অঙ্গুলিতে আয়রনি, বাকিরা অবোধ:
গুরু-হাস্যে মূক শিষ্য, পড়ে মুগ্ধবোধ
[‘পল দা মান: অ্যা- রিডিং দেয়ার’, ডক্টর রিচার্ড ম্যাক্সি, কমপ্যারেটিভ লিটারেচার ৯৯: ৫ (১৯৮৪), পৃ. ৯৭৯-৯৮২]
পাশ্চাত্ত্য জগতে যে বই -সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন ন’টি গদ্যরচনার সংকলন (১৯৭১) – সাহিত্য বিষয়ে বহু শতাব্দীর চিরায়ত বিশ্বাস চিরতরে বদলে দেয়, অন্তত পশ্চিমে, তার নাম ব্লাইন্ডনেস অ্যান্ড ইনসাইট (১৯৭১); ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টারলিং প্রফেসর তাত্ত্বিক পল দা মান (১৯১৯-১৯৮৩) তার প্রণেতা। বঙ্গে অশ্রুতপূর্ব এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রিয় একটি শব্দের অনুসরণে, বলতে পারি পশ্চিমের চিন্তায় ‘কালান্তর’, ১৯৭১-২০১৭। পল দা মানের সে বইয়ের উদ্ধৃতি ছাড়া, ১৯৭১ থেকে আজকের ২০১৭ সাল পর্যন্ত, ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য সম্বন্ধে কোনো উদ্ধৃতিযোগ্য একাডেমিক বই, প্রবন্ধ, রিভিয়্যু প্রকাশিত হয় নি। হয় নি মানে তাত্ত্বিকের বিচারে হয় নি১। আমার এই উক্তি যদি বিস্ময়ের উদ্রেক করে, তাহলে বুঝতে হবে গত পঁয়ত্রিশ বছরের সাগরপারের মূলধারার সাহিত্য-সম্বন্ধীয় আলোচনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হওয়ার সুযোগ ঘটে নি। ঘটে নি, অথচ ইন্টারনেটে এখন আমরা যে তামাশা, ইয়ার্কি করি, তা ওদিকের ওই চিন্তারই, তত্ত্বেরই, একপ্রকার স্বাভাবিক পরিণতি। তবে ওদের ‘তত্ত্বে’র অনুপ্রেরণায় ঢাকায় বা জোহানেসবার্গে ইয়ার্কি আবিভূত হয় নি (তত্ত্বের ভিতরস্থ, তলবর্তী, ইয়ার্কি অনুমানের জন্যে ইয়ার্কিটা বোঝার প্রশ্ন জড়িত); এসেছে তত্ত্বের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী অন্য এক অনিবার্য, অপ্রতিরোধ্য কারণে। এসেছে পল দা মান প্রমুখ তাত্ত্বিকদের সেকেলে টাইপ-রাইটার এবং প্রিন্টিং প্রেস-পরবর্তী ইন্টারনেট নামক এক ভিস্যুয়াল মেছোবাজারে, তেনা-গামছা বিছিয়ে, যত্রতত্র চালটা ডালটা মূলাটা কেনা-বেচা বিজ্ঞাপনের সুযোগ তৈরি হওয়ায়। কিন্তু ওদিকের তত্ত্বে, ব্লাইন্ডনেস অ্যান্ড ইনসাইট (১৯৭১)-এর তাত্ত্বিকতায়, ইয়ার্কি-বিদ্রƒপ (তত্ত্বে বলে আয়রনি) পুরোমাত্রাতে ছিল, যদিও অর্জুনের অভেদ্য কবচের মত তার দন্তস্ফুট ভাষা এবং আড়ষ্ট দর্শনগন্ধী শব্দের বহুলতায় বোঝা যায় নি। তার ব্যূহভেদ এখনও সহজ নয়। গুরুপাক না হলে তত্ত্বের চলবে কেন? ব্লাইন্ডনেস অ্যান্ড ইনসাইট (১৯৭১) সহজপাচ্য নয়, তবে সহজপাচ্য করা সম্ভব। তাত্ত্বিক কথাশিল্পী কমলকুমার যদি মার্সেল প্রুস্তের লেখায় হিন্দু মাতৃভক্তি২; ক্যাথলিক পন্থার ইউকারিস্ট, স্যাকরামেন্টে ‘ধর্ম্ম-পরিকর উচ্চবর্ণে’র সনাতন ভাব; ওয়াল্টার র্যালির ‘একনিষ্ঠ রাখালিয়া ভাব’-এ বৃন্দাবনের ‘বাঁশরী’, মাধবের ‘বাদয়েতে মৃদু বেণুম’৩; ম্যা’লরির ইউরোপ-বাহিত রোমান্সকাহিনী ‘র্মোট ড’ার্থারে’র৪ বিবিধ (কৃষ্ণ সবুজ লাল নীল) নাইটদের ক্ষত্রিয় নায়ক, বীরপুরুষ রূপে কল্পনা করতে পারেন, এমনকি মধ্যযুগীয় গিয়োম দি’লোরিসের ‘রোমান দে লা রোজ’কে বদলে দিতে পারেন আধুনিক যুবক বিলাসের ‘গোলাপ সুন্দরী’তে (১৯৬১), কিংবা একইভাবে, বঙ্গীয় গবেষকের অজ্ঞাতসারে, কোলরিজের ‘অ্যানশানট্ ম্যারিনার’ (১৭৯৮) যদি রূপান্তরিত হয় বাঙালী মুসলমানের বিলম্বিত লিরিকাল ব্যালার্ডস ‘সাত সাগরের মাঝি’তে (১৯৪৪), অথবা একই সালে প্রকাশিত বিভূতির ‘দেবযান’ (১৯৪৪)-এ বিলাতী সায়েন্স ফিকশন বদলে যেতে পারে মৃত যতীনের নিঃসীম, নীল, নভোম-লে মুক্ত পরিক্রমায় – আমাদের চেষ্টা করতে দোষ কি। এখানে, যেমন আগেও, সেরকম একটা চেষ্টা।
১
কোনরকম প্রকাশিত বই ছাড়া, কর্নেল (১৯৬০-৬৮) ও জুরিখ (১৯৬২-৬৮) জনস হপকিনস ও জুরিখ (১৯৬৮-৭০), ইয়েল ও জুরিখ য়ুনিভার্সিটিতে (১৯৭০-৮৩) – একইসময়ে, একসঙ্গে, দুই বেতনে, দুই স্থানে৫ – প্রফেসর পদে বৃত হওয়ার পর ইয়েলের কর্তৃপক্ষ পল দা মানের প্রকাশিত গ্রন্থমালার একটি তালিকা চেয়ে বিভাগে খোঁজ পাঠালে, বন্ধু জেফ্রি হার্টমান ও অন্য ভক্তদের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। কেননা প্রকাশিত গ্রন্থমালার তালিকা দূরে থাক গুরুর, পল দা মানের, একটিও প্রকাশিত বই ছিল না। ছিল জার্নাল ও সাময়িকপত্রে প্রকাশিত বিচ্ছিন্ন কিছু প্রবন্ধ ও বুক রিভিয়্যু; তা-র সবও আবার ইংরেজি ভাষায় নয়, দেশী৬ ফরাশিতে। অগত্যা, অনুবাদ-ইত্যাদি সমাপনের পর (ফরাশিতে দক্ষ, প্রাক্তন মার্কিন ছাত্রী, গৃহিণী প্যাট্রিশা তো গৃহেই ছিল) বেরিয়ে যায় বই। এই ন’টি লেখা নিয়েই প্রকাশিত হয় ‘ব্লাইন্ডনেস’ বইয়ের প্রথম সংস্করণ (১৯৭১); বার বছর পর, আর পাঁচখানা প্রবন্ধসমেত, প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় সংস্করণ (১৯৮৩)। দ্বিতীয় সংস্করণের প্রকাশ (১৯৮৩) বিরাট ঘটনা, কেননা তখন সাহিত্য-বিভাগে ডিকনস্ট্রাকশনের তথা ‘তত্ত্বে’র উত্থান এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিপত্তির সোনালি মুহূর্ত । দ্বিতীয় সংস্করণই এখানে আলোচ্য, কারণ ‘দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি’ ([১৯৬৯] ১৯৮৩) প্রবন্ধটি প্রথম সংস্করণে ছিল না (যদিও ১৯৬৯-সালে প্রকাশিত সে প্রবন্ধের কথা জানত অনেকে); ঢুকেছে দ্বিতীয় সংস্করণে। সেই জগতবিখ্যাত প্রবন্ধ Ñ পল দা মানের বিশ্বাস (ভূমিকা, ১৯৮৩, পৃ. ১২) Ñ তাঁর চিন্তাবদলের চিহ্নবাহী, ‘টার্ন’-এর, সূচক। তাঁর ভক্তকূলের ধারণা, পল দা মানের সে প্রবন্ধ একখানা দুরধ্যয় সন্দর্ভ মাত্র নয়, দারুণ রহস্যঘেরা দুর্লভ গদ্যামৃত। আর এ দেশের সাহিত্যবিভাগের ¯œাতকোত্তর ক্রিশ্চান ছাত্র-ছাত্রীর কাছে এ হল বহু প্রতীক্ষিত গস্পেল, ‘সুসমাচার’, সিনাইয়ের দশবিধ কঠিন দৈবাজ্ঞার পর জিসাসের ¯িœগ্ধ সারমন অন দি মাউন্ট, প্রাচীন জুইশ সংহিতার স্থলে ‘জেনটাইলে’রউপযোগী নতুন টেস্টামেন্ট। সেই প্রবন্ধ, তাত্ত্বিকদের চেতন-অবচেতন মানসে, যেন ভানুসিংহের বৈষ্ণব ‘গুহা’র আঁধারে ‘রবির কর’, ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ (১২৯০)। কেননা, এই প্রবন্ধের রবিচ্ছটায় সাহিত্য সম্বন্ধে চূড়ান্ত সত্যোপলব্ধির পর সাহিত্য বিষয়ে তাত্ত্বিকদের সেই যে স্বপ্নভঙ্গ, নিদ্রাভঙ্গ, হয়েছে, তার পর থেকে তাঁরা আর স্বপ্নে বা নিদ্রায় ফিরে যেতে পারেন নি। তার আগে পর্যন্ত তাঁরা ‘ব্লাইন্ড’ ছিলেন, বিশ্বাস করতেন সাহিত্য নামক সনাতন ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’-এ; এ প্রবন্ধের পর তাঁরা অলোকপ্রাপ্ত, ‘আঁখিপদ্ম’ মেলে দেখেন ‘আলো ক্রমে আসিতেছে’, ফিরে পান দৃষ্টিশক্তি। দিব্যদৃষ্টি অর্জনের পর কে আবার অন্ধ হতে চায়? স্বপ্নভঙ্গের পর পুনরায় স্বপ্নদর্শন কি সম্ভব? বয়োপ্রাপ্তির পর বয়োসন্ধিতে ফেরা?
