জীবনানন্দ দাশ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবিদের একজন। তিনি শ্রেষ্ঠ বিষয়বস্তু এবং আঙ্গিক ও নতুনত্বের কারণে। তাকে নারী, নদী ও নিসর্গের কবি হিশাবে কেউ কেউ আখ্যায়িত করেন। কিন্তু এর বাইরে তিনি ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণকে চ্যালেঞ্জ করেছেন নগ্ন হস্তে। যার প্রথমটি শুরু করেন নিজের নামের শেষ অংশে পরিবর্তন এনে। ১৯৩২ সাল পর্যন্ত “তিনি নামের আগে ‘শ্রী’ লিখতেন, পদবির বানান লিখতেন ‘দাস’ ”(সুমিতা চক্রবর্তী, ২০০৮: ২৩)। কিন্তু এর পরেই তিনি আত্ম-উপলব্ধির কারণে দাস থেকে দাশ হয়ে যান।
‘দাস’ মানে অধীনতা, শৃঙ্খলিত বা পরাধীনতা এবং ‘দাশ’ মানে জেলে বা ধীবর (ড. এনামুল হক, ২০০০:৬০০)। তবে আবু ইহসাক সমকালীন বাংলা অভিধানে বলেছেন “দাশ মানে কৈবর্ত তথা জেলে, ধীবর, মেছো” (হরিশংকর জলদাস, ২০১৫:৭)। উল্লেখিত অর্থের মধ্যেই বুঝা যায় জীবনানন্দ দাশ কারো গোলামি করার মনোবৃত্তি নিয়ে বেঁচে থাকতে চাননি। জেলেদের জীবনযুদ্ধ কঠিন হওয়ার পরও সে নামেই পরিচিত হয়ে থাকতে চেয়েছেন কারণ মাছ শিকার করে জীবন ধারণ স্বাধীন পেশা। অধীনতা বা শৃঙ্খলিত হওয়ার কোন সুযোগ থাকে না। এটি ছিল তার প্রথম আঘাত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে। প্রজা-নিপীড়নের ‘টাকায়’, ‘সঙ্গীত’, শিল্প এবং ধর্ম সংস্কারের খুব হুজুগ’ দেখা দিল। ‘ছোট চাষীদের উচ্ছেদ করে সেই জমি খাস করে হাতে দেওয়া হলো বড় চাষাদের।’ ‘বাঙালায় শুরু হলো ভূমিহীন কৃষক শ্রেণীর উদ্ভব’ (আলেখ্য ভট্টাচার্য, ১৪১০ বঙ্গাব্দ: ৮)। আর এই সত্যটি সে সময় অনেক ইংরেজ তোষণকারী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী এড়িয়ে গেলেন পাছে প্রভুরা ক্ষেপে যান। ফলে, “ক্ষমতা যখন ঈশ্বরের দূতদের হাতে ছিল সাহিত্য তখন তাদেরই দাদাগিরি করছে” (আবুবকর সিদ্দিক, ২০০১:১১)। কিন্তু নজরুল প্রথম লেখক যিনি নগ্নহস্তে আঘাত করেছেন ব্রিটিশ শাসনকে এবং ঐক্যবদ্ধ করার প্রাণান্ত চেষ্টা করেছেন তাঁর লেখায়। পরবর্তীকালে সুকান্ত ও র্ফরুখ আহমদ ক্রমাগতভাবে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেছেন ব্রিটিশ রসের সিংহাসনকে। আর জীবনানন্দ দাশও ঘুমন্ত জাতির হৃদয়ে নানা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
পাশাপাশি আমাদের সেসময়ে বিচ্ছিন্নভাবে যে সাহিত্যিক আন্দোলন শুরু হয়েছে তাকে মনে করিয়ে দেয়। “অর্থাৎ দীর্ঘদিনের রাবীন্দ্রিক মায়ামুগ্ধ জগতের প্রভাব এড়িয়ে ঐ আন্দোলনের উদ্যোক্তারা একটি নতুন চেতনা আনতে চাইলেন যাতে যুগের যন্ত্রণা তথা নব-যুগের চাহিদা মেটানো যায়” (আবু জোবের, ১৯৮৬:২৪৩)।
১৯২৬ সালে ‘কল্লোলে’ ‘নীলিমা’ কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে তার কবি প্রতিভার প্রকাশ পেয়েছে। কবিতাটি পাঠের পর অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৭৬) প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছিলেন “ঠিক এক টুকরো নীল আকাশের মত”, বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৪) বলেছিলেন “কবিতাটিতে এমন একটি সুর ছিলো যার জন্য লেখকের নাম ভুলতে পারিনি” এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “জীবনানন্দ দাশের চিত্ররূপময় কবিতাটি আমাকে আনন্দ দিয়েছে” (এম এ. আজিজ মিয়া, ২০১২-২০১৩:১২২)।
