জাতীয় জীবনে ঈদ যেমন গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাববিস্তারি, তেমনি সাহিত্য সমাজে ‘ঈদ সংখ্যা’ও সমান তাৎপর্যপূর্ণ। বাজারে অনেক ঈদ সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছে, বিশেষভাবে দৈনিকগুলো ঢাউস ঢাউস সংখ্য বের করেছে, যেগুলো সাহিত্যপ্রধান নয় মোটেই। সাহিত্যপ্রধান ঈদ সংখ্যা যে কয়টি প্রকাশ পেয়েছে, তার মাঝে ‘নতুন এক মাত্রা’র ঈদ সংখ্যা অন্যতম সেরা। গ্রীষ্ম-বর্ষা দুই সংখ্যা মিলিয়ে ২০০ পৃষ্ঠার বেশ বড়সড় একটা সাহিত্যপত্রিকা বলতে হবে। চমৎকার প্রচ্ছদ-বাঁধাই, নতুন ধরনের লেখা, সুন্দর সজ্জা মিলে অসাধারণ সমৃদ্ধ একটি সংখ্যা নিশ্চয়।
বৈচিত্র্যময় লেখায় মধ্যে দুটি প্রচ্ছদ রচনা লিখেছেন যথাক্রমে মুস্তাফা জামান আব্বাসী ‘ঈদের অভীপ্সা’ ও আবদুর রহিম ‘কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গানে ঈদ’। কবি সাযযাদ কাদির ও জুবাইদা গুলশান আরাকে নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন আল মুজাহিদী ও দিলারা মেসবাহ। জন্মশতবর্ষ স্মরণ করেছেন ফজলুল হক সৈকত : আহসান হাবীবের কবিতায় জাতীয় চেতনা, আহমেদ মাওলা: শওকত ওসমান : সাহিত্য জীবন এবং মুহাম্মদ মতিউর রহমান: শতবর্ষে কবি ফররুখ আহমদ শিরোনামে। নানা স্বাদের ৫টি উপন্যাস রয়েছে। দূরের মানুষ / নুরুল করিম নাসিম, চিতা কাহিনী/ আতা সরকার, গোলাপ যখন হেসে ওঠে/ রফিকুর রশীদ, ঘনায়মান সন্ধ্যার স্বপ্ন/ নাজিব ওয়াদুদ এবং কাফকা-সিন্দুক ও লুতুর আব্বার বাইফোকাল চশমা/ শহীদ ইকবাল। প্রত্যেকটি উপন্যাস নতুন অভিজ্ঞতা ও মাত্রার। প্রবন্ধ লিখেছেন আটজন খ্যাতিমান প্রাবন্ধিক। আবু সয়ীদ আইয়ুব : স্মরণগ্রন্থের আলোকে/ আবুল কাসেম ফজলুল হক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় পঠন-পাঠন/ সরকার আবদুল মান্নান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর ছোটগল্প/ কাজী মহম্মদ আশরাফ, সাহিত্যের সংলাপ নিরীক্ষায় জীবনানন্দ দাশের উপন্যাস/ শামীমা হামিদ, আল মাহমুদের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ/ ইয়াহ্ইয়া মান্নান, বাংলা সাহিত্যে কালাপাহাড়/ সরদার আবদুর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর ছড়াসাহিত্য/ আশরাফ পিন্টু, এবং বাংলার ঋতু-প্রকৃতি ও বীন্দ্রনাথের গান / ফজলুল হক তুহিন। বিশ্বসাহিত্য রিখেছেন দুইজন। প্যাট্রিক হোয়াইট: উপন্যাসের পৃথিবী: সরকার মাসুদ এবং আরব নারীবাদী কণ্ঠস্বর মাই জিয়াদাহ : কামরুল হাসান। শিল্পকলা অসাধারণ দুটি লেখা রচনা করেন: লোকশিল্পের অন্তর্লোকে ধ্বনিত পল্লিজীবনের প্রাণস্পন্দন: আবুল মনসুর এবং ভাটির গান ভাটিয়ালী গান: মহিবুর রহিম। প্রবন্ধগুলো বেশ সুখপাঠ্য এবং ব্যাপক জ্ঞাননির্ভর।