পল দা মানের যা কিছু বলার, তার সব কথা যেমন ‘ব্লাইন্ডনেস’ বইতে আছে, তেমনি সে বইয়ের সব কথা এই প্রবন্ধে আছে। কাজেই এ প্রবন্ধের বক্তব্য বুঝলে পল দা মানের সমস্ত লেখার মর্ম, সকল তত্ত্বের সারপদার্থ বোঝা যায়। কৈ মাছ ধরতে হলে তার মাথাটা শক্তভাবে দু’দিকে টিপে ধরা লাগে; সেভাবে ধরলে পর কাঁটার ভয়, লেজের তর্জন-গর্জন তুচ্ছ, কৈ-টা হস্তচ্যুত হবে না কিছুতেই। তত্ত্বের জঙ্গল কন্টক-সমাকীর্ণ, কিন্তু মূল সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়লে কন্টক এড়ানো সহজ। পল দা মানের এই প্রবন্ধ সেই সুড়ঙ্গ।
‘দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি’ ([১৯৬৯] ১৯৮৩) প্রবন্ধ দুই উপশিরোনামে বিভক্ত: প্রথমাংশের নাম ‘অ্যালেগরি৭ অ্যান্ড সিম্বল’ (পৃ. ১৮৭-২০৮) এবং দ্বিতীয়াংশের নাম ‘আয়রনি’ (পৃ. ২০৮-২২৮)। প্রথমাংশের শুরু এভাবে:
উনবিংশ শতাব্দীতে অ-বস্তুনিষ্ঠ (সাবজেকটিস্টিক), স্বাভিমানী সাহিত্যবিচার শুরু হওয়ার পর থেকে অতীতের রেটরিক বা অলংকার-তত্ত্বীয় সাহিত্যের আলোচনা উপেক্ষিত। তবে অলংকারশাস্ত্রের এই অবমূল্যায়ন সাময়িক, আমার ধারণা। অলংকারবিদ্যার পুনরাবির্ভাব বিষয়ে আমি আশাবাদী, কেননা সাম্প্রতিক সময়ের সাহিত্যালোচনার ঝোঁক সেদিকেই, যার লক্ষ্য: উনিশ শতকে বর্জিত, অবহেলিত, অলংকার-মীমাংসার অনুগামী একটা কোনো ভাষা তৈরি করা যা নরমেটিভ এবং ডেসক্রিপটিভ হতে অনিচ্ছুক, এবং যা সাহিত্য নামক অলংকারাবৃত ভাষার মধ্যে ইনটেনশনালিটির প্রশ্ন তুলে আনতে উদগ্রীব (পৃ. ১৮৭-১৮৮)।৮
সাম্প্রতিক সময়ের সাহিত্যালোচনা বিষয়ে তিনি আশাবাদী, এই কথাটায় বিভ্রান্তি হতে পারে ভেবে তিনি বলেন:
আমি সাম্প্রতিক সময়ের সেই ধরনের সাহিত্য-সংক্রান্ত আলোচনার দিকে ইঙ্গিত করছি, যেখানে ‘মাইমেসিস’, ‘মেটাফর’, ‘অ্যালেগরি’, ‘আয়রনি’ প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা যাবে। কিন্তু এ ধরনের আশাব্যঞ্জক আলোচনাও সমস্যামুক্ত নয়, কেননা এসব আলোচনায় ‘শব্দ’কে অর্থ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার অভ্যাস দেখা যায় না। ‘সাহিত্য’ নামক অলংকৃত ভাষার আলোচনা করতে গিয়ে এ সব লেখা অকারণে সেই অলংকৃত ভাষার (‘সাহিত্যে’র) মূল্যায়নে তৎপর হয়ে ওঠে, তার অর্থ-তাৎপর্যের বিচারে প্রবৃত্ত হয়। অর্থাৎ এগুলো আলাদা হতে চাচ্ছে, কিন্তু পারছে না। পারছেনা এ জন্যে যে, এসব সাহিত্য-আলোচকের চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছে উনিশ শতকী রোমান্টিসিজম ও রোমান্টিক যুগের সাহিত্যচিন্তা। আর তাই, ইতিহাসের নিরিখে, উনিশ শতক থেকে জেঁকে-বসা ইনটেনশনাল রেটরিক বা অভিপ্রায়বিম্বিত সাহিত্যভাষা বিষয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা সংশোধনের নিমিত্ত এই প্রবন্ধ। আঠার শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যেদিন থেকে ‘অ্যালেগরি’ শব্দ উঠে গিয়ে জুড়ে বসল ‘সিম্বল’, রূপক শব্দের স্থলে আমদানি হল প্রতীক শব্দের, সে দিন থেকে এই ভুল ধারণার সূত্রপাত (দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি, ব্লাইন্ডনেস অ্যান্ড ইনসাইট, পৃ. ১৮৭-৮৮)।
মূলানুগ তর্জমায় মূলের প-িতি অস্বচ্ছতা পরিহারের সময় কিছু কিছু ইংরেজি শব্দ রেখে দিয়েছি, যাতে সেগুলো মনে রাখতে সুবিধা হয়: রেটরিক, অ্যালেগরি, আয়রনি, ইনটেনশনালিটি। ইতিহাস শব্দ উল্লেখিত হয়েছে বটে, কিন্তু ইতিহাসের কোনো কথা প্রবন্ধে নেই (হাইডেগারীয় লেখকেরা ক্ষণজীবী ক্ষুদ্র মনুষ্যের তুচ্ছ ‘ইতিহাসে’, সাহিত্য সৃজনের মতো ক্ষুদ্র কীর্তিতে, বিশ্বাস করেন না); উনিশ শতকের রোমান্টিক যুগের সাহিত্যচিন্তার কথা তুললেও, এবং সে চিন্তা পরবর্তীকালের সাহিত্য-চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে বলা হলেও, তা কোথাও নির্দিষ্ট করে, নির্দিষ্ট লেখক বা রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে, বলা হয় নি। ইংরেজি রোমান্টিক কাব্যের উইলিয়াম ব্লেইক (১৭৫৭-১৮২৭), কোলরিজ (১৭৭২-১৮৩৪) বা ওয়ার্ডসওয়ার্থের (১৭৭০-১৮৫০) দু’য়েকটি গৌণ মন্তব্য, ওয়ার্ডওয়ার্থের পথের পাঁচালী তথা আত্মকথামূলক ‘প্রেলিউড’ (১৮৫০)-এর সমস্তটা অগ্রাহ্য করে সেই বিশাল, পথের পাঁচালীর মত সুদীর্ঘ, কাব্যের কয়েকটি পংক্তি প্রবন্ধে উদ্ধৃত হয়েছে। উদ্ধৃত হয়েছে অবশ্য একটা গভীর তত্ত্ব (বলা যায় তাঁর প্রবন্ধের একমাত্র তত্ত্ব) বোঝানোর জন্যে। গভীর তত্ত্বটা এই: বিইং-সৃষ্ট, ব্রহ্ম-রচিত, ‘প্রকৃতি’ই কোলরিজ-ওয়ার্ডওয়ার্থের কাব্য লেখার পুঁজি (‘কল্পনা’, ‘প্রতিভা’, ‘প্রতীক’, ‘উৎপ্রেক্ষা’ ইত্যাদির কথা বলে রোমান্টিক কবিরা যে দম্ভ করেছিল, যা একশো বছর পর বঙ্গের রবীন্দ্রনাথকে আলোড়িত করে বঙ্গীয় কাব্য বদলে দেয়, তা দম্ভই, তাদের আসল পুঁজি নয়); সেই ব্রহ্ম-সৃষ্ট ‘প্রকৃতি’র পুঁজিতে, তার নকলে নশ্বর কাব্য লিখে মৃত ওয়ার্ডওয়ার্থের অমর হবার আকাক্সক্ষায় আকাক্সক্ষাই সার, কেননা শব্দের সঙ্গে শব্দ জুড়ে ‘প্রেলিউড’ (১৮৫০) কাব্যে প্রাচীন আলপস পর্বত ও সৃষ্ট প্রাচুর্যের (প্লেনিটুড) বর্ণনা লেখা যায়, আলপস সৃষ্টি করা যায় না। ব্রহ্ম-সৃষ্ট সৃষ্টিপ্রাচুর্যে (প্লেনিটুড) বিশাল আলপসও নশ্বর, তবে ওয়ার্ডসওয়ার্থের মতো মনুষ্যের তুলনায় ‘কম নশ্বর’, টেম্পরাল হয়েও আলপস পর্বত শব্দের চেয়ে, ‘প্রেলিউডে’র চেয়ে, বহুগুণ বেশি স্থায়ী (পৃ. ১৯৭)। ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রকা- প্রেলিউড থেকে প্রবন্ধের দু’তিন জায়গায় কয়েক ছত্র উদ্ধৃত করার পয়েন্ট এই। পল দা মানের কথা হল, কবি শব্দ দিয়ে কাব্য রচে, অনুকরণ করে ব্রহ্ম-রচিত, যুগ যুগ ধরে ‘অক্ষত’ (পৃ. ১৯৭), আলপসের মতো অতি-প্রাচীন পর্বত, প্রকৃতির; অথচ, শব্দযোগে শব্দক্রীড়া সাঙ্গ হবার পর কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থ স্বপ্ন দেখে অমরতার। আলপসের স্থাণু স্থবির শৈলমালা, অভ্রচুম্বিত রাজসিক শিলাস্তম্ভই স্থায়ী নয়, ভঙ্গুর শব্দে-রচিত মাটির ঢেলা অমর হবে? এই হল কাব্য সম্বন্ধে, সাহিত্যের মূল্য, তাৎপর্য, স্থায়িত্ব সম্বন্ধে পল দা মানের ‘বাণী-চিরন্তনী’। এই হল সেই মূলীভূত তত্ত্ব যার (ধর্মীয়) ইঙ্গিত আঁচ করে আমেরিকার দাক্ষিণাত্যের (ধর্মীয় পরিবারের) রক্ষণশীল জে. হিলিস মিলার এবং অন্যেরা একযোগে সাহিত্য ত্যাগ করে তাত্ত্বিক হন। হিলিস মিলার নিজেই বড় এক সাক্ষাতকারে (ক্রিটিসিজম ২৪: ২, [১৯৭৯] ১৯৮২, পৃ. ৯৯-১২৫) রবার্ট মনিহ্যানকে বলেছেন যে, মূলত বাইবেল, ধর্ম, খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদিতে প্রবল উৎসাহ হেতু Ñ এবং কলিযুগে ধর্মতত্ত্বের বিকল্প নির্ভর হিশেবে Ñ তিনি ‘সাহিত্য-সমালোচকের’ পরিচয় প্রত্যাখ্যান করে ঢুকেছেন তত্ত্বচর্চার রহস্যে, তাত্ত্বিক (ধার্মিক) হয়েছেন। ‘অনুকরণের অনুকরণ’ করে কবি Ñ এই প্রাচীন তত্ত্ব যে পল দা মানের নয়, দার্শনিক প্লেটোর, তা আমরা সকলে ভালভাবে জানি। সে কথাটা যেহেতু (রিপাবলিক না পড়েও, দর্শনের ছাত্র না হয়েও) সবারই জানা, সেকারণে তাত্ত্বিকদের সাহিত্য-বিরোধিতার মূল, তার প্রাচীনতম সূত্রও বোঝা সম্ভব সবার পক্ষেই । দার্শনিক প্লেটোর কাছে দর্শনই ধ্যান, প্রজ্ঞান, অনুধ্যান, ধর্ম; সেজন্যেই তিনি সাহিত্যের বিরোধী, কারণ সাহিত্য তাঁর মতে সত্য নয়, আসল কিছু নয়, উপরন্তু বিভ্রান্তিকর; তা সত্যের ধ্যান ও দার্শনিক সত্য-সন্ধানের অন্তরায়। শিবনারায়ণ-কথিত ‘কবির নির্বাসন’ নয়, সাহিত্যের নির্বাসন; দর্শনের রাজা প্লেটো বলেছেন সাহিত্য-বর্জনের কথা। সরাসরি, সুস্পষ্টভাবে। সে কথাটা বুঝলে বোঝা যাবে, পল দা মানের তত্ত্বের বা দর্শনগন্ধী তাত্ত্বিকতার সঙ্গে সাহিত্যের দা-কুমড়ার সম্পর্ক কেন, এবং দর্শনের ইতিহাসে তা কতখানি প্রাচীন। দর্শন বা তত্ত্বের সঙ্গে সাহিত্যের অহি-নকুল সম্বন্ধ দুই হাজার পাঁচ শত বৎসরের পুরাতন বিষয়, প্লেটোর সাহিত্যবিরোধী প্রোগ্রাম ‘রিপাবলিকে’ই তার সূচনা। একালের তাত্ত্বিকেরা, বলা বাহুল্য, নিজেদেরকে (ছোট সাইজের) দার্শনিকই মনে করেন। প্লেটো বলেছিলেন ফিলসফার রাজা হবে, রাজ্য চালাবে, এবং তাতে সাহিত্য থাকবে না; আলোকপ্রাপ্ত তাত্ত্বিকেরা, প্লেটোর ‘গুহার আঁধার’ থেকে উঠে, বললেন তাঁরা সাহিত্য-বিভাগ চালাবেন, এবং তাতে সাহিত্য থাকবে না।
২
‘আঠার শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যেদিন থেকে অ্যালেগরি শব্দ উঠে গিয়ে জুড়ে বসল সিম্বল’ (পৃ. ১৮৮): পল দা মানের এই রহস্যময়, ইতিহাসের সঙ্গে সংশ্রবহীন, উক্তির ইঙ্গিত সাহিত্যের ঐতিহাসিকের পক্ষেও ধরা সহজ নয়। কাজেই, ‘যেদিন থেকে’ কথাটার মানে ধরতে হবে ‘রুসোর পর থেকে’, বা ‘রুসো-পরবর্তী ফরাশি বিপ্লবোত্তর রোমান্টিসিজমের পর থেকে’। আরো নির্দিষ্ট করে বুঝতে গেলে ‘যেদিন থেকে’র অর্থ হবে: কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থের রোমান্টিক কাব্যসংকলন ‘লিরিকাল ব্যালার্ডস’ ([১৭৯৮] ১৮০০, ১৮০২) এবং তার পরে কোলরিজের কল্পনা বিষয়ে, প্রতিভা বিষয়ে, কাব্য বিষয়ে অনেক প্রভাবশালী ভাষণ, রচনা, ও আলোচনা প্রকাশের ‘পর থেকে’। সুকুমার সেন (বা ইয়েলের রেনে ওয়েলেক) হলে রহস্য না করে সোজাসুজি তাই লিখতেন।
