১৯৬৪)। নগরজটিলতার এক ক্লান্তপ্রাণ কবি। আত্মমগ্নতায় নিপতিত। প্রতীকী তাৎপর্যে ব্যঞ্জিত কবির কাব্যভাষা। বেলাল চৌধুরীর আবেগের মাত্রায় যুক্ত থাকে রাজনীতি। সমাজের উন্মূল মানুষ, গ্রামগঞ্জ-পথঘাট শাশ্বত বাংলার প্রকৃতি গভীর স্পর্শতায় ছন্দে যুক্ত হয়। কবির স্বতঃস্ফূর্ত অন্তর্গত অনুভূতিতে থাকে স্বস্তি ও গৌরবের সনিষ্ট মিথিক উচ্চারণ :
একটি নিখাদ দুঃখের নির্মাণে
কেটে যেতে পারে কয়েক কোটি আলোকবর্ষ,
দুঃখ বিষম ভারি বোঝা, সিন্দাবাদের বুড়োর অধিক।
কবির দিব্যচেতনায় সংযুক্তি, প্রধানত পরোক্ষ প্রতিক্রিয়াবাদী রাজনীতি। ফলে শরণার্থী, শোষিত মানুষ, মৃত্যু বিশেষ প্রত্যয় পায় কবিতায়। স্বচ্ছতোয়া স্বতঃস্ফূর্ত আঙ্গিকে উদ্গত যাবতীয় জীবন্ত সব চিত্রপ্রতীক। কবিতার রাজসিক জয়যাত্রায় তিনি এখনও সজীব প্রাণপুরুষ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ বেলাল চৌধুরীর কবিতা (১৯৭৩), আত্মপ্রতিকৃতি, স্থির জীবন ও নিসর্গ (১৯৭৫), স্বপ্নবন্দী (১৯৭৯), জল বিষুবের পূর্ণিমা (১৯৮৫), প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি (১৯৮৬), সেলাই করা ছায়া (১৯৮০), কবিতার কমলবনে, যাবজ্জীবন সশ্রম উল্লাসে (১৯৯৭), বত্রিশ নম্বর (১৯৯৭), স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল (২০০১), বিদায়ী চুমুক (২০১০) প্রভৃতি।
বিভাগোত্তর পূর্ব-বাংলায় সিকান্দার আবু জাফর (১৯১৯-১৯৭৫) বিরূপ স্বদেশের প্রসন্ন চিত্ররূপ অঙ্কন করেছেন তাঁর কবিতায়। আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক পরিকাঠামোতে সর্বগামী ও অকুতোভয়, অদম্য সৈনিক হিসেবে তাঁর শিল্পচেতনা উদ্ভাসিত। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী; বিখ্যাত হয়েছেন ‘সমকাল’ (১৩৬৪) সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদক ও সংগঠক হিসেবে। বৈরী বৃষ্টিতে (১৯৬৫), তিমিরান্তিক (১৯৬৫), প্রসন্ন প্রহর (১৯৬৫), কবিতা ১৩৭২ (১৯৬৮), বৃশ্চিক লগ্ন (১৯৭১), বাংলা ছাড়ো (১৯৭১), কবিতা ১৩৭৪ (১৯৭২) সিকান্দার আবু জাফরের কাব্যগ্রন্থ। মালবকৌশিক (১৯৬৬) তাঁর গানের সংকলন। স্বভাবে বহির্মুখি, দেশাত্মভাবনায় দায়বদ্ধ, মুহূর্তের স্বাক্ষর লিখনের তৎপরতা তাঁর কবিতাকে সমকালীন কাতারে নেমে এনেছে। সিকান্দার আবু জাফরের কাব্যগুণ প্রশংসিত, কালিক বাস্তবতায় – যেখানে জনমানুষের সাফল্য ও গৌরবই প্রধান হয়ে ওঠে। স্বৈরাচারের অপশাসন থেকে মুক্তি, বৈষম্যের অমানিশার অবসান সিকান্দার আবু জাফরের শিল্পভাষ্যকে পল এলুয়ার বা কাজী নজরুল ইসলামের সমগোত্রীয় করে তোলে :
চিত্তহীনের যে অস্থি আজ
হয়েছে দাবার ঘুঁটি
নামবে সে কাল সংহার হয়ে
বজ্র বাঁধন টুটি।
আল মাহমুদ বলেছেন : ‘ফজল শাহাবুদ্দীন এক নির্বিরোধ গভীর প্রেমের কবি।… তার কবিতায় আছে অন্য এক গূঢ় রহস্য’। ক্ষয়িষ্ণু সমাজ ও অবক্ষয় চিত্র নির্মাণও এ কবির অন্যতম অন্বিষ্ট। অন্ধকার অতিক্রমী আশাবাদ আছে তাঁর কবিতায়। বিংশ শতাব্দীর ষাটের উত্তাল নাগরিক সময়, সুতীব্র বেদনায় অঙ্কিত হয় ফজল শাহাবুদ্দীনের (১৯৩৬-২০১৪) কবিতায়। ‘ভিক্ষারত কুষ্ঠরোগী’, ‘বেশ্যা পল্লী’, ‘নগ্নতার বৈদেহী চিৎকার’ বিকৃত এমন প্রসঙ্গ ‘অন্ধকারে’র শব্দবন্ধে ইমেজে রূপান্তরিত হয়। এক পর্যায়ে এ কবি হয়ে পড়েন অন্তর্মুখিন (রহঃৎড়াবৎঃ), চেতনালুপ্ত, বিনয়ী ও পলাতক। বিষাদাক্রান্ত হয়ে পড়েন। ফজল শাহাবুদ্দীন ‘পুরানো দিনের সন্ধ্যা’, ‘বাংলা আমার স্বপ্ন আমার’-এর মতো অনেক কালজয়ী কবিতা লিখে বাংলাদেশের কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ কবি হয়ে উঠেছেন। উদ্ধৃতি :
আমিই ঘনিষ্ঠ ক্রন্দনধ্বনি
আসলে আমিই সব আমিই জীবন মৃত্যু আলো অন্ধকার
মহাজীবন প্রকৃতি মহাপ্রকৃতি এবং বিশ্বলোক
তৃষ্ণার অগ্নিতে একা (১৯৬৫), আকাক্সিক্ষত অসুন্দর (১৯৬৯), আততায়ী সূর্যাস্ত (১৯৭৫), অন্তরীক্ষে অরণ্য (১৯৮০), সান্নিধ্যের আর্তনাদ (১৯৮৩), আলোহীন অন্ধকারহীন (১৯৮৪), সনেটগুচ্ছ, অবিনশ্বর দরোজায়, ছিন্নভিন্ন কয়েকজন, আমার নির্বাচিত কবিতা, হে নীল সমুদ্র হে বৃক্ষ সবুজ, লংফেলোর নির্বাচিত কবিতা (১৯৬৭) ইত্যাদি।
আবুবকর সিদ্দিকের (জ. ১৯৩৪) প্রথম কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে; ধবল দুধের স্বরগ্রাম। কবির ঊনসত্তর-একাত্তর Ñ কবির প্রেয়সীসত্তা পরিপূর্ণ অভিন্ন, দ্বিতীয়সত্তায় মা’র অভিষেক এবং তাও ক্রমশ রূপান্তরিত প্রথমসত্তায়। এমন উন্মাদনার আঁচড় হে লোকসভ্যতা (১৯৮৪), কালো কালো মেহনতী পাখি (১৯৯৫) কিংবা শ্যামল যাযাবরে (১৯৯৮)। ঘৃণার, প্রতিবাদের-প্রত্যাঘাতের-প্রতিরোধের কবিভাষা নির্মিত সময়যন্ত্রণা, নৈঃশব্দ্য অন্ধকার ও স্বপ্নভঙ্গজনিত অনিঃশেষ কষ্ট থেকে।
মাটিগন্ধি মানুষের প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য ওমর আলী (১৯৩৯-২০১৫)র। স্মরণযোগ্য আলেখ্য নির্মাতা। লোকায়ত পরিকাঠামোকে নতুন নন্দনের সৃজনকর্তা। তাঁর এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি (১৯৬০) রোম্যান্টিক প্রণয়মাখা আবেগস্পন্দিত কাব্য। কাব্যটি ১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ কালপরিসরে রচিত। কবির প্রথম কবিতা ১৯৫৭ সালে ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাধারণ বিষয়বস্তু তথা গ্রামীণ জীবননির্ভর উপাদানে এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি নির্মিত হলেও এটি সর্বোতভাবে আধুনিক। জসীম উদ্দীন (১৯০৩-৭৬) ও বন্দে আলী মিয়ার (১৯০৬-৭৯) কাব্যধারায় ওমর আলী কবিতার ইমেজে যুক্ত করেছেন গ্রামীণ-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ রূপলাবণ্য। এক ‘শ্যামাঙ্গী নারী’র প্রতিকৃতি আটপৌরে এবং চরমরূপে উদ্ভাসন ঘটিয়েছেন তাঁর কাব্যে। এই একটি কাব্যগ্রন্থই তাঁকে দিয়েছে প্রকৃত কবির মর্যাদা। কাব্যটিতে মোট কবিতার সংখ্যা পঞ্চাশটি। কবিতাগুলোর মৌল কেন্দ্র ‘নারী’। একত্রিশটি কবিতায় আছে প্রেম। ‘হাসিনা’, ‘মিমোসা’, ‘নীলুফার’, জুনো (গ্রীক পুরাণে জুপিটারের স্ত্রী), শিরীণ ফরহাদ, সেলিম-আনারকলি – এসব নারী কবিতার রোম্যান্টিক প্রেম উদ্দীপনায় দেশ-কালের সীমা মানেনি। কবিরচিত ‘তোমাকে’, ‘যৌবনের প্রার্থনা এই’, ‘রমনা’, ‘একদিন তুমি’, ‘একদিন একটি লোক’, ‘পাথর’, ‘তুমি সুন্দরী’, ‘বৃষ্টির বিপদে এক চড়–ই’, ‘পটভূমিকা’, ‘সুসজ্জিতা’ কবিতায় আধুনিক কাব্যরুচির প্রতিফলন রয়েছে। ত্রিশোত্তর আধুনিক বৈশিষ্ট্যটি এতে চমৎকাররূপে উদ্ভাসিত:
