শাফিক আফতাব : আপনার জন্ম ও বাল্যশিক্ষা নিয়ে জানতে চাই।
শওকত আলী : আমার জন্ম অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ১৯৩৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ থানায়। বাবা খোরশেদ আলী সরকার মা সালেমা খাতুন। আমার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় রায়গঞ্জের শ্রীরামপুর মিশনারি স্কুলে। এখানে আমার মা শিক্ষকতা করতেন। এরপর ১৯৪২ সালে রায়গঞ্জ করনেশন হাইস্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হই। এই স্কুল থেকেই শওকত আলী ১৯৫১ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করি। আমার ডাক নাম চাঁদ। এ নিয়ে একটি গল্প আছে। আমি যখন মায়ের পেটে তখন মা আমার স্বপ্ন দেখেন একটি চাঁদ তার পেটে ঢুকে গেছে। স্বপ্ন ভাঙার পর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এই ছেলে আমার সুনাম কামাবে। তখন আমার নাম রাখলেন চাঁদ।
শাফিক আফতাব : পশ্চিমবঙ্গ থেকে কখন এবং কেন বাংলাদেশে এলেন?
শওকত আলী : বিভাগোত্তর কালে আমাদের পরিবার সাম্প্রদায়িক রোষানলের শিকার হয়। একসময় রায়গঞ্জে থাকা আমাদের জন্য অনিরাপদ হয়ে ওঠে। ১৯৫১ সালের শেষের দিকে রাতের অন্ধকারে আমি আমার বড়বোন ও ছোট ভাইবোনসহ তৎকালীন পাকিস্তানের দিনাজপুর শহরে চলে আসি এবং একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করতে থাকি। এই বছরেই আমি দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ইন্টামেডিয়েটে ভর্তি হই। বাবার নিকট থেকে যে টাকা পয়সা এনেছিলাম, তা নিয়ে আমি ঐ বয়সেই দিনাজপুর কালীতলায় একটি বাড়ি কিনে ফেলি। ফলে অর্থকষ্টে পড়তে হয়। তখন আমি ও আমার বড় বোন শিক্ষকতা ও টিউশনি করে লেখাপড়া চালাই। পরে বাবা দিনাজপুরে এলে আমরা স্থায়ীভাবে দিনাজপুরে কালীতলায় বসবাস শুরু করি।
শাফিক আফতাব : শোনা যায়, আপনি নাকি দিনাজপুরে কলেজে পড়াকালীন ছাত্ররাজনীতি জড়িয়ে পড়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন? কেন এবং কিভাবে গ্রেপ্তার হলেন?
শওকত আলী : পাকিস্তান সরকারের শোষণপীড়নে আমাদের তরুণসমাজ ও বামপন্থি দলগুলো সোচ্চার হয়ে ওঠে। আমিও ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে যাই এবং কারারুদ্ধ হই। জেলে অন্তরীণ থাকাকালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হাজী দানেশ ও বরদা চক্রবর্তী প্রমুখের সাথে আমার পরিচয় ঘটে। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শ আমাকে মুগ্ধ করে। কারাগারে আটক থাকার একটা সুবিধাও আমি পেয়েছি। সেটা হলো আটককালীন সময়গুলোতে আমি জেল-পাঠাগারের সব বই পড়ে ফেলি। ১০ মাসের অধিক অধিক আমাকে জেল অন্তরীণ থাকতে হয়। জনৈক জেলার রাজনীতি না করার শর্তে আমাকে ছেড়ে দেয়ার অঙ্গীকার করেন। আমি রাজনীতি করিনি, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি, আমি কোনো শর্তে মুক্তি চাই না। আমি ১৯৫৩ সালে ইন্টারমেডিয়েট পাস করি। জেলে থাকাকালীন সময় সাহিত্য রচনার উন্মেষ ঘটে। ১৯৫৫ সালে আমি বিএ পাস করি।
শাফিক আফতাব : ঢাকায় কিভাবে এলেন এবং আপনার লেখালেখির শুরুটা কিভাবে হলো জানতে চাই?
