একটা চারতলা বিল্ডিং। এর নিচে সামান্য ঘাসবিহীন এবড়ো-থেবড়ো একফালি লন। একপাশে বাচ্চাদের সময় কাটানোর মতো কিছু খেলনা- কতগুলো রাবারের বল, প্লাস্টিকের খেলনা গাড়ি, দোলনা এসব। অন্যপাশে সীমানা-দেয়াল ঘেঁষে সালমাদের বসার জায়গা। খুব হিজিবিজি অবস্থা। একে-অন্যের গায়ে লাগে যখন-তখন।
কিছুদিন আগেও এখানে এলে বড় বিরক্ত হত সালমা। ছেলেকে কোচিংয়ের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা খোলা আকাশের নিচে একচিলতে এ জায়গাটায় অন্য মায়েদের সঙ্গে বসে থাকতে মোটেই ভালো লাগত না। ইলিয়াস বুঝতে পেরে জিজ্ঞাসা করত, ‘মন খারাপ কেন দিলরুবা?’ যদিও সালমার নাম দিলরুবা নয়, তবু নানারকম রোমান্টিক নামে ওকে সম্বোধন করে সোহাগ ঝরাবার বাই রয়েছে ওর। বি.এ পাসকোর্সে পড়ার সময় বাঙলায় বেশ ভাল করেছিল তো, হয়তো এরই কিছুটা প্রভাব রয়ে গেছে এখনো।
‘মন খারাপের তুমি কি বোঝ?’ মুখ ঘোরায় স্ত্রী।
‘না বললে কিভাবে বুঝব? কিছু অন্তত বল নার্গিস?’ আকুলতা স্বামীর গলায়।
‘আমি তোমার ছেলের কোচিং- সেন্টারে ঘণ্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে পারব না। বাসার কাজ সব পড়ে থাকে। বুয়া আমাকে না পেয়ে প্রায়ই ফিরে যায়। সেসব কাজ আমাকেই করতে হয়। এত ঝামেলা আমাকে দিয়ে হবে না।’ থামে সালমা। উষ্মা আর বিরক্তিবোধ একসঙ্গে সালমার দুধসাদা ফর্সা গোলগাল ভারিক্কি চেহারায় বাসা বাঁধে।
ইলিয়াস ভালো করেই জানে ওর বউ এখন কী বলতে চাইছে; উত্তর না দিয়ে সে ওর তিনতলা ভাড়া বাসার একমাত্র বিনোদন-কেন্দ্র একচিলতে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। টি-শার্টের পকেট থেকে একটা বেনসন সিগারেট সযতেœ বের করে আনে। তারপর ম্যাচ ঠুকে সেটি ধরিয়ে উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে সন্ধ্যার আলো-ঝলোমলো ঢাকার দিকে। বুকের ভেতর থেকে এসময় বোবা-চাপা চেনাজানা কিছু কষ্ট উগড়ে আসতে চায়; বারবার ভাতের বলকের মতো গুমরে উঠে কিছুক্ষণ স্তব্ধ করে রাখে ইলিয়াসকে।
পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে হাত থেকে সিগারেটটা ফেলে স্ত্রীর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মুখভরা হাসি নিয়ে বলে, ‘আর কটাদিন অপেক্ষা কর। বেতনটা বাড়লেই তোমাকে আর কোচিং সেন্টারে গিয়ে বসে থাকতে হবে না। ছেলেকে দিয়ে সোজা বাসায় চলে আসবে। ছুটির সময় আবার যাবে। ঠিক আছে দিলতাজ বেগম?’
সালমা আর কথা বাড়ায় না। সে জানে, ইলিয়াস যে বেতন পায় তা দিয়ে বাড়িভাড়া মিটিয়ে সংসার-খরচ চালানো সত্যি দুরূহ ব্যাপার। এর উপর ওদের একমাত্র ছেলে সৌদের ক্লাস ফাইভের সমাপনী পরীক্ষার ঠ্যালা। স্কুলের নিয়মমাফিক পড়ায় এ-প্লাস আসে না; তাই, বিশেষ সতর্কতার অংশ হিসাবে টাকাভরতি পকেট নিয়ে সবাইকে ছুটে আসতে হচ্ছে কোচিং-সেন্টারের দিকে। ওদের একমাত্র ছেলে সৌদেরও তো এ-প্লাস পেতে হবে। তাই, খাওয়া-খরচ কমিয়ে কোচিংয়ের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে হবেÑ এটাই দস্তুর, কিস্যু করার নেই!
