বাংলাদেশের কবিতা দশকে দশকে আবির্ভূত কবিদের স্বাতন্ত্র্যবাদী হওয়ার সচেতন প্রয়াসের মাধ্যমেই বিকশিত হয়েছে। তাই বলে বাংলা কবিতার ঐতিহ্যের পরম্পরা থেকেবিযুক্ত নয় বাংলাদেশের কবিতা। আর্থসামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনে কবিতাও নতুন রূপে নির্মিত হয়। এই নির্মাণপ্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকে তত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব ও জাগতিক সঙ্কট। এতে থাকে নৈরাশ্য, প্রগতি পরম্পরা, বাস্তব ও পরাবাস্তব চেতনা। বাংলা কবিতার আধুনিকতার সাথে ইউরোপীয় আধুনিকতার একটি যোগসূত্র আছে। দেশে দেশে প্রকাশরীতির দিক থেকে আধুনিকতা ভিন্নতর হলেও মূলত উনিশ শতকের শেষ থেকে শুরু করে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকেই এর বৈশিষ্ট্যগুলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এতে প্রাধান্য পায় নতুন প্রসঙ্গ ও তা রূপায়ণের রীতি। স্বকাল সম্পর্কে তীব্র অনুরাগ এবং রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রমের প্রয়াস থেকে বাংলা কবিতার আধুনিকতা সূচনা ঘটে। তিরিশি কবিতার আধার ও আধেয় এর মধ্যে নিহিত আছে বাংলা কবিতার আধুনিকতা। তিরিশি কবিদের কবিতার বিষয় ও শিল্পরূপ বিবেচনা করলে দেখা যাবে বিশ^যুদ্ধোত্তর ঔপনিবেশিক আধুনিকতার রূপায়ণে এরা বিশ^ সংস্কৃতি ও দেশজ আকাক্সক্ষার সম্মিলনে দ্বন্দ্বের সম্মুখীন। এই দ্বন্দ্ব তিরিশি কবিদের ব্যক্তিক অনুভবে প্রকাশিত। উক্ত কবিরা কবিতার দর্শন, প্রতীক, চিত্রকল্প রূপায়ণে স্বতন্ত্র ও বিচ্ছিন্ন। বৈদগ্ধ্য প্রকাশে স্বোপার্জিত ভাষারীতির ওপর নির্ভরশীল। এই আধুনিকতার পথ ধরেই দেশজ ও বিশ^ পরিস্থিতিতে কবিরা দশকে দশকে রূপবদ্ধ করেছে আধুনিকোত্তর চেতনা।
১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পূর্বেই উনিশ শতকের সূচনা থেকে বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি ক্রমবিকশিত হতে থাকে। নতুন দেশ পাকিস্তান সৃষ্টির মাধ্যমে উক্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণির পূর্বাংশের মানুষ জীবনে ও শিল্পে প্রবল উদ্দীপনার মুহূর্তে আত্মসংকটে পতিত হয়। চল্লিশের বেশ কিছু কবি পাকিস্তানি ও ইসলামি ধারায় কাব্যচর্চায় ব্রতী হন। এরা ইসলামি ধারা, পুঁথির জগৎকে আবহমান বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে সমন্বয় করতে চেয়েছেন। এদের কাব্যাদর্শে ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদী দৃষ্টি ও ইসলামী পুনর্জাগরণ থাকলেও বাস্তবতার কারণে গ্রহণ করতে হয়েছে মানবিক মূল্যবোধ ও রোমান্টিক জিজ্ঞাসা। চল্লিশের কবিরা তিরিশি আধুনিকতা ধারণ করলেও তা থেকে উত্তরণের প্রয়াসও লক্ষণীয়। এরা জাতিসত্তার আকাক্সক্ষা রূপায়ণে নিজস্ব ভূগোল ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধ।
