সার্বজনীন নজরুল
নজরুল চর্চায় বিশেষ সংযোজন
আহমদ বাসির
গত একদশকে তিনজন বিদগ্ধ নজরুল বিশেষজ্ঞকে হারিয়েছি আমরা। শাহাবুদ্দীন আহমদ (ইন্তেকাল-২০০৭), আবদুল মান্নান সৈয়দ (ইন্তেকাল-২০১০) ও মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ’র (ইন্তেকাল-২০১৩) মতো ব্যক্তিত্বের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশে নজরুল চর্চার অবস্থাটা অনুধাবনযোগ্য। নজরুলচর্চায় এদের মতো বহুমাত্রিক প্রতিভাদীপ্ত ব্যক্তিত্বের অভাবটাই সবার আগে প্রকট হয়ে দেখা দেয়। এ কাজে এরা ছিলেন দায়বদ্ধ, প্রতিশ্রুত। আমৃত্যু এদের জীবনের অন্যতম কর্ম ছিল নজরুলচর্চা। সৃজনশীল প্রতিভার বিরাট অংশ তারা ব্যয় করেছেন নজরুলসাধনায়,নজরুলকে অন্বেষণ করেছেন তার সমগ্রতায় এবং তা উন্মোচন করেছেন শক্তিশালী কলমের মাধ্যমে। এদের অনুপস্থিতি প্রকট হয়ে ধরা দেয়ার কারণ একটাই; আর এটি হচ্ছে নজরুলচর্চায় এদের মতো প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন সৃজনশীল প্রতিভার অভাব। ফলে নজরুল গবেষক রয়েছেন অনেক কিন্তু নজরুল বিশেষজ্ঞ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কেননা, নজরুল বিশেষজ্ঞ হওয়ার মানে নজরুলকে তার সমগ্রতায় অনুধাবন করার যোগ্যতা অর্জন করা।
আমাদের প্রয়োজন সত্যিকার কিছু নজরুল বিশেষজ্ঞ। কবি আবদুল হাই শিকদার সম্পাাদিত নজরুল বিষয়ক আলোচ্য বই ‘সার্বজনীন নজরুল’। ‘সার্বজনীন নজরুল’ প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৭০২। বৃহদাকারের এই গ্রন্থ সম্পাদনার কাজ যে যেনতেন কাজ নয় তা গ্রন্থের আকার-আকৃতি থেকে প্রথমেই অনুমান করা যায়। গ্রন্থটি সম্পাদকের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও কর্মসাধনের ফসল বলেও মনে করা যায়।
কবি আবদুল কাদির, কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ও কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো আবদুল হাই শিকদারও একজন মৌলিক কবি। পূর্বসূরি কবিদের মতোই তিনিও নিজেকে নিরন্তর নজরুল সাধনায় নিয়োজিত রেখেছেন, নিজস্ব কাব্যচর্চার পাশাপাশি। পূর্বসূরিদের মতোই জেনে, বুঝে, সিদ্ধান্ত নিয়ে তার এই নজরুলসাধনা। তার নজরুল যাত্রা তিনি শুরু করেছেন একেবারে চুরুলিয়া থেকে। লিখেছেন ‘কবিতার্থ চুরুলিয়া’। তারপর একে একে ‘তোমার চরণ স্মরণ চিহ্ন’, ‘বাংলাদেশে নজরুল চর্চা : মুখোশ ও বাস্তবতা’, ‘নজরুল রচনায় পলাশী ট্রাজেডি’, ‘নজরুল রচনায় মোহররম’, ‘চিত্রকলায় নজরুল’ এবং ‘কামাল পাশা : ইন দ্য আইজ অব কাজী নজরুল ইসলাম’সহ বেশকিছু গ্রন্থ। এছাড়াও বাংলাদেশ টেলিভিশনের কথামালা অনুষ্ঠানের জন্য কবিকে নিয়ে নির্মাণ করেছেন বেশকয়েকটি তথ্যচিত্র। নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক থাকাকালে বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি, ‘কুমিল্লায় নজরুল’, ‘চট্টগ্রামে নজরুল’ ও ‘ত্রিশালে নজরুল’ নামে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেন তিনি। তার নজরুল বিষয়ক কাজ শুধুমাত্র লেখালেখি, গবেষণা কিংবা তথ্যচিত্র নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তিনি এ বিষয়ে তার নানাবিধ কর্মকান্ডের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেনÑ তিনি সর্বাত্মক একটি নজরুল আন্দোলন গড়ে তুলতে তৎপর। ‘সার্বজনীন নজরুল’ বইয়ের প্রথম ফ্ল্যাপে একেবারে শুরুর কয়েকটি বাক্য এরকম- ‘কবি আবদুল হাই শিকদারের নজরুলচর্চা নিতান্তই প্রাণের দায়ে। এই প্রাণের জন্য যেমন চাই আলো, বাতাস, পানি ও খাদ্য তেমনি চাই কাজী নজরুল ইসলামকে। নজরুলকে
বাদ দিয়ে বাংলাদেশ অসম্পূর্ণ এবং উত্থানরোহিত।’ কথাগুলো বইটির প্রকাশকের নাকি অন্য করো, নাকি কবি আবদুল হাই শিকদারের নিজেরই তা অবশ্য জানা যায় না। কিন্তু এ কথাগুলোই শিকদারের নজরুল সাধনার পরিচয় ও মূল্যায়ন আমাদের নিকট তুলে ধরে। ফলে তিনি যে একটি নজরুল আন্দোলন তৈরি করতে চান তা স্পষ্ট হয়ে যায়। আর এ আন্দোলনের প্রয়োজনেই এই গ্রন্থ দুটি তাকে সম্পাদনা করতে হয়েছে বলে আমাদের মনে হতে পারে।
‘সার্বজনীন নজরুল’ বইয়ের মূলঅধ্যায় তেরটি, সঙ্গে চারটি পরিশিষ্ট অধ্যায় সংযোজিত। প্রথম অধ্যায়ে ‘আমার নজরুল’ শিরোনামে সম্পাদক আবদুল হাই শিকদারের পাঁচটি রচনার সমাবেশ ঘটেছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘৯০-এ বিদ্রোহী’ শিরোনামে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নিয়ে তিনজন লেখকের তিনটি লেখা রয়েছে। ‘অতীত দিনের স্মৃতি’ অধ্যায়ে এগারো জন লেখকের লেখা আছে, যেগুলো অধিকাংশই নজরুল স্মৃতিকথা, কিছু লেখা নজরুলের রচনা বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ক স্মৃতিকথা। ‘তোমার চরণ স্মরণ চিহ্ন’ অধ্যায়ে আছে নয়জন লেখকের নজরুল স্মৃতিবিজড়িত স্থান নিয়ে লেখা। ‘খেলাধূলা’ অধ্যায়ে আছে দুটি বিশেষ লেখা। ‘চির উন্নত মম শির’ অধ্যায়ে আছে ২০১০ ও ২০১১ সালে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত কুড়িটি বিশেষ কলাম। এই কুড়িটি লেখা কুড়িজন লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, নজরুল গবেষক ও সঙ্গীতশিল্পীদের। ‘সঙ্গীত’ অধ্যায়ে আছে সাতটি লেখা। ‘কেন নজরুল চর্চা করি’ অধ্যায়ে আছে পনেরজন নজরুল গবেষকের লেখা। এ অধ্যায়ে আছে একটি বিশেষ প্রতিবেদনও। এ সম্পর্কে সম্পাদক তার প্রবেশকে জানিয়েছেন ‘কেন নজরুল চর্চা করি’ কবির ৯০তম জন্মদিন উপলক্ষে বুকলেট আকারে প্রকাশ করেছিল চুরুলিয়ার নজরুল একাডেমি।’ এ অধ্যায়ে ওই বুকলেটের লেখাগুলোই সংযোজিত হয়েছে। পরবর্তী অধ্যায়ে সংকলিত হয়েছে ১৯৯৯ সালের ১২ জুন কলকতার দেশ পত্রিকার নজরুলসংখ্যায় প্রকাশিত নয়টি লেখা। পরের অধ্যায়ে সংকলিত হয়েছে কলকাতার ‘কাফেলা’ পত্রিকাহ নজরুলসংখ্যা। পরবর্তী অধ্যায়ে সংকলিত হয়েছে বাংলাদেশের অধুনালুপ্ত ‘মাসিক সম্ভার’ পত্রিকার ‘বিদ্রোহী বিহঙ্গ’ শিরোনামের নজরুলসংখ্যায় প্রকাশিত সাতটি লেখা ও নজরুলের একটি অভিভাষণ। পরের অধ্যায়ের শিরোনাম ‘বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যসূচী: আমার দেশের নজরুল’। এ অধ্যায়ে সম্পাদকের নিজের একটি লেখাসহ মোট চারটি লেখার সমাবেশ ঘটেছে। সর্বশেষ অধ্যায়ে ‘কোন কূলে আজ ভিড়লো তরী’ শিরোনামে দশজন লেখক গবেষকের দশটি লেখা সংকলিত হয়েছে। এ অধ্যায়ের সবগুলো লেখা ২০০৭ সালের ২৫ মে দৈনিক আমার দেশ- এর সাপ্তহিক সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘সাতকাহন’-এর বিশেষসংখ্যায় প্রকাশিত।