প্রথমদিকে সালমার মাঝে মাঝে মনে হতো, সে ছেলেকে নিয়ে হেঁটে বা বাসে করে স্কুলে বা কোচিং সেন্টারে যাবে; হয়তো তাতে সামান্য সাশ্রয় হলেও হতে পারে ইলিয়াসের।
সে নিজে এ ব্যাপারে বেশ কবার চেষ্টাও করে দেখেছে। হেঁটে গেলে অনেকটা রাস্তা, পায়ে ব্যথা ধরে যায়। অভয় দাস লেন থেকে খিলগাঁ সরকারি বিদ্যালয় তো কম রাস্তা নয়? বাসে-টেম্পোতে গেলেও দুতিনবার সেগুলো অদল-বদল করে স্কুলে পৌঁছুতে হয়। তার ওপর প্রচন্ড ভিড়ের চাপ তো রয়েছেই। সারাদিনের পর এতোই ক্লান্ত হয়ে পড়ে যে, মা-ছেলে দু’জনার শরীর আর চলতে চায় না। বাসায় ফিরে সালমা ছেলেকে আর পড়াতে পারে না। আবার অসম্ভব পরিশ্রমের কারণে পড়তে গিয়ে ছেলেটাও শেখা পড়া ভুল করে বসে থাকে, পড়ার মাঝে বারবার অমনোযোগী হয়ে পড়ে। তখন শুধু ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে মা- ছেলে দু’জনার।
এসব দেখেশুনে ইলিয়াস বলল, ‘আমার যত কষ্টই হউক, কেউ এখন থেকে বাসে বা হেঁটে স্কুলে যাবে না। রিক্সায় যাবে। যা হয় আমি বুঝব। ’
ইলিয়াসের আশকারা ও নিত্যদিনের খরচ চালাবার আত্মবিশ্বাস পরখ করে তখন থেকে ওরা রিক্সায় স্কুলে যাওয়া-আসা করতে শুরু করে। মাসের প্রথমে চুলছেঁড়া হিসাব-নিকাশ করে যাতায়াত খরচের টাকা ইলিয়াস তুলে দেয় সালমার হাতে। মুখ বুজে এরই ভেতর সালমাকে চলতে হয়। মাঝে মাঝে স্কুলে বা কোচিং-সেন্টারে বসে বিরক্ত হয়ে পড়লে সালমার খুব ইচ্ছে জাগে, বাসায় গিয়ে একটুখানি বিশ্রাম নিয়ে ফিরে আসতে। কিন্তু, খরচের সীমাবদ্ধতার কারণে তা আর হয়ে ওঠে না। এমনকি, বন্ধু-বান্ধব কারো হাতে নতুন কোনো চকোলেট বা চিপস দেখে একমাত্র ছেলে বায়না করে বসলেও কিছু করার থাকে না; ধমক-ধামক দিয়ে ওকে থামিয়ে রাখতে হয়। নিজেরও মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ফাস্টফুডের দোকানে ছেলেকে নিয়ে ঢুকে পড়তে। চারপাশে ফাস্টফুডের এতো হাতছানির ভেতর নিজেকে ধরে রাখা সত্যি কঠিন এক কাজ। কিন্তু ইলিয়াসের করুণ চেহারা ও গরিব পকেটের কথা ভেবে সালমাকে সেসব সংবরণ করেই চলতে হয়। ইচ্ছেগুলোর উপর সংযমের ছিপি এঁটে দিয়ে মুখে বলতে হয়, ‘ঘরের ডাল-ভাত অনেক ভাল।’
অথচ বিয়ের পর সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে ইলিয়াসের প্রাইভেট কোম্পানির চাকরিটিকে সালমার মনে হতো, পৃথিবীর সেরা চাকরি। এক রুমের যে-বাসাটায় সংসারজীবনের প্রথমদিকে ওরা থাকত, সেটিকে ভাবত ঢাকার সবচেয়ে বিলাসবহুল কামরা। আর ইলিয়াসকে লাগত পৃথিবীর সেরা নায়ক। ও যা বলত, যা খাওয়াত, যেখানে নিয়ে যেত, তা-ই সে সুযোগ পেলে আত্মীয়স্বজনের কাছে গল্প করে বেড়াত। এমনি এক রোমান্টিকতার ঘোর ছিল ওর চোখজুড়ে।