তার কবিতায় সময় সচেতনতার কথা বারবার ফুটে উঠেছে। কিন্তু সময় সচেতনতার কথা বলতে গিয়ে প্রায় অধিকাংশ সমালোচকই তার কাব্যে বিদ্যমান সা¤্রাজ্যবিরোধী চিন্তা চেতনাকে ছেপে রেখেছেন। ফলে সত্যিকারে জীবনানন্দ দাশের মধ্যে স্বাধীনতার জন্য যে হাহাকার ছিল তা আমাদের অনেকাংশেই অজানা থেকে গেল। তার কবিতায় যে সময় সচেতনার প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেন, “মহাবিশ্বলোকের ইশারা থেকে উৎসারিত সময়চেতনা আমার কাব্যে একটি সঙ্গতিসাধাক অপরিহার্য সত্যের মতো; কবিতা লিখবার পথে কিছুদূর অগ্রসর হয়েই এ আমি বুঝেছি, গ্রহণ করেছি। এর থেকে বিচ্যুতির মানেই নেই আমার কাছে। তবে সময়চেতনার নতুন মূল্য আবিষ্কৃত হতে পারে” (জীবনানন্দ দাশ, ২০০২:৩৬)। এ ছাড়াও কবিতা “খন্ড-বিখন্ডিত এই পৃথিবীর, মানুষ ও চরাচরের আঘাতে উত্থিত মৃদুতম সচেতন অনুনয়ও এক-এক সময় যেন থেমে যায়- একটি-পৃথিবীর-অন্ধকার-ও-স্তব্ধতায় একটি মোমের মতন যেন জ্বলে ওঠে হৃদয় এবং ধীরে ধীরে কবিতা-জননের প্রতিভা ও আস্বাদ পাওয়া যায়” (জীবনানন্দ দাশ, ২০০২:১৩)।
তার কবিতায় ইতিহাস ও ঐতিহ্যবোধ ছিল প্রবল। যেমন “তিনি চর্যাপদ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এবং বাঙালির হাজার বছরেরও বেশি সময়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-ইতিহাসকে আত্মস্থ করেছিলেন নিমগ্ন সাহসে” (কামরুল ইসলাম, ২০১৪:৫০)। এখানে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে তার এ আত্মস্থের মূল কারণ কী? কেন তিনি যুগ যুগান্তরের ইতিহাসের পাতায় নিজেকে মগ্ন রেখেছেন? এসব প্রশ্নের জবাব সরাসরি পাওয়া যায় ‘বনলতা সেন’ কবিতায়। যেখানে তিনি বলেছেন:
হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথির অন্ধকারে ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন। (জীবনানন্দ দাশ, ২০০৮:১৫৩)
“বনলতা সেন রোমান্টিক গার্ল হলেও আধুনিক জীবনের যন্ত্রণার উপরেই তার অবস্থিতি এবং সে নিজে এ-সম্বন্ধে অবহিত না হলেও তার প্রেমিক কবি জানেন, কি দুঃসহ মানস-যাত্রার শেষে নাটোরের বনলতা সেন না¤œী বালিকার কাছে তাঁর প্রণয়-নিবেদন হাহাকারের শরীরে দুদন্ড শান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়” (আবু জোবের, ১৯৮৬:২৪৪)।
কবি কেন এখানে বনলতার চোখকে পাখির নীড়ের সাথে তুলনা করেছেন? সাহিত্যে এমন রোমান্টিক উপমা হয়তো আর কেউ দেননি। “আর চোখের উপমা তাই হয়, ‘পাখির নীড়’। বিপর্যস্ত অভিযানকারীর কাছে ‘নীড়’Ñ আশ্রয়, শান্তি ও ইপ্সিত।” (পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, ২০১১:৪৯) যদিও বিপরীতধর্মী কথাও শোনা যায়। যেমন সঞ্জয় ভট্টাচার্য মনে করেন, অনুভবের যাতনায় জীবনানন্দ দাশ এ কবিতাটি লিখেন (শংকরানন্দ মুখোপাধ্যায়, ২০১১: ৫৪)। ফরিদ কবির মনে করেন, “যখন একটি কবিতা অনেক পাঠকের পাঠের অংশ হয়ে যায়, তখন বুঝতে হবে; কবিতাটির মধ্যে রয়েছে এমন কিছু উপাদানÑ যা আম-পাঠকের সংবেদ সিক্ত করতে সক্ষম” (ফরিদ কবির, ২০১১:৯৮)।
এই কবিতাটি বুঝতে গেলে জীবনানন্দ দাশের কাব্যের নিঃসঙ্গতার সম্পর্ক কি সেটি বোঝা দরকার। কেননা, নিঃসঙ্গতা বা নিঃসংযোগের অভিজ্ঞতা ঘটে যখন অস্তিত্বের রোধে পীড়িত সংবেদনশীল মানুষÑ যেমন শিল্পী নিজের স্বরূপ, ব্যক্তিচিহ্ন বা ব্যক্তিত্বের পরিচয় খুঁজতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। “নাটোরের বনলতা সেন যদি নাটোরের অ্যাসোসিয়েশন থেকে আলাদা হয়ে পৃথক অন্য কোনো বনলতা হয়ে ওঠেন তাহলে হঠাৎ আমাদের মনে পরিচিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিচ্ছেদ থেকে এক ধরনের নিঃসংযোগ বোধ দেখা দেয়। একে সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক অর্থে বহুল প্রচলিত যে ‘এলিয়েনেশন’ বা বিচ্ছিন্নতা তার সঙ্গে এক করে দেখলে চলবে না। মার্ক্স যে বিচ্ছিন্নতা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তা হচ্ছে বুর্জোয়া সমাজে উৎপাদন ও উৎপাদকের মধ্যে অসংযোগ থেকে সৃষ্ট। কিন্তু জীবনানন্দ দাশের কাব্যে অসংযোগের ভিত্তি দার্শনিক, তার জন্ম এক বিশিষ্ট জীবন ও শিল্প দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, তাকে মার্ক্সীয় বিচ্ছিন্নতার ফর্মুলা দিয়ে বোঝা যাবে না” (জগন্নাত চক্রবর্তী, ২০১১:১১৩)।