পরিশিষ্ট-ক-এ সংযোজিত হয়েছে তিনটি লেখা, পরিশিষ্ট-খ-এ দু’টি পাঠ প্রতিক্রিয়া, পরিশিষ্ট-গ-এ সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন ধরনের পঁচিশটি নজরুল বিষয়ক প্রতিবেদনের সঙ্গে কবি নাতনী খিলখিল কাজীর একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার এবং ‘পরিশিষ্ট-ঘ’ এ নজরুলের জীবনপঞ্জি ও গ্রন্থপঞ্জি।
দেখা যাচ্ছে, বিপুল বৈচিত্র্যের সমাবেশ ঘটেছে এ বইটিতে। বুকলেট, মাসিক পত্রিকার বিশেষসংখ্যা, সাপ্তাহিক পত্রিকার বিশেষসংখ্যা, দৈনিক পত্রিকার বিশেষ সাহিত্য ম্যাগাজিন সংখ্যা বিভিন্নভাবে পরিকল্পিত ও বিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত হলেও এ গ্রন্থে এসে এক মলাটের ভিতর স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে। এতসব গুরুত্বপূর্ণ ও বিচ্ছিন্ন বিষয়কে এক সুতোয় গেঁথে প্রকাশ করা যে অতি জরুরী ছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। গবেষক ও অনুসন্ধানী পাঠকদের জন্য এতসব জিনিস একসঙ্গে পাওয়ার উত্তম উপায় ছিলো এমন একটি বই। সবমিলিয়ে বলা যেতে পাওে, বইটি নজরুল বিষয়ক একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ আর্কাইভ। এই আর্কাইভটি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে যে কেউ নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারেন এবং নজরুলচর্চাকে আরও বেগবান ও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারেন।
সম্পাদনা কর্ম পরিশ্রমসাধ্য ও অনুসন্ধানী কাজ। আলোচ্য বই দু’টি সেই পরিশ্রম ও অনুসন্ধানেরই ফসল। সম্পাদনা কর্ম জটিল এবং স্পর্শকাতরও । তাছাড়া প্রতিটি সম্পাদনা কর্মেরই একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গী থাকে। আবদুল হাই শিকদার ‘সার্বজনীন নজরুল’ বইটি সম্পাদনে যে দৃষ্টিভঙ্গীর আশ্রয় নিয়েছেন তার প্রকৃতি উদারনৈতিক। ফলে সাধারণ ও নির্দিষ্ট কোন দৃষ্টিভঙ্গীকে সামনে রেখে নয়, বরং প্রয়োজনের তাগিদে বইটি সম্পাদিত হয়েছে।
বাংলাদেশে নজরুলচর্চার এই ক্রান্তিলগ্নে কবি আবদুল হাই শিকদার যে নজরুলচর্চা অব্যাহত রেখেছেন, তার জন্য তাকে অভিনন্দন জানানোর দায়িত্ব রয়েছে পাঠকদের। নজরুলচর্চা যখন নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন তখন তিনি এ কাজে নিরলস। নজরুলের সত্যিকার সৈনিক না হলে নজরুলচর্চাকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। নজরুলচর্চা মানে আমাদের জাতীয় উন্নতি ও প্রগতির চর্চা, নজরুল চর্চা মানে আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আত্মিক উন্নতির চর্চা। এই চর্চা রুদ্ধ হয়ে যাওয়া মানে আমাদের প্রগতির পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়া, আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তির চেতনা দুর্বল হয়ে যাওয়া। এই গভীর অনুভবই আবদুল হাই শিকদারকে তার কাজে নিরলস রেখেছে বলে অনুধাবন করতে পারি। আলোচ্য বইটি সেই নিরলস প্রচেষ্টার ফসল। নজরুল চর্চাকে বেগবান করতে, নজরুল আন্দোলন গড়ে তুলতে বইটি প্রভাবক হিসেবে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা রাখছি। অবিরাম নজরুলচর্চা ও গবেষণার ভিতর দিয়ে বের হয়ে আসবে সত্যিকার নজরুল বিশেষজ্ঞ। নজরুলের আদর্শ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলার এই একটাই পথ।
জীবনের খোঁজ : জল ও জমিনে
প্রেমে মানবিকতায় দীপ্ত কাব্য
আবুল কাইয়ুম
কবির কাছে সাধারণ পাঠকদের আকাক্সক্ষা হলো, মাটি ও মানুষে নমিত হোক কবিতা, ইতিবাচক জীবনচেতনায় জারিত হোক কবিতা। কবিতায় পাঠক খুঁজে পাক নিজেকে, নিজের অনুভূতিগুলোর সমান্তরাল বয়ে যাক কাব্যপ্রবাহ। শুধু কী তাই? কবিতার মাঝেকার চিত্র-শ্রুতিকল্প অর্থময়তাকে ছাপিয়ে অন্তরে এক অনির্বচনীয় আবেশ ছড়িয়ে দিক। এসব ভালো লাগা ও সহানুভূতিকে জাগায় বলেই অধিকাংশ পাঠক জীবনঘনিষ্ঠ কবিতাকে তার পাঠ্য করে নেয়। আমাদের সৌভাগ্য যে, পাঠকদের এই চাহিদাকে আমল দিয়ে কবিতাচর্চায় ব্যাপৃত কবির সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। এই আলোকিত কবিদের সারিতে সাম্প্রতিককালে আর একজন কবিকে পেলাম, তার নাম অর্ণব আশিক। ষাটোর্ধ্ব এই কবি সারা জীবনের কাব্যসাধনার তুমুল প্রস্তুতি নিয়ে তার জীবনবাদী কাব্যদর্শনের প্রথম ফুলটি ফোটালেন ২০১৪ সালে, ‘ধূপগন্ধময় এই জীবন’ কাব্য প্রকাশের মাধ্যমে। বিলম্বে আগত এই অতিসংস্কৃত কবির দ্বিতীয় কাব্য ‘উজানি গাঙে নিঃসঙ্গ নোঙর’ (২০১৫)-এ ইতিবাচক জীবন, গ্রামীণ নিসর্গ ও নদীমাতৃক স্বদেশের আখ্যান নির্মিত হয়েছে। আর সেই উজ্জ্বল কাব্যবোধের ধারায় অবস্থান নিয়েই তিনি প্রকাশ করলেন ‘জীবনের খোঁজ : জল ও জমিনে’ (২০১৭) কাব্যটি, যা আমাদের আজকের আলোচ্য।
‘জীবনের খোঁজ : জল ও জমিনে’ কাব্যটিতে কবির প্রেম ও সামাজিক চেতনা নানাভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। জীবনবোধ, দেশপ্রেম ও যুগযন্ত্রণা থেকে উদ্ভূত কবির বিভিন্ন অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে এ কাব্যের কিছু কবিতায়। তার সব চৈতন্যই বাংলার অমল প্রকৃতিকে আশেষ করে এক অতুলনীয় নান্দনিক কাব্যপ্রবাহ সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতির রূপ-সুষমা ও বিশালতায় আস্তীর্ণ করে প্রিয় নারীর প্রতিমূর্তি অঙ্কনে সিদ্ধ এই কবি। আর সেই প্রতিমূর্তি কবির হৃদয়ে বিশ্বের তাবৎ নারীর স্বরূপে আবির্ভূত হয়েছে। সে তার কাছে ধরা দিয়েছে মহিমময়ী ও সর্বাত্মক প্রেমিকার আদলে। কবির উচ্চারণ-
