অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ছোট স্টেটের নাম তাসমানিয়া। তাসমানিয়া একটা দ্বীপ। জনসংখ্যার দিক দিয়ে সিডনির পরই তার স্থান। মেজো ছেলে রুহীর চাকরির সুবাদে ২০০৩ সালে একবার আমার সেখানে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়। রুহী অধ্যাপনা করতো তাসমানিয়ার দ্বিতীয় বড় শহর লন চেস্টনের মেরিন অ্যাকাডেমিতে। একদিন রুহীর বিভাগীয় প্রধান ডক্টর দেবেনদ্বারের স্ত্রী শিখ কন্যা নাম কিরণ। রুহীর বাড়িতে বেড়াতে আসে। কথাবার্তা আলাপ আলোচনা আমাদের দেশের মেয়েদের মতো সহজ সরল। গল্প-গুজবের মধ্যে একসময় বললো-আন্টি, অনেক দিনতো তাসমানিয়ায় থাকলেন। যারা অস্ট্রেলিয়া বেড়াতে আসে তাদের মধ্যে খুব কম জনের ভাগ্যে তাসমানিয়া দেখার সৌভাগ্য হয়। আপনি হচ্ছেন সেই ভাগ্যবতী মহিলাদের একজন। আসার সুযোগ হয়েছে যখন, তখন এখনকার পোর্ট আর্থার নামে খ্যাত জায়গাটি দেখে যান। কিরণের কথায় আমি অনুপ্রাণিত হলাম এবং রোমাঞ্চিত হলাম। কারণ-তাসমানিয়া আসার পর থেকে প্রবাসী বাঙালিদের কাছে পোর্ট আর্থার সম্বন্ধে অনেক কাহিনী শুনেছি। অস্ট্রেলিয়া ইংরেজদের প্রথম উপনিবেশ স্থাপিত হয় সিডনি কোপে ১৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে। ক্যাপটেন কুকের নেতৃত্বে প্রথম নৌযানে যারা ইউরোপ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় আসে তাদের মধ্যে নাবিক ছিলো, অফিসার ছিলো সেই সঙ্গে নানা কাজে পারদর্শী বেশ কিছু ধৃত আসামিও ছিলো।
অস্ট্রেলিয়ার এতো উন্নতি ও সমৃদ্ধির পেছনে প্রথম দিকে আসা কয়েদিদের অবদান অনেক। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে পোর্ট আর্থারে কাঠের শিল্প কারখানা প্রথম স্থাপিত হয়। এই কারখানায় উৎপাদিত জিনিসপত্র অস্ট্রেলিয়ার সরকারি প্রকল্পগুলিতে ব্যবহৃত হতো। এক কথায় পোর্ট আর্থার পরিচিতি লাভ করে কাঠ শিল্পের মাধ্যমে। কয়েদিদের জন্য জেলখানাও তৈরি করা হয়েছিলো এখানে। যারা গুরুতর অপরাধ করতো তাদের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা ছিলো। বর্তমানে পোর্ট আর্থার বলতেই সবাই বুঝে কয়েদিদের শহর। কয়েদিদের মর্মান্তিক জীবনযাপনের এক করুণ ইতিহাস বিধৃত আছে পোর্ট আর্থারের মাটিতে। কিরণের কাছে এই শহরের খবর পেয়ে জায়গাটি দেখার জন্য মনের মধ্যে এক ধরনের তাগিদ অনুভব করলাম। তাসমানিয়ায় আমি এসেছি প্রায় দু’মাস হয়ে গেলো। প্রাকৃতিক সৌদর্যের আধার অনেক কিছুই আমার দেখা হয়ে গেছে। কিন্তু পোর্ট আর্থার দেখা হয়নি। ভাত খেতে বসে একদিন রুহীকে সসঙ্কোচে বললাম-কিরণের কাছে শোনা মৃত আত্মার বিচরণ ভূমি পোর্ট আর্থার দেখতে খুবই ইচ্ছা হচ্ছে।
