‘যুদ্ধই জীবন যুদ্ধই সর্বজনীন’। অর্থাৎ বলা যায়, জীবনের সাথে যুদ্ধের একটা অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। কেন না জীবনে তো যুদ্ধ করেই বাঁচতে হয়, টিকে থাকতে হয়। মানুষকে প্রকৃতির সাথে যেমন যুদ্ধ করতে হয়, তেমনি দশের এক হয়ে বাঁচতে কিংবা অধিকার আদায়ে অনিবার্যভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে হয়। মানুষের জীবনের সাথে যুদ্ধ, সংগ্রাম, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ প্রভৃতি অনুষঙ্গ নিবিড় সূত্রে গাঁথা। আধুনিক মানুষের যে রাজনীতি সচেতনতা বা রাজনৈতিক বোধ তা উপরিউক্ত সূত্রে প্রাপ্ত। প্রসঙ্গত বলা যায় আজকের আধুনিক মানুষ অনেক রক্তের ও সংগ্রামের পথ মাড়িয়ে এই আধুনিক যুগের পাদদেশে এসে পৌঁছেছে। অনিবার্যভাবেই এই আধুনিক মানুষকে আত্মসচেতন ও যুদ্ধকে মোকাবেলা করতে হয়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য খ্রিস্টপূর্ব যুগে আর্যিকরণ ও ১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজির বিজয়ের মধ্য দিয়ে বঙ্গদেশে জাতিগত ও সম্প্রদায়গত বিভেদ-সঙ্ঘাত পরিলক্ষিত হয় এবং তা দীর্ঘ সময় অন্তঃধারার মতো চলতে থাকে। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ এমনই বিভেদকে আরও ত্বরান্বিত করেছিল। ভারতবর্ষে এক সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব যে উন্মাদনা সৃষ্টি করে তার ফলে স্বাধীনতা প্রাপ্তির উন্মাদনা পুরো ভারতবর্ষে বিরাজ করে। হিন্দু মুসলমান মধ্যকার দাঙ্গা সাম্প্রদায়িকাতর রূপ পরিগ্রহ করে, উদ্ভূত হয় দ্বিজাতিতত্ত্বের। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলে ভারতে মুসলমানদের থাকা যেমন নিরাপদ হয়ে ওঠে না, তেমনি পাকিস্তানে হিন্দুুদেরও অবস্থান নিরাপদ হয়ে ওঠে না। এ সময়ে লক্ষ্য করা যায়, প্রাণ রক্ষার্থে অনেক মুসলমান যেমন ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে আসে তেমনি পাকিস্তান থেকেও অনেক হিন্দু ভারতে চলে যায়। ফলত দেখা যায়, সাধারণ লোকের মতো বাংলার স্বনামধন্য কতিপয় কবি কথাসাহিত্যিক; যেমন- হাসান আজিজুল হক, শওকত ওসমান, আবু রুশদ, রশীদ করীম প্রমুখকে ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে এসে বসতি স্থাপন করতে হয়। এইসব কথাসাহিত্যিক জীবনযুদ্ধে স্বভূমি থেকে উন্মূলিত হওয়ার হৃদয়ক্ষত-বেদনাকে অন্তর্লোকে লালন করেছেন ফল্গুধারার মতো। ফলত দেখা যায় শিল্পে, কাব্যের ক্যানভাসে ও কথাসাহিত্যের বিস্তীর্ণ পটভূমিতে তার ছাপ পড়েছে প্রায়শ। বিশেষ করে তার রাজনৈতিক চেতনার উপন্যাসে এই উদ্বাস্তু সমস্যা ও হিন্দু মুসলমান দাঙ্গার বিষয়টি ফুটে উঠেছে প্রবলভাবে। সরদার জয়েনউদ্দিনের অনেক সূযের্র আশা, আবুল ফজলের রাঙা প্রভাত, আবু রুশদ-এর নোঙর, শওকত ওসমানের আর্তনাদ, ও সেলিনা হোসেনের গায়ত্রী সন্ধ্যা প্রভৃতি উপন্যাসে এই উদ্বাস্তু সমস্যা, বাস্তুভিটা থেকে উন্মূলিত হওয়ার হৃদয়বিদারক বেদনা তীব্রভাবে উঠে এসেছে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে স্বাধীনতা প্রাপ্তি নব্য রাষ্ট্রীয় শক্তি পাকিস্তান সরকার প্রথমেই বাঙালির ভাষা অধিকার কেড়ে নিতে তৎপর হয়। ঢাকাসহ সারাদেশের তরুণ যুবক এর প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। দায়বদ্ধ কথাসাহিত্যিকগণ ভাষা আন্দোলন তথা