আলাদা আলাদা আলাদা সব
তুমিই জমিন তুমিই আকাশ
তুমিই দরজা তুমিই ঘর
বাহির ও ভিতর তুমিই সব।
(‘তুমিই সব’)
অন্তরে লালিত এই মহীয়সী প্রেমিকার অপরূপ রূপেরও সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন কবি। তাঁর ভাষায়-
এ নয় তোমার শরীর তুমিই শরীর
বেপরোয়া জোছনা ভেঙে পড়ে সেথায়
গোপন সিন্দুকে ধরে আছে রূপ
টেরি কেটে দাঁড়ানো নারী তুমি
এক স্বপ্নের কৌমুদী ভোর।
(‘জলরঙে আঁকা মুখ’)
আবার কখনো দেখি, প্রিয়তমা পতœীর সন্নিধানে স্বপ্নাচ্ছন্ন্ ও সংসারবিবাগী কবি পারিবারিক সংসারধর্মের ঘূর্ণাবর্ত থেকে ছিটকে পড়েছেন। তবু দাম্পত্যের মাঝে যে স্বাভাবিক প্রেম থাকে তার সবই সেখানে আছে। দু’টি কবিতায় (‘স্বপ্ন ও সংসার’, ‘বিলম্বিত লয়’) প্রেমের এই স্বরূপ অনুভূত হলেও কবির অধিকাংশ প্রেমের কবিতায় তাঁর সেই মনোলীনা এক অসামান্যা দয়িতারই অবস্থান। এসব জায়গায় কবির বোধে নিসর্গ ও পৃথিবী ধরা দিয়েছে মহত্তর প্রেমের পটচিত্র হয়ে। প্রেমের এই বিশালতা গন্ডি ছাড়িয়ে সমগ্রের মাঝে মিশে গেছে। প্রেমের আনন্দ-বেদনা ও স্মৃতি সুন্দরভাবে কাব্যরূপ পেয়েছে। যেমন-
পাপড়িগুলি পড়ে আছে স্মৃতির মতো
ঝরাপাতার মিতালি দুঃখের সাথে
একদা তোমার বাগান জুড়ে ফুল ছিল
আমার বাগান জুড়ে তুমি আছো আজ।
(‘আমার বাগান জুড়ে তুমি আছো’)
কবির আরো কিছু প্রেমের কবিতায় এমনি সুখস্মৃতির সাথে একটি সূক্ষ্ম বেদনার প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়। যেমনি হারানো সময় নিয়ে তাঁর চিত্তের আনন্দ প্রকাশ পায়, তেমনি হারাবার কষ্টও তাকে ছুঁয়ে যায়-
তুমি নেই
স্মৃতি যেন কাঞ্জিভরম শাড়ির আঁচল,
বার বার খসে পড়ে,
নেশাগ্রস্তের মতো রাত জাগা হৃদয়ে উতরোল কথা কয়,
কবিতার পর কবিতা শোনায়, বিরহী পথ চাওয়ায়
খোঁজে স্মরণীয় মায়াবী সন্ধ্যালগন এবং
তোমার উড়ন্ত আগমন।
(‘এরই নাম প্রেম’)
এভাবে প্রেমের আনন্দ-বেদনা, প্রেমের জন্য নানা আকুলি-বিকুলি, প্রেমস্মৃতি- এ সবেরই স্বপ্নময় কাব্যিক প্রকাশ লক্ষ্য করি কাব্যটিতে। তাঁর প্রেমের কবিতাগুলো পাঠে স্পষ্টই মনে হবে- তিনি মুখ্যত একজন স্বাপ্নিক কবি। কিন্তু তাঁর কবিতার জীবনবাদী প্রান্তটি একেবারে উল্টো। তখন তিনি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ বা যুগযন্ত্রণার নির্মমতায় বিদগ্ধ এক বৌদ্ধিক কবি। আমরা কাব্যটির কিছু কিছু কবিতায় জগৎ ও জীবনের দুঃখক্লেশে বিমর্ষ কবির তীব্র অনুভূতিগুলো লক্ষ্য করি। তিনি কবিতা নিয়ে ফটোগ্রাফি করেননি বলেই (যা তিনি ব্যক্তিগত জীবনে করেন) দুর্দশার প্রেক্ষিতকে বেদনার্ত হৃদয়ানুভূতি সহকারে প্রকাশ করেছেন। সমকালীন হত্যা ও নৃশংসতার বিপরীতে তার উচ্চারণ-
প্রতিবাদী হলে সব যাবে, শিয়রে মৃত্যুর খটখট
ঘাতক সময় যেন তুষারাবৃত গিরি-সংকট
মসৃণ এই জীবন হায় হলো খড় কুটো
রাতের আঁধার ক্রসফায়ার বুকটা হয় ফুটো।
হাওয়ায় কঠিন গন্ধ ভাসছে মানুষের লাশ
মরছে সত্যকথন অসহায় আজ সমস্ত সমাজ।
(‘ঘাতক সময়’)
‘মানবতার ক্ষরণ’ শীর্ষক কবিতায় কবি এই হন্তারক সময়ে মানবতার পরাজয়ের দুর্দান্ত এক ছবি এঁকেছেন। মাতৃহারা বোধে কবি বলে ওঠেন, “সেদিন কেঁদেছিলাম মা নেই বলে/ আজ কাঁদি মা, মানবতা নেই বলে”। একই কবিতায় কবি দৈশিক পরিমন্ডলে মৃত্যুর ফাঁদে নিপতিত সকল মানবাত্মার জন্যই আর্তি ছড়িয়েছেন। তিনি বলে ওঠেন-
মা আকাশটা আজ কাঁদছে,
নির্বাচনে মানুষ মরছে, উড়াল সেতু ধসে মানুষ মরছে,
তনুরা মরছে ধর্ষকের সহিংসতায়, প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন ছায়ায়
কবি স্বদেশকে বড় ভালোবাসেন, স্বদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার অবিচল শ্রদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধকালীন উন্মাতাল দিনগুলোয় বাঙালির বিপুল রক্তক্ষরণ ও প্রতিরোধ-যুদ্ধকে, সেই কান্না ও স্বাধীনতা অর্জনের আনন্দকে তুলে ধরেছেন কবি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার পরম শ্রদ্ধার্ঘ লক্ষ্য করি যথাক্রমে ‘১৭ই মার্চ’ ও ‘জনকের ছবি’ শীর্ষক দুটো কবিতায়। শেষোক্ত কবিতায় কবি লেখেন-
প্রতি সন্ধ্যায় আমার ক্রোধ ও দ্রোহের পাশে
জনক তোমাকে দেখি, ৭ই মার্চের মহাকাব্যের বাণী শুনি
আর তোমার সমাধিকে দেখি প্রজ্বলিত মশালের আলোয়
তোমার জীবন ও সংগ্রামের আয়াস সৃজন অনুভব করি
তোমাকে জানার আকাশ ইচ্ছেগুলো নতুন করে জন্ম হয়।
কবি অর্ণব আশিক এ কাব্যের আরো কিছু কবিতায় বিভিন্নভাবে ইতিবাচক মানবিকতায় স্নাত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা খন্ডচিত্র ও বোধের পরিচয় পাওয়া যাবে তার কয়েকটি কবিতায়। বাংলা ভাষা ও মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা, নারী জাগরণ, গ্রামীণ মানুষের জীবন ও সঙ্কট, নাগরিক জীবনের দুরবস্থা প্রভৃতি বিষয়েও তিনি লেখনী ধারণ করেছেন।
‘জীবনের খোঁজ : জল ও জমিনে’ কাব্যটিতে গ্রামবাংলা ও গ্রামীণ নিসর্গ চিত্রায়ণের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। গ্রামীণ জীবন-প্রকৃতি কবি-অন্তরে সেঁটে থেকে পথদ্রষ্টার মতো যেন তার কাব্যবোধকে চালিত করে। গ্রামবাংলা অপরূপ মাধুরীতে ঝরে পড়ে তার কবিতার ভাষায়-
জীবনের খুব কাছে সবুজের ঘাসে, কর্ষিত জমিতে,
নেমে আসে মেঘবতী আকাশ, জল ও কাদা একাকার,
কৃষকের চোখের পাপড়ি চুইয়ে বৃষ্টি ফোঁটা ঝরে
রাখালিয়া বাঁশি বেজে ওঠে লাঙলের ফালে;
ভেজা পাখি করে ওড়াউড়ি নিবিড় মেঘের সাথে,
ঠোঁটে নেয় জলকণা, ধূলিকণা, খাদ্য তার।
(‘গ্রামীণ সম্পর্ক’)