পল দা মানের এ প্রবন্ধে কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থের আসল কোনো কথা৯ – যা, পল দা মানের মতেই, ইংরেজি রোমান্টিক কাব্য ও তৎপরবর্তী তাবৎ সাহিত্যচিন্তার ভিত্তি (অর্থাৎ ১৮০০ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত, এলিয়ট-পাউন্ড সমেত) Ñ আলোচিত হয় নি। অনুল্লেখের কারণ অনেক, যেমন (ক) ওসব স্বচ্ছ সুন্দর সুখপাঠ্য বাক্য উদ্ধৃত করলে, প্রবন্ধের মধ্যে তাত্ত্বিকতার কুহক রক্ষা করা সম্ভব হয় না (‘ডিসকাশন’ না বলে, ‘ডিসকার্সিভ প্রাকটিস’ বললে যে গাম্ভীর্যটা আসে, সেরকম; লেখক না বলে ‘সাবজেক্ট’, বই না বলে ‘টেকস্ট’, শব্দ না বলে ‘সাইন’, ভাষা না বলে রেটরিক, কলোনিয়ালিজম না বলে দি কলোনিয়াল প্রজেক্ট, প্রবলেম না বলে প্রবলেমেটিক, টাইম না বলে টেম্পরালিটি, ইনটেনশন না বলে ইনটেনশনালিটি, সঙ্গতিহীন বা কনট্রাডিক্টরি না বলে আন্রিডেবল) (খ) যে সব বাঘা সমালোচককে বাতিল এবং সরল ঘোষণা করে তাদের উদ্দেশ্যে, তাদেরই পড়ার জন্যে, প্রবন্ধটি রচিত Ñ যেমন রেনে ওয়েলেক (১৯০৩-১৯৯৫), আর্ল ওয়াসারম্যান (১৯১৩-১৯৭৩), ওয়াল্টার জ্যাকসন বেইট (১৯১৮-১৯৯৯), বিশেষত মাইক এইব্রামস (১৯১২-২০১৫) – তাদের কাছে কোলরিজ-ওয়ার্ডওয়ার্থের ওসব কথা ‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে’র মত পরিচিত; (গ) সকল সাহিত্যমনস্ক ‘ক্রিটিকে’র সাহিত্যচিন্তা যেহেতু, পল দা মানের মতে, কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থের সাহিত্যচিন্তার (যা তাঁর মতে চিন্তা নয়, দম্ভোক্তি) সম্প্রসারণ, সেজন্যে কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থের চিন্তার অসারত্ব ধরিয়ে দিলেই, অন্য সবার – অর্থাৎ সাহিত্যমনস্ক সকল সমালোচকের – চিন্তার অসারত্ব সম্বন্ধে আর কিছু বলা লাগে না (যদিও তাদের অসারত্ব সম্বন্ধে কটাক্ষও যথেষ্ট আছে, যেমন এইবরামস, ওয়াসারম্যান, উইমস্যাট; রেনে ওয়েলেক ছাড়া, একটা বিশেষ কারণে)। কোলরিজ-ওয়ার্ডওয়ার্থের চিন্তা যেহেতু ভুল, তাদের অনুরাগী, অনুসারীদের চিন্তাও ভুল। কোলরিজ-ওয়ার্ডওয়ার্থের অনুসারীরা, পল দা মানের মতে, একশো একাত্তর বছর যাবৎ সেই প্রথম ভুলের পুনরাবৃত্তি করে এসেছেন। সেজন্যে এই শুদ্ধ ও নির্ভুল চিন্তার প্রবন্ধখানিতে, ১৭১-বছর-ধরে সাহিত্য বিষয়ে প্রচলিত ভুল কথাগুলোর সামান্যই উদ্ধৃত। তবে জার্মান বা ফরাশি ভাষার উদ্ধৃতি হলে ভিন্ন কথা; সেগুলো দীর্ঘ হলেই ভাল, দীর্ঘই দিয়েছেন (যেমন শ্লেগেলের জার্মান রচনা থেকে উদ্ধৃতি, পৃ. ২২১-২২)। বিলাতী বালকদেরকে সংস্কৃত শ্লোক ও আধা-সংস্কৃত ‘প্রবোধচন্দ্রিকা’ (১৮৩৩) দিয়ে ‘মার্শম্যানের জনসন’ হিশেবে খ্যাত প-িত মৃত্যুঞ্জয়ের (১৭৬২-১৮১৯) ভয় দেখানোর সঙ্গে দীর্ঘ জার্মান উদ্ধৃতির একটা সম্বন্ধ নিশ্চয়ই আছে।
‘দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি’তে ইংরেজি রচনা থেকে যেসব কোটেশন আছে তা মূলত নাকচ করার প্রয়োজনে উদ্ধৃত। যেমন কোলরিজের অপ্রকাশিত নোটবুক (যা প্রকাশের জন্যে রচিত নয়, যার অনেক বাক্য অসম্পূর্ণ; কোলরিজের মৃত্যুর পর প্রকাশিত) থেকে একটি উদ্ধৃতি (পৃ. ২৪৯)। সেখানে কোলরিজ (জার্মানি থেকে দর্শন পড়ে আসা কোলরিজ) দুটো ভিন্ন বস্তুর এক, অভিন্ন হয়ে ওঠার উদাহরণ দিতে গিয়ে গৃহপালিত পশু, বা প্রিয় কোনো বন্ধুর সঙ্গে, মনুষ্যের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠার কথা বলেন: এ ধরনের বন্ধনের পর প্রিয় বন্ধু (তা যদি পশুও হয়) নিজের সত্তার অংশ হয়ে ওঠে, আংশিকভাবে হলেও। এ কথার পর পরই কোলরিজ বলেন যে, ‘তবে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে আমাদের সম্বন্ধ সর্বতোভাবে একাত্মক’, অভেদাত্মক, কারণ তিনিই হলেন ‘দি ফ্রেন্ড’ (কোলরিজ, অ্যানিমা পোয়েটাই বা ‘কবির আত্মা’, হু’টন মিফলিন, নিউ ইয়র্ক, ১৮৯৫, পৃ. ২৪৯)। বিইং নিয়ে এই বেয়াদবি, সৃষ্টিকর্তাকে ‘ফ্রেন্ড’ বলার মত দু:সাহসিক অপরাধ, হাইডেগার-শিষ্য পল দা মানের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়; নয় বলেই এই উদ্ধৃতি। কোলরিজের ডায়েরির এই উক্তিকে ‘অপরাধ’ হিশেবে চিহ্নিত করে খ্রিস্টান পল দা মান বলেন যে, অবশ্য কোলরিজের বন্ধু ‘ওয়ার্ডসওয়ার্থ এ ধরনের অপরাধে অপরাধী নয়’ (দি রেটরিক অফ…পৃ. ১৯৮)। এ সব কথা পড়ার সময় কারো মনেই পড়বেনা যে পল দা মান একজন কবির কথা বলছেন, তা-ও যে সে কবি নয়, কোলরিজের মতো কবি Ñ যে কবির হস্তে রচিত হয়েছে অ্যানশানট্ ম্যারিনার, কুবলা খান, ক্রিস্টাবেল, ফ্রস্ট অ্যাট মিডনাইট-এর মত অমর, অবিনাশী কবিতা। নাকচ করার জন্যে উদ্ধৃত বলে, কোলরিজের নোটবুক-এর পরের লাইনটি তিনি উল্লেখই করেন নি, যেখানে কোলরিজ বলেছিলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা হল প্রেম, অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তাই একমাত্র কর্তা, তিনি বস্তু নন, কিন্তু তিনি মনুষ্যের প্রয়োজনে তাঁর কর্তাসত্তা থেকে নেমে এসে মানুষী অনুরাগ, আকুতির আরদ্ধ বস্তুতে পরিণত হতে উদগ্রীব, যেমন ইউকারিস্ট কৃত্যানুষ্ঠানে ভক্ত বিশ্বাসীর কাছে তাঁর সত্য উপস্থিতি’ (কোলরিজ, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৪৯)। কোলরিজের এই কথা কোন্ খ্রিস্টান ‘অপরাধ’ জ্ঞান করবে, তা কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। পুরো খ্রিস্ট ধর্মের মূল কথাটাই তো এই Ñ সৃষ্টিকর্তা তাঁর সৃষ্ট মনুষ্যের প্রেম ও মঙ্গলের নিমিত্ত জিসাসের রূপ ধারণ করে একদা ধরাতলে অবতরণ করেছিলেন। সেই অবতরণ, খ্রিস্টান দার্শনিক হেগেলের (১৭৭০-১৮৩১) বিবেচনায়, মনুষ্যের ইতিহাসে সৃষ্টিকর্তার সরাসরি হস্তক্ষেপ হিশেবে বিবেচ্য; সেই হস্তক্ষেপের পর থেকে, ধর্মশাস্ত্রের ছাত্র হেগেলের ইতিহাসতত্ত্ব মোতাবেক, ধরাবক্ষে প্রকৃত ইতিহাসের সূচনা। ইতিহাস, হেগেলের কাছে, সৃষ্টিকর্তার নিরঙ্কুশ ইচ্ছার প্রকাশ (লীলা নয়); সেই ইচ্ছাটা নানা যুগে কত বিচিত্ররূপে ক্রম-অভিব্যক্ত, তার আলোচনাই হেগেলের দর্শন। সে দর্শনের সঙ্গে খ্রিস্ট্রীয় ধর্মশাস্ত্রের, বাইবেলের, সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের যে কোনো সম্বন্ধ নেই Ñ হাইডেগারের হিস্ট্রি শব্দের সঙ্গে যেমন হিস্ট্রির কোনো সম্বন্ধ নেই – তা নিশ্চিত। ‘কিংগডম অফ গড অত্যাসন্ন’, ক্রিশ্চান বাইবেলের এটাই কথা; হেগেল বললেন, মনুষ্যের ইতিহাস ওদিকেই, কিংডমের দিকেই, যাচ্ছে; একটু সময় নিলেও, যাচ্ছে। রোমান্টিক কবি শেলী, যাঁর ওপর পল দা মান প্রচ- খাপ্পা, খ্রিস্টান ছিলেন না (পল দা মানের ‘শেলী ডিসফিগারড্’ প্রবন্ধ সেই ক্ষোভের প্রকাশ১০) হেগেল বা হাইডেগারের মত; কিন্তু কোলরিজ যে ওয়ার্ডসওয়ার্থের তুলনায় অনেক বেশি খ্রিস্টান ছিলেন, তা কোলরিজের সমস্ত লেখাতে, এমন কি এই নোটবুকেরও প্রতি পৃষ্ঠায়, সুস্পষ্ট। খ্রিস্টান তাাত্ত্বিক পল দা মান ছাড়া, খ্রিস্টান কোলরিজের খাঁটি ধর্মীয় বিশ্বাস বিষয়ে, আর কারো সংশয় ঘটে নি।
পল দা মানের এই ‘রেটরিক অফ টেম্পরালিটি’ প্রবন্ধে (পৃ. ১৮৭-২২৮) সাহিত্য বিষয়ে কোনো আলোচনা যদি থাকে (এবং তা-ও দূরবর্তী অর্থে আলোচনা), তা হলো জাঁ-জাক রুসোর (১৭১২-১৭৭৮) রোমান্সমূলক, অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে চিত্তজয়ী, পত্রোপন্যাস ‘জুলি, অর দি নিউ এলোয়িজ’ (১৭৬১), এবং আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ বা দৌলতউজির বাহরাম খানের ‘লাইলী-মজনু’র মতো, ত্রয়োদশ শতকে রচিত ইউরোপের মধ্যযুগীয় রূপক রোমান্স-উপাখ্যান ‘রোমান দে লা রোজ’ (১২২৫-৩০)। ইউরোপের অন্যান্য রোমান্সের মতো, ‘পদ্মাবতী’ ‘লাইলী-মজনু’র মতো, কাব্যে রচিত এই জনপ্রিয় উপাখ্যান (‘রোমান দে লা রোজ’ ) ইংরেজি পাঠকের কাছে ‘দি রোমান্স অফ দি রোজ’ নামে পরিচিত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে রুসোর উপন্যাস ‘জুলি’র (১৭৬১) বিস্ময়কর জনপ্রিয়তা, মধ্যযুগের সেই রোমান্স অফ দি রোজ (১২২৫-৩০)-এর জনপ্রিয়তার সঙ্গে তুলনীয়। ত্রয়োদশ শতকের পর থেকে অন্তত তিন শতাব্দী ধরে অক্ষুণœ ছিল তার সমাদর (বই বলতে তখন বোঝাত বাইবেল, আর আনন্দ বলতে আর্থারীয় অভিযান-বীরত্ব দরবারি প্রণয়মূলক কাব্যকাহিনী, বা ‘দে লা রোজে’র মতো, ২১,৭৮০ পংক্তি-সম্বলিত১১, রোমান্স-কাব্য)। রুসোর জুলি মধ্যযুগীয় রোমান্সের, দে লা রোজ-এর, পাঁচশো বছর পরে প্রকাশিত হলেও, পল দা মানের বিশ্বাস উপন্যাস লেখার সময় রুসো ওই রোমান্স দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। সে জন্যে তিনি খুশি। তাঁর কথা এই: রুসোর ‘জুলি’ (১৭৬১) – যা আধুনিক কালের (অর্থাৎ ফরাশি বিপ্লবের মাত্র ২৮ বছর পূর্বে প্রকাশিত) রচনা – উপন্যাসের একটি পরিচ্ছেদে হ্রদতীরবর্তী একটি মনোহর বাগানের বর্ণনা মধ্যযুগের ‘রোমান্স অফ দি রোজ’ উপাখ্যান থেকে গৃহীত। অর্থাৎ রুসোর ওই বাগান কোনো প্রকৃত বাগান নয়, তার বর্ণনার ভিত্তিও রুসোর বাস্তব অভিজ্ঞতা নয় – তার উৎস মধ্যযুগের ‘রোমান্স অফ দি রোজ’, সেই ক্রিশ্চান রোমান্সের প্রথম পরিচ্ছেদে বর্ণিত প্রাচীরঘেরা রহস্যাবৃত রূপকী বাগানটাই তার সমস্ত রূপকী চিহ্নসমেত ঢুকে পড়েছে ফরাশি বিপ্লব পূর্ববর্তী সেইন্ট প্রু-র প্রেমিকা রোমান্টিক জুলির বাগানে। আশ্চর্যজনক ঘটনা, বিস্ময়কর আবিষ্কার (সাহিত্যে এ ধরনের প্রভাব আর কেউ আবিষ্কার করতে পেরেছেন কি, এরকম সাদৃশ্য?); শুধু আবিষ্কার নয়, মহাশূন্যের পূর্বানুমিত অভিকর্ষ-তরঙ্গ যেমন বর্তমানে প্রমাণিত, সেরকম প্রমাণযোগ্য। তবে, পল দা মানের মতে, রোমান্সের বাগান রোমান্টিক উপন্যাসে ঢুকে পড়াটা ভাল; কারণ সমালোচকদের অজান্তে (তাত্ত্বিকের অজান্তে নয়) রূপকী বাগান বাস্তব বাগানে উন্নীত হওয়ার এই ঘটনায় তাঁর প্রবন্ধের তত্ত্ব সিদ্ধ হয়। সেই তত্ত্ব এই: ‘বস্তু’র সঙ্গে ‘বর্ণনা’র, ‘ভাষা’র সঙ্গে ‘বাস্তবে’র, ‘অভিজ্ঞতা’র সঙ্গে ‘অ্যালেগরি’র কোনো সম্বন্ধ নেই। বস্তু এক, তার বিবরণ আরেক; বাস্তব এক জিনিশ, ভাষা আরেক জিনিশ। ভাষা কক্ষনো বস্তু, বাস্তব, অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না (মানুষ চায় প্রকাশিত হোক, চেষ্টা করে, কিন্তু ভাষা চিরকাল অবাধ্য)। কাজেই, কাব্যের ভাষাও রতি, শোক, কাম, ক্রোধ, ভয়, বিস্ময়, জুগুপ্সা রি-প্রেজেন্ট করতে অক্ষম; যাকে কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থের অনুরাগী ক্রিটিকেরা প্রকৃত বস্তু, প্রকৃত ভাব, প্রকৃত বাস্তব, প্রকৃত অনুভূতি ধরে নিয়েছিলেন (তাঁর এ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হবার আগে পর্যন্ত), ব্যাজস্তুতিকে ভেবেছেন বাস্তব, তা রচিত বস্তু, রচিত ভাব, রচিত বাস্তব, রচিত ব্যাকুলতা। ‘ভাষা’র সঙ্গে প্রকৃত ‘বাস্তবে’র, প্রকৃত বস্তুর, প্রকৃত অনুভূতির কোনো সম্বন্ধ আছে মনে করা ভুল; কত বড় ভুল, তার প্রমাণ রুসোর উপন্যাসে জুলির বাগান – কারণ জুলির বাগান যেমন প্রকৃত বাগান নয়, তেমনি রোমান্সের যে বাগান রুসো-বণিত জুলির বাগানের মূলসূত্র, সেই বাগানও কোথাও কখনও ছিল না। মধ্যযুগীয় বাগান স্বপ্নদৃষ্ট, অবাস্তব; স্বপ্নের কথা দিয়েই গিয়োম দে’লোরিসের ‘রোমান দে লা রোজে’র কাহিনীর আরম্ভ। পল দা মান লেখেন:
জুলির বাগান ও দে লা রোজ রোমান্সের প্রথম ভাগে বর্ণিত বাগানের সাদৃশ্য সুস্পষ্ট। জুলির বাগানের বর্ণনায় এমন উপাদান বিশেষ নেই যা মধ্যযুগের ওই টেকস্ট থেকে গৃহীত হয় নি: লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন সেই একই চারদিকে আবদ্ধ নির্জন স্থান, যার ভেতরে প্রবেশের চাবি কারো নেই, দু’একজন ভাগ্যবান ছাড়া; ‘রোমান দে লা রোজে’র মত ‘রুসো’র জুলিতেও সেই একই প্রাকৃতিক বিষয়পুঞ্জ, বৃক্ষ ফুল সুরভিত তরুলতা পক্ষীনিচয়। সবচেয়ে লক্ষ করার বিষয় ‘জলে’র ওপর গুরুত্বারোপ (রোমান্সেও, ‘জুলি’তেও) – এই জল, ঝরনা, পুষ্করিণী কিন্তু প্রাকৃতিক নয়, মনুষ্যের বানানো। কাজেই, রুসোর বাগান তাঁর চোখে-দেখা বাগান নয়, তাঁর ব্যক্তিগত ইতা দ্য’ম বা মনের ভাবের প্রকাশও নয়, বরং মধ্যযুগীয় রোমান্সের পুরাতন প্রতিষ্ঠিত থিম, তার আক্ষরিক প্রতিরূপ, ‘রোমান দে লা রোজে’র গুলবাগ, গুলবাহারই রুসোর উৎস (‘দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি’, ব্লাইন্ডনেস অ্যান্ড ইনসাইট, পল দা মান পূর্বোক্ত, পৃ. ২০৩)।
মধ্যযুগের রোমান্স উৎস হওয়াটা ভাল, কারণ তাতে ‘ভাষা’ এবং ‘বাস্তবে’র পৃথকত্ব বিষয়ে গোমরাহি ঘটে না, ‘ভাষা’ ও ‘বাস্তবে’র পৃথকত্ব অক্ষুণœ থাকে:
শাতব্রিঁয়ার পর থেকে ফরাশি রোমান্টিক লেখকেরা ভ্রান্তিদোষে আক্রান্ত, কিন্তু রুসোর রোমান্স-নির্ভর জুলি উপন্যাসে সে দোষ নেই। রুসোর বর্ণনা আলংকারিক, মধ্যযুগীয় রোমান্সের মত, সেজন্যে তা ভাষা ও বাস্তবেরর পৃথকত্ব বিষয়ে সজাগ। সেই উত্তম আলংকারিক ভাষার মধ্যে পরবর্তীকালের মতিচ্ছন্ন রোমান্টিকেরা আঁখিজল, মনের মাধুরী ইত্যাদি মেশানো শুরু করেন এবং ভাষাতে তা মিশেছে বলে দাবি করেন। রুসোর ভাষায় সে দোষ কখনো ছিল না, তা শাতব্রিঁয়াদের মত মেটাফরিকাল নয়, ওদের ভাষার মতো [কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থ-রবীন্দ্রনাথের মতো] তা বোধ, অনুভূতি ইত্যাদির বিজ্ঞাপক হতে চায় নি; তা বাহ্যজগত ও প্রকৃতির সঙ্গে মনুষ্যের মন বা ভাবের মিতালি খুঁজে বেড়ায় না। রুসোর ভাষা আলংকারিক।…রোমান্সের ইন্দ্রিয়জ ঝোঁক বর্জন করেছেন রুসো; রোমান্সের সঙ্গে রুসোর ‘জুলি’র সাদৃশ্য ভাষা সংক্রান্ত ধারণার ঐক্যে। সে ধারণা তাঁর সন্ততিদের, পরবর্তী রোমান্টিকদের, ধারণার বিপরীত। কারণ রুসো ভাষা এবং বাস্তবের স্বতন্ত্রতা, পৃথকত্বে বিশ্বাসী (‘দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি’, পূর্বোক্ত, পৃ. ২০৩)।
রুসোর উপন্যাসে মধ্যযুগের উপস্থিতি আবিষ্কার করে পল দা মান রোমাঞ্চিত; রুসোর হাতে বাইবেল-স্পৃষ্ট মধ্যযুগের আলংকারিক রূপকী রচনার ধারা পুনরাবিষ্কৃত হওয়ায় তিনি আশ্বস্ত (পৃ. ২০৫)। রূপকী ভাষার গুণগান করে পল দা মান জুলি উপন্যাসের রূপকী মধ্যযুগ, না অগাস্টিন-পরবর্তী ইউরোপের, পিয়ের আবেলারের, আসল মধ্যযুগে ফিরতে বলেন তা প্রবন্ধে স্পষ্টভাবে বলা নেই, কিন্তু প্রতীকবাদী রোমান্টিক ও রোমান্টিসিজম-বাহিত পরবর্তী সমস্ত আধুনিক সাহিত্যকে বিভ্রান্ত, নষ্ট, ব্যর্থ, বাতিল ঘোষণা করার সময় তাঁর মধ্যে যে জোশ দেখি এই প্রবন্ধে (এবং অন্যত্র), তাতে বোঝা যায় তাঁর পক্ষপাত শুধু মধ্যযুগের সাহিত্য, রূপক ইত্যাদিতে নয়, একেবারে আসল মধ্যযুগেই। সেটা অবশ্য স্বাভাবিক, কারণ তাঁর তত্ত্বের খুঁটি মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান ধর্ম ও ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে বাঁধা। মধ্যযুগের খ্রিস্টান ধর্মবেত্তা পিয়ের আবেলারের১২ সঙ্গে পল দা মানের যতটা মেলে (রুসোর বাগানের মত), আর কারো সঙ্গে ততটা মেলে না। রূপকী ভাষায় বিবৃত জুলি-র বাগান টেক্সচ্যুয়াল বাগান, ন্যাচারাল বাগান নয় – এই তথ্যটিতে বারংবার জোর দেন পল দা মান। তিনি দেখাতে চান যে, রোমান্টিসিজমের পিতামহ জাঁ-জাক রুসোর যদি ‘রূপকী ভাষাতে’ই পোষায়, এবং রুসোর মত মহীরূহ যদি রূপকী ভাষাকে ‘সিম্বলিক ভাষা’, ‘মেটাফরিকাল ভাষা’, ইত্যাদি বলে ভড়ং না করেন, তাহলে রুসো-পরবর্তী তস্য অর্বাচীনেরা, কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থের মত ছোট লেখকেরা, প্রকৃতির ডেসক্রিপশন লিখে তাকে সিম্বলিক বলে বাহাদুরি ফলায় কেন? এবং ওদের ওই সিম্বলিক শব্দের বিজ্ঞাপন দেখে সাহিত্য-সমালোচকেরা Ñ বেইট, এইব্রামস, ওয়াসারম্যান, ব্লুম, ওয়েলেক – ‘তাইতো’, ‘তাইতো’ বলে কবিদের সেই প্রচারণাকে প্রতিষ্ঠা দেন কোন্ যুক্তিতে? রুসোই তো রোমান্টিসিজম; রোমান্টিসিজমের সবই কি রুসোতে নেই? (‘অভাগীর স্বর্গই বাংলা সাহিত্য’, কমলকুমার); রুসোর ‘কনফেশনস’-এ কি ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘প্রেলিউড’ ছিল না? মহর্ষি বেদব্যাস-রচিত মহাভারত প্রাচীন ভারতের সংস্কৃত মহাকাব্য: ‘মেটে ফিরিঙ্গীর’ ইংলিশ মহাভারত দেখে ‘মনোজ্ঞ মহাভারত’ (‘লেখা বিষয়ক’, কমলকুমার, পৃ. ২৭৮) লেখার খায়েশ কেন ‘রিফর্মড হিন্দু’র, বুদ্ধদেব বসুর?
৩
পল দা মান রুসো-পরবর্তী (অর্থাৎ ফরাশি বিপ্লবোত্তর) আধুনিক সাহিত্যের বিরোধী, কিছু ব্যতিক্রম বাদে–যেমন বোদলেয়ার, মালার্মে, বা হাইডেগার-ভক্ত, ভোল-পাল্টানো ফ্যাশিস্ট, মরিস ব্লাঁশ (১৯০৭-২০০৩)। মরিস ব্লাঁশের ভাষা-বিষয়ক মালার্মে-কেন্দ্রিক চিন্তা পল দা মানকে প্রভাবিত করে, ব্লাইন্ডনেস বইতে ব্লাশর ‘মালার্মীয় নৈব্যক্তিকতা’ নিয়ে তাঁর একটি লেখা আছে (পৃ. ৬০-৭৮)। ব্লাঁশর মত তাঁরও আধুনিক শব্দটা অপছন্দ, ব্যবহারও করেন না, শুধু বলেন ‘রোমান্টিক ও পোস্ট-রোমান্টিক’। এই দুই শব্দের মধ্যে কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থ-শেলী আছে; বোদলেয়ার, মালার্মে, ইয়েটস-জয়েস-এলিয়টও আছে। কারণ এরা সবাই রুসোর পরে আসা ফরাশি বিপ্লবোত্তর কবি: সেই স্কিম অনুযায়ী কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থ যদি রোমান্টিক হয়, বোদলেয়ার-মালার্মে এবং ইয়েটস-এলিয়টকে ধরতে হবে পোস্ট-রোমান্টিক। আধুনিক শব্দ না-ব্যবহারের কারণ সোজা: রুসো-পরবর্তী সাহিত্যই, তাঁর মতে, আধুনিক সাহিত্য এবং তার সূচনা রোমান্টিক কাব্য দিয়ে, কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থ দিয়ে। ‘দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি’ প্রবন্ধে কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থ সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর একারণেই, কারণ তাদের রোমান্টিক কাব্যই সর্বপ্রথম বিপ্লব আনে সাহিত্যে (অর্থাৎ মধ্যযুগ, রূপক, ধর্ম ইত্যাদি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তখন থেকেই সাহিত্যে প্রধান হয়ে ওঠে ‘আমি’)। সাহিত্যের সে বিপ্লবকে অন্যেরা ধরে বোদলেয়ারের মডার্নিজম থেকে (‘ক্লেদজ কুসুম’, ১৮৫৭), কিন্তু পল দা মান ধরেন কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থের রোমান্টিসিজম থেকে (‘লিরিকাল ব্যালার্ডস’, ১৭৯৮)। যেহেতু কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থ ‘মডার্নিজমে’র সূচনা করে রোমান্টিসিজম দিয়ে, সেজন্যে এ দু’জন রোমান্টিককে নস্যাৎ করে দিলে পোস্ট-রোমান্টিকেরাও নস্যাৎ হয়ে যায়। এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ব্লাইন্ডনেস অ্যা- রেটরিক (১৯৮৩) বইয়ের দীর্ঘতম প্রবন্ধ ‘দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি’ (পৃ. ১৮৭-২২৭) রচিত হয়।
কন্টকাবৃত হলেও ‘দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি’ প্রবন্ধের সারপদার্থ এই: ‘রুসো-পরবর্তী আত্মপ্রচারক ছোট লেখকেরা যাকে প্রতীক, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প ইত্যাদি নাম দিয়ে নব্য ভাষায় নতুন কাব্য বলে চালিয়েছে, তা নব্য ভাষা নয়, রুসোর ‘রূপকী ভাষা’ই; তা-ও নয়, তার অনেক নিচে তার স্থান: নব্য ভাষার গর্জনটাই শুধু অতিরিক্ত। রুসো-পরবর্তী রোমান্টিক কবিদের এই গর্জন, বিজ্ঞাপনকে সমালোচকেরা ধরে নিয়েছেন মৌলিক উদ্ভাবন বলে এবং অন্যদের বিভ্রান্ত করে এসেছেন দু’শো বছর যাবত (১৮০০-১৯৭১) । কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থের কপট আত্মপ্রশস্তিকে তাঁরা মনে করেছেন সত্য-ভাষণ, তাদের কবিতাকে ভেবেছেন মৌলিক কল্পনার চিরস্থায়ী নমুনা। ভুল। কাব্যের ভাষায় ‘অস্ফুট চিত্তকমল’ বা ‘আঁখিজলে’র মতো জলীয় বাস্প কোনোদিন মেশেনি, কখনো মেশার সম্ভাবনা নেই – এটা রুসো জানতেন বলেই তাঁর ভাষা রূপকী, অ্যালেগরিকাল। ‘আঁখিজল’ যে মিশবে না তা ওয়ার্ডসওয়ার্থও জানতো, কিন্তু কপট বলে স্বীকার করেনি, উপরন্তু সে ব্যর্থতা (আত্মপ্রকাশের অক্ষমতা) ঢাকতে ধুয়া তোলে অন্য কিছুর; বলতে থাকে উৎপ্রেক্ষা, প্রতীক, চিত্রকল্প ইত্যাদি উদ্ভাবনের কথা। আত্ম-প্রকাশে নিজেদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার না করে, অক্ষমতার কথা না বলে, উল্টো প্রচার করে নব নব উদ্ভাবন, ইমাজিনেশন, কল্পনা-প্রতিভার কথা। আত্মপ্রচার ছাড়া, এ আর কি? রোমান্টিকতার জনক রুসোর রচনা থেকেই ইংরেজি রোমান্টিসিজম উদ্ভূত১৩, কিন্তু ইংরেজ রোমান্টিক করিবা তাদের কাব্যকে রূপকী বা অ্যালেগরিকাল বলল না, বলল সিম্বলিক। সৃষ্ট প্রকৃতির (আলপস পর্বতের) বিবরণ লিখল রোমান্টিকেরা, কিন্তু তাকে বিবরণ বলল না, বলল ‘ইমাজিনেশন’; বিশ্বকর্মার সৃষ্ট-জগতের সৃষ্টির অনুকরণ করে সেই অনুকরণকে রটাল ক্রিয়েশন বলে। আর সাহিত্যের আলোচকেরা, ওয়ার্ডসওয়ার্থ-বন্ধু হাযলিটের১৪ অনুসরণে, কবিদের সেই শেখানো বুলি আওড়ে গেলেন বয়:প্রাপ্ত শিশুর মত, ১৮০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত। সাহিত্য সমালোচকেরা বয়:প্রাপ্ত শিশু; তাদের খেলাঘরের পুরনো পুতুলটা ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর’ ঝোপে নিক্ষেপ না করা পর্যন্ত তাঁদের প্রলম্বিত শৈশবের অবসান হবে না। সেই পুতুলের নাম সাহিত্য’।