সযতেœ ছায়ার নীচে ঢাকা থাকে মেয়েদের স্তন
এবং দেহের স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের প্রচুর সম্ভার।
দেখেছো তোমার নাম এইবার পড়ে গেল মনে,
যখন ঠোঁটের পরে ঠোঁট রেখে বললে চুম্বনে।
এ নিষ্কাম প্রেম নয়, ইন্দ্রিয়ঘন প্রেম। আদিরসনির্ভর রিরংসাবৃত্তিজাত (বৎড়ঃরপ ঃবহফবহপু)। পঞ্চাশের শেষে এ বিষয়-আরাধ্য সমাজ-অনুশাসন প্ররোচিত নয়, রক্ষণশীলতার বিপরীতে এক ভিন্ন ও আধুনিক কাব্যরুচি, সন্দেহ নেই। এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি কবিতায় মৃত্যুচেতনার বিষয়টিও উপস্থিত। এছাড়া মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কজাত অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির বহুমুখী রূপায়ণ, নরনারীর মানসিক লীলা প্রত্যহিক প্রতিকৃতিতে বর্ণিত হয়েছে। তার প্রেম পিউরিটান নয়, মৃন্ময়ী বাস্তব ও কামবাসনার লালিত্যে প্রদীপ্তময়। তীব্র সংবেদনশীলতায় জীবন-সংস্কৃতির যাবতীয় রূপ বাংলাদেশের কবিতায় দৃঢ়ভিত্তি পায়। এদেশে শ্যামল রঙ রমনীর সুনাম শুনেছি (১৯৬৭), আত্মার দিকে (১৯৬৮), নদী (১৯৬৯), নিঃশব্দ বাড়ি (১৯৭৩), অরণ্যে একটি লোক (১৯৭৪), বিলেতে অনিচ্ছুক একজন (১৯৭৫), নরকে বা স্বর্গে (১৯৭৫) প্রভৃতি তাঁর কাব্যগ্রন্থ। ‘লেখার সংখ্যা সামান্য হলেও কবিতায় বাঙ্ময় জীবনদর্শন অসামান্য এবং সম্পূর্ণ, দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট ও নিঃসংশয়, পর্যবেক্ষণ তীক্ষ্ম ও সূক্ষ্ম, প্রকাশ অনবদ্য ও মেদহীন। তাঁর কবিতার অন্তর্গত যাবতীয় বোধ দেশকালের সীমানাকে ডিঙিয়ে আধুনিকতার নির্মাল্য হয়ে উঠেছে।’
পঞ্চাশ-উত্তর বাংলাদেশের কবিতায় আধুনিক মননের ছাপ ও নাগরিক জীবনবোধের সংযোগ ঘটিয়ে কবিতার উৎকর্ষে অর্জিতÑ শহীদ কাদরী (১৯৪২-২০১৬)। উত্তরাধিকার (১৯৬৭), তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা (১৯৭৪), কোথাও কোন ক্রন্দন নেই (১৯৭৮) তিনটি কাব্যগ্রন্থে তিনি প্রকাশ করেছেন ষাট-উত্তর আত্মমুখি জীবনচেতনার গরল ও গ্লানি, যেখান থেকে মুক্তির অভিমুখে নির্ণয় করে সুন্দর-সুশ্রী নব-আধুনিক প্রতিজ্ঞা। কবি – শব্দে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, বুদ্ধি ও মস্তিষ্কই সে শব্দের নির্মাল্য, এলিয়টিয় ‘অবজেকটিভ কোরিলেটিভ’ প্রবণতায় যুক্ত হয় নির্বাচিত শব্দ-সারাৎসার, বিশশতকী ইমেজিস্ট ধারায় সেই শব্দে বিদ্রƒপ-ব্যঙ্গ-পরিহাস বয়ে আনে নাগরিক সংকোচঘুণ-ম্লান মূল্যবোধ আর ‘মুমূর্ষু স্তনে’র অসুস্থ স্পন্দন। এসব শব্দপ্রতিমায় শহীদ কাদরীই বাংলাদেশের কবিতার প্রকৃত নাগরিক আইডল। যা পরবর্তীতে অন্যদের হাতে নবায়িত হয়েছে, ক্রম-বিবর্তন পেয়েছে – কিন্তু উৎসশক্তির কেন্দ্রটিতে তিনিই প্রধান ও শ্রেষ্ঠ। তিনটি কাব্যে এমন বোধের নির্ঝর-নির্মাণ ছুঁয়ে গেছে কবিতার মর্মদাহী অনেক প্রান্তমুখ। কবির অবক্ষয় ও কৃত্রিম-ক্লান্ত রসশ্লেষ ওই সময়ে আঁতুর র্যাবো বা শার্ল বোদলেয়ারের অন্ধকার আধেয় প্রভাবাক্রান্ত হলেও জড়িয়ে নিয়েছিল সদ্য-মধ্যবিত্ত বুর্জোয়ার অনিকেত প্রবৃত্তিতে – ফ্যাকাশে পতিতার দেহরূপ, যেখানে মাতৃজরায়ুর অন্ধকারও হয়ে ওঠে অনিরাপদ – তাই কুঁকড়ে যায় চৈতন্য ও দৃষ্টিপাতের দীপহীনতা :
জন্মেই কুকড়ে গেছি মাতৃজরায়ণ থেকে নেমে –
সোনালী পিচ্ছিল পেট আমাকে উগরে দিল যেন
দীপহীন ল্যাম্পোস্টের নিচে, সন্ত্রস্ত শহরে
নিমজ্জিত সবকিছু, রক্তচক্ষু সেই থাক আউট আঁধারে।
মাত্র পঁচিশ বছর বয়সেই বেরুনো প্রথম কাব্যের নামকবিতায় এমন ভিন্নকথনের স্বর, চিরসাক্ষ্য নিয়ে দাঁড়ায়, সামনের জন্য। পরের কাব্যধারায় তা শমিত, পরিপক্ব এবং গতিময় প্রাণবন্ত। কবিতাধারায় চিহ্নিত এই নতুন মুখটি সাহসী; মেধাবী তো নিশ্চয়ই:
যুদ্ধ, হত্যা, মারী, মড়ক, টুথব্রাশ, মাজন – এরা সব
জীবনের জটিল কল্লোল হয়ে ওঠে
স্বতন্ত্র ভাষার শহীদ কাদরী পরবর্তী কাব্যধারার অনেককেই প্রভাবের শক্তি যোগান। তাঁর শব্দ যতোটা আবেগের তার চেয়ে বেশি বৃদ্ধি¯œাত। বৃদ্ধিটুকু অবচেতন-চেতন-অর্ধচেতন থেকে উৎসারিত। ‘প্রিয়তমা’ ও ‘স্বদেশ’ স্বপ্নজাত মিথপ্রবণ বলয়ে প্রতিভাসিত। এটি উত্তর-উপনিবেশী (ঢ়ড়ংঃ-পড়ষড়হরধষ) চিন্তা¯্রােতে পরিমাপ্য। সমাজসচেতন এ কবি, অপরতার বৃত্তে আঘাত করেছেন আত্মবিনষ্টির কারণ অনুসন্ধানে, সেখানে পুঁজির দম্ভ ও উপনিবেশ-আধিপত্য এক ভেল্কী, তাই তাঁর শব্দ হয়ে উঠেছে কঠোর আক্রান্তপ্রবণ – ‘মাংসশিকারী একদল হায়নার দাঁতের মতো ধারালো বাতাসে আক্রান্ত আমি’। এই কাব্যভাষ্যে শহীদ কাদরী অতুলনীয়। এবং কবিতাধারার নতুন অভিমুখ, বলাইবাহুল্য।
ষাটের সুররিয়ালিস্ট কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০)। বৈদ্যুতিক দ্যুতিময় প্রতীকে, কিন্নরকণ্ঠী শিল্পী। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে প্রথম পরাবাস্তব ফর্মে; আত্মমগ্ন অবচেতন বৈভবে যতিচিহ্নহীন কাব্যভাষা নির্মাণ; জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ (১৯৬৭) থেকে ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ (১৯৭৪) উত্তরিত ও প্রবর্তিত। জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছের গদ্যকবিতা (ঢ়ৎড়ংব ঢ়ড়বস) কবির ষাটের তীব্র সাহসী উচ্চারণ; পরবর্তী আত্মমগ্নতায় তা কয়েকধাপ এগিয়ে জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা (১৯৬৯) হয়ে সামনে এগুনো। আবদুল মান্নান সৈয়দ কবিঅভিজ্ঞতায় প্রচলিত নন্দনতাত্ত্বিক বিন্যাসকে ভেঙেছেন অভিনব উপমাপ্রতিমায়। ষাটের শেষদিকে কবিতায় নাট্যমৌহুর্তিক ক্ষণকে উপভোগের পর অমিত সাহস আর বাকভঙ্গিকে ভর করে ‘ঘুমের ভেতর নিদ্রাহীন’ অন্তঃপ্রবাহে ‘স্বজ্ঞা ও অবচেতনের, চৈতন্য ও নিহিতের, আকস্মিক ও যুক্তিহীনতার, আবেগের ও আন্তর প্রস্তুতির, কল্পনা ও ঝড়ে-ওড়া শিকলের সমবায়ী ফলাফল’কে মজ্জারসে বিরচন করেন। সেখানে তিনি এক রূপকপ্রতীকের সুনিশ্চয় স্বপ্নদ্রষ্টা :