বিভাগোত্তর পাঁচের দশকের কবিরা পরিচিতি পান মূলত ‘নতুন কবিতা’ (১৯৫০) ও ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ (১৯৫৩) কবিতা সংকলনের জন্য। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তানি উদ্দীপনা ম্রিয়মাণ হয়ে যায়। এদের কবিতায় প্রাধান্য পায় সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। গণতান্ত্রিক জীবনাদর্শ ও সাংস্কৃতিক জাগরণের পরিপ্রেক্ষিতে কবিতায় ভাষাভিত্তিক ঐতিহ্য অনুভূত হতে থাকে। বিষয়ের নবমাত্রিক চেতনা সত্ত্বেও এরা তিরিশি কবিতার অনুবর্তী। তবে এদের কবিতার আঙ্গিকে রূপায়িত হয় স্বকীয় সমাজ ও সংস্কৃতিজাত উপমা, রূপক ও চিত্রকল্প। স্বদেশ চেতনায় দায়বদ্ধ থেকে এ সময়ের কবিতা ধারণ করেছে বুর্জোয়া মানবতাবাদী ভাবাদর্শ। আধা সামন্তবাদী সমাজে উক্ত চেতনাই পরিবর্তনকামী ও প্রগতিশীল বলে প্রতীয়মান হয়।
ষাটে আবির্ভূত কবিদের কবিতা ধারণ করেছে আধুনিকতার আরেকটি মাত্রা। পাঁচের দশকের কবিতার জীবন সংলগ্ন, মানবিক আত্মিক অনুভবের সঙ্গে ষাটের কবিরা যুক্ত করলেন স্বীকারোক্তিমূলক মনোভঙ্গি। ষাটের কবিদের কাব্যভাবনা ‘কণ্ঠস্বর’, ‘স্বাক্ষর’, ‘সাম্প্রতিক’, ‘প্রতিধ্বনি’, ‘বক্তব্য’, ‘স্যাড জেনারেশন’ পত্রিকাকেই কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতে থাকে। ষাটের দশক জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীনতার ক্ষেত্র প্রস্তুতে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের কবিরা অবক্ষয়ী ও উজ্জীবনী ধারায় বিভক্ত। অবক্ষয়ী ধারার কবিতায় প্রাধান্য পেয়েছে অবক্ষয়চেতনা, নগরমনস্কতা ও আত্মজৈবনিক জিজ্ঞাসা। এদের মধ্যে কেউবিশুদ্ধ কাব্যচর্চায় নিবেদিত থেকে নির্মাণ করেছেন সমাজ থেকে বিযুক্ত পরাবাস্তব কবিতা। তবে ষাটের শেষার্ধে সামাজিক ও রাজনীতিক বোধের কারণে কাব্যে প্রকাশ পায় এক ধরনের স্ববিরোধিতা। সমকালের আগ্রাসী সংকট মোকাবেলা করে তার শেষ পর্যন্ত জীবন পলায়ন করেননি। ষাটের কবিতায় পরিলক্ষিত হয় মুখের ভাষা, সাংবাদিকতার ভাষা, আত্মজৈবনিক প্রত্যক্ষকথন ও গদ্যছন্দ। এ ক্ষেত্রে কেউ কেঊ ব্যতিক্রমও ছিলেন।