‘দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি’র সরল খোতবাটা তুলে দিলাম, বাক্যের জঙ্গল পরিষ্কার করে; ভাষ্যমঞ্জরীতে নেই। পল দা মানের ওপর সেরকম বই, প্রবন্ধের সংখ্যা গণনা করাও অসম্ভব; তার কিছু (শতাধিক) আমি ঘেঁটেছি, কিন্তু সে সব পড়লে মনে হয় যেন ডিকনস্ট্রাকশনের দলীয় শলা-পরামর্শে তৈরি একজন ব্যক্তির রচনা; যেন বাসস-এর পাঠানো প্রেসবিজ্ঞপ্তি। খোতবা ছাড়া, ‘ব্লাইন্ডনেসে’র আসল বক্তব্য ছাড়া, আর সবই আছে ভাষ্যমঞ্জরীতে। একে জঙ্গল তায় কন্টক (কমলকুমারের ‘যে এবং’, ‘যে এবং’-এর মত) – ভাষ্যকার নিরূপায়, ভীত তো বটেই। সে সুযোগে কৈ মাছ, কাঁটার ভয় লেজের ভেলকি দেখিয়ে – ছেঁড়া, একরোখা চটির মতো, ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে – পুকুরের জলে অদৃশ্য। বাসস-প্রেরিত প্রেসবিজ্ঞপ্তিকে কেউ সংবাদ বলে না। ভক্ত-শিষ্যের দলীয় ভাষ্যমঞ্জরীতে কিছু থাকা সম্ভব নয়, পল দা মানের মূল লেখাই একমাত্র নির্ভর; সে লেখা বিচার করতে হবে পল দা মান কর্তৃক ‘স্বতন্ত্রভাবে উদ্ভাবিত’ (ক্রিস্টফার নরিস, ই.ফ.রি., ১৯৮৫, পৃ. ৩৩৭) এবং তাঁর ‘ব্লাইন্ডনেস অ্যান্ড ইনসাইটে’ বইতে প্রদর্শিত, আসল ডিকনস্ট্রাকশনের পদ্ধতিতে। ডিকনস্ট্রাকশন অবশ্য নেতিবাচক, সাহিত্যবিরোধী; পল দা মানেরও, দেরিদারও। আমাদের লক্ষ্য তা নয়; আমাদের ডিকন্সট্রাকশন ডিকনস্ট্রাকশনের উল্টো। তত্ত্বের কাছে সাহিত্য তুচ্ছ, প্রান্তিক; আমাদের কাছে সাহিত্য প্রধান। দর্শনের চেয়ে কল্পনা, চিন্তার তুলনায় অনুভূতি, শীতল অভিসন্দর্ভের তুলনায় উষ্ণ, স্পন্দিত বাক্য অনেক বেশি প্রয়োজন। বিরাট ‘অলংকার-মীমাংসা’র তুলনায় একটি ছোট্ট, সূক্ষ্ম উৎপ্রেক্ষা অনেক বেশি দামী। সিলিকন ভ্যালি নয়, শান্তিনিকেতন; ফেইসবুক নয়, কোলরিজ; ‘এছলাম’ নয়, ‘সাত সাগরের মাঝি’, রোমান্টিসিজম। আরব্য রজনী ও লিরিকাল ব্যালার্ডসের পুনর্বিবাহ। দরকার সমালোচনা-সাহিত্যের পুনরুজ্জীবন। সবুজ বনস্পতির মত মুখরিত গদ্যের উত্থান। বাসস-এর প্রেসবিজ্ঞপ্তির গদ্যে রচিত, তার কথা এখানে হচ্ছে না।
৪
রোমান্টিক কাব্য যেহেতু অনেক বড় ফ্যাক্টর পল দা মানের কাছে (ফলত তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য), সেজন্যে বুঝতে হবে রোমান্টিক সাহিত্যের নতুন চর্চা ও যুগানুগ পুনরুজ্জীবনের মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের সাহিত্য, এবং সমালোচনার, পুনরুজ্জীবনের সূত্র। আমাদের সমালোচনা হবে ‘ডিকনস্ট্রাকশনের উল্টো’ Ñ এ কথা বলে আমি তাই বোঝাতে চাই। পল দা মান বলেন কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থ দুর্বল কবি, তাদের সাহিত্যচিন্তা ভ্রান্ত: আমাদের বুঝতে হবে তারাই শক্তিশালী, তাদের সাহিত্যচিন্তা মৌলিক, যদিও এ দিকের দা মানীয়-হাইডেগারীয় তত্ত্ব তা আমাদের বুঝতে দিতে চায় না, আবার ওদিকের ‘ক্লেদজ কুসুম’ও তা থেকে আমাদের বঞ্চিত করেছে বহু বছর।
‘দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি’: আমরা যাকে কথা বলি বা ভাষা, তাত্ত্বিক তার নাম দেন রেটরিক, ‘টাইম’ বলেন না, টেম্পরালিটি (হাইডেগারের বিইং অ্যান্ড টাইম থেকে ‘টেম্পরালিটি’র আমদানি)। সেভাবে তর্জমার পর পল দা মানের প্রবন্ধের শিরোনামের অর্থ হবে: নশ্বরতার ভাষা, বৈখরি – রোমান্টিক কাব্য (যেমন ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রেলিউড) নশ্বর মনুষ্যের নশ্বরতার বাক্-বৈখরি। কবি ওয়ার্ডওয়ার্থ, পল দা মানের প্রবন্ধে, আক্রমণের যোগ্য বিবেচিত হওয়ার কারণ পল দা মান ওয়ার্ডসওয়ার্থের মধ্যে মৃত্যু এবং নশ্বরতার এই বোধ দেখেন। সেই বোধের, অনুভূতির, হাহাকারের অথেনটিসিটি তিনি যাচাই করতে চান। তা তিনি করেছেন প্রবন্ধের দ্বিতীয়াংশে, একেবারে শেষে; ছোট্ট বালিকা লুসি গ্রে-র মৃত্যু বিষয়ে রচিত ওয়ার্ডসওয়ার্থের একটি ছোট্ট কবিতার আলোচনায়। ওয়ার্ডসওয়ার্থ, বলা বাহুল্য, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন নি। দেখা গেল, মৃত বালিকা লুসি গ্রে বিষয়ে ওয়ার্ডসওয়ার্থের শোক খাঁটি নয় মোটেও; অথেনটিক নয়। কারণ অনড়, স্পন্দনহীন, অন্ধ, বধির, নানা ঋতুর পরিক্রমায় নি:সাড়, নির্বাক মৃত বালিকাকে ওয়ার্ডওয়ার্থের মনে হয়েছে একখ- জড়বস্তুর মত, ‘এ থিং’। এই ‘থিং’ শব্দ ধরে পল দা মানের সিদ্ধান্ত: ওয়ার্ডসওয়ার্থের শোক, অনুভূতি কিছুতেই সত্য, খাঁটি হতে পারে না; খাঁটি হলে ‘থিং’ কেন? মৃত বালিকা কি বস্তু, বিড়াল-কুকুর, না মনুষ্য? মৃত বালিকাকে জড়বস্তু-সদৃশ বলে ওয়ার্ডওয়ার্থ প্রমাণ করেছেন যে, বালিকার মৃত্যুতে তাঁর শোক প্রকৃত শোক নয়, কৃত্রিম; তাঁর দু:খ প্রকৃত দু:খ নয়, শব্দের চাতুর্য (তা রচিত শোক, রচিত দু:খ, নকল শোক, নকল অনুভূতি)। এই যে থিং শব্দের কারণে ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাত্ত্বিকের কাছে ‘ধরা খেলেন’, এই ধরা খাওয়াকে ডিকনস্ট্রাকশনে আয়রনি বলা হয়। ‘থিং’ তথা শিকার ধরে পল দা মান বেশ সন্তুষ্ট, চার পৃষ্ঠা ধরে বৈখরি, শিকারের বৃত্তান্ত (পৃ. ২২৩-২২৬)। সে বৈখরির সঙ্গে, বলা বাহুল্য, ওয়ার্ডসওয়ার্থের ওই সংহত, লোকোত্তর লিরিকের কোনো সম্বন্ধ নেই। ক্ষণজীরী মনুষ্যের যে নশ্বরতা নিয়ে তাত্ত্বিকের কৌতূহল, ওই ‘থিং’ শব্দের কারণেই তা তীব্র; তার ফলেই গভীরতর হয়েছে অনন্তের বিপরীতে অন্তের, ‘টেম্পরালিটি’র, নশ্বরতার বোধ:
তন্দ্রাবশে খিল পড়েছিল আত্মাতে আমার
মানুষের মানুষী ভয় চকিতে উধাও:
বালিকা নয় সে, মনে হল জড়বস্তু এক
অনুভূতিহীন, নিখিলের মাস-বর্ষ ছোঁবে না
তাকে আর, বলহীন নিশ্চল সে, বধির,
অপসৃত তার ছোট্ট দুই চোখের আলোক,
পাহাড়, পাথর, তরুপত্রের পাশে পাক খায়
বালিকাও, প্রকৃতির নিয়ত চক্রে, পরিক্রমায়
(এ স্লাম্বার ডিড্ মাই স্পিরিট সী’ল, লিরিকাল ব্যালার্ডস, ২য় খণ্ড, লন্ডন, ১৮০০, পৃ. ৫৩)
বেলজিয়ামের ‘কসাইপুত্রে’র১৫ নিকট ইংরেজ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের ইংরেজি শেখার কোনো প্রয়োজন নেই।
আয়রনি তাত্ত্বিকদের প্রধান একটি শব্দ। লেখায়, কথাবার্তাতেও, তোত্লার মতো বারে বারে সেই একই শব্দ, আয়রনি । আয়রনি শব্দটি, ‘দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি’ প্রবন্ধেই, ১১০ বার ব্যবহৃত হয়েছে। কাব্যের আলোচক খোঁজেন চিত্রকল্প, উপমা, প্রতীক, উৎপ্রেক্ষা; তাত্ত্বিক খোঁজেন আয়রনি। খোঁজা নয়, ধরা। আয়রনি ধরা। বিড়াল যেভাবে ইঁদুর ধরে সেরকম, কারণ আয়রনি ধরার পর তা নিয়ে অনেকক্ষণ খেলা করা লাগে। পল দা মান বলবেন: গোবিন্দচন্দ্র দাসে আয়রনি ধরে লাভ নেই (স্বভাবকবিত্ব আক্রমণের অযোগ্য), ধরতে হবে ওয়ার্ডসওয়ার্থের মত সিরিয়াস লেখকের রচনায়, অর্থাৎ আয়রনি খুঁজতে হবে রবীন্দ্রনাথে। পল দা মান আরো বলবেন, যে-ব্যক্তি ওয়ার্ডসওয়ার্থ বাদ দিয়ে বায়রনে – রবীন্দ্রনাথ ছেড়ে সুধীন্দ্রনাথে – আয়রনি খোঁজে সে বেকুব, তাত্ত্বিক হবার অযোগ্য। বায়রন-সুধীন্দ্রনাথের লেখার মূল সুরই আয়রনিক, খোঁজার কিছু নেই। শিকার খুঁজতে হবে সেই স্থানে যেখানে তা দুর্লভ; খুঁজতে হবে ভিন্ন ভাবমূর্তির প্রণম্য ক্লাসিক লেখকের মধ্যে, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে। সেটা করা গেলেই তাত্ত্বিক, ‘থিং’ ধরতে পারলেই রবীন্দ্রনাথের উপরে স্থান। থিং ধরা মানে – রবীন্দ্রনাথের ভাষায় – ‘বুদ্ধির চোখে সূক্ষ্ম বুদ্ধির ধূলা ছড়া’নো (খৃষ্ট, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী, [১৯১০] ১৯৫৯, পৃ. ৬)।
আর সব বাদ দিয়ে, তাত্ত্বিকতাকে যদি একটি কাজ (মশারি টাঙানো, পরীক্ষার খাতা দেখার মত) হিশেবে ধরি, তাহলে দেখব যে, সমগ্র ডিকনস্ট্রাকশনের একমাত্র কাজ এই আয়রনি ধরা, ওয়ার্ডসওয়ার্থে ‘থিং’ ধরা। গুরুর অনুসরণে ভক্তেরা তা ধরতে চায়, যথেষ্ট পরিশ্রম করে, চেষ্টায় ত্রুটি করে না, কিন্তু ভাল ধরতে পারে না (আক্ষেপ করেন পল দা মান, একটি সাক্ষাতকারে); যদি ধরেও, শিকারটা ভাল হয় না সবসময়:
ভক্ত: ‘আয়রনি’ বুঝতে চাই আমরা, আয়রনি, কিন্তু বুঝতে অক্ষম। একটু যদি..
দেবতা: তুমি বলছিলে, তিরিশ-চল্লিশ বছর আগে আয়রনি নিয়ে উৎসাহ ছিল, মাঝে ভাটা পড়েছে, এখন তাতে আবার উৎসাহ দেখা দিয়েছে। ব্যাপারটা তা নয়, বুঝলে। ক্লীনথ ব্রুকরা আয়রনি শব্দ বাজারে ছেড়েছিল, ঠিক; কিন্তু আমার আয়রনি সেই ব্যাপার না, অন্যকিছু।..তুমি বুঝতে পারছ না, শ্লেগেল আয়রনির একজন বড় তাত্ত্বিক, নীটশের রচনা আয়রনিক; ওদের লেখায় আয়রনি খোঁজা প-শ্রম।.. এই টেকস্ট আয়রনিক, ওই টেকস্ট তা না – এ ধরনের কথাবার্তা অর্থহীন। সব ধরনের টেকস্টের মধ্যে আয়রনি খুঁজে বের করা সম্ভব; কারো হয়ত ‘বাইবেলে’র মধ্যে আয়রনি খোঁজার শখ হতে পারে, ‘কিন্তু বাইবেল নিয়ে আমি সে ধরনের কথা ভাবতেই চাই না। বাইবেল নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করবে না’ (পৃ. ১৫২)..আমি যেভাবে দেখিয়েছি, সেভাবে লিরিক কবিতায়, রোমান্টিক কাব্যে খুঁজতে হবে তা; বলে রাখলাম, ভবিষ্যতে অনেক বেশি লোক আয়রনি খুঁজবে। আমি দেখিয়েছি, খুঁজবে।..আয়রনি কি জানতে চাও, আয়রনি হল ওয়ার্ডসওয়ার্থের লেখার মধ্যে মওকামতো একটা বাক্য বা শব্দ বের করা সেই তত্ত্ব প্রমাণ করার জন্যে যা তুমি আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলে (পৃ. ১৪৯)।.. আয়রনি কিন্তু শ্লেষ, ব্যঙ্গ, পরিহাস, প্যারডি নয়, বুঝলে; জনাথন সুইফট, আলেকজান্ডার পোপ আয়রনিক, শ্লেষ, স্যাটায়ারে আকীর্ণ, ও ধরনের খোঁজা নয়, ওদের মধ্যে খোঁজা নয়, বুঝলে (পৃ. ১৫০)।…ওয়ার্ডসওয়ার্থ থেকে আরেকটা উদাহরণ দিই। ওয়ার্ডসওয়ার্থের একটা গদ্যলেখা আছে ‘এপিটাফ’ সম্বন্ধে…ওয়ার্ডওয়ার্থ ভদ্রলোক; স্বভাবতই বেশ গম্ভীরভাবে, সিরিয়াস ভঙ্গিতে, ‘এপিটাফ’ লেখাটির শুরু, কিন্তু দেখা গেল, আলেকজান্ডার পোপ-এর কথা তুলেই তিনি আর ভদ্র, গম্ভীর, সিরিয়াস থাকতে পারলেন না, চটে আগুন..বুঝলে, ওরকম দুর্বল জায়গা বের করা..[এবং বের করে রবীন্দ্রনাথকে জব্দ করাই আয়রনি]
(‘ইন্টারভিউ উইথ রবার্ট মনিহান’, দি পল দা মান নোটবুকস, মার্টিন ম্যাককুইলেন-সম্পাদিত, এডিনবরা, ২০১৪, পৃ. ১৪৭-১৬৬)