কটির তলে নতুন-জাগা পাতা
কৃতজ্ঞতার নকশি-আঁকা
পাঠিয়েছিলে কবে,
আজ সে কাঁদে স্মৃতির হাতে
অবচেতন পরাবাস্তব কৌশল থেকে এক পর্যায়ে সচেতন বুদ্ধির প্রয়োগে কবিতায় চাক্ষুষ রোম্যান্টিক জগতে ঢুকে পড়েন। কবিতার ফর্মে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে নমস্য কবিদের শব্দার্থ স্বরূপ, ছন্দ আর নিজের নিরীক্ষার ভেতরে নিজেকে সেঁধিয়ে নেন আবদুল মান্নান সৈয়দ। এ পর্যায়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ পাশ্চাত্য আধুনিকতার বিষয়গুলো ধারণ করে বাংলা কবিতাকে বিশিষ্ট করে তোলেন। তবে তিরিশি আধুনিকতা নয় বরং আত্মবোধের সচেতনতায় এক ধরনের অনিবার্য-মনস্কতারই মুখোমুখি দাঁড়ান কবি। এক্ষেত্রে কবির মনস্তত্ত্বে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী চিন্তাস্রোত, নবগঠিত নগরচেতনা, নস্ট্যালজিয়ার কাতরোক্তি ইত্যাদি অন্তর্মুখি বাতাবরণ তৈরি করে। যেখানে মান্নান রীতিমতো শরণ নেন পরাবাস্তববাদী প্রকরণে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বপ্নকল্পনার মানুষ মোটেই তাঁর কাব্যে তিরোহিত নয়। উত্তরণের পরিক্রমাতেও কবি সামগ্রিক হওয়ার পথেই এগুতে থাকেন। ফলে তাঁর শৈলিও একরকম থাকেনি। তাঁর মাতাল মানচিত্র (১৯৭০) বিভিন্ন ভাষার পনের জন কবির অনুবাদ। কবিতা কোম্পানী প্রাইভেট লিমিটেড (১৯৮২), পরাবাস্তব কবিতা (১৯৮২), পার্কস্ট্রিটে এক রাত্রি (১৯৮৩), মাছ সিরিজ (১৯৮৪), পঞ্চশর (১৯৮৭), শ্রেষ্ঠকবিতা (১৯৮৭), আমার সনেট (১৯৯০), সকল প্রশংসা তাঁর (১৯৯৩), নীরবতা গভীরতা দুই বোন বলে কথা (১৯৯৭) আবদুল মান্নান সৈয়দের কাব্যগ্রন্থ। আমার সনেট তাঁর ব্যতিক্রমী গদ্য সনেট। বিষয়ের বৈচিত্র্য আছে স্বপ্ন আনন্দের বর্ণিল উচ্চারণে।
আজিজুল হক (১৯৩০-২০০১) ব্যক্তিজীবনের সীমায় মহাকালকে অবলোকন করেন। সেখানে যন্ত্রণা-অন্ধকার-মৃত্যু সামগ্রিক দ্যোতনায় প্রকটিত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন রূপকে, কটাক্ষতায়; কবি এসব থেকে মুক্তি চান। তিনি চান বিচ্ছিন্নতার অবসান। প্রথম কাব্য ঝিনুক মুহূর্ত সূর্যকে (১৯৬৯)-র পর বিনষ্টের চিৎকার (১৯৭৬)-এ কবি বেশি সংহত। বোধ ও বুদ্ধির সংশ্লেষ আরও প্রগাঢ়। ঝিনুক-স্বভাবকে সময়ের আবর্তে ক্ষিপ্রগতিতে বহির্মুখি, সর্বাত্মক করে তোলেন। এ পর্যায়ে প্রতিবাদ, ইতিহাসচেতনা, আত্মউজ্জীবন স্পষ্ট সম্ভাবনায় উদ্দীপ্ত। বিনষ্টি তাঁকে কাতর করে কিন্তু তা নিরঙ্কুশ প্রখরতায় প্রজন্মের শুভবোধের প্রত্যয়কে সমর্থন জানায়। ঘুম ও সোনালী ঈগল (১৯৮৯)-এ কবির আশাবাদ ও যন্ত্রণামুক্তি অনেকটা স্থৈর্য দেয়। বাংলাদেশের বিষাদকে যেন ‘সূর্যস্পর্শী’ স্বপ্নে ফেরাতে চান। আজিজুল হক পূর্ব-পাকিস্তানে সামরিক শাসন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরের স্বাধীন বাংলাদেশকে মন্ময় ম্যুরালে, প্রচ্ছন্ন প্রতীকে প্রকাশ করেছেন। অপাপবিদ্ধ সব নন্দিত শোক কবির কাছে যেন দিব্যাবিষ্ট। কবি যন্ত্রণামুক্ত হননি অন্তরঙ্গে, কবিভাষায় তা নির্মিত; কিন্তু শুভবিশ্বাস তাঁর স্বদীক্ষিত।
মোহাম্মদ রফিক (জ. ১৯৪৩) কবিতায় কল্পলোকের বাইরে সত্য ও বাস্তবের বহিঃপ্রকাশ তীব্রতর। প্রচন্ড সংযত ও ব্যঞ্জনাস্পর্শী এ কবিতায় অবগাহন করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর আধুনিক আকর্ষিত ঋজুরেখ রূপটি। ‘বইটির নাম বৈশাখী পূর্ণিমা – বেরিয়েছিল ১৯৭০-এ, ১৯৬২ থেকে ৬৮ সালের মধ্যে লেখা। অর্থাৎ প্রায় গোটা ষাটের দশক জুড়ে।’ উদ্ধৃতি :
আজ রাতে দেখি আমি তন্দ্রায় বিবশ সবে,
পাখিদের কোলাহল বৃক্ষের মর্মর
কি এক বৈদেহী সুরে
বিভাসিত চাঁদ আর তারার প্রণয়ে
কবির কাব্য-নিবেদন বহুদূরব্যাপ্ত চেতনায় কিন্তু অন্তর্গাত্রে বিরাজমান স্বাভাবিক ইচ্ছাকাতর ও দহনদুস্থ প্রেম। এ প্রেম প্রকাশে কবিআশ্রিত প্রকৃতি এক রকমের প্রাণায়িত (ধহঃযৎড়ঢ়ড়সড়ৎঢ়যরপ) সমগ্রতায় উপস্থিত। যেখানে প্রকৃতি ও নারী একীকৃত। কবি-নির্ধারিত প্রকৃতি চেতনায় একদিকে বিধৃত তার স্নিগ্ধ রূপবৈচিত্র্য অন্যদিকে বিনাশ-বৈনাশিকতা। আবার একইরূপে প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিবাদের শোষণ, স্বেচ্ছাচারিতা যেমন আছে তেমনি চিরায়ত স্পন্দ্যমান জীবনও আছে। এমন আদর্শগত উপাদানের সঙ্গে সমান্তরাল সমাজ অভিজ্ঞতা মোহাম্মদ রফিকের কবিতার বিষয় হয়ে ওঠে। কবির প্রত্যক্ষ ও সামূহিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয় পঠনের উৎকীর্ণ মননশক্তি। ফলে আঙ্গিকটি পায় আধুনিক অবমুক্ত মাত্রা।
মোহাম্মদ রফিক লৌকিক আমেজে যুক্ত করেন আধুনিক উপাদান -তখন ‘অশ্বের ক্ষুরধ্বনি’ আর ‘মৃত বাঘের পাঁজর’ এক স্মৃতিরেখায় পৌঁছে দেয় কিন্তু সময়খন্ডের তির্যকধারাটি বহাল থাকে। মোহাম্মদ রফিক পাল্টান, বিবর্তিত হন, তাঁর স্বতন্ত্র পথটি খুঁজে নেন। বিভিন্ন রীতিতে তা পরীক্ষণীয় রূপও অর্জন করে। যেমন আন্তরপাঠমূলক রীতিতে (রহঃবৎঃবীঁধষরঃু) ‘কপিলা’ বা ‘গাওদিয়া’ বাঙময় হয়ে ওঠে। এরকমে দুঃখ-দারিদ্র্য, আনন্দ-উচ্ছ্বাস তাঁর কবিতায় প্রকৃত প্রয়াসে অন্তর্বয়িত হয়। বাংলাদেশের কবিতায় এমনটি সচরাচর মেলে না Ñ আর বহুচর্চিত হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। কপিলা (১৯৮৩) পাঠকপ্রিয় কাব্য। এ প্রসঙ্গে কবি বলেন : ‘একটি ঘোরের মধ্যে তৈরি হয়েছিল কপিলা। ১৯৮৩র ১০ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারি এই পনেরো দিন, আমি জানি না কীভাবে কেটেছে আমার। স্বচ্ছন্দে বলা যায় ভূতে পেয়েছিল আমাকে।’ আশির স্বৈরশাসনের ভেতরে তৈরি হতে থাকে এর কাঠামো। প্রতিরোধী সময়ে ‘কপিলা কাদায় জলে, ঘামেশ্রমে অন্নদা স্বদেশ।’ আরও দীর্ঘ স্পষ্টতা ‘মোছো রক্ত, পইঠার ওপরে কালসিটে, এই/ লড়াই চলবেই।’ এক্কেবারে অভিনব। কবির বিষখালী সন্ধ্যা (২০০৩)ও গুরুত্বপূর্ণ কাব্য। সে কারণে লৌকিক সুরটিও বিভিন্ন রীতিতে পরীক্ষণীয় রূপ অর্জন করে। যেমন আন্তরপাঠমূলক রীতিতে (রহঃবৎঃবীঁধষরঃু) ‘কপিলা’ বা ‘গাওদিয়া’ বাঙময় হয়ে ওঠে। এরকমে দুঃখ-দারিদ্র্য, আনন্দ-উচ্ছ্বাস তাঁর কবিতায় প্রকৃত প্রয়াসে অন্তর্বয়িত হয়। তাঁর কাব্য বৈশাখী পূর্ণিমা (১৯৭০), ধুলোর সংসারে এই মাটি (১৯৭৬), কীর্তিনাশা (১৯৭৯), কপিলা (১৯৮৩), খোলা কবিতা (১৯৮৩), উপকথা (১৯৮৫), গাওদিয়া (১৯৮৭), স্বদেশী নিঃশ্বাস-তুমিময় (১৯৮৮), মেঘে এবং কাদায় (১৯৯১), মোহাম্মদ রফিকের নির্বাচিত কবিতা (১৯৯৩), রূপকথা কিংবদন্তী (১৯৯৮), মৎস্যগন্ধা (১৯৯৯), মাতি কিসকু (২০০০), স্মৃতি-বিস্মৃতির অন্তরালে (২০০২), ভালোবাসার জীবনানন্দ (২০০৩), বিষখালী সন্ধ্যা (২০০৩), কালাপানি (২০০৬), নির্বচিত ১০০ কবিতা (২০০৬), দো-মাটির মুখ (২০১০) প্রভৃতি।
সাম্প্রতিক সময়ে নির্মলেন্দু গুণে(জ. ১৯৪৫)র কবিতায় কামই শিল্প। আছে তার বহুতর বন্দনা। প্রত্যক্ষ ও নিরাবরণ হলেও কবিতা তীক্ষèধী উইটে রূপময় মাত্রা পেয়ে যায়। অবশ্য এক্ষেত্রে কবির ক্যারিজমা – পাঠকের রসগ্রাহী সমর্থনকে সাবলীল রেখেই শিল্পকে স্পর্র্শ করতে পারা। নির্মলেন্দু গুণের কবিতা অমীমাংসিত রমণী (১৯৭৩), বাৎসায়ন (২০০০)র কাম স্থূল নয়, প্লেটোনিক ভাবে পর্যবসিত। আটান্নটি প্রেমের কবিতা নিয়ে অচল পদাবলী (১৯৮২) রচিত। ‘সংসারের খুঁটিনাটি অনুষঙ্গে মিলনাত্মক প্রেমের বিচিত্ররূপ এখানে বাক্সময়।… কবিতাগুলো মিলনাত্মক হলেও কিছু কিছু কবিতা মিলনের তৃপ্তিসুখ-বন্দনায় উজ্জ্বল, আর এক ধরনের কবিতার মিলন সুখ দীর্ঘ না হওয়ার আশঙ্কায় ব্যথিত।’ তাঁর অন্য প্রেমের কবিতা দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী (১৯৭৪), চৈত্রের ভালোবাসা (১৯৭৫)। গণ-আন্দোলনের পদাতিক কবিও বটে তিনি। রাজনৈতিক ভাষ্যকে অনুপম শিল্পে বন্দি করেন নির্মলেন্দু গুণ। চেতনায় সমাজতন্ত্র ও বিবর্তিত সমাজ বিশ্বাস স্পষ্টতর। তাঁর কাব্যে এর জন্য উগ্র ও প্রত্যক্ষ চিৎকার ধ্বনিত। সাতের মাঝামাঝি নির্মলেন্দু লোকায়ত স্বভাবের সঙ্গে যুক্ত করেন সংগ্রামকে। সে সংগ্রামে থাকে অলজ্জ, রুক্ষ্ম মেজাজ। সর্বাঙ্গীন কল্যাণকামনায় আধুনিক চিন্তনে তাঁর কবিভাষা ক্রম-উত্তরিত। কবিতার দীর্ঘায়ত পদযাত্রায় সামূহিক অবচেতন স্তরে রচিত উপমাপ্রতিমায় কবি উদ্বোধিত। তাছাড়া নিয়ন্ত্রিত আবেগশুদ্ধ মননে বৈশ্বিক বাস্তবতাটিও বিপুল ব্যঞ্জনায় স্ফটিকস্বচ্ছ রূপ পায়। প্রেম-কাম কিংবা রাজনীতির মতো চেতনাশুদ্ধ স্পর্শকাতর বিষয়ের প্রতীকী বিবেচনা একমাত্র নির্মলেন্দু গুণেই সম্ভব। নির্মলেন্দু গুণ অবসিত বা বিবরবাসী নন, সেসব থেকে সম্ভাবিত ও রাজনৈতিক বিশ্বাসে প্রদীপ্ত। ষাটের দ্বিতীয়ার্ধের রাজনৈতিক চেতনা, বিপ্লবের স্ফূর্তি, সমাজতান্ত্রিক ক্ষিপ্রতায় অনেকটা অবক্ষয়-অবসিত কাল চলছে তখন।
মহাদেব সাহা (জ. ১৯৪৪) মর্বিড রোম্যান্টিক কবিতা লিখে পাঠকের কাতারে দাঁড়ান। নির্বিরোধী; কিন্তু কবিতায় তাঁর পথ অনিরুদ্ধ। বিচিত্র রকমের কবিতা লিখেছেন; অনেক বিষয় এসেছে তাঁর কবিতায়। উত্তরণ অনেক ভাবে, অনেক রকমে। আর্থ-সমাজ রাজনীতির বিষয়গুলো প্রচ্ছন্ন বিরচিত হলেও মর্মদাহ লক্ষণীয়। একান্ত আত্মশ্লাঘা যেমন আছে তেমনি আছে প্রেম; মূলত শিল্পকৃতি রক্ষায় কবি স্থির, সংযত, দৃঢ়। আকণ্ঠ অনুরাগ বা জীবনের প্রমত্ত জঙ্গমতা কাক্সিক্ষত নয় মহাদেব সাহায়; নির্বিকার প্রতিমায় সহজাত ছন্দ মূর্ত; ধ্বনিপ্রবাহও অবিরাম, স্নিগ্ধতামন্ডিত – যেমনটা মাহাদেব সাহার চারিত্র্য, এমনটাই আত্মমূর্তি। সমাজ-রাজনীতি তাঁর কবিতায় থাকলেও প্রধানত অক্রিয় আত্মকথনেই সামূহিক বিবেচনা নির্ণীত। সেভাবেই নিরবধি তাঁর কাব্যচর্চা। মহাদেব সাহার প্রথম কাব্য এই গৃহ, এই সন্ন্যাস (১৯৭২) এরপর মানব এসেছি কাছে (১৯৭৩), চাই বিষ অমরতা (১৯৭৫), কী সুন্দর অন্ধ (১৯৭৮), তোমার পায়ের শব্দ (১৯৮২), ধুলোমাটির মানুষ (১৯৮২), ফুল কই, শুধু অস্ত্রের উল্লাস (১৯৮৪), লাজুক লিরিক (১৯৮৪) প্রভৃতি কাব্য।
ফরহাদ মজহার (জ. ১৯৪৭) বিশ্বাসে প্রধানত বিরাজমান প্রচ্ছন্ন রাজনীতি। কিন্তু শরীরবৃত্তিয় জগতের সূক্ষ্মতর কণিকা এবং তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কিংবা কার্যকারণ প্রক্রিয়া ফরহাদ মজহারের মর্মপ্রোথিত। ‘নিউরন’ জিজ্ঞাসা খোকন ও তার প্রতি পুরুষ (১৯৭২) কাব্যে বিদ্যমান। তবে যেমনটা বলা চলে, রাজনীতি – যেখানে শ্রেণিচেতনা, বৈষম্য-শাসন-ত্রাসন বিরাজমান সেখানে বিপ্লবীর স্বপ্ন ও সাহস; কিংবা আশাবাদ তাঁর কবিভূমে প্রবল এক জায়গা সৃষ্টি করে নেয়। কিন্তু ফরহাদ মজহার বিপ্লবের অপরপীঠে অধ্যাত্ম চেতনাতেও কম যান না। সম্প্রতি তাঁর দর্শনগত দিকটি বিতর্কের মাত্রা পেয়েছে। নিরন্তর কাব্যচর্চায় প্রারম্ভিক পর্বে তিনি লিখেছেন গদ্যভঙ্গিতে এবং স্বরবৃত্তের দ্রুত লয়ে; পরে সেটি আর দাঁড়ায়নি। আশির দ্বিতীয় পাদে কিংবা পরে লক্ষ করা যায় অক্ষরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের স্বরে তিনি জাগরূক। উদাহরণে ধরা যায়, মেঘ মেশিনের সঙ্গীত; পুরোটিই আটকে আছে মাত্রাবৃত্তের চালে। ক্রম-পরিবর্তমান, মেধাবী, বিজ্ঞানচেতনাসম্ভূত আধার ও আধেয় তাঁর কবিতা। প্রকরণে যে কবি জীবিত, স্পন্দ্যমান তিনি ফরহাদ মজহার। ‘একটু দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ফুঁ দাও তা’হলে/ খিড়কি দিয়ে অসংখ্য বুদবুদ দেখবে উড়ে যাবে চড়–ইয়ের মতো’, ‘আজকে ভোরে বনের মধ্যে/ একটি বুনো ফুলের স্বাদে/ কিশোর ভালুক মাতাল হয়ে/ হড়কে পড়ে অথই খাদে’ – এসবে কবির একটা রূপান্তর আছে। উপমান, উপমেয়র প্রথাবদ্ধ চিন্তাকে বাতিল করে দেন, বিশেষণ ব্যবহারে সমকালকে অর্থারোপ করেন অন্যমাত্রায়, কামনাকে তুলে ধরেন সংযত ব্যঞ্জনায়, বৈশ্বিক তথা বস্তুবিশ্ব প্রতিষ্ঠিত হয় ভাবের তুলনায়। কখনো ধর্মীয় বিশ্বাসকে অন্যমাত্রায় প্রশ্রয় দেন কবি। কাঠবিড়ালিকে ‘এহতেকাফে’ দেখা কিংবা ভালুকের যৌবন উল্লাস পংক্তিমালায় চমৎকার পরিবেশ ছড়ায়। এবাদনামায় আরবি-ফারসি-লোকায়ত শব্দবিন্যাস তৈরি করেন। এভাবে তাঁর কবিতা-নির্মাণটি দৃশ্যমান হয়। তবে বর্তমানে তাঁর অনেক বিষয় অমীমাংসিত মনে হয়। ত্রিভঙ্গের তিনটি জ্যামিতি (১৯৭৭), আমাকে তুমি দাঁড় করিয়ে দিয়েছো বিপ্লবের সামনে (১৯৮৩), বৃক্ষ (১৯৮৫), সুভাকুসুম দুই ফর্মা (১৯৮৫), অকস্মাৎ রপ্তানীমুখী নারী মেশিন (১৯৮৫), খসড়া গদ্য (১৯৮৭), মেঘ মেশিনের সঙ্গীত (১৯৮৮), এবাদতনামা (১৯৯০), অসময়ের নোটবই (১৯৯৪), দরদী বকুল (১৯৯৪), গুবরে পোকার শ্বশুর (২০০০), কবিতার বোনের সঙ্গে আবার (২০০৩) কাব্যের ভেতরে বাংলাদেশের কবিতাভূমে তিনি উজ্জ্বলরূপে অধিষ্ঠিত।
