দনিয়া আরমানদোর পর্ণকুটির
মাস দুয়েক ধরে আমি নিকারাগুয়ার ইসতেলি বলে একটি মফস্বল শহরে বাস করছি। অদূর ভবিষ্যতে লাতিন আমেরিকায় পেশাদারি কাজের ধান্দায় আমার এসপানিওল বা স্প্যানিশ ভাষা শেখার প্রয়োজন হয়েছে। তো, ইসতেলি শহরে আছে ইসকুয়েলা হোরাইজনতি বলে চমৎকার একটি এসপানিওল ভাষা শেখার স্কুল। ওখানে আমি ছাত্র হিসেবে পড়াশুনা করছি। মি. চার্লসের সাথে ইসকুয়েলাতে আমার পরিচয় হয়েছে। তাঁর পুরো নাম চার্লস ডেভান। বয়স সত্তর, তবে ব্যায়াম করা পেটানো দেহের জন্য তাঁকে দেখায় মেরেকেটে বাষট্টির মতো। এক সময় কাজ করতেন আমেরিকান এয়ারফোর্সে, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত, ভ্রমণ করেন, নিজেকে হিস্টোরিয়ান হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। কিসের ইতিহাস, কেন তিনি তা লিখছেন, ইত্যাদি এখনো আমি ভালো করে বুঝে উঠতে পারিনি।
মি. চার্লস বর্তমানে এসপানিওলের কোন ক্লাসের ছাত্র নন। তবে বছর দেড়েক আগে তিনি এ ইসকুয়েলাতে এসে এসপানিওলের ওপর একটি কোর্স করেছেন। সে সূত্রে শিক্ষয়িত্রী সিনোরিতাদের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব খুবই মজবুত। তিনি প্রায়ই তাঁদের জন্য এক্সপেনসিভ চকোলেট বার নিয়ে আসেন। তারপর, আঙিনায় হোমওয়ার্ক করার জন্য পেতে রাখা চেয়ার-টেবিলে বসে পুরনো পত্রিকা খুঁটিয়ে পড়েন এবং আমাকে অবসর দেখলে আলোচনা জুড়ে দেন। তাঁর আলাপের প্রিয় প্রসঙ্গ হচ্ছে- নিকারাগুয়ার বংশানুক্রমের ডিক্টেটর শাসকগোষ্ঠী তথা সমোজা পরিবারের রাজনৈতিক গলদ কোথায় ছিলো? সান্দিনিস্তা বলে বামপন্থী বিপ্লবীরা ক্ষমতায় এসেছে মূলত কিসের জোরে? আর শহরের তরুণদের মধ্যে ইদানীং ছড়াচ্ছে যে ড্রাগস ও ভয়োলেন্স, তা রোধ করা যায় কিভাবে ইত্যাদি।
ইসতেলি শহরে মি. চার্লস পর্যটক হিসেবে একটি হোটেলে মাসওয়ারি কড়ারে বসবাস করছেন। তিনি ক্যাটাগরিতে পর্যটক হলেও কী কারণে জানি শহরের আওয়ারা তরুণদের নানা কিসিমের প্রকল্পে যুক্ত করে মাতিয়ে রেখেছেন। এ ধরনের একটি প্রকল্প হচ্ছে- মস্ত রঙিন কাপড় পালের মতো উড়িয়ে তাদের রলারস্কেট করা শেখানো। তাঁর আস্তানা হচ্ছে বিপ্লবী যুদ্ধে আত্মাহুতি দেয়া মৃতদের স্মরণে সৃষ্ট একটি গ্যালারি। নিকারাগুয়ার সাম্প্রতিক বিপ্লবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট সমোজা চক্রকে সশস্ত্র সংগ্রামের ভেতর দিয়ে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসে প্রগতিশীল বাম ধারার সান্দিনিস্তা পার্টি। এ যুদ্ধে ইসতেলি শহরের তিন শ’ মানুষ আত্মাহুতি দেন। তাঁদের ফটোগ্রাফস, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের কাটিং, কাপড়-চোপড়, বুটজুতা ও বন্দুক দিয়ে দনিয়া নিনো আরমানদো বলে এক মহিলা গড়ে তুলেছেন এ স্মারক গ্যালারি।
