সাংঘাতিক রকমের পাগলা সৌরবর্ষে বাস আমাদের সভ্যতার। স্যাপিয়েন্স, হোমোস্যাপিয়েন্স-এর সাত আট মিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ফল এই সভ্যতা। যেকোনো সময় তার ধ্বংস ঘটতে পারে। ছিটকে পড়া গ্রহাণু বা উল্কার সঙ্গে সংঘর্ষে, ছড়িয়ে পড়া সৌরচ্ছটায় না হয় প্রচন্ড শক্তিসম্পন্ন গামারশ্মির বিস্ফোরণ, সুপার নোভার বিস্ফোরণ কিংবা কোন নক্ষত্রের প্রবল আত্মনাশে যদি এ পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে পড়ে তবে আমাদের যে পরিণতি হবে তা হবে ডাইনোসরের পরিণতির চেয়েও ভয়াবহ।
উপরোল্লেখিত ভাবনা থেকে মানবজাতি তাদের পরবর্তী উপনিবেশ খুঁজছে। বিজ্ঞানীরা মঙ্গলগ্রহে মানুষকে পাঠিয়ে সভ্যতাকে স্থানান্তর করার চেষ্টারত। এমন এক ভাবনায় এবং মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামকে উপজীব্য করে কবি ও ঔপন্যাসিক সাযযাদ কাদির লিখেছেন বিজ্ঞান চিন্তার উপন্যাস ‘অনেক বছর ধরে’। বহুমাত্রিক লেখক হলেও সাযযাদ কাদির মূলত কবি। তার বিজ্ঞান নিরীক্ষার সাথে কবির কল্পনা যুক্ত হয়ে জন্ম নিয়েছে মনসাল রাজ্য। যুদ্ধ ও শান্তি দু’টি পারস্পরিক বিপরীত শব্দ। যুদ্ধ বিরোধীরাই শান্তিবাদী। এই শান্তিবাদী আন্দোলনের যুদ্ধবিরোধী কিছু মানুষ ও বিজ্ঞান গবেষকরা একটি নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করেছেন মনসাল নামে। উত্তর ও মধ্য গোলার্ধের মাঝামাঝি কোন এক এলাকায় তার অবস্থান। সময়কাল ২২২২ খ্রিষ্টীয় সাল।
পৃথিবীর উৎপত্তি ও মানবপ্রাণীর জীবন যাত্রার রহস্য নিয়ে ভাবনার শেষ নেই। মহা বিস্ফোরণের ফল এই বিশ্ব যারা বলেন, তাদের ভাবনায় মানুষও বিবর্তনের ফসল। কিন্তু একটি সম্প্রদায় মানুষকে পরিযায়ী প্রাণী ভাবতে চান। তাদের কথা অন্যগ্রহ থেকে এসেছে মানুষ। এখান থেকেও অন্যত্র নিরাপদ বাস খুঁজে চলেছে তারা। নাগিব মাহফুজের একেশ্বরবাদী চিন্তার উপন্যাস ‘আখেন আটেন’ কিংবা সিগমুল ফ্রয়েডের ‘মুজেস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, একেশ্বরবাদী সূর্য উপাসকদের থেকে মুসার আবির্ভাব উত্তরাধিকারসূত্রে। একেশ্বরবাদী মুসা থেকে মুহাম্মদ প্রবর্তিত ওয়াহদানিয়াত হচ্ছে এ ধারাবাহিকতায় ধর্মবিশ্বাস।