রূহীকে বললাম পোর্ট আর্থার না দেখে আমি কিছুতেই দেশে ফিরে যাবো না। স্বভাবতই শান্ত প্রকৃতির ছেলে সে। কথা কম বলে। আমার কথা শুনে সে প্রথম দিন কিছুই বললো না। পরের দিন বললো, রাস্তার দূরত্ব ছাড়াও যে সমস্ত আজগুবি ব্যাপার স্যাপার ওখানে হয় বলে শুনি, আপনি পারবেন সে সব ধকল সহ্য করতে? জানি না, আমার এই দুর্বল শরীরে কেমন করে এতো সাহস পেলাম! আমি নাছোড়বান্দা। বললাম, আমি ইনশাআল্লাহ যেতে পারবো। আমি আমার চোখ দিয়ে দেখতে চাই কয়েদিদের আবাস স্থানটি। তাদের মৃত আত্মার বিচরণ স্থানটি। শেষ পর্যন্ত আমার জেদ জয়ী হলো। আমরা ১৪ নভেম্বর ২০০৩ এ বেলা ১২টার দিকে পোর্ট আর্থারের উদ্দেশে রওনা হলাম। সঙ্গে নাতনী সারা, জেবা ও তাদের মা লিজা। পথের জন্য কিছু খাবার দাবার ঔষধপত্র নিতেও পুত্রবধূ লিজা ভুললো না। লন চেস্টন থেকে পোর্ট আর্থারের দূরত্ব ৩০০ কিলোমিটার।
বেলা ৫টার দিকে পথে আমরা ডারউইন নদীর তীরে রিচডন শহরের কাছে একটা চিড়িয়াখানাতে নামলাম। চিড়িয়াখানার নাম ুড়ড়-ফড়ড়। ত্রিশ একর জায়গা নিয়ে গরু, ছাগল, মুরগি, হাঁসসহ প্রায় হাজারখানেক প্রাণীর সমাবেশ এখানে। খবর নিয়ে জানলাম, এসব প্রাণিকুল সবই নাকি অস্ট্রেলিয়াতে দেখা যায়। এই চিড়িয়াখানার মালিক এক অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি। গোটা চিড়িয়াখানা দেখতে হলে গাড়ি করে দেখতে হয়। ভেতরে গাড়ি করে ঘুরবার পথও আছে। মালিক নিজের আট সিটের একটা অটো ট্যাক্সিতে আমাদের চড়িয়ে গোটা এলাকাটা ঘুরে দেখালেন। বিশাল বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মনের সুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে হরেক রকম পশু-পাখি, জীব-জন্তু। প্রত্যেকের চড়ে বেড়াবার, উড়ে বেড়াবার আলাদা আলাদা সীমানা থাকলেও পরিধি এতো বিশাল যে, বুঝার উপায় নাই ওরা যে বন্দী। সমতল ও পর্বতে বেষ্টিত এক অন্তহীন জায়গা নিয়ে এই চিড়িয়াখানার জগৎ।
ুড়ড়-ফড়ড় থেকে বের হয়ে রিচডন শহরকে পাশ কাটিয়ে আমরা ছয়টার সময় পৌঁছলাম রাজধানী হোবার্টে। এখানে বলে রাখি, সিডনিতে শ্বেতাঙ্গদের প্রথম জনবসতি পত্তনের পর এরা রিচডনে এসে দ্বিতীয় জনবসতি স্থাপন করতে চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু বুশরেঞ্জারদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে পরে সরে গিয়ে হোবার্টে আস্তানা গাড়ে। রিচডনেও আসামিদের তৈরি কিছু বাড়িঘর দেখা যায়। আসামিদের তৈরি পাথর খুদিত একটা সেতুও দেখা যায়। সবচেয়ে প্রাচীন ক্যাথলিক গির্জা এখানে। হোবার্ট অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় পুরাতন শহর। অস্ট্রেলিয়া যখন কলোনি ছিলো লর্ড হোবার্ট ছিলেন কলোনিগুলোর সেক্রেটারি অব স্টেট। তাকে স্মরণ করে এই শহরের নাম রাখা হয় হোবার্ট। হোবার্ট পৃথিবীর সুন্দরতম বন্দরগুলির একটি। ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে হোবার্টে জনবসতি পত্তনের ইতিহাসে কয়েদিদের অনেক অবদান আছে। কয়েদিদের হাতে তৈরি বাড়ি আছে অনেক। এর মধ্যে ৯০টি বাড়ি জাতীয় জাদুঘর হিসেবে সরকার কতৃক সংরক্ষিত। প্রয়োজনে পর্যটকদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়।
কিছুক্ষণ হোবার্টে সাগর সৈকতে হেঁটে এক রেস্টুরেন্টে নাস্তা, কফি, স্যান্ডউইচ খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে যাত্রা শুরু হলো পোর্ট আর্থারের পথে। এখন প্রায় বেলা সাতটার কাছাকাছি। তাই বলে আলোর কমতি নেই। সাগরের সারা শরীরে রোদের সোনালি আভা, আকাশের গায়ে নীল মেঘ সাঁতার কাটছে। আমাদের রাস্তার দুইধারে অথৈই নীল পানির দরিয়া। মাঝখানে দিয়ে আমাদের গাড়ি এগুচ্ছে পোর্ট আর্থারের দিকে। রুহীর গাড়ির রং সাদা। ঢেউগুলোকে মনে হচ্ছে সাটিন গায়ে জল কন্যারা আমাদের যেনো স্বাগত জানাচ্ছে। মনে হচ্ছে, নিঃসীম নীরবতা ভঙ্গ করে পানির দরিয়ায় যেনো ভেসে চলছে একটা রাজহাঁস। গাড়ির ভেতরে বসে আছি আমরা কয়জন।
এই মুহূর্তে প্রকৃতির মনোহর রূপকে প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই। আমি চেষ্টা করছি এ সুন্দরকে, এই মনোহর রূপকে চোখের আয়নায় ধরে রাখতে।
জীবনে অনেক সাগর দেখেছি, নদী দেখেছি কিন্তু পানির এমন স্বচ্ছ নীল রঙ কখনো দেখিনি। ঢেউগুলোকে মনে হচ্ছে ঘাগরা পরা জলকন্যারা নেচে নেচে দুই দিক দিয়ে আমাদের স্বাগতম জানিয়ে পোর্ট আর্থারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আগেই বলেছি, পোর্ট আর্থার একটা উপদ্বীপ। তিনদিকে পানি বেষ্টিত। খোলা মুখ দিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এসে গেছি পোর্ট আর্থারে। পোর্ট আর্থারের মুখে আগে কড়া পাহারার ব্যবস্থা ছিলো তা দেখেই বুঝা যায়। পোর্ট আর্থারে ঢুকতেই আমার শরীরের সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলো শিহরিত হয়ে ওঠে। চারিদিকে সুনসান, ভীষণ নীরবতা। আগাগোড়া সবুজের বেষ্টনী। মাঝখান দিয়ে সুন্দর মসৃণ রাস্তা। সবে সন্ধ্যা হচ্ছে।
বিজলি বাতি জ্বলে উঠেছে রাস্তার দুই ধারে। চারিদিকে সবুজের আভা দেখা যাচ্ছে বাতির আলোতে। বিরাট ফলকে লেখা ডবষষ পড়সব আমাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। রুহী খুব মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে এসে দাঁড়ালো পোর্ট আর্থারের তথ্য কেন্দ্রের সামনে। আমি হারিয়ে গেলাম পোর্ট আর্থারের ইতিহাসের ভেতর। রুহী গাড়ি