যুদ্ধে দনিয়া নিনোর দু’টি ছেলের মৃত্যু হয়। প্রথমে তাঁর চৌদ্দ বছর বয়সের ছোট ছেলেকে সমোজা চক্রের সৈনিকরা প্রকাশ্যে ধর্ষণ করে হত্যা করে। পরে মৃত্যু হয় আঠারো বছরের বড় ছেলের। বিপ্লবী ক্রিয়াকর্মের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাঁর কাটা মুন্ডু প্রদর্শিত হয় শহরের পার্কে।
গ্যালারিতে কোন আর্থিক অনুদান নেই। মি. চার্লস ওখানে মৃত যোদ্ধাদের জননীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ল্যকেল হিস্ট্রি লেখার একটি প্রজেক্ট করছেন। তাঁর প্ররোচনায় আমিও গ্যালারিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কিছু কাজে শামিল হচ্ছি। এ সুবাদে গ্যালারির ব্যবস্থাপক দনিয়া নিনো আরমানদোর সাথে আমাদের দু’ জনের তৈরি হচ্ছে হার্দিক সম্পর্ক। আর সত্যি কথা বলতে- দনিয়া নিনোর আচরণে এমন কিছু আছে, যার জন্য তাঁকে আমার আত্মীয়-স্বজনদের মতো আপন মনে হয়। তিনি দিন দুয়েক গ্যালারিতে আসেননি। মহিলা সম্ভবত অসুস্থ। মি. চার্লস প্রস্তাব করেন- চলো সুলতান, তাঁর বাড়িতে যাই। দেখে আসি- কী রকম আছেন দনিয়া, কী হয়েছে তাঁর? দনিয়ার আর্থিক অবস্থা কেমন, তাঁর পরিবারের সকলে কিভাবে বসবাস করেন, এ বিষয়টি জানতে আমার আগ্রহ আছে। তার ওপর বিকেলবেলা আমার কোন কাজবাজ নেই, তাই আমি কোনো চিন্তা-ভাবনা না করে রওয়ানা হই, মি. চার্লসের সাথে দনিয়া নিনোর বসতবাড়ির দিকে।
খুবই সংক্ষিপ্ত শর্টকাট পথ ধরে মি. চার্লস আমাকে নিয়ে আসেন শহরের লাগোয়া মিরাফ্লোর পাহাড়ের বেইসে। পথের ধারের এক ছাপরা কফিশপে বসে আমরা পাবলিক বাসের অপেক্ষা করি। একটা বিষয়ে খটকা লাগে-মি. চার্লস ছোট শহরের চিপাগলি ও কোনাকোনি সব শর্টকাট এতো ভালো করে চিনেন কিভাবে? তিনি কফিশপ থেকে দনিয়া নিনো আরমানদোর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিছু সালচিচা বা মশলাদার সসেজ কিনেন। পাবলিক বাসে ছাদের ওপরও কয়েকজন মানুষ বসে আছেন। ভেতরের ভিড়ে আমরা রড ধরে দাঁড়াই। মিরাফ্লোর পাহাড়ের গোড়ায় টিলা-টক্কর ও মাঠ-প্রান্তরে ছড়ানো বেইসটি বিশাল। চাষিরা মিষ্টিআলু, যব ও তামাকের ক্ষেতে কাজ করছে। পাহাড়ের গোড়া প্যাঁচিয়ে যাওয়া সড়ক ধরে খানিক আগ বাড়িয়ে বাসটি উল্টা দিকের সমতলে থামলে, আমরা নেমে পড়ে চষাক্ষেতের ওপর দিয়ে হেঁটে চলে আসি দনিয়া নিনোর বাড়িতে।