আরেক দল মানুষ যারা বিবর্তনতত্ত্বে বিশ্বাস করেন, তাদের ভাবনায় মানুষ এসেছে ‘অবমানুষ’ বা এপস থেকে। দ্বিতীয় ধাপে প্রাইমেট নামে এক পরিবার থেকে এপস, মানব, লেমুর, মানুষ ইত্যাদির জন্মতত্ত্ব খোঁজেন আরেক দল নৃবিজ্ঞানী। প্রাইমেট ছিল স্তন্যপায়ী ও মেরুদণ্ডী প্রাণী। অপর নৃবিজ্ঞানীদের মতে, প্রাক মানব পুরুষদের মধ্য থেকে ক্রমবিকাশের ধারায় মানুষের উদ্ভব ঘটেছে। তারপর হোমোস্যাপিয়েন্স বা বিচক্ষণ মানুষের ধারায় আমাদের আবির্ভাবকে স্বীকৃতি দিয়েছে বিজ্ঞান। আবার ধর্মানুসারীরা মেসোপটেমিয় সভ্যতার আবরাহাম বা ইবরাহিম থেকে ধর্মতত্ত্বকে গ্রহণ করেছেন। আদম-হাওয়া তত্ত্ব তারই পরবর্তী সংস্করণ।
পৃথিবীর ভবিষ্যৎ রক্ষা এবং মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই বিজ্ঞানেরই অবদান। ভূমিকম্পে ধূলিসাৎ হবে না বরফ গলে পৃথিবী ডুবে যাবে, ছিটকে পড়া গ্রহাণু, উল্কা পিন্ডের সংঘর্ষ, সৌরচ্ছটা না গামারশ্মির বিস্ফোরণ নক্ষত্রের প্রবল আত্মনাস না সুপারনোভার বিস্ফোরণ কিংবা জাতিতে জাতিতে, দেশে-দেশে মহাযুদ্ধ বা বিশ্বযুদ্ধ বেধে গিয়ে সম্ভাব্য ধ্বংসোন্মুখ এ বিশ্বকে রক্ষার লড়াইয়ের চেয়ে বড় লড়াই আর নেই। লালমুখ মঙ্গলগ্রহে বসবাসের জন্য মানুষকে পাঠানোর চেষ্টা বিজ্ঞানের। রহস্যময় মঙ্গলগ্রহে অভিবাসী হবে আগামী দিনের মানুষ। আদম-হাওয়া তত্ত্বে-পৃথিবীতে আসার আগে মানুষ স্বর্গে ছিল। নাগিব মাহফুজ কিংবা সিগমূল ফ্রয়েডের সাহিত্য তত্ত্বে মানুষ যে অন্যগ্রহ থেকে এসেছে এবং আবার অন্যত্র যাবার চেষ্টাও করছে- সে কাহিনীই কবি-ঔপন্যাসিক সাযযাদ কাদিরের ‘অনেক বছর পরে’র বিষয় আঙ্গিক। এটাকে বিজ্ঞান সাহিত্য তত্ত্ব বললে বিজ্ঞান আবিষ্কার তত্ত্বের সাথে কিছু পার্থক্য থেকে যায়। তবুও সাহিত্যধারায় বাংলাসাহিত্যে এ গ্রন্থ দুর্লভ রচনা ও অমরত্ব লাভের মত অভাবনীয় সৃষ্টি। এ চিন্তায় ও শিল্পরসে এমন গ্রন্থের কথা আমার জানা নেই।
অনেক বছর পরের সময়কাল ২২২২, সে কথা আগেই বলেছি। দেশের নাম মনসাল সেটাও বলা হয়েছে। তবে মজার ব্যাপার সেখানকার ভাষাবাংলা এবং একই বানান রীতিতে তা লেখা হয়। লিঙ্গভেদ নেই একটি শব্দেও। অন্যান্যদের ভাষাভাষীদের জন্য সাবটাইটেল ব্যবহার হয় টিভি ট্রেইলারে। এ বিষয়টি কবি সাযযাদ কাদির সন্নিবেশ করে আমাদের ভাষার মাহাত্ম্য এবং পাশাপাশি বানান-রীতির বিশৃঙ্খল অবস্থার কথাকেই জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন। যথাযথ প্রচার পেলে এ উপন্যাসটি তাঁকে বাংলাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান লেখক হবার যৌক্তিকতাকেই প্রমাণিত করবে।