একুশে ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপটে শিল্প রচনা করে। গানে কবিতায় উপন্যাসসহ শিল্পকলার বিচিত্র মাধ্যমে একুশের চেতনা প্রতিভাত হতে থাকে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হিন্দু-মুসলিম বিভেদ ও ভাষা আন্দোলনকে নির্ভর করে উপন্যাস সৃজিত হয়। অমর একুশ আমাদের উপন্যাস সাহিত্যে ব্যাপকভাবে চিত্রিত হয়। একুশের প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রথমের জহির রায়হান নির্মাণ করে ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাস।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনই এই উপন্যাসের ঘটনার প্রেক্ষাপট হিসেবে আবির্ভূত। আমরা দেখেছি ভাষা আন্দোলন নিয়ে যে কয়টি উপন্যাস রচিত হয়েছে তন্মেধ্যে এটি প্রথম ও অনন্য। সংঘশক্তি ও স্বার্থের কাছে ব্যক্তিশক্তি ও স্বার্থ যে একেবারেই ঠুনকো ঔপন্যাসিক তাও আমাদের জানান দেন। মুনিম ও ডলির ব্যক্তিক প্রণয় পরবর্তী পর্যায়ে যে জাতীয় জীবনে ভাষা আন্দোলনে একীভূত হয়েছে তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ এই ঘোষণার দাবিতে ছাত্র জনতা প্রতিবাদের আগুনে ফেটে পড়ে এবং একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষাদিবস পালনের ঘোষণা দিলে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যরাত থেকে ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ছাত্ররা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে মিছিল বের করে এবং তাদের সাথে জনতাও একাত্ম হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন আন্দোলনকারী ছাত্র জনতাকে গুলি করার হুকুম দিলে সালাম জব্বার বরকত রফিক শফিক শহীদ হয়। এই থেকে ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসে। ১৯৫৫ সালে ভাষা দিবস পালন করতে গিয়ে ছাত্রছাত্রীরা বন্দি হয়। জেল কর্তৃপক্ষ বন্দিদের জায়গা সংকুলান করতে না পেরে বিরক্ত হয়। বন্দি কবি রসুল চিৎকার করে বলে জেলখানা বাড়াতে। কারণ, আসছে ফাল্গুনে তারা দ্বিগুণ হবে।
উপন্যাসটির নামকরণে যেমন কাব্যময়তা তেমনি প্রতীকময়তার পরিচয় পাওয়া যায়। আরেক ফাল্গুনে দ্বিগুণ হবার মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক আসলে সংগ্রামী চেতনার দ্বিগাণুপাতিক স্ফুরণ বুঝানোর প্রয়াস পেয়েছেন। সরকার সংগ্রামী ছাত্রদের বন্দি করে যে কোনো ফল পাবে না, বরং তা যে সরকারের জন্য আত্মঘাতী হবে, কালক্রমে ছাত্র-জনতা দ্বিগুণ হয়ে তাদের দমনপীড়নকে প্রতিহত করবে তার প্রতিও ইঙ্গিত করেছেন লেখক। এই সংগ্রামী চেতনায় মুনিম কিংবা কবি রসুলই শুধু নয় উপন্যাসের তাবৎ চরিত্রগুলো সংগ্রামী চেতনায় উদ্বেলিত। নারী চরিত্রগুলো পুরুষের সমান্তরালে জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ। আরেক ফাল্গুন উপন্যাসে নারী চরিত্রের রূপ রাজনৈতিক চেতনার উজ্জীবনের অনুষঙ্গে। রাজপথে নামতে এদের এতটুকু দ্বিধা নেই। একজন গবেষকের মন্তব্য বিশ্লেষণ করা যায় :
গোটা উপন্যাসজুড়ে সালমার অবস্থান সুদৃঢ় এবং মুখরিত। প্রতিবাদী আন্দোলন করে তার স্বামী রওশন অঙ্গ হারিয়েছে, দীর্ঘদিন জেলের ঘানি টানছেÑ সালমা স্বামীর বিরহে কাতর ; ভালোবাসার মূল্যায়নে পরিবারের চাপেও অন্য কোন পুরুষকে সে গ্রহণ করতে পারে না। সারাক্ষণ যে বিবমিষা তার মধ্যে কাজ করে সেখানে সে আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রাজপথের আন্দোলনে শরিক হয়। সালামার পাশাপাশি নীলা, বেণু বাণুু নানারকম সামাজিক সমস্যা ও সংকট পেরিয়ে তারাও প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে জ্বলে ওঠে। (শহীদ ২০১০ : ৯৭)