তাঁর বাড়ির হাতায় খোলামেলা বেশ কিছু জমি। তাতে ফলছে শাকসবজি, ঘাস খাচ্ছে কয়েকটি গরু ও ছাগল। দু’টি মুরগা কককক করে তাড়া করে এসে উড়াল দিয়ে উঠে বসে ঘরের চালে। তাঁর ঘরটি দ্বিতল হলেও অবস্থার নিরিখে তা পর্ণকুটির। অনেক বছর তাতে সারাই-মেরামত হয়নি বলে তা বেজায় রকম ঝুরঝুরে হয়ে আছে। মোরগের ককককে সজাগ হয়ে কে যেন কেশে গলা সাফ করে বলে ওঠেন- মিরা, কিয়েন ভিনো, বা দেখোতো কে এলো? আমরা ততক্ষণে চলে এসেছি সামনের আঙিনায়। দাওয়ায় মাদুর পেতে শুয়েছিলেন দনিয়া নিনো, তিনি উঠে বসলে দেখি, তাঁর চুলে বেড় দিয়ে প্যাঁচানো একটি লতা, তাতে গোঁজা রঙিন পাখির পালক। শরীর তাঁর খারাপ করেছে সকাল থেকেই, তাই তিনি গ্যালারিতে যেতে পারেননি। মাঝে মাঝে তাঁর এরকম হয়- মাথার আধখানা জুড়ে তীব্র ব্যথা। এ রকম চলে যায় দিন দুয়েক। লতা দিয়ে প্যাঁচিয়ে পালক গুঁজলে একটু উপশম হয়।
বারান্দায় একটি চেয়ারে বসে তাঁর স্বামী ডন আরমানদো। তিনি বসে বসে মৃদু স্বরে শুনছেন ট্রানজিসটার রেডিও। তাঁর সামনের বেঞ্চে বসে মি. চার্লচ আমার সাথে ডন আরমানদোর পরিচয় করিয়ে দেন। তারপর, তাঁকে এক প্যাকেট মার্লবরো সিগারেট উপহার দেন। ডন আরমানদো একটি সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলেন- সারা জীবন আমি শ্লোগান দিয়েছি আবাহো এল ইমপিরিয়েলইজমো ইয়াংকি, বা নিপাত যাক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, তবে অই দেশের একটা জিনিস আমি পছন্দ করি, তা হচ্ছে মার্লবরো সিগারেট, স্বাদে বড়ই মোলায়েম। তিনি আরেক দফা ধোঁয়া ছেড়ে আমার দিকে এক শলা বাড়িয়ে দেন। চোখ থেকে গড়িয়ে নেমে আসা জল মুছলে আমি খেয়াল করে বুঝতে পারি, তিনি দেখতে পান খুবই সামান্য, তাঁর চোখের মণি দুটোকে দেখায় শ্যাওলা মাখা মার্বেলের গুলির মতো। মি. চার্লস দনিয়া নিনোর সাথে আঙিনায় লাউ-কুমড়ার মাচা দেখতে গেলে, ডন আরমানদোর সাথে আমার কথাবার্তা বেশ জমে ওঠে।
দৃষ্টিস্বল্পতা নিয়ে জন্মাননি তিনি। পেশায় চাষি ডন আরমানদো বিপ্লবের আগে মিরাফ্লোরে মরালেস পরিবারের বিশাল কফি এস্টেট ফিনকা নেবলিনাতে কাজ করতেন। মূলত কফি চাষের লোক হলেও এস্টেটের ডাকসাইটে মালিক সিনিওর মরালেস যখন মিষ্টি আলু ইত্যাদির এক্সটেনশন শুরু করেন, ক্ষেতে রসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রভৃতি দেয়ার ভার পড়ে ডন আরমানদোর ওপর। একবার সিনিওর মরালেস আমেরিকান এক কোম্পানির কাছ থেকে সংগ্রহ করেন, এনহাইড্রাস এমোনিয়া বলে এ ধরনের সার। এটি প্র করার সময় অসাবধানতায় কিছু ফিউম বা বিষাক্ত বাষ্প লিক