শওকত আলী : আমার লেখালেখির শুরু তো একেবারে বাল্যকালে। প্রথম জীবনে আমি আবেগাক্রান্ত হয়ে বহু ছড়া-কবিতা লিখেছি। গল্প-টল্প লেখা ধরেছি তার অনেক পরে। স্কুলে আর আট-দশজনের মতো আমার ভেতরেও ‘ভাবে’র উদয় হতো। এই ‘ভাব’ উদয় হওয়ার ফলাফল ছিল ছড়া-কবিতা। যখন স্কুল ডিঙিয়ে কলেজে ভর্তি হলাম, তখন কলেজ বার্ষিকীতে আমি অন্যদের দেখাদেখি কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। অধ্যাপক জিসি দেব ছিলেন আমাদের প্রিন্সিপাল। নজরুল ইসলামের ওপর আমার প্রবন্ধটার বেশ প্রশংসা করেছিলেন তিনি। মজার ব্যাপার হলো, স্বনামধন্য অনেক সাহিত্যিকের শুরুটা কবিতা দিয়ে হলেও আমার হয়েছে প্রবন্ধ দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় এমএ ভর্তি হতে গেলাম। মার্কস কম থাকায় ফিরে আসতে হয়। পরে জেসি দেব ও মুনীর চৌধুরী স্যার ভালো গল্প লেখার গুণের ফলে বাংলায় ভর্তি করিয়ে দিতে সাহায্য করেছেন। কিছুদিন পর আর্থিক সংকটের কারণে ঢাকা থেকে দেশে প্রত্যাবর্তন করতে হয়। আমি কিছুদিন দিনাজপুরে স্কুলে শিক্ষিকতা করি। ১৯৫৬ সালে পুনরায় ঢাকা আসি এবং পুনারায় ভর্তি হয়ে ১৯৫৮ এমএ পাস করি।
শাফিক আফতাব : আপনার কর্মজীবনের শুরু ও সমাপ্তি কিভাবে হলো?
শওকত আলী : বীরগঞ্জ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকের চাকরি দিয়ে আমার কর্মজীবনের সূত্রপাত। পরে ঠাকুরগাঁও কলেজে ০৩ বছর সময়কাল অধ্যাপনা করি। এখানে অধ্যাপনা করাকালীন শ্রমজীবী মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মেশার সুযোগ হয়। পরবর্তী জীবনে যা আমার সাহিত্য রচনার অনুষঙ্গ হয়েছে। ১৯৬২ সালে আমি পুনরায় ঢাকা আসি। এবার পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নিই। কিন্তু শিক্ষকতার প্রতি প্রবল টান আমার থেকেই যায়। পত্রিকায় নাটকের সমালোচনা লেখার সুবাদে সিকানদার আবু জাফর ও অজিত গুহের সহযোগিতায় ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করি। ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি এখানেই কর্মরত ছিলাম। ঐ বছরই আমি জেলা-গেজেটিয়ার উপ-পরিচালক নিয়োগ পাই। ১৯৯০ সালে আনন্দমোহন কলেজে আমার বদলি হয়। ১৯৯১ সালে শওকত আলী সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করি। ১৯৯৩ সালে আমার কর্মজীবনের সমাপ্তি হয়।
শাফিক আফতাব : প্রবন্ধ ও গল্প দিয়ে আপনার সাহিত্য শুরু হলেও গ্রন্থকারে প্রথমে প্রকাশিত হয়েছে উপন্যাস? আপনার প্রকাশিত প্রথম উপন্যাসের নাম কী? এর প্রেক্ষাপট কী?
