নাটক প্রধানত দৃশ্যকাব্য। তবে অনেকে একে দৃশ্য এবং শ্রব্যকাব্যের মিশ্রণ বলেও উল্লেখ করেন। সুতরাং, এভাবে বলা যায়- নাটক দৃশ্য ও শ্রব্যকাব্যের সমন্বয়ে রঙ্গমঞ্চের সাহায্যে গতিমান মানবজীবনের কাহিনী দর্শকের সামনে মূর্ত করে তোলে।১ ইংরেজিতে নাটকের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবে-“Drama is the creation and representation of life in terms of theatre”২ অর্থাৎ দেখা আর শোনা মিলে দর্শক চিত্ত ও চিন্তাকে যে নাটক অভিভূত করতে সক্ষম হয়, তাকেই বলে সার্থক নাটক। নাটকের জীবন বাস্তব জীবনেরই প্রতিচ্ছায়া, দর্শকের চোখের সামনে তা উপস্থাপন করা হয়;
ফলে নাটকায়িত জীবন দৃশ্যগত ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হয়।৩ প্রখ্যাত সমালোচক M.H. Abrams এর ভাষায় Drama is the literary form designed for the theater, Where actors take the roles of characters, perform the indicated action, and utter the written dialogue.4
অ্যারিস্টটল Poetics গ্রন্থে নাটকের ছয়টি উপাদানের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন-১. প্লট বা কাহিনী, ২. চরিত্র, ৩. রচনারীতি, ৪. ভাব, ৫. দৃশ্য, ৬. সঙ্গীত।৫ কালের বিবর্তনে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও রুচির পরিবর্তনে নাটকের রূপ-রীতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু নাটকের মৌলিক উপকরণ-অভিনেতা-অভিনেত্রী, দর্শক-শ্রোতা এবং মঞ্চ একই রয়ে গেছে। নাটকে মানবজীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে ফুটিয়ে তোলাই নাট্যকারের প্রধান লক্ষ্য।
ইবরাহীম খাঁ যে সময়ে নাটক-চর্চা শুরু করেছেন, সে সময়টি ছিল বাঙালি মুসলমানের নাট্যচর্চার প্রতিকূলে। দীর্ঘ দুই শ’ বছর ইংরেজ জাতির শাসন ও শোষণে নিষ্পেষিত মুসলিম সমাজ ছিল হতবিহবল। রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি সবদিকেই মুসলিম সমাজ ছিল পশ্চাৎপদ। কিছু সংখ্যক মৌলভীদের মনগড়া ফতোয়ার কারণে নাট্যাভিনয় সম্পর্কে জনমনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল। রক্ষণশীল গোষ্ঠী ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অভিনয়শিল্পকে মুসলিম সমাজের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনা করেছেন। ‘নাটকের উপদেশ’ গ্রহণ করার পরিবর্তে ‘নায়ক-নায়িকা’ ও যুবতী রমণীদের রূপ-লাবণ্য, নাচ-গান, অঙ্গভঙ্গি দেখার জন্যই শতকরা নিরানব্বই জন লোক থিয়েটারে যায় বলে মত প্রকাশ করেছেন জনৈক নজির আহমদ।৬ সমাজের এক শ্রেণীর মানুষের বিরোধিতা সত্ত্বেও বুদ্ধিজীবী ও সংগঠন অভিনয়কে সমাজ বদল ও জাগরণের অন্যতম উপায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কবি ও নাট্যকার শাহাদাৎ হোসেন ‘সমাজ বা জাতীয়তা’ গঠনে নাট্যাভিনয়ের অসাধারণ প্রভাবের কথা উল্লেখ করে নাট্যসাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে স্বীয় মতামত ব্যক্ত করেছেন।