দেবতার কথা দেবতার মুখে শোনাই ভাল; ভাষ্যমঞ্জরীতে ভক্তের নৈবেদ্য, শিষ্যের ভজনা, ম-লীয়১৬ অমাত্যবর্গের পুরাতন আরতিবাদ্য শুনে লাভ কি? তাত্ত্বিকতাকে ভক্তি, দীক্ষা, গুরু-শিষ্যের বাঁধন, ভ্রাতৃভাব থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না; নরিসের১৭ মত বিলাতী ভক্ত চাইলেও, ম্যাককুইলেনের মত স্কচ শিষ্য চাইলেও, যাবে না। পল দা মানের ওপর ডক্টর রিচার্ড ম্যাক্সি-রচিত একটি প্রবন্ধের (১৯৮৪, পৃ. ৯৭৯-৮২) যে বক্তব্য শুরুতে পদ্যে তুলে দিয়েছি – (ম্যাক্সির প্রবন্ধখানা বিষয় ছিল: গুরু পল দা মানের দুষ্পাঠ্য মোনালিসা-হাস্য) – তার আরম্ভ পল দা মানের এই কথা দিয়ে: ‘প্রুস্ত জানত, সত্য জিনিশটা অনেকটা মৃত্যুর মত, কখনই ঠিক সময়ে আসে না।’ গভীর রহস্যময় উক্তি, মনে হয়েছিল ম্যাক্সির।
নিজের বিষয়েই যে পল দা মান কথাটা বলেছেন, রিচার্ড ম্যাকসির তা সন্দেহ হওয়ার কথা নয় ১৯৮৪ সালে। ১৯৮৭-৮৮ সালের আগে পর্যন্ত কেউ জানতই না যে, পল দা মান হিটলারের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন; যে, তাঁদের দেবতা হিটলার-অধিকৃত বেলজিয়ামের ‘লা সোয়া’য় ইহুদীদের বিরুদ্ধে শতাধিক প্রবন্ধ লিখেছেন এবং তার কিছুই, আমেরিকায় কাউকে, হার্টমান-ব্লুম-দেরিদার মতো জুইশ বন্ধুকে, জানতে দেন নি); যে, পল দা মানের হাইডেগার-প্রীতি মূলত তাঁর হিটলারী ভক্তির সম্প্রসারণ। ম্যাক্সির মতো ভক্ত, বা মুগ্ধবোধের মূক শিষ্যের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না যে, কোলরিজ, শেলী, ওয়ার্ডওয়ার্থের লেখায় থিংপ্রতারণাকপটোক্তি খোঁজার প্রতিজ্ঞা প্রকৃতপক্ষে এক বাজিকর প্রতারকের – বেলজিয়ামে অর্থ-আত্মসাতের দায়ে দ-প্রাপ্ত পলাতক ফেরারী আসামীর (এভেলিন ব্যারিশ, নিউ ইয়র্ক, ২০১৪, পৃ. ১৮৮, ১৯২) – নিজের প্রতারণা, কপটতা, নিজের দোষ, নিজের অপরাধ অন্যের মধ্যে, ওয়ার্ডসওয়ার্থের মধ্যে, সাহিত্যের ভেতর অনুসন্ধানের হীন উদ্দেশ্যজাত। সাহিত্য জীবনের দর্পণ কি না জানিনা, তবে ডিকনস্ট্রাকশন পল দা মানের আত্মজীবনের দর্পণ। এই একটি কারণের জন্যে হলেও বুঝতে হবে ডিকনস্ট্রাকশন, তত্ত্ব, তত্ত্বের প্রতিপাদ্য; বুঝতে হবে গত পঁয়ত্রিশ বৎসরের পাশ্চাত্ত্য চিন্তার প্রকৃত ইতিহাস। ডিকনস্ট্রাকশনের ডিকনস্ট্রাকশন ছাড়া ‘সমালোচনা-সাহিত্যে’র যুগানুগ পুনরুজ্জীবনের স্বপ্ন দেখা নিরর্থক। (চলবে)
তথ্যসূত্র
১. তাত্ত্বিকের বিচারে হয় নি (বিদেশে তাঁরাই আশ্রমের, সাহিত্য বিভাগগুলোর, অধিপতি), কিন্তু তার মানে কি ওয়েলেক, বুথ, কে’ইযেন্, ব্রুকস, বেইট, ব্লুম, এইব্রামস, ক্রুজ, হার্শ, সাইদ, ক্রিগারের বিচারে (এঁরা সকলে ‘সাহিত্য-সমালোচক’) হয় নি? অবশ্যই হয়েছে। কিন্তু ‘সাহিত্য-সমালোচকে’র বিচারে হলেই বা কি, তাত্ত্বিকের চোখে তা রদ্দি মাল। তাত্ত্বিকদের নিয়ন্ত্রণাধীন মূলধারার প্রধান একাডেমিক মার্কেটে তার কোনো মূল্য নেই; তাত্ত্বিকদের লেখায় সে ধরনের ‘সাহিত্য-সমালোচনা’ বা ‘সাহিত্য-বিচার’-ধর্মী বই উদ্ধৃত না করাই নিয়ম। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত তাত্ত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্ত্তী স্পিভাকের এ ক্রিটিক অফ দি পোস্টকলোনিয়াল রি’জন (১৯৯৯) তাঁর শিক্ষক পল দা মান (ও তারকনাথ সেন)-কে উৎসর্গীত। প্রথম প্রবন্ধ (‘ফিলসফি’) থেকে শুরু করে এ বইয়ের নানা স্থানে পল দা মান উল্লেখিত, আলোচিত (পৃ. ১৫-১৬, ১৮, ৩১, ১০৬, ১৭৫, ২৬৯, ৩৩৭, ৪৩০)। গায়ত্রীর বইতে তো বটেই, ১৯৭১ সালের পরে প্রকাশিত যে-কোনো তাত্ত্বিকের লেখায়, রিডিং শব্দ দেখা মাত্রই বুঝতে হবে সেটা তাত্ত্বিকের তাত্ত্বিক পল দা মানের শব্দ, এবং তা পল দা মান-প্রযুক্ত অর্থে ব্যবহৃত। ক্রিটিসিজম নয়, রিডিং – তাত্ত্বিক হয় কান্টীয়-হেগেলীয় critique করেন, অথবা পল-দা-মানীয় reading করেন (ক্রিটিসিজম শব্দ কারো লেখায় দেখলে বুঝতে হবে তিনি সাহিত্যমনস্ক সমালোচক, তাত্ত্বিক নন)। এ বইতেই গায়ত্রী মনে করিয়ে দেন: ‘এ লেখায় আমি কান্টের অ-বিশ্বজনীন দর্শন যেভাবে ৎবধফ করছি তা পল দা মান-প্রণীত ডিকনস্ট্রাকশনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ..পল দা মান দেখিয়েছেন যে, দর্শন বা সাহিত্যের বইতে যা সত্য কথা হিশেবে চালু বা প্রতিষ্ঠিত, তা অলংকৃত বচন মাত্র (অর্থাৎ তা কোনো কথার সত্য অথবা মিথ্যা হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কহীন); সেটা ধরিয়ে দেয়াই ডিকনস্ট্রাকশনের প্রথম কাজ’ (গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, পূর্বোক্ত, ১৯৯৯, পৃ. ১৮)। গায়ত্রী চক্রবর্তীর এ ক্রিটিক অফ দি পোস্টকলোনিয়াল রি’জন (১৯৯৯) বইতে রিডিং শব্দটি ১৯০ বার ব্যবহৃত (আমার গণনা মতে); হিলিস মিলারের নতুন বইটির নামই রিডিং ফর আওয়ার টাইম (এডিনবরা, ২০১২)। মিলারের বইয়ের সূচীপত্র ও ভেতরের লেখায় রিডিং শব্দ ১৬৫ (বা তার বেশি) বার পুনরাবৃত্ত; তার আগে প্রকাশিত মিলারের টোপোগ্রাফিস (স্ট্যানফোর্ড, ১৯৯৫) বইতে – যা হাইডেগার দিয়ে শুরু (পৃ. ৯) এবং হাইডেগার দিয়ে শেষ (পৃ. ২১৬) – রিডিং শব্দ সম্ভবত ২০০ বার (বড় জোর ৩-৪ গ-া কম) ব্যবহৃত।
২. ‘মার্সেল প্রুস্ত বিষয়ে কিছু’, কমলকুমার মজুমদার, প্রবন্ধ সংগ্রহ (কলিকাতা চর্চাপদ পাবলিকশন প্রাইভেট লিমিটেড, ২০০৯, পৃ. ১৩৮-১৫৫); এই দীর্ঘপ্রবন্ধকে রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে হয়েছে ‘ফরাসি সাহিত্যে এক ঝটিকা-সফর’ (কমলকুমার, কলকাতা: পিছুটানের ইতিহাস, আনন্দ পাবলিশার্স [২০০৫] ২০১১, পৃ. ৩১০), যার ‘কথাবস্তু আন্তর্জাতিক, কথাভঙ্গি জাতীয়, দেশজ’ (পৃ. ৩১১)। ‘কথাভঙ্গি’র দেশজতা ঠিক, তবে তার চেয়েও উল্লেখযোগ্য হল, বিদেশি ‘কথাবস্তু’কে কমলকুমার, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ধূলা’ (বঙ্গদর্শন, ফাল্গুন ১২৭৯) বা ‘গগন পর্য্যটন’ (বঙ্গদর্শন, পৌষ ১২৮০) প্রবন্ধের মতো, বাঙালীর নিজস্ব সম্পত্তিতে, চিন্তাবস্তুতে, পরিণত করার ক্ষমতা রাখতেন: যেমন, প্রুস্তে হিন্দু মাতৃভাব বা আর্থারীয় নাইটে ক্ষত্রিয় বীরের কল্পনা, ইউরোপের মধ্যযুগীয় রোমান্সের অনুসরণে ‘গোলাপ সুন্দরী’র তত্ত্ব (সুনীলেরা বিলাস চরিত্রের যে অর্থ ধরেছেন, তার সঙ্গে ‘গোলাপ সুন্দরী’র আসল তত্ত্বের কোনো সম্বন্ধ নেই)। বাংলায় বিজ্ঞান বিষয়ে প্রথম (এবং আমার বিচারে শ্রেষ্ঠতম) রচনার লেখক বঙ্কিমচন্দ্র (১৮৩৮-৯৪) ‘ধূলাতত্ত্ব’ (অর্থাৎ পরমাণুতত্ত্ব) নিয়ে লিখেছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী জন টি-েলের (১৮২০-১৮৯৩) অন ডাস্ট অ্যা- ডিজিস (১৮৭০) বক্তৃতাপ্রবন্ধের অনুসরণে।
৩. ‘রোজনামা: ২/রাত্র একাকিনী’, কমলকুমার মজুমদার, পূর্বোক্ত, ২০১১, পৃ. ৪৪
৪. ‘লা র্মোট ডা’র্থার’ (আর্থারের মৃত্যু; রচনা: ১৪৭০, প্রথম প্রকাশ: ১৪৮৫): কমলকুমার যেসব বই পড়তে বলেছিলেন তার একটি টম ম্যালরির এই আর্থারীয় রোমান্স, আরেকটি কোলরিজের ‘বায়োগ্রাফিয়া লিটারিয়া’ (২ খ-, প্রথম প্রকাশ ১৮১৭), দ্র. ‘নির্বাচিত বই’, কমলকুমার (বিভাব, কমলকুমার মজুমদার সংখ্যা, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত-সম্পাদিত, ২০১০, পৃ. ২৯)। কোলরিজের সুযোগ্য কন্যা স্যারা কোলরিজ – দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পিতার মতই ডিপ্রেশনের রোগী, মাদকাসক্ত – মূল্যবান টীকা ও জীবনীমূলক তথ্য সন্নিবেশন করে এ বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন ১৮৪৭ সালে। কমলকুমারের গদ্যলেখাগুলো স্থানে স্থানে কোলরিজের ‘বায়োগ্রাফিয়া লিটারিয়া’র মতো, অর্থাৎ ঠিক প্রবন্ধ নয় কিন্তু অনুপ্রাণিত, অন্তর্দৃষ্টিময়, আলোকসঞ্চারী ভাবনাসূত্র।
৫. নবাবিষ্কৃত তথ্যের ভিত্তিতে আগের লেখায় পল দা মানের ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে যা লিখেছি, তা পড়া থাকলে এ লেখার বিভিন্ন সূত্র ধরা সহজতর হবে। যাদুকরী ব্যক্তিত্ব পল দা মান একইসঙ্গে আমেরিকা ও ইউরোপে ১৯৬২ থেকে ১৯৮৩ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত পূর্ণ বেতনে ‘ফু’ল প্রফেসর’ ছিলেন (অবশ্য, মৃত্যুর আগে পর্যন্তও, তাঁর সহকর্মীরা তা জানত না)। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সম্মোহিত’ ডীন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম ভঙ্গ করে, এই নিয়োগ দেন (দি ডাবল লাইফ অফ পল দা মান, এভেলিন ব্যারিশ, লিভারলাইট/নর্টন, নিউ ইয়র্ক, ২০১৪, পৃ. ৪২৫, ৪৮৯)। যাদুকরের অন্তর্ধানের পর সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির কোনো সম্ভাবনা নেই।
৬. এভেলিন ব্যারিশ লেখেন: বেলজিয়ামে পল দা মানেরা গৃহে, ছোটকাল থেকে, ফরাশি ভাষায় বাতচিতে অভ্যস্ত। বেলজিয়ামে ফ্লেমিশ কথ্য (বাতচিতের) ভাষা, ডাচ লেখ্য (সাধু) ভাষা। বেলজিয়ীয় সমাজে ফরাশি ভাষায় বাতচিত আভিজাত্যের চিহ্ন, ফরাশি উপরে ওঠার সিঁড়িও (ব্যারিশ, পূর্বোক্ত, ২০১৪, পৃ. ৬)। ফরাশি, এক কথায়, এককালের আশরাফ শ্রেণীর উর্দু ভাষা।