উপন্যাস পাঠ থেকে জানা যায়, বিজ্ঞানীরা ভাবছেন পৃথিবী আরো ১৫ হাজার বছর আয়ু পাবে। কিন্তু পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে তা পাঁচ হাজার বছর পূর্বেই বিস্ফোরিত হয়ে বাড়তে পারে। মনসাল রাজ্যের উদ্যোগ পৃথিবীকে বাসযোগ্য রেখে পাশাপাশি অন্যগ্রহে মানুষের উপনিবেশ গড়ে তোলা। কিন্তু চেনা অচেনা নারী-পুরুষ এক সাথে মিশেছে এখানে। ভূগর্ভস্থ ২২টি জনপদে তাদের বাস। অন্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদন ব্যবস্থা রয়েছে নানা জাতির নর-নারীর জন্য। উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীদের মধ্যে মিকো, লোপেজ, লিমা, মেরি, আনা, গিনি, ওলে, আমাদু, সাতো, গুহ, অমবা, পল, মায়া পেই, রিও, লিব, জিরা ভিন্ন ভিন্ন কাজের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ব্যস্ত। তাদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যককে অন্যত্র পাঠানোর জন্য নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মুখোমুখি করা হচ্ছে। তারাই উপন্যাসের সমাপ্তির দিকে একত্রিত হবে।
মিকো দু’নম্বর জনপদের গ্যাস দপ্তরে কাজ করেন। দপ্তরের লোপেজ এই দপ্তরের প্রধান। দু’শ কর্মী একটু একটু করে গ্যাস নিষ্কাশন করে আবহাওয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলেছেন। হিমালয়, আলপস ও আনদিজ এলাকা থেকে সংগৃহীত গ-১ নামীয় গাছের চারা লাগিয়ে ছোট ছোট বাগান করে গ্রিন হাউজ অ্যাফেক্ট ঠেকানোর চেষ্টা করে চলেছে তারা। তার হাত ঘড়িতে তিনটি বোতাম। টিভি, মোবাইল, সময় সবই এক জায়গাতে। রক্তের গ্রুপ বিরল প্রজাতি। তাঁর নিজের রক্তের গ্রুপ মিলে গেলে তার সাথে যৌন সংসর্গ হলে ফলদায়ক হবে। তার নজর গুহের দিকে। ফলমূল জনপদের দপ্তরে সে কাজ করে। প্রথম দিকে এক সন্তান উৎপাদন বাধ্যতামূলক ছিল মনসালে। ফলে সন্তান জন্ম দিয়ে একবার সঙ্গী বিচ্ছেদ ঘটে গেলে আর সন্তান নেয়ার সুযোগ ছিল না তাদের। তবে যৌন সংসর্গ তৈরিতে বাধা ছিল না। তবে সম্প্রতি দু’সন্তান উৎপাদনকে সিদ্ধ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জলের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যাবে বলে এতদিন জনসংখ্যা সীমিত রাখার ইচ্ছা ছিল তাদের। সে রাজ্যে নারীদের অনেকেই পুরুষদেরকেই ভোগের সামগ্রী ভাবে। আনা ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের স্বাদ নেয়। তাই সে আবার কাউকে স্থায়ী সঙ্গী হিসাবে গ্রহণ করতে নারাজ।
তবে সঙ্গীকে বিয়ে করে সন্তান উৎপাদন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে নিয়ন্ত্রকদের কাছে ফ্ল্যাটের আবেদন করতে হবে। ফ্ল্যাট পাওয়া গেলে সঙ্গী নিয়ে বসবাস করা যাবে এবং একই সাথে সন্তান উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে পারবে। এর বাইরে মদ্যপানের জন্য বারে যাওয়া ও যৌন মিলনে কোন বাধা নেই। এটা সময়, সুযোগ ও সম্মতি থেকে সম্পাদিত হবে।
গবাদিপশুর গোবরে মিথেন চিহ্নিত হয়েছে। যা বৈশ্বিক উষ্ণতা ও আবহাওয়ার ক্ষতিতে ভূমিকা রাখে বলে প্রমাণিত। তার নিয়ন্ত্রণ করতে বিজ্ঞানীরা গলদর্ঘম। জনপদের ফলমূল দপ্তরে গুহর কাজ। সাতো গুহকে অসামাজিক বলে। আর গুহরই এক সঙ্গিনী অমবা। সাতো তাকে পুরুষ খেকোভাবে।
কর্মজীবনের শুরুতে সাতো পেইকে সঙ্গী করেছিল। পেই উজ্জ্বল কিন্তু সাতোর রয়েছে যৌনশৈত্য। একটি সন্তান আছে তাদের। তারা কেউই প্রথম আইনে দ্বিতীয় সন্তান নেবার অযোগ্য। তবে আইন পরিবর্তনের পরে তা নিতে পারবে। রিও সাতোর সাথে সঙ্গী হতে চায়। কিন্তু সন্তানও তার চাই। তাই সাতোর সাথে জুটি হচ্ছে না রিত্ত’ও।
আনা স্থায়ী সঙ্গী চায় না। সে ভিন্ন ভিন্ন পুরুষে আরো কিছুদিন মজা নিতে চায়। আমাদুর হাত দু’টি বড় অসঙ্গত। সে অমবাকেও নিষ্পেষণ করেছে। জিরার অনেক সঙ্গী থাকার পরও তার আগ্রহে গুহ তার সাথে মিলিত হয় এবং কৌমার্য হারায়। তখন গুহের বয়স ছিল ২৫। অমবার সাথে এখন স্থায়ী জুটি গুহর। তিনি স্থায়ী জুটি হিসেবে জীবন শুরুর পর নিশ্চিত হন সাবালকত্ব অর্জনের পর অমবা নিঃসঙ্গ ছিল না। এখনো কারো সাথে অমবার সম্পর্ক বিশ্বাস না করলেও বুরকা নামক এক যুবকের সাথে তার রোমান্টিক কথাবার্তার রেকর্ড হাতে পেয়েছে গুহ। বুড়ো ওলে মদ্যপ অবস্থায় অমবার জামার ভেতর হাত ঢুকিয়ে পেষণ করলেও তার কুমতলব নেই বলে নিশ্চিত করে গুহকে অমবা। গুহ মনে মনে অমবাহকে জীবন থেকে সরিয়ে দিতে চান।
সিরিনিদি নামে এক নতুন জনপদে সবাইকে জড়ো করা হচ্ছে। ২নং জনপদ থেকে এসেছে ৮৮ জন। তাদের মধ্যে ৬৮ জনই মেয়ে। ২৫ থেকে ৫৫ তাদের বয়সসীমা। নতুন জনপদে মিকোর রক্তের গ্রুপের সাথে অন্যের রক্তের গ্রুপ মিলিয়ে নতুন রক্তের গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে। বিরল প্রজাতির গ্রুপ মিকোর। তাই সম্ভাব্য বিপদ কাটিয়ে ওঠার জন্য নতুন গ্রুপের তৈরির এ চেষ্টা চলছে।
এখানে সকলেরই শরীরকে নতুন করে গড়ে তোলার কাজ চলছে। নানা অস্ত্রোপচার চলছে। অস্থি মজ্জা ও চামড়ায় চলছে এ অস্ত্রোপচার। আইথ নামক নতুন জনপদের উপযোগী করা হচ্ছে তাদের শরীরকে। যে ভূ-ভাগ থেকে প্রতিদিন ১ ঘন্টা ২ ঘন্টা ও ৩ ঘন্টা করে তাদের ভূগর্ভস্থ একটি স্থানে খালি গায়ে বসবাস করানো হচ্ছে। যেখানে তারা যাবে সেখানে জামা কাপড় পরতে পারবে না কেউই। অন্যান্য কোটি কোটি প্রাণীর মত মানবজাতি যাতে ধ্বংস না হয়ে পড়ে সে লক্ষ্যেই এমন ব্যবস্থা নিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।