করে বাতাসের ঝাপটায় এসে লাগে ডন আরমানদোর চোখ-মুখে। কিছুক্ষণের ভেতর তিনি চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করেন। ফুলে ওঠে তাঁর চোখ-মুখ, জ্বালা-যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে এক পর্যায়ে সংজ্ঞাহীন হলে প্রতিবেশী চাষিরা তাঁকে হ্যামোকে শুইয়ে নিয়ে যায় স্থানীয় হাসপাতালে। পাঁচ দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে। দিন পনেরো পর তাঁর চোখে কিছু আলো ফিরে আসে বটে, কিন্তু আগের মতো দেখার পুরাপুরি ক্ষমতা তিনি আর ফিরে পাননি কখনো। সে থেকেই ডন আরমানদো অর্ধেক অন্ধ, কাজকর্ম আর কিছু করতে পারেননি তেমন করে। মূলত বেকার ঘর-বৈঠকি জীবনযাপন করছেন প্রায় তেইশ-চব্বিশ বছর হলো।
দনিয়া নিনো বারান্দার কোনায় স্টোভ জ্বেলে ফ্রাইপ্যানে ভাজছেন লালচে কফি বিন। তাঁর পাশে টুলে বসে ঘরের মানুষের মতো সহজাত ভঙ্গিতে গালগল্প করছেন মি. চার্লস। আমরাও একটু-আধটু কথা বলি। বিপ্লবের আগে এ বাড়িটিও ছিলো মরালেস পরিবারের কফি এস্টেটের সম্পত্তি। চাষি হিসেবে ডন ও দনিয়া তাদের বালবাচ্চা নিয়ে এখানেই বাস করছিলেন। দৃষ্টিক্ষমতা খানিক ফিরে আসতেই সিনিওর মরালেসের কর্মচারীরা এসে তাঁকে আবার ক্ষেতে বিষাক্ত এনহাইড্রাস এমোনিয়া ¯েপ্র করার জন্য চাপ দিতে থাকে। তিনি এ রাসায়নিক স্পর্শ করতে অস্বীকার করলে তাঁর পরিবারকে একুশ দিনের উকিল নোটিশ দিয়ে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। একই সাথে ফিনকা নেবলিনাতে চাষি হিসাবে কাজ করার অধিকারও হারান তিনি।
তারপর দেশে বিপ্লব হলো। মরালেস পরিবারের এস্টেট সমাজতান্ত্রিক সরকার হুকুম-দখল করে নিলে ডন ও দনিয়া এ বাড়িতে ফিরে আসার আইনিস্বত্ব লাভ করেন। ফিনকা নেবলিনাও ইদানীং ভাগ করে দেয়া হয়েছে যেসব চাষি বিপ্লবে শরিক ছিলেন তাঁদের মধ্যে। এ পরিবারের দু’টি ছেলে যেহেতু মুক্তিসংগ্রামে আত্মাহুতি দিয়েছে; তার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁরা পেয়েছেন ফিনকা নেবলিনায় পাঁচ একরের কফি প্ল্যানটেশনের একটি প্লট। তাদের মেজ ছেলে অই পাঁচ একরে চাষবাস করে। সে বাসও করছে মিরাফ্লোরের মিডল লেয়ারে।
বারান্দার মাঝামাঝি ছোট্ট একটি টেবিলের ওপর কাঠের ক্রুশের পাশে পানি ভরা বউলে রাখা কিছু তাজা ফুল। তাতে এসে বসে একটি প্রজাপতি। আমি এ বেদির ওপর দেয়ালে টাঙানো জোড়া ফটোগ্রাফসের দিকে তাকাই। আত্মাহুতি দেয়া ছেলে দুটোর ছবি আমি গ্যালারিতে দেখেছি, তাই তাঁদের চিনতে কোন অসুবিধা হয় না। হামানদিস্তায় আধপোড়া কফি বিন কুটছেন দনিয়া নিনো, চারদিকে