শওকত আলী : আমার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস পিঙ্গল আকাশ। আমি আগেই বলেছি লেখালেখির শুরু কলেজ জীবনে বার্ষিক মেগাজিনে প্রবন্ধ লেখার মধ্য দিয়ে। এরপর জেলে অন্তরীণ থাকাকালীন কয়েকটি কবিতাও আমি লিখেছিলাম। পরে ঠাকুরগাঁও কলেজে অধ্যাপনা করাকালীন পিঙ্গল আকাশ রচনা করি। ঢাকা আসার পর এই উপন্যাস প্রকাশের জন্য আমাকে প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। পরে মুক্তধারা থেকে এই উপন্যাস প্রকাশিত হয়। বিভাগোত্তর কালে জাতিগত সহিংসতার কবলে পড়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়েছিলো আমাদের- যা অনিবার্যভাবে কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি করে। অন্য দিকে পাকিস্তান সরকারের শোষণপীড়নে তীব্র প্রতিবাদী চেতনা আমাকে চেতনালোকে দারুণভাবে তাড়া দেয়। আমি সাহিত্যকেই প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করি। প্রথম উপন্যাস পিঙ্গল আকাশ সামাজিক অসঙ্গতি ও অভাজনের জীবনমথিত কান্না হলেও এতে আমি সেনাশাসিত সরকারের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রেক্ষিতে সমাজবিন্যাসের অসঙ্গতি ও মানুষের নিরাপত্তাহীন জীবনের করুণ অনুরণন প্রতিফলিত করার চেষ্টা করেছি। এর পরবর্তী পর্যায়ে প্রদোষে প্রাকৃতজন, দক্ষিণায়নের দিন, অবশেষে প্রপাত, স্ববাসে প্রবাসে, প্রভৃতি উপন্যাসে আমি এই অনুষঙ্গই চিত্রায়ণ করার চেষ্টা করেছি। এদিকে ঢাকা শহরে শিক্ষা লাভের সুবাদে মধ্যবিত্তের সাথে মেশার সুযোগ হয় এবং তাদের অন্তর্জীবনের চালচিত্র অনুপুুুঙ্খ অবলোকন করি। নব্য ঔপনিবেশিক শক্তির মদদপুষ্ট এইসব উঠতি মধ্যবিত্তের শ্রেণির রূপাঙ্কন পরবর্তী পর্যায়ের রচনায় লক্ষ্য করা যাবে।
শাফিক আফতাব : আপনার লেখা উপন্যাস ‘ওয়ারিশ’ অনেকেই আত্মজৈবনিক উপন্যাস বলতে চান। এই উপন্যাসের চরিত্রায়ণে ও কাহিনীতে আপনার ব্যক্তিজীবনের রেখাপাত আছে কি?
শওকত আলী : আমি তখন থেকে কলেজে চাকরি করছি। ঠাকুরগাঁও কলেজে ছিলাম। তখন আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল। তখন তো পাকিস্তান। প্রশ্ন হচ্ছে যে, এই বাংলা অঞ্চলে মুসলমানের সংখ্যাটা বেশি। মোগল পাঠান যারা এখানে এসেছেন। হয়তো উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত ধরে। তারপর একটা একটা করে জায়গা দখল করতে করতে তারা সিন্ধু দেশ শাসনে বসে পড়লো। বাংলায় এসেছে বখতিয়ার খলজি এবং তিনি আসেন ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে। প্রায় পাঁচশো বছর পরে তো ব্রিটিশ শাসন আমল এলো। মুসলমানদের নিয়ে তারা চেয়েছিল যে আলাদা ভূখন্ড। তো সে হিসেবে আন্দোলনও হয়েছিল। মুসলমানরা সবাই সেই আন্দোলনে ছিল। একটা পর্যায়ে দেখা গেল মুসলমান নেতৃবৃন্দের মধ্যে তারা কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এলেন। তারপর, তাদের মনে সন্দেহ জাগলো যে কংগ্রেসের নেতৃত্বের মধ্যে উপরের দিকে তো সবাই হিন্দু। মুসলমান আছে তো, নিচের দিকে। তো এটা যদি হিন্দুদের শাসনে চলে যায় তো মুসলমানদের কী লাভ হবে? আমরা কী পাবো? তাই তাদের মনে প্রশ্ন জাগলো। আমার মনে হয় ব্রিটিশ শাসকরাই তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্য এই বুর্জুয়া চিন্তা ভাবনা সৃষ্টি করলো। এবং হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল। এটা তখনকার যুগে অনেকে করতো এবং এখনো অনেকেই ভাবে। যাই হোক মুসলিমদের মনের মধ্যে এই ধরনের ভাব জাগলো। তারপর থেকে তারা নিজেদের মধ্যে পার্টি গঠন করলো। তো তারা বিভাজনে গেল। তো তারা একটা পর্যায়ে এসে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নেতা বানালো। তারপরে পাকিস্তান কিভাবে ভাগ হবে, এর সীমারেখা কিভাবে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি ভাগ হলো। ফলে ওই আন্দোলন যখন খুব প্রবল হয়ে উঠেছে তখন মহাত্মা গান্ধী বললেন, ‘ভারতের মুসলমানরা মুসলিম লীগের এই দাবি সমর্থন করে না’। ফলে মুসলমানদের মতামত নেয়ার জন্য তখন একটা নির্বাচনের মত হয়েছিল। এর নাম ছিল রেফারেনডাম। রেফারেনডামে দেখা গেল ভারতের মুসলমানদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ মুসলমান পাকিস্তানের দাবি সমর্থন করেছে। বাকিরা করেনি। এর ফলে মহাত্মা গান্ধী নতুন কথা তুললেন : এটা যদি হয় তাহলে ভারতের প্রদেশগুলোকে ভাগ করতে হবে। সিদ্ধান্ত হয় যেসব প্রদেশে হিন্দুর সংখ্যা বেশি তারা ভারতের সঙ্গে থাকবে। আর বাকিরা পাকিস্তানের সঙ্গে যাবে। তখন ওই রেফারেনডাম চালু ছিল। তখন পাঞ্জাবে একটি বৈঠক বসলো। তখন তারা বিভিন্ন অংশ ভাগ করে নিলো। বেঙ্গলের পশ্চিম অংশটি পড়লো ভারতের সাথে। বাঙালির এত বড় গণ-অধ্যুষিত অঞ্চল কিন্তু সেখানে একটা প্রদেশ তারা দিলো না। কিন্তু তারপরে একটা ঘটনা জানা গেল। সেটা হচ্ছে এই, তখন তারা চায়-না আমরা আলাদা একটি প্রদেশের মালিকানা পাই। স্বভাবত মুসলমানরা। তখন প্রায় ৬০ ভাগ মুসলমান রায় দিল। তবে বাঙলার মুসলমানরা শতকরা ৭০ ভাগের বেশি পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন দিল। কিন্তু ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানরা সমর্থন দিয়েছিল ১৫ কি ১২ ভাগ। তবে বেলুচিস্তানে ২০ ভাগের বেশি আর পাঞ্জাবে আরো বেশি পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে সমর্থন জানালো। কিন্তু পাঞ্জাবেও পঞ্চাশ ভাগ হবে না। ৪৫ ভাগ। ফলে দেখা গেল পাকিস্তানেও ৫০ ভাগেরও কম লোক পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন জানালো না। তো যেটা করেছে, সেটা করলো বাঙালি মুসলমানরা। আসলে পাকিস্তানটা হয়েছে বাঙালি মুসলমানদের জন্য। সেই জিনিসগুলো উঠে এসেছে। সেগুলো একেবারে আমার কিশোর বয়সের থেকেই। এর কারণ হচ্ছে আমার বাড়ি থেকেই দেখে আসছিলাম আমি। আমার বাবা কংগ্রেসের সমর্থক ছিলেন এবং মা মুসলিম লীগের সমর্থক ছিলেন। যদিও তখন মুসলিম লীগের দাবি ছিল জাতীয় চেতনার। এ নিয়ে অবশ্য সংসারে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। মা বাবাকে বলতো কি পারো নাই? যাও এখন যাও তো। আমার মা তো ১৯৪৯ সালেই মারা গেলেন। আমি ‘ওয়ারিশ’ উপন্যাসে বিভাগোত্তরকাল থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সময়ে ধরার চেষ্টা করেছি। এই উপন্যাসে আমার বাবা মা ও আমার ব্যক্তিজীবনের ছায়াপাত আছে।
শাফিক আফতাব : ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসটিতে রাজনৈতিক চেতনা আছে, ইতিহাসের ঘটনা আছে। আর তৃণমূলের কথা দেখা যায়; সব মিলে বাঙালি জীবনের চিত্রায়ণ মেলে? এটি লেখার প্রেক্ষাপট বলবেন কি?