সৌদ হওয়ার পর ধীরে ধীরে সালমার সেই মোহ কাটতে শুরু করে। চারপাশের বাস্তবতা দেখে নিজেকে কেবল গরিব লাগে নিজের কাছে। ছেলেকে একটা সাইকেল কিনে দেয়ার শখ ছিল। পারেনি। রিমোটসহ একটা লাল খেলনা গাড়ি কিনে দেয়ার খুব আকাক্সক্ষা হতো। পারেনি। স্কুলে দেয়ার সময় খুব ইচ্ছে ছিল, বড় কোনো ইংরেজি স্কুল বেছে নেবে। কিন্তু মাসের পর মাস সংসারের যাবতীয় হিসাব-নিকাশ মিলানোর পর শেষমেশ খিলগাঁর সরকারি বিদ্যালয়ে ছেলেটার স্থান হয়েছে, কিছু করার নেই।
কিছু বললেই ইলিয়াস উত্তর দিত, ‘মেহবুবা, আমি প্রাইভেট কোম্পানির সামান্য কেরানি মাত্র। উপরি বলতে কিছু নেই আমার। মাত্র বিশ-বাইশ হাজার টাকা বেতন। এর ভেতরই হিসাব নিকাশ করে তোমাকে চলতে হবে। আমার কিছু করার নেই, মেহেরজান।’
এগুলো সব শুরুর দিককার কথা। এখন সব গা-সওয়া। সমস্ত দীনতা মেনে নিয়ে সালমার এখন নির্বিকার-নির্বিকল্প সমাধি। কোনো কিছুই আর ওর ভেতর নতুন করে বিস্ময় জাগায় না।
তা সত্ত্বেও ইলিয়াসের আচরণে একধরনের আকর্ষণ রয়েছে। ওর উপর বেশিক্ষণ মন খারাপ করে থাকার জো নেই। হাসি এসে যায় আপনা আপনি।
কখনো কখনো বেশি মন খারাপ হলে ওর একটা বাধা উত্তর রয়েছে, ‘নিজেদের অভাবের কথা ভেবে অত কষ্ট পাচ্ছ? তোমার চেয়ে যারা খারাপ আছে, তাদের দিকে তাকাও। দেখবা আর খারাপ লাগবে না। আল্লাহপাককে স্মরণ কর। দেখবে অনেক কষ্ট কমে গেছে।’
এসব শুনে শুনে এখন ওর বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে, অনেকের তুলনায় ওরা বরং ভালোই আছে; আরো সুখ পায় এই ভেবে যে, ওরা অসৎ নয়।
দু’জন মিলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। রোজার দিনে তিরিশটা রোজা রাখে। কোরবানির সময় আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে কোরবানিও দেয়। আম্মা-আব্বা-শ্বশুর-শাশুড়ি সবাইকে বছরে অন্তত একবার ঈদের সময় শাড়ি-কাপড় দেয়ার চেষ্টা করে। ছেলেকে ভাগাভাগি করে পড়াতে বসায়। গ্রামের বাড়ি থেকে আম্মা-আব্বাকে নিজেদের দুই রুমের ফ্ল্যাটে এনে রাখে। টাকা জমিয়ে মাঝে মধ্যে এখানে সেখানে বেড়াতেও যায়। ছেলেকে নিয়ে খিলগাঁ তালতলা মার্কেটে গিয়ে ফুচকা-চটপটি খায় এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে এই মাইনে থেকেই পিঁপড়ার সঞ্চয়ের মতো নিয়মিত একটি ডিপিএস চালায়।
ইলিয়াস জিজ্ঞাসা করে, ‘আমরা তো সুখী, সুখী না পেয়ারেজান?’