কবির পূর্ববর্তী কাব্য ‘উজানি গাঙে নিঃসঙ্গ নোঙর’-এ নদীর প্রাধান্য ছিল, আর আলোচ্য ‘জীবনের খোঁজ : জল ও জমিনে’ কাব্যটিতে বৃষ্টির। এখানে বৃষ্টি কখনো হয়েছে বেদনার প্রতীক, কখনো বা প্রেমকে শুদ্ধস্নানে পুণ্য করার ধারা কিংবা জীবনের সর্বময় সত্তায় বেজে ওঠা মধুর সঙ্গীত। তার কবিতার চিত্রকল্পগুলো গভীর অন্তর থেকে উঠে আসা এমন ছবি যাতে রয়েছে অন্তরেরই পুরো ছাপ। হৃদয় থেকে উৎসারিত এসব ছবিই তার কবিতাগুলোর অধিকাংশ এলাকাজুড়ে। চিত্রকল্পগুলো খুব তরতাজা, স্বাদু, দৃষ্টিনন্দন। তিনি সমসাময়িক জীবন ও পরিপার্শ্ব থেকে তুলে এনেছেন কবিতার নানা অনুষঙ্গ, তার সাথে যুক্ত হয়েছে এসব নিসর্গাশ্রয়ী চিত্রকল্প। তিনি যেমন দেখেছেন তেমনই এঁকেছেন। পরাবাস্তবতা, বিমূর্ততা বা অবাস্তবতার খেলায় মজেননি তিনি। তার নান্দনিক চিত্রকল্পমালা থেকে কিছু উদাহরণ তুলে আনছি-
১. তুমি যে জোছনার খেলা, জোনাকির মিট মিটি/ জমে আছো চিরল পাতা, পুষ্পিত এক খনি
২. বুকের লবণ হ্রদে হাতড়ে বেড়ায় যে হাত/ প্রেমে-অপ্রেমে কুড়ায় সে রাত্তিরের সোহাগ
৩. কবিতার বোধিবৃক্ষ নিভে গেছে আশ্বিনের রাতে/ বাংলা কবিতায় আজ নিভৃত অশ্রর অনুভব
৪. কুয়াশায় ধোঁয়াশায় দুলছে সুবর্ণলতা কুসুমপুরের আর্শ্চয সকাল
৫. ভরা স্রোত কুমারী মেয়ের মতো সমুদ্রে দেয় দোলা
অর্ণব আশিকের শব্দ-বিশেষণ প্রয়োগ ও বাণীবন্ধ নির্মাণের রীতি একান্তই তার নিজস্ব। কাব্যটির প্রতিটি কবিতার ভাষা বিশুদ্ধ ও সুগঠিত। তার ভাষায় কোনো চটুকে ভাব বা প্রদর্শনশীল চমক নেই, প্রেক্ষাপটের উল্টোপাল্টা বাঁক-মোড় নেই। তিনি সর্বদাই প্রসঙ্গের ভেতরে থাকেন। প্রতিটি কবিতাই স্বচ্ছন্দে প্রবহমান, কোথাও কোনো স্থবিরতাও দৃষ্ট হয় না। তাঁর ভাবনাগুলো একনাগাড়ে ভাষায় গড়িয়ে চলে, থমকে দাঁড়ায় না কোথাও। নেই কোনো জোড়াতালি। আর পরিচিত শব্দভান্ডার থেকেই চয়ন করেন তার কাব্যোপযোগী শব্দ। তদুপরি, চিন্তার জট পাকিয়ে কাব্যভাষাকে বোধাতীত করার তাড়নাও তার মাঝে দেখা যায় না। এর ফলে তার কবিতাগুলো হয়ে উঠেছে সাবলীল, সহজবোধ্য ও সুখপাঠ্য। তার প্রতিটি কবিতাই আপন ছন্দের মাধুরী মাখা। তিনি গভীর ভাব প্রয়োগের দ্বারা ভাষাকে দুর্বোধ্য করে তোলেননি। যা তার কল্পনায় ধরা পড়েছে তাকেই তিনি অকপটে তার মতো ভাষায় সরাসরি প্রকাশ করেছেন। অন্য কবিদের থেকে একেবারে আলাদা বৈশিষ্ট্যে ঋদ্ধ তার কবিতাগুলো। আশা করা যায়, কাব্যটি পাঠকের কাছে আদৃত হবে।
আমি কবি রাতের সহোদর
প্রাসঙ্গিক ভাবনা
কামরুল আজাদ
“আমি কবি রাতের সহোদর” চার শব্দের শিরোনামে কবি বান্দা হাফিজের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। সুদৃশ্য মলাটে আবৃত বইটি যেকোনো পাঠককে আকৃষ্ট করতে সাবলম্বী। প্রচ্ছদ থেকেই এর মোহিনী শক্তির শুরু হয়েছে যা শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে সফল হয়েছেন কবি।
রাতের শরীর আঁধারে মোড়ানো। আঁধারের রং কালো। আর কালোকে আমরা ভালো চোখে দেখি না। যদিও মাথার চুলকে কালো রাখার অনন্ত প্রয়াস আমাদের থাকে কিংবা কাজলের রং চিরায়ত কালোই হয়। তবুও কালো রং নিয়ে একটি বিদ্রপাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে আসতে পারি না আমরা। অবশ্য বলতে পারি, অন্য কালো যাই হোক আঁধারের কালো অশুভ। এই কালো আঁধারে যত অশুভ কাজ সংঘটিত হয়। আর যেহেতু রাত কালো আঁধারে ঢাকা থাকে তাই রাতকেও অশুভ জ্ঞান করা অপ্রাসঙ্গিক কিছু নয়। এমন অবস্থাতে কবি রাতের সহোদর হলে তো প্রশ্ন উঠতেই পারে। কবি হবেন সত্যের বাহক, সুন্দরের কথক, শুভ্রতার প্রতীক। কবিরা কালের দিশারি, মানবতার সৈনিক। সমগ্র কবিসত্তা হবে প্রেমের আকর। সেখানে কবিকে রাতের সহোদর হিসেবে বড় বেমানান লাগারই কথা।
রাতকে যে দৃষ্টিতেই অশুভ মনে করা হোক না কেন রাতেও কিন্তু শুভ্রতার কমতি নেই। অর্থাৎ শুভক্ষণ হিসেবে রাতের গুরুত্বও কম নয়।
কবি ও কবিতা সুন্দরের প্রতীক। সুন্দরের সৃষ্টিতেই কবির আনন্দ। রাতের নির্মলতায়, গভীর নিস্তব্ধতায় কবি পবিত্রতার সন্ধান করবেন এমনটাই তো স্বাভাবিক। রাতের সহোদর না হলে রাতকে নিবিড় করে পাওয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে কবির অবস্থান যৌক্তিক। তবে ‘সহোদর’ শব্দটি অবস্থানগত দিক থেকে প্রশ্নসাপেক্ষ। কেননা সমান উদর না হলে সহোদর হওয়া যায় না। এক্ষেত্রে ‘সহচর’ শব্দটি জুতসই হতো বলে আমার মনে হয়। কারণ, ‘রাতের সহোদর’ হওয়া না গেলেও ‘রাতের সহচর’ হতে পারাটা খুবই সম্ভব। তাই গ্রন্থটির নাম ‘আমি কবি রাতের সহচর’ হলে আরও সুন্দর হতো।
প্রথম কবিতাতে কবি আঁধারের পায়ে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন “এস অন্ধকারের পায়ে সমর্পিত হই” শিরোনামে। স্বরবৃত্ত মাত্রায় লেখা এই কবিতাতেই কবি তার পরিচয় তুলে ধরেছেন।
তোমার যখন রাতকে ভীষণ ডর
আমিই কবি; রাতের সহোদর।
আঁধার আমার প্রাণেশ্বরী প্রিয়া
তাহার পায়েই বাইন্ধা রাখি হিয়া।
সারা দুনিয়ায় দিনের সূর্যালোকে এমন কিছু ঘটছে যা আমরা দেখেও দেখতে পাচ্ছি না। আলোতে বোধ হয় কোন ঐন্দ্রজালিক মায়া আছে যা আমাদের দৃষ্টিকে খাটো করে দিচ্ছে। কবি লিখলেন,
আলোর ভেতর সব দূষিত কীটের দল
তোমার আলো প্রাণ হরণের মায়ার কল।
দ্বিতীয় কবিতা “অন্ধকার হিমঘরে প্রায় আঠারো যুগ” একটি গভীর ভাবযুক্ত কবিতা যা গদ্য-ছন্দে লেখা। এখানে কবি অন্ধকার বলতে পরাধীনতার দৃশ্যপট্ এঁকেছেন। প্রায় আঠারো যুগ ধরে এই বাংলা ও বাঙালি জাতি পরাধীন থেকেছে। বাঙালি জাতির সরলতার সুযোগে পশ্চিমারা দখল করেছে এই ভূখন্ড, শোষণ করেছে নিদারুণ অত্যাচারের সাথে। সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে গেছে। এই কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে কবি লিখেছেন,
সরল আমার প্রাচীন পুরুষ, কী উদার ছিলো তাঁর মন-
সেই সুযোগেই সোনালি ফসল কেটে নিয়ে গেছে
লুটেরার দল-কতশত বেজন্মা বজ্জাত;
প্রতি ঘরে ঘরেই লক্ষ্মীর বসবাস-
প্রপিতার বুক যেন সততার বিচরণ ভূমি-
ওরা আমাদের মৌলিকতা লুটে নিয়ে গেছে আর আমাদের দিয়েছে নিছক উচ্ছিষ্ট। তৃতীয় স্তবকে বিষয়টি চমৎকারভাবে বিবৃত হয়েছে,
প্রাণোচ্ছল সূর্যটা লুটে নিয়ে ওরা, জ্বেলেছিল ওদের আকাশে
আমরা মরেছি বিষধর পুষে দুধে-
আমরা বেঁচেছি কী ভয়াল অন্ধকারে….