আরেকজন গবেষকের মন্তব্য বিশ্লেষণ করা যেতে পারে :
সাহানার মতো নষ্ট চরিত্রের মেয়েরাও আন্দোলনের ধারার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। মুনিমের নগ্ন পা দেখে যে ডলি একুশের চেতনাবিরোধী মন্তব্য ধারণ করে মুনিমের কাছ থেকে সরে গিয়েছিলে এবং আদর্শহীন বজলের হাত ধরে নতুন স্বপ্ন দেখার উদ্যোগী হয়, সেই ডলি তার নিজের ভুল বুঝতে পেরে মুনিমের চেতনার কাছে ফিরে আসে। (আমিনুর ২০০৩ : ১৩০)
উল্লিখিত উদ্ধৃতি দুটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নারী এই উপন্যাসে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছে। পুরুষের চেতনা সঞ্চারে কখনো তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে কখনো সহযোগী হিসেবে কখনো নিজেরাই রাজপথ নেমে প্রতিবাদী কণ্ঠ ধারণ করেছে। শিক্ষিত ভদ্র চরিত্রই শুধু নয়, নষ্ট ভ্রষ্ট নারীরাও ছাত্র-জনতার সাথে একাত্মতা গ্রহণ করেছে। সাহানার আন্দোলনে একীভূত হবার মধ্য দিয়ে আমরা তারই প্রমাণ পাই। এই উপন্যাসের সমান্তরালে জহিরুল ইসলামের অগ্নিসাক্ষী; শওকত ওসমানের আর্তনাদ; শওকত আলীর দক্ষিণায়নের দিন, অবশেষে প্রপাত; আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই প্রভৃতি উপন্যাসের চরিত্রের সাথে সাজুয্য আছে। আরেক ফাল্গুন উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মুনিমের সাথেও অপরাপর উপন্যাসগুলোর নায়ক চরিত্রে চেতনাগত সাদৃশ্যও পরিলক্ষিত হয়।
ভাষা আন্দোলনে নারীদের সংগ্রাম ও সম্পৃক্ততা নিয়ে গবেষকের তথ্য উপাত্ত হিসেবে হাজির করা যায় :
একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের ওপর পুলিশের বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে ১৯৫২ সালের ২৮ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার পুরানা পল্টনে নারীদের এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বক্তৃত করেন নুরজাহান মোর্শেদ, লায়লা সামাদ প্রমুখ। একই সঙ্গে নুরুল আমিন মন্ত্রিসভার পদত্যাগের দাবিও এই সভা থেকে জানান। কামরুন্নাহার লাইলী, হামিদা খাতুন, নুরজাহান মোর্শেদ, আফসারী খানম, নিবেদিতা নাগ, রানু মুখার্জী, প্রতিভা মুৎসুদ্দী, রওশন হকসহ আরো অনেক নারী ভাষা আন্দোলনের সম্মিলিত সর্বদলীয় ভাষা সংগ্রাম পরিষদের লিফলেট বিলি, নারী জমায়েত, নারীদের মধ্যে সঠিক বক্তব্য পৌঁছানোর কাজ করেন। ঢাকা সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে নারীরাও ছিলেন। তাদের মধ্যে নাদেরা চৌধুরী ও লিলি খানমের নাম উল্লেখযোগ্য (আনোয়ার হোসেন ও মামুন সম্পাদিত ১৯৮৬ : ৪২২)
উপন্যাসের আখ্যান নির্বাসনে আমরা ঐতিহাসিক সত্যের প্রমাণ পাই। আলোচ্য উপন্যাসে নারীর রূপ শুধুমাত্র সংগ্রামে প্রতিবাদে নয়, বাংলাদেশের জাতীয় চেতনারূপের সঙ্গে একীভূত।