ভাষা ও সংস্কৃতিক ভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ সত্তরের কবিতার মুখচ্ছদ। এ সময়ের কবিতায় যুদ্ধের আবেগ নৈর্ব্যক্তিক অনুভবে জারিত হয়নি। কবিদের অভিজ্ঞতাপুঞ্জ রোম্যান্টিক অনুভবে ও অতিকথনে আক্রান্ত। কবিতায় প্রত্যাশিত ছিল মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা কিন্তু সময়, স্বভাব ও ঘটনাপ্রবাহ থেকে নিরাসক্ত না থাকায় কবিতাগুলো হয়েছে আবেগঘন, শোকময় ও বীরত্বব্যঞ্জক। সত্তরের শেষার্ধে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা ব্যাহত হয়। দুর্ভিক্ষ ও গুপ্তহত্যা সৃষ্টি করে ঘনায়মান হতাশার। এই নৈরাশ্যের মধ্যে হারিয়ে যায় যুদ্ধোত্তর চেতনা। প্রতিকূল পরিবেশে কবিরা প্রাত্যহিক জীবনের হতাশার রূপায়ণে মগ্ন থাকেন। সীমাহীন প্রত্যাশা ও অপ্রাপ্তির বেদনায় নীল কবিরা একটা সময়কে ধারণ করে পাঠককে কবিতার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছেন। অনিবার্যভাবেই এ সময়ের কবিতায় দেখা যায় সংলাপ ও শ্লোগান।
সত্তরের বিবরণধর্মী কবিতালোক থেকে আশির কবিরা দেশের দীর্ঘকাল থেকে চলে আসা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনীতিক পরিস্থিতিকে বাইরে রেখে অর্ন্তলীন হন ব্যক্তিক দর্শনে। জীবনের পরিব্যাপ্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুভব থেকে এরা ইশতেহার ও ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেন। এগুলো তত্ত্বাশ্রয়ী ও জীবনবিমুখ এক কথায় বিমানবিক। কবিরা ব্যক্তিক অনুভব থেকে যে কাব্যদর্শন সৃষ্টি করেন তা ছিল অতীতের মতোই নানা ইজমে বিভক্ত, জ্ঞানকান্ডের পরিভাষায় সমৃদ্ধ। এদের অনুভবগুলো মননধর্মী হলেও তা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারায় কার্যকারণসম্পৃক্ত নয়। মিথের বহুমাত্রিক ব্যবহারে আশির কবিরা উৎসাহী। তবে মিথ বিষয় হিসেবে নয় বরং অনুষঙ্গ,সংকেত ও ভাষ্য হিসেবে বিন্যস্ত। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার পরিবর্তে কবিতায় প্রাধান্য পায় ব্যক্তিক অনুভব। আশির দশকের কবিদের কাব্যদর্শন ‘একবিংশ’, ‘গান্ডীব’, ‘সংবেদ’, ‘প্রান্ত’ প্রভৃতি পত্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এ সময় আধুনিকবাদ স্থানচ্যুত হয়, উত্তর-আধুনিকবাদী নতুন চিন্তা কাব্যে ভর করে। কবিরা ব্যক্তিক কাব্যাদর্শ সৃষ্টির যে প্রচেষ্টা নেন সেখানে জ্ঞানকান্ডের চিন্তাপ্রপঞ্চ যুক্ত হয়। আশির কবিরা আধুনিক কবিতার ধারাবাহিকতা থেকে সরে এসে বিনির্মাণ করেছেন কবিতার বৈচিত্র্যময় সঙ্গতি, অসঙ্গতি ও শিল্পের কারুকাজ। আশির কবিরা হলেন, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, মোহাম্মাদ সাদিক, সাজ্জাদ শরিফ, ফরিদ কবির, মঈন চৌধুরী, মাসুদ খান, সরকার মাসুদ, রেজাউদ্দিন স্টালিন, মতিউর রহমান মল্লিক, মারুফ রায়হান, মোশাররফ হোসেন খান, কামরুল হাসান, সোলায়মান আহসান প্রমুখ। এ সময়ের কাব্য আন্দোলনের সমষ্টিগত প্রচেষ্টা সম্পর্কে খোন্দকার আশরাফ হোসেনের অভিমত তাৎপর্যপূর্ণ: ‘আশির দশকের কবিদের হয়তো বলা যাবে, কালক্রান্তির