ইংরেজি রোমান্টিক কাব্যধারার অন্যতম স্থপতি এস টি কোলরিজ কবিতার ভাষা নির্মাণ ও প্রকাশ সম্পর্কে দু’টি চমৎকার মন্তব্য করেছেন, ‘সুন্দর শব্দের সুনিপুণ পদবিন্যাস কবিতা’ এবং ‘স্পর্শী অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ কবিতা’। যদিও কোনো নির্দিষ্ট বা একক সংজ্ঞা দিয়ে কবিতাকে ব্যাখ্যা করা যায় না অথবা একজন কবি-লেখকের মন্তব্যই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত হতে পারে না, তবু এ দুটি সংজ্ঞায় আমরা তাৎপর্যপূর্ণ দুটি অনুষঙ্গ পাই যা কবিতা রচনার প্রধানতম না হলেও গুরুত্বপূর্ণ নিরূপক বা নির্দেশক; সে দুটি হচ্ছে- ‘স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ’ এবং ‘নিপুণ পদবিন্যাস’। অবশ্য, কবিতা লিখতে গিয়ে কবি যদি কোনো বিষয় বা ঘটনাকে সামনে রাখতে যান বা প্ররোচক হিসেবে তাঁর মধ্যে কোনো কিছু কাজ করে অথবা কারও বিশেষ মনোরঞ্জনের বিষয় মাথার কাজ করে, তবে সেটা শিল্পবাচ্য না-ও হতে পারে। শিল্পরচনায় কবিকে ভাবনিষ্ঠ ও স্বাধীন থাকতে হয়। অন্যথায় তা মার্গচ্যুত হবে নিশ্চিত। এ বিষয়ে চলিত ভাষারীতির প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরীও চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন, ‘কবিতা কোনো ভাব, ঘোর, চিন্তা, চেতন বা অবচেতন মুহূর্তের তাজা ফসল যেখানে বল প্রয়োগ করার খুব বেশি অবকাশ থাকে না।’ আধুনিক শিল্প সম্পর্কে থিওফিল গত্যিয়ের মন্তব্য হচ্ছে- শিল্পকলা সকল প্রকার উপযোগিতা বর্জিত। অর্থাৎ নির্দিষ্ট শিল্পকর্ম কোনো উপযোগ বা উপলক্ষকে পোষণ করবে না বরং উত্তম শিল্পই তার শিল্পগুণের মাধ্যমে উপযোগিতাকে নানা রকমে মহার্ঘ্য করে তুলবে। একজন কবির প্রথমতই প্রয়োজন শক্তিশালী শব্দভান্ডার, শব্দের প্রয়োজনে এ-জন্য প্রকৃত কবিরা শব্দ-সন্ধানী হয়ে থাকেন। কেবল হালকা ও তরল শব্দচালে উন্নত কবিতা রচনা সম্ভব নয়। কবিতার ভাব যখন অবোধ্য, অগম কিংবা ঝলকানির মতো অনুভূতি নিয়ে আসে সে ক্ষেত্রে উন্নত এবং ব্যঞ্জনাময় শব্দই কবিতার ভাব প্রকাশে বড় ভূমিকা রাখে। শব্দভান্ডারের সংকীর্ণতা থাকলে খুব মননশীল অন্তরীণ অনুভূতিমালা প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিরল ও বিচিত্র শব্দের ব্যবহার, ভিন্নার্থে শব্দ প্রয়োগ এবং কল্পিত শব্দ সৃষ্টিতে কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। এলিয়ট তাঁর The Waste Land কাব্যে নিজস্ব টীকা সংযোজনের মাধ্যমে কবিতা প্রকাশ করেছিলেন। অর্থঘনত্ব ও শিল্পসৌকর্য সৃষ্টির প্রয়োজনে যথার্থ শব্দ ব্যবহারপূর্বক কবিতার