শওকত আলী : ওই আমি যখন স্কুল কলেজে পড়ছি তখন আমার ইতিহাসের প্রতি, সাহিত্যের প্রতি একটা কৌতূহল ছিল আরকি। কৌতূহলটা থাকার কারণটা ছিল এই যে, আমাদের পারিবারিক একটা ব্যাপার আছে। আমাদের পরিবারটি প্রধানত সম্ভ্রান্ত পরিবার ছিল আরকি। যেমন তখনকার দিনে আমার বাবাদের নানা, কি বলবো তাঁর কবরটা বাঁধানো ছিল। এটা ১৯৪০ সালের আগের ঘটনা। আমার ধারণা হলো মানুষ মরে গেলে এইরকম কবরে চলে যায়। আমার ভেতর প্রশ্ন জাগলো আর কবর নাই কেন?
পরবর্তীকালে আমি বুঝেছি যে, সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকদেরই কবর পাকা করে দেয়া হয়। আরেকটি ব্যাপার ছিল এই যে, আমাদের জমিজমা আধিয়া হয়ে চাষবাস করতো। আধিয়া মানে ফসলের যা হবে তার অর্ধেক সে নেবে আর বাকি অর্ধেক আমাদের দেবে। আমাদের বাড়ির উঠানে দু’টি ধান মাড়াইয়ের ব্যবস্থা ছিল। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ধান মাড়াই করা হতো, এরপর বস্তা ভরা হচ্ছে। এসবতো আর সবার বাড়িতে থাকে না। আমাদের দুটো গোলা ছিল। গোলায় ছাউনির মত ছিল। চারপাশে ছিল বাঁধ দেয়া বাঁশ। আর ওই গোলার মধ্যে রাখা হলো ধান। আর ওইখান থেকে গুদামিরা এসে ধান নিয়ে যেতেন। আমার দাদি সেই ধান দেয়ার কাজটি করতেন। উনি লেখাপড়া জানতেন না। তবে তিনি হিসেব-টিসেব বুঝতেন। যেটা দিয়ে ধান মাপা হতো ওটা ছিল টুকরির মতো ওটাকে বলা হতো কাঠা। যেটা বলছিলাম আরকি ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে আমাদের পারিবারিক যে পরিমন্ডলটা ছিল সেটা নিয়ে আমার ভেতর বাল্যকাল থেকেই কৌতূহল ছিল। আমাদের পূর্বপুরুষরা কোথায়? আমাদের কী ছিল, কী না ছিল? অতীতের দিকে একটা ঝোঁক গড়ে উঠছিল। আর ইতিহাস জানতে খুব ভালো লাগতো, বই পড়তে খুব ভালো লাগতো। তো ধরো, স্কুলে পড়ার সময় শরৎচন্দ্র পড়তে খুব ভালো লাগতো। তো বঙ্কিমচন্দ্র পড়া স্কুলে থাকতেই শুরু করেছি। তো রায়গঞ্জে উনিশ শতকের কিছু খবরাখবর জানতে পারতাম। এবং ওখানে একটি ছোট লাইব্রেরি ছিল। ওই লাইব্রেরিতে কিছু বই ছিল। ওখানে গল্প, উপন্যাসের টুকটাক বই নিয়ে আলোচনা হতো। তারপরে কৌতূহল জেগেছে মুসলমানদের মাদ্রাসায় পড়তে হয় কেন? হাইস্কুলেই যদি যাই আমি তাহলে মুসলমান ছেলেদের কি অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়?