কবি, আধুনিকবাদের উপত্যকা পেরিয়ে আধুনিক-উত্তর চাতালে পা-রাখা কবিকুল, কেননা তাঁরা বাংলাদেশের কবিতায় একটি টার্নিং পয়েন্ট দাঁড়িয়ে আছেন, শুধু তাই নয়, তাঁরাই বাংলা কবিতার অভিমুখ ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন অতি বহির্জাগতিক প্রাত্যহিকতা থেকে অন্তর্মুখিনতা এবং ভাষা ও কর্মের অগ্রগণ্যতার চেতনার দিকে। এই অভিমুখেই বাংলাদেশের কবিতা চলেছে নব্বইয়ের দশক এবং তারও পরে।’ (সরকার আশরাফ: ২০১৪ : ১৯৬-১৯৭) এ সময়ের কবিরা গদ্যছন্দে কাব্যচর্চায় উৎসাহী। মিথের বহুমাত্রিক ব্যবহার, বিজ্ঞানবোধ, লোকজীবন প্রতিরূপকধর্মী প্রাকৃত চেতনা, লজিক্যাল ক্র্যাক, বিষয়হীনতা কবিতায় প্রাধান্য পায়। ভেতর ও বাহিরের দ্বন্দ্বে পরিব্যাপ্ত জীবনের জন্য কবিদের কাব্যভাবনা মননময় হলেও তা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনুযায়ী ছিল না
আশির উত্তরসূরি হিসেবে নব্বইয়ে কবিরা বাস্তব পৃথিবীর বদলে প্রতিচ্ছায়াময় পৃথিবীর সন্ধান করেন। বাস্তবতাকে প্রসারিত না করে তারা হাইপার রিয়েলিটি সৃষ্টি করেন। তারা সে টেক্সট নির্মাণ করেন তা বৈচিত্র্যময়, বহুরৈখিক, বহুধ্বন্যাত্মক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিকূল। এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার সম্প্রসারণ, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বাণিজ্যিক উদারতা, মেধাপাচার, নানা পরিবর্তনমুখী প্রবণতায় কবিরা কবিতার প্রচলিত ফর্মের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে হয়ে উঠেন প্রতিনিয়ত নিরীক্ষাপ্রিয়। নব্বইয়ের কবিতার যে প্যারাডাইম সেখানে শব্দচ্যুতি ও অর্থচ্যুতি ঘটেছে। আকস্মাৎ নাটকীয় আবহ সৃষ্টি এবং জীবনকে আনুভূমিকভাবে দেখার পরিবর্তে উলম্বভাবে দেখার জন্য কবিতার ভাষা হয়েছে দুরূহ এবং কখনো কখনো বোধগম্যহীন। এভাবেই নব্বইয়ের কবিরা উত্তর আধুনিকতার পথে অগ্রসর হন। নব্বই দশকের উল্লেখযোগ্য কবি হলেন বায়তুল্লাহ কাদেরী, রহমান হেনরী, মুজিব ইরম, মাসুদুল হক, কামরুজ্জামান কামু, টোকন ঠাকুর, সায়ীদ আবুবকর, ব্রাত্য রাইসু, কামরুজ্জামান, হেনরি স্বপন, সাজ্জাদ বিপ্লব, ওবায়েদ আকাশ, সরকার আমিন, জাকির আবু জাফর, জেনিস মাহমুদ, মনসুর আজিজ, চঞ্চল আশরাফ, মহিবুর রহিম, নয়ন আহমেদ, জফির সেতু, খুরশীদ আলম বাবু, সৈয়দ সাইফুল্লাহ শিহাব, আল হাফিজ, ওমর বিশ^াস প্রমুখ। উত্তর আধুনিক কবিতার দু’টি ধারা। একটি ধারা হলো কবিতায় বাস্তবতার বদলে হাইপাররিয়েলিটির সন্ধান। এরা কবিতাকে করতে চেয়েছেন জীবন রাজনীতি ও যুক্তি বিযুক্ত। অন্য ধারা আমাদের সংস্কৃতির পারম্পর্য, লোকজ সংস্কৃতি ধারণ করে নতুন সংস্কৃতি নির্মাণে উৎসাহী। আত্মপরিচয় নবায়ন এবং বিশ্বের ধারাবাহিক চ্যালেঞ্জের সাথে তা সমীকৃত করাই ছিল তাদের প্রচেষ্টা। এ সময়ের কবিরা কবিতার নতুন টেক্সট বিনির্মাণের জন্যই খ্যাতিমান।
