সমকালীন কথাসাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২) একজন জনপ্রিয় লেখক। কিশোর বয়সী থেকে মধ্যবয়সী, বৃদ্ধ কিংবা স্বল্পশিক্ষিত থেকে বুদ্ধিজীবী পন্ডিত- সকলেই তাঁর গল্প-উপন্যাসের আগ্রহী পাঠক। এক জাদুকরী ক্ষমতায় সকল পাঠককে কাছে টানেন তিনি। তাঁর গল্পে আছে গতিময় সহজ-সরল ভাষাবিন্যাস, চিত্রল বর্ণনা, অভাবনীয় ঘটনা বিশ্বাসযোগ্য ভাবে উপস্থাপনের মনোহারী কৌশল আর অকল্পনীয় চমকপ্রদ সংলাপ।
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস বা গল্পের কাহিনীতে ছড়ানো আছে আমাদের চিরচেনা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনের আশা-নিরাশার অনিশ্চিত দোলাচল প্রবণ মূল্যবোধ, তার সামান্য লাভ-ক্ষতির বন্ধনে অন্তরঙ্গ অস্তিত্ব। হুমায়ূনের সৃজনীসত্তার মনন কল্পনায় সাধারণ (মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত) মানুষের কাতর জীবন ছড়িয়ে আছে তাঁর প্রায় প্রতিটি গল্পে।
‘‘উনিশ একাত্তর’’ ও ‘‘জলিল সাহেবের পিটিশন’’ দুটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প। ‘‘উনিশ শ’ একাত্তর’’-এ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকসেনা কর্তৃক সাধারণ মানুষের উপর বর্বরোচিত ও ন্যক্কারজনক অত্যাচারের অমানবিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গল্পের আজিজ মাস্টার ভীরু প্রকৃতির সাদা-মাটা সহজ-সরল একজন মানুষ। গ্রাম থেকে অধিকাংশ মানুষ পালিয়ে গেছে কিন্তু পালানোর ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সে পালাতে পারে নি; ছোটবোনের প্রসব বেদনার কারণে। ভিতু হলেও সে দায়িত্ববান- অবশেষে নির্ভীক প্রাণ।
মেজর কর্তৃক যখন আজিজ মাস্টারকে বিবস্ত্র করা হয়-প্রথমে সে কিছুটা বিচলিত হয় বটে কিন্তু পরে তাকে কাপড় পরতে বলা হলেও সে কাপড় পরে না। বরং ‘হঠাৎ একদলা থুথু ফেলল। সেই থুথু মেজর সাহেবের ডান প্যান্টের হাঁটুর কাছে এসে পড়ল।’ এভাবেই একজন সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত প্রাইমারির শিক্ষক আজিজ মাস্টার হুমায়ূনের গল্পে অসাধারণ হয়ে ওঠে।
‘‘জলিল সাহেবের পিটিশন গল্প’’-এ আছে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রেক্ষাপটের চিত্র। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার দীর্ঘদিন পরেও অপরাধীদের বিচার হয় না। ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দশ লাখ ইহুদি মারা গিয়েছিল। সেই অপরাধে অপরাধীদের প্রত্যেকের বিচার করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। কিন্তু এ দেশে ত্রিশ লক্ষ মানুষ মেরে অপরাধীরা কি করে পার পেয়ে গেল?’ মুক্তিযুদ্ধে শহীদের পিতা জলিল সাহেবের মনে এমনি কথা ঘুরপাক খায়। জলিল সাহেব বত্রিশ হাজার স্বাক্ষর সংবলিত দরখাস্তের ফাইল রেখে মারা যান। আশির দশকের প্রেক্ষাপটে লিখিত গল্পে জলিল সাহেব অসমাপ্ত কাজ রেখে মারা গেলেও তাঁর চেতনার মৃত্যু হয় না।
