আত্মকেন্দ্রিকতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ উত্তরাধুনিক মানুষ প্রতি নিয়ত বয়ে চলেছে শেকড়চ্যুতির গ্লানি। বিশ্বায়নের মুখোশে প্রকৃত মানব হৃদয় হারিয়ে ফেলছে তার অস্তিত্ব, প্রতি মুহূর্তের ব্যর্থতা, হতাশা তাকে নিবেদন করছে জীবনের ছাড়পত্র। এই সময়ের কবিতা তাই কোনো নির্দিষ্ট নিয়মের গন্ডিতে আবদ্ধ নয়। কবিতা ছড়িয়ে পড়েছে জীবনের স্তরে স্তরে, গভীর থেকে গভীরে। কবিতাকে যাঁরা সময়ের বেড়িতে বাঁধেননি, আবদ্ধ করেননি বৈষয়িকতার নাগপাশে তাঁরাই কবিতাকে করতে পেরেছেন জীবনলগ্ন। এমনই একজন জীবনলগ্নি কবিতার শিল্পী কবি আমিনুল ইসলাম। তিনি কোনো যুগ, দশক, দেশ-কাল বা মানুষের পক্ষপাতী নন বলেই তাঁর কবিতা বিচিত্র বিষয়াশ্রয়ী। ধরাবাঁধা অনুশাসনের জালে আবদ্ধ নন বলেই তাঁর কবিতার গঠন ভিন্ন মাত্রা প্রাপ্ত।
দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য আর অর্জিত অভিজ্ঞতার তারতম্য জীবনকে দেখার কৌণিক কৌশল বদলে দেয়। আমিনুল ইসলাম জীবনকে দেখেছেন ভিন্নভাবে। ধরাবাঁধা, চিরপরিচিত পথে হেঁটেও জীবনের প্রতিটি বিষয় তাঁর কাছে উপস্থিত হয়েছে ব্যতিক্রমী ব্যঞ্জনা নিয়ে। জীবন ও জীবনের অনুষঙ্গ তাঁর কবিতায় ভিন্ন ধারায় ভূষিত। যিনি অবলীলায় বলতে পারেন ‘আমি একজন সাধারণ মানুষ।’, তাঁর জীবনকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা দেখলে সত্যিই বিস্মিত হতে হয়। সাধারণ, একেবারে অতি সাধারণ না হলে অসাধারণ উপলব্ধি যে সহজলভ্য নয় তার প্রমাণ আমিনুল ইসলাম। সাধারণ বলেই জীবন তাঁর কাছে নানা বর্ণে ধরা দেয়। যেখানে জীবন স্রোত হারানো নদী, মেপে মেপে কেনা কাঁচা মরিচের ঝাল, ব্যালান্স শিটের ভাঁজ, ব্যাংক রিজার্ভের চাবি। একঘেয়ে জীবন তার কাছে উটপাখি ছাড়া কিছু নয়। কবিতায় তার প্রকাশ-
কারা বিচক্ষণ আর কারা বোকারাম
সে রায় দেয়ার নেই কোন হাইকোর্ট
জীবন যদিবা হয়ে ওঠে উটপাখি
বালুতেই সুখ খুঁজে নেবে তার ঠোঁট। (এইতো জীবন )
জীবনের ব্যর্থতা তাঁর কাব্যে প্রস্ফুটিত হয়েছে ভিন্ন মাত্রা নিয়ে। নেতিবাচকতার সাথে ব্যর্থতার সংযোগ জীবনকে নিয়ে যায় গন্তব্যহীনতার পথে। কবির জীবনেও ব্যর্থতার ছাপ স্পষ্ট কিন্তু তিনি স্পষ্টভাষী বলেই তাকে অস্বীকার করেননি। ব্যর্থতার গ্লানি বুকে নিয়েই জীবনের পথে হেঁটেছেন ক্লান্তিহীন এই শব্দসৈনিক। ‘অপূর্ণতার কাব্য’, ‘সে এক অদ্ভুত ব্যর্থতা’, ‘ব্যর্থতার চাবি স্বর্গের দুয়ার’ ইত্যাদি কবিতায় তিনি ব্যর্থতাকে প্রচলিত কোনো ভাষ্যে অভিষিক্ত করেননি। ব্যর্থতা ছড়িয়ে আছে তাঁর কাব্যের স্নায়ুতে যাকে খুঁজে নিতে হয় পাঠকের তীক্ষè অনুভূতির মাধ্যমে।
জীবনের বেলা যখন ফুরিয়ে আসে তখনও তিনি শোনেন রূপান্তরের ডাক। জীবনানন্দের মতো পেঁচা বা কাক হওয়ার কথা মনে হয় না তার কেবল উদভ্রান্তের মত দিক খুঁজে ফেরেন তিনি। মনে হয়- ‘উদভ্রান্ত আমরা খুঁজি দিক/ শূন্যে বাজে রূপান্তরের ডাক।’ (হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে)
জীবনের কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন ভালোবাসা। পেয়েছেন সংবিধিবদ্ধ ¯œান আর ‘সাঁঝের নদীতে গোপন সাঁতার’ কাটার আনন্দের স্মৃতি, কখনো পেয়েছেন উপহাস। পেয়েছেন গ্লানি, দেখেছেন মানব জীবনের দুর্বিষহ পরিণতি, অজ মৃত্যু দেখেছেন জীবনের পাড়ে দাঁড়িয়ে। ভাগ্যচক্রের পরিহাসে বারবার মৃত্যুর দ্বারে গিয়ে ফিরে এসেছেন। তবুও তিনি নিরুৎসাহী নন। নেতিবাচকতার শেকলে তিনি জীবনকে আবদ্ধ করেননি বরং মেনে নিয়েছেন আজ নয়তো কাল হেমলকের শেষ পেয়ালা তাকে পান করতেই হবে। তাই কবি হার মেনেও হেরে যান না বরং জীবনের এই রীতিকে স্বাগত জানান। জানান শুভেচ্ছা নিজের ভাষায়- ‘তবু হে বন্ধু, হে সখা, হে শত্রু, তোমাকে জানাই লাল গোলাপ শুভেচ্ছা।’ জীবনের প্রতি এরূপ ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি খুব কম কবির মধ্যেই পাওয়া যায়। জীবনকে শ্রদ্ধা করেন, ভালোবাসেন বলেই আমিনুল ইসলামের কবিতায় জীবনের ভাষ্য ভিন্ন ধারায় বিকশিত হয়।
তবে জীবনের বেশিরভাগটাই তার আছন্ন করেছে ব্যর্থতা আর সমকালীন শোক। জগতের বৈরী স্বভাব তাঁকে বারে বারে ভাবিয়ে তুলেছে। তিনি বুঝেছেন ‘জীবনের পক্ষে কোনো সহৃদয় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট ফার্ম নেই।’ তিনি অনুভব করেছেন অদ্ভুত এক ব্যর্থতা। যেখানে গোলপোস্টের গোল নিশ্চিত হয়েও পেলে হেরে যান, প্রাপ্তবয়স্ক প্রেমিক হয়েও প্রেমের কাছে নিজেকে তাঁর মনে হয় নিতান্ত দুধের শিশু। অদ্ভুতভাবে ব্যর্থতাকে ধারণ করেছেন তিনি কবিতায়। সাধারণ বিবৃতি থেকে বহুদূরে অবস্থান করেও তাঁর কাব্যভাষ্য জীবনে অসাধারণ ব্যর্থতার পরশ বুলিয়ে যায়। তিনি অনুভব করেন, গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন ব্যর্থতার রূপ। মনে হয় ‘মহানগরীর তামাটে প্রচ্ছদে/ সবুজের স্বপ্ন আঁকে দিন; / কিন্তু হরিৎ সমুদ্র ছেনে রঙ আনতে গেলে/ সরে যায় শঙ্কিত বন;’ (ফুল ফোটানোর ব্যর্থতায়) জীবনের অনেক পাওয়ার ভিড়েও কবি উপলব্ধি করেন কিছু করতে না পারার ব্যর্থতা। তাঁর ব্যর্থতা লোভনীয় কিছু অর্জনে নয় বরং তিনি ব্যর্থতা অনুভব করেন ভিন্ন ভাবে। এই ভিন্ন ধারার চিন্তা ও অনুভূতি শক্তিই তাকে অন্য কবি থেকে পৃথক ধারায় চিহ্নিত করে। কবি অনেক রাতের তারা ছুঁয়েছেন, বেঁধেছেন নদীর ঢেউ, ছেনে এনেছেন আকাশের নীল, খুলেছেন মেঘের খাম কিন্তু যখনি তিনি নতুন হাওয়ার স্বর্গে যেতে চেয়েছেন, তিনি ব্যর্থ হয়েছেন রংধনু রঙের চাবি দিয়ে দরজা খুলতে। প্রতিদিন এই ভাবনা নিয়ে তার আড়মোড়া ভাঙে আর ‘দিনভর হাসে ব্যর্থতা।’ কবি এই ব্যর্থতার ঘামে জবুথবু হয়ে থাকেন, রৌদ্রের তাপে পোড়াতে সচেষ্ট হন নিজেকে। এভাবে তাঁর কবিতায় ব্যর্থতা লাভ করে এক অসাধারণ শিল্পরূপ।