ওবায়েদ আকাশ (১৯৭৩-) কবিতায় বাস্তবতার বদলে হাইপাররিয়েলিটির সন্ধান করেন না। তিনি উত্তর আধুনিকতার অভিঘাতে সন্ধান করেন স্বকীয় পথ। এ পথ মূলত আত্মপরিচয় নবায়নের পথ। তাঁর কবিতায় তিনটি প্রবণতা লক্ষণীয়। প্রথমত, লোকায়ত জীবনকে অবলম্বন করেই তার সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে। দ্বিতীয়ত, কবির অনুভবকে সহজাত ও স্বাভাবিক রাখতে ছন্দবদ্ধো না থাকা। তৃতীয়ত, অনুষঙ্গ হিসেবে লোকসংস্কৃতি, মিথ আসলেও কবিতা রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা থেকে বিযুক্ত নয়। ওবায়েদ আকাশের নির্বাচিত কবিতার সংকলন ‘উদ্ধারকৃত মুখমন্ডল’ (২০১৩) – এ লোকায়ত জীবনকে তিনি জৈবিক সমগ্রতায় উপস্থাপন করেন।
আমার মতো যারা মানবদেহ মাটি করে/ঝাড়বংশে বৃদ্ধি করছে আগাছার চারা/তাদের নামে তৈরি হবে গ্রামে গ্রামে দাতব্য ইস্কুল? (বুকের ওপর আগাছার চারা, উদ্ধারকৃত মুখমন্ডল)
বায়তুল্লাহ কাদেরীর (১৯৬৮-) কবিতার যে প্যারাডাইম সেখানে শব্দচ্যুতি ও অর্থচ্যুতি ঘটেছে। নব্বই দশকের কবিতায় যে কাউন্টার ডিসকোর্স তৈরি হয় সেখানে কবিতার প্রচলিত ধারাকে অতিক্রম করে ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে যে টেক্সট নির্মিত হয় তা বৈচিত্র্যময়, বহুরৈখিক, বহুধ্বন্যাত্মক। কবিতা এখন আর তত্ত্বের স্বরায়ণ নয়। কবি অন্তর্দৃষ্টিতে যে আধেয় সৃষ্টি করেন তা স্বকীয় বোধের উন্মোচনে তাৎপর্যময়।
শীত হলো সক্রেটিস, পাশাপাশি সত্যদ্রষ্টা কবি,
মহান বাল্মীকি শীত। তার ঠোঁটে হেমলক,বুকে
ব্যাধের নিষ্ঠুর স্বর। শোনো শীত, তুমিই গয়বী
শিক্ষক আমার, মূর্খ পুলিশেরা তোমার মৃত্যুকে
তাড়িয়ে বেড়াক, আমি তো জেনেছি প্রিয় ঐ ঠোঁটে
বিষ নয়,সত্যের মহিমা রোজ ক্রৌঞ্চ হয়ে ফোটে।
(শীতাভ সনেটগুচ্ছ,শীত: তিন)
এমনই বর্ষার তীর বিদ্ধ করে রাধিকা রঙের
আমার এ প্রিয় দুলদুল, কষ্টার্জিত নদী ঝরে
বিবশ আঙুলে, কোথা গো রঙিন কৃষ্ণ, চরাচরে
বুঝি তুমি ইস্রফিল, আমার বুকের কিয়ামত
ওঠাও বাঁশিতে? যেদিন বাতাসে শুধু মো’রমের
চাঁদ,জানবে আমার বাড়িতে রোজ কেয়ামত।
(শীতাভ সনেটগুচ্ছ,বর্ষা: সাত)
বায়তুল্লাহ কাদেরীর কবিতায় ইতিহাস, ঐতিহ্যের সঙ্গে অবধারিতভাবে আসে প্রতীচ্য। তিনি শেষ পর্যন্ত তা থেকে প্রত্যাবর্তন করেন আপন গৃহে। সনেটের বিন্যাসে তার কবিতা যে ডিসকোর্স নিয়ে হাজির হয় তা বিশ^ভূগোলে পরিভ্রমণ করলেও আত্মভুবনে প্রান্তিকজনের সখা।