৭ বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ সমাজের নানাবিধ কুসংস্কার ও অন্ধ আনুগত্যের বিরুদ্ধে যুক্তিপূর্ণ মতামত ব্যক্ত করে সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর মুখপাত্র ছিল শিখা সাহিত্যপত্র। এর মুখবাণী ছিল ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ নাটক সমাজ বদলের হাতিয়ার, অথচ মুসলিম নামধারী কিছু সংখ্যক মোল্লা-মৌলভীর ফতোয়ার কারণে মুসলিম লেখক ও অভিনয়শিল্পীগণ নাট্যচর্চা থেকে বিরত ছিলেন। সে সময়ে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এসব সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছিল। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এর প্রথম বার্ষিক অধিবেশনে আবদুস সালাম খাঁ তাঁর ‘নাট্যাভিনয় ও মুসলিম সমাজ’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন :
প্রথমেই চোখে পড়ে অভিনয়ের বিরাট ধঢ়ঢ়বধষরহম শক্তি। সমাজের সাধারণ লোক খুব বিখ্যাত বাগ্মীর বক্তৃতায়ও যত না উপস্থিত হয় তাহার তিন গুণ হয় যে কোন বাজে অভিনয়ে।… অভিনয়ে যে কেবল ধর্মের জয় ও অধর্মের পতনই দেখিবে তাহা নহে, কুশিক্ষা ও কুসংস্কারের ফল, একতা, শিক্ষা ও ব্যবসার উন্নতির মনোহরচিত্র, মানব জীবনের গূঢ় রহস্য, সৃষ্টির বৈচিত্র্য ইত্যাদি দেখিয়া সাধারণের ধারণায় যে গতি হইবে, তাহাতে উহা সমাজের পক্ষে কোন অবস্থায় নাজায়েজ ত নয়ই বরং অত্যন্ত জায়েজ বলিলেও বোধ হয় অপরাধ হয় না।৮
ইবরাহীম খাঁ নিজেই জানিয়েছেন, সে সময়ে নাটক করার প্রচলন ছিল শহর-বাজারে এবং তা আবদ্ধ ছিল হিন্দু সমাজে। তাঁদের মঞ্চে কামাল পাশাকে ঠাঁই দেওয়ার মত রুচি তাঁদের অনেকের মধ্যেই তখনো বিকাশ লাভ করে নাই। শহর-বাজারে মুসলমানের পরিচালনায় কোন বাংলা মঞ্চ ছিল না। পাড়াগাঁয় রক্ষণশীল ইসলামী পরিবেশে নাটক মঞ্চস্থ করা প্রায় অসাধ্য ছিল। কিছুকাল পরেই আধুনিকতার ছোঁয়ায় মুসলিম সমাজে মঞ্চবিরোধী অবস্থান বিদূরিত হয়েছে। স্কুল-কলেজে, শহরে-বাজারে পরম উৎসাহে কামাল পাশা নাটক অভিনীত হয়েছে। দু-একজন মাওলানা-মৌলভী কামাল পাশা নাটক মঞ্চায়নকে জহর-এ কাতেল (সর্বনাশা বিষ) বলে ফতোয়া দিলেও সে ফতোয়া জনচিত্তের চাহিদার কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মত অনেক হিন্দু নাট্যকার কল্পিত বীর চরিত্র রচনা করে নাটক লিখেছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা বংলাদেশ ছেড়ে রাজপুত বা মহারাষ্ট্রে গিয়েছেন বীর নায়কের সন্ধানে। সে সময়ে মুসলিম সমাজ ও চরিত্রনির্ভর নাটকের প্রচলন ছিল না। এ অবস্থাদৃষ্টে তরুণ সাহিত্যিক ইবরাহীম খাঁ অত্যন্ত বেদনা বোধ করেন এবং বাংলার মুসলমানরা যেন হীনমন্যতায় মুষড়ে না পড়ে সে উদ্দেশ্যে তিনি মুসলিম চরিত্রনির্ভর নাটক রচনায় অগ্রসর হন।৯