এই পুস্তকের তৃতীয় কবিতা “অন্ধকারে বাস রোদ্র ভালোবাসি” মিল অমিলের এক যৌথ ব্যঞ্জনা। এখানেও অন্ধকার। অবশ্য অন্ধকারের মাঝে থেকেও রোদের প্রতি ভালোবাসা অকৃত্রিম-
নিষিদ্ধ গলি ছিদ্র করে যাই; আদিম উল্লাসে আমি
আমি নিকষকৃষ্ণের পরতে হাঁটি, তবু প্রচন্ড রোদ্রকামী
এই কবিতায় কবি সমগ্র পৃথিবীকে পর করে রৌদ্রকে আপন করেছেন বেশ নিপুণভাবে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক যে, কবি একই বইতে দ্বৈত অবস্থানে অবস্থান করছেন। শুধু তাই নয়, বইয়ের শিরোনামের মাহাত্ম ধরে রাখার ক্ষেত্রে সক্ষম হতে পারেননি। এ বইতে প্রথম কবিতায় আঁধার যখন প্রাণেশ্বরী প্রিয়া তখন তৃতীয় কবিতায় প্রচন্ড রোদ্রকামী না হলেও পারতেন। আর রৌদ্রকে রোদ্র লেখা কতটা যৌক্তিক সেটিও ভেবে দেখা প্রয়োজন।
“মানকচুর বড়ো পাতাটিকে আমার বাজান মনে হয়” এক ভিন্ন উপমার উপস্থিতিতে সহজ সরল সাবলীল পাঠযোগ্য কবিতাটি একটা ভিন্ন মাত্রা এনে দিয়েছে এই গ্রন্থটিকে। মানকচুর পাতা ছাতা অপেক্ষা কম নয় আর আমাদের সমাজে বাজান হচ্ছে পরিবারের ছাতা যার বিশাল বুকের ছায়ায় আমরা বেঁচে থাকি। স্নেহ মমতার আধার আমার বাবার বক্ষ। বাজানের চোখের সাথে মিল করেছেন পীরপোখরী নামক পুকুরের স্থির জলের। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন কবি কোন পীরকে বাবার আসনে বসাননি বরং বাবাকে বসিয়েছেন পীরের আসনে।
এইভাবে একে একে বর্ণনা করা এই ছোট্ট পরিসরে সম্ভব নয়। প্রতিটি কবিতায় জীবনবোধের পরিচয় রাখতে কবি সক্ষম হয়েছেন। নারীপ্রেম থেকে মানবপ্রেম, দেশপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম সবকিছুই ছুঁয়ে গেছে তার কলম। অপর পক্ষে প্রেমের মাঝে ঘৃণার অবস্থানও তার চক্ষু এড়িয়ে যায়নি। এক্ষেত্রে “প্রেমের অপর পিঠে হায়েনা ঘুমায়” কবিতাটি প্রণিধানযোগ্য। এই কবিতায় ৪/২ স্তবকে মোট ২৪টি চরণ রয়েছে যার প্রতিটি ৮+৬ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দে লেখা। মিথ আশ্রয়ী এই কবিতাটি হাবিল কাবিলের ঘটনা টেনে বর্তমান সময়কে চিত্রায়ণ করেছেন খুব সচেতনভাবে।
বিরহ বেদনে পোড়া কাবিলের মন
পিতার অমত বলে, প্রেমের খতম
সেই প্রেমে নেচে ওঠে ময়ূরী পেখম
প্রেয়সী করেছে স্বয়ং সহোদরা বোন।
… … … … … … …
প্রেমের অপর পিঠে হায়েনা ঘুমায়
তাকেই ঘুমিয়ে রাখা চুমায় চুমায়।
বাংলা লোকজ গানের মত এই কবিতাতে ভণিতার আশ্রয় নিয়েছেন কবি। শেষ স্তবকে তিনি লিখেছেন-
অধম বান্দা হাফিজ নত মুখে এসে
হাত দুটো এক করে সকাতরে বলে
চেয়ারটা ঠেলে দিও টেবিলের তলে
তারাও কাটাবে রাত, প্রেম ভালোবেসে।
.. … … … … … … … … …
অতঃপর খুনি হলো প্রেমিক কাবিল
খুন হলো সহোদর সরল হাবিল।
সমকালীন প্রসঙ্গও কবিকে নাড়া দিয়েছে প্রচন্ডভাবে। পশ্চিমে আইলান আর পূর্বে মিয়ানমারের নৃশংসতা কবিমনকে কাঁদিয়েছে। তাইতো লিখেছেন এসব বিষয় নিয়ে।
গত বছরের বিশ্বব্যাপী আলোচিত ঘটনাবলির মধ্যে আয়লান কুর্দি একটি বিশেষ জায়গা দখল করে নিয়েছে। অভিবাসী ইতিহাসে আয়লান কুর্দির নাম কোনদিনও মুছবার নয়। বান্দা হাফিজ বিষয়টিতে তাঁর কবিতায় দুটি আঙ্গিক আনার চেষ্টা করেছেন। প্রথমে আন্তঃদরজা এবং পরে অন্দরমহল। আন্তঃদরজায় তিনটি চরণে ঘটিয়েছেন এক মহা ভাবের পরিব্যাপ্তি।
মহাকাল মুখে কী পরম সুখে হেঁটে চলেছেন নিজে
আমাদের রেখে গেলেন ব্যথাতুর বুকে বিউগল মুখে
নিরন্তর সুর দিতে- এক আয়লান কুর্দিতে।
অন্দরমহলে কবি তার বক্তব্যকে পরিস্ফুট করেছেন ছয়টি স্তবকের একটি মর্মস্পর্শী চিত্রকল্পে। গদ্য আদলে পদ্য লেখার সমন্বিত রূপটি আমরা দেখতে পাই কবিতাটিতে যার শুরুটা হয়েছে-
শুয়ে আছো তুমি, হে পূতপ্রাণ বালির বুকে
ছুঁয়ে আছো জলে নি®প্রাণ দেহ পরম সুখে
বয়স কতই হতে পারে; বড়জোর দুই কিবা তিন
যে বয়সে নাচবার কথা ছিলো, ছাগল ছানার মত
তা-ধিন তা-ধিন।
মিয়ানমারের নৃশংসতার প্রেক্ষিতে লিখলেন “আমি আরাকান থেকে বাঁচতে এসেছি” শিরোনামে অন্য আরেকটি কবিতা। সংলাপের মাধ্যমে শুরু কবিতায় সেখানকার নির্মমতার স্বরূপ এঁকেছেন কবি।
“ছায়ার পুরুত্ব আর কাম সুর আশা” সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা। বোদ্ধা বিচারে কাঠামোবদ্ধ লেখা অবশ্যই কঠিন তবে কবির এই প্রয়াসকে অভিবাদন জানাই। এখানে ৮+৬ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দে ৮+৬=১৪টি চরণের বিভাজিত রূপ যেমন দৃষ্টিগ্রাহ্য তেমনই ৪+৪=৮ এবং ৪+২=৬ চরণের স্তবক নিয়মের যথার্থতাকেই তুলে ধরে। সেই সাথে ভাব, ভাষা ও শিল্পগুণ কবিতাটিকে সুদৃঢ় করেছে।
কবি বান্দা হাফিজ তাঁর আরও অনেক কবিতার মত এখানেও ভণিতার আশ্রয় নিয়েছেন। যদিও এখানে যথার্থভাবে তিনি কাজটি সম্পন্ন করতে পারেননি। এই কবিতার শেষ দু’টি চরণে তিনি বলেছেন,
ছায়ার পুরুত্ব আছে-যে জানে সে চিজ
ছায়াতে বিলীন হও, বলছে হাফিজ।
মাত্রা ঠিক রাখতে গিয়ে বান্দা হারিয়ে গেছে। শুধু হাফিজ শব্দটি সুদূর পারস্য পর্যন্ত ঠেকিয়ে দেয় তাই বান্দা হাফিজ পুরো নাম ব্যবহারই যৌক্তিক। এক্ষেত্রে ‘ছায়াতে বিলীন হলো এ বান্দা হাফিজ’ আরও বেশি মানানসই হতো বলেই মনে হয়।
কোনটা রেখে কোনটা নিয়ে আলোচনা করি। একগুচ্ছ শক্তিশালী কবিতার সমাহার ঘটেছে বইখানিতে। সমকালীন কবিদের মধ্যে বান্দা হাফিজকে অন্যতম বললে অত্যুক্তি হবে না। সরল ভাষায় জটিল ভাবকে ধারণ করে শিল্প আর সুষমার আবেশ মাখানো যে কত দুরূহ তা কবিতাগুলো না পড়লে বুঝা সম্ভব নয়। অথচ বইটিতে জটিল শব্দের আড়ম্বরিতা নেই।