মুজিব ইরম (১৯৭১) এর কবিতায় উত্তর আধুনিকতার ভিন্ন একটি প্রান্ত উন্মোচিত হয়েছে। আকস্মাৎ নাটকীয় আবহ সৃষ্টি এবং জীবনকে আনুভূমিকভাবে দেখার পরিবর্তে উলম্বভাবে দেখা। এর কারণ অনুসন্ধান করলে পাওয়া যাবে কবিতার চিত্রকল্পসমূহে জাদুবাস্তবতায় বিস্তার। কবিকে তাড়িত করে এক জগৎ থেকে অন্য জগৎ। কবি নিজেকে সংযত ও সংহত করতে সহজেই প্রত্যাবর্তন করেন নিজ বাসভূমে। কল্পনা অকস্মাৎ হয়ে ওঠে বাস্তব, বিমূর্ত জগৎ ও মূর্ত জগৎ যেন হাত ধরাধরি করে চলে।
আমার কবিতাগুলো ভরে রাখি লালনীল বৈয়ামে বৈয়ামে-বিদ্যালয়ের প্রবেশ পথে, টং দোকানের তাকে।
ওরা রাঙ্গা রাঙ্গা রাঙ্গা লেবেঞ্চুষ, কমলা চকোলেট, নীলাভ মার্বেল-ফেরিওয়ালানিয়ে বসে মাঠের ওধারে।
(গার্জিয়ানদের জন্য ১টি ফাও কবিতা)
সিলট্যা এই মানু আমি, তোমার কদর করবো আমি কমলা লেবু, কাগজী লেবুর শীতল জলে। তোমার তরে কান্দে আমার মন, আমার বাড়ি, ও বন্ধুয়া, তোমার নিমন্ত্রণ।
(১ টি পুরান পদ্য)
খালই আমার সাগর নদী, শান্ত দীঘির জল; বিলই আমার হাওর-বাঁওড়, ঝিলের অবিকল।
(আমার আছে)
পাখিটা উড়াল দেয়, আমি তার ছায়া আঁকি। পাখিটা গান করে, আমি তার সুর আঁকি। পাখিটার রঙ নাই। আমি রঙ মাখিয়ে দিই। পাখিটা ভাবহীন থাকে, আমি তাতে ভাব বসিয়ে নেই। পাখিটার নাম নাই, আমি তার নাম রাখি। আমি তার নাম ধরে ডাকি, আমি তার দেশ আঁকি।
(আঁকাজোখা)
মুজিব ইরমের কবিতার যে টেক্সট নির্মিত হয় তা যাদুবাস্তবতার মোড়কে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। সাদামাটা অথচ অসাধারণ ভাষায় তিনি যে জগৎ তৈরি করেন সেখানে শেষ পর্যন্ত থাকে লোকজ জীবন ও মাটির ঘ্রাণ।
সরকার আমিন (১৯৬৮) মূলত কবিতার নতুন টেক্সট বিনির্মাণের জন্যই খ্যাতিমান। তবে এই টেক্সট নির্মাণের জন্য তিনি উল্লফনবিমুখ, মাত্রাতিরিক্ত অর্থচ্যুতির প্রতি আস্থাশীল নন। নব্বই এর উল্লফনধর্মিতা ও অর্থবিচ্যুতির প্রকট প্রবণতা থেকে তিনি স্বকীয় সত্তা উন্মোচন করেছেন। তিনি জীবনানন্দ দাশের প্রলোভন সহজেই এড়িয়ে চলেন। সরকার আমিনের কবিতায় যে বৈশিষ্ট্যগুলো সহজেই দেখা যায় তাহলো আকর্ষণীয় নামকরণ, নতুনতর উপমার ব্যবহার, প্রচলিত প্রবণতার সাথে মতান্তর, কথোপকথনের ভঙ্গিতে কবিতা উপস্থাপন। প্রচলিত উপকরণের ব্যবহার।
আমি মারা গেলে কেউ শোক করো না। কারণ দেখবে ততক্ষণে ম্যাটারনিটি হাসপাতালের লেবার রুমে কোন না কোন সরকার আমিন জন্ম নিয়েছে।
(ওসিয়তনামা: আমি মারা গেলে)
আমার জন্য বরাদ্দ মৃত্যুগুলো ফেরত দিলাম
আমার জন্য বরাদ্দ যন্ত্রণাগুলো দু’হাতে নিলাম
তবুও যদি চড়া দামে নিলাম হয় আমার শীতার্থ হৃদয়।
(নিলাম বিজ্ঞপ্তি)
ও আমার সংকটসাখী;
ধ্বসে যাওয়া ভবনের ভিতর আটকা পড়লেও
জড়াজড়ি করে মৃত্যু উদযাপন করা যায়
কারণ মৃত্যুর পর আর মৃত্যু থাকে না।