মুহম্মদ নূরুল হুদা (জ. ১৯৪৯)র অবস্থান ষাট ও সত্তরের সন্ধিপর্বে। তিনি চিহ্নিত ‘জাতিসত্তার কবি’রূপে। শেকড়সন্ধানী ও অস্তিত্বপিপাসু কবির আমরা তামাটে জাতি (১৯৮১) দিয়ে কাব্যঙ্গনে শক্ত ভিত্তি করে নেন। পঠন-অভিজ্ঞতায় কবি পৃথিবী ও মানবসৃষ্টির উৎসজ্ঞানকে বিস্তৃতি বা প্রসারিত করে আবেগের কিনারাকে স্পর্শ করেন। কখনো বৈজ্ঞানিক জ্ঞানও তাঁর আবেগমগ্নতাকে ছেয়ে যায়। লৌকিক ধর্মবোধ, লোককথা, ব্রতকথা, সংস্কার-মূল্যবোধ কাব্যিক জিজ্ঞাসায় প্রমূর্ত করে তোলে। অনার্য জাতির আদিপর্বের সূচনা ও সম্ভাবনাকে অখন্ড সময় সন্নিপাতে তিনি প্রকাশিত করতে চান। এ ভাবস্তরে তাঁর অলংকার চিত্রমালাও রচিত। এমন অন্তর্লীন প্রবণতায় মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতার প্রধান ভাবস্তরটি ধরা পড়ে। বহুমাত্রিকতায় আলিঙ্গনে তাঁর কবিতার উত্তরণের পথটিও রচিত। শোণিতে সমুদ্রপাত (১৯৭২), আমার সশস্ত্র শব্দবাহিনী (১৯৭৫), শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি (১৯৭৫), অগ্নিময়ী হে মৃন্ময়ী (১৯৮০), শুক্লা শকুন্তলা (১৯৮৩), নির্বাচিত কবিতা (১৯৮৫) – এসবের ভেতর দিয়ে নূরুল হুদার রূপশৈলি একটা ধ্রুপদী মাত্রা অর্জন করেছে।
ষাটের অবক্ষয়চেতনা মর্মে অবগাহন করে বিষাদ-নৈরাশ্য-ক্ষোভ-ক্রোধ নিয়ে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭২ সময়ে রফিক আজাদ (১৯৪৩-২০১৬) লিখেছেন অসম্ভব পায়ে (১৯৭৩) কাব্যগ্রন্থ। তাঁর নঞর্থক ভাবটা অনেকটা ফরাসি কবি বোদলেয়ারের আঙ্গিকের। কবিকৃতিতে বিরাজমান এক ধরনের সাহস, দৃঢ়তা, অঙ্গীকার অন্যদিকে ব্যক্তির ব্যথাবেদনার আকুতি :
চক্ষুষ্মানের পক্ষে চোখ বুজে থাকার মতো
আনন্দময় আর কী-ইবা হতে পারে?
হয়তো এভাবেই আমার বাকি জীবন
চ’লে যেতো
কিন্তু হঠাৎ ক’রে তোমাকে দেখে ফেলে
আনন্দে বিহ্বল এই আমি কী যে বিপদে পড়লাম,
তুমি তো কোনোদিনই বুঝবে না।
রফিক আজাদ এভাবে প্রকরণেই আলাদা। নির্বাচিত কবিতায় তাঁর উক্তি ‘খন্ড, বিচ্ছিন্ন, স্বাধীন কিছু পদ্য-প্রবন্ধের একত্রিত সমাবেশ ঘটিয়ে এই সামান্য পুঁথির বিনীত প্রকাশ’, আবার বলেন ‘পাঠকের জন্য আমার কোনো গদ্য-সংবাদ নেই বলেই অগত্যা, পদ্য-প্রবন্ধকে আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছি’ – নৈরাশ্যবাদ, ‘মাছি’, মানুষের প্রতীকায়ন কবিউপমায় একেবারে দিব্যদৃষ্টি। ক্ষমা করো হে বহমান উদার অমেয় বাতাস-এ প্রকৃতি প্রচন্ড দায়িত্বশীল। পল্লীর পললভূমে সজ্জিত। পাখি, কীট, পতঙ্গ, লতার শোভামগ্ন আত্মার অবমুক্তি। রফিক আজাদ প্রকৃত কবি কিন্তু ‘গভীর আর স্বপ্নে বাস্তবে’র রথে তিনি ত্রুটিমুক্ত নন। শব্দের বাগাড়ম্বর, তাৎক্ষণিক স্থূল আবেগ, রাজনৈতিক দার্ঢ্য, প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা অনেক সময় তাঁর কবিতায় যেন জনপ্রিয়তার চাপ সৃষ্টি করেছে। তাঁর কবিতা : সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে (১৯৭৪), নির্বাচিত কবিতা (১৯৭৫), চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া (১৯৭৭), প্রেমের কবিতা (১৯৮১), সশস্ত্র সুন্দর (১৯৮২), একজীবনে (১৯৮৩), ভালোবাসার কবিতা (১৯৮৩), অঙ্গীকারের কবিতা (১৯৮৩), প্রিয় শাড়িগুলি (১৯৮৩), হাতুড়ির নিচে জীবন (১৯৮৪), পরিকীর্ণ পানশালা আমার স্বদেশ (১৯৮৫), রফিক আজাদের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৮৭) প্রভৃতি।
১৯৬৪ থেকে ১৯৭২ সময়ের [স্যাড জেনারেশনে’ ‘স্যাড জেনারেশন’ বেরিয়েছিল ১৯৬৪ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে। যাকে কেন্দ্র করে স্যাড জেনারেশন আবর্তিত হয়েছিল সে রফিক আজাদ। সে-সময়কার নতুন অবক্ষয়ী চেতনার মূল চেতনাটিকে ও-যে কেবল এই বুলেটিনে তুলে ধরেছিল তা নয়, এই বুলেটিনের অধিকাংশ লেখার মূল বিষয়বস্তুও ছিল ও-ই] সবুজপ্রতœরসিক [‘সবুজ শস্যের মাঠ’, সবুজের ধারাবহিকতা’, ‘সবুজ সংসার’, ‘সীমিত সবুজে’, ‘সবুজের ভেতর সবুজ’, ‘পাখিদের মতো সবুজ সা¤্রাজ্য’, চুনিয়া সবুজ খুব’, ‘কী ক’রে সবুজ হ’ব বলো’, ‘দীর্ঘ সবুজ বিকেল’, ‘সবুজ চারা কেন আমি করিনি রোপণ’] কবিকৃতিতে বিরাজমান এক ধরনের সাহস, দৃঢ়তা ও অঙ্গীকার অন্যদিকে ব্যক্তির ব্যথাবেদনার উগ্র-আকুতি। উদ্ধত ভঙ্গি এবং প্রবণতায় জীবনবাদী। না-পাওয়ায়, বেদনাহত। চীৎকার তার অনিবার্য ক্ষোভ ও অধিকারে। ‘ভাত দে হারামজাদা, তা-না হ’লে মানচিত্র খাবো’ – এক দানব-দুঃস্বাপ্নিকের হাহাকার। এ প্রবণতাটি ‘স্যাড’-উত্থিত। সেভাবেই কবির নৈর্ব্যক্তিক প্রকল্প-নির্মাণ। কোনো তুলনায় নয়, ষাটের অবক্ষয়-দুর্বিনীত লক্ষ্যভ্রষ্ট-কালধারায় পাশ্চাত্যরীতির প্রভাব বা প্রচ্ছন্নতা অবসিত নয়। সেটি স্বকালবিদ্ধ। লক্ষণীয় উপর্যুক্ত কাব্যটির “নগর ধ্বংসের আগে” কবিতাটি :
নগর বিধ্বস্ত হলে ভেঙে গেলে শেষতম ঘড়ি
উলঙ্গ ও মৃতদের সুখে শুধু ঈর্ষা করা চলে।
‘জাহাজ, জাহাজ’ – ব’লে আর্তনাদ সকলেই করি –
তবুও জাহাজ কোনো ভাসবে না এই পচা জলে।