আমাদের সমাজে কবিতার পাঠক এমনিতেই কম। তার ওপর আধুনিক কবিতার জটিল ভাব পাঠককে আরও বিমুখ করে ফেলছে। এদিক দিয়ে ভাবলেও বান্দা হাফিজের স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান। তাঁর কবিতায় ভাবের গাম্ভীর্য যেমন আছে তেমনি ভাষার লালিত্য আছে। সব ধরনের পাঠক এখান থেকে রস আস্বাদন করতে পারবেন সাবলীলভাবে। আর বোদ্ধা পাঠকের খোরাকও বিদ্যমান এই বইয়ে। গদ্য-পদ্য বিভিন্ন আঙ্গিকে লেখা কবিতাগুলো পাঠক হৃদয়ে স্থান করে নিতে সক্ষম হবে বলে আমার বিশ্বাস।
আলম সিদ্দিকীর নামকাব্য
প্রাসঙ্গিক দৃষ্টিপাত
মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূর
কবিদের শব্দফুলের সমাহারে গ্রন্থিত অনবদ্য সৃষ্টি কাননবালার নাম কবিতা। তাই কাব্য কাননের কারিগর হচ্ছেন একজন কবি। কবিতার সমষ্টিগত নাম কাব্য। কাব্যজগতের বিশাল জমিনে নতুন ধারার আরেকটি উদ্ভাবিত সৃষ্টির পরিচয় ‘নামকাব্য’। সময়ের সাহসী কবি ‘আলম সিদ্দিকী’ নাম কাব্যের উদ্ভাবক। ‘নামকাব্য’ নিয়ে রচিত হয়েছে তার বিশাল একটি বই। তার লেখা ‘নামকাব্য ১’ বইটি আমার পুরোটাই পড়ার সুযোগ হয়েছে। কবি ‘নামকাব্যে’র যেসব বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন তার আলোকেই যৎসামান্য আলোচনা করার চেষ্টা করব।
কবি বইটিতে শতাধিক নামের ওপর কাব্য রচনা করেছেন। কবি চমকপ্রদ সেসব সৃষ্টির শুরুতেই এনেছেন কুরআন-বিষয়ক কাব্য। কবির ভাষায়-
কুরআন শরীফ ধরলে
অর্থ বুঝে পড়লে
আমলটা ঠিক করলে
জান্নাত পাবে মরলে।
মনের আঁধার ঠেলে
নূরের আলো জ্বেলে
ঈমান রাখো তাজাও
জীবনটাকে সাজাও।
কবির চিন্তা অনেক ভালো। কবি শুরু করেছেন কুরআন অধ্যয়নে মনোযোগ দেয়ার আহবান ও তার ফলাফল জানিয়ে। জীবনটাকে সুন্দর করে সাজাতে হলে কুরআনের সংস্পর্শে আসার বিকল্প নেই। দুনিয়ায় কল্যাণ এবং আখিরাতে জান্নাত পেতে হলে কুরআনের বিধান মেনেই জীবন চালাতে হবে। কবির আহবান সফল হোক।
একজন কবি আগামীর স্বপ্ন দেখেন। দেখান আলোকের পথ। দেখেন আঁধারের কালোছায়া। আঁধারের মাঝেই কবি সৃষ্টি করতে চান আলোকের ঝলকানি। হোক না সেটা সূর্যের আলোর মত দীপ্তিময় কিংবা জোনাকির মত মিটিমিটি জ্বেলে ওঠা আলোকরেখা। কবি আলো-আঁধারের মাঝে শয়তানের খেলা দেখেন। দেখেন শয়তানের প্রসারিত কুচক্রের হাতছানি। কবি শয়তান কাব্যে মানুষরূপি শয়তানের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। কবির ভাষায়-
আজেবাজে বহু কথা কয় কানে
মানুষরূপি ছদ্মবেশী শয়তানে।
হ্যাঁ, আজকে হাজারো মানুষরূপি শয়তানের আনাগোনা। কাজে কর্মে, কথাবার্তায়, চাল চলনে তার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় বেশ। এদের অবস্থান বেশ জোরালো। এরা দেশ, জাতি ও মানবতার শত্রু। এদের রাহুগ্রাস থেকে বাঁচতে হবে নিজেকে। নিজের দেশকে বাঁচাতে হবে ওদের অন্যায় হস্তক্ষেপ থেকে। কবি তাই এদের থেকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। এদের থেকে বাঁচার জন্য কবির আহবান-
ভালো কাজে বন্ধু তোরা দিস হাত
ভাঙতে হবে শয়তানের ওই বিষদাঁত।
মানুষরূপি শয়তান আজ আমাদের সবকিছুই শেষ করে দিচ্ছে। আমাদের পরিবারে ওদের শক্ত হস্তক্ষেপ। পারিবারিক জীবনে ওদের রাহুগ্রাস আজ দীপ্যমান। এদের থেকে সাবধান হতে হবে সকলের। আমাদের সতর্ক পথচলা হোক আরো বেগবান। আরো শানিত হোক আমাদের জীবনমান।
একজন কবি সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে আনেন তার কবিতার জমিনে। শব্দফুলের বুননে। কবি একান্ত আপনার করে সাজিয়ে নেন তার শব্দবাগান। কবি মানুষরূপি চামচিকা দেখেন সমাজে। বাস্তবজীবনে। চামচিকারা যেমন আলোকের ময়দানে বেরোয় না, ভালোলাগে না তাদের আলোকিত জীবনের আবহ ঠিক তেমনি কিছু মানুষরূপি চামচিকা আছে দুনিয়ায়। কবি তাদেরকে দেখেন নিজের কাব্যজগতে। তেমনি নামকাব্যের স্বপ্ন আঁচড়ে কবির ভাবনা-
দিনের আলো লাগেনাতো ভালো
অপেক্ষা তাই কখন হবে কালো
দিনের বেলা চামচিকারা কানা
অন্ধকারে তাই মেলে দেয় ডানা।
চামচিকাদের রাতে বাহাদুরি
দিক হারিয়ে করে ওড়াউড়ি
কিছু মানুষ চাচ্ছে আঁধার দেশে
উন্মত্ততা চামচিকাদের বেশে।
হ্যাঁ, আমরা যদি একবার ভালো করে দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পারবো কিছু লোক রয়েছে যারা সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশ চায় না। চায় না আলোকিত সমাজ। সুন্দরের পথে যারা এগোতে চায় তাদের পথের কাঁটা হয়ে আলোকের অগ্রযাত্রা থামাতে চায়। কবি তাদেরকে চামচিকার সাথে তুলনা করেছেন। ব্যঙ্গচিত্রে কবির চামচিকা সৃষ্টি সফল হয়েছে।
কবি সুখপাখির অনুসন্ধান করেন। সুখপাখিটাকে ধরতে চান আপনার করে। কিন্তু কবি কেন যেন সুখপাখি ধরতে পারেন না। সুখপাখিটা ধরতে গিয়ে সামনে কেবল মরীচিকার ধূ ধূ বালুকারাশির হাতছানি দেখেন। তবুও কবি সামনে এগিয়ে যেতে চান। ভয় পান না কবি। মরীচিকার ভয়ে ভয়ে পথ চললে জীবন জয়ে পরাজয় ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা কবির। তাই কবি সাবধানে এগোতে বলেছেন আমাদেরকে। কবির ভাষায়-
সুখপাখিটা ধরতে গিয়ে ধরি চিকা
সামনে ভাসে ধূ ধু বালু মরীচিকা
তবু আমি স্বপ্ন আশায় পথে চলি
স্বপ্ন আমার নিয়ে কেহ খেলে হলি।
জীবন মানে নয়তো থামা চলব আমি
মরুর পথে চলতে গিয়ে যতই থামি
মরীচিকার পিছে কিবা ভয়ে ভয়ে
চললে জীবন বাধাগ্রস্ত হবে জয়ে।
মরীচিকার ভয়ে এগিয়ে যেতে থমকে দাঁড়ালে পরাজয় নিশ্চিত। তাই আর মরীচিকার ভয় নয়। এগিয়ে যেতে হবে সামনে। ক্রমাগত মঞ্জিল পানে। কাক্সিক্ষত বিজয়ের দুয়ারে।