একুশের ফেব্রুয়ারি রাজপথে রফিক জব্বার বরকত আত্মাহুতিতে সারাদেশ মিছিলে ফেটে পড়ে। কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর বসত উপন্যাস সেই শ্লোগান ও একুশের প্রেক্ষাপটকে আমরা চিত্রিত হতে দেখি। এই উপন্যাসের নায়ক আপন বাস্তু থেকে উন্মূলিত হয়ে পাকিস্তানে এসে বসতি স্থাপন করার পরই পাকিস্তান সরকারের নয়া ঔপনিবেশিকতায় ক্ষুব্ধ হয়ে কংগ্রেস আদর্শে পুষ্ট নবগঠিত ‘ছাত্র ইউনিয়নে’ যোগ দেয় এবং মিছিল করার প্রাক্কালে পুলিশ কতৃর্ক ধৃত হন। কারাবাসে দীর্ঘদিন অতিবাহিত করতে হলেও রাজনীতি না করার অঙ্গীকারে সরকার ছেড়ে দিতে চাইলেও কেন্দ্রীয় চরিত্র রায়হান তাতে রাজি হয় না বরং জনৈক জেলারের রাজনীতি করা প্রশ্নে তিনি রাজনীতির সংজ্ঞায়নে বলেন : ‘আমি রাজনৈতিক দলের লোক নই, রাজনীতি করিনি, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি।’ (শওকত ২০০৫ : ২১১)
ওয়ারিশ শতাব্দীকাল পরিসরের বিস্তীর্ণ পটভূমির চার পুরুষের জীবনাখ্যান বিধৃত অপেক্ষাকৃত বৃহৎ কলেবরের উপন্যাস। ভারত বিভাগ-পূর্ব এবং উত্তরকালে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতে উদ্ভূত উদ্বাস্তু সমস্যা ও সংকটকে ঔপন্যাসিক বিষয় কৌশল হিসেবে নির্বাচন করেছেন। জাতিগত বিভেদ ও হীন রাজনীতি মানুষের জীবনকে যে বিপর্যস্ত করে দেয় শওকত আলী তা-ই প্রকাশের প্রয়াস চালিয়েছেন ওয়ারিশ উপন্যাসে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির কবল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা প্রাপ্তির আকাক্সক্ষা ছিলো একটা শোষণমুক্ত সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র বিনির্মাণের। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির পর শাসক গোষ্ঠী পূর্ববাংলা নামক ভূ-খন্ডকে ব্রিটিশ শাসকের খোলস পাল্টে নিজেরাই শোষক শক্তিতে পরিণত হয়। আধুনিক মানসপুত্র গওহর পুত্র মুর্শেদের পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে আত্মনিয়োগ করে। কিন্তু হীন রাজনীতির অন্তর্সংঘাতে সবকিছু হারায় মুর্শেদ, অবশেষে পার্টি থেকে মনোনয়ন পর্যন্তও পায় না। তার প্রশ্ন এই যে, এই কি রাজনৈতিক আদর্শ? একসময় মুর্শেদ রাজনীতি থেকে সরে সংসার ধর্মেকর্মে আত্মনিয়োগ করে, বাড়ি গাড়ি করে সুখের সংসার গড়ালেও সাম্প্রদায়িকতার কবলে বাস্তুভিটা থেকে তাকে উন্মুলিত হতে হয়। মুর্শেদের ঐ উন্মিলনের সাথে আবুল ফজলের রাঙা প্রভাত-এর কামাল, অনেক সূর্যের আশা-এর রহমতের সাথে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। এই দুই উপন্যাসের কামাল ও রহমতের মতো মুর্শেদও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার স্বপক্ষে মত দিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শাসকের শোষণ ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও টাউট ও সুবিধাবাদীদের দৌরাত্ম্য ও রাজনীতির হীন ও জঘন্য চালচিত্র, কোন্দল ও অন্তর্দ্বন্দ্বে তাদের স্বপ্নভঙ্গ ঘটে। পাকিস্তান নামক নবীণ ভূ-খন্ডে তারা পুরনো শাসককেই নতুনরূপে দেখতে পায়। এই উপন্যাসত্রয়ের তিন নায়কই হিন্দু-মুসলমানের মিলিত প্রয়াস দেখেছেন। রাঙা প্রভাত-এর কামালের মতো মুর্শেদ উদার মানবতাবাদী ও স্বাতন্ত্র্যবাদী চেতনায় উজ্জীবিত। তবে মুর্শেদের সাথে কামালের পার্থক্য হলো কামাল যেখানে হিন্দু মেয়ে ‘মায়া’কে বিয়ে করে অসাম্প্রদায়িকতার পরিচয় দেয়, মুর্শেদ সেখানে হিন্দু মেয়ে দীপান্বিতাকে ভালোবাসলেও তাকে ঘরে তুলতে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতাবোধের সাথে সরদার জয়েনউদ্দিনের অনেক সূর্যের আশা-এর রহমতের সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।