‘ক্যাম্পে’ জীবনানন্দের রহস্যাবৃত্ত কবিতাগুলির একটি এবং অন্যতম। ‘ক্যাম্পে’ প্রকাশিত হওয়ার পর আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। কেউ কেউ তীব্র কটাক্ষ করেছেন কবিতাটিতে অশ্লীলতার ছায়া দেখেন। “অনেকে তাকে ভৎসনাও করেছেন” (এম এ. আজিজ মিয়া, ২০১২-২০১৩:১২৯)। ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় সমালোচকরা যে অশ্লীলতা পেয়েছেন তাও নিজের চিন্তার ফসল নয়। তারা তা ধার করেছেন ক্লিন্টন্ বুথ সীলি জীবনানন্দ দাশের উপর যে গবেষণা করেছেন তা থেকে। ক্লিন্টন্ বুথ সীলি কবিতাটিতে ব্যবহৃত ‘ঘাই’ শব্দের অর্থ খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করেন এক আজগুবি অর্থ।
কিন্তু সুবলচন্দ্র মিত্র রচিত সরল বাঙ্গালা অভিধানে ‘ঘাই’ শব্দের অর্থ বলা আছে, “ভাসা মৎস্যের ডুবিয়া গভীর জলে প্রবেশ/ধাপ্পা/ বাঁধের কাটা জায়গা/ ভীষণ মার দেওয়া/ খুব ঠকানো/ অত্যন্ত অপমানিত করা” (সুবলচন্দ্র মিত্র, ১৯৮৪:৫০৮)। সংসদ বাংলা অভিধানে বলা আছে “আঘাত/ বৃহদাকার মৎস্যের জল পুচ্ছাঘাত” (সংসদ বাংলা অভিধানে, ১৯৬১:২৪৫)। আর বাংলা একাডেমি অভিধানে বলা আছে “পাখি-শিকারি কর্তৃক ব্যবহৃত পুরুষ পাখি, যা একই প্রজাতির অন্য পুরুষ পাখিকে লড়াই করতে আহ্বান করে, শিকারি সেই সুযোগে আগন্তুক পাখিকে খাঁচাবন্দী করে থাকে” (বাংলা একাডেমি অভিধান, ২০০০:৩৮৪)। অতএব উল্লেখিত অর্থগুলির মধ্যে নিহিত আছে জীবনানন্দ দাশ এই ঘাই হরিণীকে মূলত একটি ফাঁদ হিসাবেই দেখেছেন। সুমিতা চক্রবর্তী মনে করেন, “জীবনানন্দ এই অর্থেই ‘ঘাই হরিণী’ ব্যবহার করেছেন। কামপ্রমত্ত হরিণী নয়, মানুষের পালিত হরিণী যে ছলনাময় ডাকের সাহায্যে হরিণের কামোন্মাদনা জাগায় এবং তাকে এনে দেয় শিকারির আওতায়। কামনার ভাবটি হরিণীর দিকে আছে কিন্তু হরিণীর ডাক সম্পূর্ণ প্রতারক। কাম নয়, কামের ছলনা” (সুমিতা চক্রবর্তী, ২০০৮:২৬)।
আর এখানে জীবনানন্দ দাশের মতে যারা জাহাজে করে পণ্য নিয়ে এসে বাণিজ্যের নামে ফাঁদ তৈরি করে এক সময় বাংলার মানুষকে শৃঙ্খলিত করেছে, সেই ব্রিটিশকে তিনি ‘ঘাই হরিণী’ বলেছেন। এমন ধারণার পিছনে যুক্তি দিয়ে সুমিতা চক্রবর্তী বলেন, “নিতান্ত বনবাসী মানুষ ছাড়া সভ্য মানুষ শিকার করে মূলত বাণিজ্যিক স্বার্থে এবং প্রমোদের উদ্দেশ্য। বহু প্রতারণা ও অন্যায় পদ্ধতিতে তা সম্পন্ন হয়। পোষা হরিণীর ডাকের ছলনা আশ্রয় করে হরিণের কামনা জাগানো এবং দূর থেকে তাকে গুলিবিদ্ধ করার প্রতিক্রিয়ার মধ্যে জীবনানন্দ এক কুটিল বঞ্চনা অনুভব করেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল এ অন্যায় কেবল মানুষের দ্বারাই সম্ভব” (সুমিতা চক্রবর্তী, ২০০৮:২৬-২৭)। সুতরাং এখানে হরিণী ব্রিটিশদের প্রতারণা-প্রক্রিয়ার নৈপুণ্যের উদাহরণ।
