কাগজটির শরৎ সংখ্যাতেও ছিল চিত্তবৃত্তির ভাঙ্গাগড়া। ছিল লিখিয়েদের আধ্যাত্ম চেতনার প্রচ্ছন্ন, আটপৌরে সাহিত্যচর্চা। প্রচ্ছদ রচনায় এমরান কবির ও জোবায়ের মিলন ছিলেন মনোযোগী কারিগর। তাদের লেখায় ফুটে ওঠে আদুল গায়ে মেঠো পথ দাপিয়ে বেড়ানো সেই ছোট্টবেলার শরৎ-এ আমার আমিত্ব। লেখকদ্বয়ের শরৎ ব্যাখ্যায় নিপাট প্রেমবোধ, চিত্রময়তার নিবিড় সমন্বয় যেন প্রচলিত উপমার বাইরে ভিন্ন এক নতুন উপমা, যেটা সংখ্যাটির আঙ্গিক বাড়িয়েছে বহুগুণ। সাক্ষাৎকার কন্টেন্টে চিনুয়া আচেবে সততই প্রেরণাদায়ী মহারথী। সাথে শ্রদ্ধেয় হাসনাত আবদুল হাই-এর আত্মস্মৃতির স্মৃতিকথন মনের কোন এক জায়গা খুব আলতো করে নাড়িয়ে দিল। অবিশ্বাস্য। এমন সজ্জনরা এমনিতেই ক্ষণজন্মা। আশরাফ আল দীনের স্মৃতিচারণের চিত্রায়ণ সত্যিই নিপাট। বিচিত্র সব বিষয় ছিল তাঁর সপ্রতিভ লিখনীতে। প্রবন্ধকার অন্তরা চৌধুরী তার প্রবন্ধে অত্যন্ত গতিশীল, নিটোল, আগাগোড়া রসালো কিন্তু সুরেলা একটা শিক্ষণীয় ব্যাপার তুলে এনেছেন পাঠক সমীপে। পুরো লিখায় কোথাও কোন টোল খায়নি। কবি ওমর আলী: নির্জনে এক কিংবদন্তী, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সমালোচনা সাহিত্যে হোরেস এবং মীম মিজানের নজরুল: মহাকবি হাফিজের ভাবশিষ্য লেখাটি অসাধারণ হয়েছে। লেখকের লেখা বিন্যাস ছিল ভাবগম্ভীর, যৌক্তিক। উঠে এসেছে নজরুল, হাফিজের যত অন্তমিল। প্রিয় কবি জাকির আবু জাফরের সাহিত্যের পথ প্রবন্ধে তিনি তুলে ধরেছেন, সাহিত্যের সরু পথগুলো কিভাবে আলপথ ছাড়িয়ে মূল পথে মিশে যায়। ছিল এক প্রস্থ সাহিত্য বর্ণন। মূলত এই প্রবন্ধের মাধ্যমে লেখক তার কলমের নিব দিয়ে ঝরিয়েছেন সাহিত্যের মিশেল সৌন্দর্য, টাইট বুনন, ঐতিহ্য চেতনা, ধ্রুপদী ভাবনার প্রায়োগিক মেলবন্ধন। প্রসংশনীয় লেখা নিঃসন্দেহে। পাঁচ তরুণর গল্পে যথাক্রমে শিল্পী নাজনীন, আসাদল্লাহ মামুন ভালো লিখেছেন। আবার পারভেজ আনোয়ার তার ‘চৌরের বউ’ গল্পে শুরু থেকে শেষ অব্দি পাঠককূলে একটি মেসেজ দিয়েছেন- ‘বিশ্বাস জিইয়ে রাখার’। এছাড়া হাসান রুহুলের ‘হাসু ভাই আমি ভালো আছি’তে মূল চরিত্র হাসুর মানসে গ্রাম্য নিভৃতা আঁখির স্বচ্ছন্দ, প্রাণোচ্ছল ছায়াসঙ্গিনী হয়ে স্বাপ্নিক হওয়াটাও লেখকের গল্পগাথুনির অনন্য