রেখে গেলো তথ্য কেন্দ্রের ভেতর, ঐতিহাসিক জায়গাগুলো দেখার নিয়ম কানুন জানতে। পোর্ট আর্থার নামের গোটা অঞ্চলটি শতাব্দীর পুরানো আকাশচুম্বী বিশাল বিশাল বৃক্ষের এক নীতিদীর্ঘ আরণ্যক ভূমি। দখলদার ইংরেজদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল উৎসের একটি হলো এই কাঠ সম্পদ। এই কাঠ সম্পদকে কাজে লাগাবার জন্য ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে এখানে কাঠের কারখানা স্থাপিত হয়। এখানে আসা কয়েদিদের হাতে গড়া এই কাঠ শিল্পের প্রথম পত্তন। এখানে প্রথম কয়েদিদের বসতিও স্থাপিত হয়। জুতা, কাপড়, আসবাবপত্রও তৈরি হয় এখানে। সমগ্র অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে শিল্পনগরী হিসেবে পোর্ট আর্থার পরিচিতি লাভ করে। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে এখানে আসামির সংখ্যা ছিলো ২৮০০ এর মতো। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে ১২০০০ কয়েদির মৃত্যু দন্ডাদেশের মধ্য দিয়ে এখানে নির্বাসন বন্ধ হয়ে যায়। পরে দুই যুগ কয়েদি নির্বাসিত এলাকাটা পতিত হয়ে থাকে। ইউরোপ হতে আনা কয়েদিদের স্থায়ীভাবে রাখার ব্যবস্থাও করা হয় পোর্ট আর্থারে। তাসমানিয়ার তদানীন্তন গভর্নরের নাম অনুসারে এই জায়গার নাম রাখা হলেও এটা আসলে অসংখ্য আসামির মৃত আত্মার বিচরণ ভূমি। অস্ট্রেলিয়া পত্তনের ইতিহাসে এদের অনন্য অবদানকে স্মরণে রাখার জন্য পোর্ট আর্থারকে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপ দিয়ে অর্থ উপার্জনের পথকে সুগম করে নিয়েছে অর্থলোভী ইংরেজ জাতি।
আমি যখন গাড়িতে বসে এসব ভাবছিলাম তখন হঠাৎ মাতৃভূমি বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে গেলো। আমার ছোট ছেলে বাবু এসব দেখার ব্যাপারে খুব উৎসুক। কিন্তু সে দেখতে পারছে না। ইতোমধ্যে রুহী এসে বললো, আম্মা, আপনি নামেন। ওরা বলছে, আজকে নাকি দেখার মতো ট্রিপ নেই। দেখতে হলে হোটেল ভাড়া করে রাতে থাকতে হবে। কাল সারাদিনে ছয় ট্রিপে এখানকার দর্শনীয় স্থানে ওরা গাইডের সাহায্যে নিয়ে যাবে। আমি নামলাম। তথ্য কেন্দ্রটি শৈল্পিক কায়দায় তৈরি। তথ্যকেন্দ্রের অভ্যর্থকারিণী একজন বর্ষীয়ান শ্বেতাঙ্গ মহিলা। চারিদিক গাছে গাছে সবুজ। আমি ঐতিহাসিক জায়গা দেখতে সুদূর বাংলাদেশ থেকে এসেছি জেনে তিনি আমার দিকে বহুক্ষণ তাকিয়ে কি যেনো ভাবলেন, পরে বললেন, আমাদের একটা ট্রিপ রাত সাড়ে নয়টায় এযড়ংঃ ট্রিপে যাবে। ঐ ট্রিপে লোকসংখ্যা ত্রিশজন না হলে আপনারা যেতে পারবেন।
অনেক দূর জার্নি করে এসেছি। একটু বিশ্রাম দরকার। দুই নাতনীও ক্লান্ত হয়ে গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন রাত আটটা। ঐ ট্রিপে যেতে হলে আগে আমাদের একটা হোটেল দরকার। রুহী রাতের এবং পরের দিন দুপুর পর্যন্ত থাকার জন্য একটা গেস্টরুম ভাড়া করলো ১২০ ডলারে। পাশাপাশি অনেকগুলো অ্যাপার্টমেন্ট একই রকমের।
প্রত্যেকটি অ্যাপার্টমেন্টে ড্রইং রুম, কিচেন, দু’টি বেডরুম ও বারান্দা। শুনলাম, এই জায়গায় আবাদ করার সময় ইংরেজদের ঋড়ী ধহফ ঐড়ঁহফ ঐড়ঁংব ছিলো এই বাড়িটি। সময়ের ¯্রােতে কিছুটা রদবদল করে এখন সুসজ্জিত গেস্ট হাউজ করে পর্যটকদের ভাড়া দিচ্ছে। রুমে ঢুকে আমরা মুখ-হাত ধুয়ে একটু বিশ্রাম করে তৈরি হয়ে রইলাম ফোনের আশায়। ঠিক সময়ে ফোন এলো।
আমরা যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। বুকে আমার অজানা ভয়ের কম্পন। সূরা নাস, ফালাক পড়ছি বারবার। দেড়শ বছর আগে পৃথিবীর চলে যাওয়া অসংখ্য অতৃপ্ত আত্মার সান্নিধ্যে যেতে এখানে আমরা নানান দেশের ত্রিশজন যাত্রী একত্রিত হয়েছি। চারিদিকে ভয়াবহ পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে যেনো অশরীরী আত্মার আভাস পাচ্ছি। সভ্যতার শীর্ষতম জায়গায় শেষ দক্ষিণে আমরা গোটা ত্রিশেক লোক অজপাড়াগাঁয়ের রাতের মতো গহিন আঁধারে পথ চলার জন্য ল্যান্টন জ্বালিয়ে গাইডের দিক-নির্দেশনায় ভূত দেখার জন্য রওনা দিলাম। গাইড গম্ভীরকণ্ঠে জানতে চাইল কেউ তার সঙ্গে ল্যান্টন নেয়ার সঙ্গী হবে কিনা। দুইজন অস্ট্রেলিয়ান তরুণী একজন যুবক সম্মতি দিলে ওদের হাতে গাইড তিনটি ল্যান্টন তুলে দিলো। বললো, একজন ট্রিপের পেছনে থাকবে, একজন মধ্যখানে আর একজন সামনে। তথ্যকেন্দ্রের ছিমছাম, পরিপাটি, বিজলি আলোর চোখ ঝলসানো রোশনাই ফেলে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে আমরা নেমে গেলাম গহিন আঁধার রাজ্যে। উপরে তারা ভরা আকাশ। শাখা-প্রশাখা ছড়ানো শতাব্দী পুরনো বিশাল বিশাল গাছের ভেতর দিয়ে সরু বাঁধানো রাস্তা ধরে আমাদের অভিযান শুরু হলো অপরাধ জগতের অতৃপ্ত আত্মাদের অন্বেষণে। সামনে যার হাতে ল্যান্টন সে উঁচু নিচু দেখলে পেছনের সবাইকে সাবধান করে দিচ্ছে। কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নাই। সবাই অদৃশ্য এক আকর্ষণে চুম্বকের মতো আঁধারের মধ্যে শির শির আওয়াজরত অসংখ্য গাছের মধ্য দিয়ে এগুচ্ছে। গাইড একদম চুপ। হিস-হিস, সো-সো আওয়াজ। আমরা কোথায় যাচ্ছি? সামনে পড়ে আছে দেড়শ বছরের পুরনো কিছু ভাঙা বাড়ির ধ্বংসস্তূপ। মনে হচ্ছে বন্দী আসামিদের পায়ের শিকল যেনো ঐ সব ঘরগুলিতে ঝনঝন শব্দ তুলছে। দুঃসহ যন্ত্রণার কাতর আর্তনাদ যেনো কানে এসে লাগছে। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে কোনো অস্বাভাবিক মৃত আত্মার সান্নিধ্য পাওয়ার আশায়… হ