বাড়ি থেকে বের হতে হতে বাবা বললেন- হাসু এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি? মা আমাকে বাঁচানোর জন্য বললেন- হ্যাঁ ঘুম থেকে উঠছে।
তখনো আমি লেপ মুড়ি দিয়ে মাথা পর্যন্ত টেকে শুয়ে আছি। পৌষের শীতের সকাল কী যে মিষ্টি। মন কোনোমতেই বিছানা ছেড়ে উঠতে চায় না। মনে হয় আরো একটু শুয়ে থাকি। এইতো উঠছি, অল্প সময়। কতই না মজা পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ সারা দুনিয়ার সব সুখ-শান্তি এই সকালে দিয়ে রাখছেন।
বাবা উঠোন থেকে রাস্তায় যাওয়ার পরই মা আমার ঘরে এসেই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলেন- কতই আর এভাবে মিথ্যা বলব। আল্লাহ কি এই মিথ্যা মাপ করবেন? এতো যে কথা কাকে বলছি। এখনো বিছানা ছেড়ে উঠিসনি। কথা কি কানে ঢুকে না। কথাগুলো বলে মা রাগে গড় গড় করতে করতে বের হয়ে গেলেন। আর কি করা, বাধ্য হয়ে উঠি।
পড়ার টেবিলে মা মুড়ি মাখা দিয়ে গেলেন। সরিষার তেল, পিঁয়াজ, কাঁচামরিচ আর হালকা চিনি দিয়ে মাখা। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, আমার মায়ের মতো মুড়ি মাখা কেউ তৈরি করতে পারবে না।
আমার পড়ার টেবিল একটা গবেষণাগার। পড়তে বসে খাতায় ক্রিকেট খেলার মাঠ আঁকিয়ে ফিল্ডিং প্ল্যান করছি। এমন সময় বাবার গলার আওয়াজ পেয়ে বই খোঁজা শুরু করি। হাতের কাছে সমাজ বই ছিল সেটাই বের করে চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে ইংরেজি পড়ছি। যাতে বাবা মনে করে আমি ইংরেজি ভালো পারি। পড়ছি- টেন্স তিন প্রকার: প্রেজেন্ট টেন্স পাস্ট টেন্স এন্ড ফিউচার টেন্স। বার বার পড়ছি।
বাবা আমার পড়ার টেবিলের সামনে এলেন, আমি আরো জোরে পড়ছি। বাবা রাগে অস্থির হয়ে উঠলেন। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই বাবা আমার চুলের মুঠি ধরে পিঠে কিল বসে দিলেন। গালে একের পর এক থাপ্পড় চলছে। মা দৌড়ে এসে আমাকে বাবার হাত থেকে রক্ষা করলেন। অবশ্য মায়ের পিঠে কিছু পিটন পড়ল।
বাবা বললেন,
– ক্লাস এইটে পড়ে এখন পর্যন্ত টেন্সের নাম জানে না। ওর হাতে সমাজ বই পড়ছে ইংরেজি। ওকে দিয়ে পড়ালেখা হবে না। ওকে পড়ালেখা বাদ দিতে বল।
দাদী বাবাকে ইচ্ছে মতো বকছে তুই ওকে কোনোদিন পড়া বুঝে দিয়েছিস। মারটাই বেশি বুঝিস। এখনি আমার বাড়ি থেকে বেড় হয়ে যা। বাবা তখন মাথা নিচু করে অন্য ঘরে চলে গেলেন। দাদী আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করছেন। বুবু এসে বুকের ভেতর নিয়ে বলল,
– এভাবে আর কত মার খাবি। পড়ালেখা কর। নিয়মিত স্কুলে যাবি। তা না করে স্কুল ফাঁকি দিয়ে ক্রিকেট খেলা নিয়ে মেতে থাকিস।
রাগ করে বলি আমি স্কুলেও যাবো না পড়ালেখাও করব না। এই তোকে বলে দিলাম। বুবুর বুক থেকে ঝটকায়ে নিজেকে সরে নিয়ে বারান্দায় বের হলাম। পেছনে বুবু দৌড়ে এসে বলে- সোনা ভাই আমার রাগ করিস না। বাবা ঠিক কথাই বলছে। তোর ভালোর জন্যই বলছে। আমি বুবুর পিঠে গুড়–ম গুড়–ম করে কিল দিতে শুরু করলাম। আর বললাম-তুই আমার বুবু না, তুই আমার শত্রু। তুই আমাকে ভালোবাসিস না। বাবা আমাকে ভালোবাসে না, মা আমাকে ভালোবাসে না। কেউ আমাকে ভালোবাসে না। আমি তোদের কাছে বেশি হয়েছি। শুধু মারিস। আমার ভালো চাস না। বাড়ি থেকে চলে যাবো। আর ফিরে আসব না।
বাবা যেদিন আমাকে পিটন দেয় সেইদিন পড়ালেখা মাপ। আজ স্কুলে গেলাম না। তিনমাথার মোড়ে গিয়ে বড় আমগাছের নিচে বসে আছি। মনে মনে ভাবছি- আর স্কুলে যাবো না। পড়ালেখা না করে আজাদ চাচার মতো দোকান দেবো। না দোকান দেবো না, শহরে চলে যাবো। আবার ভাবছি শহরে গেলে গ্রামকে মিস করবো। এমন সময় পাড়ার সবাই দল বেঁধে স্কুলে যাচ্ছে। আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাদের স্কুলে যাওয়া দেখছি। আঁখি ভয়ে ভয়ে আমার কাছে বলল,
– হাসু ভাই তোর কী হয়েছে। স্কুলে যাবি না। দেখ, আমরা স্কুলে যাচ্ছি। মতি ভাই ভদ্রভাবে স্কুলে যায়। তুই স্কুল মিস করিস কেন? স্কুলের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছি। উঠ, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আয়। আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি। আমি ঠাস করে আঁখির গালে চড় বসে দিলাম। বললাম,
– তোকে পন্ডিতি করতে কে বলছে। তুই পন্ডিত হবি, মতি পন্ডিত হবে, তাই তোরা স্কুলে যা। আমি যাবো না। আঁখি মাথা নিচু করে নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল।
সারাদিন এলোমেলোভাবে গ্রামের ভেতর ঘুরে বেড়ালাম। নদীর ধারে বসে থাকলাম অনেকক্ষণ সময় ধরে। সন্ধ্যায় বাড়ির উঠানে এসে ঘরে ঢুকতে লজ্জা লাগছে। কি আর করি অনেক ভেবে আজাদ চাচার ঘরে ঢুকলাম। চাচি এসে বলল- হাসু, তুই সারাদিন কোথায় ছিলি বাবা। এখনো বাড়ি আসিসনি, সবাই চিন্তা করছে।
পড়া থেকে উঠে এসে আঁখি চাচিকে বলছে- মা, হাসু ভাই জেঠার ওপর রাগ করে কিছু খায়নি।
চাচি বলল, আয় বাবা হাত মুখ ধোয়ে ভাত খাবি। বাবার ওপর রাগ করতে নেই। উঠে আয় বাপ। চাচিকে বললাম, আপনি যান আমি আসছি।
আঁখির ওপর রাগ হচ্ছে, চাচিকে নিশ্চয় বলে দিয়েছে বাবা আমাকে পিটিয়েছে। আমি ওর চুলের মুঠি ধরে ঘুষি দিতে লাগলাম। কেন তুই চাচিকে বলেছিস। আঁখি চিৎকার দিয়ে উঠল, ওমা আমাকে বাঁচাও হাসু আমাকে মেরে ফেলল।
চিৎকার শুনে মা-বুবু-চাচি দৌড়ে এসে আমার হাত থেকে আঁখিকে বাঁচায়। মা আমাকে কয়টা চড় বসে দিল। বুবুও রাগারাগি করল-তুই আঁখিকে এভাবে আর মারবি না। ও তোকে কী করছে। পড়ালেখা নেই, স্কুলে যাওয়া নেই। অন্য মানুষকে মেরে বাহাদুর হয়ে গেছে।
আমি খেয়ে শুয়ে আছি। ঘুম ধরছে না। কি সব এলোমেলো চিন্তা করছি। বুবু মনে করছে আমি ঘুমিয়ে আছি। আমার শিয়রে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে, আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমার খুব খারাপ লাগছে। আমি চোখ মেলে বুবুর গলা ধরে বলছি- বুবু তুই আর কাঁদিস না। বুবু বলল- বাবা আজ সারাদিন কিছু খায়নি। মা খায়নি। আমি বললাম, তুই খাছিস। বলার সাথেই বুবু আমার মাথা বুকে জড়িয়ে ধরে বলছে- লক্ষ্মী ভাই, তোকে ছাড়া কেমন করে খাবো বল। তুই যে আমার একমাত্র ভাই। আসার সোনা ভাই।
তুই এমন হলি কেন। তোকে নিয়ে বাবা-মার অনেক স্বপ্ন, তুই আমাদের সব। আমারও স্বপ্ন তুই একদিন বড় মানুষ হবি। অনেক সুনাম অর্জন করবি। আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবি।
সকালে বাবার গলার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো। বাবা মাকে বলছে, ওকে দিয়ে কিছু হবে না। তোমার ছেলে মুখ রাখবে না। গতকাল বিকেলে নিয়ামুল মাস্টার চায়ের দোকানে গুণধর ছেলের গুণকীর্তন করলেন। গত মাসে স্কুলে গেছে মাত্র দুই দিন। আবার সেই দুই দিনেই মারামারি। ওকে স্কুল থেকে বের করে দিবে ভাবছে। আজ স্কুলে মিটিং আছে। আমি কোন মুখ নিয়ে যাবো।
মা বিভিন্ন্ অজুহাতে বাবাকে থামানোর চেষ্টা করছে।
বিছানা থেকে উঠে বুবুর ঘরে গিয়ে দেখি বই হাতে বুবু কাঁদছে। আমি সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বললাম- বুবু আমি স্কুলে যাবো। তুই শুধু আমাকে পড়াবি। বুবু বুকে জড়িয়ে নিয়ে অনেক আদর করল।
আজ স্কুলে যাবো। রেডি হচ্ছি। আবার লজ্জাও লাগছে। বুবু পরিপাটি করে সাজিয়ে দিল। রাস্তায় বের হতেই দেখি আঁখি মতি রাবেয়া স্কুলে যাচ্ছে। আঁখি আমাকে দেখে দৌড়ে এসে বলছে- হাসু ভাই তুই স্কুলে যাচ্ছিস। আমি ওর পিঠে কিল বসিয়ে বললাম- আমাকে ডাকিসনি কেন পেঁচিমুখী। আনন্দে আঁখির চোখের কোনা ভিজে উঠল। আঁখি আমার হাত ধরে বলছে- হাসু ভাই তুই আরো মার, যা ইচ্ছে বল, আমি কিছুই বলব না। প্রতিদিন তোর সাথে স্কুলে যাবো। খুব খুশি লাগছে। চল তাড়াতাড়ি যাই।
ক্লাসরুমে এসে প্রথম সারিতে বসতেই সবাই কি যেন বলাবলি করছে আর আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হয় আমি যেন চিড়িয়াখানার জন্তু।
ক্লাস শেষে নিয়ামুল স্যার বললেন- জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার জন্য বিশেষ ক্লাস হবে। কে কে পরীক্ষা দেবে খাতায় নাম লেখাও। ফার্স্ট বয় মতি, দ্বিতীয় শবনম, তৃতীয় আরিফসহ পনেরোজন নাম লেখালো। স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বলছেন- আর কে আছো আজ শেষ দিন। এই তালিকা বোর্ডে পাঠিয়ে দিতে হবে।
দাঁড়িয়ে বললাম, স্যার আমি বৃত্তি পরীক্ষা দেবো। খুশিতে স্যারের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ভাবতে লাগলাম স্যার আমাকে এতো ভালোবাসেন। আমার জেদ চেপে গেলো আমাকে বৃত্তি পেতে হবেই।
সন্ধ্যায় পড়তে বসে বুবুকে বললাম- বুবু আমি বৃত্তি পরীক্ষা দেবো খাতায় নাম দিয়েছি। বুবু জড়িয়ে ধরে চুমু দিয়ে বলল-আমার বিশ্বাস তুই বৃত্তি পাবি।
মনোযোগী ছাত্র হয়ে পড়া শুরু করছি। বাবা আজ আনন্দে আত্মহারা। বাবা প্রাইভেট শিক্ষক দিতে চাইলেন। আমি না করে দিয়েছি। বললাম, আমি শুধু বুবুর কাছে পড়ব।
আজ পড়তে বসতেই মনের ভেতর জেগে উঠছে পুরনো দিনের কথা। ক্রিকেট খেলার কথা। সন্ধ্যা হলেই ছুটে যেতাম নদীতে মাছ ধরতে। পড়তে বসলেই মনে পড়ে, জোসনা রাতে পুরনো বাঁধের ধারে যমুনার কোলা নদীতে মতি, আঁখি আর আমি কত মাছ ধরেছি। মাঝে মাঝে চাচাও যেত। ভাবছি আর ভাবছি। বুবুর কলমের খোঁচায় সম্বিত ফিরে পেলাম। বুবু আমার ভাব বুঝতে পেরে শুধু বলল- লক্ষ্মী ভাই আমার পরশু থেকে তোর বৃত্তি পরীক্ষা।
বৃত্তি পরীক্ষা শেষ। হাতে অনেক সময়। বুবু কিছু বই দিলো। বলল- এই বইগুলো শেষ কর আরো দেবো। পথের পাঁচালি দিয়ে শুরু করলাম। বই পড়ার প্রতি একটি নেশা তৈরি হলো। মাঝে মাঝে আঁখি এসে বলে- হাসু ভাই তোর পরীক্ষা শেষ। চল না খেলতে যাই। তোকে ছাড়া খেলা যে আর জমে না। আবার বলে আজ মাছ ধরতে যাবি। আমি বলি, পিটন পাচ্ছিস না তো তাই ভালো লাগে না, তাই না। আঁখি বলে- এখন আমি বড় হয়েছি। তুই আর মারতে পারবি না। আমি বলি, আহারে বটগাছ হয়ে গেছিস। তুই কি বুবুর মতো বড় হয়েছিস। বুবুকে আমি এখনো মারি।
খেলার জন্য আমার মনটাও ছটফট করছিলো। হারিয়ে গেলাম খেলার রাজ্যে।
আজ বিকেলে বাবা খুশিতে বাড়ি মাথায় তোললেন। অনেকদিন পড় বাবার আনন্দমাখা মুখ দেখতে পেলাম। বাবা বলছেন- আমাদের হাসু ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। অন্য তিনজন সাধারণ গ্রেডে। বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন। কিছুক্ষণ পর আমার মাথা গরম পানিতে ভিজে গেলো। এ যে বাবার আনন্দ অশ্রু। বাবা বললেন,
– হাসু, তুই কি চাস তাই দেবো তোকে।
বাব সাইকেল কিনে দিতে চাইলেন। না করলাম। আমি কিছুই চাইলাম না। শুধু বললাম- কোনো একদিন চেয়ে নেবো। এদিকে বুবু মা খুশি। বুবু আমার টিচার তাই ওর ভাব বেড়ে গেল। বাড়ির সবাইকে বাবা নিজ হাতে মিষ্টি বিতরণ করতে গেলেন।
বুবু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। প্রথম বর্ষে বুবু হলে সিট না পাওয়ায় বাবা রাজশাহীতে বাসা ঠিক করলেন। বাবা, মা ও বুবুকে নিয়ে রাজশাহীতে চলে গেলেন। আমার জেদ আর চাচার অনুরোধে কয়েক দিনের জন্য রেখে গেলেন।
আজ সকালে বাবা আমাকে নিতে এসেছেন। চোখের পলকে সপ্তাহ চলে গেল- মাছ ধরে, ক্রিকেট খেলে আর হৈ হুল্লোড় করে। বিকেলে বারান্দায় বসে আছি। আঁখি চুপিসারে এসে বলছে,
– হাসু ভাই তুই আজই চলে যাবি। আমার ভালো লাগছে না। তুই ওখানে থাকতে পারবি। বড় আব্বা বললেন, তোকে রাজশাহীতে ভালো স্কুলে ভর্তি করে দিবে। তোকে খুব মিস করব হাসু ভাই। বললাম তুই অনেক বড় হবি। আমি দূর থেকে তোকে দেখব, আমার হাসু ভাই সাহেব হয়েছে।
আঁখির চোখের পাতা পানিতে ভিজে উঠল। সেই পানি আনন্দ না বেদনার বুঝতে পারলাম না।
চলে আসার সময় আঁখিকে দেখতে পেলাম না। মনের ভেতর এক অজানা ব্যথা চিন চিন করছে। চোখ খোঁজে আঁখিকে। কিন্তু ওকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। চাচা চাচিসহ বাড়ির সবাই আমাকে এগিয়ে দিতে রাস্তায় এসেছে। শুধু আঁখি নেই। ওর ওপর রাগ হচ্ছে। কাউকে বলতেও পারছি না আঁখি কোথায়।
যাওয়ার সময় ওকে দেখতে না পাওয়ার দুঃখ নিয়ে পথ হাঁটছি। বাড়ি থেকে অল্প কিছু দূর হেঁটে যেতে হয়। তারপর সিএনজিতে উঠে সোজা বগুড়া। তারপর রাজশাহী।
আঁখি সিএনজি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে। আমার হাতে একটি বাটি দিয়ে বলল- হাসু ভাই রাতে পায়েস খাইনি। তোর জন্য রেখে দিয়েছি। তুই খুব পছন্দ করিছ। সময় করে খেয়ে নিস।
– হাসু ভাই, তুই আবার কবে আসবি।
আমি কোন কথা বলতে পারলাম না।
বাবা আঁখির মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন- ভালো করে পড়ালেখা করবি। নিয়মিত স্কুলে যাবি। নিয়ামুল মাস্টারকে বলে দিয়েছি তোর প্রাইভেটের বেতন দেয়া লাগবে না। আমি এসে এসে দিয়ে যাবো।
সিএনজি ছেড়ে দিলো। আঁখি উদাসীন মনে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হয় আমার বুকের পাঁজরের ওপর দিয়ে সিএনজি ছুটে চলছে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরাজিত উপন্যাস পড়ে বুবুকে বলছি, অপু একটা অসাধারণ চরিত্র। বুবু টিপনি কেটে বলল- উপন্যাস পড় ভালো। আবার নায়ক হতে চাস না।
– আমাদের অপুর নায়িকা কেমন আছে।
– অপুর নায়িকারা দুঃখীরে বুবু।
বুবু মুখ টিপে হেসে বলছে, ঐ নায়িকার কথা বলিনি। নব্য অপুর নায়িকার কথা বলছি। আমি বললাম সে কে রে বুবু? বুবু তখন স্বাভাবিক হয়ে বলল- বাড়ির কথা মনে পড়ে না তোর।
– মনে পড়ে। খুব মনে পড়ে। অনেক দিন হলো বাড়িতে যাওয়া হয় না। মতি আঁখি রাবেয়া, মাছ ধরা, ক্রিকেট খেলা আরো অনেক কিছু মনে পড়ে। এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে যাবো। বুবু বলল,
জানিস হাসু, আঁখি আর স্কুলে যায় না। মতি স্কুলের পাশে বই-খাতা কলমের দোকান দিয়েছে। রাবেয়ার বিয়ে হয়েছে।
– তোকে কে বলল বুবু?
বাবা গতকাল বাড়িতে গিয়েছিল। বাবা চাচা চাচীকে বলে এসেছে, আঁখিকে বিয়ে দিতে যা টাকা লাগবে বাবা দিবে। চাচী বাবাকে বলছে, আঁখি বিয়ের কথা শুনতে চায় না। ও বিয়ে করবে না।
– আঁখি আমার কথা কি বলছে?
বুবু আর কথা না বলে চলে গেল।
এইচএসসি পরীক্ষা শেষ। হাতে সময় আছে। অনেক দিন বাড়ি যাওয়া হয় না। বুবুকে বললাম- বাড়ি যাবো, ঠিক দুই দিন পরে চলে আসব। তোকে কথা দিলাম। বাবার থেকে অনুমতি নিয়ে দে। বুবু আশা দিল।
বিকেলে বুবুর ক্যাম্পাসে ঘুরতে গেলাম। সাবাস বাংলাদেশ ভাস্কর্যের পাশ দিয়ে হাঁটছি। আনমনে হেঁটে হেঁটে সোজা কেন্দ্রীয় মসজিদের পশ্চিম পাশে চলে এলাম। বড় ভাইয়ারা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে, মজা করছে। জীবনকে কতই না উপভোগ করছে তারা। আমি ভাবছি ফেলে আসা গ্রাম, আঁখি, রাবেয়া, মতি, মাছ ধরা, ক্রিকেট খেলা আর অতীতের দুরন্তপনা দিনগুলো।
রাতে বুবু বলল, তোর বাড়িতে যাওয়া পাস হয়েছে। শোনেই মন আনন্দে নেচে উঠল। আমি ছটফট করছি রাত কখন ভোর হবে। ছোট রাত আজ এতো বড় হয়েছে যে শেষ হতেই চাচ্ছে না। বুবু বলছে,
– কিরে আমার নায়ক ভাই কার জন্য ছটফট করছিস। বললাম তোর বর ঠিক করার জন্য ছটফট করছি।
সকাল সকাল রওনা হলাম। বুবু এক ব্যাগ ভর্তি আঁখির জন্য কি যেন দিল। আম আর লিচুর খাঁচি। সাথে বাবা মিষ্টিও কিনে দিলেন। আমার পকেট খরচ ছাড়াও কিছু টাকা দিলেন চাচাকে দেয়ার জন্য। বাস না ছাড়া পর্যন্ত বাবা দাঁড়িয়ে রইলেন। মনে হয় তাকে ছেড়ে এক জীবনের জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছি। বাবা শুধু বললেন, নদীতে গোসল করবি না।
বাস ছুটে চলছে সাঁ সাঁ করে। জানালা দিয়ে দেখছি সবুজে ঘেরা বাংলার অপরূপ। দ্রুত অতিক্রম করেছি মাঠের পর মাঠ, গ্রামের পর গ্রাম। তবুও মনে হচ্ছে বাস আস্তে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বাস থেকে নেমে উড়াল দিয়ে বাড়িতে যাই।
বাড়ির কাছে আসতেই আঁখি দৌড়ে এলো। আমার কাছে আসতেই থেমে গেল।
– হাসু ভাই তুই এলি। জানি তুই না এসে পারবি না। কেমন আছিস হাসু ভাই? বাড়ির কথা তোর মনে পড়ে।
আঁখি কথা বলছে আর ফিক ফিক করে হাসছে। এই চার বছরে আঁখির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এক সঙ্গে হাঁটছি অথচ ওর হাত ধরতে সাহস হচ্ছে না। ওর সাথে আগের মতো কথাও বলতে পারছি না। আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো খুশি হয়েছে আঁখি। তিড়িং বিড়িং করে আগে আগে হেঁটে চলছে। কথা বলার সুযোগ না দিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করছে, তোর স্কুল কেমন, স্যারেরা কেমন, বন্ধু কয়টা, ওখানে মাছ ধরা যায় কি না, এখনো কি রোদের মধ্যে ক্রিকেট খেলি কি না। শেষে একটি বাক্য বলেই আঁখি থেমে গেল। সে বলল- নতুন ফুলের ভিড়ে আমি বাসি ফুল হয়ে গেছি, আমাকে তোর আর মনে পড়ে না, ঠিক বলছি না হাসু ভাই।
চাচী ছুটে এলেন। বাড়ির সবাই এলো। যেন আমি বিদেশ থেকে এলাম। দুপুর থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালাম। বারান্দায় বসে আছে রাবেয়া, মতি আর আঁখি। রাবেয়ার কথা শুনে ভালো লাগলো। রাবেয়া আগের মতো সুন্দরী নেই। ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। পেটে বাচ্চা। স্বামী অনেক ভালো।
জোসনা রাত। মতি এসে বলতে বড়শি নিয়ে বাড়ির পেছনে খোলাঘাটের ব্রিজে গেলাম মাছ ধরতে গেলাম। অনেক রাত হয়ে গেল মাছ ধরতে পারছি না। মতি অধৈর্য হয়ে চলে গেল। আমি আনমনে বড়শি পেতে বসে আছি। আঁখি ডাকছে,
– হাসু ভাই রাত অনেক হলো ঘুমাবি না।
– এখানে ভালো লাগছে।
আঁখি আমার পাশে এসে বসল।
– হাসু ভাই একটা মাছও ধরতে পারিসনি।
– আমাকে না হয় ভুলে গেছিস কিন্তু মাছ ধরতেও ভুলে গেছিস।
– আমি ওর গালে থাপ্পড় দিতে গিয়ে থেমে গেলাম।
– কে বলছে তোকে ভুলে গেছি। তোকে সারাদিন, সারাক্ষণ, সারাটি সময় মনে পড়ে। কিন্তু আমি আসতে পারি না। বুবু তোকে নিয়ে আমার সাথে মজা করে। আমি কিছুই বলতে পারি না। তুই স্কুল ছেড়ে দিয়েছিস শুনে অনেক খারাপ লাগছে।
আঁখি আমার পিঠে পিঠ রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ওর মনে হয়তো অনেক ঝড় বয়ে চলছে। আমি ওর চোখের পানি মুছে দিতেই আঁখি বলল- হাসু ভাই, মা বাবা আমাকে বিয়ে দিতে চাচ্ছে।
আমি বললাম আজ না হোক কাল তোকে বিয়ে করতেই হবে। রাজি হয়ে যা। ও অবাক করা নয়নে বলল- হাসু ভাই তুইও এই কথা বললি।
সময়গুলো দ্রুত কেটে গেল। রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা দেবো। আঁখিকে ঠিকানা দিয়ে বললাম। তুই আমাকে চিঠি লিখবি। অন্তত লিখবে- হাসু ভাই আমি ভালো আছি। এই কথা লিখলেই আমি শান্তি পাবো। তুই ভালো থাকলেই আমার ভালো থাকা।
আমি রওনা হলাম। সাথে মতি। আঁখি বাড়ির পাশে তিনমাথা মোড়ে আমগাছের নিচে উদাস মনে দাঁড়িয়ে রইল। ওর মুখ শুকনো। চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে পানি পড়ছে। কান্না থামাতে গিয়ে মাঝে মাঝে ওর ঠোঁট জোড়া কেঁপে কেঁপে উঠছে। বার বার পেছনে তাকাই আর পথ চলি। আঁখিকে আজ বিনোদিনীর মতো লাগছে।
মতির কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম। মতি ক্ষোভের সাথে বলছে,
– পড়ালেখা শিখলে মানুষ ভালো অভিনেতা হয়। তাই না হাসু?
– কে বলল তোকে, পড়ালেখা শিখলে অভিনেতা হয়।
– তোকে দেখেই তো বুঝা যায়। তুই খুব ভালো অভিনয় করতে জানিস। রাজশাহী যাওয়ার পর আঁখিকে ভুলে গেলি। এসে আবার তার সাথে ভালো অভিনয় করলি। কি দরকার ছিল এসব টালবাহনা করার। জানিস তুই- আঁখি তোকে কত ভালোবাসে। তুই যাওয়ার পর থেকে প্রত্যেকদিন তিনমাথার আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে তুই আসবি বলে। ও বিয়ে করতে রাজি হয় না। হয়তো তোর জন্য অপেক্ষা করে আছে।
সমাজ বলে একটা কথা আছে ও একা সমাজের সাথে কতই যুদ্ধ করবে। হয়তো তোর জন্য সব অপবাদ সয়ে যাচ্ছে নীরবে। আঁখি সত্যই ভালো মেয়ে।
মতির কথা শুনছি আর চুপ করে হাঁটছি। আঁখি আমাকে কতো ভালোবাসে তা আমার চেয়ে কেউ বেশি জানে না। সিএনজি স্ট্যান্ডে এসে মতিকে অনুরোধ করলাম- ভাই আঁখির লেখা চিঠি পোস্ট করে দিস।
সন্ধ্যের পরেই রাজশাহীতে পৌঁছিলাম। বাসায় ঢোকার আগেই শুনতে পেলাম। আমাকে নিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মা বুবুকে আচ্ছা করে বকছে। মা বলছে- না করেছিলাম। ওর বাড়িতে যাওয়া হবে না। তুই বাপকে বুঝিয়ে অনুমতি নিয়ে পাঠিয়ে দিলি। আজ বিকেলে ফেরার কথা, কই এলো? মা বাবাকে বলছে যেভাবে হোক দ্রুত আঁখিকে বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা কর। ঐ পোড়ামুখী হাসুর ঘাড়ে উঠে বসে আছে।
রুমে ঢোকলাম। কিছুই না শোনার ভান করে বুবুকে বললাম, চলে এসেছি, তোকে দেয়া কথা রেখেছি বুবু। রাতে জানতে পারলাম বুবুর বিয়ে আগামী শনিবারে। ছেলে ব্যাংকার। বুবুর গলা ধরে আজ অনেক কাঁদলাম। বুবুার জন্য আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। বুবুর জন্য আজ মানুষ হতে পারছি। বুকের ভেতর কেমন যন শূন্যতা লাগছে। বুবুর বিয়ের পর ঢাকায় ফিরে এলাম।
দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস শেষ। ল্যাব ওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে। রসায়নের যে এতো রস আগে জানতাম না। মজার একটা সাবজেক্ট। বেশি ইনজয় করা যায় ল্যাবরেটরিতে। কিছুদিন পর ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা। পড়ার চাপ বেশি। তাছাড়াও আমার একটা টার্গেট আছে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হতে হবে। স্কলারশিপ পেতে হবে।
আজ আঁখিকে খুব মনে পড়ছে। টেবিল থেকে উঠে খাটে শুয়ে আঁখির কথা ভাবছি। প্রতিদিন সকালে বিকালে ডাক বাক্স খুলি আঁখির চিঠির জন্য কিন্তু পাই না। ওর জন্য দুশ্চিন্তা হয়। মেয়েটা অভিমানী। কি যে করছে। চোখে ভেসে উঠছে আঁখির কারুময় মুখ। মোহময় হাসি। ভুবনজুড়ানো চোখ। দুর্দান্ত চাহনী, তাতে কী যে মায়া। চঞ্চল পরিপাটি সাধারণ একটি মেয়ে। কী অসাধারণ যোগ্যতা। সে যোগ্যতা শুধু আমি জানি।
বাসরঘরে আঁখি বউ সেজে বসে আছে। ধীর পায়ে হাঁটি হাঁটি করে আঁখির সামনে গিয়ে বসি। আঁখি বলছে- হাসু ভাই আমাকে কী বলে ডাকবি।
– তোকে, তুই করে ডাকবো।
– আমি কী করে ডাকবো।
– আপনি করে ডাকবি।
– আপনি করে ডাকতে পারবো না। কী আমার সাহেব এসে গেছে আপনি ডাকতে হবে। আমি তুই করেই ডাকবো।
আমি ওর গালে চড় দিতেই হাত খাটের রেলিংয়ের সাথে লেগে ব্যথায় চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠি।
আজ বিকেলে আমার নামে হলুদ খামের চিঠি দেখে চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো খুশিতে মন নেচে উঠল। পোস্ট অফিসের সিল দেখে বুঝতে পেলাম গ্রামের বাড়ির চিঠি। খাম খুলতে ধরে না খুলে রুমের দিকে রওনা দিলাম। দৌড়াতে পারছি না হেঁটে যেতেও দেরি হচ্ছে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড থর থর করে কাঁপছে। আনন্দে কথা বলতে পারছি না। গা ঘেমে যাচ্ছে। লিফটের জন্য অপেক্ষা না করে হেঁটে চারতলায় উঠলাম। দরজা বন্ধ করে খাম খুলে কাগজখানা বের করে মেলে ধরতেই চোখে পড়ল একটি বাক্য- হাসু ভাই আমি ভালো আছি। যদি কোনদিন আমাকে মনে পড়ে চলে আসিস রাধাকান্তপুর গ্রামে। দেখে যাস স্বামীর ঘরে কেমন আছি।
আমি আকাশ থেকে পড়ে গেলাম। হৃৎপিণ্ড ডিপ ডিপ করে কাঁপছে। এই মুহূর্তে পৃথিবী ভেঙে পড়ল আমার ওপর। হ