ছড়াচ্ছে তীব্র স্মোকি সৌরভ। ডন কাশতে কাশতে আরেকটি মার্লবরো ধরিয়ে চোখের জল মোছে বলেন- দেশে বিপ্লব হলো, যে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিলাম সেখানেও ফিরে এসেছি, আমাদের মেজ ছেলের কফি বিক্রি করে অবস্থাও খারাপ যাচ্ছে না; তারপরও আমরা ঠিক ইনসাফ পেলাম না। চুপাসংগ্রেজ বা ব্লাডসাকার সিনিওর মরালেস এখনো বেঁচেবর্তে আছে। এ আনসিয়ানো রিএকশনারিও বা এ বুড়া প্রতিক্রিয়াশীলের নাতনি এখানকার একটি ভাষা বিদ্যালয় ইসকুয়েলা হোরাইজনতিতে বিদেশীদের এসপানিওল শেখায়।
দনিয়া নিনো ও মি. চার্লস আমাদের জন্য নিয়ে আসেন দুই পেয়ালা কফি। আমি চুমুক দিতে গিয়ে দেখি, ডন আরমানদো উবু হয়ে হাতড়ে চেয়ারের নিচ থেকে বের করে আনছেন পোড়ামাটির এক সানকি। তাতে বেশ খানিকটা কফি ঢেলে শিস দিয়ে তিনি কাকে যেন ডাকেন। আঙিনা থেকে তাঁর কাছে চলে আসে একটি ছাগল। সে ঘোলাচোখে ঘাড় কাত করে আমাদের কথাবার্তা শুনে। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠি, চুন লাগা পাথরের মতো তার রঙ। অন্ধ প্রাণীটি ডন আরমানদোর হাতে ধরা সানকি থেকে চেটে চকাস চকাস করে কালো কফি খায়। আর তিনি আফসোস করে বলেন- বিপ্লবের সময় আমরা ট্রেড ইউনিয়ন করেছি, কথা হয়েছিলো লিবারেশনের পর দেশ থেকে উচ্ছেদ করা হবে বিষাক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, কিছু হলো কি? শুনি আজকাল আমেরিকান কোম্পানিগুলো ফিরে এসেছে, কৃষকদের তারা দিচ্ছে কিছু ফ্রি কীটনাশক। এগুলো মিশে যাচ্ছে পশুচারণ ভূমির পানির উৎসে। এতে অন্ধ হয়ে গেছে এ এলাকার বেশ কিছু গরু ও ছাগল। এ ছাগলটি অন্ধ হলে আমার প্রতিবেশী একে কসাইখানায় বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলো। আমি শুনতে পেয়ে তাকে কিনে নেই। ছাগলটি ঘাড় বাঁকা করে যেন আলাপের সরোৎসার বুঝতে পেরে চেটে দেয় ডন আরমানদোর হাত।
হাঁস ভাসা হ্রদ
বেলা পড়ে আসার একটু আগেই আমরা দনিয়া ও ডন আরমানদোর কুটির থেকে বেরিয়ে আসি। পাহাড়ের এ পাদদেশে মেদুর হয়ে জমেছে অপরাহ্ন। মেঘভাসা আকাশের বর্ণিল জলরঙের দিকে তাকিয়ে মি. চার্লস বলেন, চষাক্ষেত আর কফির ঝোপে ঝোপে এখনই ফুটে উঠবে মায়াবী আলোছায়া, সুলতান, চলো আমার সাথে, তোমাকে একটা জিনিস দেখাবো। এখনই ইসতেলিতে ফিরে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। অসুবিধা কিছু নেই, সন্ধ্যের পরও এখান থেকে পাবলিক বাস পাওয়া যাবে। আমি তাঁর সাথে হেঁটে একটু উপরের ছড়ানো কফি ঝোপের দিকে যেতে যেতে ভাবি-এ বান্দা এ এলাকার পথঘাট এতো ভালো করে চিনলেন কিভাবে?