ঐতিহাসিক কারণে প্রাক-৪৭ পর্বে নাট্যচর্চা তথা সংস্কৃতি ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গে বাঙালি হিন্দুমধ্যবিত্তের প্রাধান্য ছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে অনেক হিন্দু এদেশ ত্যাগ করেন। ফলে সাময়িকভাবে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয় শূন্যতা। এ শূন্যতার মধ্যেও অত্যন্ত সীমাবদ্ধ পরিসরে যে নাট্যচর্চা হয়েছে, তাকে প্রধানত দু’টি ধারায় চিহ্নিত করা যায়। এক. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা শহর ও শহরতলিকেন্দ্রিক ; দুই পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জেলা ও মফস্বলকেন্দ্রিক। প্রথম ধারাটিতে বুদ্ধিদীপ্ত প্রাগ্রসর চেতনা এবং দ্বিতীয় ধারাটিতে মধ্যযুগীয় সামন্ত মূল্যবোধ ও রক্ষণশীল চেতনা প্রকাশিত হয়েছে।১০ এ সময়ে মোগল ইতিহাস, মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও দেশীয় মুসলিম ঐতিহ্যনির্ভর বেশ কিছু নাটক রচিত হয়। এ ধারার অন্যতম লেখক হলেন শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩), ইবরাহীম খাঁ (১৮৯৪-১৯৭৮), আকবরউদ্দীন (১৮৯৫-১৯৭৮), ইব্রাহীম খলীল (১৯১৬- ); অপরপক্ষে জীবনঘনিষ্ঠ ও সমাজবাস্তবতামূলক ধারার নাট্যকার হলেন নুরুল মোমেন (১৯০৬-১৯৯০), শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮), আসকার ইবনে শাইখ (১৯২৫-২০০৯) প্রমুখ।
শাহাদাৎ হোসেন ঐতিহাসিক নাটক রচনায় খ্যাতি অর্জন করেন। সরফরাজ খাঁ (১৩২৬-২৭, মাসিক সওগাত), মসনদের মোহ (১৯৪৬), আনার কলি (১৯৪৫), শা-জাহান-আলমগীর সংবাদ (১৩৪৮) ও জাহাঙ্গীরের আত্মসমর্পণ (১৩৪৯) তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক। শাহাদাৎ হোসেন নাট্য রচনায় ঐতিহাসিক ধারা অনুসরণ করলেও ইতিহাসকে তিনি পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেছেন মাত্র। তাই দেখা যায়- তার সৃষ্ট অনেক চরিত্রেই প্রাত্যহিক জীবন ও পরিচিত পরিমন্ডলের প্রভাব স্পষ্ট। এ প্রসঙ্গে মুনীর চৌধুরী বলেন, (শাহাদাৎ হোসেন-এর নাটকের অনেক চরিত্র) ‘‘সংসার জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক সুখ-দুঃখ… মনুষ্যত্বে ষড়যন্ত্রে, দোষে গুণে জীবন্ত রূপ লাভ করেছে।১১ ঐতিহাসিক নাটকের সংলাপ রচনায় তিনি অধিকতর যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। যেমন-
জান্নাত-চক্রান্ত! চক্রান্ত আসমান-জমীন, ব্যোমবায়ুম্বর কুলমাখলুকাৎ চক্র মায়ায় আচ্ছন্ন। দুনিয়া-জাহান বিষ-বাষ্পে ভ’রে উঠেছে।
জাহান্নামের সদর দরওয়াজা খুলে গিয়েছে। ওরে কে আছিস-বন্দী কর, বন্দী কর।১২
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৯-১৯২৫) ঊনবিংশ শতাব্দীতে যেমন হিন্দু জাতীয়তাবাদী চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে নাটক রচনায় অগ্রসর হয়েছিলেন, তদ্রুপ মুসলিম জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ইবরাহীম খাঁ নাটক রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক নাটক কামাল পাশা (১৯২৬) ও আনোয়ার পাশা (১৯২৭) ; ঋণ পরিশোধ (১৯৫৫) ও কাফেলা (১৯৫৬) তাঁর সামাজিক নাটক। তুরস্কের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের জালকে ছিন্ন করে কামাল পাশার নেতৃত্বে নব্য তুরস্কের অভ্যুদয়কে কেন্দ্র করে কামাল পাশা নাটকের কাহিনী নির্মিত হয়েছে। তুরস্কের জাতীয় বীর কামাল পাশার দক্ষিণ হস্ত আনোয়ারের জয়গাথাই আনোয়ার পাশার কেন্দ্রীয় বিষয়। আলোচ্য দু’টি নাটকের মাধ্যমে লেখক বাংলার যুবসমাজকে জাগিয়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন। সমালোচকের ভাষায়- ‘…তৎকালীন মুসলিম সমাজ উত্থিত জাতীয় অনুপ্রেরণা আবেগাশ্রয়ী সংলাপের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। বস্তুত মুসলিম পুনর্জাগরণের আকাক্সক্ষার প্রচারই ইব্রাহীম খানের মুখ্য উদ্দেশ্য।’১৩
আকবরউদ্দীন ঐতিহাসিক ও ইসলামী ঐতিহ্যমূলক নাটক রচনায় খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য নাট্যগ্রন্থ হল- সিন্ধু বিজয় (১৯৩০), বন্দীর মুক্তি (১৩৩৪), অভিশাপ (১৩৩৫), সুলতান মাহমুদ (১৩৩৭), অল-ইন্ডিয়া ঝি-ফেডারেশন (১৩৫৩) ও আজান। সিন্ধু বিজয় নাটকটি সতের বছর বয়সী মুহাম্মাদ ইবনে কাশিমের সিন্ধু বিজয়ের ইতিহাসকেন্দ্রিক নাটক। ইতঃপূর্বে মিয়া মুহম্মদউদ্দীন একই বিষয়বস্তু নিয়ে মুহম্মদ ইবনে কাসেম শীর্ষক একটি নাটক রচনা করেন। সিন্ধু বিজয় নাটকের কাহিনী-বৈচিত্র্য না থাকলেও পরিবেশন গুণ আকর্ষণীয়।১৪ নাটকের ভাষা অপেক্ষাকৃত প্রাঞ্জল ও কাব্যময়। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে মুহাম্মাদ ইবনে কাশিমের আবেগদীপ্ত সংলাপে স্বদেশের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ প্রকাশিত হয়েছে। আলোচ্য নাট্যগ্রন্থে লেখক হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়কে মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে উপস্থাপন করেছেন। সুলতান মাহমুদ মোগল-ইতিহাস-আশ্রয়ী ও বন্দীর মুক্তি রূপক নাটক। অভিশাপ, অল-ইন্ডিয়া ঝি-ফেডারেশন ও আজান সামাজিক নাটক। এসব সামাজিক নাটকেও লেখক ইসলামী ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে রূপদান করেছেন।১৫
ইব্রাহীম খলীলের উল্লেখযোগ্য নাটকের নাম স্পেন বিজয়ী মুসা (১৯৪৯)। দামেস্ক সেনাপতি মুসা বিন মুসায়ের ও তারিক বিন জিয়াদের স্পেন বিজয়ের গৌরবগাথা নিয়ে আলোচ্য নাটকটি রচিত হয়েছে। লেখক অত্যন্ত সচেতনভাবেই ইসলামের সোনালি অতীত স্বসমাজে তুলে ধরেছেন এবং সে বিবেচনায় তিনি “ঐতিহাসিক চরিত্রের উপযোগী সংলাপ সৃষ্টি করে প্রচারধর্মে সার্থকতা অর্জন করেছেন।”১৬ তাঁর অন্যান্য নাট্যগ্রন্থের নাম হলো-ফিরিঙ্গীরাজ (১৯৫৪), সমাধি (১৯৫৭) ইত্যাদি।
বিষয়বস্তু, জীবনদৃষ্টি, গঠনশৈলী এবং উপস্থাপনা-রীতির পরীক্ষায়, সাফল্য এবং সিদ্ধিতে, নুরুল মোমেনের অবদান বাংলা নাটকের ধারায় বিশিষ্ট ও ব্যতিক্রমধর্মচিহ্নিত।১৭ নেমেসিস (১৯৪৮) নামের একটি নাটক তাঁকে এনে দিয়েছে ‘প্রাতিস্বিক সৃষ্টি-ক্ষম-প্রজ্ঞার অভিধা।’ নেমেসিস প্রসঙ্গে সমালোচকের মন্তব্য নিম্নরূপ-