আমরা মাকাল ফলের গুণাগুণ জানি। ফলটি দেখতে বেশ চমৎকার। অনেক আকর্ষণীয়ও বটে। সবাই তার কাছে যায়। একান্ত আপনার করে কাছে পেতে চায়। কিন্তু লোকেরা যখন মাকাল ফলের পাশে যায়, দেখে তার ছোঁয়ায় ভালো চিন্তার বিলুপ্তি ঘটছে ঠিক তখনই মাকাল ফলের গুণাগুণ বুঝতে পারেন তারা। আমরা সমাজে এমন কিছু লোক খুঁজে পাই, যাদের বাহ্যিক আচরণ দেখলে মনে হয় ওরা কতই না সাধু! ওরা কতই না ভালো মানুষ! কিন্তু বাস্তবজীবনে ওরা মাকাল ফল। কবি তার বাস্তব অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তার মাকাল নামক কাব্যে। কবির ভাষায়-
টকটকে লাল দেখতে মাকাল
দুর্গন্ধটার নেইতো আকাল
খাবার মতো নয়তো ওটা
ফলের মতো মাকাল গোটা।
কিছু লোকের বাইরে ভালো
ভেতরটা যে বেশি কালো
ঠিক যেন ওই পাকা মাকাল
ভালো লোকের পড়ছে আকাল।
কবির চিন্তা সঠিক। সমাজে এখন ভালো লোকের ভীষণ আকাল। আমাদের সমাজে ভদ্রবেশী লোকের অভাব নেই। ওদের কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তোতাপাখি। মিষ্টি সুরে বৃষ্টি ছড়ায় কথার ছন্দে। তাদের পাশাপাশি নাচানাচি দেখলে মনে হবে একান্ত কাছের জন। আপনজন। বাস্তবে কেউ নয় তারা। ওরা সুসময়ের তোতাপাখি। ওদের থেকে সাবধান হতে হবে। সতর্ক থাকতে সবাইকে। কবি আলম সিদ্দিকী তার নাম কাব্যে তোতাপাখির বর্ণনা দিয়েছেন বেশ ভালো করেই। কবির ভাষায়-
তোতাপাখি কথা বলে মিষ্টি করে
তখন যেন ভালোবাসার বৃষ্টি ঝরে
কাছাকাছি নাচানাচি লাগে ভালো
বাড়ায় যেন আমার দু’টি আঁখির আলো।
পাখির প্রেমে আঁখির ফ্রেমে বন্দি আমি
পাখির সাথে করিনি যে সন্ধি আমি
হঠাৎ যেদিন উড়ে গেল তোতাপাখি
সেদিন আমার হয়ে গেছে ভোঁতা আঁখি।
আজকের সমাজে তোতাপাখির অভাব নেই। ওরা সমাজের কীট। ওদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে। তোতাপাখির মিষ্টি কথায় ভুললে হবে না। তোতাপাখি যেন নাচের পুতুল। কর্তা যেমন খুশি তেমন করে কথা বলান তোতাপাখিকে। ঠিক তেমনই নাচের পুতুলকেও নিজের করে নাচানো যায়। পুতুল খেলার মতই ওদের নিয়ে নিজের মত করে যা ইচ্ছা তাই খেলা যায়। আমরা যেন কারও নাচের পুতুল না হই। কবি সেদিকেও দৃষ্টিপাত করেছেন আমাদের জন্য। কবির ভাষায়-
কচিসোনা ছোট্টমনা তুতুল
হাতে নিয়ে খেলে সদা পুতুল
পুতুল পুতুল গায়ে হলুদ বিয়ে
ইচ্ছেমতো খেলে পুতুল নিয়ে।
দেশটা নিয়ে হচ্ছে পুতুল খেলা
ভাঙছে দেশের শান্তি-সুখের মেলা
তুতুল যেমন দেয় পুতুলের বিয়ে
তেমন খেলা হচ্ছে এদেশ নিয়ে।
হ্যাঁ, একশ্রেণির পুতুলবাজ এদেশ নিয়ে খেলছেন। এদেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নিয়ে বাদ সাধছেন ওরা। তুতুলবেশী এদের থেকে সাবধান হতে হবে। সতর্কতার সাথে এগিয়ে যেতে হবে সামনে। বিজয়ের মঞ্জিলপানে। এইসব তুতুলবেশীরা একসময় বাঁশ দেবে এদেশের জনগণকে। আমাদেরকে। আমার দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে। তুতুলবেশী এসব পুতুলের বর্ণনা দিয়েছেন আমাদের আজকের সাহসী কবি। কবির ভাষায়-
এই বাঁশ সেই বাঁশ কত বাঁশ আছে
কেউ কেউ বাঁশ দেয় অপরের পাছে
বাঁশ দিয়ে বাঁশ হয় বাঁশ দিয়ে ঘর
বাঁশ দিয়ে কেউ দেখি হয়ে যায় পর।
বাঁশ দিয়ে লাঠি হয় বাঁশ দিয়ে সাঁকো
বাঁশ দিয়ে লাশকে যে কবরেই ঢাকো
বাঁশ দিয়ে আসবাব বাঁশ দিয়ে খুঁটি
বাঁশ নিয়ে হয় তাই খুব ছোটাছুটি।
কবির নাম কাব্য বইটি পুরোপরি পড়ার সুযোগ হয়েছে আমার। প্রতিটি কাব্যই বেশ মজাদার হয়েছে। তবে বাঁশ কাব্যটি আরো বেশি সফল বলে মনে হয়েছে আমাকে। জানি না কবির চিন্তা কতটুকুন সফল হবে। তবে তার প্রচেষ্টার সফলতা আশা করতেই পারি আমরা। আসুন আমরা পরস্পরকে বাঁশ দেয়া থেকে বিরত থাকি।
মূল্যায়ন : কবি আলম সিদ্দিকীর নাম কাব্য বইটি পুরোপরি আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে। বেশ মনোযোগ দিয়েই পড়বার চেষ্টা করেছি বইটি। তবে দু-একবার পড়েই কোন বইয়ের ওপর মন্তব্য করা সঠিক হয়ে ওঠে না। তাই আমার মত পাঠকের জন্য এ বই নিয়ে মন্তব্য না করাই শ্রেয়। তবুও কিছু না কিছু বলতেই হয়। কবি নাম কাব্যের যেসব বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন বেশ কয়েকটি কাব্যে তার ব্যত্যয় ঘটেছে বলে পরিলক্ষিত হয়েছে। কোথাও আবার বৈশিষ্ট্যের ছোঁয়া খুব একটা বোঝা যায়নি সহজেই। তবুও আমরা আশা করতে পারি উজ্জ্বল সম্ভাবনার। কবি এগিয়ে যাক সামনে। সাহিত্যের জমিনে তার পথচলা হোক আরো বেগবান। আরো শাণিত হোক কবির চিন্তার জমিন। বিজয়ের মঞ্জিলপানে এগিয়ে চলুক কবি। কবির জন্য শুভকামনা নিরন্তর।
নামকাব্য বিষয়ক নোট:
আলম সিদ্দিকী নামকেন্দ্রিক ছড়া নামকাব্যের প্রবর্তক। নামকেন্দ্রিক বলে এ জাতীয় ছড়ার নাম দিয়েছেন নামকাব্য।
কবি আলম সিদ্দিকীর জন্ম ১৯৮১ সালে গাইবান্ধার সাঘাটায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এমএসএস করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। বর্তমানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন আমেরিকায়।
নামকাব্যের বৈশিষ্ট্য :
১. নামকাব্য নামকেন্দ্রিক। শুধু মানুষের নাম বাদ দিয়ে যে কোনোকিছুর নাম দিয়ে রচিত হবে এ জাতীয় কাব্য। যেমন যেকোনো ফুল ফল পশুপাখি উদ্ভিদ নদী নালা সাগর বন পাহাড় খাল বিল স্থান দেশ রাজধানী গাছ মাছসহ যেকোনো নামে।
২. নামকাব্য নির্দিষ্ট (মুখ্য) একটি নামে হতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে অন্য (গৌণ) নাম আসতেই পারে।
৩. চারজোড়া পঙ্ক্তির স্তবক হবে দুইটি।
৪. যেকোনো ছন্দে হতে পারে নামকাব্য। অন্ত্যমিল হবে প্রথম স্কবকে ক ক খ খ। দ্বিতীয় স্তবকে ক ক খ খ।