শওকত ওসমানের আর্তনাদ উপন্যাসে দেশবিভাগ কাল-পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকায় এসে বসত স্থাপন করে আলী জাফর পরিবার। বসত-এর রায়হানের মতো আলী জাফর ম্যাট্রিক পাস করে। অভাব অনটনের সংসারে আলী জাফরের মতো রায়হানও টিউশনি করে। হোস্টেলে থাকা অবস্থায় জাফর অধ্যাপক নগীবউদ্দিন ও সালামদের সঙ্গে পরিচয় সূত্রে রাজনৈতিক চেতনায় উজ্জীবত হয়। পক্ষান্তরে রায়হান আলী হেনুও কলেজ পড়া অবস্থায় ও জেলে অন্তরীণকালীন প্রগতিবাদী গণতন্ত্রী পার্টির নেতা হাজী দানেশ, বরদা চক্রবর্তী প্রমুখের সাথে সহাবস্থানের ফলে রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রাজপথে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় আলী জাফর কিন্তু হেনু রাজপথে মিছিল করে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে অন্তরীণ হয়। এভাবেই তাদের নবীণ রাষ্ট্রে স্বাধীনতা প্রাপ্তির স্বপ্নভঙ্গ ঘটে। মূলত লেখকদ্বয় একই প্রেক্ষণবিন্দু থেকে স্বাধীনতার স্বপ্ন কিভাবে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলো তাই দেখিয়েছেন। তবে পার্থক্য এই যে, আর্তনাদ-এ শোষণ-বঞ্চনা ও ভাষা অধিকার বিষয় অঙ্গীভূত। কিন্তু বসত উপন্যাসে বর্ণিত বিষয়ানুষঙ্গসহ পূর্ববাংলাকে নিয়ে আর একটি নবীণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার দাবির অনুষঙ্গ পাওয়া যায়।
যে আশা এবং প্রত্যাশা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিলো, নতুন করে ঔপনিবেশিক পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্রের শোষণ ত্রাসন বাঙালির স্বপ্নভঙ্গের বেদনাকে জাগ্রত করে। তাই শুরু থেকেই ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা তাদের উজ্জীবিত করে। (আমিনুর রহমান ২০০৩ : ১১৩)
এই উজ্জীবনের সার্থক সৃষ্টি আবু রুশদের আর্তনাদ ও শওকত আলীর বসত। ঔপন্যাসিকদ্বয় বিষয় কৌশলে চরিত্র নির্মাণে ও পটভূমি নির্বাচনে সাদৃশ্যমূলক কৌশল অনুসরণ করেছেন।
শওকত আলীর অগ্রজ লেখক আবু রুশদ-এর নোঙর উপন্যাসের বিষয়বস্তু বসত-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশভাগের পর ইনকামটেক্সের কর্মচারী কামালকে ঢাকা শহরে এসে বসবাস শুরু করতে হয়। ঢাকা শহরের অবক্ষয়ের ক্ষতচিহ্নে অনিবার্যভাবে জড়িয়ে যায় সে।
ফলে পাকিস্তান সম্পর্কে তার স্বপ্ন ভাঙতে থাকে। আখ্যানের বাঁককৌশলে দেখা যায় শওকত আলীও বসত উপন্যাসের হেনুও দেশভাগের পর পাকিস্তানে এসে আবাস স্থাপন করে। কামাল ও রায়হান এরা উভয়ই রাজনৈতিক কর্মী। কিন্তু পাকিস্তান শাসক চক্রের শোষণ বঞ্চনা ও বিমাতাসুলভ আচরণ ও দমন-পীড়নের প্রেক্ষিতেই কামাল যেমন কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী না হয়েও রাজনীতি সচেতন তেমনি হেনুও রাজনৈতিক দলের কর্মী না হয়েও রাজনীতি সচেতন।
এভাবেই আমরা দেখতে পাই অমর একুশ আমাদের উপন্যাস শিল্পে ব্যাপকভাবে চিত্রিত হয়েছে। ঔপন্যাসিকগণ রক্তাক্ত রাজপথের চিত্রের পাশাপাশি ভাষা অধিকারের প্রসঙ্গটি তুলেছেন জোরালোভাবে। সেই অমর একুশের চেতনায় পরবর্তী পর্যায়ে স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তরিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে।