-কে ওখিনে? কারা গো?
শ্রাবণের রাত। ঝুপ-ঝুপ বৃষ্টি ঝরছে অবিশ্রান্ত। চারদিকে, মাথার ওপরে, আকাশজোড়া গহিন অন্ধকার। নিজের শরীরটাও দেখা যায় না। আঠালো ঘন তরল অন্ধকারের পুকুরে যেন ডুবে আছে গোটা পৃথিবী। চোখে তার চাপ অনুভূত হয়। অন্ধকারেরও যে একটু আলো থাকে তা-ও নেই, সে জন্য হাতের রুপালি নিকেলওয়ালা চকচকে টর্চটাও চমকায় না এতটুকুও।
অভ্যাস মতো বৈঠকঘরের দিকে টর্চের আলো ফেলেন আজিম মন্ডল। ব্যাটারির তেজ নেই। স্বল্পালোকে বৈঠকঘরের বারান্দা ভালমতো উদ্ভাসিত হয় না। তবু ওর মধ্যেই দু’জন মানুষের চেহারা ছায়া হয়ে ওঠে। তারা গুটিসুটি মেরে বসে আছে টুলের ওপর।
এগিয়ে যান মন্ডল। পায়ের নিচে পচপচে কাদা, দু’পায়ে মাখামাখি। লুঙ্গি কায়দা মতোন ভাঁজ করে হাঁটু অদধি তোলা। সেটা টেনে-টুনে একটু নামান যাতে হাঁটু দৃশ্যমান না হয়। বাইরের মানুষের কাছে সেটা মান-ইজ্জতের ব্যাপার।
মুখের ওপর ফকাশ আলো পড়তে চোখ ঝলসে যাওয়ার জোগাড়। দ্রুত হাত বাড়িয়ে চোখের সামনে আড়াল বানায় মুসাফির দু’জন। উঠে দাঁড়ায়।
-সালামু আলাইকুম।
-ওয়ালাইকুম সালাম। আন্ধার ক্যান? হেরিকেন নাই?
-হারিকেল আছে একটা, ত্যাল নাই।
টর্চের আলোটা চোখের নিচে, ওদের বুক বরাবর নেমে আসে। তখন ওরা মুখ সোজা করে তাকায়।
মন্ডল ততক্ষণে বৈঠকঘরের বারান্দার কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। অপরিচিত লোক দুটোর একজন কিছু বয়স্ক, বয়স চল্লিশের ওপর। কালো কুচকুচে রং। শক্তপোক্ত শরীর। বেশ লম্বাপানা দেহখানা। মুখে মাঝারি মাপের দাড়ি। অন্যজন ছেলেমানুষ, সতেরো-আঠারো হবে তার বয়স। ধবধবে ফর্শা, হালকা-পাতলা চেহারার উঠতি যুবক ছেলে। মুখে দাড়ি-গোঁফের বালাই নেই। একটুখানি খাট, লম্বায় বড় জনের কান বরাবর।
বাহিরবাড়ির এই বৈঠকখানায় মুসাফির থাকে না এমন দিন কমই যায়। তবে সেসব অতিথির বেশির ভাগই চেনা-জানা, বা চেনা-জানা কারো সঙ্গে হয়তো অচেনা কেউ আসে কখনও। থাকে না দু-একদিনের বেশি। কিছু সাহায্য পেলে চলে যায়। তাদের কেউ-কেউ এ বাড়ির আত্মীয়র মতো হয়ে গেছে।
কিন্তু এ দু’জন একেবারে অচেনা।
-তুমারে বাড়ি কুণ্ঠে গো?
-মুশ্শিদাবাদ। ডোমকুল থানা।
-মুশ্শিদাবাদ? ছিকিষ্টপুরের মানুষ নাকি!
-জি, জি। হুসেন মুল্লার বাড়ি।
আজিম মন্ডল আগ্রহ নিয়ে দুই মুসাফিরকে আবারো দেখেন ভাল করে। -এই ছেলি হুসেন মুল্লার ব্যাটা নাকি?
-জি। ছোট ছেইলি।
-হ্যাঁ, বাপের মুতনই চেহারা। বসো, বসো। তুমারখে তো আগে দেখিনি। মুনে পইড়্ছে না।
-আপনাকে আমি দেইখেছি, আপনে য্যাখুন গিইছিলেন। আমি মুল্লাজির জামাই। আর উয়ার তো ত্যাখুন জন্মই হয়নি।
-ও। কখুন আইসিছো তুমরা?
-এই তো মগরেবের ইট্টুধান আগে।
-কেউ খোঁজ-খবর লেয়নি বুধায়, না?
-লিয়েছে। একজন এইখেনে বইস্তে বলল, তো… আমতা-আমতা করতে থাকে বড় জন।
-হু। বুঝতে পারেন মন্ডল। আফসোস হয় তার। বাড়ির লোকজন কেউ মানুষ হলো না। দু’জন মুসাফির এসে বসে আছে অন্ধকারে, বাতি দেয়ার প্রয়োজনও কেউ বোধ করেনি।
-আমি মর্ইলে এই বাড়ির লোকজনের কী হাল যে হবে তাই ভাবি! শিয়ালে অরে পাছা চাইট্পে, বুঝলে বাবা। কী আর বুইল্বো।
বৈঠকঘরে ঢুকে হারিকেনটা তুলে নিয়ে ঝাঁকিয়ে দেখেন সত্যিই তেল নেই একফোঁটাও। -আর ইট্টুক বসো তুমরা, আমি আসছি।
আজিম মন্ডল বৈঠকঘরের পাশ দিয়ে পেছনের দিকে হারিয়ে গেলেন অন্ধকারের ভেতর।
ছোটজন এবার মুখ খোলে। -ইনিই বাপজির দোস্ত নাকি?
-হ্যাঁ। কতদিন পরে দেখা। চুলে পাক ধইরেছে। তোধের বাড়ি য্যাখুন যায় ত্যাখুন তো পুরা যুবক মানুষ। পরের বছরই বাপজি মারা গেইলেন। তারপর থেইকে আর যোগাযোগ নাই।
এ গল্প অনেক শুনেছে যুবক। তখন ব্রিটিশ আমল। ব্যবসা উপলক্ষে প্রায়ই কলকাতায় যেতে হতো তার বাপজিকে। একবার আকস্মিকভাবে পরিচয় হয় এই আজিম মন্ডলের সঙ্গে। তিনি কলকাতা বেড়াতে গিয়েছিলেন। ছিলেন একই হোটেলে। দু’জনের মধ্যে ভাব জমে যায়। সেই ভাবের টানে আজিম মন্ডল গিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণপুরে। দিন দুয়েক ছিলেন। মহম্মদ হুসেন মোল্লাও আসতে চেয়েছিলেন পদ্মা পার হয়ে এই শ্যামপুর গ্রামে। কিন্তু তার আগেই ওলাবিবি তার জীবন ছিনিয়ে নেয়। সে খবর এপাড়ে পৌঁছেছিল কিনা কে জানে। তারপর দেশ ভিন্ন হয়ে গেল। যোগাযোগ ছিল না আর।
-এতদিন পরেও চিনতে পাইরেছে সেডাই বড় কথা। মানুষটা সত্যিই ভাল, নাকি বলিস?
– হ্যাঁ। বাপজির চেহারা মনে রাইখেছে।
-বাপজি খুব চেহারাদার মানুষ ছিল। খুব একটা লম্বা ছিল না, কিন্তুক্ তোর মত সুন্দর আর ফর্শা ছিল দেখতে। তুই অবিকল বাপজির লাক চোখ আর থুতনি পায়িছিস।
এ কোনো নতুন কথা নয়। পিতার সঙ্গে তার চেহারার মিলের কথা সেই ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছে যুবক। যাকে নিজের চোখে দেখেনি কোনোদিন আয়নায় নিজের চেহারা দেখে তাকে কল্পনায় ভেবে উঠতে পারে না।
পিতার মৃত্যুর সময় সে মায়ের পেটে সাত মাসের ভ্রণ। এতিম হিসেবেই জন্ম তার। কিন্তু পিতার কথা এত শুনেছে বড় হয়ে যে পিতার অভাব তাকে অনুভব করতে হয়েছে প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে। পিতার কথা উঠলে তার মনের মধ্যে আবেগের ঢেউ উঠত চেলা মাছের মত খলবল করে। আয়নায় নিজের চেহারা দেখে-দেখে লোকেদের মুখে শোনা বর্ণনা অনুযায়ী সে পিতার একটা আদল মনের পর্দায় এঁকে নিয়েছিল। গোটা কৈশোর জুড়ে এই একটা স্বপ্ন তাকে আকুল করে রেখেছিল। পিতার রেখে যাওয়া কিছু বই, বেশির ভাগই ধর্মীয়, তার মা তাকে দিয়েছিলেন। সেসব বই সে তখন পড়তে পারেনি। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ সেই থেকেই শুরু। এই আগ্রহ তাকে বাড়িছাড়া করেছে। তাদের অঞ্চলে নাগালের ভেতর তেমন কোনো স্কুল-মাদ্রাসা নেই। তাই তাকে পড়াশোনার খাতিরে বাড়িছাড়া হয়ে থাকতে হয়েছে আশৈশব।
বৈঠকখানার পেছনে, একটু দূরে একটা বড় গোয়াল। সেখানে অন্তত ছয়-সাত জোড়া গরু। টর্চ মেরে দেখেন মন্ডল গরুগুলো শুয়ে-দাঁড়িয়ে জাবর কাটছে। গোয়ালের পুব পাশ দিয়ে পৌঁছেন পুকুরপাড়ে। ছোট্ট পুকুর একটা, খানা-খন্দের চেয়ে বড়। এধরনের পুস্করিণীকে এ অঞ্চলের লোকেরা ‘মাইঠিল’ বলে। মাইঠিলের উত্তর-পুব কোণে শান-বাঁধানো ঘাট। বর্ষার পানিতে মাইঠিল টইটম্বুর। ওপরের কয়েকটা ধাপি ছাড়া ঘাটের প্রায় সবটাই ডুবে আছে। সাবধানে ঘাটে নেমে পায়ের পাক-কাদা ধুয়ে হাঁটু পর্যন্ত ছাফ-ছুতরো করে নেন আজিম মণ্ডল।
মাইঠিলের পুব পাড়ে তার চাচাতো ভাই আজগর ও আকবর মণ্ডলের বাড়ি। এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে নিয়ে বড় সংসার তাদের। উত্তর থেকে দক্ষিণে টানা অনেকগুলো ছড়ানো-ছিটানো ঘর। মাইঠিলের পাড় ঘেঁষে প্রশস্ত পথ। কিন্তু সে পথে না গিয়ে সরাসরি আজগর মণ্ডলের বাড়ির ভেতর ঢোকেন আজিম। এসব বাড়ির কোনো সীমানাপ্রাচীর নেই। একটার সঙ্গে আরেকটার খোলা উঠোন। আজগর মণ্ডলের লম্বা বারান্দাওয়ালা টিনের চারচালা বাড়ি, এক সারিতে পাঁচটা ঘর। এক বাড়িতেই বসবাস তার পাঁচ ছেলের। বড় দুই ছেলে মফেজ আর তফেজের বউছেলেমেয়ে নিয়ে আলাদা সংসার। বাকিদের নিয়ে এক ঠায়ে তার নিজের সংসার। বারান্দায় পাটি পেড়ে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন চলছে তাদের।
টর্চের আলো আর গলাখাঁকারি শুনে তারা টের পান আজিম মণ্ডল ঢুকেছেন বাড়িতে। ত্রস্ত হন সবাই।
-বড় বাপ! ভুনা খিচুড়ি রাইন্ধিছি। ইট্টুক মুখে দিয়ে যান না।
তফেজের বউটা বলে এ কথা। সে জানে, তাকে খেতে বসানো যাবে না। তবু মুখের কথা বলে সে, সৌজন্যের খাতিরে।
-না রে মা। খা তুরা। বাহিরে মেহমান আছে।
মেহমান আছে মানে মেহমানের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা না করে তিনি খাবেন না। কিছু পেয়ারের মেহমান আছে তার, তারা এলে সঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করেন। সেজন্য তারা তাকে পুনরায় আর অনুরাধ করে না।
আজিম মণ্ডল দাঁড়ালেন না দেখে আজগর মণ্ডল হারিকেন হাতে সামনে এগিয়ে আসেন। বারান্দার কিনারে এসে ডাকেন চাচাতো ছোট ভাইকেÑ ইট্টুক্ শুনো তো আজু।
আজগর মণ্ডল আকবর মণ্ডল দুজনেই বয়সে আজিম মণ্ডলের চেয়ে বড়। তাই তাদের কাছে আজিম আজু হয়েই থাকেন। তবে বংশের মোড়লি, সামাজিক মর্যাদা, এবং বিত্তের কারণে তিনি বড়র গুরুত্ব পান। কিন্তু বড়দের তিনি অবজ্ঞা করেন না।
-কাইল্ আমাক্ তিরিশটা ট্যাকা দিয়ো তো। সামনে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলেন আজগর মণ্ডল।
বোঝা যায় কাউকে জানাতে চান না তিনি। তাই আজু মণ্ডলও ফিসফিস করে বলেন, তিরিশ ট্যাকা? এ্যাতো ট্যাকা কী হবে?
-সে তুমাক্ পরে বুইল্বোনি।
-আচ্ছা, ঠিক আছে। দেখ্ফোনি।
সন্তুষ্টির হাসি ফোটে আজগর মণ্ডলের মুখে। আজু মণ্ডল যখন দেখবেন বলেছেন তখন আর চিন্তা নেই। না চাইলেও তিনি নিজেই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে টাকা নিতে ডেকে পাঠাবেন, না হয় পৌঁছে দেবেন।
এর পরেই তার নিজের বাড়ির উঠোন। সেটা অনেকটা হাঁটুভাঙা দ-এর মতো। একদিকে পুব-পশ্চিমে লম্বা, অন্যদিকে পশ্চিম প্রান্ত থেকে এগিয়ে দক্ষিণে বিস্তৃত। উঠোনের পুব প্রান্তে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা দড়তি ঘর। উত্তর সীমানা ঘেঁষে বড় হেঁশেল। আবার দক্ষিণের বাড়তি অংশেও ঘর কয়েকটা।
হেঁশেলে বড় বাতি জ্বলছে। তার সঙ্গে রয়েছে উনুনের আগুনের আলো। উঠোনে ছিটকে পড়ছে সেসব আলোর ছটা। বাড়িটাকে তাই আলো-আঁধারির আবছায়ায় রহস্যময় দেখায়। হেঁশেলটা একটা দোচালা ঘরের মতোন, ওপরে টিনের চালা, তিন দিকে গোবর-মাটি-খড় দিয়ে লেপা কঞ্চির বেড়া। সামনে অর্থাৎ দক্ষিণটা খোলা। মেঝে উঠোন থেকে কোমরসমান উঁচু। সেখানে তিন বউ, আর একদঙ্গল ছেলেমেয়ের হুড়োহুড়ি।
উঠোনে পা দিয়েই হাঁক-ডাক শুরু হয় আজু মণ্ডলের। তার আগেই তার আগমনবার্তা পৌঁছে গিয়েছে বাড়ির লোকজনের কাছে। আজগর মণ্ডলের বাড়ির কথাবার্তা কানে এসেছে তাদের। তারা প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। সাড়া দিলেন খোদেজা বিবি। -কী হইলো?
-খবর-টবর কিছু রাখো? বাহিরে মেহমান, সেখিনে বাতি নাই, বিছনা-পাতির ঠিক নাই। মেহমানদারির কুনু বালাই নাই। করে কী সব?
-মেহমান? শুনিনি তো! ক’জন?
-তা শুইন্বে ক্যান? কী আর বুইল্বো! আমি মর্ইলে এই বাড়ির লোকজনের শিয়ালে পাছা চাইট্পে, বুঝলে! দেখো, আমি বুইলি রাখ্নু।
-ক’জন?
-দু’জন।
-ওই হবেনি তাহিলে।
-তুমারে সোনাধন মানিকেরা সব কই? কুণ্ঠে গেইছে সব?
-সোনাধন মানিক বলতে তিনি এ বাড়ির তিন ছেলেকে বোঝান। এদের মধ্যে তার নিজের ছেলে এরফানই বড়। তারপর তার বোনপো আজিবর। মেজ ভায়ের ছেলে খলিল সব ছোট। সদ্য যুবক হয়ে ওঠা ছেলেমানুষ এরা। আজিবর আর খলিলই মেহমানদারির কাজগুলো বেশির ভাগ করে থাকে।
-খলিলের প্যাটের অসুখটা আবার বাইড়িছে। শুই আছে ঘরে।
-বাকি দু’জন?
-অরা যে কুণ্ঠে গেছে! সারাদিন দেখা নাই। দুফোরেও খায়তে আসেনি।
-অরে যে কী হবে তা আল্লাই জানে! লেখাপড়া তো কর্ইলো না, খালি টো-টো কইরি ঘুইরি বেড়ানি। জমি-জমাতে তো হাত দিবে না লাটসায়বের ব্যাটারা, ব্যবসা-বাণিজ্য করলেও তো হয়।
এ কথা নিত্য শুনতে হয় এ বাড়ির বউদের। কেউ উত্তর করে না। আজও সবাই মুখে কুলুপ এঁটে থাকে।
একটুক্ষণের জন্য থামলে সুযোগ নেন খোদেজা বিবি, -হাত-মুখ ধুই ল্যাও। ভাত খুলছি।
হাত-মুখ একবার ধোয়া হয়েছে। কিন্তু সে মাইঠিলের পানিতে। বাড়িতে আরেকবার কুয়ার ভাল পানিতে ধোয়ার অভ্যাস। তাই কথাটা বলা।
-হাত-মুখ পরে ধুছি। আগে মেহমানের খাওয়ার দ্যাও। বিছনা-পত্তর রেডি করো।
উত্তেজনায় এতক্ষণ উঠোনে দাঁড়িয়েই কথা বলছিলেন মণ্ডল। এবার ছাতা গুটিয়ে ঘরের বারান্দায় ওঠেন। একমানুষ উঁচু বারান্দা। এটা আটচালা টিনের বাড়ি, দেড় হাত বেড়ের মাটির দেওয়াল। তাতে পাশাপাশি তিনটা বড়-বড় ঘর। মণ্ডল ছাতাটা লটকে রাখেন বারান্দার বাতায় ঝুলিয়ে। বেশ প্রশস্ত ও লম্বা বারান্দা, সামনেই দুটো হাতলওয়ালা চেয়ার ছিল, তার একটা টেনে নিয়ে বসেন সেটায়।
-সলেমান, মজিদ, অরাও বাড়িতে নাই নাকি?
এরা তাঁর দুই ভাই। দক্ষিণের উঠোনে টানা বারান্দাওয়ালা তিন ঘরের বাড়িটায় ওরা থাকেন। এক হাঁড়িতেই রান্না-খাওয়া তিন ভায়ের। হৈ-চৈ শুনেই হয়তো বা, পাশের ঘর থেকে মণ্ডলের বুড়ো বাপ-মা বেরিয়ে আসেন। বাপ-মাকে দেখে উঠে চেয়ার টেনে দেন আজু মণ্ডল।
সেটায় বসেন হাজি সিরাজুদ্দিন মণ্ডল।
-বষ্ষা-বাদলের দিন, ঘুটঘুইট্টি আন্ধার… এ্যাতো রাইত করো ক্যান? ছেলের মাথায় হাত বুলাতে-বুলাতে বলেন মা।
-কতো আর রাইত হয়ছে মা? এই তো মগ্রেব গ্যালো।
-দিনকাল যা খারাপ! আমারে দুশ্চিন্তা হয় না? সকাল-সকাল কাম সাইরি বেলা থাইক্তে-থাইক্তে বাড়ি ফিরলে কী হয়! বলেন সিরাজুদ্দিন মণ্ডল।
মা আর কিছু না বলে ধাপিতে পা রাখেন। রান্নাঘরে যাবেন তিনি।
-সাবধানে যাইস্ মা, পা পিছলায় পড়িস্নি যেন্। এহ-হে, ছাতি লিলিনি ক্যান? কাশিডা আবার বাইড়্বেনি দেখিস।
মায়ের হাঁপানির টান আছে। সেজন্যেই এই সাবধানবাণী। কিন্তু মা ছেলের কথায় কান না দিয়ে মাথায় একটা গামছা চেপে উঠোনটুকু এক রকম দৌড়ে পার হন। আসলে বৃষ্টিরও আর জোর নেই। সারাদিন ঝরে-ঝরে এখন বেশ একটু গা-ছাড়া দিয়েছে।
-কদিন থেইকি দেখছি ফরমান ঘুরঘুর কইরছে। কী ব্যাপার?
কোনো জবাব না পেয়ে আবার কথাটা বলেন হাজি সায়েব। -আইজও মগরেবের সুমায় আইসিছলো। কী ব্যাপার?
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন আজু মণ্ডল, সে সময় পর-পর সলেমান এবং মজিদ এসে হাজির হন। ওদের দেখে তার কথার মোড় ঘুরে যায়। -কী রকুম মানুষ রে তুরা? ভিনদেশী মেহমান আইসি বইসি আছে আন্ধারে, ইট্টুক্ খবর লিতে হয় না? আমি না দেখলে কী হইতো বেচারিরে?
-না, না, আমি দেইখিছি। মুনে করছি খাওয়ার-দাওয়ার রেডি হোইক্… কৈফিয়তের লজ্জিত সুরে বলেন সলেমান মণ্ডল।
-হেরিকেলে ত্যাল নাই। ঘুট্টুইট্টি আন্ধারে বইসি আছে দুজন মানুষ। কেরাসিন আর বিছনা-পাতি লিয়ে যা। আমি পরে ভাত লিয়ে যাছি। অরা ইন্ডিয়ার মানুষ। মান্যি-গন্যি লোকের ছেলি। আমার বন্ধু মানুষের ছেলি-জামাই। আমি অরে বাড়িত্ একবার গেল্ছুনু। ছিনু দুদিন। যা, দেরি করিসনি।
সলেমান মণ্ডল লম্বা মানুষ, মুখে ছোট ছোট দাড়ি। তিনি দায়িত্বটা নেন, বলেন, যাছি। দ্যাও ভাবি, বিছনা-পাতি দ্যাও।
খোদেজা বিবি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এঘরে আসেন, ঢোকেন নিজের ঘরে। পেছন পেছন সলেমান মণ্ডল। দুজন মিলে কাঠের বিশাল একটা বাকসোর ঢাকনা তুলে চাদর-বালিশ বের করেন। কেরোসিন তেলের পাত্রটা দেবরের হাতে তুলে দেন খোদেজা বিবি। রান্নাঘর থেকে একটা দেশলাইও ধরিয়ে দেন তার হাতে। চাদর-বালিশ বগলদাবা করে ছাতা মাথায় বেরিয়ে যান সলেমান মণ্ডল। ততক্ষণে বড় ভাইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন মজিদ মণ্ডল।
-কথা হইলো?
-পীর সায়বের দেখা পাইনি। আবার কাল যাবো।
-কুনু দরকার নাই। বুইলি কুনু লাভ নাই। খালি-খালি দেরি হোয়ছে।
-না, একবার বুইল্তে হবে। পরে যেন্ দোষ দিতে না পারে।
-যা-ই করেন তাড়াতাড়ি করেন, নাহিলে আমরা ঠইগি যাবো।
-আচ্ছা, ঠিক আছে, দেখছি আমি।
ততক্ষণে উত্তরের ঘর থেকে খলিল বেরিয়ে এসেছে। কৈশোর এখনো যায়নি তার শরীর থেকে। হালকা, রোগাটে দেহ। তার সাড়া পেয়ে আজিম মণ্ডল ডাকেন তাকে। -তোর প্যাটের আবার কী হইলো?
-আমাশা।
-এ্যাতো আমাশা হয় ক্যান তোর? আমি তো বুঝিনি!
বড় চাচার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায় সে। -ওই বইডা আইনিছেন, বড় বাপ?
-না রে বাপ। আইজ্ বাজারে যাওয়াই হয়নি। জামিরাতে গেনু এক কামে, যাইতেই দেরি হইলো… পীর সায়বেরও দেখা পানুনি… তারপর বাপের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলেন, তে যায়ে শুননু যে শ্বশুরের শরীল খারাপ, তখুন না দেইখি কী কইরি আসি?
শ্যামপুর থেকে পুবে তিন ক্রোশ দূরের গ্রাম জামিরা। কাটাখালি হয়ে একটু ঘুরে যেতে হয় বলে ক্রোশখানেক রাস্তা বেশি হয়। সেটা তার শ্বশুরের গ্রাম। তিনি গিয়েছিলেন পীর সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর দেখা না পেয়ে ফিরেই আসছিলেন। পথে দেখা তাঁর এক চাচাতো শ্যালকের সঙ্গে। তার মুখে শুনলেন তার শ্বশুর অসুস্থ। সে কথা শোনার পর তাঁকে দেখতে না যাওয়া খারাপ দেখায়। তাই ফিরে গিয়েছিলেন। তাকে দেখতে গিয়ে আটকা পড়েছিলেন অনেকক্ষণ।
এসব কথা কিছু-কিছু পৌঁছে যায় হেঁশেলঘরে বউদের কানে। খোদেজা বিবি শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করেন, কার শরীল খারাপ? তিনিও স্পষ্ট শুনতে পারেননি। -কী জানি, কার কথা বুইল্ছে?
-মা, মুনে হয় নানার ব্যারাম। ছেলেমেয়েদের মধ্যে থেকে জানায় নাজিয়া, আজু মণ্ডলের ছোট মেয়ে।
বাপের অসুস্থতার কথা শুনে খোদেজা বিবি রান্নাঘর থেকেই চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করেন স্বামীকে- কী হয়ছে বাপজানের?
তার শাশুড়িও চুপ করে থাকতে পারেন না। ছেলের শ্বশুর তার নিজের বড় ভাই। -খারাপ খবর নাকি?
-না, ত্যামুন কিছু না। জ্বর-কাশি। আর বুকে নাকি মাঝে-মধ্যে কী রকুম ইট্টুক ব্যথা হোছে।
শুনে শান্ত হন তারা।
সিরাজুদ্দিন মণ্ডল তখন জিজ্ঞেস করেন- পীর সায়বের কাছে কী কাম? আবার কী হোইলো?
দুই ছেলের নিচু স্বরে আলাপ শুনে তাঁর সন্দেহ হয়েছিল কিছু একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। হয়তো তারা পীর সাহেবের মধ্যস্থতা কামনা করছে। তার মানে উত্তরপাড়ার সাথে কোনো গোলযোগ হবে, মনে-মনে ভাবেন তিনি। অনেকদিন হয় কিছু ঘটেনি। প্রত্যেক বছরই তো এই দুই পাড়ার মধ্যে একটা-না-একটা ব্যাপার নিয়ে দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ হয়ই। এবারই বা তাহলে হবে না কেন? গণ্ডগোল-মারামারির ছুঁতা পেলে দুইপাড়ার লোক যেন হামলে পড়ে শকুনের মড়া গরুর গন্ধ পাওয়ার মতো। খুব ভয় করে তার। কবে যে কার কোন বড় ক্ষতি হয়ে যায়।
-আবার কী লিয়ে গণ্ডগোল বাধলো?
-না, ত্যামুন কিছু না।
-ঝুট-ঝামেলাতে যায়ো না। দিনকাল খারাপ।
-দিনকাল খারাপ, দিনকাল খারাপ কইরছো ক্যান তুমরা? দিনকালের আবার কী হোইলো?
-দেখছো না চারিদিক কী হোইছে? দ্যাশটা কেবল স্বাধীন হোইলো, এ্যার মধ্যেই শুরু হয়া গেল মারামারি-কাটাকাটি।
এবার বুঝতে পারেন আজিম মণ্ডল। রাজনীতির কথা বলছেন তার বাপ। গোটা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে বাংলা ভাষা নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছে। রাজশাহী শহরেও তার ঢেউ লেগেছে। মাস্টার, উকিল, এমনকি স্কুলের ছাত্ররাও মিছিল-মিটিং করে। মাঝে-মাঝে পুলিশের সাথে মারামারি হচ্ছে। গ্রেপ্তার হয়েছে অনেক লোক। শহর তো দূরে নয়, মাত্র তিন ক্রোশের ব্যবধান। তাছাড়া এই গ্রামের লোকেদের ভাল যোগাযোগ আছে শহরের লোকেদের সঙ্গে। যাতায়াত আছে। সুতরাং খবর পেতে দেরি হয় না। কানে আসে সব কথাই।
-ওইসব রাজনীতির সাথে আমারে কী সম্পর্ক বাপ?
-দেখো, তুমাক্ যেন্ না জড়ায়।
এটা একটা ইঙ্গিতময় কথা। সিরাজুদ্দিন জানেন যতদিন যাচ্ছে নানান কাজকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন আজিম মণ্ডল। কত রকম লোকের সঙ্গে যে তার ওঠাবসা। বিশেষ করে হামিদ মিয়ার ছোট ভাই সামাদ মিয়ার সঙ্গে ইদানীং তার ভাব জমে উঠেছে। হামিদ মিয়া রাজশাহী জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি। সামাদ মিয়াও শিক্ষিত প্রভাবশালী তরুণ। তাদের পাল্লায় পড়ে রাজনীতির সঙ্গেও জড়াবেন না আজিম মণ্ডল এমন কথা হলপ করে বলা যায় না। তারা নিজেরাও তো মুসলিম লীগেরই সমর্থক। ব্রিটিশ আমলে তারাও অনেক সভা-সমিতিতে যোগদান করেছেন। এই শ্যামপুরেও একবার মুসলিম লীগের মিটিং হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী এসেছিলেন সেই মিটিংয়ে। একবার ফজলুল হকও এসেছিলেন। হক সাহেবের লোকেরা তো তাদের পার্টিতে আজিম মণ্ডলের নাম তুলে দিয়েছিল। এ নিয়ে মুসলিম লীগের সে কী টানাহেঁচড়া! জামিরার পীর সাহেব পর্যন্ত এসেছিলেন সে সমস্যার সমাধান করতে। তারা শেষ পর্যন্ত বুঝেছিলেন পাকিস্তান অর্জন করতে হলে মুসলিম লীগের বিকল্প নেই এখন। তারপর থেকে অবশ্য তারা আর কখনও কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেননি। দেশ স্বাধীন হয়ে গিয়েছে। এখন তো আর কোনো আন্দোলন-ফান্দোলনের দরকার নেই। এ রকমই বুঝেছিলেন তারা। কিন্তু এখন দেখছেন আন্দোলন থামছে না, বরং বিস্তৃত হচ্ছে আষাঢ়ের মেঘের মতো গড়িয়ে-ছড়িয়ে। পার্থক্য শুধু এই যে এখন মারামারিটা নিজেদের মধ্যে। ভারি যন্ত্রণার কথা!
-আরে ভাই, উর্দুও থাইক্পে, বাংলাও থাইক্পে, অসুবিধা কী? এ লিয়ে মারামারির কুনু দরকার আছে?
রাজনীতির আলাপ বেশ জমে উঠছিল, কিন্তু বাদ সাধলেন খোদেজা বিবি। মেহমানের খাবার প্রস্তুত।
-আমি যাছি। মজিদ মণ্ডল এগিয়ে আসেন।
-না, আমিই যাই। অরে সাথে আমার কথা আছে। খলিল, তুই চল্ ব্যাটা আমার সাথে।
একথা বলেই তার অসুখের কথা মনে হয় তার। তখন বলেন, ও, তোর তো ব্যারাম। থাক তুই।
-না, ত্যামুন না বড় বাপ। চলেন।
এই ছেলেটাকে অত্যন্ত ভালবাসেন আজিম মণ্ডল। খুব কাজের ছেলে। শৈশবে মাকে হারিয়েছে। তার বাপ আরেকটা বিয়ে করেছেন। চাচা-চাচীদের কাছেই মূলত মানুষ সে। মা-হারা ছেলেটিকে তিনি সময়-সুযোগ পেলেই কোলে-পিঠে নিয়ে আদর করতেন। এটা-ওটা এনে খাওয়াতেন। সেজন্যই হয়তো বা, বড় চাচার খুব ন্যাওটা হয়েছে সে।
ফিরফিরে বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় চাচা-ভাতিজা মেহমানের খাবার নিয়ে রওনা হলেন।
রান্নাঘরটা বিশাল। তার দুটো অংশ, মাঝখানে পাটখড়ির বেড়া। একটায় চ্যালাকাঠ-ইত্যাদি জ্বালানির পালা। অন্যটার একটা ছোট্ট অংশ বাতার চেগার দিয়ে ঘেরা। সেখানে হাঁড়ি-কুড়ি, রান্না-সংক্রান্ত জিনিসপত্র সাজানো। বাকি অংশের এক কোণে দুটো উনুন। তার কাছ ঘেঁষে সার করে রাখা ভাতের হাঁড়ি, তরকারির কড়াই, ডালের ডেকচি, আর থালাবাসনের পাহাড়। সেগুলোকে সামনে রেখে খেজুরের পাটিতে বসেছে ছেলেমেয়েরা। বউ তিনজন তাদের সামনে থালা ঠেলে দেন। খোদেজা বিবি বড়-বড় গামলায় ও বাটিতে ভাত বেড়ে দিচ্ছেন, বাকি দু’জন ছেলেমেয়েদের পাতে তুলে দিচ্ছেন। ওদের খাওয়া হলে বড়রা খাবে। তারপর মেয়েরা।
-তুমার শ্বশুর খিদি-খিদি কর্ইছলো, খাওয়ায়ে দিবে নাকি? বড় বউকে উদ্দেশ করে বলেন আজিম মণ্ডলের মা। উনুনের পাশে একটা কাঠের উঁচু পিঁড়িতে বসে আছেন তিনি।
শাশুড়ির কথা শুনে খোদেজা বিবি বলেন, ঘরে দিয়ে আইস্পো নাকি?
-জিজ্ঞেসা করো তো।
তখন-তখনি জিজ্ঞাসা ছুঁড়ে দেন খোদেজা বিবিÑ বাপজান, আপনের খাওয়ার দিবো? খুইলি লিয়ে আসি?
-না, তার দরকার নাই। আজিমেরা আসুক, সগলাই একসাথেই বইস্পোনি।
-ক্যান, খিদি-খিদি কর্ইছেলেন যে?
-না, ঠিক আছে। একসাথে খাবোনি।
রান্নাঘরে ছেলেমেয়েদের হাসাহাসি আর মা-চাচীদের ধমকানির মধ্যে খাওয়ার পর্ব চলতে থাকে। দুটো কুকুর বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে এসে পালঙ্গায় দাঁড়ায়। ওদেরও সময়জ্ঞান আছে। জানে এ সময়ই এ বাড়িতে রোজ খাওয়ার পাত পড়ে।
মজিদ বড় ভাইয়ের ছেড়ে-যাওয়া চেয়ারটায় বসেন। হাজি সিরাজুদ্দিন এবার তার দিকে মন দেন। -ক্যা রে, কী কথা বুল্ছিলি?
মজিদ একটু ডানপিটে স্বভাবের। আচরণ কিছুটা উদ্ধত। তিনি তার কথায় কান দিচ্ছেন না দেখে সিরাজুদ্দিন এাবার কণ্ঠে চাপ সৃষ্টি করে বলেন, পীর সায়বের কাছে কী ব্যাপার? কী হয়ছে?
এবার আর সাড়া না দিয়ে পারেন না মজিদ। -না, ত্যামুন কিছু না।
-ত্যামুন না মানে? বুইল্লেই হলো? আজিম কি এমনি-এমনি পীর সায়বের কাছে যাওয়ার মানুষ? নিচ্চয় কিছু হয়ছে। বুলছিছ্নি ক্যান?
-বুল্নু তো ত্যামুন কিছু না।
-তোর চাচা শ্বশুরক্ েকদিন থেকি দেখছি রোজ আইস্ছে। কী ব্যাপার? অরে কিছু হয়ছে নাকি?
বাপ তার ঠিকই আন্দাজ করেছেন। ফাঁকি দেওয়ার উপায় নেই। কীভাবে কথাটা বলবেন বাপকে ভাবেন মজিদ মণ্ডল। তার শ্বশুরবাড়ির ব্যাপারে হাজি সায়েবের বিরাগ আছে। ওই বাড়িতে তিনি ছেলের বিয়ে দিতে চাননি। ছেলের আগ্রহে বাধ্য হয়েছেন। সেজন্যে ও-বাড়ির লোকেদের সঙ্গে স্বাভাবিক সৌজন্য বজায় রাখলেও তিনি তাদের খুব একটা সুনজরে দেখেন না। সুতরাং জানতে পারলে তিনি বাগড়া দিতে পারেন এই আশঙ্কায় মজিদ ইচ্ছা করেই চেপে রাখতে চেয়েছেন ব্যাপারটা। এখন বাপ যখন আন্দাজ করে ফেলেছেন তখন তার আর জানতে বাকি থাকবে না, সেটা অবধারিত। তাই ব্যাপারটা সংক্ষেপে খুলে বলাই ভাল।
গোয়ালপাড়ায় বাড়ি মজিদের শ্বশুর আজমত ফকিরের। একসময় বেশ রমরমা অবস্থা ছিল তাদের। তাদের বাপ-চাচারা জমি-জমা নিয়ে দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদে পড়েছিল। একবার জমি দখল নিয়ে এক মারামারি হয়। মারা যায় একজন। সেই মামলা সামলাতে সহায়-সম্পত্তি সাবাড় হয়ে গেল। এতদিন পরে এসে আবার এক জমি নিয়ে গোল বেধেছে। আজমত ফকিরের ছোট ভাই ফরমান তার দুই বিঘা জমি কটে (বন্ধক) দিয়েছিল একই পাড়ার চাইন্দ্যা আমিরের কাছে। ছোটবেলা থেকেই তার মাথায় টাক, তাই চাইন্দ্যা। কট ছাড়াতে না পেরে আর কিছু টাকা নিয়ে ফরমান তার জমিটা বিক্রি করে দিয়েছে চাইন্দ্যা আমিরের কাছে। ওই দাগে আরো দেড় বিঘা জমি আছে। সেটুকুও কট আছে তার কাছে। কয়দিন আগে উত্তরপাড়ার পলান মণ্ডল সেই জমিতে চাষ দিয়েছে। তার দাবি, পুরো জমিটা চাইন্দ্যা আমিরের কাছ থেকে কিনে নিয়েছে সে। চাইন্দ্যা আমিরও সমর্থন করছে সে কথা। কিন্তু ফরমান বলছে সে বিক্রি করেছে দুই বিঘা। বাকি দেড়বিঘা আছে কটে।
-তাহিলে এখুন তো দেখছি মারামারি লাইগ্বে উত্তরপাড়ার সাথে। তে এ্যার ভিতর তুরা ক্যান? তোরে কী স্বার্থ?
-না, আমারে আর কী স্বার্থ। কিন্তুক এডি অন্যায় না? চিটারি কইরি বেশি জমি রেস্টিরি কইরি লিইছে।
-অন্যায় তো বটেই, কিন্তুক তাতে তোরে কী ক্ষতি?
-আমারে আত্মীয় না অরা? আর সমাজে এত বড় একটা অন্যায় হবে, তার প্রতিকার হবে না?
-দ্যাখ্, পরার জইড়্ (জটিলতা) ঘাড়ে লিয়ে দ্বন্দ্বে যাইস্নি মান্ষের সাথে। অরা লোক ভাল না।
এ নিয়ে বাপের সঙ্গে তর্ক করতে চান না মজিদ মণ্ডল। তিনি কোনো জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকেন।
ছেলেমেয়েদের খাওয়ার পর্ব শেষ। তারা যে যার মতো নিজ-নিজ ঘরের দিকে চলে যায়। সে সময় সলেমান মণ্ডল ফিরে এলেন।
-কই গো খলিলের বাপ, তুমার ভাই আইলো না?
-ভাই যে-গল্প জুইড়িছে! মুনে হয় দেরি হবে।
-তে খলিলও আইস্লো না? উই খাবে কখুন?
-ডাকনু, তা-ও আইলো না। বুলে, বড় বাপের সাথে খাবো।
এ রকম হয়। মেহমানকে খাওয়াতে গিয়ে গল্প জুড়ে দেন আজিম মণ্ডল। কোনো কোনো দিন অনেক দেরি করে ফেলেন। আর খলিলও প্রায়ই তার সাথী হয়। এ রকম পরিস্থিতির সঙ্গে অভ্যস্ত তারা।
খোদেজা বিবি বলেন, তাহিলে আপর্নেখে খাওয়ার দিই, নাকি বাপজান? আপনের ছেলির যখুন দেরি হবে…
বাপের বদলে উত্তর আসে মজিদ মণ্ডলের কাছ থেকে- ভাইয়ের গল্প সহজে শেষ হবে না। আর্মাখে খাওয়ায়ে দ্যাও।
খাবার বাড়তে ব্যস্ত হয়ে পড়েন বাড়ির বউ তিন জন।
দুই.
শ্যামপুর, রাজশাহী
পূর্ব পাকিস্তান
২৩ জুলাই, ১৯৫১ ইং
মুহতারাম মেজভাই,
আমার সালাম লইবেন। আশা করি খোদার ফজলে বাড়ির সকলেই ছহি-ছালামতে রহিয়াছেন। আপনাদের দোয়ায় আমিও একরূপ আছি।
বাদ সমাচার যে-কথাটি বলিতে চাই তাহা হইল, খোদা আমার মুখের দিকে রহমতের দৃষ্টি লইয়া চাহিয়াছেন। আমি পাকিস্তানে যে লক্ষ্য লইয়া আসিয়াছি খোদার রহমতে এবং আপনাদের সকলের দোয়ায় তাহা চরিতার্থ হইবে বলিয়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস। প্রথমত, আমার আশ্রয় জুটিয়াছে মুহতারাম আজিম মণ্ডল সাহেবের বাড়িতে। তিনি এই অঞ্চলের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। সম্পদশালী ও অভিজাত মানুষ। অতিশয় ভদ্রলোক এবং সহানুভূতিশীল। তাহা ছাড়া তিনি আমাদের বাপজির কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখিয়াছেন। তিনি আমাকে সন্তান জ্ঞানে গ্রহণ করিয়াছেন। আমার মনে হয়, আমি এইখানে ভালই থাকিব। এইখানে থাকা-খাওয়ার কোনও অসুবিধা হইবে বলিয়া মনে হয় না। এখন প্রয়োজন হইবে শুধু লেখাপড়া, কাগজ-কলম, যাতায়াত এবং পোশাক-আশাক, ইত্যাকার খরচাদি। পাকিস্তানে সব কিছুই বেশ রকম সস্তা। আমার জমির দরুন আমি যে ফসল পাইব তাহার অর্ধেকেই এইসব খরচ সংকুলান হইয়া যাইবে তাহাতে সন্দেহ নাই। তাই আপনার নিকট সনির্বন্ধ অনুরোধ, জমিগুলি ভালভাবে আবাদ করিবেন এবং আমার ভাগের ফসল বিক্রয় করিয়া টাকা পাঠাইবেন। আমি এইখানে আসিবার সময় যে টাকা আনিয়াছি তাহাতে বড়জোর দুই মাস চলিবে। কেননা, কলেজে ভর্তি হইতে এবং বইপত্র কিনিতেই অনেকগুলি টাকা খরচ হইয়া যাইবে। তাই সময় থাকিতেই, অর্থাৎ আগামী মাসেই পাট বিক্রয় করিয়া টাকা পাঠাইবার ব্যবস্থা করিবেন। আমার মনে হয় টাকা লইয়া আপনি নিজে আসিলেই ভাল হইবে। তাহা হইলে আমরা যে বিনিময়ের কথা আলোচনা করিয়াছিলাম আপনি স্বয়ং তাহার খোঁজ-খবর লইতে পারিবেন।
এই পত্র হস্তগত হওয়া মাত্রই আপনার মতামত জানাইবেন এই আশায় শেষ করিলাম। ইতি-
আপনার স্নেহধন্য
মমিনুর রহমান মোল্লা
চিঠি লেখা শেষ হলে বার দুয়েক পড়ে মমিন। ভাবে, তার মনে কত আবেগই না জমা হয়েছিল, ভেবেছিল দু-চার পৃষ্ঠা চিঠি লিখতে হবে। কিন্তু সব কথা এতেই শেষ হয়ে গেল! মনে মনে বলে, না, ঠিকই আছে। চিঠিতে কত কথা আর লেখা যায়। আরও যেসব কথা আছে তা খেজমত দুলাভাই বলবে। খেজমত মানে খেজমত শেখ, যে তার সঙ্গে এসেছে। তার মেজ বোনের স্বামী। শ্বশুর-শাশুড়ির প্রিয়পাত্র ছিল সে। তার বাপজির মৃত্যুর পর যতদিন মা বেঁচে ছিলেন ততদিন সে বলতে গেলে তাদের বাড়িতেই থাকত। তারপরেও তার প্রভাব ছিল। একবার মেজ ভাইয়ের সঙ্গে তার ভীষণ ঝগড়া হয়েছিল। সেটা তাকে নিয়েই। ব্যাপারটা খুব সামান্য। ডোমকুলের আমিনাবাদ মাদ্রাসায় সে পড়ত তখন। ছুটিতে বাড়ি এসেছিল। মেজ ভাই আমিন মোল্লা তাকে মাঠে কাজে ডেকেছিল। কিন্তু যেতে দেয়নি খেজমত শেখ। সে তাকে তার বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যায় আবার সাথে করে বাড়িতে রাখতে এসেছিল। বলা নেই, কওয়া নেই মমিনকে ধরে মারতে শুরু করে আমিন মোল্লা। খেজমত শেখ বাধা দিতে গেলে আমিনের সঙ্গে তার কিছু ঠেলাঠেলি হয়। আর তুমুল ঝগড়া শুরু হয়। দুজনেই অনেক কটু কথা বলেছিলেন সেদিন। তারপর থেকে শ্বশুরবাড়িতে আসা-যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন খেজমত। কিন্তু মমিনকে ভালবাসে এখনো নিজের ছোট ভাইয়ের মতন। এই এতিম ছেলেটির জন্যে তার অনেক কিছু করার ইচ্ছা। এই যেমন তাকে নিয়ে পাকিস্তানে এসেছে। কেউ চায়নি এটা। কিন্তু সে বলেছে, ‘তুই য্যাখুন চাইস্ তো আমি তোকে লিয়ে যাবো। তুই বড় হ, এই আমি চাই।’ এই শ্যালকটিকে নিয়ে তার খুব উচ্চ আশা। দেশ-বিদেশে লোকের বাড়ি জায়গির থেকে কত কষ্ট করে ম্যাট্রিক পাস করল। তা-ও কিনা ফার্স্ট ডিভিশনে। হিন্দুস্তানে মুসলমানের ছেলে এমন লেখাপড়া করতে পারে তা গোটা ডোমকুল অঞ্চলে অবিশ্বাস্য ছিল। যখন তার ফল বের হয় তখন সে হুগলিতে জায়গির বাড়িতে। সেখানকার ভাবতা হাইমাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে মমিন। কয়েকদিন পরে যখন সে বাড়ি আসে তখন মানুষের ঢল নেমেছিল তাকে দেখার জন্য। হিন্দুরাও বাদ যায়নি। দিন দুই পরে মেজ ভাইয়ের পরামর্শে হিন্দুপাড়ায় গিয়েছিল দুকড়ি সান্যালের আশীর্বাদ নিতে। তার বারান্দায় নিচু জাত আর মুসলমানদের বসার জন্য বরাদ্দ থাকত একটা ময়লা পাটের মাদুর। কিন্তু মমিনকে সম্মান জানিয়ে তিনি চেয়ার দিয়েছিলেন। সে কথা অনেকদিন ধরে চাউর হয়েছিল সারা গ্রামে। কিন্তু কেউই চায়নি সে আরও লেখাপড়া করুক। কোথায় করবে লেখাপড়া? কী পড়বে? পড়ে করবেই বা কী? হিন্দুস্তানে কি মুসলমানের চাকরি-বাকরি হবে? তার চেয়ে বাপের যে জমি পেয়েছে ভাগে তা-ই চাষবাস করুক। আর আশপাশের কোনও প্রাইভেট স্কুল-মাদ্রাসায় মাস্টারি করুক। কেবল খেজমত শেখই মমিনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তাকে মনের কথা জানিয়েছে মমিন। সে পাকিস্তানে যেতে চায়। সেটা মুসলমানের দেশ। সেখানে গেলে অনেক সুবিধা পাবে। এসব কথা সে ভাবতায়, বেলডাঙ্গায়, গণ্যমান্য লোকেদের মুখে শুনেছে। সেসব এলাকার মুসলমানেরা যে-যেভাবে পারছে পাকিস্তানে চলে যাচ্ছে। সে-ও পাকিস্তানে যাবে, যা আছে কপালে। কেউ নেই তো কী হয়েছে! ভাবতায় কে ছিল? পরের বাড়িতে থেকেই তো লেখাপড়া করেছে এতদিন। পাকিস্তানে গিয়েও তা-ই করবে। তার এই আকাক্সক্ষার কথা শুনে খেজমতই প্রথম তাকে আজিম মন্ডলের খবর দিয়েছে। জামিরার পীর সাহেবের কথা তার জানা ছিল। মহম্মদ হুসেন মোল্লা তার হাতেই আহলে হাদিসের বায়আত নিয়েছিলেন বহরমপুরের এক জলসায়। খেজমতও শ্বশুরের সঙ্গে আহলে হাদিস হয়েছিল। সে জানত জামিরার কাছাকাছিই হবে শ্যামপুর গ্রাম। তাছাড়া আজিম মন্ডলরাও আহলে হাদিসের অনুসারী। সুতরাং জামিরায় গেলেই শ্যামপুর বা আজিম মন্ডলের খোঁজ পাওয়া যাবে। এই সূত্রটুকু ধরেই মমিনকে নিয়ে এখানে এসেছে খেজমত শেখ। এবং ঠিক খুঁজে বের করেছে আজিম মন্ডলকে। আর মন্ডল সাহেবও সবকিছু শুনে নিজেই মমিনকে রাখতে চেয়েছেন তার বাড়িতে। তার শ্রম সার্থক হয়েছে।
-কত বড় উপকার যে আপনি কর্ইলেন মুন্ডলজি! আমরা আপনার এই উপকারের কথা কুনোদিনও ভুলব না। আজিম মন্ডলের স্বতঃপ্রবৃত্ত প্রস্তাব শুনে আবেগঘন কণ্ঠে এ কথা বলেছিল খেজমত গতকাল রাতে।
– শুনো জামাই, মহম্মদ হুসেন ভাই যদিল্ আইজ বাঁইচি থাকতেন, আর তিনি যদিল্ একটা চিঠি পাঠায়ে বুইল্তেন তাহিলে আমি কি না কর্ইতে পারতু? তা ছাড়া আল্লাহ কি আমাক্ একটা অতিরিক্ত মানুষ পুষার সামর্থ্যও দেয়নি নাকি? ওসব কথা রাখো। খেজমতের কাঁধে বাম হাতের চাপড় দিতে-দিতে বলেছিলেন মন্ডল। মৃদু হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল তার মুখ।
-আমি তাহলে কাইল ফজর পইড়েই রওনা দিব বাপজি, আমাদের জন্য দোয়া কোর্ইবেন।
-আরে না। কয়দিন থাইকি যাও, ঘুইরি-ফিরি বেড়াও। আবার কবে আইস্পে তার ঠিক আছে?
বন্ধুর জামাই, সুতরাং তারও জামাই বৈকি। কণ্ঠে সেই আন্তরিকতা মন্ডলের। বিগলিত হয় খেজমত শেখ।
তারপর শুয়ে-শুয়ে দুই শ্যালক-দুলাভাই-এর মধ্যে অনেকক্ষণ কথা চলেছিল এইসব নিয়ে।
ফজরের নামাজের পর চিঠি লিখতে বসে মমিন। পরে লিখলেও চলত, যেহেতু খেজমত থাকবে আরও দুতিন দিন। কিন্তু কাজ ফেলে রাখা তার স্বভাববিরুদ্ধ। এটা শিখেছে ভাবতায় তার শিক্ষক মৌলবি হারেজ আলীর কাছে। হুজুর তাকে খুব পছন্দ করতেন। নানাভাবে সাহায্য তো করতেনই, আর সব সময় সুপরামর্শ দিতেন। নিজের কাজ নিজে করা, আর যখনকার কাজ তখনই করার অভ্যাস তিনিই তার মধ্যে গড়ে তুলেছেন। সেজন্যে চিঠি লেখার কাজটা সে ফেলে রাখতে পারেনি। তাছাড়া একটা আবেগের ঢেউ খেলে যাচ্ছিল তার মনের মধ্যে। বর্ষা না হলে বাইরে হাঁটাহাঁটি করতে পারত। তাতে হয়তো তার অন্তরের অস্থিরতা দূর হতো কিছু। এই বিদেশ-বিভুঁয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত লোকের কাছে কী ব্যবহার পাবে সে নিয়ে তার দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। খেজমত শেখ অশিক্ষিত, সরল-সোজা মানুষ। তাকে বুঝতে দেয়নি মমিন তার হৃদয়ের উদ্বেগ। এত সহজে, এত সংক্ষেপে, তার স্বপ্ন পূরণ হবে তা সে কল্পনাও করেনি। দু’রাকাত শুকরানা নামাজ পড়ে সে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে সৃষ্টিকর্তাকে।
কিন্তু একটা উদ্বেগ এখনও তার মনের মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে বেড়াচ্ছে। সেটা হলো পড়াশোনার খরচ সংস্থানের প্রশ্ন। সাড়ে বারো বিঘা জমি পেয়েছে ভাগে। খুব ভাল জমি। প্রচুর ফসল হয়। তার দশ বিঘা আবাদ করে মেজ ভাই। বাকিটা ল (সেজো) ভাই দবির মোল্লা। ল ভাইকে নিয়ে চিন্তা নেই। তিনি সময় মতো তার পাওনা বুঝিয়ে দেন। সমস্যা মেজ ভাইকে নিয়ে। প্রথমত তার বড় সংসার, ছেলেমেয়েরা সব ছোট, লেখাপড়া করছে। তার খরচ অনেক। তা ছাড়া তার হাতটাই আসলে খাট। একবারে তিনি কখনও ফসলের ভাগ বুঝিয়ে দেন না। এতদিন দেশেই ছিল, কাছে-কোলে ছিল। প্রয়োজন মতো যখন-তখন গিয়ে কিছু-না-কিছু আদায় করতে পারত। এখন এই আলাদা দেশ থেকে অত দূরে ঘনঘন যাওয়া কি সম্ভব হবে? খেজমতের শরণাপন্ন হয় সে। – দুলাভাই, চিঠি লেখলাম লেখা দরকার তাই, আসলে মাইজ্ভাইকে সবকিছু কিন্তু আপনাকে বুঝিয়ে বোইল্তে হবে।
-আমি যা বলার তা তো বোইল্বোই। তবে আমিনকে তো তুই চিনিস ভালই। তোকেই শক্ত হোইতে হবে।
সেকথা এর আগেও অনেকবার ভেবেছে মমিন। মনে করেছে ভাই টাকা-পয়সা ঠিক মতো না দিলে জমি অন্য লোককে ভাগে দিবে। কিন্তু সেটা কি এত সহজে সম্ভব? তাদের পরিবারের সুনাম আছে। সবাই মোল্লা পরিবারকে সমীহ করে। মেজভাই দোকুড়ি সান্যালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মোড়লি করে গ্রামে। তার পৈতৃক জমি চাষ করবে অন্য লোকে তাই কি হয়? তা ছাড়া জমিগুলো তার দরকার। বড় সংসারের বড় খরচ। শুধু নিজের জমিতে তার সংস্থান হয় না। মমিনও চায় না বিপদে পড়–ক তার ভাই ছেলেমেয়ে নিয়ে। তার তো খুব বেশি কিছু দরকার নয়। তার জমি থেকে যা আয় হয় তার সবটুকু তার প্রয়োজন হয় না। বাকিটুকু ভাইয়ের কাছেই থেকে যায়। সে হিসাব ভাই দেন না দেখে তার খারাপ লাগে বটে, কিন্তু সে কোনোদিন তার হিসাব চায়নি, চাইবেও না কখনও। ভাইকে সহযোগিতা করার জন্যই সে এই হিসাব নেয় না। তারপরেও যদি নিজের প্রয়োজনের টাকাটা না পাওয়া যায় তাহলে… ব্যাপারটা সে ভাবতেই পারে না।
– ভাই টাকা-পয়সা সময় মতো দিবে না বোলে মনে করছেন আপনি?
একটু দ্বিধান্বিত দেখায় খেজমতকে। -না, তা লয়। দিবে না ক্যানে? দিবে। তবে সুমায় মতো দিবে কিনা সেডাই কথা।
একথা শুনে মমিন একটু ঘাবড়ে যায়। সেটা তার ফর্শা মুখে এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে ঘরের স্বল্পালোকেও তা দৃশ্যমান হয়। বুঝতে পারে খেজমত। তখন এতিম শ্যালককে সান্ত¦না দিতে বলে, তবে আগের কথা আর এখনকার কথা আলাদা অবশ্য। ভিন দ্যাশ বলে কথা। ও লিয়ে তুই অতো ভাবিসনি। আমরা আছি না? কুনো অসুবিধা হবে না।
‘আমরা’ মানে তিনি নিজে আর ল ভাই। তাদের কতটুকু সামর্থ্য সে তার জানা। তাছাড়া ল ভাইয়ের লেখাপড়ার ব্যাপারে তেমন একটা আগ্রহ নেই। বিশেষ করে এজন্য ভিন দেশে যাওয়াকে তিনি একেবারেই সমর্থন করেন না। বাধা দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত বলেছিলেন, তা পড়বিই য্যাখুন, দ্যাশেই পড়। বিদেশে যাওয়ার দরকার নাই। শোনেনি মমিন। দবির মোল্লা নরম মানুষ। বলার কথা বলেছেন, কিন্তু জেদাজেদি করেননি।
– গাজল বুধায় একাধটু কইম্লো নাকি?
গাজল মানে একনাগাড়ে, কয়েকদিন ধরে অবিরাম বর্ষণ। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে গাজল খুব স্বাভাবিক ঘটনা। বৈঠকঘরের টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম ঝুমঝুম গানের ঐকতান। এখন তার স্বরগ্রাম বেশ নিচু।
দু’জনেই বেরিয়ে আসে বাইরে, বারান্দায়। হ্যাঁ, বৃষ্টি এখন নেই বললেই চলে।
টুলটায় বসে ওরা।
সকালটা এখনও আঁধার-আঁধার। আকাশে পুরু কালো মেঘ। বাতাস নেই এতটুকু। ঝিপঝিপ বৃষ্টি মাথায় জবুথবু হয়ে ভিজছে চরাচর। পৃথিবীটা হাঁটু মুড়ে হাত-পা জড়িয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে যেন কখন বৃষ্টি থামে এই আশায়।
বৈঠকঘরটা উত্তরমুখী। তার সামনেই একটা মাঝারি আকারের ফজলি আমের গাছ। তারপরে একটা খন্দক, বর্ষার ঘোলা পানিতে টইটম্বুর। সেটা পশ্চিমে খানিকটা বিস্তৃত হয়ে দক্ষিণে বেঁকে এগিয়েছে বৈঠকঘর বরাবর। তার পাড়ে জঙ্গল। পানিছিটকির ঝাড় হলুদ স্বর্ণলতায় ছাওয়া। খাদের উত্তরপাড়ে পুবমুখী মসজিদ। মসজিদের ওপরে টিনের চালা, কিন্তু বেড়া কঞ্চির, খড়-মাটি দিয়ে ছিমছাম করে লেপা। বেড়ার নিচের প্রায় অর্ধেকটা বৃষ্টির ছাঁট লেগে ভিজে আছে। ধারিটা বেশ উঁচু করে ইট দিয়ে বাঁধানো। মেঝেয় সিমেন্টের প্রলেপ। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ওয়াক্তিয়া মসজিদ এটা। এখানে জুমার নামাজ হয় না। জুমা মসজিদ উত্তরপাড়ায়। সেটা অনেকখানি দূরেই। সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে নামাজ পড়তে যাওয়া অসুবিধা। সেজন্য এই মসজিদ। আশপাশের সাবালক পুরুষরা এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জামাতে শামিল হয়। মসজিদের সামনে ফাঁকা জায়গা অনেকখানি। এই বাড়ির লোকজনের বাইরে যাতায়াত চলে তার ওপর দিয়েই। মসজিদের পেছনে একটা আমবাগান। সব কটাই ফজলি আমের গাছ। বাগান ঘেঁষে পশ্চিমে কতকগুলো বসতবাড়ি। বৈঠকঘরের পুব ঘেঁষে একটা টিউবওয়েল। তার ওপাশে, একটু ফারাকে, দক্ষিণ আর পুব জুড়ে বাড়ি-ঘর। বাড়িঘরগুলো সব মাটির, উঁচু-উঁচু ধারি সব ক’টা বাড়ির।
-এ্যাদের ঘরগুলান দেইখেছিছ, ক্যামুন বুকসুমান উঁচু? বান হয় নাকি?
-না, দেখে তো মনে হয় বেশ উঁচু এলাকা এটা, বন্যা হওয়ার কথা নয়। কোথাও হাঁটুসমান পানিও তো জমে থাকতে দেখলাম না। আসার সময় দেখেননি খেয়াল করে?
-তবে?
-তবে আর কী, একেক দেশের একেক নিয়ম।
খেজমত বলে, বাড়িঘরের হাল দেখে মনে হয় না এনারা এত বড়লোক।
-আপনি কী যে বোলেন না দুলাভাই! মাটির বাড়ি হলেও কী সুন্দর দেখতে, ঝকঝকে তকতকে। মন্দ কী?
-না, তোদের ক্যামুন পাকা বাড়ি।
-সে বাপজি কইরে দিয়ে গেইছে বলে। তাই কিনা বলেন?
মাথা নাড়ে খেজমত।
তাদের এসব আলাপের মধ্যেই সকালের নাস্তা নিয়ে আসে খলিল। রাতেই পরিচয় হয়েছে তার সঙ্গে। ছেলেটাকে ভাল লেগেছে মমিনের। তার চেয়ে বছর দুই ছোট হবে হয়তো। এখন দিনের আলোয় দেখে মনে হয় সে চিররুগ্ন। মায়াময় চেহারাখানা। কিন্তু বেশ হাসি-খুশি।
-খায়ে লেন মাস্টার ভাই।
এদিক-ওদিক তাকায় মমিন। -কে মাস্টার? কাকে বলছ?
-আপনে? আপনে আমারে জায়গির-মাস্টার হলেন না?
বুঝতে পেরে হাসে মেহমান দুজন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে।
-কোন ক্লাসে পড় তুমি?
-সেবেনে।
-সেবেনে… ও সেভেনে!
গরম খিচুড়ি খেতে খেতে প্রশ্ন করে খেজমত, ক্যানে গো ভাই, তুমার ব্যারাম নাকি?
-হ্যাঁ।
– কী ব্যারাম?
-প্যাটের ব্যারাম। খালি আমাশা হয়। অকপট কথা বলে খলিল।
খেজমত কবরেজি চিকিৎসা জানে। এলাকায় তার হাতযশও আছে বেশ। সে এখন কবরেজি ফলাবে বুঝতে পেরে তাকে নিরস্ত করে মমিন।
কিন্তু খলিল মজা পেয়েছে। লোকগুলোকে তারও পছন্দ হয়েছে বোঝা যায়। সে জিজ্ঞেস করে, অ্যাখুন কুণ্ঠে যাবেন আপনেরা?
-কেন বলো তো?
-যদিল্ কুনুঠে না যান তে আমার সাথে গাঙের ধারে চলেন, মাছ আইন্তে যাবো।
-তাই নাকি? তাহলে তো ভালই হয়।
-হ্যাঁ, পদ্মা নদীডা সামনে থেইকে দেখা হবে। লিয়ে চলো ছোটু ভাই, লিয়ে চলো আমাদের। হ
(চলবে)