সড়কের পাশে বাড়ির হাতায় বসে বেত দিয়ে পিঞ্জিরা তৈরি করছেন একজন মাথাইল পরা ফার্মার। ঢেউটিনের দোতালা ঘরের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, তিনি তুলনামূলকভাবে সম্পন্ন। তাঁর আঙিনায় ছোট্ট ওয়াটার পাম্প ও জারিকেনে রাখা পেট্রল বা ডিজেল। আমরা তাকাচ্ছি দেখে, তিনি হাতের কাজ থামিয়ে আমাদের সম্ভাষণ করেন। মি. চার্লস এগিয়ে গিয়ে তাঁর সাথে কথাবার্তা বলেন। ফিনকা নেবলিনার এক টুকরা তিনিও পেয়েছেন, অন্য এক চাষি তাঁর কফির প্লট বিক্রি করে দিলে তাও তিনি কিনে নিয়েছেন, তবে বাজারে কফির ভালো দাম পাচ্ছেন না। আমি জানতে চাই-কী ধরনের কীটনাশকে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে এ এলাকার গরু-ছাগল? বিষয়টি তিনিও শুনেছেন, শুধু গরু-ছাগল না, কিছু চাষিরও নাকি দৃষ্টিক্ষমতা এফেক্টেড হয়েছে। তবে বিস্তাারিত তিনি জানেন না। কফি চাষিদের কেউ এ রকমের কীটনাশক ব্যবহার করছেন না। সঠিক তথ্য পেতে হলে আমাদের কথা বলতে হবে মিষ্টিআলু চাষ করছেন যারা তাঁদের সাথে। মি. চার্লস ফেয়ার ট্রেইড বলে একটি আমেরিকান এনজিওর কথা বলেন। যেসব চাষি সার ও কীটনাশক ছাড়া অর্গানিক পদ্ধতিতে কফি ফলান, ফেয়ার ট্রেইডের এজেন্টরা তাঁদের ফলন ন্যায্যমূল্যে আমেরিকায় বাজারজাতের ব্যবস্থা করে দেন। কোন কোন ক্ষেত্রে খানিকটা মূলধনও জোগান তাঁরা। মি. চার্লস অবশেষে ফেয়ার ট্রেইডের এজেন্টদের দেখানোর জন্য কফি ফার্মারের কাছ থেকে এক মুঠো কফি বিন স্যাম্পোল হিসেবে নেন।
কিছু পাথর ভেঙে খানিক হাঁপাতে হাঁপাতে আমরা এবার উঠে আসি কিঞ্চিৎ উপরের লেয়ারে। এখানে লালচে খয়েরি রঙের ভারী এক রক-ওয়াল, তাতে কুঁদে আঁকা গেরিলা যোদ্ধার প্রতিচ্ছবি। তার সামনে দাঁড়িয়ে যেন মূর্তিটি নিজেই গড়েছেন, এ রকম বড়ফট্টাই ভঙ্গিতে তিনি দিগন্তের দিকে হাত প্রসারিত করে বলেন-আই লাইক টু বি এ হিস্টোরিয়ান, কিন্তু এ পাথরে কখন কে এ মূর্তিটি কুঁদেছে, তা না জানলে তো ঠিক হিস্ট্রি গোছানো যাচ্ছে না। আমি কৌতূহলী হয়ে জানতে চাই-কী ইতিহাস আপনি লিখছেন স্যার, বিষয়টা ঠিক বোধগম্য হচ্ছে না? জবাবে তিনি বলেন-এখনো লিখি নাই সুলতান, এয়ারফোর্স থেকে রিটায়ার করার পর সময় কাটছিলো না একেবারে। তাই ভিডিও ব্যবহার করে স্থানীয় মানুষজনকে শামিলের মাধ্যমে কিভাবে ল্যকেল হিস্ট্রি তৈরি করা যায় তার ওপর কিছু কোর্স করেছি। এখন চেষ্টা করছি, ইসতেলির সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসকে ধারণ করতে। হোয়াই ইসতেলি স্যার, মে আই আস্ক? অন্য কোন জায়গা নিয়ে হিস্ট্রি তৈরি করছেন না কেন? মি. চার্লস দাড়ি চুলকিয়ে জবাব দেন-বড় শহরের খোঁজখবর অনেকেই রাখে, কিন্তু তৃণমূল গোছের শহরের বিষয়-আশয় কেউ ধারণ করে না। বাইরে থেকে যেসব পর্যটক আসে, তারাও ছোট্ট মফস্বল শহর স্রেফ পাস করে যায়, এখানে কী ঘটেছে তা বিশেষ একটা বুঝতেও পারে না। আমি এবার তাঁকে খানিক চেপে ধরে জানতে চাই-কিন্তু আপনার ইসতেলিতে কাজ করার পেছনে মেটিভেশনটা কী, ঠিক ধরতে পারছি