সালমা ভাবে, সুখ বুঝি বছরশেষে ঈদের সময় দুটো শাড়ি কেনার তৃপ্তির মতো আনন্দময় কিছু একটা। সে স্বামীর আবগেতপ্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে গভীর মমতা নিয়ে উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ, সুখীই তো।’
এসময় সালমার ঠোঁটের ফাঁকে হাসির ঝিলিক ইলিয়াসকে বুঝিয়ে দেয়, ওরা সুখী।
২.
এখানে গভীরভাবে কেউ কাউকে চেনে না।
তবু যারা বাচ্চাদের কোচিং সেন্টারে ঢুকিয়ে নিয়মিত বসে থাকে, তাদের ভেতর একধরনের সম্পর্ক তৈরি হতে বেশি সময় লাগে না। প্রথমদিকে সালমার ভালো না লাগলেও এখন এখানে এসে কিছুক্ষণ না বসলে কেমন যেন খালি-খালি লাগে সবকিছু। প্রাণখুলে কিছুক্ষণ হাসতে পারা ও মায়েদের নানারকমের অভিজ্ঞতার বয়ান ওকে এক ভিন্নমাত্রার বৈচিত্র্য এনে দেয়। আবদ্ধ গৃহিণী-জীবনে এ এক খোলা জানালা। সালমা এখানে এলে গ্রামের বাড়ির সেই জানালাটার ধারে দাঁড়াবার আনন্দ খুঁজে পায়। টিনের ঘরের সেই জানালাটা ছিল ওর একমাত্র আনন্দ। কারণ, ওখানে দাঁড়ালেই সে একটা পুকুর দেখতে পেত। চোখে পড়ত পুকুরঘাটে যারা গোসল করত, তাদের; একটুক্ষণের জন্যে হলেও পুকুরপাড়ের গাছপালা, দু-চারটা বেজি, গুঁইসাপ, সাপের মাসি, নানারঙের পাখি সবার সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। সালমা প্রফুল্ল বোধ করত এসময়টায়।
সেখানেও বেশিক্ষণ কাটানো ছিল আব্বাজানের বারণ। স্থানীয় বিদ্যালয়ের মৌলভী মতিউর রহমান ব্যক্তিজীবনে খুবই রক্ষণশীল এক মানুষ। মেয়েকে ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়ালেও সেই শৈশব থেকে কখনো বোরখা ছাড়া বাড়ি থেকে বের হতে দেননি। কিশোরী সালমার খুব ইচ্ছে করত নদীর ধার ধরে উদ্দেশ্যবিহীন হেঁটে যাওয়ার; মাঠে চরা একটা গরুর পিছু নিয়ে সেটিকে দাবড়ে বেড়ানো; ছেলেদের মতো আম- পেয়ারার গাছে চরে সেগুলোর স্বাদ নেয়া। কিন্তু ওর পক্ষে সেসব কিছু করার উপায় ছিল না। পাড়া সম্পর্কে এক দাদিজান সালমাসহ আরো ক’জন বোরখা পরিহিত মেয়েকে ওদের পাড়া থেকে এমনভাবে মেয়েদের বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিত এবং নিয়ে আসত যে, ঘাড় ঘোরানোর উপায় ছিল না। রাস্তার কিনার ধরে ভেড়ার পালের মত ওরা ক’জন বিদ্যালয়ে যেত আর আসত। গভীরভাবে কোনোকিছু দেখা ও করার সুযোগ ছিল না তখন। শুধু পুকুরটাই ছিল সালমার সংগোপন প্রেম। একমাত্র ভালো লাগা। সেখানে দাঁড়ানোও ওর জন্য ছিল নিষিদ্ধ। তবু লুকিয়ে-চুরিয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সেই আনন্দটুকু শুষে নেয়ার চেষ্টা করত সালমা। সেটাই ছিল ওর বদ্ধ গ্রামজীবনের পরম পাওয়া!