শেষে তেমন শব্দভাষ্য ব্যবহার করা যায়। নিজস্ব শব্দভঙ্গি সৃষ্টির প্রয়োজনে কবিকে হতে হয় শব্দ-শ্রমিক। শেকসপিয়রের ভান্ডারে ছিল প্রায় পঁচিশ হাজার শব্দ। তাঁর রচনায় তিনি দুই হাজারের মতো নতুন শব্দ যোগ করেছিলেন। blanket, gossip, assassination, champion ইত্যাদি শব্দ তিনিই প্রথম ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া কয়েক-শ নতুন ও জনপ্রিয় শব্দবন্ধ বা Phrase তিনি যোগ করেছেন ইংরেজি ভাষায়- in my mind’s eye, we have seen better days, a pound of flesh, murder most foul যার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
দীপ্তি ত্রিপাঠী আধুনিক বাংলা কবিতার ভাব ও প্রকরণগত অনেক লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় আমরা প্রকরণগত কতিপয় ধরনের পাঠ নিলাম।
ক. গদ্য ছন্দের বহুল ব্যবহার।
খ. প্রচলিত কাব্যিক শব্দ- এনু, গেনু, হিয়া, হেরি, হেন, মোদের, মম, মোরা, তব, পানে, যবে প্রভৃতি শব্দ বর্জন।
গ. প্রাচীন উপমা বা শব্দের অভিনব অর্থে প্রয়োগ, প্রত্যক্ষের চেয়ে পরোক্ষ উপমা ব্যবহার এবং নতুন চিত্রকল্প ও রূপক সৃষ্টি।
ঘ. শব্দ প্রয়োগে মিতব্যয়িতা ও অর্থঘনত্ব সৃষ্টি।
ঙ. চলতি ক্রিয়া পদের সঙ্গে তৎসম শব্দের ব্যবহার।
চ. রসের ক্ষেত্রে ব্যঙ্গ, অদ্ভুত, বীভৎস রসের বহুল ব্যবহার।
অনেকে মনে করে থাকেন বা মন্তব্য করেন যে, তৎসম শব্দ কিংবা পুরনো শব্দের ব্যবহার আধুনিক কবিতায় চলবে না কিন্তু আধুনিক কবিতার উল্লিখিত বৈশিষ্ট্য পাঠে আমরা বলতে পারি যে, অর্থঘনত্ব সৃষ্টি এবং ভাবকে স্বচ্ছন্দ রেখে শব্দের নিপুণ বিন্যাসের প্রয়োজনে কেবল তৎসম শব্দই নয়- পুরনো, অপ্রচলিত শব্দ, লোকজ শব্দ, ধর্মীয় শব্দ, আদিবাসীদের ব্যবহৃত শব্দ, মিথ ও কিংবদন্তি অনায়াসে আধুনিক কবিতায় ব্যবহার চলে। তবে সতর্ক হতে হবে ক্রিয়াপত্র ও সর্বনাম পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে- যতটা সম্ভব চলিত ভাষায় বাক্য নির্মাণ করা যায়। যদিও একান্ত বাক্প্রবাহ রক্ষার প্রয়োজনে মিশ্রণ দোষণীয় হবে না। কবিতা বলতে তার ভাববস্তু ও রূপরীতি (ঋড়ৎস) – এ দুয়ের সম্মিলন বোঝায়। ভাব ও রূপের একাঙ্গ লাভই কাব্যের প্রাণ। রূপগত বা নির্মাণ কৌশলগতভাবে কবিতার ভাষা নির্মাণে মোটামুটি তিন ধরনের কৌশলের প্রয়োগ দেখা যায়- বাক্ কৌশল বা কথকতা, ছন্দ কৌশল এবং শব্দবিন্যাস কৌশল। একটি শিল্পসম্মত কবিতায় যেকোনো একটি কৌশলের সাক্ষাৎ পাওয়া যাবে, তবে কিছু সার্থক কবিতায় একাধিক কৌশলের যথার্থ প্রয়োগও দৃশ্যমান হয়। বক্ষ্যমাণ রচনায় আমরা কেবল শব্দবিন্যাসের কৌশল সম্পর্কে বক্তব্য নেবো এবং এ ক্ষেত্রে প্রসঙ্গ বিবেচনায় কিছু কবিতাংশও পাঠ করব।
ক. ছন্দকৌশল এবং শব্দ প্রয়োগ কৌশলের গুণে বাংলা সাহিত্যের অনন্য পাঠ কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। শব্দ-ব্যঞ্জনায় সম্মোহন সৃষ্টিতে সমার্থক শব্দেরও পরপর প্রয়োগ করে অভিনব পন্থায় অর্থ-সম্পূর্ণতা রক্ষণসহ উচ্চ-শিল্পে অধিগমন সম্ভব, ‘বিদ্রোহী’ থেকে এমন একটি চমৎকার নমুনা-
‘আমি উত্তর-বায়ু মলয়-অনিল উদাস পূরবী হাওয়া/ আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া’।
কবিতাংশের উত্তর-বায়ু, মলয়, অনিল, পূরবী হাওয়া সবই ‘বাতাসের’ সমার্থক শব্দ কিন্তু বায়ুতে বায়ুতে যে ভেদ তা-ই বিভাসিত হয়ে এক অমোঘ অদ্ভুত অনুধ্যান সৃষ্টি হয়েছে এখানে।
খ. ‘যক্ষের নিবেদন’ শিরোনামে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত কালিদাসের ‘মেঘদূত’ অনুবাদ করেছেন। কিন্তু ছন্দ এবং শব্দমাধুর্যের অপূর্ব প্রয়োগে তা হয়ে উঠেছে উচ্চশিল্পসম্পন্ন কাব্যকীর্তি-
‘পিঙ্গল বিহ্বল ব্যথিত নভতল কইগো কই মেঘ উদয় হও
সন্ধ্যার তন্দ্রায় মুরতি ধরি আজ মন্দ্র-মন্থর বচন কও।’
গ. ব্যতিক্রম শব্দ ভঙ্গিমায় মগ্ন অনুভূতিমালা চিত্রণে জীবনানন্দের ভূমিকা অনন্য। তাঁর শব্দে শব্দে বিম্বিত ‘ইতিহাসযান’ কবিতা থেকে সামান্য পাঠ- ‘নিজেকে কেবলই আত্মক্রীড়া করি, নীড় গড়ি/ নীড় ভেঙে অন্ধকারে এই যৌন যৌথ যন্ত্রণার মালিন্য এড়ায়ে উৎক্রান্ত হতে ভয় পাই/ সিন্ধুশব্দ, বায়ুশব্দ, রৌদ্রশব্দ, রক্তশব্দ, মৃত্যুশব্দ এসে/ ভয়াবহ ডাইনির মতো নাচে- ভয় পাই- গুহায় লুকাই/ লীন হতে চাই- লীন ব্রহ্মশব্দে লীন হয়ে যেতে চাই/ আমাদের দু’হাজার বছরের জ্ঞান এ রকম।’
ঘ. প্রেমেন্দ্র মিত্রের বর্ণনায় পথে, মধুর স্মৃতি ও সন্তাপ একাকার হয়ে স্বর তোলে সাবলীল কথকতার-
‘সেই পথ হারানো পথ আমাকে টানে
কেরামানের নোনা মধুর উপর দিয়ে
খোরাশান থেকে বাদকশান
পামিরের তুষার-পৃষ্ঠ ডিঙিয়ে, ইয়ারকন্দ থেকে খোটান।
শ্রান্ত উটের পায়ে-পায়ে যেখানে উড়েছে মধুর বালি
চমরীর ক্ষুরে লেগেছে বরফ গলা কাদা।
বাদকশানের চুনি আর খোটানোর নীলার নিষ্ঠুর ঝিলিক দেওয়া
ভেঙে-পড়া ক্যারাভানের কঙ্কালে আকীর্ণ
লুব্ধ বণিক আর দুরন্ত দুঃসাহসীর পথ-
লাদকের কস্তুরীর গন্ধ যেখানে আজো আছে লেগে পুরনো স্মৃতির মতো।’
ঙ. স্মৃতি-বিস্মৃতির দোলাচলে দারুণ শব্দ মহিমায় বিষ্ণু দে ‘মহাশ্বেতা’ কবিতায় প্রেমকে প্রোজ্জ্বল করেছেন-
‘নয়নে তোমার মদিরেক্ষণ মায়া
স্তন চূড়া দিলো ক্ষীণ কটিতটে ছায়া
স্বপ্ন-সারথি, তোরণ কি যায় দেখা?
অমরলোকের ইশারা তোমার চোখে
ক্লান্তিবলয় মিলায় সুমেরুলোকে
আজ কি আমাকে ভুলেছো মহাশ্বেতা?’
চ. শব্দানুষঙ্গের প্রবাহ বজায় রেখে নিজভূমিকে কল্পিত প্রেয়সীর মতো স্নিগ্ধ, চির সতেজ করে প্রকাশের এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন সৈয়দ আলী আহসান, তাঁর ‘আমার পূর্ব-বাংলা’ শীর্ষনামের কবিতায়-
‘আমার পুর্ব-বাংলা একগুচ্ছ স্নিগ্ধ অন্ধকারের তমাল/ অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায় একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ/ সন্ধ্যার উন্মেষের মতো সরোবরের অতলের মতো/ কালো কেশ মেঘের সঞ্চয়ের মতো/ বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি/ আমার পূর্ব-বাংলা বর্ষার অন্ধকারের অনুরাগ।’
ছ. লোকজ শব্দ, মিথ, ঐতিহ্য এবং কিংবদন্তির নিপুণ-সমাবেশে আল মাহমুদ নিজস্ব এক ধ্রুপদী কাব্যভাষা নির্মাণে সক্ষম হয়েছেন; শব্দ ব্যবহারের সহজাত নৈপুণ্য তাঁর কবিতাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে। বিচিত্র ভাবের সাথে তাঁর শব্দবিন্যাস ও যোজনা পাঠককে সম্মোহিত করে-
‘চিতল হরিণী তার দ্রুতগামী ক্লান্তির শেষ যামে/ যখন প্রবণে পিপাসায় মুখ নামায় আমি সেই জলপান শব্দের শিকারি।’
(পিপাসার মুখ, ‘লোক লোকান্তর’)
জ. শব্দের শক্ত গাঁথুনি সৃষ্টির মাধ্যমে ভাস্কর্যধর্মী কবিতার শক্তিমান কারিগর কবি বিনয় মজুমদার। তাঁর শব্দপ্রয়োগ যেন অবিকল্পভাবে স্থাপিত; প্রতিটি শব্দই যেন সিদ্ধসূত্রে রোপিত-
‘হৃদয়, নিঃশব্দে বাজো; তারকা, কুসুম, অঙ্গুরীয়
এদের কখনো আর সরব সংগীত শোনাবো না।
বধির স্বস্থানে আছে, অথবা নিজের রূপে ভুলে
প্রেমিকের তৃষ্ণা দ্যাখে, পৃথিবীর বিপণীতে থেকে।’
(ফিরে এসো, চাকা)
ঝ. পুরনো উপমা ও শব্দের নান্দনিক প্রয়োগ আমরা খুঁজে পাই মুহম্মদ নূরুল হুদার আখ্যান বর্ণনায়-
‘চিত্রার্পিত নারী এক মুদ্রিতনয়না
কপাল বিন্যস্ত যার দুই করতলে
ভাষাহীন স্পন্দহীন লুটায় ভূতলে
শর্মিন্দা শরীর, আহা, বিব্রস্ত-বসনা।’ (শুক্লা শকুন্তলা)
ঞ. শব্দের সুনিপুণ মালা গেঁথে স্বল্পকালের মধ্যেই কাব্যপিয়াসুগণের দৃষ্টি আকর্ষণে খুব সার্থকভাবে পারঙ্গম হয়েছেন আবুল হাসান, অদ্ভুত ভাব ও বাক্-শিহরণে তিনি নিজে যেমন দুলেছেন, দুলিয়েছেন লেখকদেরও। তাঁর ‘একসময় ইচ্ছে জাগে’ কবিতার কিয়দংশ পাঠ-
‘একসময় ইচ্ছে জাগে, মেঘপালকের বেশে ঘুরিফিরি
অরণ্যের অন্ধকার আদিম সর্দার সেজে মহুয়ার
মাটির বোতল ভেঙে। উপজাতি রমণীর বল্কল বসন
খুলে জোৎস্নায় হাঁটু গেড়ে বসি-
আর তারস্বরে বলে উঠি নারী, আমি মহুয়া বনের
এই সুন্দর সন্ধ্যার পাপী, তোমার নিকটে নত, আজ
কোথাও লুকানো কোনো কোমলতা নেই’
ট. বীররসকে আশ্রয় করে দারুণ শক্তিমত্তার সাথে কবি সব্যসাচী দেব আমাদের শুনিয়েছেন মহাভারত, রামায়ণসহ পুরনো আখ্যানসমূহের গতিশীল পাঠ- তাঁর ‘কর্ণ’ কবিতা থেকে সামান্য উদ্ধৃতি-
‘বিশাল সভাগৃহে দুঃশাসনের লোলুপ আঙুল যখন ছিঁড়ে নিচ্ছিল দ্রৌপদীর লজ্জা/ ক্ষণিকের জন্য আমার তূণীর থেকে তীর উঠে এসেছিল হাতে/ আমার কাক্সিক্ষতার অপমানে।/ পরক্ষণেই করতালিতে ব্যস্ত হয়েছে দু’হাত/ কেননা দুর্যোধন আমার উপকারী বান্ধব, আমার প্রভূ/ প্রতি মুহূর্তে দুর্যোধনের ভ্রুকুটি স্থির করে দিচ্ছিল আমার কর্তব্য-/ আর প্রতি মুহূর্তে নিজের অক্ষম ভীরুতাকে ঢেকে রাখার জন্য/ উচ্চরতে প্রচার করেছি আমার শৌর্যের অহংকার’
ঠ. ‘ভালোবাসা সসস্ত্র হলে যুদ্ধ থেমে যায়
আদিগন্ত বরফপ্রান্তর সূর্যালোকিত রাতে গুণগুণ গান গায়
সে গান একদিন এমনি প্রখরতা পায়
সকালে পাখির গান ম্লøান হয়ে যায়।’
‘নদী ও ভালোবাসা’ শিরোনামের কবিতায় কবি দিলীপ দাস অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন শব্দকুশলতায় ভালোবাসার শক্তিমত্তাকে প্রকাশ করেছেন। আজকের পৃথিবীর এই যে প্রতিহিংসা, বিগ্রহ, হত্যা, ধর্ষণ এসব যাবতীয় অনাচারের পেছনে রয়েছে ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আস্থার অভাব। যেখানে ভালোবাসা শক্তিশালী সেখানে যুদ্ধ, বিবাদ, বিসংবাদ কখনোই আঁচড় কাটতে পারে না। এই অমোঘ বক্তব্যের সাথে শব্দবিন্যাসের নৈপুণ্য কবিতাটিকে অনবদ্য করে তুলেছে।
ড. প্রেম ও বিপ্লবের ভাষ্যকার কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তীব্র চৈতন্য ও ধ্বনি-দ্যোতনার সাথে প্রেম-অপ্রেমে তিনি উচ্চারণ করেছেন দীপ্ত শব্দমালা, যা কেবল কানে নয়, গভীর অন্তরালে বাজে; তাঁর ‘অভিমানের খেয়া’ থেকে কয়েক ছত্র-
‘অভিলাষী মন চন্দ্রে না-পাক, জ্যোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই
কিছুটা তো চাই, কিছুটা তো চাই
আরো কিছু দিন আরো কিছু দিন- আর কতদিন
ভাষাহীন তরু বিশ্বাসী ছায়া কতোটা বিলাবে?
কতো আর এই রক্ত-তিলকে তপ্ত প্রণাম
জীবনের কাছে জন্ম কি তবে প্রতারণাময়?
এতো ক্ষয়, এতো ভুল জমে ওঠে বুকের বুননে
এই আঁখি জানে, পাখিরাও জানে কতোটা ক্ষরণ
কতোটা দ্বিধায় সন্ত্রাসে ফুল ফোটে না শাখায়।’
ঢ. রেজাউদ্দিন স্টালিন- মিথ, ঐতিহ্য ও সমকালচেতনায় উদ্দীপ্ত কবি। অন্তঃশীল চেতনার সাথে স্বতঃস্ফূর্ত বাক্কুশলতা তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
‘স্মৃতির পাখিরা এসে বলে যাবে সুরঞ্জনা শোনো:/ কাল সারারাত জেগে বিচ্ছেদের বেদনা লিখেছি/ ফিরিয়ে নিয়েছি মুখ পরস্পর ক্ষোভে ও ঘৃণায়/ কে জানতো মুহূর্তের মরীচিকা কেড়ে নেবে আলো/ বুকের ভেতর থেকে জেগে ওঠা একখন্ড ভূমি/ দখল করবে এসে নগরের নিকৃষ্ট মাতাল।/ পৃথিবীর দীর্ঘতম সেতুর উপরে উভয়ের দেখা হবে/ কথা ছিলো নক্ষত্রের বিশাল টাওয়ারে শিশিরের শিহরণে/ স্বপ্নগর্ভ আকাশের নিচে/ জোছনায় অন্তহীন অপেক্ষা করবো।’ (বিচ্ছেদের বর্ণমালা)
ণ. আত্ম-রোদনের মাঝে উদার সমর্পণ, নির্মম বাস্তবতার মাঝেও রোমান্টিক আবেশ সৃষ্টি করে ইসহাক সিদ্দিকীর কবিতা; শব্দ প্রয়োগের অভিনব কসরতে দীপ্ত তাঁর ‘যেখানেই রাখো পা’ কবিতার কয়েক ছত্র-
‘যেখানেই রাখো পা, রাজধানী হবে
বাউল বিপন্ন হবে বিস্ময়ে চমকে
আমার সহস্র খুলি জমা হবে
সরোবর পাখির প্রতিবিম্ব হবে
যেখানেই রাখো পা-
আমাকে একা নিবেদিত পাবে।’
ত. প্রাচীন ইতিহাস, ভূগোল থেকে আরম্ভ করে আধুনিক প্রযুক্তি, পণ্য-রসনা এমনকি দাপ্তরিক শব্দসহ বিবিধ অনুষঙ্গকে কবি আমিনুল ইসলাম তাঁর কবিতায় সাদরে প্রশ্রয় দেন, তারপর যা তিনি উচ্চারণ করেন তা কিন্তু বস্তুর চেয়ে ভাবমর্মেই অধিক স্বর তোলে; তাঁর ‘স্বাগত হে অভিনেত্রী’ কবিতার সামান্য পাঠ-
‘আমি আমরণ রয়ে যাবো
নগ্ন-হৃদয়ের রোগী
যেভাবে সন্তান রয়ে যায় শিশু
আজীবন জননীর কাছে।’
থ. অদ্ভুত ভৌতিকতার রক্তখেলা যেন লেপ্টে আছে মজুন শাহ’র কবিতায়; কেবল ইশারা কেবল হাতছানি, কাছে পেয়েও যেন তাকে কোনো দিন ছোঁয়া যায় না, এমনই অবাক অনুভূতিশীল তাঁর শব্দমন্ত্র- কবিতার নাম ‘প্রহরী’-
‘কৃষ্ণসার মৃগভূমি আমাকে তার আরও কাছে যেতে বলে/ যতদূর চোখ যায় উঁচু উঁচু গাছগুলো দূরত্বকে ধরে আছে/ সমুদ্রে ছড়িয়ে আছে মানুষ ও মহিষের রক্ত/ গাঁদাফুল মালা পরে কারা এত নাচছে এই যাবার সময়?’
দ. শব্দে শব্দে অন্তরীণ ছন্দকে ছড়িয়ে দিয়ে মুক্ত বাক্-প্রবাহের চালে কবিতার চমৎকার এক গদ্যভাষা রপ্ত করেছেন কবি চাণক্য বাড়ৈ। তাঁর ‘পরিত্যক্ত হেরেম’ কবিতার থেকে কিঞ্চিৎ পাঠ-
‘অতল মধ্যরাতে তুমি আসো- পরিত্যক্ত সোনার হেরেমে- নিঃসুর, নিথর এই হাওয়ার অভ্যন্তরে কান পেতে কার করুণ শিঞ্জনী শোনো রোজ-’
উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিগুলোর মতো শব্দশীলনের নান্দনিক ব্যঞ্জনাসম্পন্ন এমন অগণন উদাহরণ পাওয়া যাবে বাংলা কবিতায়, পাওয়া যাবে মধুসূদনে, রবীন্দ্রনাথে এবং বাংলা কবিতার সাধনায় নিয়োজিত আরও অনেক কবির কবিতায়। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ কবিতায় কবিতা সম্পর্কে খুব চমৎকার দুটি পঙ্ক্তি উচ্চারণ করেছেন- ‘জিহ্বায় উচ্চারিত প্রতিটি সত্য শব্দ কবিতা/ কর্ষিত জমির প্রতিটি শস্য দানা কবিতা।’
আসলে, একরকমভাবে বলা যায়- শব্দই কবিতা। যে শব্দসমষ্টিতে নিবিড় বিন্যাসের সাথে সাথে গভীর সম্পৃক্ততায় ভাব ও চেতনা সংযুক্ত থাকে, তা-ই কবিতা। আধুনিক কবিতার একটি বড় ধর্ম হলো, শব্দপরিক্রমার অন্তরালে প্রচ্ছন্নভাবে ভাব ও ছন্দের সঙ্গতি। ব্যাকরণগত বা আনুষ্ঠানিক ছন্দ ভাবের স্বাচ্ছন্দ্যকে আড়ষ্ট করে দিতে পারে বলে বাক্য নির্মাণের ক্ষেত্রে আধুনিক কবিরা গদ্যকে বেছে নিয়েছেন; তবু কবিতা এবং সাধারণ গদ্যের মধ্যে যে তফাৎ তা কিন্তু ভাব, চিন্তা ও নির্মাণ-কৌশলে কবিকেই স্পষ্ট করে দিতে হবে; অন্যথায় সেটা কবিতা হবে না। উত্তম কবিতা কখনো অযথার্থ-রকমে অবোধ্য হতে পারে না, ভাব ও চিন্তার ফলশ্রুতি কিছু ক্ষেত্রে কবিতাকে অনুধাবনাতীত করে তোলে; সে ক্ষেত্রে অনুভব করে পাঠক কবিতা রপ্ত করে। কিন্তু অনর্থ, অযৌক্তিকভাবে শব্দের কঙ্কাল তৈরি করে কবিতায় মুনশিয়ানা দেখাতে গেলে সেই প্রচেষ্টা গচ্চা যায়, যা সম্প্রতিককালের কবিতায় বেশ দৃশ্যমান হচ্ছে। শব্দের ব্যাপক দখল, শিল্প ও শব্দ-ব্যঞ্জনা সম্পর্কে বোধগম্যতা এবং বিন্যাস-সামর্থ্যরে মধ্যেই মূলত কবির দক্ষতা ও পরিচয় ফুটে ওঠে। একান্ত প্রয়োজন ব্যতিরেকে একই কবিতায় একই শব্দের একাধিক প্রয়োগ কবিতার শিল্পকে ক্ষুণœ করে, এমন ক্ষেত্রে সমার্থক শব্দের ব্যবহার করা যায়। ভাষাকে গতিশীল ও ধ্বনিময় করার প্রয়োজনে কবিতায় শৈল্পিক উপমা, অনুপ্রাস সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা আছে। কবিতার বাক্যে অর্থঘনত্ব সৃষ্টি ও বাক্-মাধুর্যের প্রয়োজনে সন্ধি, সমাস, উপসর্গ ও যৌথবন্ধ প্রক্রিয়ায় নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি করা যায়; যা প্রয়োগে কাব্যভাষা সমৃদ্ধ হয়। কবি নিজস্ব প্রক্রিয়ায় একেবারে অচিন্ত্য, অশ্রুতপূর্ব এবং কল্পিত শব্দের ব্যবহারও করতে পারেন, তবে এ ক্ষেত্রে টীকা অথবা শব্দভাষ্য প্রদান জরুরি। হ