৭. পল দা মানের প্রবন্ধে অ্যালেগরি সংক্রান্ত সমস্ত কথা (যেমন, ‘রূপকী ভাষা’য় রচিত কাব্য সচেতনভাবে অবজেকটিভ এবং তা, রোমান্টিক কাব্যের ভাষার মতো, সাবজেকটিভ হতে নারাজ; ‘রূপকী কাব্যে’ ব্যক্ত অনুভূতি রূপকী কবির অনুভূতি নয়, বিশ্বাস রূপকী কবির বিশ্বাস নয়, বক্তব্য রূপকী কবির বক্তব্য নয়; তা রূপকী কবির, আলাওলের, দৌলতউজিরের, ইন্টেনশন, মনোভাব বা ধর্মবিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করে না; ‘রূপকী কাব্য’কে রূপকী কবি তাঁর নিজের আবেগ বা বিশ্বাস থেকে দূরে রাখেন, মেশান না ‘আঁখিজল’: এই ডিসট্যান্স, আপন মনের ভাব বা ইচ্ছার সঙ্গে রূপকী ভাষায় এই দূরত্ব, এই বস্তুনিষ্ঠতা [যা রোমান্টিক কাব্যে বর্জিত], এই নিরাসক্তি, ইত্যাদি) – এ সব কথাই পল দা মান পেয়েছেন পল অ্যালপারের ৪১৫ পৃষ্ঠার বিশাল দি পোয়েট্রি অফ দি ফেইরি কুইন (প্রিন্সটন য়ুনির্ভাসিটি প্রেস, ১৯৬৭) বই থেকে, যা পল দা মানের প্রবন্ধটির (১৯৬৭) দু’বছর পূর্বে প্রকাশিত হয়েছিল। পল আলপারের বিরাট বইখানার উল্লেখ পল দা মানের প্রবন্ধের কোথাও নেই। উল্লেখ তো নেইই, উপরন্তু পল আলপারের বইয়ের বক্তব্য হাইডেগারীয় শব্দের আগাছায় ঢাকা পড়েছে; তা কিঞ্চিৎ বিকৃতও করে দিতে হয়েছিল। ‘রূপকী ভাষা’ সম্বন্ধে পল দা মানের প্রায় সব কথাই পল আলপারের বইয়ের প্রথম পরিচ্ছেদে স্পেনসারের ‘রূপকী ভাষা’র আলোচনাতেই আছে (দ্র পল আলপার, প্রিন্সটন, ১৯৬৭, পৃ. ৩-৩৫), সারা বই জুড়ে তো আছেই ( বিশেষত পৃ. ৫, ৯, ৪৯-৫১, ৮৬, ১৩৩-৩৪, ২৩৩-৩৪, ২৩৮, ২৮৬-২৮৯, ২৯৭) । উল্লেখ্য, ফ্রাঙ্ক লিনট্রেকিয়া (জ. ১৯৪০) ব্লাইন্ডনেস অ্যান্ড ইনসাইট (১৯৭১) ও সে বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৮৩) অন্তর্ভুক্ত এই প্রবন্ধের (‘দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি’ [১৯৬৯] ১৯৮৩) কঠোর সমালোচনা করে – যেখানে তিনি একে ‘দি রেটরিক অফ অথরিটি’ বলেছেন (গণতান্ত্রিক সমাজে ওর চাইতে বড় ব্যঙ্গ নেই) – দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন বটে, কিন্তু পল আলপারের বই (১৯৬৭) ভাঙ্গিয়ে পল দা মান ‘অ্যালেগরি’র বটিকা তৈরি করেছেন, লিনট্রেকিয়া তা খেয়াল করেন নি (এক এরিয়ার লোক অন্য এরিয়ার খোঁজ রাখে না; তত্ত্বের উত্থানের পর অল্প ক’জনই স্পেনসর-মিলটন উল্টে দেখেন; ষোল শতকে কেমব্রিজের এম এ পাশ পন্ডিত কবি এডমান্ড স্পেনসরের দীর্ঘ, চার হাজারের মত স্পেনসরীয় স্তবকে বিন্যস্ত, ‘ফেয়ারি কুইন’ [ ১৫৯০, ১৫৯৬] ভীষণ শক্ত)। তবে সার্ত্রের উল্লেখ ছাড়া সার্ত্রের শব্দ, অর্থ, ধারণা ব্যবহারের যেসব অভিযোগ করেছেন ফ্রাঙ্ক লিনট্রেকিয়া (আফটার দি নিউ ক্রিটিসিজম, শিকাগো, [১৯৮০] ১৯৮৩, পৃ. ২৮২-৩১৭), তা পল দা মান অংশত স্বীকার করেন অনেক বছর পরে এক সাক্ষাতকারে (স্তেফানো রসো, ‘পল দা মানের সঙ্গে সাক্ষাতকার’, ক্রিটিকাল ইনকোয়েরি, শিকাগো, ১২:৪, ১৯৮৬, পৃ. ৭৯২-৯৩)।
৮. বাংলা রচনায় ইংরেজি হরফ ব্যবহারে আমার অ্যালার্জি, তবু এখানে মূল থেকে উদ্ধৃত করে দিই:
Since the advent, in the course of the nineteenth century, of a subjectivistic critical vocabulary, the traditional forms of rhetoric have fallen into disrepute. It is becoming increasingly clear, however, that this was only a temporary eclipse: recent developments in criticism reveal the possibility of a rhetoric that would no longer be normative or descriptive but that would more or less openly raise the question of intentionality of rhetorical figures (Paul de Man, ‘The Rhetoric of Temporality’, Blindness and Insight, [1971] 1983, p. 187-188)
কেন কোন্ কথার কি তর্জমা করেছি, তা এই অংশের অনুবাদ এবং আমার পুরো লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে অনুরোধ করি; কেন পল মানের ‘রেটরিক’ শব্দের বাংলা করেছি ভাষা, এবং ‘রেটরিকাল ফিগারস’ কথার তর্জমা করেছি অলঙ্কৃত ভাষা, তার যুক্তি বোঝা যাবে। যেভাবে আমরা ‘বঙ্কিমী ভাষা’ বলি, সে অর্থে ভাষা: পল দা মান, হিলিস মিলারের মত শিষ্য-ভক্তদের দল নিয়ে, দ-ী-রুদ্রটের ‘সপ্তম বেদাঙ্গে’র অনুরূপ একটা ভাষা বানানোর প্রোগ্রামের কথা বলছেন যা (ক) ‘নরমেটিভ’ হবে না (অর্থাৎ সাহিত্য-সমালোচনা হবে না; সাহিত্য-সমালোচনায় যা নর্ম বা নিয়ম বা প্রতিষ্ঠিত রীতি, তার উল্টো হবে); (খ) ডেসক্রিপটিভ হবে না (অর্থাৎ সাহিত্যের আলোচনা হবে না, তাত্ত্বিক হবে); (গ) সাহিত্যের আলোচনা বাদ দিয়ে তা সাহিত্যিকের ‘ইনটেশনে’ মন দেবে – অর্থাৎ সাহিত্য লিখে সাহিত্যিক যা করতে চান, তা যে তিনি কিছুতেই করে উঠতে পারেন না (তা ওয়ার্ডসওয়ার্থ হোক বা রবীন্দ্রনাথ), এবং যা লেখেন তা যে তাঁর উদ্দেশ্যকে ভ-ুল করে উদ্দেশ্যের বিপরীত বস্তুতে পরিণত হয়, সেটাই বড় বড় লেখকদের মধ্যে খুঁজে বের করবে। শুধু এই কথাগুলোর ভিত্তিতেও ডিকনস্ট্রাকশন প্রোগ্রাম এবং তত্ত্বের উদ্দেশ্য বুঝে নেওয়া যায়।
৯. কাব্য বিষয়ে কোলরিজের প্রভাবশালী উক্তি অসংখ্য। যেমন: ‘ওয়ার্ডসওয়ার্থের সঙ্গে মিলে লিরিকাল ব্যালার্ডস লেখার সময় আমি যুক্তির অনধিগম্য রোমান্টিক কল্পনাযোগে লিখতে চেয়েছি সে ধরনের কবিতা, যার মাধ্যমে আমার মনের কৌতূহল পৌঁছে যাবে অন্য পাঠকের মনে; এবং, কল্পনার ফসল হলেও, সে কবিতার ভেতর সত্যের প্রতিভাস, পাঠককে, সে মুহূর্তের জন্যে, স্বেচ্ছায় তার অবিশ্বাস বর্জনে [উইলিং সাসপেনশন অফ ডিসবিলিফ] বাধ্য করবে।.. দর্শনবিদও উৎকৃষ্ট কবিতার মূল্য কিসে বা কোথায়, তা ধরতে পারে না; সাধারণ লোকের মত তারাও ভাবে, কিছু ভাল পংক্তি বা জোড়া মিলের পদ্যই বুঝি কবিতা..; বিচ্ছিন্ন পংক্তিতে নয়, পাঠকের যান্ত্রিক কৌতূহলের নিবৃত্তিতেও নয়, কবিতার কাব্যত্ব তার সমন্বিত সমগ্রতায়।.. সব কথার শেষ কথা হল, যাকে আমি কল্পনা বলছি তা প্রতিভা-সাপেক্ষ, উদ্ভট খেয়ালের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিভাবানের কল্পনা এক যাদুকরী ক্ষমতা’ (বায়োগ্রাফিয়া লিটারিয়া, চতুর্দশ পরিচ্ছেদ, অখ- সংস্করণ, নিউ ইয়র্ক: লেভিট, লর্ড অ্যান্ড কোং, [১৮১৭] ১৮৩৪, পৃ. ১৭৪, ১৭৮-১৭৯)। কল্পনা ও প্রতিভা বিষয়ে এ ধরনের কথা কোলরিজের আগে কেউ বলে নি ; সাহিত্য সম্বন্ধে পরবর্তীরা যা কিছু বলেছেন, তার উৎস কোলরিজ – সেসময়কার পত্র-পত্রিকায় কোলরিজের বিভিন্ন লেখা, লিটারারি বায়োগ্রাফিয়া, আড্ডা, শেক্সপীয়রের ওপর বক্তৃতামালা (১৮১১-১২), রাস্তায় হাঁটার সময় পাঁচ মিনিটের পাঁচশ কথায় অভিভূত কীটসকে কি বলেছিলেন, ইত্যাদি। কোলরিজ শুধু কবি নন, তিনি সে সময়ে ইংল্যা-ের এক নম্বর বুদ্ধিজীবী ছিলেন (তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন অনেকেই, এমার্সন গেছেন)। কোলরিজ সম্বন্ধে বইপত্র তো অসংখ্য (বিলাতের রিচার্ড হোমসের, ১৯৯০ ও ১৯৯৮-এ প্রকাশিত, দুই খ- ‘নির্ভরযোগ্য’ জীবনী থেকে শুরু করে ওয়াল্টার জ্যাকসন বেইটের কোলরিজ, [ম্যাকমিলান ১৯৬৮], এবং সর্বগ্রাসী প-িত-সমালোচক রেনে ওয়েলেকের হিস্ট্রি অফ মডার্ন ক্রিটিসিজম, ১৭৫০-১৯৫০, দ্বিতীয় খ-, কেমব্রিজ [১৯৫৫] ১৯৮১, বিশেষত পৃ. ১৫১-১৮৭), কিন্তু আমার বিশ্বাস, মায়ার ‘মাইক’ এইব্রামসের ‘দি মিরর অ্যা- ল্যাম্প’ (১৯৫৩) এবং ‘ন্যাচারাল সুপারন্যাচারালিজম’ (নর্টন ১৯৭৩) আত্মস্থ না হওয়া পর্যন্ত, কিছুতেই বোঝা সম্ভব নয় ‘উনিশ শতকের প্রত্যূষকালীন’ ইংলিশ রোমান্টিসিজম কি বস্তু ছিল (যখন জার্মানির জন্মও হয় নি, ইংল্যান্ডের তুলনায় ফ্রান্স মফস্বল শহর), এবং বুদ্ধদেবের ‘শার্ল বোদলেয়ার: তাঁর কবিতা’ (দে’জ ১৯৬১) বইয়ের ভূমিকা পড়ে আমরা কি মুখস্থ করেছি। কোলরিজ কান্ট, হেগেল, শ্লেগেল, শিলার থেকে কোন্ কোন্ কথা নিয়েছেন তা বিশ্রুত সমালোচক-ঐতিহাসিক রেনে ওয়েলেক তাঁর সমালোচনার ইতিহাস দ্বিতীয় খ- ছাড়াও অন্য বইতে (কান্ট ইন ইংল্যান্ড, ১৯৩১, পৃ. ৬৫-১৩৫) বিস্তারিতভাবে দেখিয়েছেন, কিন্তু তাতে আমাদের লাভ কি? কোলরিজ আগে কবি, পরে দার্শনিক; কোলরিজের গদ্য পড়তে গিয়ে যদি ভুলে যাই, যেমন প-িতেরা ভুলে যান, তা এক বিশুদ্ধ কাব্যোন্মাদের রচনা, তাহলে জীবনানন্দের ‘কবিতার কথা’য় পুনরুক্ত কোলরিজের ‘কল্পনা-প্রতিভা’ (কবিতার কথা, [১৯৩৮] ১৯৫৬) ইত্যাদি কথা ধরতে পারব না (‘কল্পনা-প্রতিভা’ লিখেই জীবনানন্দ ইমাজিনেশন শব্দটা উল্লেখ করেছিলেন তার আদি, নির্দিষ্ট, কোলরিজ-ব্যাখ্যাত রোমান্টিক উৎস ধরিয়ে দিতে)।
১০. শেলীর ওপর খাপ্পা: পল দা মানের ‘শেলী ডিসফিগারড্’ লেখাটি প্রথমে জেফ্রি হার্টমান-প্রমূখ সম্পাদিত ডিকনস্ট্রাকশন অ্যা- ক্রিটিসিজম (লন্ডন, ১৯৭৯) এবং পরে ‘দি রেটরিক অফ রোমান্টিসিজম’ (কলাম্বিয়া, নিউ ইয়র্ক, ১৯৮৪) বইতে সংকলিত। এ প্রবন্ধের একটা সংক্ষিপ্ত রূপও অতি সম্প্রতি আবিষ্কৃত ও অনূদিত হয়েছে – ‘রুসো অ্যা- ইংলিশ রোমান্টিসিজম’ (পল দা মান নোটবুকস, মার্টিন ম্যাককুইলেন-সম্পাদিত, এডিনবরা, ২০১৪, পৃ. ১০৭-২৫) – তার সঙ্গে মিলিয়ে পড়া উচিত ‘শেলী ডিসফিগারড্’। সেই প্রবন্ধের ডিসফিগারড্ শব্দটাকে খ্রিস্টানী গালি হিশেবে ধরলে তার মধ্যে লম্বা কথার সমস্ত অবান্তর জট খুলে যাবে আপনাতেই।
১১. মধ্যযুগের রূপক কাব্য রোমান দে লা রোজ (দি রোমান্স অফ দি রোজ) মূলত দুই কবির রচনা, গিয়োম দে’লোরিস লেখেন প্রথমাংশ (৪,০৫৮ পংক্তি, আনুমানিক ১২৩০-৩৫ সালে); চল্লিশ বছর পর, ভিন্ন মেজাজের আরেক কবি, জঁ দু’মা তাতে যোগ করেন ১৭,৭২২ লাইন । দুই কবির দুই অংশকে পরস্পরের বিপরীত বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন সি এস লুইস (১৮৯৮-১৯৬৩) তাঁর প্রভাবশালী অ্যালেগরি অফ লা’ভ (অক্সফোর্ড, ১৯৩৬) বইতে; লুইসের এই সিদ্ধান্তের পর থেকে সেই যে ‘দুই অংশ’কে জোড়া দেয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে, তা এখনো থামে নি। লুইসের অ্যালেগরি অফ লা’ভ (১৯৩৬) মধ্যযুগীয় ইউরোপের দরবারি প্রেম রোমান্স কাব্যগাথাকে সিরিয়াস গবেষণার বিষয়বস্তুতে পরিণত করলেও, মধ্যযুগের ইউরোপে নারীর প্রতি অকস্মাৎ খ্রিস্টান কবির, ত্রুবাদুরদের এই নজিরবিহীন অনুরাগ – লুইসের ভাষায় নারীর প্রতি ‘সেন্টিমেন্ট’ (অ্যালেগরি অফ লাভ, গ্যালাক্সি বুক, [১৩৯৬], ১৯৫৮, পৃ ১১২), সেই অনুরাগ বা সেন্টিমেন্ট যাকে এখন সবাই ধরে নেয় ‘ইউরোপীয় বস্তু’, অথচ মধ্যযুগের ইউরোপে দক্ষিণ ফ্রান্সের ত্রুবাদুর কবিদের কাব্য-কাহিনীতে তার উন্মেষের আগে, তার কোনো পূর্বসূত্র ইউরোপীয় গ্রীক বা রোমান সাহিত্যে অনুপস্থিত – কিভাবে জন্ম নিল, অকস্মাৎ মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান কবির চিত্তবদলের উৎস কি, ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর সি এস লুইসের বইতে নেই; সে সব স্বাভাবিক, অনিবার্য প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি শুধু বলেছেন, তিনি ‘ব্যর্থ’ (পৃ. ১১২)। তাই, এসব বিষয়ে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টারলিং প্রফেসর’, ফিললজিস্ট মারিয়া রোসা মেনাকলের সাম্প্রতিক গবেষণার নিরিখে সি এস লুইসের ক্লাসিক বইটিকে এখন ‘ডেইটেড’ মনে হতে বাধ্য (দ্র মারিয়া রোসা মেনাকল, দি অ্যারাবিক রোল ইন মি’ডিয়াভল লিটারেরি হিস্ট্রি, পেনসিলভেনিয়া য়ুনিভার্সিটি প্রেস, [১৯৮৭] ২০০৩, পৃ. ২৪, ২৭-৩৩, ৮৩-৮৮, ৮৯-৯০, ৯১-১১৩; দি অরনামেন্ট অফ দি ওয়ার্ল্ড, নিউ ইয়র্ক, ২০০২, পৃ. ৪৫-৪৬, ১২১-১২২, ১২৫, ১৭৪, ১৯০, ২২১; দি আর্টস অফ ইনটিম্যাসি, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৮, পৃ. ১০৬, ১২৮, ১৪৪-১৫১, ১৫৮; দি শার্ডস অফ লাভ, ডিউক য়ুনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৩, ২৪-২৬, ২৮-২৯, ১৫৪-১৫৭, ১৬২-১৬৩, ১৬৬-১৬৭, ১৭৩-১৭৪, ২০৪-২০৬)। অকালপ্রয়াত প্রফেসর মেনাকল (১৯৫৩-২০১২)-এর এসব গবেষণা-গ্রন্থে দুটি প্রধান সিদ্ধান্ত হল: ক) অন্ত্য-মধ্যযুগে রচিত দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’র উৎস সিসিলীয় আরব্য সূত্র; খ) ত্রুবাদুরদের লিরিক কবিতার উৎস আন্দালুসীয় লোকজ, কিঞ্চিৎ হিব্রু-মিশ্রিত, আরব্য গীত-কবিতা।