শুভপ্রদ, শ্রেয়োচেতনায় রফিক আজাদ হঠকারী নন, পরিপূর্ণ ‘ধার্মিক’, স্বদেশ-স্মৃতি-ঐতিহ্য-পুরাণের রসায়নে তা তপ্তময়। সমাজের যাবতীয় বিষয় বিশেষ করে মধ্যবিত্তের-স্বরূপ নির্ণয় করলেও তার কবিতার মুখ্য প্রতিপাদ্য শুভপ্রদ চেতনা। যেটি নব্বুইয়ের পরে এক উচ্চরেখ আস্থায় পৌঁছেছে। দক্ষতাও যুক্ত হয় তাতে। ‘নারী’-কৈশোর-জননী-গ্রাম-নিসর্গ এক ভিন্ন প্রকরণে স্থিরতা পায়। বিষয়-সংকেতে ধরা দেয়। এতে হয়তো মধ্যবিত্তিয় সমাজস্তর বা কর্পোরাল পুঁজির কাঠামোয় বন্দী-ব্যক্তির নাভিশ্বাস, উত্তেজনা ও ক্ষেদ আছে – ‘নানারকম হাতুড়ির নিচে এই জীবন।’ ‘বিরিশিরি পর্বে’র পরে কবির মৃত্তিকাগন্ধী, লোকপ্রতœপুরাণ সত্তাসান্নিধ্য স্পষ্টতায় বিকিরিত। ধর্মীয়-ঐতিহ্যও পুনর্গঠিত। আকর্ষণীয় কোলাজধর্ম কখনো আশায় প্রতীক্ষায় স্বীকারোক্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এখানে বিস্তৃতিময় ও সৃজনশীল নিরীক্ষায় ব্যঞ্জিত বিষয়সমূহ। কবির অদৃষ্টময়তা, আত্মশ্লাঘা, জীবননিষ্ঠা এতে প্রকাশিত। এ পর্বের পরে কবির কবিতার রঙ ও বিভা পাল্টেছে।
বাংলাদেশের কবিতায় আধুনিক রীতির আঙ্গিক রচয়িতাদের মধ্যে হৃদয়সংবেদী-নার্সিসিস্টিক কবি আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫)। তাঁর কবিতায় আত্মপ্রেম, নৈঃসঙ্গ্যবোধ, বিচ্ছিন্নতা কিংবা স্মৃতিকাতর বেদনার্ত আত্মা দিব্যত্ব লাভ করে। কবিতাশরীরে তিনি অন্তহীন স্বপ্নচারিতাকে দুঃসময়ে ধারণ করেন। একাধারে বাউলচেতনা ও স্বপ্নকাতরতার কবি তিনি। কবিতার অন্তর্গত রূপবৈচিত্র্যে সমসাময়িক অন্যদের থেকে তিনি পৃথক :
যাই, এখন তোদের শরীরে শস্যের আভা ঝরে পড়ছে যাই…
মৃত্যু আর মৃত্যু আর মৃত্যুর আঁধারে যাই,
বিবর্ণ ঘাসের ঘরে ফিরে যাই, যাই
সেখানে বোনের লাশ, আমার ভাইয়ের লাশ খুঁজে নিতে হবে,
আমি যাই
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি-সম্বলিত এ কবিতায় কবি মৃত্যু-পংক্তির রূপময় পরিবেশ রচনা করেন। বিষণ্নতায় হন দগ্ধ। মৃত্যুচেতনা বিদ্যমান প্রকৃতিরাজিতে স্থির কম্পমান। পৃথক পালঙ্ক সে ক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ। ত্রিশোত্তর কবিদের প্রভাব হলেও তা হাসানের হাতে অন্য। একটি আলোকিত কবিভাষা এক্ষেত্রে নির্মিত হতে দেখা যায়। কবিকণ্ঠটি পরিষ্কার। আগেই এ কাব্যের প্রথম কবিতা “নচিকেতা”র উদাহরণ এসেছে। তাতে ঘোষিত কবিস্বর। বিনষ্ট বা গলিত জীবনের আরোপিত ক্রন্দনে কাতর নন কিংবা পাশ্চাত্য স্বভাবে জাঁ আর্তুর র্যাঁবো (ঔবধহ অৎঃযঁৎ জরসনধঁফ) বা ফ্রেদেরিক গার্সিয়া লোরকা (ঋবফবৎরপড় এধৎপরধ খড়ৎপধ) লোরকার অনুভাবের প্রত্যক্ষ প্রেরণাবন্দি নন। যদিও বলতে শোনা যায় ‘লোরকার বিষণ্ন জন্ম’র কথা। কিন্তু তা ব্যক্তি – পরে দেশের পটচিত্রে, বাঙালির ভঙ্গুর পীড়িত সমাজ-কাঠামোয়। আগের কাব্যে যেটি স্পষ্ট নামে প্রকাশিত “গোলাপের নীচে নিহত হে কবি কিশোর”, “কবির ভাসমান মৃতদেহ”, “আমি অনেক কষ্টে আছি”। বিষণ্নতা ব্যাপক চিত্রে প্রতিফলিত। উপর্যুক্ত উদাহরণটির মতো অনেক পংক্তিতে তা আইকনে পরিণত। সার্বভৌম এ আনুষ্ঠানিকতাটি পূর্বজ অনেক কবি লালন করলেও গভীর অনুভবের চর্চায় বা বিচিত্র বিষয়বস্তুর ভেতর দিয়ে [মৃত্যু, রোগ, নারীর জৈববস্তু, মহামারী, মন্বন্তর] তাকে আধারবন্দী করা অত্যন্ত নতুন। এটি প্রকৃতির বিচিত্র রঙে (বৃষ্টি, বৃক্ষ, নদী, পক্ষী) ব্যাপক। কবির টোটেমব্রতও যেন এ ধর্মটিকে অনেক প্রসারিত করে, যাতে মনুষ্যত্ব-মানবিক সারাৎসার রীতিমাফিক তার আদর্শে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে নারীর সত্তাগত সম্ভাবনা ও অধিকার চেতনাও অপরিস্ফুট নয়। তাবৎ মহিমার প্রকৃতি কাব্য-প্রকরণ ধারণ করলে আবুল হাসান নিজের ভেতরে নির্মাণ-পুলকে বা নবায়িত সৃষ্টিতে পৌঁছুলে তার প্রতাপটুকু বিস্ময়কর বলে স্বীকার করার কিছু থাকে না। কারণ, এ পথের বাঁকে এবার তার নব-প্রতিভার স্তর কায়েম হয়েছে, তার প্রকাশ উদিষ্ট পৃথক পালঙ্ক। এ কাব্যের প্রবণতা আত্ম-উৎসারণ। রোগশয্যা, স্মৃতিচিহ্ন, অসুখ, নরকের আগুন, রুগ্নতা, হাসপাতাল, মৃত্যু, এপিটাফ-এর ভেতর থেকে পুরাণের পাখির মতো জেগে ওঠা। আত্মার এ জাগর-আখ্যান চিরজয়ী, মৃত্যুঞ্জয়ী, জয়শ্রী। ‘আমার অনলে আজ জাগো তবে হে জীবন, জয়শ্রী জীবন!’, ‘মধ্যরাতে ঝাউকান্না কেঁদে বলে, শান্তি হোক, ওরে শান্তি হোক!’, ‘সমস্ত শান্তি ভেঙ্গে ঢুকে যাচ্ছে মানুষের মনীষার শেষ বৈনাশিকে!’ – এভাবে আত্মাকে অনলে পুড়িয়ে, ‘শান্তি’-র চিরজীবিত শিল্পকাঠামো রচনা করেন। এতে প্রকরণবৈশিষ্ট্যও নিরূপিত হয়। পুনরুদ্ধার বা রিভাইভ অনেকটা যীশু-পুরাণে-উপনিষদে প্রজ্বলিত। এ প্রজ্বলনের পথ জাগতিক সকল প্রাণীর শুভপ্রেরণায়। কিন্তু সেটি উজ্জীবিত হওয়ার সরণী সমাজ-বিধৃত অভাব, দুঃখ, বেদনা, গ্লানির ভেতর দিয়ে। কবি দুঃখ-বেদনারও কাব্যময় প্রসিদ্ধি নির্মাণ করেন। স্মৃতিসৌধে বা উদ্ধত-ভীতিকর প্রাণীবাচক বিশেষায়ণে তার শিল্পিত রূপ-কাঠামো রচনা করেন। বাংলার প্রকৃতিতে কিংবা বিধৃত বিবর্তিত সমাজ ও জীবনচেতনায় তার পুনর্বয়ন লাভ ঘটে। সমাজের উপরকাঠামোয় প্রকাশিত যে স্তর তার কারণ হিসেবে ভেতরের কাঠামো ও কার্যকারণ সম্পর্ক, কর্পোরেট বা মার্কেন্টাইল বাণিজ্যের শাসনে নিপতিত ব্যক্তি, যে জন্মেই কুঁকড়ে গেছে, ব্যথাদীর্ণ ক্ষয়িষ্ণু মন ও মনন, প্রেমবিনাশী ও দুর্বিনীত দ্বন্দ্বে সৃষ্ট ক্ষত আর দুঃখচিহ্নিত প্রহরের গরল নিয়ে তবুও জয়ী জীবিতের শান্ত-সন্ধান প্রচেষ্টায় রত কবির উপলব্ধ প্রকরণ। ছন্দও সে লক্ষ্যেই সচেষ্ট। এ শান্তির ইমেজ রূঢ়-বিদ্রুপাত্মক-বিকৃত-কঠোর কিন্তু শেষাবধি উপনীত শান্তি পারাবারে। তৃতীয় এ কাব্যটিতে পূর্বের কাব্যচিন্তনের সরণী বেয়ে কবি পৌঁছেছেন দুর্লভ শান্তি পারাবারে। যেখানে নিজস্ব রূপ-ধারণাটি পূর্ণ ও জীবনজয়ী মানুষের সারাৎসাররূপে চিহ্নিত। বিভাগোত্তর কাব্যভাবনায় এর স্বরূপ পার্থিবতার ভেতর দিয়ে লোকোত্তর বিশেষত্ব লাভ করতে সক্ষম হয়। ‘মৃত’ মানুষের পুনরুত্থানে যে নবজন্ম তা বৃষ্টি, নদী, সমুদ্র, রৌদ্র কিংবা গোলাপ, কোমল হরিণ রূপকে প্রকাশিত। এ রূপকার্থ কবি-উক্তিতে লোকোত্তররূপে পরিগণিত নি্নক্ত দৃষ্টান্তে :
(ক) আমাকে শোনাতে হবে সেই কবেকার এক সত্যমাথুর :
প্রবাহ নদীর প্রাণ, – নাবিকের দল ফিরে এসো,
আমার দু’পাশে আজ মরা ঢেউ, অভিভূত অন্য বন্দর!