বিয়ের পর ঢাকায় এসে সহসা মনে হলো, সে বুঝি সব পাওয়ার দেশে পৌঁছে গেছে। নিজেকে মনে হতো ঢাকার একমাত্র অধিশ্বরী আর ইলিয়াসকে ভাবত ওর জীবনের সুদর্শন রাজকুমার।
নানাবিধ সাংসারিক চাপে পড়ে সেই রোমান্টিক ঘোরটুকুও একসময় ভেঙে গেল। তখন কদিন খুব মনমরা হয়ে পড়েছিল সে। কিছু আর ভালো লাগত না। দিন দিন নির্জীব হয়ে পড়ছিল। হীরা-জহরত-পান্নায় মোড়ানো এ শহরে ওর অনেক অপ্রাপ্তি ওকে করে তুলেছিল হতাশগ্রস্ত।
একসময় সেখান থেকেও সালমা বের হয়ে এলো। সমস্ত উচ্চাশা জলাঞ্জলি দিয়ে ধীরে ধীরে সব মেনে নেয়ার অভ্যাস করতে গিয়ে একদিন আবিষ্কার করল, সে সুখী। এখন বুঝতে পারে, কোনো কিছু গায়ে না মেখে নিজের মতো করে চলতে পারার ক্ষমতাই হচ্ছে সুখ।
এ শহরে কারো রোগ হলে সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাংককে গিয়ে সুখ পায়; আবার কেউ মেডিক্যাল কলেজের কাউন্টার থেকে পাঁচ টাকার টিকিট কেটে ইমারজেন্সির ডাক্তারের স্টেথোর নিচে নিজেকে সঁপে দেয়ার মাঝে সুখ খোঁজে। ঘুরেফিরে তো এক কথাই। গায়ে না মাখলেই হলো। ব্যস, হয়ে গেল। তুমি বড়লোক তো আমার কী যায় আসে? তুমি তোমার, আমি আমার। ব্যস, সুখ এসে গেল হাতের মুঠোয়। সালমা এখন এভাবেই সব দেখে।
এই যে লিজা ভাবী, মাত্র কদিন হল ছেলেকে সমাপনী পরীক্ষায় প্রস্তুতি নেয়ার জন্য এই কোচিং-সেন্টারে দিয়েছে, দেখলে মনেই হয় না, কথা বলতে পারে। কিন্তু কদিনের ভেতর ভাবীর গল্পে অস্থির হয়ে পড়েছে সবাই। কোচিং-সেন্টারে এসেই সবার এক জিজ্ঞাসা, ‘লিজা ভাবী আসেনি ?’
এ কদিনে সবাই ওর সাফল্যের সব গল্প শুনে একেবারে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। সালমা যে এতো কম কথা বলে, ওরও মজা লাগে লিজা ভাবীর কথায়, অনেকটা গৎবাঁধা বাংলা ছায়াছবি দেখার মতো।
লিজা ভাবী এসে প্রথমে ওদের কাছে বসে। বিড়বিড় করে দোয়াদুরূদ পড়ে। তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে। এসময় মায়েদের ভেতর থেকে কেউ প্রশ্ন করে, ‘ভাবী, কি খবর?’
‘খবর ভালো না। ব্যাংকের সুদ এক ডিজিটে নামায়া ফেলছে। খুব খারাপ অবস্থা।’ চোখ দুটো পোয়া মাছের মতো ফ্যাকাশে।
‘মানে?’ কলকলে টাইপ এক ভাবী বুঝতে না পেরে পাল্টা প্রশ্ন করে।
‘কিছু টাকা জমাইছিলাম তো ব্যাংকে। এখন সুদের হার দিছে কমায়া। আছি পেরেশানিতে।’ বলে লিজা ভাবী কপালের ঘাম মোছে। স্থুলকায় মহিলা। বোরখা ও হিজাবে ঢাকা দেহকান্ড। একসময় গায়ের রং ফর্সা হলেও এখন তামাটে হয়ে গেছে। তবে কথা বলে বেশ জমিয়ে তুলতে পারে আসর।
‘তাইলে এখন কি করবেন ভাবী?’ প্রশ্নকর্তা এক মায়ের জিজ্ঞাসা।
‘আরে ভাবী, আমিও কি কম যাই? ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে সোজা আমিন মোহাম্মদে চলে গেছি। রেডি একটা প্লট নিয়ে নিলাম। কাগজ দেখে তো আমার জামাই এক্কেরে থ।’
‘কি বলেন ভাবী? কত টাকার প্লট?’ বিস্ময় ঝরে ঢাকার মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মায়েদের চোখে মুখে।
‘বেশি না। চল্লিশ লাখ টাকার প্লট। কাল ওর আব্বার নামে চিঠি দিয়েছে আমিন মোহাম্মদ। পেয়ে তো আকাশ থেকে পড়ল ওর আব্বা। ভাবতেই পারে না এত টাকার প্লট কে কিনে দিল ওকে? হিঃ হিঃ হিঃ।’ লিজা ভাবী হেসে গড়িয়ে পড়ে মাটিতে।
সব মায়েরা রীতিমত উত্তেজিত। একসঙ্গে বলে ওঠে, ‘তারপর?’