মুসলমান ছাত্র সংখ্যা এত কম কেন? আমি যখন স্কুলে ক্লাস থ্রি, ফোরে পড়ি তখন ছয় সাতজন মুসলমান ছাত্র ছিল পঞ্চাশজন ছাত্রের মধ্যে। আমি যখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছি তখন মাত্র তিনজন মুসলিম ছাত্র ছিল। আঠারোজন পরীক্ষা দিয়েছে, মুসলমান ছাত্র ছিল মাত্র তিনজন। তখন তো পার্টিশনের পরে। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছেন আমার বড় ভাই। তো উনি, ওদের সঙ্গে মনে হয় ওইরকম চারজন মনে হয় ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিল। তখনকার সময়ে সবচেয়ে উলেখযোগ্য ব্যাপার ছিল এই যে, গানবাজনার চর্চা ছিল, গানের স্কুল ছিল। বাবার ঘনিষ্ঠ বুন্ধরা ছিল হিন্দু। এইসব বিষয় নিয়ে আমার কৌতূহল জাগতো। ইতিহাস কী জন্য পড়া দরকার! তারপরে যে কথাটা বললাম, এই অঞ্চলে মুসলমান আছে, মসজিদও আছে। এই যে ঘাঁটাঘাঁটি করছি, এই অঞ্চলে মুসলমানরা ছিল প্রভাবশালী। এই অর্থে তারা ভারতে প্রবেশ করছে এবং লক্ষণ সেনদের বিতাড়িত করেছে। ওই ঘটনাটা আমার মনে খুব খোঁচা দিত আরকি। আসলে ব্যাপারটা কী? এইসব বিষয় জিজ্ঞেস করতাম। লাইব্রেরিতে পড়তাম। হঠাৎ বই আমার চোখে পড়ে গেছে। সংস্কৃত বই। তখন তো মোটামুটি পড়তে পারি। বুঝতেও পারি আরকি। আমি ইংরেজি হরফে লেখা, হিন্দি হরফে লেখা পড়তে পারি তখন। সুতরাং ওই সময়ে বই পড়তে অসুবিধা হয়নি। ওই “শেখ শুভদয়া” বইটি পড়েছি। ওই বইটা নিয়ে খুব বিতর্ক ছিল তখন। উনি আবার লক্ষণ সেনের মন্ত্রীও ছিলেন। উনি কবিও। তো ওই বইটা নিয়ে বিতর্ক ছিল এই যে, এটা ওই লেখকের বই নয়, এটা অন্য কারো হবে। ওই বইতে যা লেখা আছে ঐতিহাসিকরাও তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখেননি। কিন্তু “শেখ শুভদয়া’র বাংলা করলে দাঁড়ায় শেখের শুভ উদয়। মুসলমানদের শেখ বলা হতো। বইটা পড়ে আমার মনে হয়েছিল, এবং এই পর্বটা নিয়ে আমার কৌতূহল ছিল। এটা নিয়ে আমি কল্পনাও করেছি। এর ফলে ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ বইটি আমি লিখেছি। যদিও লেখাটি আমি অনেক আগেই লেখেছি। এবং অনেক পরে প্রকাশিত হয়েছে। এরও আগে আমার ‘ওয়ারিশ’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল। তো ‘ওয়ারিশে’ আমাদের পারিবারিক বিষয়, অস্তিত্ব অনুসন্ধান, তার অতীতে কি ছিল, কে না ছিল, তাদের মধ্যে কি ঘটনা ঘটেছিল। এবং আমাদের পরিবার যে জমিদার ছিল, ফলে আমাদের জমিগুলো কিভাবে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিলো এইসবের বর্ণনা আরকি।
শাফিক আফতাব : ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে প্রদোষকালের প্রাকতজনের জীবস সংগ্রাম। এটি কখন কিভাবে মাথায় এলো যে এই নিয়ে উপন্যাস লিখতে হবে?