সজাগ অনুভূতি, সুতীক্ষè রসবোধ এবং বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ নুরুল মোমেনের নাটকের বিশিষ্টতা।…
…পরিকল্পনায়, সংলাপের ব্যঞ্জনায়, ঘটনার অনিবার্যতায় এবং উপস্থাপনায় ‘নেমেসিস’ একটি উল্লেখযোগ্য নাটক।১৮
নুরুল মোমেন রচিত অন্যান্য নাটকের নাম হলো- রূপান্তর (১৯৫৯), আলোছায়া (১৯৫৮), বহুরূপা (১৯৫৮), যদি এমন হোত (১৯৬২), নয়া খান্দান (১৯৬২) ইত্যাদি।
পাশ্চাত্য মানবতাবাদী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সমাজতান্ত্রিক স্রোতধারার অন্যতম নাট্যকার শওকত ওসমান। শওকত ওসমান প্রধানত কথাসাহিত্যিক হলেও সমাজ ও জীবনবাহী প্রাগ্রসর নাট্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য নাট্যগ্রন্থগুলি হলো- তস্কর ও লস্কর (১৯৪৫), কাঁকর মণি (১৩৫৬), আমলার মামলা (১৯৪৯) ইত্যাদি। তস্কর ও লস্কর সামাজিক নাটক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত আলোচ্য নাটকে বর্ণিত হয়েছে। কাঁকর মণি প্রহসন জাতীয় রচনা। নাট্যকার এ নাটকে সমকালীন সমাজজীবনে ধনী ও অভিজাত সম্প্রদায়ের ক্রিয়াকলাপ উপস্থাপন করেছেন শেষ ও কৌতুকরসের মাধ্যমে। সমকালীন জীবন ও কল্পনার সংমিশ্রণে গ্রন্থিত কাঁকর মণির কিছু ঘটনায় নাটকীয় গতি বিদ্যমান।১৯ আমলার মামলা কমেডি শ্রেণির নাটক।
আসকার ইবনে শাইখ ঐতিহাসিক ও সামাজিক নাটক রচনায় স্বীয় মেধাশক্তির পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক নাটক হলো- তিতুমীর (১৯৫৮), অগ্নিগিরি (১৯৫৯) ও রক্তপদ্ম (১৯৬১) ; সামাজিক নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-বিরোধ (১৯৪৮), পদক্ষেপ (১৯৫১), বিদ্রোহী পদ্মা (১৩৫৯), দুরন্ত ঢেউ (১৩৬০), এপার ওপার (১৯৬২) ইত্যাদি। ঐতিহাসিক নাটক রচনায় নাট্যকার প্রচলিত রীতিকে অনুসরণ করেছেন। তাঁর প্রবলতম আগ্রহ হলো বাংলাদেশের সমাজ, ইতিহাস, আকাক্সক্ষা ও আনন্দকে নাট্যরূপে দৃশ্যমান করা। নাট্যকার আসকার ইবনে শাইখের সর্বাপেক্ষা বড় গুণ তিনি সমাজমনস্ক ও নাট্যরীতিতে আধুনিক।২০
ইবরাহীম খাঁ এবং তাঁর সম-সাময়িক নাট্যকারগণ মুসলিম সমাজের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সমাজবাস্তবতামূলক বিষয়কে নাটকের উপজীব্য হিসেবে উপস্থাপন করে নাট্যশিল্পকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। নাটকের নির্মাণ-কৌশলে নিরীক্ষা ও জনরুচিকেও তাঁরা তাঁদের লেখনীতে ধারণ করেছেন। এসব লেখকের নির্মাণশৈলীর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে বর্তমান বাংলাসাহিত্যের শক্তিশালী ও সফল নাট্যাঙ্গন এবং নাট্য আন্দোলন। হ
তথ্যপঞ্জি
১. শ্রীশচন্দ্র দাস, সাহিত্য সন্দর্শন, ২০০১, ঢাকা, একুশ প্রকাশন, পৃ. ৭০।
২. Elezabeth drew, Discovering Drama, , উদ্ধৃত, শ্রীশচন্দ্র দাস, ঐ।
৩. শুদ্ধস্বত্ব বসু, বাংলা সাহিত্যের নানারূপ, ১ম সং, ১৩৮৫, কলিকাতা, অক্ষর, পৃ. ১১৩।