নিরাভরন দেহকে লজ্জার নয়, সম্পদ হিসাবে দেখানো হচ্ছে। উদোম থাকাকে গর্বের বোঝানো হচ্ছে। কৃত্রিম উপায়ে প্রকৃতি তৈরি করা হচ্ছে। ফুলে ফলে ভরা গাছ, বনবনানী। লতা-পাতার বুকে বাতায়নের ঢেউ। দূরে দূরে সবুজ প্রান্তর। তারপর হ্রদ। উঁচু পর্বতমালায় পর্বতমালায় বরফের টুপি। উপত্যকা থেকে মাতোয়ারা হয়ে বরফের ঝরনাধারা নেমে এসেছে নিচে।
কি মনোরম প্রকৃতি। আহ্! কিন্তু সবই যে কৃত্রিম, প্রাণহীন, যন্ত্রচালিত। সময়ের সাথে সাথে বদলে যাচ্ছে সবকিছু। ঘনঘন বদলে যায় সবকিছু। ফুলফোটে আবার ঝরে পড়ে। ফল পাকে। টুপ করে পড়ে যায়। বরফ জমে আবার গলে যায়। ঋতু পরিবর্তন ঘটছে আবহাওয়ায়। সবই যন্ত্র ব্যবস্থাপনায়।
আলাপচারিতায় তারা বলে ‘প্রাচীন পৃথিবী’। খুব ভাল লাগে তাদের। স্মৃতির প্রাচীন পৃথিবী আজ শুধুই অতীত। মানুষের জন্য, মানুষের ক্ষুধা ও লোভের জন্য পৃথিবীর আজ এই দশা। এটা ভেবে তারা ক্রোধান্নিতও হয়।
পৃথিবীর গরিব মানুষেরা ছিল ক্ষুধার্ত আর ধনীরা ছিল লোভী। কঠিন ফিলসফি ঔপন্যাসিকের। ক্ষুধার জন্য একদল মানুষ পৃথিবীকে তছনছ করেছে। অন্যদল করেছে লোভের বশে। যদি পৃথিবী থেকে বৈষম্য তখন দূর করা যেতো তবে প্রাচীন পৃথিবীর আজ এই দশা হতো না। মাতাল হয়ে লিব বলে দেয় মনের ভেতর জমা থাকা জ্ঞান। এখানেও ফিলসফি বেরিয়ে পড়ে ঔপন্যাসিকের। মাতাল হয়ে যাওয়ার পর মানুষের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে আরেকটা মানুষ। সেই মানুষটা হয় তার স্বপ্নের, কল্পনার মানুষ। কখনও নিজেরই এক অতীত হয়ে যায় যেন ও। ‘পশ্চিম থেকে হাইপারসনিক পাখি আসছে’- বলে লিব। পশ্চিমের সমরপ্রভু সুতাং। তার লোভ পড়েছে এই জনপদের দিকে। মনসাল থেকে বিজ্ঞানী ও নারীদের সে অপহরণ করে নিয়ে যেতে চায়। জমবুর দক্ষিণের সমর প্রভু। সুতাং চায় মনসাল’র রিসাইক্লিং প্রযুক্তি। গ্যাসমুক্ত করণ, খাদ্যশস্য উৎপাদন ও শোধন পদ্ধতিকে সে আয়ত্ত করতে চায়। দক্ষিণের সমর প্রভু জমবুর। সে চায় নারী। তার দেশে নারী সংকট। ১ নারীকে ৫-৬ পুরুষের যৌনভার বহন করতে হয়।
আগেই বলা হয়েছে, যে গ্রহের উপযোগী করে মিকোদের তৈরি করা হচ্ছে তার নাম আইথ গ্রহ। আবহাওয়া ক্ষেত্রে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে আইথের আদলেই। আইথের আদলে আবহাওয়া প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রের পরিবেশও তৈরি করা হয়েছে। এই পৃথিবী টিকবে না বলেই আগেবাগে এত উদ্যোগ। এদিকে আদিন নামক আবহাওয়া স্টেশন নিয়ে নানা জল্পনা চলছে।