১২. পিয়ের আবেলার (১০৭৯-১১৪২) মধ্যযুগীয় ইউরোপের (‘প্যারিসে’র) সেরা তাত্ত্বিক; থিওলজিস্ট বা ‘ধর্মতাত্ত্বিক’ বলছি আমরা, একালে। আবেলার ছিলেন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা ছাত্র-শিষ্য-ভক্ত ম-লীর মাথার মুকুট (ফলে ‘নোটর ডেইমে’ অন্য ব্রাহ্মণদের আতংঙ্ক); অন্যদিকে, সূক্ষ্ম তর্কে অসীম স্পৃহা ও নানা কেলেঙ্কারির কারণে, তিনি মধ্যযুগের ইউরোপে ‘প্রতিদিনের হেডলাইন’। আবু রুশদের (১১২৬-১১৯৮) এরিস্টটল-সমগ্র নোটর ডেইমের ক্যাথিড্রাল পাড়ায় (ক’দিন পরেই [১১৫০] যা সরবন-নামে খ্যাত প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়) পৌঁছেছিল আবেলারের তিরোধানের পর, খ্রিস্টানি বাঁচাতে এরিস্টটল পোড়ানো হয়েছিল আরো পরে (মারিয়া রোসা মেনাকল, পূর্বোক্ত, ২০০২, ১৮১-৮৩)। তবু, ফিলসফির দু’এক খানা হাত-ফেরতা পুঁথির (এরিস্টটলের ‘ক্যাটেগরিস’) সাহায্যেই, পিয়ের আবেলার খ্রিস্ট্রধর্মে ফিলসফি ঢোকান; তাঁর দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির ‘সিক এট নোন’ (হাঁ এবং না; আনু. ১১২০ সাল) বইতে শুধু খ্রিস্টিয় ধর্মবেত্তাদের ভুল নয়, একেবারে জিসাসের মুখপত্র ‘অ্যাপাসল-প্রধান’ সেইন্ট পিটারের গলদ (দ্র জে. এইচ. রবিনসন, রিডিংস ইন ইউরোপিয়ান হিস্ট্রি, ১ম খ-, বস্টন, ১৯০৪, পৃ. ৪৫০) ধরার বেয়াদবিতে অতিষ্ঠ ব্রাহ্মণেরা আবেলারকে প্যারিস ত্যাগে বাধ্য করে (আবেলারের থিওলজিয়া আবেলারকে দিয়েই পোড়ানো [১১২২] হয়েছিল)। বিদূষী ছাত্রী এলোয়িজের মামার বাড়িতে (১১০১-১১৬৪) গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হবার পর, বাইবেলীয় সূক্ষ্মতত্ত্বের আলোচনা বাদ দিয়ে, মামার অগোচরে, দু’জনের গোপন প্রেম ও বিবাহের কথা নোটর ডেইমে জানাজানির পর দু’জনের যে সীমাহীন লাঞ্ছনা, (মামার গু-ায় আবেলারের অঙ্গ-কর্তন), ট্রাজেডি, তার বৃত্তান্ত আবেলার নিজেই লিখে গেছেন তাঁর বিখ্যাত ‘এ হিস্ট্রি অফ মাই ক্যালামিটিস’ (‘আমার তাবৎ দুর্ভাগ্যের পাঁচালী’; আনু. ১১৩২) বইতে; চিঠির ধরনে রচিত হলেও, এ আসলে তাঁর ‘কনফেশনাল’ আত্মজীবনী (অগাস্টিনের ‘কনফেশনস’ [৪০০], আবেলারের ‘ক্যালামিটিস’ [১১৩২], এবং রুসোর ‘কনফেশনস’ [১৭৮২-৮৯] একসঙ্গে পড়ার বই)। তত্ত্বের আলোচনায় পিয়ের আবেলার অপরিহার্য, কেননা আবেলার-উদ্ভাবিত ‘হাঁ এবং না’ পদ্ধতিই ডিকনস্ট্রাকশনের পদ্ধতি। আবেলারের ‘হাঁ এবং না’ তত্ত্বে যেমন একটা জিনিশ হাঁ-ও না, না-ও না, কিংবা একইসঙ্গে হাঁ-ও না-ও, হিজড়ার মত, ডিকনস্ট্রাকশনেও তাই। আবেলার বঙ্গে অবিদিত ছিলেন না, সুধীন্দ্রনাথে আছে: ‘..এয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে পাশ্চাত্ত্য মনীষা বিচার ও বিবেচনা চরমে তো পৌঁছেছিলই, এমনকি আবেলারের জন্ম যেকালে একাদশ শতকের শেষ ভাগে, তখন আর একশ বছরও নি:সন্দেহে আলোকপ্রাপ্ত’ (‘ভিক্টোরিয় ইংল-’, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধসংগ্রহ, দে’জ পাবলিশিং [১৩৯০] ২০১০, পৃ. ৩৯৫)। রুসোর ‘জুলি, অথবা নিউ এলোয়িজ’ (১৭৬১) উপন্যাসে জুলির সঙ্গে সেইন্ট প্রু-র প্রণয় হয়, পরিণয় ঘটে না; আবেলার ও এলোয়িজের প্রণয় হয়, ক্ষণকালীন পরিণয়ও ঘটে, কিন্তু ক্যাথলিক অনুশাসনে খ্রিস্টীয় ধর্মবেত্তার বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ায় (বিবাহ প্রমাণিত হলে ‘নোটর ডেইমে’ নিশ্চিত চাকরিচ্যুতি) দু’জনের মিলন ঘটতে পারে নি আমৃত্যু। কাজেই জুলির পরিণতি যা, এলোয়িজেরও তাই। এই দুই চরিত্রের জীবনে পরস্পরে যে ব্যবধান বা দূরত্ব, ‘রূপকী ভাষা’তে শব্দের সঙ্গে ‘অর্থে’র সেইরকম দূরত্ব: এই কথাটা বলার জন্যে পল দা মান ৪১-পৃষ্ঠা ব্যয় করেছেন ব্লাইন্ডনেস বইতে (দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি, পূর্বোক্ত, পৃ. ১৮৭-২২৮)।
১৩. ‘রুসো থেকে ইংরেজি রোমান্টিক কাব্য উদ্ভূত’: সে সময় পল দা মানের তাই ছিল বিশ্বাস, দি রেটরিক অফ টেম্পরালিটি (১৯৬৯) প্রবন্ধে লাট-বাহাদুরের মত ওয়ার্ডসওয়ার্থ-বিরোধী উক্তির সূত্র সেই বিশ্বাস; কিন্তু পরে, শেলীর মৃত্যুর আগে রচিত একটি কবিতা ছাড়া (‘দি ট্রায়াম্ফ অফ লাইফ’, ১৮২২), কোলরিজ-ওয়ার্ডসওয়ার্থে রুসোর প্রভাবের কোনো চিহ্ন খুঁজে না পেয়ে খোঁজাখুঁজিতে ইস্তফা দেন (দ্র. ‘রুসো অ্যা- দি ইংলিশ রোমান্টিসিজম’, নোটবুকস, পূর্বোক্ত, ২০১৪, পৃ. ১০৭-১০৮); তারপর থেকে ওয়ার্ডওয়ার্থ, ব্লেইক, এবং কীটসের মধ্যে রুসোর প্রভাব খোঁজা – পেইশেন্স ম’লের ভাষায় – ‘অবান্তর’ (নোটবুকস, পূর্বোক্ত, পৃ. ১০৫) হয়ে যায় পল দা মানের কাছে; ইংরেজি রোমান্টিক কাব্যে রুসোর সেই কল্পিত প্রভাব নিয়ে তাঁর যে বই লেখার কথা ছিল, তা-ও ভেস্তে যায় (পূর্বোক্ত, পৃ. ১০৫), লেখেন অন্য কিছু, ‘অ্যালেগরিস অফ রিডিং’ (ইয়েল, ১৯৭৯)।
১৪. সমালোচক উইলিয়াম হ্যাজলিটই (১৭৭৮-১৮৩০) সর্বপ্রথম বলেন যে, ওয়ার্ডসওয়ার্থের কাব্য বৈপ্লবিক; দি স্পিরিট অফ দি এইজ (১৮২৫) বইতে হ্যাজলিটই প্রথম ব্যাখ্যা করে দেখান যে, ফ্রান্সে ফরাশিরা রাজনীনৈতিক বিপ্লব করেছে, আর তার অনুপ্রেরণায় ওয়ার্ডসওয়ার্থ বিপ্লব আনেন ইংরেজি কাব্যে। অর্থাৎ ফরাশি বিপ্লব ফরাশি সাহিত্যে কোনো রোমান্টিক বিপ্লব আনে নি, এনেছে ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কাব্যে। ফরাশি বিপ্লব ফরাশি ফিউডালতন্ত্র পরিবর্তিত করে, ওয়ার্ডসওয়ার্থ বদলে দেন ইউরোপীয় কাব্যকলার গদবাঁধা বিষয়, ছন্দ, রূপক, পন্ডিতি ইত্যাদির পুরাতন অভিজাততন্ত্র। রোমান্টিক কাব্য এই অর্থে বৈপ্লবিক, ‘স্পিরিট অফ দি এইজ’ (দ্র এইবরামস, ‘ভূমিকা’, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ অ্যা- দি এইজ অফ রোমান্টিসিজম, রাটগার্স য়ুনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, পৃ. ৮-৯)। ১৮২৫ সাল থেকে সকলে হ্যাজলিটের এই সত্য উক্তিকে সত্য মনে করে বলেই রক্ষণশীল পল দা মান রোমান্টিক কাব্যকে নস্যাৎ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
১৫. ‘আমি হলাম কসাইয়ের বাচ্চা’: এ কথা পল দা মান তাঁর মার্কিন স্ত্রী প্যাট্রিশাকে বলেছিলেন (দি ডাবল লাইফ অফ পল দা মান, এভেলিন ব্যারিশ, পূর্বোক্ত, ২০১৪, পৃ. ৩): ‘আমার স্বামী অনেক ঘন্টা কাটাতো আয়নার দিকে তাকিয়ে, চেহারা দেখার জন্যে নয়, চুল আঁচড়ানোর প্রয়োজনে নয়। কখনো মনে হতো, পল তার জীবনের কথা ভাবছে, কখনো মনে হত সে খুঁজছে কোনো রহস্য। ‘আমি বোধ হয় সিজোফ্রেনিক’ – পল একবার বলেছিল বটে, কিন্তু আমি জানি সে কোনোদিনই সিজোফ্রেনিক ছিল না’ (পৃ. ৪৫১)। ‘কসাই’ শব্দ, পল দা মানের অনুসরণে বলা যায়, ডিকনস্ট্রাকশনের অ্যালেগরি, তার রূপক।
১৬. চার্চ অর্থে ‘ম-লী’ শব্দটি জাতীয় পাঠ্যপুস্তক খ্রিস্টধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা (নবম-দশম শ্রেণী, ২০১২) থেকে গৃহীত। খ্রিস্টিয় ধর্মে চার্চ মন্দির, মসজিদের মত একখানা বিল্ডিং নয় – চার্চ হচ্ছে, মনুষ্যের কল্যাণের নিমিত্ত ক্রুশমৃত্যু বরণকারী ‘অমৃতের পুত্র’ (খৃষ্ট, রবীন্দ্রনাথ, [১৯১০] ১৯৫৯, পৃ. ৮) জিসাসের দেহ (কিং জেইমস বাইবেল, দি অ্যাক্টস, ৯:৪), দেহের প্রতীক মাত্র নয়। আমাদের চোখে যা গির্জা, বিল্ডিং (উপাসনালয়), সেইন্ট পল-প্রচারিত, সেইন্ট অগাস্টিন কর্তৃক সম্প্রসারিত (প’লিন) খ্রিস্টিয় তত্ত্বে তা বিল্ডিং নয়, বরং জিসাসের আপন দেহের, তাঁর ক্রুশবিদ্ধ শরীরের, একেকটি অংশ। চার্চ, অতএব, একটি আইডিয়া। এই পাঠ্যপুস্তকে চার্চ শব্দের বাংলা করা হয়েছে ‘ম-লী’ (খ্রিস্টধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, ফাদার এলিয়াস-প্রমূখ প্রণীত, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, মতিঝিল, ঢাকা ২০১২)। পল দা মানের ভক্তকূল, শিষ্য, অমাত্যবর্গ তাঁর রচিত ‘চার্চে’র, দিব্য-ম-লীর, অংশ। কাজেই, এটা আশ্চর্যের নয় যে, জেনিভার এক সম্মেলনে বক্তৃতার সময় অনুরাগী শ্রোতৃবর্গের মনে হয়েছে: পল দা মান মনুষ্য নয়, জাজ্জ্বল্যমান ‘দেবতা’ (্এভেলিন ব্যারিশ, পূর্বোক্ত, ২০১৪, পৃ. ৩৯৮)।
১৭. এই বিলাতী ভক্ত (ডিকনস্ট্রাকশনের ওদেশীয় ‘নিজস্ব সংবাদদাতা’ বলা উচিত) পল দা মানের ওপরে স্বতন্ত্র বই লিখেছেন (পল দা মান, ক্রিস্টফার নরিস, রাথলেজ, ১৯৮৮), লিখেছেন দেরিদা ওপরেও (১৯৮৮)। বইতে পল দা মানের প্রশস্তি শেষ করার সময়, পল দা মানের হিটলার-ভক্তির কথা তাঁর কানে পৌঁছায়; প্রশস্তি বদলানোর সময় তখন আর নেই, অগত্যা বইয়ের পেছনে একটা ‘পোস্টস্ক্রিপ্ট’ জুড়ে দেন (১৯৮৮, পৃ. ১৭৭-১৯৮)। কিন্তু পুরো বইয়ের প্রশস্তির সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে মনে হবে, গুরুর অতীতের কাহিনী জানার পর নরিসের মুখে যেন কথা সরছেনা, তোত্লাচ্ছেন। তত্ত্বে তাঁর স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে কি না জানি না, তবে সম্প্রতি তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর প-িত কবি আলেকজান্ডার পোপের কাব্যগ্রন্থ ‘অ্যান এ’সে অন ক্রিটিসিজমে’র (১৭১১) আদর্শ অবলম্বনে পদ্যাকারে, পোপের মতই, ক্রিয়েটিভ ক্রিটিসিজম লেখা শুরু করেছেন (দি উইনোইং ফ্যান, ২০১৭)।