‘শকুন’ জীবনানন্দ দাশের আরেকটি অসাধারণ কবিতা। এখানে শকুন “যে-সা¤্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ যুগে যুগে দুর্বল দেশগুলিকে উপনিবেশে পরিণত করে শোষণ করেছে; শেষ পর্যন্ত তারা পলায়নপর ও অপসৃত” (সুমিতা চক্রবর্তী, ২০০৮:২৮) তাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কেননা, প্রথম বাক্যটিতে পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয় কবিতার স্থান ও সময়ের বিন্যাস। বিস্তৃত মাঠ, বিস্তৃত আকাশ, নির্জন ও প্রলম্বিত দ্বিপ্রহর। মাঠে ও আকাশে ভ্রমণরত একদল শকুন। ‘এশিয়ার আকাশ’ বলতেই ভেসে আসে উপনিবেশের প্রসঙ্গ। ১৭৫৭ সালের পূর্ববর্তী সময়ে বাংলার জনগণ অনেকটাই বিচ্ছিন্ন এবং অসচেতনতার মধ্যে ছিল। ফলে সে সময়কে কবি “দৃঢ় নীরবতা” বলে আখ্যায়িত করেছেন। ফলে, “সেইখানে শকুনেরা একবার নামে পরস্পর/ কঠিন মেঘের থেকে” (জীবনানন্দ দাশ, ২০০৮:১১১)। আর এ শকুনেরা তথা ব্রিটিশরা একে একে এশিয়াকে দখল করে “আবার করিছে আরোহণ/ আঁধার বিশাল ডানা পাম্ গাছে” (জীবনানন্দ দাশ, ২০০৮:১১১)। অর্থাৎ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া হয়ে সুদূর আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিল সা¤্রাজ্য। ‘শকুন’ কবিতাটিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে সা¤্রাজ্যবাদের কথা। এখানে পশ্চিমা বণিকেরা “বোম্বায়ের সাগরের জাহাজ কখন/ বন্দরের অন্ধকারে ভিড় করে” (জীবনানন্দ দাশ, ২০০৮:১১১), এরপব ‘ঘাই হরিণী’ সেজে একে একে প্রতারণার জাল বিছিয়েছিল প্রথমে বাংলায়, পরে পুরো ভারতীয় উপমহাদেশ এবং সর্বশেষ এশিয়া ও আফ্রিকাকে দখল করে দাসত্বের শিকলে বন্দি করে। আমরা জানি “শঠ ও শোষক রূপেও কল্পনা করা হয়েছে শকুনকে। ইংরেজি সাহিত্যে ‘ভাল্চার’ নিষ্ঠুর প্রবঞ্চক, পরস্বাপহারীর বিশেষণ। গ্রিক পুরাণে দেখি জিউস এর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রমিথিউস পর্বতশৃঙ্গে শৃঙ্খলিত। তার যকৃৎ ঠুকরে ঠুকরে খায় এক শকুন। বুঝা যায়- শকুনের মধ্যে অমঙ্গল আর স্বৈরাচারী শক্তিকে সংবদ্ধ দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বহু প্রাচীন” (সুমিতা চক্রবর্তী, ২০০৮:৩৫)। আর এসব মানুষরূপী ব্রিটিশ শকুনেরা এদেশে এসেছে বণিকরূপে। বাণিজ্য মানসিকতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে এরা প্রগতিশীলতার ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে সভ্য হওয়ার কথা বলেছে। এসবই ছিল তাদের প্রবঞ্চনা।
জীবনের মানে যিনি যত বেশি উপলব্ধি করতে পারেন তিনি তত বেশি স্বাধীনচেতা। জীবনানন্দ দাশ ছিলেন স্বাধীনচেতাদের একজন। ফলে তিনি “সংশয়, ক্লান্তি, অবসাদ, ক্লেদ, গ্লানি, হিংসা, রিরংসায় জীবনকে ওপারে রেখেছেন। জীবনকেই ভালোবেসেছেন গভীরভাবে এমনকি মৃত্যুর স্বাদ দেখে” (এম এ. আজিজ মিয়া, ২০১২-২০১৩:১২৫)।
“আট বছর আগের একদিন কবিতায় মাছি, মশা, ব্যাং, ফড়িং, পেঁচা, অশ্বত্থের শাখা ও সোনালি ফুলের ¯িœগ্ধ ঝাঁক- মৃত্যুবাসনা জীর্ণ করে না এদের কাউকেই। শুধু মানুষটিকেই করে” (সুমিতা চক্রবর্তী, ২০০৮:২৮)। ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায় জীবনানন্দ দাশ “জীবন সংকট, গাঢ়তা ও সার্থকতা সম্পর্কে গভীর চিন্তায় তলিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তির জীবন কাহিনী নির্মাণ করেছেন। একটি মানুষের আত্মহত্যাকে ঘিরে মানুষের জীবন-যাপন সম্পর্কিত এক গভীর আত্মদর্শনের মুখোমুখি হন তিনি” (সুমিতা চক্রবর্তী, ২০০৮:৮৪)। তাছাড়া কবিতাটি পরিপূর্ণভাবে রহস্যাবৃত্ত। কেননা,
শোনো
তবু এ মৃতের গল্প; -কোনো
নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই;
বিবাহিত জীবনের সাধ
কোথাও রাখেনি কোনো খাদ,
সময়ের উদ্বর্তনে উঠে এসে বধূ
মধু-আর মননের মধু
দিয়েছে জানিতে;
হাড়হাভাতের গ্লানি বেদনার শীতে
এ জীবন কোনোদিন কেঁপে ওঠে নাই;
(জীবনানন্দ দাশ, ২০০৮:১৮৫)।
তবে কেন আত্মহত্যার পথকে বেছে নিলেন? কোনো মানসিক বিকারগ্রস্তের কোন ব্যক্তির কাহিনী জীবনানন্দ দাশ কি শোনাচ্ছেন? সব প্রশ্নের উত্তর জীবনানন্দ দাশ নিজেই দিয়েছেন,