না স্যার? তিনি বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকে বলেন- সমোজা রিজিমের সমর্থনে কন্ট্রা প্রতিবিপ্লবী ফোর্সদের যখন রিগান প্রশাসন অস্ত্র জোগাচ্ছিল, তখন আমি ছোট্ট একটি সিভিলিয়ান প্লেনে এখানকার আশপাশের আকাশে অনেক ঘুরপাক করেছি। আকাশ থেকে প্যারাস্যুটে ড্রপ করেছি, মার্কিন সমর্থক পুঁজিবাদী সমোজাপন্থী কন্ট্রাদের জন্য সাপ্লাই; তাতে গ্রেনেড, মাইন, মর্টার সবই ছিলো।
রিটায়ারমেন্টের পর প্রথমবার যখন ইসতেলিতে এসপানিওল শিখতে আসি, তখন সরেজমিন দেখতে পাই, আমাদের দেয়া অস্ত্রশস্ত্রে এ শহরের কার কতোটা ক্ষতি হয়েছিলো। সত্যি কথা বলতে কি-মনে আমার প্রচুর গ্লানি। যখন আকাশ থেকে সাপ্লাই জোগাতাম, তখন ভাবতাম হিংস্র কমিউনিস্ট সান্দিনিস্তাদের ঠেকানো দরকার। এখানে এসে এদের সাথে মেলামেশা করে দেখছি, এরা তো আমাদের মতোই সাধারণ মানুষ, আর এদের হিংস্র বললে অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়, আমরা যারা আমেরিকান এ কাজে মদদ জুগিয়েছি, তাদের বর্বরতার বিষয়-আশয়। এদের বেদনাবোধ বা জীবনসংগ্রামের সাথে আমাদের তফাত-ইবা কোথায়? তাই উদ্যোগ নিয়েছি, এ ল্যকেল হিস্ট্রি প্রজেক্টের। যদি এ এলাকার বাস্তবতা ও সাম্প্রতিক ইতিহাস ধারণ করতে পারি, তাহলে আমেরিকান পর্যটকরা তা দেখতে পারবে; এমন কি যুক্তরাষ্ট্রের যেসব আর্মি অফিসাররা নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত ছিলো, তাদেরও এসব ভিডিও দেখানো যেতে পারে। তিনি এবার আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলেন- তোমার কিছু এফেক্টিভ আইডিয়া আছে সুলতান, প্লিজ হেল্প মি টু ক্যারি আউট দিস প্রজেক্ট। উইল ইউ? আমি তার প্রস্তাবে সায় দিয়ে বলি- আপনার যে রকম ল্যকেল হিস্ট্রিতে আগ্রহ, সে রকম আমিও খুঁজছি যাদের সাথে পর্যটনের সময় দেখা-সাক্ষাৎ হয় তাদের পার্সোনাল হিস্ট্রি। আপনার ব্যক্তিগত ইতিহাস একটু বলা যায় স্যার?
বাসস্টপের দিকে ফিরতে ফিরতে মি. চার্লস প্রশ্ন করেন- আমার কোন বিষয়ে তোমার খটকা আছে? আই হ্যাভ এ লং লাইফ, তার কোন দিকটি তুমি জানতে চাও সুলতান? আমি আমতা আমতা করে বলি- আপনি এয়ারফোর্সের লোক স্যার, কিন্তু উড়াতেন সিভিলিয়ান প্লেন..? তিনি আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বলেন- এখন তো রিটায়ার্ড জীবনযাপন করছি সুলতান, তাই ভেঙে বলতে আইনি কোনো সমস্যা নেই। আমি মূলত কাজ করতাম এয়ারফোর্স ইন্টেলিজেন্সে। নিকারাগুয়ায় সমোজাপন্থী কন্ট্রা প্রতিবিপ্লবীদের সামরিকভাবে খোলাখুলি সহায়তা দানে মার্কিন কংগ্রেসের আপত্তি ছিলো। তাই, ইন্টেলিজেন্সের হয়ে আমরা জনা কয়েক অফিসার সংগোপনে এসব কাজে লিপ্ত হই। আমি এবার জানতে চাই- এই যে একাকী ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আপনার কোন পার্টনার বা ফ্যামিলি নেই? তিনি উদাসভাবে হেসে জবাব দেন-আই হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড যে, বয়স সত্তরের কাছাকাছি হলে মহিলাবন্ধু খুঁজে পাওয়া