শওকত আলী : ওই যে বললাম তো এই সম্পর্কে কৌতূহল ছিল। ‘শেখ শুভোদয়া’ বইটা পড়ছিলাম এবং ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এর মধ্যে তো উল্লেখ আছে যে একটা মেলা হচ্ছে। মেলাটা হচ্ছে অশ্বের। আমাদের মনে কৌতূহল জাগে না এরাবিয়ান হর্স, ঘোড়া হচ্ছে আরব দেশে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। অর্থাৎ যে সমস্ত দেশে যারা রাজা মহারাজা ছিল, মানে এইরকম। তাদের একটা অশ্বারোহী বাহিনী রাখতে হতো এবং তাদের কাছে এরাবিয়ান হর্স খুব প্রয়োজনীয়। তো এরাবিয়ান হর্স আরব এরা আরকি। জবন বণিকরা, তখন তো জাহাজ ছিল না, কাঠের জাহাজ ছিল। তো সেই নৌকায় করে ঘোড়া নিয়ে আসতো আট দশটা। ঘোড়া বিক্রি করতো, বিক্রি করে আবার চলে যেতো। তারপরে ওই যে চরিত্রগুলো, চরিত্রগুলো কল্পনার, কাল্পনিক। তবে সেখানে একটি প্রশ্ন আছে। প্রশ্নটি হচ্ছে, নিম্নশ্রেণীর মানুষেরা যাদের অধিকারের সুযোগ ছিল না, তাদেরকে ব্যবহার করা হতো। এবং তাদের দাসের মতো অবস্থা ছিল। এবং সেই জন্য নিম্নশ্রেণীর মানুষদের কী অবস্থা ছিল? তাদের কাছে যখন যবন বণিকরা এলো, ঘোড়া বিক্রি করতে আসতো, সেটা একটা বিষয় ছিল। আর যখন যবন সাধুরা আসতে শুরু করলো জায়গায় জায়গায় তাদের ক্যাম্পেইন ছিল। রাজা লক্ষ্মণ সেনের সময় নাকি এই অঞ্চলে একাধিক যবন শ্রেণী ছিল। আর নিম্নশ্রেণীর মানুষরা সেখানে যেতো চিকিৎসার জন্য। অসুস্থ হলে তারা মন্ত্র পড়ে, আবার ঔষধ খাইয়ে তাকে সুস্থ করে তুলতো। আরেকটা কথা হচ্ছে ‘হলাইয়ুধ চিকিৎসক’ এই নামটা আমি আগে পাইনি। আমার মনে কৌতূহল ছিল, নামটার অর্থ কী? হলায়ুধ মানে হচ্ছে হল মানে হচ্ছে নাঙল, আয়ুধ মানে হচ্ছে অস্ত্র। তো অর্থ দাঁড়ায় লাঙলের অস্ত্র। এই যদি নাম হয় তার তাহলে সে জনগণের থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়বে। তাই না। এটা নিয়ে কিন্তু কোথাও আলোচনা হয়নি। কেউ করেওনি। এই হলায়ুধ শব্দ নামটা আসলে কী? এটা আমার চোখে পড়েছে। তো যাই হোক। ওই উপন্যাসের বিষয়টা ওই যে সাধারণ মানুষের অবস্থাটা কেমন ছিল? ওই সময়টায় মানুষের মধ্যে মানসিকতার পরিবর্তন, চিন্তার পরিবর্তন এইগুলো শুরু হয়েছিল। তারপের বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। লক্ষ্মণ সেনের সময়ে সাধারণ মানুষ অনেকবার বিদ্রোহ করেছিল। তো যাই হোক এইসব বিষয়গুলো আমাকে কৌতূহলী করেছিল। এবং আমি কিছু লেখাপড়া করেছিলাম তার ফল এই উপন্যাস ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’।
শাফিক আফতাব : আপনি আপনার গল্পে, উপন্যাসে নিম্নবর্গীয় মানুষদের যাপিত জীবন চিত্রিত করেন? কিন্তু জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন নগরে। কিভাবে সম্ভব জীবনাভিজ্ঞাতাবিহীন গল্প লেখা?
শওকত আলী : দেখো, আমার মনের ভেতর যে জাগরণটা হচ্ছে, লেখার জন্য আমি যে আনন্দ পাই, সেই সময়টা তো ওই বয়স থেকেই শুরু হয়েছে। কৌতূহল এই জন্য সৃষ্টি হয়েছে যে আমার কোনো কাজকর্ম নাই। আমি নানান জায়গায় ভ্রমণ করেছি। যেমন আদিবাসীদের পলীতে আমি ভ্রমণ করেছি। তারা কী খায়, কী পরে? আমার গল্পের মধ্যে, উপন্যাসের মধ্যে সাঁওতালদের উৎসবের কথা বলা হয়েছে।
শাফিক আফতাব : প্রবন্ধ দিয়ে আপনার লেখালেখি শুরু হলেও গল্প ও উপন্যাসেই আপনি খ্যাতিমান। গল্প লেখার শুরুটা কিভাবে হলো?