জানি-তবু জানি
নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ-নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়-
আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে
ক্লান্ত- ক্লান্ত করে;
লাশকাটা ঘরে
নেই ক্লান্তি নাই;
(জীবনানন্দ দাশ, ২০০৮:১৮৩)
এখানে এক স্বাধীনচেতা মানুষের গল্প বলা হয়েছে। কারণ, একজন মানুষের জীবনে অর্থ-বিত্ত, নারী-সংসার-সন্তান ও সামাজিক মর্যাদাই শেষ কথা নয়। তার কাছে সবচেয়ে উপলব্ধির বিষয় হলো স্বাধীনতা। সে স্বাধীনতা হারিয়ে মানুষটি দীর্ঘকাল সংগ্রামের পথকেই বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু সবাই সংঘবদ্ধভাবে ‘ঘাই হরিণী’ ও ‘শকুন’দের বিরুদ্ধে অস্ত্র না ধরায় স্বাধীনতা লাভের পথটি সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল বলেই তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। এ ঘটনাটি চিনুয়া আচেবের থিংকস্ ফল অ্যাপার্ট এর প্রধান চরিত্র অকোঙ্কোর সাথে তুলনা করা চলে। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে আফ্রিকার জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যর্থ হন তিনি। ফলে যখন বুঝতে পারেন নিশ্চিতভাবেই ধরা পড়ে যাচ্ছেন ব্রিটিশ শকুনের হাতে, তখনি তিনি আত্মহত্যার মাধ্যমে যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানি থেকে মানবতাকে রক্ষা করেছেন। এখানেও আমরা দেখি কবিকে বলতে সবকিছু থাকার পরও রক্তের ভিতর কিছু একটা প্রতিনিয়ত খেলা করে। কিছু একটা খেলা করে বলতে তিনি নিশ্চিতভাবে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে বুঝিয়েছেন। কেউ কেউ নৈরাশ্যবাদীদের কাতারে বিবেচনা করেন জীবনানন্দ দাশকে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে তিনি দৃঢ়প্রত্যয়ী ও আশাবাদীদের একজন। ফলে তিনি অনমনীয় কণ্ঠে ঘোষণা করেন, “তবু রোজ রাতে আমি চেয়ে দেখি”। কিন্তু সমস্ত পথ অবরুদ্ধ হয়ে আছে। কেননা, “থুরথুরে অন্ধ পেঁচা অশ্বত্থের ডালে বসে আছে।” কেবল এখানেই শেষ নয় এরা নিয়মিত চোখ পাল্টায়।
এ কবিতাটিতে স্পষ্টই একটি দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে। এ দ্বন্দ্বটি ঔপনিবেশিক শাসনের সাথে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর দ্বন্দ্বের মতই। ফলে এমন পরিস্থিতিতে প্রান্তে থাকা মানুষ কথা বলার কর্তৃত্ব হারায়। ঠিক তেমনিভাবে উল্লেখিত বিষয় অর্থাৎ ব্যক্তিটি পরাধীনতার কারণে নিজের কথা বলার অধিকার না থাকায়, তিনি আত্মহত্যার পথকে বেছে নেন।
১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের কথা এদেশের মানুষ এখনো ভুলতে পারেনি। এ তেতাল্লিশ শব্দটিকে আড়াল করার জন্য পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে অভিহিত করা হয়। তেতাল্লিশের পূর্বেও ব্রিটিশদের শাসনামলে এদেশের মানুষ বেশ কয়েকবার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিল মন্বন্তরের। এসবের মূল কারণ চিহ্নিত করতে গিয়ে অমর্ত্য সেন বলেন, “মন্বন্তর হয় যেখানে প্রচুর খাবার থাকার পরও সর্বসাধারণের খাদ্যে ওপর কোনো অধিকার থাকে না সেখানে।” মন্বন্তর তথা দুর্ভিক্ষের কারণে মানুষের মৌলিক অধিকার থাকে না। জীবন ধারণে নারীদের বেছে নিতে হয় পতিতাবৃত্তিকে। আবার কখনো জোর করে বাধ্য করা হয় হেন কাজে প্রবৃত্ত হতে। পাশাপাশি নিজেদের যৌনাকাক্সক্ষাকে মিটিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয় পতিতা বলে। ইতিহাসের এ নির্মম সত্যটিকে নিপুণতার সাথে তুলে এনেছেন জীবনানন্দ দাশ। তিনি বলেন,
কালনাগিনীর ফ’ণার মতন নাচে সে বুকের ’পর!