কবি আমিনুল ইসলাম প্রবলভাবে শেকড়প্রেমী। শেকড়ের প্রতি তীব্র আকর্ষণ ও ভালোবাসা তাঁর কবিতার বিশেষ একটি দিক। শেকড়সন্ধানী বলেই কবি নিজের অস্তিত্ব টের পান সাধারণ মানুষের মধ্যে। নিজেকে সাধারণ বলে পরিচয় দিতে বোধ করেন আত্মতৃপ্তি। আবার কখনো শেকড়বিচ্যুতির যন্ত্রণায় আচ্ছন্ন হন। কবির ভালোবাসার গ্রাম টিকলীচর বিলীন হয়েছে পদ্মার করাল গ্রাসে। বাস্তুহারা হয়েছে অনেক মানুষ সাথে কবিও। জীবনের প্রচুর প্রাপ্তির ভেতরেও তিনি তাই অনুভব করেন শেকড়ের টান। বাংলাদেশের অনেক জেলায় কর্মসূত্রে তিনি বিচরণ করলেও ভুলতে পারেন না তার সেই ভিটের কথা। এক্ষেত্রে কবির অনুভূতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার উপেনের মত যেখানে উপেন বলে ‘সাগরে পাহাড়ে বিজনে নগরে, যখন যেখানে ভ্রমি/ তবু নিশিদিনে ভুলিতে পারি নে সেই দুই বিঘা জমি।’ তাঁর মতই কবির অন্তরের অভিব্যক্তি দেখা দেয় দীর্ঘশ্বাস হয়ে তিনি বলেন ‘ভিটেমাটিহারা দীর্ঘশ্বাস মাঝে মাঝে আমাকেও ভীষণভাবে স্পর্শ করে।’ তিনি মনে করেন ছেলেবেলার ঘুড়ি ওড়ানোর কথা, তার স্মৃতিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে মাঠ, নদী, কৈশোর। কবির এই গভীর অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে ‘কপোতাক্ষ : সে এক হাফ-সাঁতারের স্মৃতি’ কবিতায়। এখানে কবি স্মৃতিকাতর, তাঁর হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারিত হয় ‘ও কপোতাক্ষ, ও আমার প্রতœপ্রিয়জন! আজও এই কানে বাজে/ নিষিদ্ধ ডাকের পরকীয়া অনুবাদ।’ মাটির টান কবিকে স্মরণ করিয়ে দেয় শস্যহীন মাঠের কথা, গরিব কৃষকের কথা আর সাধারণ মানুষের কথা। তাই তিনি চাকরিসূত্রে যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই তাঁর নজরে পড়েছে সাধারণের জীবন। তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন দিনমজুর, কৃষক, শ্রমিকের জীবন। তাদের দুঃখ তাঁকে ব্যথিত করেছে। কোমলপ্রাণ কবি তাদের জন্য বেদনা অনুভব করেছেন। দক্ষ পর্যবেক্ষক বলেই তিনি সমাজের উঁচুস্তরের লোক যেমন : এমপি, মন্ত্রী, অভিজাত থেকে শুরু করে নিচু স্তরের মুটে মজুর, দরিদ্র চাষা সবার জীবন এবং আচরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন নিবিষ্টচিত্তে। দেখেছেন আমলাতন্ত্র আর দেশীয় রাজনীতির ভেতর-বাহির। তাঁর কবিতায় তাই স্থান করে নিয়েছে রাজনীতি। বর্তমানের ঘৃণ্য রাজনীতি তার অপছন্দ হলেও তিনি অনবরত বয়ে বেড়ান তারই ছায়া। এখানে নিরপেক্ষতার কোনো জায়গা নেই। এখানে ‘নিরপেক্ষ মানে- তুমি পার্টি ও পলিটিকসের দেশে/ ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চাটি- ভ্যাঁ..ভ্যাঁ..ভ্যাঁ.. ভ্যাঁ।’ এখানে নিরপেক্ষতা মানে সবার চক্ষুশূল, নিশ্চিত পরাজয়। কবি তাই নিজেই কখনো কখনো বিস্মিত হন; তাঁর মনে হয় ‘এ কোন্ জাতের কবি? কী তার দশক?’ বর্তমান সময়ের রাজনীতিকে তিনি চিত্রিত করেন তাঁর ব্যতিক্রমী কাব্যভাষায়- ‘গুলিতে মরেছে বাঘ, সিংহ লুপ্ত নাম/ হরিণেরা দৃশ্যচ্যুত যেহেতু হালাল/ পোষ মেনে ঐরাবত শেখে ভুল কাম / বাঘছাল প’রে হাসে বাঘের দালাল।’ (ক্ষমতার দৃশ্যপট) এই দেশে সত্য বলা নিষেধ। চারিদিকে শুধু বিধি নিষেধের ব্যারিকেড। এখানে চলে মিথ্যার রাজত্ব। সত্য এখানে অচল। এখানে ‘গরুমার্কা’, ‘দুম্বামার্কা’ সত্য বলাও মানা। কেবল তোষামোদীদের রাজত্ব এই দেশে কবি নিতান্ত অসহায়। মানুষের প্রাণ ছটফট করে মুক্তির জন্য কিন্তু ব্যর্থ হয়। সবকিছু চলে উল্টো গতিতে, চারদিকে দমিত আকাক্সক্ষা নিয়ে কেবল জমে উঠতে থাকে ‘বারুদ প্রহর’। রাজনীতির খেলায় পরাজিত অসহায় মানবজীবন। কবিও সেখানে পরাজিত সত্তায় বিচরণ করেন। তাঁর বিজ্ঞ অভিব্যক্তি ছড়িয়ে পড়ে কবিতায়। কবি ধারণ করেন সমকালকে। সমসাময়িক বিষয় তার নিপুণ হাতের কারুকার্যে অনবদ্য হয়ে ওঠে। কবি আমিনুল ইসলাম সমকালের ভাষ্যকার বলেই হয়তো তাঁর কবিতায় সমকালীন ঘটনাবলী, প্রত্যহ ঘটে যাওয়া হাজার হাজার ঘটনা, চরিত্র আর মানুষের পুতুল জীবন অভিনবত্ব লাভ করেছে। তাঁর মতে এখন চলছে জগৎশেঠ দিন। অরাজকতার রাজত্বে জয়ী এখন মীরজাফরেরা। এই সময় বিষাক্ত সাপের কবলে পড়ে বিষে জর্জরিত। মানুষের জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই যেন সবাই তলপেটে টাইমবোমা বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। যেকোন সময় ঘটতে পারে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা। তাই তারা সাবধানে ভয় নিয়ে চলে। এই সময়ে সাধারণ মানুষের স্বপ্নের উঠোনে ঘোরাফেরা করে সনদহীন উমেদার। এখন মানুষ বরণ করেছে ক্ষমতার দাসত্ব। তারা শিখেছে সব কিছুতে ‘জি স্যার’ বলতে। কবি এই পরিস্থিতিকে বিচক্ষণতার সাথে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তার মনে হয়েছে মানুষের এমন অস্তিত্ব বিলিয়ে দেয়ার ফলে ‘কোনদিনও শেখা হয় না দাঁড়াতে নিজ পায়ে;/ ফলে নিজও মেরুদন্ডে সোজা হয়ে দাঁড়ায়নি সিস্টেম।’ তাঁর মতে ‘এখন কুঁজোদের চিৎ হয়ে শোওয়ার দিন’; এখন উত্তরাধুনিকতার মুখোশ পরে মানুষ কেবল যন্ত্রের মত ছুটে চলে। অনুভূতিহীন তাদের জীবনে অসংখ্য প্লট ভিড় করলেও গল্পটা জমে ওঠে না। এই সময় ভীষণ রকম আগ্রাসী হয়ে গ্রাস করে মানুষকে। ঈগল তার নখে টেনে নেয় আকাশের নীল। সর্বগ্রাসী বাণিজ্যবায়ু তীব্র বেগে আবার স্থাপন করে নয়া উপনিবেশ। কবির উপলব্ধিতে সমকাল ধরা দেয় নির্মম সত্য হয়ে। কালের স্রোতে মানুষ সভ্যতার যে মুখোশে আড়াল করে নিজেকে, তারই বিদঘুটে অট্টহাসিতে সে হারিয়ে ফেলে তার প্রকৃত পরিচয়। সভ্যতার ক্রমোন্নতি মানুষকে পরিণত করে হিংস্র পশুতে। প্রবল সংবেদনশীল কবি তাই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন মানুষের রূপান্তর। তাঁর কবিতায় তার প্রকাশ ঘটে এভাবে-