শওকত আলী : কথাটা সত্যি। পৃথিবীর অনেক দেশেই সমালোচনার বিষয়টি সাহিত্যের মর্যাদায়ই চলে গেছে। আমাদের এখানে আমি মনে করি, সমালোচনা সেরকম জায়গায় যায়নি। সামনে যে যাবে সে-সম্ভাবনাও আমি দেখি না। আমি আমার নিজের লেখা গল্প নিয়েই বলতে পারি, আমার এমন অনেক গল্প আছে, যেগুলো নিয়ে সমালোচনা করা কোনো কাজই করেননি। আমার এখন মনে হচ্ছে এসব গল্প নিয়ে আলোচনা হলে গল্পগুলো পাঠকদের মধ্যে আরো বেশি আলোড়ন তুলতো।
শাফিক আফতাব : আপনার প্রায় গল্পেই দেখা যায় ঘুরে ফিরে এসেছে সেই নিম্নবর্ণের মানুষই। এরা কিভাবে আপনার গল্পের চরিত্র হয়ে উঠে এলো?
শওকত আলী : আগেও আমি তোমাদেরকে বলেছি, ছাত্রজীবনে আমি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। চোখের সামনে অনেক স্বপ্ন ছিল। ওই সময়ে যে রকম থাকে আর কি! ছাত্ররাজনীতি করার কারণে অল্পবয়সে জেলও খেটেছি। তবে, হ্যাঁ, জেলজীবনে আমার অনেক প্রাপ্তিযোগের মধ্যে একটি হলো বিখ্যাত কৃষক নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশের সঙ্গে জেল খাটা। বন্দি সাঁওতালদের সঙ্গে তাদের জীবনাচার, কৃষ্টি, গঞ্জনা-বঞ্চনার কথাও শুনেছি অনেক। আর জেলের লাইব্রেরির সব বই প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। কী বিচিত্র বিষয়ের সেসব বই! আরেকটা কথাবলি, ছাত্র ইউনিয়ন করার সুবাদে আমার একটা স্বভাব ছিল, আমি সবসময় শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে থাকতাম। তাদের সঙ্গে চলাফেরা করে আমি জীবনে অনেক কিছু শিখেছি। পরে এই সমস্ত মানুষ আমার গল্পে উঠে এসেছে নানা রূপে, নানা মাত্রায়।
শাফিক আফতাব : আপনার গল্পে মানব-মানবীর লিবিডো ভাবনার চিত্রায়ণ নিয়ে কিছু বলুন।
শওকত আলী : এ-ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি আমাকে আগেও হতে হয়েছে। কিন্তু আমি মনে করি, আমি আমার মতো করে জীবনের জলছবি তুলে ধরার যৎসামান্য চেষ্টা করেছি। মানব-মানবীর মধ্যে যে বিচিত্র রকম সম্পর্ক থাকে আমি তা নির্মাণ করি মাত্র।
শাফিক আফতাব : শেষ পর্যন্ত মঙ্গল ও কল্যাণই আপনার সাহিত্যের বিষয় ও লক্ষ্য হয়েছে। কিন্তু প্রমথ চৌধুরীর মুখে শুনি; সে সাহিত্যের উদ্দেশ্য আছে, সেটা প্রকৃত সাহিত্য নয়। আপনি কী বলেন?
শওকত আলী : সাহিত্যের যদি উদ্দেশ্য না থাকে; কোনো লক্ষ্য না থাকে; সেটাতে যদি কোনো সুন্দর ও কল্যাণ না থাকে তবে সেটা সাহিত্য নয়। জীবনে আমি যা কিছু সুন্দর ও কল্যাণ বলে জেনেছি; তা-ই চিত্রায়ণ করার চেষ্টা করেছি। তৃণমূলের কথা বলতে না পারলে, অন্যায়ে প্রতিবাদ করা না শিখলে তা সাহিত্য নয়; তা অপসাহিত্য।