‘খুলে বললাম আসল গুমর। গোপনে ওরে না জানিয়ে আমি কতগুলো ফিক্সড ডেপোজিট আর ডিপিএস চালাই সে কথা। ওর আব্বা তো হতবাক। মুখ থেকে কথাই বেরোয় না! অনেকক্ষণ পর বলল, তুমি আবার কখন টাকা জমাতে শুরু করলা? আমারে বল নি ত? ’ বলে থামে লিজা ভাবী।
চিকন-চাকন এক ভাবী সহসা বলে উঠল, ‘বকাঝকা করেনি?’
‘কেন, বকবে কেন? এতকিছু ম্যানেজ করে আমি ওকে এরকম দামি কোম্পানির একটা প্লট উপহার দিয়েছি, ও খেপবে ক্যান? উল্টা হিন্দুদের মত আমাকে কি বলে জানেন?’ লিজা ভাবীর মুখে শরমের চিহ্ন।
‘কি?’ সমবেত সবার প্রশ্ন।
‘লক্ষ্মীরানী। এখন চোখ বুজে আমার সবকিছুতে সায় দেয়। আমি যা বলি তাতেই সই। হিঃ হিঃ হিঃ।’ আত্মতৃপ্তির আনন্দে মাতোয়ারা লিজা ভাবী।
সালমা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে মহিলার দিকে। এসব কথা শুনলেও শরীর ও মনে রোমাঞ্চ জাগে। মনে হয় কোন এক স্বপ্নপুরীর সীমাহীন বৈভবের কথা বলছে কেউ। অথচ লিজা ভাবী ওরই মতো দেখতে। বরং নাক চোখের গঠন-গাঠন ও একহারা শরীর-স্বাস্থ্যের কারণে সালমাকেই সবাই সুন্দরী ভাববে। তবু এমন কি রয়েছে লিজা ভাবীর হাতে যে প্রতিটি দিন প্রাপ্তির আনন্দে মশগুল থাকে মহিলা?
একদিন আড়াই ভরি একটি হার এনে সবাইকে দেখাতে লাগল লিজা। হারটি যে ভাবীকে মানিয়েছে, তাও নয়। তবু সবার ঈর্ষা ও বিস্ময়কে উসকে দিয়ে চোখের সামনে মেলে ধরল অলঙ্কারটি।
‘কোত্থেকে এনেছেন ভাবী?’ সবার আকুল প্রশ্ন।
‘কোত্থেকে আবার? আমিন জুয়েলার্স ছাড়া আর কোথা থেকে গোল্ড কিনব বলেন? সব তো চোর। ’ ভাবী চোখ উল্টে দেয়।
‘কিভাবে কিনলেন ভাবী?’ লোভী দৃষ্টির লালা ছড়িয়ে এক অপারগ ভাবী প্রশ্ন করল।
‘ডিপিএস দুটো ভেঙে কিনে ফেললাম। ওর আব্বা তো চার ভরির কথা বলেছিল। আমিই না করলাম। এত অপচয়ের কোন মানে আছে বলেন?’ লিজা ভাবীর চেহারা ক্লিষ্ট দেখায় এসময়।
বিস্ময়ে সবার চোখ ছানাবড়া। হারটির উপর কেউ কেউ হাত বুলিয়ে সুখ নিচ্ছে; কেউ বিমর্ষ মন নিয়ে মনে মনে স্বামীকে দুষতে শুরু করেছে; হয়তো বাসায় গিয়ে ঝগড়াও বাধাবে।