দুষ্কর? আমি এবার প্রশ্নের ফোকাস পাল্টিয়ে বলি- আপনার তারুণ্যে নিশ্চয় পার্টনার বা স্পাউস্ ছিলো, এ বিষয়ে কাইন্ডলি কিছু বলবেন কি? তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেন- তুমি যখন আগ্রহ নিয়ে শুনছো… তোমাকে না হয় একটু বলি, সত্যিকারের লাইফ পার্টনার বলতে যা বোঝায়, সে রকম সম্পর্কের সম্ভাবনা শুধু একবারই দেখা দিয়েছিলো। আমি তখন জার্মানিতে পোস্টেড। ইন্টেলিজেন্সের লোক, তাই এয়ার বেইসে না থেকে অ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে বাস করছি সীমান্তের কাছাকাছি ছোট্ট এক শহরে। ততদিনে সোভিয়েত প্রভাবিত ইস্টার্ন ব্লকের আয়রন কার্টেন একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। আমেরিকান টুরিস্ট হিসেবে ছোট্ট টু-সিটার সেসনা প্লেন নিয়ে ফ্লাই করে যাচ্ছি পোল্যান্ড ও চেকোশ্লাভাকিয়ায়। আমার কভার ছিলো আমেরিকান রিচ টুরিস্ট, ফ্লাই করছি ছোট্ট শৌখিন বিমানে, সাথে খুবই জেল্লাদার চেহারার সুস্তনি গার্লফ্রেন্ড। জুইশ এ মেয়েটি জার্মানিতে বাস করলেও আদতে ছিলো চেকোশ্লাভ অভিবাসীদের কন্যা। পারিবারিক দিক থেকে চেক ছিলো তার মাতৃভাষা, তার বাবা পোল বলে পোলিশ ভাষাও বুঝতে পারতো সে অনায়াসে। আমি ফ্লাই করে চেক রাজধানী প্রাগ ছাড়িয়ে চলে যেতাম ছোট্ট সব শহরে। পাশের সিটে বসে সে চেক এয়ারফোর্স এভিয়েশনের কথাবার্তা রেডিওতে শুনে তা হিব্রুতে নোট নিতো।
বিয়ার-গার্লদের মতো এক ধরনের চটুল পোশাক-আশাক সে পরতো পেশাগত কভারের জন্য। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ছিলো খুবই উদাসীন প্রকৃতির, অনেকটা লিরিক্যাল মাইন্ডের। কবিতা পড়তে খুবই ভালোবাসতো। আর রাতের বেলা ফ্লাই করলে খিলখিলিয়ে হেসে বলতো- মনে হয় উড়ে যাচ্ছি নক্ষত্রের আস্তানায়। একটু পজ নিয়ে তিনি আবার বলেন- চেক ইন্টেলিজেন্স বিষয়টা বুঝতে পেরেছিলো, এত টেকনিক্যাল এক্সপ্লেনেশনের দিকে না গিয়ে তোমাকে সংক্ষেপে বিষয়টা বলছি সুলতান, তারা জ্বালানি নেয়ার সময় কিছু একটা আমার প্লেনে ইন্সটল করে। আকাশে উড়ার কিছুক্ষণ পর যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেয়। আমি ইজেক্ট করে প্যারাসুটে জাম্প করতে বাধ্য হই। সময় ছিলো খুবই অল্প, তাকে ইশারাও করেছিলাম। কিন্তু অই যে অন্যমনস্ক থাকার একটা স্বভাব ছিলো, বিস্ফোরণের আগে সে নিজেকে প্যারাসুটে ইজেক্ট করতে পারেনি।
আমরা বাস-স্টপে এসে পড়েছি। মোড়ে একটি পাবলিক বাসকে আসতে দেখা যায়। তার দিকে হাঁটতে হাঁটতে মি. চার্লস বলেন- হ্রদে হাঁসের উড্ডয়ন দেখতে সে খুব ভালোবাসতো। চেকোশ্লাভাকিয়ার তিন-চারটি লেক ছিলো তার ভীষণ প্রিয়। আমি বারবার এগুলোর ওপর দিয়ে লো ফ্লাইটে উড়ে যেতাম। প্লেনের আওয়াজে হাঁসের উড়ে যাওয়া দেখে সে খুশিতে হাততালি দিতো। বাসের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে তিনি আরো বলেন- অনেক বছর হয়ে গেলো সুলতান। এখনও কোথাও কোন হাঁসভাসা হ্রদ দেখলে দাঁড়িয়ে পড়ি তার পাড়ে, আর মনে পড়ে তার কথা। হ