চক্ষে তাহার কালকূট ঝরে,- বিষপঙ্কিল শ্বাস
(জীবনানন্দ দাশ, ২০০৮:৩৫)
কিন্তু পাষন্ডদের প্রাণ কাঁপেনি। বরং তারা আনন্দ উল্লাস করেছে। তারা নতুন নতুন ফাঁদ পেতেছে। ফলে, জীনানন্দ দাশ পতিতাবৃত্তির কারণ তুলে ধরে তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে বলেন,
সে যে মন্বন্তর,-মৃত্যুর দূত,- অপঘাত, – মহামারী,-
মানুষ তবু সে, – তার চেয়ে বড়ো, – সে যে নারী, সে যে নারী!
(জীবনানন্দ দাশ, ২০০৮:৩৬)
“সে যে নারী” শব্দগুলির মধ্যে নিহিত আর্তনাদ আমাদের নাড়া দিয়ে যায়। প্রশ্ন জাগে ধর্ষণের শিকার হয়েও কেন তাকে পতিতা হিসাবে পরিচিত হতে হয়? তাকে এ পরিচয় এঁটে দেয় কোন শাসক? কেন? কারণ, “ঔপনিবেশিক আর সা¤্রাজ্যবাদী শাসনকে সাংস্কৃতিক-নৃতাত্ত্বিক দিক থেকে তখন বৈধতা দেয়া হয়েছে যেখানে উপনিবেশের অধীন দেশের মানুষকে বর্বর, নিকৃষ্ট, শিশুসুলভ, মেয়েলি, দুর্বল, নিজেদের শাসনে ও প্রতিপালনে অক্ষম ভাবা হয়েছে। বলা হয়েছে প্রাচ্যের প্রয়োজনেই পশ্চিমাদের প্রাচ্যকে শাসন করা উচিত” (মাসুদুজ্জামান, ২০০৭:৪৩)। এভাবে জীবনানন্দের কবিতায় ছড়িয়ে আছে সাম্রাজ্যবাদ তথা উপনিবেশবাদের ফলে অবিভক্ত ভারতের নিমর্মতার চিত্র এবং এর প্রতি তার ঘৃণা। তবে উত্তর-উপনিবেশবাদের আলোকে জীবনানন্দকে পড়তে হলে উত্তর-উপনিবেশবাদ কী তা আলোকপাত প্রয়োজন।
১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা দখলের মাধ্যমে একে এক পুরো ভারত, পরে এশিয়ার অন্য অঞ্চলসহ প্রায় পুরো বিশ্বকে উপনিবেশে পরিণত করে। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লব প্রথম পরিকল্পিত ও সমন্বিত আক্রমণ ছিল ভারতীয়দের। কিন্তু মহাপরাক্রমশালী ব্রিটিশদের হারানো সম্ভব হয়নি। আর এ আক্রমণ থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্রিটিশরা নতুনভাবে শক্তি বৃদ্ধি করে মুক্তিকামী মানুষদের নির্মম অত্যাচার চালিয়েছিল। পাশাপাশি ধ্বংস করেছে এদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি লেখক বুদ্ধিজীবীদের কলম ব্যবহার হতে লাগলো জনসচেতনতায়। “সমাজ-রাজনীতির পাশাপাশি সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে গত শতাব্দীর শেষ দুই দশকে বিশিষ্ট সাহিত্যতত্ত্ব হিসেবে আবির্ভাব ঘটে উত্তর-উপনিবেশবাদী সাহিত্যতত্ত্বের” (বেরি, ২০০২:১০১)।
তবে একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই কখন থেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক কাল ধরা হবে এ নিয়ে বিতর্ক আছে। করো মতে “ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে পদার্পণ করে, তখন থেকে মূলত এই শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়” (মাসুদুজ্জামান, ২০০৭:৪১)। কেননা “উত্তর-উপনিবেশবাদের ‘উত্তর’ বলতে উপনিবেশের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তির নির্মিত সাহিত্যকেই নির্দেশ করা হয়” (ও’রেইলি, ২০০১:৬)। কিন্তু অ্যাশক্রাফ্ট এবং অন্যরা স্পষ্ট করে দাবি করেন, “ঔপনিবেশিক শাসনে থেকে যারা ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়ায় ওই সাহিত্য রচিত হয়েছে বলে তাকে উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য বলে চিহ্নিত করা হয়।” (অ্যাশক্রাফ্ট এবং অন্যরা, ২০০৩:২) তারা আরো মনে করেন উপনিবেশের সময় কালে রচিত সাহিত্যের মাধ্যমে উপনিবেশের নৈতিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলা হয়েছে। তা ছাড়া “উত্তর-উপনিবেশবাদের মূল কথাই হচ্ছে পশ্চিম আগে যেভাবে অপশ্চিমী দেশের মানুষ আর সংস্কৃতিকে প্রাধান্যের চোখে দেখেছে, দেখার সেই দৃষ্টিভঙ্গিকেই বিপরীতমুখী করে দেয়া।” (মাসুদুজ্জামান, ২০০৭:৪১)
এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের কারণ কী? জবাব মেলে ইয়ং-এর বক্তব্যে তার মতে, “পশ্চিম সব সময় ঠিক আয়নায় দেখা নিজেদের চেহারার প্রতিবিম্বের মতো নিজেদের মতে প্রাচ্যকে দেখেছে। নিজরা যা ভেবেছে, প্রাচ্য সম্পর্কে সেই ভাবনাকেই প্রাধান্য দিয়েছে, চাপিয়ে দিয়েছে, এমনকি নির্মাণও করেছে। কিন্তু ওই পশ্চিমের বাইরে যে আরো একটা অপশ্চিমী জগৎ আছে, সেই জগৎটা আসলে কী, এখানকার মানুষেরা প্রকৃতপক্ষে কী অনুভব করে, উপলব্ধি করে, তা কখনো ভেবে দেখেনি বা দেখার অবকাশ তারা তৈরি করেনি। কিন্তু উত্তর-উপনিবেশবাদী তত্ত্ব প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সম্পর্কের বিষয়টাকেই ভিন্ন চোখে দেখার দৃষ্টিকোণ এনে দিল” (ইয়ং, ২০০৩:২)।
পিটার বেরি যেমন উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য পাঠ বলতে মনে করেন,
Characteristically, postcolonial writers evoke or create a precolonial vision of their own nation, rejecting the modern and the contemporary, which is tainted with the colonial status of their countries. Here, then, is the first characteristic of postcolonial criticism-an awareness of representation of the non-Europian as exotic or immoral ‘Other (পিটার বেরি, ২০০২:১৯৪)।
পাশাপাশি এও মনে রাখতে হবে “যে ব্যক্তি রাজনীতি সচেতন, সুদীর্ঘ জীবনকাল যিনি প্রত্যক্ষ করেছেন বাঙালি জীবনের প্রতিটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পর্যায়, তার বিকাশ, প্রতিক্রিয়া এবং পরিণতিকে, তিনি স্বভাবতই অভিজ্ঞতার বিশালাতায় অনিবার্য ভবিষ্যৎকে ঘোষণা করেন প্রকাশ্যে” (রফিকউল্লাহ খান, ২০০২: ৫৬)। ফলে “পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জাতীয় সংগ্রামের প্রেরণাশক্তি হিসেবে সাহিত্য-শিল্প যে রূপ তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, অন্য কোনো মাধ্যমের ক্ষেত্রে সে রূপ দেখা যায় না। কারণ, নানাচিত্তের সাংস্কৃতিবোধ ও রাজনীতিচেতনায় একমাত্র সাহিত্য-শিল্পই বিচিত্রভাবে প্রভাব ফেলবে” (রফিকউল্লাহ খান, ২০০২:৫৬)।
জীবনানন্দ দাশের কবিতা উত্তর-ঔপানিবেশিকতাবাদের আলোকে পাঠে ঐতিহ্যের বিচ্যুতি হবে কিনা তা নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তোলতে পারেন। কিন্তু এমন সমালোচনার জবাবে মাসুদুজ্জামান বলেন, “এখানে বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে একটি সমালোচনা পদ্ধতি মূলত তার একক অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়েই অন্য এক বা একাধিক সমালোচনানীতির ধারার ওপর গড়ে ওঠে এবং চর্চিত ও ব্যবহৃত হয়। ফলে কোনো সমালোচনারীতিই ঐতিহ্যবিচ্যুত নয়, সমকালের বা এর কিছু আগের কোনো সমালোচনানীতিকেই তা এড়িয়ে চলে না” (মাসুদুজ্জামান, ২০০৭:৪০)। কেননা, “সমকালীন জ্ঞানচর্চার এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যার দ্বারা উত্তর-উপনিবেশবাদ এবং উত্তর-উপনিবেশবাদী সাহিত্যতত্ত্ব প্রভাবিত হয়নি” (অ্যাশক্রাফ্ট এবং অন্যরা, ২০০৩:১৯৪)।
তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান ২২ অক্টোবর, ১৯৫৪। “মৃত্যুর এত বছর পরেও তিনি আজো এতটাই প্রাসঙ্গিক যে, তাঁর কবিতা আমাদের সময় ও প্রজন্মকে নতুন করে নাড়া দেয়। তাঁর কবিতা সেই টেক্সট, যা আজকের নতুন নতুন সাহিত্য থিওরিতে আলোচনা সম্ভব এবং এভাবেই তাঁর কবিতার নতুন পাঠ আরো নতুনভাবে বৃহত্তর পাঠকের কাছাকাছি নিয়ে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস” (কামরুল ইসলাম, ২০১৪:৫২)। হ
সহায়ক গ্রন্থ :
১. সি ও’রেইলি, পোস্ট-কলনিয়াল লিটারেচার, ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ক্যামব্রিজ, ২০০১।