৪. M.H. Abrams, A Glossary of Literary Terms, 5th edition, 1988, America, The Dryden press, p. 43.
৫. বদিউর রহমান, অ্যারিস্টটলের পোয়েটিকস, ২০০১, ঢাকা, গতিধারা, পৃ. ২৮।
৬. নজির আহমদ, ‘উপন্যাস’, আল এসলাম, জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৭; উদ্ধৃত, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত, ১৯৭৭, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, পৃ. ৩৮৭।
৭. শাহাদাৎ হোসেন, ‘বর্তমান নাট্যসাহিত্য’, সওগাত, অগ্রহায়ণ, ১৩২৫; উদ্ধৃত, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, সাময়িকপত্রে সাহিত্যচিন্তা : সওগাত, ১৯৮১, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পৃ. ২৯।
৮. শিখা, ১ম বর্ষ, ১৩৩৩, পৃ. ১০১-১০২; উদ্ধৃত, খোন্দকার সিরাজুল হক, মুসলিম সাহিত্য সমাজ : সমাজচিন্তা ও সাহিত্যকর্ম, ২০০৬, ঢাকা, সূচিপত্র, পৃ. ২১৬।
৯. প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৮।
১০. সুকুমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের নাট্যচর্চা ও নাটকের ধারা, ১৯৯৮, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, পৃ. ৫২।
১১. মুনীর চৌধুরী, ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সপ্তাহ উপলক্ষে ১৯৬৩ সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর নাটক সংক্রান্ত আলোচনা’, পূবালী, মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম সম্পাদিত, ৪র্থ বর্ষ : ১ম সংখ্যা, আশ্বিন ১৩৭০, পৃ. ৬৮।
১২. শাহাদাৎ হোসেন, মসনদের মোহ, ১৯৪৬, কলকাতা, এম. আফজাল-উল হক কর্তৃক প্রকাশিত, পৃ. ২৯।
১৩. মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান, বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, ৫ম সংস্করণ, ১৩৮৫, ঢাকা, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পৃ. ৪৪৭।
১৪. বাংলাদেশের নাট্যচর্চা ও নাটকের ধারা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৮।
১৫. ঐ, পৃ.৫৯।
১৬. নীলিমা ইব্রাহিম, বাংলা নাটক : উৎস ও ধারা, ১৩৭৯, ঢাকা, নওরোজ কিতাবিস্তান, পৃ. ৪১৯।
১৭. বিশ্বজিৎ ঘোষ, “বাংলাদেশের নাটক : বিষয় ও আঙ্গিক”, একুশের প্রবন্ধ ’৯৮, ১৯৯৮, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, পৃ. ৬৫।
১৮. বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৫০।
১৯. আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস-২য় খন্ড, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৩৬৮, কলকাতা, এ. মুখার্জী এন্ড কোং প্রাইভেট লিমিটেড, পৃ. ৫৩৬।
২০. কাজী মোতাহার হোসেন, ‘ভূমিকা’ পদক্ষেপ, ১৯৫১, ঢাকা, মুসলিম পাবলিশিং হাউস।