লিবের কণ্ঠে এখানে সাহিত্য বিজ্ঞানের যে কঠিন ফিলসফি আমরা জানতে পারি, তা হচ্ছে- পৃথিবীতে ৩-৪ শ’ কোটি প্রজাতির প্রাণী ছিল। এখনও টিকে আছে কয়েক লাখ প্রজাতির প্রাণী। ওরা কেউ মানুষের মত নয়। ওরা প্রাকৃতিক আর মানুষ অপ্রাকৃত। মানুষ এসেছে অন্য গ্রহ থেকে। এ পৃথিবী মানুষের পিতৃপুরুষের নয়। মানুষ পরিযায়ী প্রাণী। এসেছে আবার অন্যত্র চলে যাবার তারা চেষ্টাও করছে।
একইভাবে অন্য প্রাণীর সাথে মানুষের মিল নেই। মানুষ পোশাক পরে। ওরা পোশাক পরে না। যুদ্ধ করে না ওরা। আমরা যুদ্ধ করি। খুন ধর্ষণেও ওরা অভ্যস্ত নয়। এটাও আমাদের কাজ। ওরা কেবল খায় আর সঙ্গম করে। মিকোকে লিব বলে আজ আমরা দু’জন তাই করবো। তাতে মিকো বিগলিত হয়। উন্মুখ হয় সঙ্গম সুখের জন্য। জিরার সাথে গুহর সাক্ষাৎ হয়। ওরাও মিলন উন্মুখ হয়। সে খুলে গিয়ে উদ্ধত হয় গুহের সামনে। মেলে ধরে নিজেকে রূপযৌবন সমেত।
জিরা বলে- প্রতিটি চাওয়ার মধ্যে তার পাওয়া থাকে। প্রতিটি পাওয়ার মধ্যে থাকে চাওয়া। গুহ বলে- প্রতিটি পাওয়ার পর হাহাকার জাগে বেশি। কি বাস্তব জীবন দর্শন? জ্বলন্ত রোমান্স। একটি বিজ্ঞান উপন্যাস কত পাঠ্যরসে ভরপুর থাকতে পারে ‘অনেক বছর পরে’ উপন্যাসটি না পড়লে তা বোঝা কঠিন ছিল আমার ক্ষেত্রে।
মঙ্গলের রহস্য অনুদঘাটিত থাকা, পৃথিবীর মত শক্তিশালী চুম্বক ক্ষেত্র না হওয়ার ফলে তেজস্ক্রিয়তার পরিণতির কারণে ও রকেট-নভোযান পদ্ধতির যথাযথ উন্নতি না করাতে মঙ্গল কি মানুষের বসবাসের জায়গা হবে এ প্রশ্ন থেকে যায়। তাছাড়া মঙ্গল জীবন উড়ুক্কু ও নিরুদ্ধিষ্ট, মহাশূন্যে ভ্রাম্যমাণ জীবন কি সুখকর হবে। ইত্যাদি নানা প্রশ্ন থেকে আইথ গ্রহকে বেছে নেয়া হয়েছে। আদিম যাত্রায় যদি বিপত্তি দেখা দেয় হবে আইথই ভরসা। আদিম কে বেদখল করে দুষ্ট জাতির জন্ম দেয়ার খবরও রয়েছে মনসার গোয়েন্দাদের কাছে। তাহলে কি মানবজাতি কোথাও যাওয়ার পূর্বেই ধ্বংস হয়ে যাবে। তবে কি তার আগে কোষের বহুমাত্রিক ব্যবহার দ্বারা শক্তিশালী রোবট তৈরি করে মানবজাতিকে পৌঁছিয়ে দিতে হবে অন্যকোন গ্রহে। তাতে কি মানবজাতির ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষা পাবে? না পেলে এর জের টেনে লাভ কি?
না এ ছায়াপথে কিংবা অন্যকোন ছায়াপথে মানবজাতি পৌঁছে যাবে। কিভাবেই বা যাবে? এমন অনেক আশা নিরাশা, হতাশা ও সম্ভাবনার এক অপূর্ব সম্মিলন বাংলাসাহিত্যের দুর্লভগ্রন্থ ‘অনেক বছর পরে’। হ