(খ) এ বৃষ্টি কি নবজন্ম?
কিছুই জানিনা শুধু অক্সিজেনের নল নাকে নিয়ে বসে থাকি জাগাতুর!
আর শব্দে টের পাই : একলক্ষ জিরাফ, হলুদ সাপ, সিংহের সবুজ দল
সমস্ত জীবন ভেঙ্গে ঢুকে যাচ্ছে আমার ভিতরে!
উপর্যুক্ত দৃষ্টান্তে পুনরুজ্জীবন ঘোষিত হয় কোন্ মূল্যবোধে? সত্যমাথুর আবুল হাসান পাপ ও পবিত্রতাকে জৈবিক সত্যসন্ধে প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে পুরা-ইতিহাস-পুরাণ মিথস্ক্রিয়ায় সামগ্রিক বিষয়কে রূপময় সৌন্দর্যে ভূষিত করেন। সেখানে সৌন্দর্য কামগন্ধভারাতুর, ললিতলোভনকান্তি :
সৃষ্টি এত সৌন্দর্যপ্রধান! সৌন্দর্য এমন ভীরু এমন কুৎসিত!
সাপ, খেলনা, নর্তকী, নদী ও নারী
অপাপবিদ্ধতায় স্বর্গ-নরকের পৌরাণিক বিশ্বাস কিংবা সমাজসাপেক্ষ বেশ্যালয়, ঘোলামদ, অশ্লীলতা ক্ষ্যাপা দূর্বাশার ক্ষেদে পুড়িয়ে ফেলেন। নৈর্ব্যক্তিক চিন্তনে জগতের বৈভবকে এক ধরনের পার্থিবতা দেন, তার ভেতরেই তুমুল হয়ে ওঠে অপার্থিব আকুলতা। যেটি সময় ও সমাজ-নিরপেক্ষ হয়েই চিরন্তনতা লাভ করে। মরমী বা আধ্যাত্মিক অবিনাশী রূপে যাবতীয় কুৎসিত-কণ্টককে হরণ করে। রচনা করে সেই মর্মজ্ঞান – যা একমাত্র ও অনিঃশেষরূপে মানুষেই সর্বশেষরূপে পরিগণিত।
রাজা যায় রাজা আসে (১৯৭২), যে তুমি হরণ করো (১৯৭৪), আমার প্রেম আমার প্রতিনিধি (১৯৭৪), পৃথক পালঙ্ক (১৯৭৫) তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ। আবুল হাসানের কবিতায় রাজনীতি নেই; কিন্তু থাকে দুর্মর ঘৃণার আশ্লেষ জড়ানো নির্বিকার ক্ষোভ। আর ক্ষোভের বিকল্প হিসেবে নিজের অন্তর্গত চেতনালোকে নির্বাসিত হন তিনি। সেখানে কীর্তিত হন ‘ভেজা মাটির বৃষ্টিতে’ কিংবা ‘পারদমাখা শয্যা’য়। এসবের ভেতরেই জীবন-মৃত্যুর বিপরীতাত্মক প্রান্তকে মিলিয়েছেন কবি। প্রত্যেকটি কাব্যে বিবিধ বিষয় বৈচিত্র্যের ভেতর দিয়ে তাঁর উত্তরণ ঘটেছে। কাব্যসমগ্রর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ এক জীবনের মর্মভেদী উচ্চারণ বিমর্ষ করুণার্দ্রতায় মুদ্রিত। পরিশ্রমী কবি আবুল হাসান স্বল্পায়ু ছিলেন। উপর্যুক্ত কাব্যগ্রন্থ ছাড়া তাঁর মৃত্যুর দশ বছর পর প্রকাশিত হয় আবুল হাসানের অগ্রন্থিত কবিতা (১৯৮৫)। অগ্রন্থিত কবিতার মধ্যে আবুল হাসানের শব্দানুসন্ধানী, ছন্দবৈচিত্র্যপিয়াসী এক সামগ্রিক কবিসত্তাকে খুঁজে পাওয়া যায়। এছাড়া আবুল হাসানের ওরা কয়েকজন (১৯৭৫) নামে একটি কাব্যনাট্যও মৃত্যুর পর সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় প্রকাশিত হয়েছিল।
আবু হেনা মোস্তফা কামাল (১৯৩৬-১৯৮৯) কবি-আত্মায় অনেকটা সুধীন দত্তীয় (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত)। সংহত, মেদবিরল ও মিতকথন প্রয়াসে গদ্যগুণের অবলম্বন আছে কবিতায়। পঞ্চাশ থেকে কবিতাচর্চায়; প্রেম ও নারীই তাঁর প্রধান অবলম্বন। এক্ষেত্রে অভিমান ও আত্মস্বভাব একটা পরিবৃত্ত রচনা করে তাঁর কবিতায়। এমন অবস্থায়ই রোম্যান্টিক মেজাজ অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু আবু হেনার রোম্যান্টিকতা উত্তরিত, মর্মপ্লাবী নয়। নিভৃত বুদ্ধির শাসনে ঋজু, দৃঢ়। তাঁর তিনটি কাব্য – আপন যৌবন বৈরী (১৯৭৪), যেহেতু জন্মান্ধ (১৯৮৪) ও আক্রান্ত গজল (১৯৮৮)। হাজার বছরের লিরিক প্রবণতার ধারাটিতে তিনি আধুনিকতার জলসিঞ্চন করেন। কাব্যময় শব্দপ্রয়োগে, দ্যুতিময় অলঙ্কার গ্রন্থনে; ছন্দে আনেন বিপুল বৈচিত্র্য। সমকাল-মনস্কতা থাকলেও কিছুতেই আরোপিত নন তিনি সেখানে। নির্ভার নিষ্পত্তিহীন পেলব প্রেমের ভাষ্য কালাতীত হয়ে ওঠে, তাছাড়া দার্শনিকসুলভ সন্দেহেও তিনি কবিতাকে অস্বীকার করে তোলেন। রোম্যান্টিক আবর্তে আবু হেনা মোস্তফা কামাল জীবনবাদী কবি, তাঁর কাব্যে প্রেম-নারী-যৌবন সোচ্চার ঘোষণা পায় দুর্মর একাত্মতায়।
ষাটের দশকের ‘স্বাক্ষর’ পত্রিকা থেকে আমৃত্যু কবিতায় নিবেদিত, নিরীক্ষাধর্মী ও অন্তর্মুখীতায় সিকদার আমিনুল হক (১৯৪২-২০০৫) বাংলাদেশের অন্যতম কবি। কবিতায় বিষয় ও প্রকরণ বিশিষ্টতায় তিনি আবদুল মান্নান সৈয়দে ব্যবহৃত আধুনিকবাদী চেতনার আকর্ষি। তাঁর কাব্যভূমি ষাটের অবক্ষয়ী নাগরিক চেতনায় নির্মিত; নিরীক্ষাধর্মী প্রকরণে উত্তরিত, সর্বদৈশিক কালানুগত্যে বিধৃত। তাঁর কাব্যভূমে বিচ্ছুরিত নাগরিক চেতনায় বিরাজমান প্রুস্ত, কামু, কাফকা, বোদলেয়ার। কবিমর্মে বিধৃত ফরাসী প্রতীকবাদের ছায়া :
তোমাকে পাই রোদ্দুরে। সিঁড়ি ছুঁয়ে ফ্লাটের নিবিড়
চলন্ত প্রবাসী মূর্তি; যেন দোকানের কাঁচ ঢাকা
শান্ত মাছ, তোমাকে প্রত্যহ পাই ঘ্রাণে আকস্মিক,
হঠাৎ দরোজা খুলে, অবিন্যস্ত বিপুল শরীর।
সিকদার আমিনুল হকের দুটো কাব্যকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা যায় – দূরের কার্নিশ ও সতত ডানার মানুষ। প্রথমটিতে একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতার প্রকাশ – যা ষাটের অভিব্যক্ত রূপ। অপরটি প্রধানত মৃত্যুচেতনার চিত্রার্পন। দূরের কার্নিশ-এর “একা” প্রথম কবিতা :
আহত হৃদয় একা, করপুট ধ’রে থাকে একা
লোকার্ত গৃহের কাছে নিরাশ্রয় জটিল লণ্ঠন।
শিকড় নেমেছে একা, জল যায়, সেও বুঝি একা
আহত হৃদয় ঢাকা, জরায়ুর কবোষ্ণ জীবন।