‘‘কবি’’ ও ‘‘আনন্দ বেদনার কাব্য’’ গল্প দুটি নিম্নবিত্ত গ্রাম্য কবিকে নিয়ে লেখা। যারা হৃদয়াবেগ দিয়ে সমাজকে অনেক কিছুই দিতে চায় কিন্তু বিনিময়ে সমাজের কাছে থেকে কিছুই পায় না। ‘‘কবি’’ গল্পে দেখা যায় কবি জোবেদ আলির মেয়ের প্রচন্ড জ্বর। মা মরা মেয়েটি বাবা বাবা বলে বিলাপ করে কিন্তু ‘বাইরে ঝড়-বৃষ্টির শব্দে সে ডাক চাপা পড়ে যায়।… তার মনে অদ্ভুত সুন্দর একটা লাইন এসেছে…।’ গল্পটি বনফুলের ‘‘হাসির গল্প’’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। ‘‘কবি’’ গল্পের জোবেদ আলির মতোই হরিহর বাবুর সংসারে নিত্য অভাব। নিজেও অসুস্থ। জরা আর দুঃখ-দুর্দশা তার পরিবারে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। কিন্তু এরই মধ্যে তাকে ‘‘হাসির গল্প’’ লিখতে হবে। কেননা ‘সম্পাদক মহাশয় তাগাদা দিয়েছেন, নিজের তাগাদাও প্রবলতর।… হাসির গল্প লেখাতেই তাহার নাম।’- এটাই জীবন।
‘‘আনন্দ বেদনার কাব্য’’ গল্পে কবির বইটির নাম ‘রিক্তশ্রী পৃথিবী’। উচ্চমার্গের কোনো সাহিত্য নয়; সস্তা ছাপাখানায় অস্পষ্ট ছাপায় অপরিপক্ব পদ্যগুচ্ছ। এই বই ছাপাতে তার কষ্টে সঞ্চিত শেষ মুদ্রাটিও হয়ত চলে গেছে। ‘কিন্তু তাতে কি একটি দিনের জন্য হলেও তো এই পরিবারটির জন্য আনন্দ এসেছিল।’
হত দরিদ্র বানভাসি মানুষের বুকচাপা আর্তনাদ আর হাহাকার প্রকাশিত হয়েছে ‘‘বান’’ গল্পে। অঝরে বৃষ্টি হচ্ছে দিনরাতব্যাপী। শোঁ শোঁ নদীর গর্জন সেই সাথে মাঝরাতে কলকল করে বানের পানি ঢুকছে রহমানের বাড়ির ভিতর। মা, বৃদ্ধা দাদি, ভাইবোন আর স্ত্রী সন্তান নিয়ে তার সংসার। ২৬ বছরের জোয়ান সে। কিন্তু রহমান প্রকৃতির প্রতিকূলে বানের হাত থেকে তার ঘরবাড়ি রক্ষা করতে পারে না। প্রকৃতির কাছে যে আমরা নিতান্তই ক্রীড়নক- সেটাই প্রকাশ পেয়েছে এই গল্পে।
‘‘সুলেখার বাবা’’ গল্পে দেখা যায় একজন দারিদ্র্যপীড়িত পিতার করুণ কাহিনী; যে অভাবের তাড়নায় অতিশৈশবে নিজ সন্তানকে এক বিত্তশালীর কাছে বিক্রি করে দেয়। পরে পিতৃত্ববোধের তাড়নায় সে মেয়েকে এক নজর দেখতে আসে। কিন্তু মেয়েটি (সুলেখা) জানে না ঐ নিঃস্ব ভিখারি তার বাবা। ধনী গৃহকর্ত্রী তাকে দেওয়ার জন্য সুলেখার হাতে একশত টাকা দিয়ে পাঠালেও সে নেয় না। রবীন্দ্রনাথের ‘‘কাবুলিওয়ালা’’ গল্পের মতোই বাৎসল্য প্রেমে সিক্ত এক পিতা-সুলেখার বাবা। পার্থক্য- কাবুলিওয়ালা অন্যের মেয়ে মিনিকে দেখে তার নিজ মেয়ের মুখচ্ছবি হৃদয়ে অঙ্কন করে; আর সুলেখার বাবা নিজ মেয়ে সুলেখাকে নিজের পরিচয় দিতে পারে না; এক নিদারুণ অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে সে বিদায় নেয়।
একজন দারিদ্র্যপীড়িত রিকশাওয়ালার শেষবেলার কাহিনী হলো ‘‘অপরাহ্ন’’ গল্পটি। প্রথমে ইসহাক সাহেবের রিকশাওয়ালাটিকে পছন্দ হয় না-‘কেমন উদ্ধত ভাবভঙ্গি’। সচরাচর রিকশাওয়ালাদের মতো তাকে চালবাজ বা ফন্দিবাজ মনে করে। ইসহাক সাহেবের মনে হয় বাড়তি কিছু আদায়ের জন্য সে যে কোনো সময়ে গল্প ফেঁদে বসবে। তাই রিকশাওয়ালা রিকশা থামিয়ে শরীর খারাপের কথা বললেও তিনি বিশ্বাস করেন না। কিন্তু যখন তিনি দেখেন রিকশাওয়ালা রক্তবমি করছে তখন তাঁর টনক নড়ে। রিকশাওয়ালা মারা যাচ্ছে তখন তার মুখে শোনা যায়-‘সাব আপনে আমার রিকশাটা দেখবেন। গরিব মানুষ রিকশা গেলে সর্বনাশ।’ হতদরিদ্র মানুষের কাছে জীবনের চেয়ে তার জীবিকার উৎস (বাহন) অনেক বড়- উপরের উক্তির মধ্যে সেটাই প্রতীয়মান হয়।