৫. হাস্যরস অনুপ্রাস বিদ্রপ খোঁচা ইঙ্গিত রহস্য থাকতে পারে আবার নাও পারে। আবেগ অনুভূতি জীবনবোধের গভীর প্রকাশও থাকতে পারে। কখনও কখনও পুরোপুরি বা আংশিক পরিচয় ফুটে উঠতে পারে।
৬. রূপক অর্থে নামটি ব্যবহার হতে পারে।
৭. যে নামে নামকাব্য রচিত হবে সেই নামটি বসতে পারে যেকোনো লাইনে। এক বা একাধিক জায়গায় থাকতে পারে প্রয়োজনে।
৮. শিরোনাম হবে শুধু যে নামে লিখিত ছড়াটি। আগে-পরে কিছু যোগ হবে না।
বোতাম খোলা দুপুর
শিশুসাহিত্যের সমৃদ্ধ সংযোজন
শাহাদাৎ শাহেদ
কবিতার সকল শর্ত পূরণ করে শিশু-কিশোর মনের চাওয়া-পাওয়া, কল্পনার জগৎ, স্বপ্নের পথের সোনালি বিবরণ বিস্তৃত যেই কবিতার চর্চা হচ্ছে, বিশেষত আশির দশক থেকে শুরু করে, বিজ্ঞজন একে কিশোর কবিতা বলে চিহ্নিত করেন। যদিও বাংলা ছড়া সাহিত্যের জরায়ুতেই এর জন্ম, তবু আলাদাভাবে বিকাশের সময় হিসেবে এই সময়ের যৌক্তিকতা রয়েছে বলে আমিও বিশ্বাস করি। এই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর কবিতার চর্চার বিস্তৃতি আমাদেরকে পুলকিত করে। বিশেষত আল মাহমুদ, ফারুক নওয়াজ, সুজন বড়–য়া, রাশেদ রউফ, জুলফিকার শাহাদাৎ-এর ধারাবাহিকতায় প্রতিভাবান তরুণরা এই ক্ষেত্রটিতে নিজেদের নিয়োজিত রাখার মাধ্যমে একটি স্বর্ণালি সময় তৈরি করতে পারবেন বলে অভিপ্রায়। আসাদ জোবায়েরের ‘বোতাম খোলা দুপুর’ এক্ষেত্রে একটি নতুন সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করতে চাই।
একজন কবি কখন নিজেকে কবিতায় নিভৃত করতে চান? কেন আসাদ জোবায়ের কিশোর কবিতা লিখতে ব্রত হয়েছেন? এর অনেক রকম কারণ থাকতে পারে। ‘বোতাম খোলা দুপুর’ পাঠের পর আমার সামনে যে সকল কারণ হাজির হয়েছে, আমি কেবল তা-ই বলতে চাই। এই কবির কাছে আছে অঢেল শব্দের ভাণ্ডার- শব্দের গাঁথুনি রীতিমতো চমক তৈরি করে; তার মনে আছে ভাব- যেগুলো প্রকাশের দাবি রাখে, প্রতিধ্বনিত হওয়ার পর মনে হয়- আরে! এতো আমারই কথা, আসাদ জোবায়ের কিভাবে জানলেন! আছে সাহিত্যরস- সাহিত্য সত্যে ভরপুর তার কবিতাগুলো, চিত্রময়তা, উপমা, উৎপ্রেক্ষাও আমাকে চমৎকৃত করেছে। আছে উদার মনাকাশ- সমস্ত বিষয়ভাবনা যেন আসাদ জোবায়েরের হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেয় অবলীলায়; সত্যিই তো, এমন একটি হদয় থাকলে তাকে কবি না হয়ে কি উপায় আছে? তবে সীমাবদ্ধতা যে নেই তা নয়। সেসব জানতে হলে প্রসঙ্গটি খেয়াল রেখে পড়তে হবে বাকিটা।
বিবিধ স্বাদের ২২টি কিশোর কবিতা দিয়ে সাজানো হয়েছে ‘বোতাম খোলা দুপুর’। ফারজানা ফায়েলের প্রচ্ছদ এবং ফারাহ নাজ মুন ও তৌসিফ আল ফাহিমের অলঙ্করণ মন ছুঁতে না পারলেও সার্বিকভাবে বইটি হাতে নিলে শিশু-কিশোররা পুলক অনুভব করবে বলে মনে হয়েছে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭তে প্রকাশনা সংস্থা ‘কালো’ প্রকাশ করেছে বইটি। ফ্লাপ লিখেছেন ছড়া যাদুকর জগলুল হায়দার। বইয়ের নাম ইতঃপূর্বে আলোচনা অনুপাতে কবির সৃজনশীলতাকে উপস্থাপন করে। কিংবা বলা চলে, নামটি পুরো বইটির আবহকে এক নজরে মনের জানালাতে এক ঝটকায় হাজির করে দেয়।
দারুণ চিত্রকল্প আঁকতে আঁকতে বইটির প্রথম কবিতা ‘বন্দি পাখি’ এগিয়ে যাচ্ছিলো। চলুন দুটা লাইন দেখি- ‘হাজার পাখির পুচ্ছ দোলায় সন্ধ্যা তোমার নামে/ হাতড়িয়ে মন খোঁজে কি গো তোমার এ খোকাকে?’ চমৎকার চিত্রকল্প, দোলা দেয় মনে। কিন্তু সমস্যা বাধে শেষ লাইনের এসে, ‘কিন্তু মাগো বন্দি আমি নিষ্ঠুর এ শহরে’। এখানে খেয়াল করলে দেখি- ‘নিষ্ঠুর এ শহরে’ এসে জিহ্বা জড়িয়ে যাচ্ছে। এতো সুন্দর একটা কবিতায় মিহিন শব্দ চয়নের দাবি রাখে কিন্তু কবি যখন ‘নিষ্ঠুর’ শব্দ নিলেন- এতে পড়ে গেছে ছন্দের দোল। এই জায়গাটুকু একটু যতœই চেয়েছে।
‘বোতাম খোলা দুপুর’ কবিতাটি যে কারও পাঠানন্দের কারণ হবে। গ্রামের দস্যি কোন কিশোর বালকের প্রতিমূর্তি-ই বিবৃত হয়েছে কবিতাটিতে। কবিতাটি পড়ে মনে হয়- এইতো আমার বাংলার কিশোর, উচ্ছল কিশোর, দস্যিপনায় খুঁজে নেবে বাংলা মায়ের রূপ। এমন দস্যি যে বালক হয়ে ওঠে কালক্রমে বড়, সে পৃথিবীর যেখানেই থাক বাংলাকে নিয়ে যাবে বুক পকেটে ভরে। পক্ষান্তরে, আমাদের শহুরে কিংবা ছোট জেলা-থানা শহরের বাবা-মা’রা যেমন ছেলে চান- তার হাতে পায়ে শিকল পরিয়ে নির্দিষ্ট ছকে ক্লাসের ফ্রার্স্টবয় হওয়ার সবক গেলান সে তো সুযোগে হয়ে ওঠে স্বেচ্ছাচারী, জঙ্গি কিংবা অন্যদেশের সংস্কৃতি চর্চার পুরোধা। এই কবি ‘এই কিশোর সেই কিশোর’ কবিতায় তার পরিণতি লিখেছেন। তাই, প্রত্যাশা- বোতাম খোলা দুপুর ফিরে আসুক প্রতিটি বাঙালি কিশোরের জীবনে। যেমনটা কবি বলেছেন-
‘তোমার দুপুর ঘুমকাতুরে সজাগ দুপুর আমার
ছুটছে এদিক ওদিক দেখো বোতাম খোলা জামার।’
‘গ্রীষ্ম’ নামক কবিতাটিতে পরিবেশ সচেতন আসাদ জোবায়েরের পরিচয় পাই। এখানে দারুণ কতোগুলো অন্ত্যমিলের বিন্যাস দেখা যায়। ‘অসংখ্য যে’র সাথে ‘অসংকোচে’ আমি প্রথমই শুনলাম। ‘আমি তো নই দস্যি ছেলে’ কবিতায় আবারও এক দস্যি বালকের চিত্র ফুটে ওঠে। মজার বিষয়টি হলো, বালকটি তার মায়ের দাবি করা দস্যিপনাকে কি সহজ-সরলভাবে নাচক করে দেয়। বর্ণনায় এমন সারল্য তৈরি করতে পারা নিঃসন্দেহে কবির কৃতিত্ব। একটি স্তবক দিয়ে উদাহরণ দিই-
‘আম্মু বলেন আমি নাকি দস্যি পাজি ছেলে
আমি বলি এমন সনদ কোথায় তুমি পেলে?
আমি কেন দস্যি হবো, দস্যি বনের পাখি
তাকেই কেবল আমি শুধু চোখে চোখে রাখি।’
আহ! কী মিহিন গতি। তবে শেষ লাইন আরেকবার পড়ে নিই; ‘কেবল’, ‘শুধু’ এই শব্দ দুটোর একই লাইনে একটি ভাবকে বোঝাতে ব্যবহার অসুন্দর। এতো সুন্দর করে যে কবি বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন তার ে