প্রবণতাটি ভারতবর্ষীয় ভাবনাদর্শের নয়। ঋষিপ্রতিম, শুভপ্রদ আকাক্সক্ষা এতে নেই। কিংবা বিভাগোত্তর কবিদের নিসর্গ-প্রকৃতিময়তার শাশ্বত আবাহনও নেই। অপরিপক্ব নগিরিকের (ষাটের ঢাকার বাস্তবতায়) ব্যক্তি-বিচ্ছিন্নতার রূপ এখানে প্রকাশিত। বিশ্বযুদ্ধোত্তর পাশ্চাত্য ধারাবাহি হলেও প্রথম কাব্যের উদ্ধৃত এ কবিতায় উচ্চারণটুকু আলোকময়। দূরের কার্নিশ (১৯৭৫), তিন পাপড়ির ফুল (১৯৭৯), পারাবত এই প্রাচীরের শেষ কবিতা (১৯৮২), আমি সেই ইলেকট্রা (১৯৮৫), বহুদিন উপেক্ষায় বহুদিন অন্ধকারে (১৯৮৭), পাত্রে তুমি প্রতিদিন জল (১৯৮৭), এক রাত্রি এক ঋতু (১৯৯১), সতত ডানার মানুষ থেকে (১৯৯১), সুপ্রভাত হে বারান্দা (১৯৯৩), কাফকার জামা (১৯৯৪), সুলতা আমার এলসা (১৯৯৪), রুমালের আলো ও অন্যান্য কবিতা (১৯৯৫), লোর্কাকে যেদিন ওরা নিয়ে গেলো (১৯৯৭) এমন কবির চিত্রকল্প ইউরোপীয় এবং স্বদেশী ঐতিহ্যে শীলিত।
আসাদ চৌধুরী (জ. ১৯৪৩)র কবিতায় নাগরিকতার সঙ্গে যুক্ত হয় লোকজ বিত্ত-বেসাত। নিরহংকারী আসাদ চৌধুরীর কবিতায় পদ্যের লালিত্য আছে। ছড়ার বুলিতে, গজলের গীতলতায় আর চারণ বৈশিষ্ট্যে সমকালের ক্লেদ-হতাশাকে পরাভূত করেন তিনি। অনাড়ম্বর তাঁর আয়োজন। খুব নির্মল প্রস্তাবনা; সাধারণ শব্দে কিংবা আটপৌরে উপমায় দ্যুতিময় ভাষ্য রচনা করেন। প্রথম কাব্য তবক দেওয়া পান (১৯৭৫)-এ কবির বিনম্র উপস্থিতি সপ্রতিভ। বিত্ত নাই বেসাত নাই (১৯৭৬), প্রশ্ন নেই, উত্তরে পাহাড় (১৯৭৯), জলের মধ্যে লেখাজোখা (১৯৮২), যে পারে পারুক (১৯৮৩), মধ্যমাঠ থেকে (১৯৮৪), মেঘের জুলুম পাখির জুলুম (১৯৮৫), ভালোবাসার কবিতা (১৯৮৫), প্রেমের কবিতা (১৯৮৫), দুঃখীরাও গল্প করে (১৯৮৭), নদীও বিবস্ত্র হয় (১৯৯২), বাতাস যেমন পরিচিত (১৯৯৮), বৃষ্টির সংসারে আমি কেউ নই (১৯৯৮), যেতে যেতে মধ্যযুগ ঘুরে দাঁড়িয়েছে (২০১২) কবিব্যক্তিত্বের অন্যতম কাব্যগ্রন্থ। কাব্যে আসাদ চৌধুরীর অভিজ্ঞতালব্ধ ও মননজাত সত্তাটি লোকসংস্কৃতির উপাদানে পরিপুষ্টি অর্জন করে। ফলে প্রবাদ-প্রবচন-ছড়া-ধাধা এসব ছন্দোযুক্ত হয় স্থানান্তর (রহাবৎংরড়হ) বা বিপর্যাস (ফরংঃড়ৎঃরড়হ) প্রক্রিয়ায় – পুনর্নির্মাণের ভেতর দিয়ে। তাঁর কাব্য পরিচর্যায় আধুনিকতার শর্তসমূহ আরোপিত নয় বরং লোকজীবনের প্রকৃত দ্বন্দ্বাত্মক প্রয়াসটি অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে বৈচিত্র্যময় উদ্ভাসিত হয়। বাংলাদেশের কাব্যাঙ্গনের তাঁর এটি নিরীক্ষিত ও ব্যতিক্রমী অনুষঙ্গ। আসাদ চৌধুরী বাংলাদেশের কবিতায় লোকায়ত জীবনাশ্রিত শুদ্ধতার ধারাটির প্রতি নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠেন। যেখানে চর্চিত অভিজ্ঞতায় ক্রমাগত অতিক্রম করেছেন বিপুল পথ-পরিক্রমা। সে কারণে তাঁর নির্মিত কবিভাষা অনেক মমতাস্পর্শী, ঋজুতারঞ্জিত। সেখানে বাংলা কাব্যধারার শাশ্বত আবহটি যেমন বজায় থাকে তেমনি বিবর্তনের প্রবাহে যুক্ত হয় কালের মাত্রা। কৃষি উৎপাদন অর্থনীতিতে বাংলাদেশের কবিতায় কবির উচ্চারণ পূর্বপাঠের রীতিকে ধারণ করে আত্মবীক্ষায় কৃত্য। আর তার মধ্যেই আত্মমুক্তির প্রসঙ্গটি কার্যকর হয়ে ওঠে। আসাদ চৌধুরীর ভালোবাসার সূত্র মাটিপুরাণে প্রোথিত। সেখানেই তাঁর শিল্পসত্তার অভিন্ন রূপটি নিমজ্জিত। আমার কবিতা (১৯৮৫) আসাদ চৌধুরীর ছয়টি কবিতা গ্রন্থ নেয়া কিছু কবিতার সংকলন।
৩.
পুনর্বার বলি, কবিতার অপরূপত্ব অনেক রকমের। কবির হাতে অনুভবের অপরিহার্য উচ্চারণটুকু শামিল হয় ভাষার প্রতীকে। এই প্রতীকে বহু-বিস্তর স্বপ্ন প্রতিপাদ্য থাকে। পুরাণ-প্রতœ অবিনাশী হয়ে ওঠে। ফরাসি মনোবিদ জ্যাক লাঁকা ভাষার সঙ্গে স্বপ্নমাখা জীবনকে মিলিয়ে মনের অন্দর-সদরের, গোপন-উন্মুক্ততার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। মনের কোণের আয়নাকে কোনো ধ্বনি-প্রতীকে বাইরের প্রতিবেশের সঙ্গে সংযোগ করেছেন। আর তাতে আছে সামগ্রিক চেতনার প্রয়াস। যিনি কবিÑ তার এ চেতনা কারো কারো কাছে ‘অবজেকটিভ কোরিলেটিভ’, কারো কাছে বিপরীতে ‘ইমোটিভ’ বা আবেগোদ্দীপক ভূমিকায় প্রদর্শিত। টি. এস. এলিয়টের মতে : Poetry is not a turning loose of emotion, but an escape from emotion; it is not the exprision of personality, but an escape from personality. But, ofcourse only those who have personality and emotions know what it means want to escape from these things. আবেগের বিপরীতে নিরাবেগ প্রস্তাবনায় কবি সৃষ্টির প্রত্যয়কে নির্ধারণ করেছেন। কবিতা মন্ময় আবেগের বিপরীতে তন্ময় ও নৈর্ব্যক্তিক বাস্তব প্রেরণাটি গ্রহণ করে, সেজন্য সে শরীরে বহন করে অনেক রহস্যময় প্রতীক, পুরাণ ও মৌহূর্তিক ইমেজ। ইমেজিস্টরাও এই প্রেরণাটি গ্রহণ করেছেন, ‘কঠিন বাস্তব আনার’ প্রত্যয়ে। এক ধরনের প্রত্যক্ষতাও তাতে আছে – যেখানে শব্দ নির্ধারিত, নির্বাচিত এবং ঘনত্বে ব্যঞ্জিত। রক্তিম এবং তান্ডবময় দ্বন্দ্বাত্মক জীবনের চিহ্নিত প্রদাহ। এরূপ পংক্তিমালায় প্রকরণ সম্পর্কে বলা যায় : ‘নিরঙ্কুশ অনিবার্য শব্দ প্রয়োগ করতে হবে; প্রয়োজনবোধে চলতি বাগধারা পরম্পরায় রচনা করতে হবে, ছন্দস্পন্দনের পরম্পরা অনুযায়ী নয়; চিত্রকল্পের বিষয়ে নিবিড় রূপদান…’। বিপরীতে আবেগোদ্দীপক ভাষার পক্ষে আই এ রিচার্ডস তার প্রতিবেশ নিরূপণের ক্ষেত্রে বিষয়-প্রবণতায় ভাষার আবেগী সংশ্লিষ্টতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। যা হোক, পঞ্চাশ ও ষাটের কবিতার বিষয় ও প্রকরণ নির্ণয়ে এমন কল্পসৌন্দর্য বিবেচনায় আনার অবকাশ আছে। এখানে আমাদের কিছু কবির চকিত প্রতিফলন হয়তো বিবেচনায় আনা হলো কিন্তু ইতিহাসগত বা প্রাকরণিক ব্যাখ্যার চূড়া এখানে গড়ে ওঠেনি। এ পরিসরে তার সুযোগও কম। বারান্তরে সে প্রয়াস নিশ্চয়ই অন্য কোনো বোদ্ধা পাঠকের হাতে থাকবে, সে প্রত্যাশাটুকু অনুভব করি।