দ্যাখো- সভ্য হাতগুলো প্রতিদিন বানায় সভ্যতার নখর, দাঁত
এবং থাবা; অথচ দুই হাতে দুই আদিম পাথর নিয়ে একদিন
মানুষ ছিল- এতটুকু সভ্য- আর অনেকখানি মানুষ।
(বিচূর্ণ জলের আয়নায় ভেসে ওঠা মুখ)
বিভিন্ন স্থানে কবি তার আত্মপরিচয় তুলে ধরেছেন। তিনি নিজেকে বলেছেন সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ। তিনি সওদাগর পুত্র নন। নন কোনো ইতিহাসের গুরুত্ববহ চরিত্র। কিন্তু তিনি আপন সত্তায় বলীয়ান। তিনি নিজের মত করে বয়ে চলেন তার জীবনের নাও আর জীবন সম্পাদনায় দুর্ভাগ্যকে করে নেন একান্ত সঙ্গী। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে কবি বলেন -‘ আমি সেই কারবারি- যার মাথায় / এল রবিনসন আর মানিবাগে উপচানো অসচ্ছলতা;’ (সম্পাদনা)
জগৎ সম্পর্কে অভিজ্ঞ কবি আমিনুল ইসলাম। তাই তার কবিতায় সমকালীন বিষয়ের সত্যভাষণ প্রকাশিত। এখন পৃথিবীজোড়া চলছে মিডিয়ার রামরাজত্ব। তারা যা শোনায় আমরা তাতেই সন্তুষ্ট, যা দেখায় তাতেই পুলকিত অথচ বিবেচনা করার শক্তি আমাদের নেই। আমরা সময়ের শেকলে আবদ্ধ। তাই বুদ্ধি, বিবেক, বিবেচনাকে পাশে সরিয়ে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মেলাই আমরাও। কবির সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তার প্রকাশ – ‘বিবিসি-সিএনএন-স্টার ওয়ার্ল্ড / এরা কার কথা বলে? / পাখির টক শো কানে তোলো তুমি; / ঘরে নিই আমিও।’(পাখির টক শো) এ যুগে মানুষের কোন মূল্য নেই। চারিদিকে কেবল প্রতারকের আস্তানা। এখানে গুম খুন, মুত্যু, অপমান, লাঞ্ছনা নিত্য দিনের ব্যাপার। এখানে মানুষ মূল্যহীন, পতঙ্গতুল্য। সাধারণ জনগণ কেবল ক্ষমতাশীনদের হাতে জিম্মি। কবির মতে এখন হল ‘ইচ্ছেদানা গণতন্ত্রের যুগ’, এখানে সবাই স্বার্থপর, সবাই রাষ্ট্রের অনুগ্রহপ্রার্থী। কারণ ‘এখন রাষ্ট্রই নবাব- রাষ্ট্রই জগৎশেঠ।’ শুধু সমকাল নয় তাঁর কবিতায় স্থান করে নিয়েছে মহাবিশ্ব ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি। বিশ্বায়ন দ্বারা তিনি প্রভাবিত হয়েছেন। অনবরত ধেয়ে চলা, তথাকথিত সভ্য পৃথিবীর পরিবর্তন তাঁকে নিরাশ করেছে। ব্যথিত করেছে। ‘ভালোবাসা অথবা মহাবিশ্ব’, ‘আরব বসন্ত’, ‘তৃতীয় বিশ্ব’ ইত্যাদি বহু কবিতায় তিনি বিশ্বায়নকে চিহ্নিত করেছেন। সাহসিকতার সাথে সমকালীন সত্যকে উপস্থাপন করেছেন কবিতায়। সত্য প্রকাশে নির্ভীক কবি তাই বলতে পেরেছেন এই বিশ্বায়ন- ‘সঙ্গে এনেছে / ভাইয়ের জন্য হোমোসেক্সুয়াল দিন/ বোনের জন্য লেসবিয়ান রাত / আর নিজের জন্য – / মিঠাপানি বিষয়ে বমিবমি বিতৃষ্ণা।’ (বিশ্বায়ন) এভাবে বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ও কাব্যিক প্রকাশ কবিকে বিশেষত্ব দান করে। মূলত সমকালীন অবস্থা ও পরিস্থিতিকে উপলব্ধিতে আনতে পারার সার্থকতা নিহিত রয়েছে কবিতায় তার যথার্থ প্রয়োগে। কবি আমিনুল ইসলাম সেখানে নিঃসন্দেহে সার্থকতার দাবিদার।
আমিনুল ইসলামের কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো প্রেম। প্রেমের প্রকাশের মাধ্যমে কবিদের একটি ভিন্ন চরিত্রের সন্ধান পান পাঠকেরা। প্রেমের কবিতায় নতুনত্ব তাই পাঠককে দেয় ভিন্নতার স্বাদ। কবি আমিনুল ইসলামের কবিতায় প্রেম ভাষারূপ লাভ করেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারায়। তাঁর কবিতায় প্রেমের বিচিত্র প্রকাশ আর প্রেমকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষত্ব দান করে কবিতাকে। পাঠক কখনো তাই তাঁর কবিতায় আচ্ছন্ন হন কখনো হন বিমোহিত। কবি সাধারণ ধরাবাঁধা প্রেমের চিত্র কখনো আঁকেননি। তিনি চিরায়ত প্রেমের প্রথাগত আখ্যান রচনায় ব্রতী নন। প্রেমের মাঝে নতুনত্বের সন্ধান তাঁর কবিতার একটি বিশেষ গুণ। এ প্রসঙ্গে সরকার আব্দুল মান্নানের উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘‘আমিনুল ইসলাম মোহন প্রেমের এই প্রথাগত আখ্যান রচনা করেন না। সংঘাতময় জীবনের বিচিত্র ক্ষতকে তিনি তুলে ধরেন জীবন-প্রেমিকের বিস্ময়কর অন্তর্লোক থেকে।’’ তার ‘ভালোবাসা কোনো সুবিধাবাদী রাজনীতি নয়’, ‘প্রেমের কবিতা’, ‘একমুঠো প্রেমের পরাবাস্তবতায়’, ‘ভালোবাসার আকাশে নাই কাঁটা তারের বেড়া’, ‘ভুলের ভূগোলে ভালোবাসা’, ‘আমাদের ভালোবাসার দিন’, ‘প্রেমের কবিতার পাঠ’, ‘ভালোবাসার তাড়াহুড়ো’ ইত্যাদি কবিতায় এই বক্তব্যের সত্যতা স্পষ্ট হয়। ভালোবাসার সংজ্ঞা তাঁর কাছে ভিন্ন। তিনি ভালোবাসার জন্য অসম্পূর্ণ হালখাতার আয়োজন করেন। তাঁর চারদিকে ছড়ানো থাকে প্রেম। তাঁর মনে হয় ভালোবাসা ঠিকরে আসা বৈশাখী হাওয়া। তিনি প্রেমের সন্ধান করে চলেন প্রকৃতির আনাচে কানাচে। তারপরেও তিনি বঞ্চিত হন। ব্যতিক্রমী তাঁর প্রকাশ ‘আমাকে বঞ্চিত রেখে তুমি ততটাই সফল হতে চলেছ/ যতটা সফল নোবেল কমিটি বঞ্চিত করে টলস্টয়দের।’ প্রেমের পরিণতি সম্পর্কেও তাঁর চিন্তাধারা ভিন্নগতিতে প্রবাহিত। যেখানে তিনি বলতে পারেন ‘মন ও মেধা, সময় ও শরীর- সবকিছু ইনভেস্ট করে/ অবশেষে জানলাম- তোমার ভালোবাসা- ধান্দাবাজির/ পিএইচডি- বিনোদপুর অথবা নীলক্ষেত!’ প্রজ্ঞাবান কবি ভবিষ্যতের কথাও ভোলেন না যখন হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মত কেউ আবিষ্কার করবে ‘ভুল পাঠশালায় অবজ্ঞায়িত’ তার ভালোবাসা। কবি বৈরী পৃথিবীর ষড়যন্ত্র টের পান, তিনি বোঝেন পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে আবেগের মালামাল কমাতে হবে, সা¤্রাজ্যবাদের মত কেবল দখলদারিত্ব এখন ভালোবাসার উপরেও প্রযোজ্য। আবেগ এখানে মূল্যহীন। কবি সেই সা¤্রাজ্যে প্রবেশের পথ খোঁজেন কিন্তু বারবার বাধাপ্রাপ্ত হন। তিনি বলেন ‘আমি কেবল প্রেমিক একজন’ যার আছে কেবল লাল ভালোবাসার স্বর্গীয় অস্ত্র আর এই অস্ত্র থাকলে কারো লাইসেন্স প্রয়োজন হয় না। কবি আমিনুল ইসলামের ভালোবাসার প্রকাশ ও প্রচার সব ক্ষেত্রেই বিচিত্র। তিনি সাধারণ কবিদের মত প্রকৃতির তুলনা দিয়ে কিংবা বন্দনা গান গেয়ে প্রেমকে মহৎ করে তোলার প্রচেষ্টায় ব্রতী নন। তিনি সত্যের ব্রাত্যজন। সমকালীন উপাদান আর সমকালীন শব্দ তাঁর প্রেম প্রকাশের ভঙ্গিকে নতুনত্ব দান করেছে।