(মৃত্যুর পর আর মৃত্যু থাকে না।)
আমি এক সেতুনির্মাতা ইটকারিগর
সিমেন্টের স্বভাব জানি বলে ভেঙে পড়ার ভয়
তাড়াতে পারি না।
(সেতু নির্মাতার ভয়)
সরকার আমিন কবিতায় ব্যবহৃত শব্দগুলোকে মোলায়েম করে তোলেন, তিনি একটি শব্দের সাথে আরেকটি শব্দের চমৎকার সম্পর্ক স্থাপন করেন। চলতে থাকে এক চরণ থেকে অন্য চরণে সঞ্চারিত পরিপূর্ণ ভাবধারা। পাঠক বিমানবিকতার সম্মুখীন হন না।
জফির সেতু (১৯৭১-) কাব্যচর্চার সূচনায় জীবনানন্দ দাশ প্রভাবিত হলেও অচিরেই তিনি খুঁজে পান তাঁর নিজস্ব কাব্যভাষা। জফির সেতুর কাব্যে প্রাধান্য পায় পুরাণ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং শেষ পর্যন্ত বিনির্মাণ।
এমন বসন্ত দিনে আমি গ্রিস-রোম-ব্যাবিলন হয়ে
হরপ্পার যুগল মূর্তির কোল ঘেঁষে প্রেরণা স্বরূপ
দাঁড়িয়েছি নটরাজ।
(বসন্ত দিনে)
টিলায় আমার ঘর আমি টিলাতেই থাকি
আমার কোনো পড়বেশি নাই
টিলায় খাই আমি টিলাতেই নিদ্রা যাই
মৃত্যু ছাড়া টিলায় কেউ আসে না
(টিলা)
জফির সেতু প্রাচীন ও মধ্যযুগের বহুবিধ চরিত্র নিয়ে যে বয়ান করেছেন তা বহুমাত্রিক ও অনেকান্ত। এ সব নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় উন্মোচিত হতে থাকে জফির সেতুর কাব্যভুবন। তিনি যে নতুন টেক্সট তৈরি করেন তা তাৎপর্যময়।
সায়ীদ আবুবকর (১৯৬৮-) কবিতায় লোকজ অনুষঙ্গ ব্যবহারের কারণে খ্যাতিমান। নব্বইয়ের কবিতার যে প্যরাডাইম সেখানে প্রাকৃতায়ণ মুখ্য। সায়ীদের ভালোবাসার পাত্রী ‘টসটসে আঙুরের মতো লোভনীয়’। ‘টুকটুকে আমের মতো উলঙ্গ সুন্দর’। কবির ভালোবাসায় ‘মেয়ের নদীচোখ’ এর কাছে ¤্রয়িমাণ ‘পৃথিবীর নদীগুলো’। ‘মেয়ের ফুল ঠোঁট’, ‘মেয়ের গিরিবুক’ কবির একান্ত প্রার্থিত। কবির প্রেমিকা ‘আকলিমা’, ‘সুলতানা’, কিংবা ‘জুলেখার’আহবানে কবি বিমুখ হন না। এ কারণেই ‘হাঁসের মতো রমণীর বাড়িয়ে দেয়া রোদ ঠোঁটে’ কবি দিতে চান ‘এক ঝুড়ি শামুক চুম্বন’। সুলতানার ‘ধানভরা বিল চোখ’, ‘লাল গাছপাকা ঝাল ঠোঁট’, ‘শে^ত কুমড়ার খেত বুক’, কবির আরাধ্য। কবির কাছে ভালোবাসা ‘ভাপ ওঠা এক থাল পায়েসের মতো’। সায়ীদের ব্যতিক্রমী চিত্রকল্প তাঁকে স্বাতন্ত্র্যে চিহ্নিত করে।
নব্বই এর সকল কবির নাম এ প্রবন্ধে আসেনি। আমরা উত্তর আধুনিক কবিতার যে ধারাটি কবিতায় বাস্তবতার বদলে হাইপাররিয়েলিটির সন্ধান করেছেন। যারা কবিতাকে করতে চেয়েছেন জীবন, রাজনীতি ও যুক্তি বিযুক্ত। তাদের কবিতা আলোচনা করিনি। উত্তর আধুনিক কিংবা আধুনিকোত্তর ধারা যেটি আমাদের সংস্কৃতির পারম্পর্য, লোকজ সংস্কৃতি ধারণ করে নতুন সংস্কৃতি নির্মাণে উৎসাহী। এই ধারার কবিতার পরিচয় দিয়েছি। এ সময়ের কবিরা আসলে কবিতার নতুন টেক্সট বিনির্মাণের জন্যই খ্যাতিমান।