কারিশমা। ভালোলাগাটা লেখক সমীপেই তোলা থাক। ভ্রমণালেখ্য চিত্রায়ণে মঈনুস সুলতান বরাবরই বিদগ্ধ। কবিতা গুচ্ছে ফরিদ আহমেদ দুলাল, ফকির ইলিয়াস, সৈয়দ রনো, হাবিব সিদ্দিকী, জামাল দ্বীন সুমন, মীর জাহান, শাহীন সৈকত, মারুফ শরীফ, আলমগীর আবীর, সেঁজুতি শুভর কবিতা ভালো হয়েছে। গুচ্ছ কবিতায় সাজ্জাদ বিপ্লবের লেখা যেন ‘নন সেন্স রাইম’ এর মত কবিতাময় শব্দসম্ভার। কিন্তু এমন লেখায় থাকে ভিন্নতর ডাইমেনশান, বহুমুখীনতা। এসব বহুমুখী শব্দশৃঙ্খলা এক ধরনের কবিতা যা ঘোরের জন্ম দেয়। পাশাপাশি মাসুম মুনওয়ার, মোস্তফা মাহাথীরও সুন্দর লিখেন। নাজিব ওয়াদুদের ধারাবাহিক উপন্যাস লেখা শুরু হয়েছে। তেমনি এই কাগজে ‘পদ্মাপাড়ের উপাখ্যানে’ তিনি নতুন আখ্যানশৈলী নির্মাণ করেন। কিন্তু এই আখ্যান অনেকাংশে ঝঞ্জাক্ষুদ্ধ মেরুময়। হালকা কুয়াশাময়। সালাউদ্দিন আইয়ুবের ‘উত্তরাধুনিকতার উত্তরকালে’র পাঠক বলেই জানি, লেখক অনেকটা উত্তরাধুনিকতা আক্রান্ত তথ্যসমৃদ্ধ, বিশদ উচ্চারণ। ছড়াগুচ্ছে নাসিরুদ্দিন তুসী, মোহিনী ইসলামের আঞ্চলিক ছড়া অসম্ভব ভালো হয়েছে। সাথে অগ্রজ মানসুর মুজাম্মিল, আরিফ বখতিয়ার, রফিক লিটন,ওদুদ মন্ডলও বেশ লিখেন। বই পত্রালোচনায় সবগুলো বইয়েরই সামগ্রিক ও মূলপাঠ্য বিষয়গুলো আন্তরিকভাবে উঠে এসেছে আলোচকবৃন্দের একাগ্র ভাবনায়। পাঠক এ সংখ্যা পাঠে মজেছেন। অবশ্যই। আসলে এই অনলাইন জামানায় পুরনো পাঠক যেখানে সাহিত্যপাঠে অনাগ্রহী সেখানে নবীশরা তো সাহিত্যে ঘরছাড়া। একদম। আর, কারো কাছে সাহিত্য হলো মায়াজাল। তারা তা বিছিয়ে সুতো ধরে টানতে থাকে। জালটা গুটিয়ে হয়তো কাছে এলে বলবে, ‘নাহ এ-তো সে নয়’…আবার বিছাবে, আবার গুটাবে! এ যেন প্রিয়তমার মুখ। বারংবার নস্টালজিক হতে হয়। শরৎ নিয়ে লেখক আবিষ্ট হন ঋতুচক্রের খেলায়। তাতে লেখার প্লট, স্বাতন্ত্য নয়, ধরা পড়ে বর্র্ণনার অভিনবত্ব। আর, নতুন এক মাত্রা সমৃদ্ধ ও পরিণত কাগজরূপে পাঠককে নতুন স্বাদে প্রকৃতিগন্ধময় করে অনেক বেশী স্মৃতিকাতর করতে পারবে। সন্দেহ নেই। সমাপ্তিতে কাগজটির নেপথ্যের চরিত্রগুলোর নিদারুণ শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বহুল প্রচার কামনা করছি। ধন্যবাদ।
চৌধুরী মুহাম্মদ রাশেদ
স¤পাদক: চৌকাঠ
একাডেমী রোড, ফেনী