তার কবিতার বৈশিষ্ট্যকে অনেকাংশে সার্থকতার দ্বারে উপনীত করেছে তার বিষয় নির্বাচন দক্ষতা। যে শব্দকে মানুষ কেবল একভাবে প্রয়োগ করতে জানে, আমিনুল ইসলাম তাকে প্রবাহিত করেন বিচিত্র পথে। তাঁর ভালোবাসার কবিতা, কষ্টের কবিতা, আবেগী কবিতা, সমকালীন কবিতা, বৈশ্বিক কবিতা কিংবা ব্যক্তিগত কবিতা তাই পরস্পরের সাথে মেলবন্ধন রচনা করতে সক্ষম হয়। তাঁর বিচিত্র বিষয়ের কবিতাগুলো সত্যের উদ্ভাষণে সর্বদা নিয়োজিত। তিনি চিন্তা করেন সাধারণ কবিদের থেকে পৃথকভাবে। তাঁর কল্পনায় তিনি দেশ কাল, লিঙ্গভেদ সবকিছুর ঊর্র্ধ্বে। তাইতো তিনি কখনো হতে চান বিরহিনী রাধা আবার কখনো খোলা আকাশ। তিনি থেমে থাকার পক্ষপাতী নন বলেই অনবরত ছুটে চলেন। কিন্তু চলতে চলতে যখন তাঁর মনে হয় গন্তব্য সন্নিকটে তখনই তাঁর ঘুম ভাঙে, অনেক দূর অতিক্রমণের পর তিনি দেখেন তাঁর সামনে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ভুলের দেয়াল। প্রেমিকাকে তিনি ডেকেছেন উদ্ভাসিতা, প্রেয়সী, মালিকিন ইত্যাদি বিশেষণে আবার কখনো চন্দনা বা সুজাহা নামে। তাঁর কবিতায় প্রেমের স্থান যেমন গুরুত্ববহ তেমনি এর প্রকাশও বিচিত্র।
বিজ্ঞ কবি আমিনুল ইসলাম বিচরণ করেন কাব্যজগতের বৈষয়িক বৈচিত্র্যের মাঝে। কবিতায় তিনি এনেছেন নৈসর্গিক সৌন্দর্যবোধ। তাঁর কবিতায় স্থান করে নিয়েছে প্রকৃতি। প্রকৃতি প্রেমিক কবি প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন নিপুণ হাতে। তিনি সৌন্দর্য দেখেছেন মাঠে, নদীতে, বৃক্ষে, আকাশে, রোদে, বৃষ্টিতে। প্রকৃতি এখানে ভাষা পেয়েছে নতুন ব্যঞ্জনায়। এখানে নদী ও বন একসূত্রে গাঁথা। কবির ভাষায় Ñ‘দু’হাতে আঁধার ভেঙে দেখেছি / তার বুক / সাঁঝ জোয়ারের আড়িয়াল খাঁ; / কান পেতে শুনেছি / তার কণ্ঠ / পূর্ণিমারাতের সমুদ্রস্বনিত সুন্দরবন।’ (কীর্তনখোলার ঢেউ) আবার কখনো প্রকৃতি তার কাছে বেদনা লুকানোর স্থান কখনোবা অন্তরে জাগরুক স্মৃতি।
তাঁর কবিতায় স্থান পেয়েছে ইতিহাস, মিথ, পুরাণ, ভূগোল, স্বদেশ, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি আরো হাজারো বিষয়। ‘বাঁশি’ কবিতায় তিনি মিথ ও পুরাণের বহু অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন। সেখানে বাঁশি দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। কালের, ইতিহাসের রূপান্তর কবি দেখাচ্ছেন ভিন্নমাত্রার ভাষিক উপস্থাপনায়। তিনি কখনো বলেছেন ‘বাঁশি কি যিশুর ফুঁ?’ ; ‘নিরো নয়, কোন এক বাঁশিওয়ালা / বাঁশি করে ফেরি।’ আবার কখনো ‘এ শকুন পূর্বজন্মে ক্রুসেডের পুরোহিত ছিল।’ তিনি চলে যাচ্ছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। একই কবিতায় তিনি ঘুরে আসছেন সারা বিশ্ব। প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে পাড়ি দেন কবি আর আশ্চর্যভাবে সবকিছু স্থান, কাল, পাত্রের ঊর্ধ্বে উঠে এক হয়ে যায়, প্রচার করতে চায় একই সুর। কবি বিশ্ব ইতিহাস থেকে চকিতে ফিরে আসেন দেশীয় ইতিহাসে। তাঁর চোখে ভেসে ওঠে মুক্তিযুদ্ধ। তিনি একের পর এক স্মৃতি রোমন্থন করে চলেন, পঁচিশে মার্চের ভয়াল থাবার কথা উচ্চারণ করে শিউরে দেন পাঠক হৃদয়। যখন তিনি বলেন- ‘জোছনা স্নাত রাতের দরবেশময় নীরবতাকে ভেঙে ফেলে / গিয়াসদাদার ঘরের দরজায় আচমকা ডেকে ওঠে দজ্জাল।’ (মুক্তিযুদ্ধের কান্না) তখন কবির সঙ্গে পাঠকও বিচরণ করে ইতিহাসের সেই ভয়াল অধ্যায়ে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ছেড়ে, ইতিহাস থেকে কবি প্রত্যাবর্তন করেন বর্তমানে। তাঁর চোখে ভাসে করুণ বাস্তবতা, নির্মম সত্যময় বর্তমান। তিনি বলতে বাধ্য হন ‘হে অতীত, মাফ করে দাও, / আমাদের বর্তমান শূন্য / তাই তোমার রিজার্ভ ফান্ডে বারবার হাত দিই।’ (হে অতীত, মাফ করে দাও)
কবি আমিনুল ইসলামের কবিতার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সাধারণ শব্দের অসাধারণ অভিব্যক্তি প্রদান। একেবারে সাদামাটা, অপ্রয়োজনীয় শব্দ তাঁর কবিতায় সগর্বে স্থান লাভ করে। তিনি অকপটে পাথর, আকাশ, কচুপাতা, মশা, বাঁশি, শীত, বৃষ্টি, বৃক্ষ, চীনাবাদামের খোসা, ক্যাঙ্গারু, সুন্দর বন, ছবি, ফোন, চোর, আ্যকাউন্ট, সিগারেট, জঙ্গল ইত্যাদি হাজারো অতি সাধারণ বিষয়কে উপস্থাপন করেছেন অসাধারণ করে। তিনি দেখেন সামান্য পড়ে থাকা চিনাবাদমের খোসায় রঙিন কোনো ঠোঁটের দুঃসহ নিয়তি, তাঁর ‘নিষাদ সময়ের স্মৃতির সাফল্য’। সিগারেটের পোড়া ধোঁয়ায় মধ্যে তিনি পান হৃদয় পোড়ার গন্ধ। মশার কামড় তাঁকে বুঝিয়ে দেয় ‘বাঁশগন্ধী প্রেরণা’ আর ‘প্রাতিস্বিক সংবেদনশীলতা’র সংজ্ঞা। এক বাড়িই তাঁর কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে দুঃখের কারণ, আগাছার উৎপাত মাথায় নিয়ে তিনি বয়ে চলেন জীবনের বোঝা। এভাবে প্রতিটি বস্তু তাঁর কবিতায় সংজ্ঞায়িত হয় নতুনত্ব নিয়ে। সাধারণ বিষয় লাভ করে অসাধারণত্ব।