২. অ্যাশক্রাফ্ট, বি. গ্রিফিথ্ টিফিন, এইচ, দ্যা ইম্পায়ার রইটস্ ব্যাক, রোটলেজ, লন্ডন, ২০০৩।
৩. আবু জোবের, “জীবনানন্দ দাশের আধুনিকতা”, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পা, সাহিত্যপত্র ত্রৈমাসিক পত্রিকা, জুলাই-সেপ্টেম্বর ১৯৮৬।
৪. আবুবকর সিদ্দিক, “লেখকের দায়দায়িত্ব ও রাজাদিন”, সাহিত্যের সংগপ্রসংগ, ঐতিহ্য, ঢাকা, ২০০১।
৫. আলেখ্য ভট্টাচার্য, “বাঙালির জীবন ও জাগরণ, প্রসঙ্গত দু’টি উপন্যাস”, অরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পা, এবং এই সময় সাহিত্য ত্রৈমাসিক, কলকাতা, ১৪১০ বঙ্গাব্দ।
৬. ক্লিন্টন্ বুথ সীলি, এ পোয়েট এপার্ট, ডেলওয়্যার, ইউএসএ, ১৯৯০।
৭. সুমিতা চক্রবর্তী, কবিতার অন্তরঙ্গ পাঠ জীবনানন্দ-অমিয় চক্রবর্তী-বিষ্ণু দে, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ২০০৮।
৮. ডক্টর এনামুল হক সম্পা, বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান পরিমার্জিত সংস্করণ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০০।
৯. হরিশংকর জলদাস,“বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে কৈবর্ত-জীবনসংগ্রাম”, আবুল হাসনাত সম্পা, কালি ও কলম, সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা, ঢাকা, এপ্রিল ২০১৫।
১০. এম এ. আজিজ মিয়া, “জীবনানন্দ দাশ: দেশ-কাল ও জীবন ভাবনা”, চপল বাশার সম্পা, প্রাঙ্গণ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক ত্রৈমাসিক, ঢাকা, নভেম্বর ২০১২-এপ্রিল ২০১৩।
১১. জীবনানন্দ দাশ, কবিতার কথা, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা, ২০০২।
১২. জীবনানন্দ দাশ, “বনলতা সেন”, “শকুন”, “আট বছর আগের একদিন”, “ক্যাম্পে”, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পা, প্রকাশিত-অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্র, অবসর, ঢাকা, ২০০৮।
১৩. কামরুল ইসলাম, “জীবনানন্দ দাশ: বিচিত্র চেতনার সময়ের সময়োত্তর কবি”, আবুল হাসনাত সম্পা, কালি ও কলম, সাহিত্য ১৫. শিল্প সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা, ঢাকা, অক্টোবর ২০১৪।
১৬. পিটার বেরি, বিগেইনিং থিওরি এন ইনট্রোডাকশন টু লিটারেরি অ্যান্ড কালচারাল থিওরি, ম্যাচেস্টার ইউনিভার্সিটি প্রেস, ম্যানচেস্টার, ২০০২।
১৭. মাসুদুজ্জামান, “উত্তর-উপনিবেশবাদী সাহিত্যতত্ত্ব”, ফকরুল চৌধুরী সম্পা, উপনিবেশবাদ ও উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠ, র্যামন পাবলিশার্স, ঢাকা, ২০০৭।
১৮. সুবলচন্দ্র মিত্র, সরল বাঙ্গালা অভিধান, বেঙ্গল প্রেস, কলকাতা, ১৯৮৪।
সংসদ বাংলা অভিধান, সাহিত্য সংসদ, ১৯৬১।
১৯. জে সি রবার্ট ইয়ং, পোস্টকলনিয়ালিজম: এ ভেরি শর্ট ইনট্রোডাকশন, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, অক্সফোর্ড, ২০০৩।
২০. পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, “বনলতা সেন: জীবনানন্দ দাশ”, সৈকত হাবিব সম্পা, বনলতা সেন ষাট বছরের পাঠ, কথা প্রকাশ, ঢাকা, ২০১১।
২১. শংকরানন্দ মুখোপাধ্যায়, “ঐতিহ্য ও ‘বনলতা সেন”, সৈকত হাবিব সম্পা, বনলতা সেন ষাট বছরের পাঠ, কথা প্রকাশ, ঢাকা, ২০১১।
২২. ফরিদ কবির, “আমার কাঠগড়ায় বনলতা সেন”, সৈকত হাবিব সম্পা, বনলতা সেন ষাট বছরের পাঠ, কথা প্রকাশ, ঢাকা, ২০১১।
২৩. জগন্নাত চক্রবর্তী, “জীবনানন্দ নিঃসঙ্গতা ও বনলতা সেন”, সৈকত হাবিব সম্পা, বনলতা সেন ষাট বছরের পাঠ, কথা প্রকাশ, ঢাকা, ২০১১।
২৪. রফিকউল্লাহ খান, “সংগ্রামের কবিতা: কবিতার সংগ্রাম”, বাংলাদেশের কবিতা সমবায়ী স্বতন্ত্রস্বর, একুশে পাবলিকেশন্স লিমিটেড, ঢাকা, ২০০২।