নিম্নবিত্ত পরিবারের সঙ্গে উচ্চবিত্ত পরিবারের আত্মীয়তা হলে কেমন অব্যক্ত যন্ত্রণার সৃষ্টি হয় তা ফুটে উঠেছে “জীবন যাপন” গল্পে। বাবার মৃত্যুর পর বিনুদের পরিবার অকূল সমুদ্রে পতিত হয়। মা’সহ তারা চার ভাইবোন বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের কাছে পরগাছার মতো বড় হতে থাকে। বিনুর বিয়ে হয় এক বিত্তশালী অর্ধবয়সী বৃদ্ধের সাথে; এতে বিনুর মনে কোনো প্রকার ক্ষোভ প্রকাশ পায় না বরং সব সময় স্বামী ও স্বামীর বাড়ির প্রশংসায় সে পঞ্চমুখ থাকে। মুখবুজে সব অন্যায়-অত্যাচর সহ্য করে। কাজের মেয়ে ময়নার মা যখন প্রেগন্যান্ট হয় তখনও বিনু কিছু বুঝতে পারে না কিংবা বুঝেও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। এক সময় এ কারণে একরাত্রিতে বাসাবদল করলেও বিনু পূর্বের মতোই স্বামীকে দেবতার মতো ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। অর্থই মানুষকে অন্যায়-অত্যাচার করতে শেখায়; অন্যায়কে চাপা দেয়। আর অর্থহীন দারিদ্র্যপীড়িতদের তা মুখবুজে সহ্য করে নেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না-এটাই তাদের ‘জীবন যাপন’।
‘‘সৌরভ’’ গল্পটিও একজন দারিদ্র্যপীড়িত নিম্নমধ্যবিত্ত বাবার করুণ কাহিনী। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও যিনি নিজের টাকায় মেয়ের শখ পূরণ করতে পারেন না। মেয়ের শখ পূরণে অন্যের কাছে টাকা ধার করতে হয়। বাবা হিসেবে মনের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করে। ‘তার মনে হয় তিনি কুকুরের জীবন-যাপন করছেন।’
পাখি শিকারের একটি অনবদ্য কাহিনী হলো ‘‘শিকার’’ গল্পটি। অন্ধ মতিমিয়ার ছেলে আজরফ পোষাবক খাঁচায় পুরে ‘বকশিকার’ করে বেড়ায়। মতিমিয়াও এক সময় এ কাজ করত কিন্তু এর কারণে বকের ঠোকরে তার দু’টি চোখই হারাতে হয়েছে। তাই ছেলেকে বারবার নিষেধ করে বকশিকার করতে। কিন্তু ছেলে বাবার কথার ভ্রুক্ষেপ করে না। পরিশেষে দেখা যায় মতিমিয়ার কথাই যেন সত্য হয়; তার পোষাবক অনুফাকে যেন মনে হয় অতিকায় কোনো অচেনা পাখি। পাখিটি যেন অন্য পাখিদের সঙ্গে করে তেড়ে আসছে তার দিকে। একটা সংস্কার কাজ করছে আজরফের মনে। পিতার কথা না শুনলেও তার কথাগুলো হৃদয়ে গেঁথে থাকে। শেষে আর বকশিকার করতে পারে না; বরং তার পোষাবকটিকেও সে মুক্ত করে দেয়। ‘ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়’- এমন সত্য কথাই যেন গল্পটিকে উজ্জীবিত করেছে।
হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস ‘‘নন্দিত নরক’’ পড়ে প্রথিতযশা সাহিত্যিক ড. আহমদ শরীফ বলেছিলেন, ‘‘হুমায়ূন আহমেদ বয়সে তরুণ, মনে প্রাচীন দ্রষ্টা, মেজাজে জীবন রসিক, স্বভাবে রূপদর্শী, যোগ্যতায় দক্ষ রূপকার। ভবিষ্যতে তিনি বিশিষ্ট জীবনশিল্পী হবেন।’’ ড. আহমদ শরীফের এই ভবিষ্যৎবাণী বিফলে যায়নি। হুমায়ূন আহমেদ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় লেখক। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, সম্ভবত জনপ্রিয়তায় তিনি শরৎচন্দ্রকেও ছাড়িয়ে গেছেন। আর এ জনপ্রিয়তার মূলে রয়েছে তাঁর গল্পে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজের মানুষের নিগূঢ় চিত্রের প্রতিফলন। হ