শুধু সালমা নির্বিকারভাবে স্বর্ণের হারটির দিকে তাকিয়ে লিজা ভাবীকে জিজ্ঞাসা করে, ‘ভাইয়া কি করে? ব্যবসা?’ সালমার ধারণা, যারা ব্যবসা করে তারাই রসে-বশে থাকে; পরের অধীনে যারা চাকরি করে তাদের জীবন ও সংসার মানেই ব্যর্থতা আর টানাটুনির দিনলিপি। চাকরির কৃষ্ণ-গহ্বরে একবার ঢুকে পড়লে এসব থেকে আর রক্ষা নেই। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ওর আব্বাকে যেমন সে গ্রামে থাকতে দেখেছে, এখন ইলিয়সাকে দেখছে। সবখানেই তো এই চিত্র। ইলিয়াসের সংসারে তো তবু দুবেলা দুটো ভাত জোটে; প্রাচুর্য না থাক, অভাব তো নেই। সালমার আব্বা মৌলভী সাহেবের সংসারে ওদের পাঁচ ভাইবোনকে কতবার যে খুদকুঁড়ো আর মিষ্টি আলুসিদ্ধ খেয়ে দিন গুজরান করতে হয়েছে, তার কি হিসাব আছে?
লিজা ভাবীর উত্তরের অপেক্ষায় সালমা ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবে ভাবী নিশ্চয়ই কোনো ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর স্ত্রী। নইলে এত বৈভব কোত্থেকে আসবে?
ভাবী ওর প্রশ্নে আকাশ থেকে পড়ল। পদ্মফুলের মতো দুই গালে দুই হাত রেখে পাকা অভিনেত্রীর মতো করে বলে ওঠে, ‘ওমা, আপনি জানেন না? ও তো চাকরি করে। খুব সৎ মানুষ। এখন ওর পোস্টিং এয়ারপোর্টে। কোন দরকার পড়লে বলবেন সালমা ভাবী। ও অনেকের উপকার করে। খুব সৎ অফিসার।’ একরাশ গর্ব ও অহংকার ভাবীর চেহারাকে আতসবাজির মত উজ্জ্বল করে তোলে এসময়।
সালমার অভিজ্ঞতার সঙ্গে না মেলায় ও কিছুটা বোকা বনে যায়। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না ওর।
৩.
বাসায় ফিরে একসময় কি ভেবে সৌদকে সালমা জিজ্ঞাসা করে, ‘বড় হয়ে তুই কি হবি বল তো একটু ভেবে?’
পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র সৌদ তখন স্কুল থেকে ফিরে টেলিভিশন ছেড়ে ডরিমন দেখায় ব্যস্ত। নাওয়া-খাওয়া পর্যন্ত বাদ। এমনভাবে কার্টুন-মুভিতে মশগুল হয়ে রয়েছে যে, কোনোদিকে তাকাবার ফুরসত পর্যন্ত নেই ওর।
সালমা ফের প্রশ্ন করে, ‘বললি না যে? এত বড় হইছিস আর এই সহজ প্রশ্নটার উত্তর দিতে পারিস না?’ ধমকে ওঠে সালমা।
বড় ধমকে চমকে ওঠে সৌদ। ওর মায়ের চোখের উপর চোখ ফেলে ধমকের মাত্রা কতটুকু তা বোঝার চেষ্টা করে। এর ভেতর সে আবার চেঁচিয়ে ওঠে, ‘উত্তর দিলি না যে? আমি যে প্রশ্ন করছি তোর গায়ে লাগে না?’
‘কি?’ ভ্যাবাচেকা খেয়ে ছেলে পাল্টা প্রশ্ন করে। ওর চোখের সামনে ডরিমন, মগজে ডরিমন।
‘তুই বড় হয়ে কি হবি? এ প্রশ্নটার উত্তর দিতে এতক্ষণ লাগে?’ খিঁচিয়ে ওঠে সালমা।
সৌদ একটা কিছু ভাবল। তারপর তাড়াহুড়ো করে উত্তর দিল, ‘কিছু না। ’
‘মানে?’
‘জানি না। চুপ কর তো। দেখতে দাও না?’ সৌদের চোখজোড়া টেলিভিশনের পর্দায়।
অগত্যা হাল ছেড়ে দেয় সালমা। রাতে খাওয়ার সময় ইলিয়াসকে লিজা ভাবীর গল্পটা শোনায় সে। গল্পটা শেষ করে খেতে খেতে স্বামীকে শুনিয়ে স্বগতোক্তির মতো করে বলতে থাকে, ‘লিজা ভাবীর জামাই যে এত বড় চাকরি করে তা আমার জানাই ছিল না। ভাবীকে দেখে বোঝারই উপায় নেই ওরা এত বড়লোক। এদ্দিন জানতাম যারা চাকরি-বাকরি করে তারা বুঝি গরিব মানুষ। এখন দেখি সব উল্টা। এখন দেখি চাকর-বাকররাই সুখে থাকে। বুঝি না কিস্যু। তোমার ছেলেটাকে প্রশ্ন করলাম বড় হয়ে কী হবে, কোন উত্তরই দিল না।’ কথা বলতে বলতে ঠোঁট উল্টে দেয় সালমা। একরাশ বিরক্তি আর ক্ষোভ কামড়ে ধরে ওর গোলগাল ফর্সা চেহারাটাকে। হয়তো খানিকটা হতাশাও।
এসময় ছুটে আসে সৌদ; আব্বার দিকে তাকিয়ে হড়বড় করে বলে ওঠে, ‘আমি পাইলট হবো। আমি পাইলট হবো। সব সময় আকাশে থাকব। খুব মজা হবে, না?’
সঙ্গে সঙ্গে সালমা ভেংচে ওঠে, ‘পাইলট হবে, আর কাজ পাও না? ঘোড়ার ডিম হবে। হাবলু কোথাকার।’
‘তাইলে কি হবো বল?’ ছেলে সরলভাবে তাকায় আম্মার দিকে।
‘তুই লিজা ভাবীর জামাইর মত চাকরি করবি। বড় চাকরি। বুঝলি?’ বলে আড়চোখে একবার তাকায় স্বামীর দিকে।
কথা না বলে ইলিয়াস গড়াস গড়াস ভাত মুখে পুরতে থাকে। একধরনের সংগোপন অপরাধবোধ পোড়াতে শুরু করে ওর ভেতর-বাহির।
সালমা চেঁচিয়ে উঠে ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে, ‘বল্ তাহলে, বড় হয়ে কি হবি?’
রোগা, পটকা, লিকলিকে আর নিরীহ গোছের সৌদ ভয় পেয়ে শিক্ষকের কাছে মুখস্থ পড়া দেয়ার মত তোতলাতে তোতলাতে উত্তর দেয়, ‘ওই তো, তুমি যা বলছ তা।’
এসময় আচমকা বাদামি রঙের একটা বিশালদেহী টিকটিকি মাথার উপর থেকে কথা কয়ে ওঠে, ‘টিক, টিক, টিক।’
ইলিয়াস খাওয়া রেখে হঠাৎ হোঃ হোঃ করে অট্টহাসিতে ভেঙে পড়ে।
সালমা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘পাগলের মত হাসছ যে? এখানে হাসবার মত কি হল?’
ইলিয়াস আঙুল দিয়ে ছাদের গায়ে সেঁটে থাকা টিকটিকিটাকে দেখিয়ে দেয় ওকে। বলল, ‘মনে হচ্ছে, তুমি যা চাইছ তোমার ছেলে ভবিষ্যতে তা-ই হবে। মাথার উপর ভয়ঙ্কর টিকটিকিটা সে কথাই মনে হচ্ছে জানিয়ে গেল। টিক, টিক, টিক।’ বলে ফের তুমুলভাবে হেসে ওঠে ও।
স্বামীর এই অপ্রাসঙ্গিক অট্টহাসিটা আনন্দের নাকি তীব্র যাতনার তা সালমা বুঝতে পারে না। ওর কাছে এসময় সবকিছু অসার বলে মনে হয়।
সহসা ছেলের দিকে তাকিয়ে সালমা তীব্র ক্রোধে ফেটে পড়ে, ‘যা ভাগ্। চোখের সামনে থেকে সর্।’