নারী প্রসঙ্গ একজন প্রজ্ঞাবান কবির অন্যতম বিষয়। কবি আমিনুল ইসলামের কবিতার মধ্যেও নারী প্রসঙ্গের অন্তর্ভুক্তি বিরল নয়। তিনি বিভিন্ন কবিতায় নারী সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন কিন্তু তা চিরাচরিত নারী হিসেবে নয়। বিজ্ঞ কবির দৃষ্টিতে নারী লাভ করেছে অনন্য রূপ। তাঁর চোখে নারীর প্রকৃত রূপ প্রস্ফুটিত। সমাজে অবহেলিত নারী তাঁর কবিতার অনুষঙ্গ যেখানে বৃক্ষ ও নারীর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। নারীকে নীতির দোহাই দিয়ে, সমাজের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে তাকে আমরা অচল বৃক্ষে পরিণত করি যার নাম কবি দেন ‘নারীবৃক্ষ’। কোন নির্দিষ্ট নারীকে উদ্দেশ করে রচিত কবিতাও তাঁর কম নয়। ‘তুর্কী মেয়ের জন্য’, ‘সাবিহা- তোমার কাছে’, ‘ঢাকার মেয়ে চন্দনাকে’, ‘আমার বোন এবং আমি’ ইত্যাদি কবিতায় তিনি বিভিন্ন ভাবে নারীদের উদ্দেশে তাঁর মনের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। নারীর সঙ্গে নদীও তাঁর কবিতায় ভিন্ন মাত্রা দান করেছে। ‘শীতের নদীতে ভাসা’, ‘নদী অথবা চাঁদ’, ‘এই নদী এই হাওয়া’, ‘মহানন্দা’ ইত্যাদি কবিতায় নদীর প্রতি কবির অনুভূতির প্রকাশ স্পষ্ট। কবি নিজেই নদী সম্পর্কে বলেছেন ‘নদী আমার ব্যক্তিগত জীবনে, আমার স্বপ্নের উঠোনে এবং আমার কাব্য ভাবনায় প্রায় স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে আছে। নদী নিয়ে আমি প্রায় স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্ন দেখি।’ নদীর প্রভাব তাই তাঁর কবিতায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাঁর কবিতায় পাওয়া যায় অনেক চরিত্রের উপস্থিতি। কবিতায় নতুন রস সঞ্চারণে কবি ঐতিহাসিক ও বিখ্যাত চরিত্রকে তুলে আনেন। তাঁর কবিতায় তাই পাওয়া যায় আলাউদ্দীন হুসেন শাহ, বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর, কবিয়াল নরেশ শীল, কবীন্দ্র পরমেশ্বর, পুটু সরকার, রানী এলিজাবেথ, ফকির পন্ডিত, গোয়েলবস, এডওয়ার্ড সাঈদ, ইয়াসির আরাফাত, রুমি, জসীমউদ্দীন, মান্নান সৈয়দ, হকিং, মাইকেল জ্যাকসন ইত্যাদি চরিত্র। দেশ কালের গন্ডিতে আবদ্ধ না থেকে কবি কবিতাকে নিয়ে যান সত্য জগতের দ্বারে যেখানে কোন চরিত্রই নির্দিষ্ট কোন ভূখন্ডের নয় বরং সর্বকালের সকল দেশের।
ঈশ্বর চিন্তা তার কবিতায় পাওয়া যায় ভিন্ন ভাষ্যে। তিনি কখনো ঈশ্বরকে সাহসিকতার সঙ্গে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। বলেছেন- ‘ভুল ছিল তোমার একনায়কী একগুঁয়ে হুকুম / যা প্রমাণ করে চলেছে হালাকু থেকে হিটলার।’ ঈশ্বরের মনের কথা বলেছেন নিজের মত করে, কখনো বাস্তবতার নির্মম পরিহাসে মর্মবিধ্বস্ত কবি ঈশ্বরকে ব্যঙ্গ করেছেন আবার কখনো হৃদয় বিদীর্ণ বাণীতে ঈশ্বরের কাছে করেছেন প্রার্থনা। কবির ভাষ্যে- ‘পূর্ণতা চাই না হে ঈশ্বর – পূর্ণতা চাই না / তোমার কসম খেয়েই বলছি- / পূর্ণতার বোঝা বইতে পারবো না আমি / আর তুমিই বলো, কেইবা পারে তা?’ (অপূর্ণতার কাব্য) কবি আমিনুল ইসলামের সার্থকতা কবিতার শিরোনাম নির্বাচনে। তিনি দক্ষতার সাথে অসাধারণ সব শিরোনাম নির্বাচন করেছেন যা তাঁর কবিতাকে করে তুলেছে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। শিরোনামের গুণে পাঠক আগাম স্পর্শ লাভ করে ভেতরের সারসংক্ষেপের তবে আমিনুল ইসলামের কবিতার শিরোনাম এতই অদ্ভুত ও আকর্ষণীয় যে কেবল শিরোনাম পড়েই তৃপ্তি মেটে না, শিরোনামের সার্থকতা উদ্ধারে তাই তৎপর হয়ে ওঠেন পাঠক। তাঁর কোনো শিরোনাম একেবারে সাধারণ যেমন: ‘ছবি’, ‘মহাবিশ্ব’, ‘বাবার জুতো’, ‘ক্ষুধা’, ‘জ্বর’, ‘বাঁশি’ ইত্যাদি। কোনোটা প্রকাশ করে গভীরতর অনুভূতি যেমন : ‘বিধ্বস্ত ভূগোলের পাখি’, ‘ভুল সময়ের ভালোবাসা’, ‘সুরভিত সময়ের সুর’, ‘জন্মান্তরের ছবি’, ‘বৃদ্ধ বাবা ও সত্যের রং’, ‘পুরনো দেয়ালের স্পর্শ’ ইত্যাদি। আবার কোনোটা বহন করে গভীর ইঙ্গিত যেমন : ‘কচুপাতার কাব্য’, ‘নিরপেক্ষতার পোস্টমর্টেম’, ‘কুয়াশাপ্রিন্ট’, ‘লাশগন্ধি হাওয়া’, ‘আধুনিক দৈত্য’, ‘জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার’, ‘মৃত্যুভক্ষণ’, ‘স্বপ্নের শস্য’, ‘পাখিতীর্থ দিনের কথা’, ‘নিয়মের সৎপুত্র’ ইত্যাদি কাবতায় ছড়িয়ে রয়েছে গভীরতম অনুভূতির সত্য প্রকাশ যা দিয়ে যায় বৃহৎ জগতের ইঙ্গিত আর কবি কেন্দ্র থেকে পরিধি পর্যন্ত ভ্রমণ করান পাঠককে।
কবি আমিনুল ইসলাম কেবল যে কবিতার বৈষয়িক দিক থেকে প্রাজ্ঞতার পরিচয় রেখেছেন তা নয় তিনি সৃষ্টিশীলতার পরিচয় রেখেছেন কবিতার শৈলীতেও। তাঁর কবিতায় যেমন পাওয়া যায় ভাবের ভিন্নধর্মী ব্যঞ্জনা তেমনি পাঠকের নজর কাড়ে কবিতার বিচিত্র গঠনশৈলী। তাঁর কবিতায় উপমা, চিত্রকল্প, রূপক, প্রতীক, নতুন শব্দ সৃষ্টি, শব্দের নতুন প্রয়োগ, বিদেশি শব্দের ব্যবহার, আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার, সম্বোধনসূচক শব্দ ব্যবহার, নতুন সমাসবদ্ধ শব্দ সৃষ্টি, ভাষার ব্যবহার, প্রশ্ন ও বিবৃতি প্রয়োগ, ড্যাস (Ñ) এর ব্যবহার, তুলনা বাচক শব্দের প্রয়োগ, পুরাবৃত্তি, অলংকার প্রয়োগ, বিশেষণের প্রয়োগ, ছন্দ প্রয়োগ ইত্যাদি তাঁর কবিতার কাঠামোকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছে। বিষয়ের পাশাপাশি গঠন বৈচিত্র্যের উপস্থাপনা তাঁর কবিতাকে করে তুলেছে অনেক বেশি আকর্ষণীয়।
আমিনুল ইসলামের কবিতায় শব্দ নিয়ে বিচিত্র খেলা চোখে পড়ে। তিনি শব্দকে ভেঙেছেন, নতুন করে গড়েছেন আবার কখনো নতুন শব্দ সৃষ্টিও করেছেন। একজন সার্থক কবির সার্থকতার অনেকখানি নির্ভর করে তার শব্দ ব্যবহার ও বাক্যে শব্দের প্রয়োগের উপর। আমিনুল ইসলাম এক্ষেত্রে সার্থকতার দাবিদার। তিনি শব্দকে যেমন ব্যতিক্রমী উপায়ে কাব্যে প্রয়োগ করেছেন তেমনি নতুন শব্দ সৃষ্টি ও বিদেশি শব্দের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন অসামান্য দক্ষতায়। তিনি কাব্যের সৌন্দর্য বর্ধনে ব্যবহার করেছেন সমাসবদ্ধ শব্দ। যেমন : ক্যালকুলেটর-সময়ে, মহা-একনায়ক, হংস-মিথুন, বৃক্ষ-হরিণ-ময়ূর, রোদসত্য, আলোকসম্মত, চন্দ্র-সূর্য-সমুদ্র, রাষ্ট্রসংঘ, শ্রাবণ-গাঙ, সূর্য-নির্গত, কচুপাতা-কাচা, বিবিসি-সিএনএন-স্টার ওয়ার্ল্ড, বৃক্ষ-নদী-ফসলের মাঠ, কুটুমপাখিদিন ইত্যাদি শব্দকে তিনি সমাস দ্বারা আবদ্ধ করে নতুন অর্থ প্রদান করেছেন। শব্দের বিচিত্র ব্যবহার তাঁর কবিতার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। চিন্তাশীল, সৃষ্টিশীল কবির পক্ষেই নতুন শব্দের সৃষ্টি সম্ভব যেখানে পুরনো শব্দ মানুষের অনুভূতির গভীরতা প্রকাশে অক্ষম সেখানে নতুন সৃষ্ট শব্দ খুব সহজেই সেই দ্যোতনাকে পরিস্ফুট করে তুলতে সক্ষম। কবি আমিনুল ইসলাম শব্দ নিয়ে নিরীক্ষা চালিয়েছেন। তিনি নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি করে প্রয়োগ করেছেন কবিতায়। কখনো একটি শব্দ আবার কখনো একগুচ্ছ নতুন শব্দ তিনি সৃষ্টি করেছেন কবিতায়। যেমন: গোলমেলে কুয়াশা, পড়শিবৃক্ষ, ক্যালকুলেটর মন, জলপিকনিক, বেহুলাচুম্বন, সৌর ফ্যামিলি, প্রতিষেধী প্রেম, দন্ডচক্র, জগৎশেঠদিন, প্রাপ্তবয়স্ক অন্ধকার, নূপুরনিপুণা রাত, মোগল জোছনা, সুদখোর দুপুর, জোছনার টি-স্টল, পাটিগণিতের মন, কানকথা, সুগারকোটেড শব্দাবলি ইত্যাদি শব্দগুচ্ছ কবিতায় নতুন প্রাণের সঞ্চার করে পাঠককে দেয় ভিন্ন এক অনুভূতি। কেবল শব্দগুচ্ছের নতুন ব্যবহারই নয় তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচিত শব্দ ভিন্নভাবে ব্যবহার করে সৃষ্টি করেছেন নতুন অর্থবোধক বাক্য যা পাঠককে নতুন ব্যঞ্জনার জগতে নিয়ে যায়। যেমন : ‘সেবার ডিসেম্বর ফলে উঠেছিল/ শীতসকালের টমেটোকালার নতুন প্রভাতের ফসলে’, ‘বাড়িটার নতুন নাম উঠুক/ পৌরপিতার প্রপ্রার্টি রেজিস্টারে।’, ‘কেমনে রেখেছিলে লুকিয়ে/ অমন গোলাপী গোলাপী প্রশ্ন’, ‘প্রটোকল ফেলে রেখে / ডুব দিই/ গোপনরাতের বিষণ্ন ডানার প্রণয়ীহাঙর।’, ‘জমে ওঠে / সবুজ পাতায় কালচে দুঃখ’, ‘শূন্যের চাদরে দ্যাখো বেড়ে যায় ছিদ্র আর ক্ষত’, ‘আমিও মুছে ফেলেছি আমার ব্যর্থতার নুন’, ‘সভ্যতার মাথার ওপরে হিসুবালকের মতো জিপার খুলে কে?’ ইত্যাদি। এছাড়াও তাঁর প্রতিটি কবিতা জুড়ে রয়েছে অসংখ্য নতুন ব্যঞ্জনা যা কাব্য পাঠের সময় পাঠককে মুগ্ধ করতে অতুলনীয়। আমিনুল ইসলামের কবিতায় প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে বিদেশি শব্দ। বিশেষ করে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার তাঁর কবিতাকে একদিকে যেমন আধুনিক পাঠকের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে তেমনি তার গভীরতা ও ভাব উপলব্ধিও সহজতর হয়েছে পাঠকের কাছে। তাঁর ‘আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট’ থেকে শুরু করে ‘তন্ত্র থেকে দূরে’ কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতার মধ্যেই অসংখ্য বিদেশি শব্দ তিনি প্রয়োগ করেছেন। যেমন : প্রপার্টি, ভিজিটিং, ব্যালান্স শিট, রিজার্ভ, হাইকোর্ট, হুইসেল, ইউনিফর্ম, গ্রিনকার্ড, গাফেলতি, চার্জশিট, রিংটোন, ডিলিট, প্রজেক্ট, ব্যাংক, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট, ফার্ম, ডিজিটাল, ফোন থেরাপি ইত্যাদি। আধুনিক কবি আমিনুল ইসলাম তাঁর কবিতাকে পাঠকের হৃদয়গ্রাহী করতে বিন্দুমাত্র ত্রুটি করেননি। তিনি অন্তরের আহ্বানে কবিতা লেখায় মনোনিবেশ করেছেন বলেই তাঁর কবিতায় আন্তরিকতার ছাপ স্পষ্ট। পাঠকের কাছাকাছি যেতে আর কবিতার প্রগাঢ় অনুভূতিকে উপলব্ধি করতে তিনি ব্যবহার করেছেন অনেক সম্বোধনসূচক শব্দ। অনেক ক্ষেত্রে এই শব্দগুলো কবিতাকে পাঠকহৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতে সহায়তা করে। যেমন : ‘ও সোনার চামচÑ ও রূপোর চামচ’ ; ‘ও রে ও নীলকণ্ঠ, আ রে ও নীলাভ ডানার পাখি’; ‘হে ভাই’; ‘ হে পাখি, হে ঝর্ণা, হে হাওয়া’; ‘ হে সারথী’, ‘ও জনক, ও জননী’ ইত্যাদি সম্বোধনে কবিতার ভাষা আরো প্রগাঢ় হয়ে ওঠে। তাঁর কবিতায় রয়েছে প্রশ্নবাচক শব্দের উপযুক্ত ব্যবহার। তিনি কবিতার প্রয়োজনে, ভাবের প্রয়োজনে প্রশ্ন ও আবেগ চিহ্ন ব্যবহার করেছেন যা তাঁর কবিতার মর্মবাণীকে পাঠকের আরো নিকটবর্তী করে তুলেছে। যেমন:
আবেগ চিহ্নের ব্যবহার তিনি করেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ভাব প্রকাশে। নিজের মনেই বিস্ময় প্রকাশ করতে কবি বলেন, ‘‘কবি, জন্মতারিখ দিয়ে কী হবে!’; আবার হারানো অতীতের জন্য কবির স্মৃতিকাতরতা ‘আহা হাতেখড়ি! আহা পাঠশালা!’; অনুরোধের সুরে ‘তোমরা কি আমাকে পাঠ করে দেবে/ বাপজানের রেখে যাওয়া সবুজ পান্ডুলিপি!’; কাউকে জোর পূর্বক জেরা করার বিস্ময়ে ‘‘বল্ শালা, তুই নিজেই এ কাজ করেছিস!’; আবার কখনো আশ্চর্য হয়ে তিনি বলেন ‘আমাকে আটকায় না আসমানি ট্রাফিক পুলিশ!’; কখনো ব্যাকুলতায় বলে ওঠেন ‘কী হবে! কী হবে!’ এভাবে আবেগ শব্দ তার কবিতায় কবির মনের ভাষা পাঠকের মনোগত করতে সক্ষম হয়। একইভাবে বিভিন্ন স্থানে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ভিন্ন ভিন্ন ভাবের প্রকাশ ঘটায়। যেমন: কবির সন্দেহ ‘ কেউ কি আমাকে হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিল?’; স্বগতোক্তি ‘আর কত রাত শুনতে হবে / গোখরো নীরবতার খোলস বদলানোর শব্দ?’; কারো উদ্দেশ্যে ছুড়ে দেয়া প্রশ্ন ‘কিন্তু তোমরা কারা? তোমাদের জাহাজেইবা কি?’; প্রিয়জনকে অনুরোধের ভাষায় ‘যাবে চন্দনা, যাবে আমার সাথে / নানানাতির গম্ভীরা গানে মুখরিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ?’; জানার ইচ্ছা ‘কিছু মনে করবেন না, আচ্ছা, আপনার প্রাণটা কি কখনো / কোন দগ্ধরাতে মরণের দরবারে গিয়ে -‘মরণ রে তুহু মম / শ্যাম সমান!’ – বলে পরকীয়া প্রেমিকার মতো নগ্নপায়ে নেচে আসে?’; তথ্য অনুসন্ধানের জন্য ‘গাছের ছায়ায়- কে পেতেছে আস্তানা কোচায় নিয়ে দুর্বাসার শ্বাস-প্রশ্বাস?’ ইত্যাদি।
অলংকারের সঠিক ব্যবহার কবিতায় প্রাণ সঞ্চার করে। প্রতীক, উপমা, চিত্রকল্প ইত্যাদি অলংকার কাব্যগাত্রের শোভা বর্ধনে অপরিহার্য। প্রতীকের ব্যবহার কবি আমিনুল ইসলামের কবিতায় অনেক স্থানেই পাওয়া যায়। সরাসরি কোন ভাব প্রকাশ না করে কবি প্রতীকী চরিত্র বা অনুষঙ্গ ব্যবহার করে কবিতাকে সার্থক করে তোলেনে। যেমন: জীবন প্রবাহের প্রতীকী উচ্চারণ ‘ঘোড়া হাঁকাই না, ঘোড়াই নিয়ে বেড়াচ্ছে আমাকে।’ কবির মনের গোপন আকাক্সক্ষা তিনি প্রকাশ করেন ক্ষুধার প্রতীকে ‘তোমার সঙ্গে কথা বললেই ক্ষুধা লাগে আমার / কেন ক্ষুধা লাগে? কেন লাগে ক্ষুধা!’; মৃত্যু ও বিধাতার অকাট্য বিধান কবির কবিতায় প্রতীকী ভাষা পায় ‘আমার আগেও রক্ষী- পিছেও রক্ষী / আমার ডানে রক্ষী – বামেও রক্ষী / আমার ফাঁসির দিন নির্ধারিত যদিও/ তারিখটা আমাকে জানানো হয়নি;’ এভাবে তিনি প্রতীকের আবডালে উপলব্ধি করেন সত্যকে। কবিতার অন্যতম সৌন্দর্য হলো উপমার প্রয়োগ। উপমার ব্যতিক্রমী প্রয়োগই এক কবি থেকে অন্য কবিকে পৃথক করে তোলে। কবি আমিনুল ইসলামের কবিতায় উপমার একটি বিশেষ জগৎ রয়েছে। তিনি নিজের মত করে উপমা নির্মাণ করেন। তাঁর কবিতায় তুলনীয় বস্তু ও মূল বস্তু উভয়ের উপস্থাপন কৌশলই ভিন্ন। কখনো তিনি ব্যবহার করেন পূর্ণোপমা আবার কখনো তাঁর কবিতায় উপমা লুপ্ত রূপ লাভ করে। উপমার সার্থক প্রয়োগ তাঁর কবিতার একটি আকর্ষণীয় দিক। বিভিন্ন কবিতায় তাঁর উপমার প্রয়োগদক্ষতার নজির মেলে। যেমন : ‘বটগাছের মতো শ্মশ্রুমণ্ডিত মহাকাল’; ‘ন্যাটোজোটের মতো শব্দজট’; ‘খৈয়ামের সাকীর মতো সুমনা সময়ের হাতে/ আনশিডিউল্ড পেয়ালিটি হেমলকের’; ‘শীতবিকেলের পশমি রোদের মতো উষ্ণতাটুকু’ ইত্যাদি। তাঁর কবিতায় অসংখ্য চিত্রকল্প সৃষ্টি করেছে নতুন দৃশ্যপট। পাঠকের চিন্তার জগৎকে নাড়া দিতে, কল্পনার জীয়ন কাঠিকে জীবন্ত করে তুলতে কবির চিত্রকল্প অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। কবিতার মধ্যে ব্যবহৃত চিত্র কবির কল্পনা আর অন্তর্লোকের সংমিশ্রণে সৃষ্টি করে মায়াময় আবহ। যেমন : ‘ঘন হয়ে আসে- / উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা চোখবাঁধা রাত।’; ‘পাথরের ঘাটে বসে পা উঠিয়ে পা ঘষে রজনী / খসে পড়ে অন্ধকার / পাথরের ঘাটে বসে জামা খুলে নাভি মাজে দিন’; ‘যেখানে রহস্যের গল্প বোনে অন্ধকার,/ খুলি নিয়ে খেলে গোরস্থানের হাওয়া’; ‘বাঁশি শুনে / ঠোঁটগুলো চুমু খায় / কংকালের স্থাপত্যে’ ইত্যাদি। বিশেষণের চমৎকার সব ব্যবহার লক্ষ করা যায় আমিনুল ইসলামের কবিতায়। শব্দকে জোড় দিতে, শব্দের মাহাত্ম্য বৃদ্ধিতে বিশেষণবাচক শব্দ প্রয়োগ খুবই উপযোগী। কবিও শব্দের কখনো শব্দের মাধুর্য বর্ধনে কখনো শব্দের অর্থ সম্প্রসারণের প্রয়োজনে ক্ষয়িষ্ণু খোঁয়াড়, সুদখোর দুপুর, গোলাপী প্রশ্ন, কালোজলের মহাসাগর, সার্বভৌম উৎপাত, বরফাচ্ছন্ন রজনী, যমছোয়া বাও, ক্রীড়ক বাতাস, পশমি রোদ ইত্যাদি বিশেষণ ব্যবহার করেছেন। পুনরাবৃত্তি তাঁর কবিতার গঠনকে অনেকাংশেই নতুন করে তোলে। একই শব্দের পুনরাবৃত্তি বা একই শব্দগুচ্ছের পুনরাবৃত্তি শব্দের আবেদনকে বিশেষ করতে সক্ষম। কবি তাঁর কবিতায় পুনরাবৃত্তির ব্যবহারের মাধ্যমে নতুনত্ব সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়েছেন। যেমন : ‘বাঁশি বাজে- বাঁশি বাজে’, ‘নিরুত্তর! নিরুত্তর! নিরুত্তর!’, ‘বদলে যাও- বদলে যাও’, ‘ক্ষয়ে যাওয়া.. ক্ষয়ে যাওয়া.. এবং ক্ষয়ে যাওয়া’, ‘ঘাম ঝরে.. ঘাম ঝরে.. ঘাম ঝরে’, ‘ছুটো-ছুটো-ছুটো’, অভিযোগ- অভিযোগ- এবং অভিযোগ’ ইত্যাদি। তুলনা বাচক শব্দের ব্যবহার তাঁর কবিতার বিভিন্ন স্থানে দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি কবিতার সৌন্দর্য বাড়াতে, ভাবের প্রয়োজনে যেমন, তেমনি, যেভাবে ইত্যাদি তুলনা বাচক শব্দ ব্যবহার করেছেন কবিতায়। যেমন: ‘যখন তুমি হাঁপিয়ে উঠবে ছকবাঁধা প্রাত্যহিকতায় / যেমন হাঁপিয়ে ওঠে ভ্যাপসা সাঁঝে ভাদরের ঢাকা শহর।’
অলংকারের সঙ্গে সঙ্গে কবিতার গঠনকে নতুনত্ব দান করতে বিচিত্র ভাবে তিনি কবিতাকে উপস্থাপন করেছেন। স্তবক বিন্যাসের বৈচিত্র্য তাঁর কবিতার একটি উল্লেখযোগ্য গাঠনিক বৈশিষ্ট্য। তিনি সাধারণ ভাবে গদ্য ছন্দকেই কবিতার বাহন করেছেন। অধিকাংশ কবিতাই রচিত হয়েছে অন্ত্যমিলহীন গদ্যছন্দে। যেমন : ‘ঢাকার মেয়ে চন্দনাকে’, ‘বিচূর্ণ জলের আয়নায় ভেসে ওঠা মুখ’, ‘কপোতাক্ষ : সে এক হাফ-সাঁতারের স্মৃতি’, ‘আক্রান্ত বাগান’, ‘জোছনার আমন্ত্রণ’ ইত্যাদি কবিতায় গদ্যছন্দের ব্যবহার স্পষ্ট। আবার গদ্যের সাথে কিছুটা চাটুল ছন্দ মিলিয়ে তিনি নতুন গঠন দিয়েছেন ‘সত্য বলা না বলা’ কবিতাটিকে। এখানে কবি প্রথমে গদ্যছন্দে শুরু করছেন। প্রথম তিন চরণের পর প্রয়োগ করছেন ছোট বাক্যের চটুল ছন্দ তারপর আবার ফিরে আসছেন পূর্ণ গদ্য ছন্দে। যেমন:
সত্য বলা যাবে না- এমন কোন কথা নেই সত্যের বিশ্ব-ঠিকাদার
ন্যাটোর ঘোষণায় কিংবা দশমুখে কথা বলা তথ্যমন্ত্রকের প্রজ্ঞাপনে;
তবু কিছু কিছু সত্য বলা মানা, একথাই সবচেয়ে বড় সত্য;
গরুমার্কা সত্য বলা মানা;
দুম্বামার্কা সত্য বলা মানা;
নিষিদ্ধ ছাগলমার্কা সত্যেরাও;
….. ….. ….
রোপিত চারাটি প্রথম ফুলে-ফলে
ফলে ওঠার আগেই গাছের পাতায় হলদে রোগ।
(সত্য বলা না বলা)
আবার অনেক স্থানে মাত্রাবৃত্ত ছন্দের ব্যবহারও লক্ষ্য করা যায়। যেমন : ‘এইতো জীবন’ কবিতায়-
হয়তো তুমিও জিতে গেলে কোন খানে
বেঁচে গেল খুব হিসেবের হালখাতা
বাজেটের ঘরে ক্যালকুলেটর মন
গণিতের গাছে হিসাবে হলুদ পাতা।
আবার চার মাত্রার পর্বে বিভক্ত কবিতার সন্ধানও পাওয়া যায় তাঁর কাব্যভান্ডারে। যেমন: ‘ড্রেসিং টেবিল’ কবিতাটিতে-
আয়না থেকে চোখ সরিয়ে আমার চোখে রাখো
আমার চোখের দৃষ্টিটুকু তোমার চোখে মাখো
দেখবে কত মধু ঝরায় তোমার ঠোঁটের হাসি
বুঝবে কেন ঠোঁটের মাঝে ঠোঁট রাখতে আসি।
কবিতায় স্তবকের ক্ষেত্রেও কবি বিচিত্র পন্থা অবলম্বন করেছেন। কোথাও ব্যবহার করেছেন দুই বা ততোধিক স্তবক আবার কোথাও এক স্তবকেই শেষ করেছেন কবিতা। যেমন: ‘এইতো জীবন’, ‘ভালোবাসার ময়ূরপঙ্খী’, ‘ফুটবল মাঠে পরাবাস্তব খেলা’, ‘শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ’ ইত্যাদি কবিতায় তিনি ব্যবহার করেছেন ছোট বড় ততোধিক স্তবক। আবার ‘ভুলের ভাসান’, ‘খন্ডাংশের সাফল্যে উজ্জ্বল আমাদের চোখ’, ‘অন্ধরাতে অন্তরঙ্গ চাঁদ’, ‘প্রবাসের পাঠশালা’ ইত্যাদি কবিতায় তিনি একটি মাত্র স্তবকেই কবিতার পরিণতি দান করেছেন। কোথাও আবার একটি স্তবকের সাথে শেষে নতুন স্তবক শুরু না করে একটি বাক্য দিয়ে শেষ করেছেন কবিতা। যেমন: ‘এই আমি’, ‘নিঃসঙ্গ বৃক্ষ’, ‘যে আলো অন্ধকারে অধিক’ ইত্যাদি। তাঁর কবিতায় কখনো পাওয়া যায় দীর্ঘ আলোচনা যেমন: ‘বৃদ্ধ বাবা এবং সত্যের রং’ আবার কখনো মাত্র চারটি বাক্যে কবিতা লাভ করে কাক্সিক্ষত পরিণতি। যেমন: ‘ড্রেসিং টেবিল’, ‘ক্ষমতার দৃশ্যপট’।
ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কবির দক্ষতা অসাধারণ। তাঁর কবিতায় একাধারে সাধু ভাষা, চলিত ভাষা ও আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। তিনি মূলত চলিত ভাষাতে কবিতা রচনা করলেও কবিতার প্রয়োজনে, ভাবকে সমুন্নত রাখতে তিনি চলিতের সাথে অসাধারণভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন সাধু ভাষা। যেমন: ‘আমাদের চাঁদে গ্রহণকালেও সুতো কেটে যায় বুড়ি’ কবিতায় ‘‘নদীর মতন কুয়াশার কাল গুনে হোক দিন সারা / শীতের উঠোনে আমরা রচিব অনাগত ফাল্গুনী।’’ আবার কবিতার ভাবকে অক্ষুণœ রাখতে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারেও কবি সুদক্ষ। যেমন: ‘ভালোবাসার বাড়ি’ কবিতায় ‘‘হারামী ইঁদুর, আইজ থ্যাইকা ছাই খাইস!’’ এভাবে ভাষিক ভিন্নতা তাঁর কবিতাকে অসাধারণ করে তোলে।
মানুষের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে যে সাহিত্য, যার কাব্যিক দোলায়মানতায় মুগ্ধ হয় পাঠক, বিস্মিত হয় বৈষয়িক নিপুণতা দেখে, অলংকার আর শব্দের ঝংকার যেখানে পাঠক হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়, রেখা টেনে যায় কোনো চরণের মাধুর্য, সেখানেই কবিতা সার্থকতা লাভ করে। যে কবিতায় মানুষ পায় আপনার খোঁজ, নিজের অস্তিত্ব, সেখানেই নিহিত হয় তার ভালোলাগা। আমিনুল ইসলাম তেমনই একজন অসাধারণ কবি যার কাব্যের ভাব ও ভাষা, গঠন ও বিষয় আকৃষ্ট করে পাঠককে। তাঁর কবিতায় নিবিষ্ট হয় যে মন সেই কেবল সন্ধান পায় এর গুপ্ত ঐশ্বর্যের। তাঁর কাব্যের বিষয় ও শৈলী যেমন চমৎকার তেমনি অসাধারণ তাঁর উপস্থাপন ভঙ্গি। তিনি সত্যানুসন্ধানী নির্ভীক কলমসৈনিক। তিনি নৈসর্গিক সৌন্দর্যের পূজারি। তাঁর কবিতার অসাধারণত্ব- তাঁর বৈষয়িক পারদর্শিতা ও শব্দ নির্বাচন কৌশলে। তিনি ছকে বাঁধা কাব্যপথের যাত্রী নন বলেই তাঁর কবিতাগুলো ভিন্ন মাত্রায় রচিত। তিনি মিথ্যাকে আশ্রয় করেননি বলেই তাঁর কবিতাগুলো সত্যাশ্রয়ী। যুগের সত্যকে, মানব সত্যকে, মননের সত্যকে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলেই তিনি হয়ে উঠেছেন ভিন্ন ধারার সত্যানুসন্ধানী। হ