ঈদ সংখ্যার কবিতায় বিশেষ আকর্ষণ হলো কবি আল মাহমুদসহ প্রবীণ-নবীন কবিদের সমাগম। আল মাহমুদ ছাড়া আরো যারা লিখেছেন: অসীম সাহা, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, আবদুল হাই শিকদার, খালেদ হোসাইন, হাসান হাফিজ, গোলাম কিবরিয়া পিনু, পুলক হাসান, মনজু রহমান, তমিজ উদ্দীন লোদী, হাসান আলীম, স.ম. শামসুল আলম, জাফরুল আহসান, সোহরাব পাশা, রেজা ফারুক, রোকেয়া ইসলাম, আমিনুল ইসলাম, অতনু ভট্টাচার্য, শিহাব শাহরিয়ার, শাহানারা ঝরনা, জাকির আবু জাফর, মাঈন উদ্দিন জাহেদ, আবু ফরহাদ, আবু তাহের বেলাল, অর্ণব আশিক, মাসুদ মুস্তাফিজ, তমসুর হোসেন, হেলাল আনওয়ার, মামুন সুলতান, মনসুর আজিজ, ইসলাম রফিক, শিবলী মোকতাদির, ওমর বিশ্বাস, তাহমিনা কোরাইশী, রেদওয়ানুল হক, আমিনুল কাদের মির্জা, লাভলী বাশার, পৃথ্বীশ চক্রবর্ত্তী,নাহিদা আশরাফী, এ কে আজাদ, সুমন রায়হান, মোস্তফা হায়দার, জাফর পাঠান, শহিদুল আলীম, রফিক রইচ, নাগর হান্নান, আরশি গাইন, হাসনাইন ইকবাল, রজতকান্তি বর্মন, অনন্য কামরুল, তিতুমীর ঋষভ, ইয়াসিন মাহমুদ, আরিফ মুহাম্মদ, আলাউদ্দিন আদর, প্রদীপ প্রোজ্জ্বল, সাদিক স্বপন, ফারুক আলম, ইসাহাক আলী, আদ্যনাথ ঘোষ, এনাম রাজু ও আবদুর রহমান। গল্পগুচ্ছে ১০টি ভিন্নভিন্ন স্বাদের গল্প আছে। লাল ছাতা হাতে মেয়েটি/ হাসনাত আবদুল হাই, অন্তরমহল/ ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ, শিকড়/ফরিদা হোসেন, নস্টালজিয়া/ আলমগীর রেজা চৌধুরী, করুণ পতন/ জাফর তালুকদার, গহন আঁধারে/ দীলতাজ রহমান, জাস্টিস হাউস/ সোলায়মান আহসান, কে/ মুহাম্মদ মহিউদ্দিন, সাঁকো/ অজয় দেবনাথ, নাবির পাড়ার ট্রেন-উড়ান/ মাতিউর রাহমান।
গুচ্ছকবিতা লিখেছেন পাঁচ কবি: ময়ুখ চৌধুরী, রেজাউদ্দিন স্টালিন, সায়ীদ আবুবকর, ইমরোজ সোহেল ও আফসার নিজাম। ‘সোয়াজিল্যান্ডের অভয়ারণ্যে বুশক্যাম্প’ শিরোনামে নতুন জগতের সন্ধানে ভ্রমণ লিখেছেন মঈনুস সুলতান। ছড়াগুচ্ছ উপহার দিয়েছেন: আলী ইমাম, ফারুক নওয়াজ, আসলাম সানী, আমীরুল ইসলাম, আলম তালুকদার, আশরাফুল আলম পিনটু, জগলুল হায়দার, আইউব সৈয়দ, আতিক হেলাল, সোহেল মল্লিক, মিজানুর রহমান শামীম, মামুন সারওয়ার, কামরুল আজাদ, এম এ মতিন, আবদুল হাই ইদ্রিছী, মাহমুদ মোস্তফা প্রমুখ। ছড়াগুলো ভিন্ন স্বাদ ও গন্ধের। শিশুতোষ ও বড়তোষ।
এছাড়া ইতিহাস-ঐতিহ্য বিভাগে কাজী মোস্তাফিজুর রহমান ও মাহফুজুর রহমান আখন্দ লিখেছেন যথাক্রমে ‘উত্তর বঙ্গের প্রতœ-ঐতিহ্য’ ও ‘মধ্যযুগে সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা’। ইতিহাসের অজানা অধ্যায় জানতে লেখা দুটি খুবি দরকারি। অনুবাদ করেছেন দুজন। হেলেন নাইয়ানারের ‘অপেক্ষা’, অনুবাদ: মনোজিৎকুমার দাস এবং চার মহাদেশের কবিতা: মাসুমা রুমা অনূদিত। সবশেষে চমক আছে রসরচনা। ‘চৌধুরি সাহেবের খাপ্পা’ রম্য লিখেছেন লতিফুর রহমান। জীবনের নানা বৈচিত্র্যেসমৃদ্ধ লেখাটি।
সবমিলিয়ে ‘নতুন এক মাত্রা’ পত্রিকাটির ২০১৭ সালের ঈদ সংখ্যাটি গুণেমানে ও রূপেসজ্জায় অনন্য। সাহিত্যে সব বিভাগ সম্পর্কে পাঠক যেমন আনন্দ পাবে, তেমনি পাবে সাহিত্য সম্পর্কে অগাধ ধারণা। আশা করছি এই পত্রিকাটি আগামীতেও এমন সমৃদ্ধ ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করবে। হ