মানুষ সভ্যতার সবচেয়ে বড় উপাদান। এই মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হচ্ছে তার মন ও মনন। এ মন ও মননকে বিকশিত করবার জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা কবিতার। কবিরা জোগায় মানুষের মত মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার প্রেরণা। এমনই একজন কবি ওমর আলী। জীবনায়নকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার যে প্রখর দক্ষতা, তা ছিল তার কবিগুণের অন্যতম। এছাড়া গ্রামীণ সৌন্দর্য, বাস্তবতা, নারী, প্রেম, রোমান্টিকতা, প্রকৃতি ও নিসর্গপ্রীতি তার কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন শক্তিমান দক্ষতায়। তার কবিতায় ঠায় পেয়েছে মফস্বলের সুখ দুঃখ হাসি-কান্নার এক অনন্য চিত্র।
১৯৩৯ সালের ২০ অক্টোবর পাবনা জেলার চরশিবরামপুর গ্রামে নানাবাড়িতে এ কবির আবির্ভাব ঘটে। তার পিতৃনিবাস ছিল প্রমত্তা পদ্মানদীর উত্তর পাড়ের চরঘোষপুর গ্রামে। ১৯৪৮ সালে মাত্র চার বছর বয়স থেকে কবিতা লেখা শুরু করেন এ কবি। ১৯৫৫ সালে ‘বৃষ্টির বিপদে এক চড়–ই’ দৈনিক সংবাদের ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হলে কবিতাটি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ড. আশরাফ সিদ্দিকী ও দুরন্ত দুপুরের কবি নরেশ গুহ এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি’। এ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার অর্জন করেন। নিভৃতচারী, নির্লোভী, নিরহংকারী, প্রচারবিমুখ এবং প্রচন্ড অন্তর্মুখী এ মানুষটি নিরলসভাবে সাহিত্য সাধনা করে গেছেন একটানা ৫৪ বছর। সাহিত্যের পতিত জমিতে সোনালি ফসল ফলিয়েছেন অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় জুড়ে। এ সময়ে প্রকাশিত হয়েছে তার ৩৯টি কাব্যগ্রন্থ ও ২টি উপন্যাস। ২০১৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলাসাহিত্যের এ উজ্জ্বল পুরুষের মহাপ্রয়াণ ঘটে। কবি চলে যান না ফেরার দেশে। এ বছর ২০১৭ সালে তিনি অর্জন করেছেন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘একুশে পদক’।
ইংল্যান্ডে অষ্টাদশ শতকে শুরু হয়েছিল রোমান্টিক কাব্যের জয়যাত্রা। ১৮৭৮ সালে ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং কোলারিজ এর যৌথ প্রচেষ্টায় প্রকাশিত খুৎরপধষ ইধষষধফং ঘটাল কাব্যের বন্ধনমুক্তি। এ গ্রন্থটি প্রকাশের পরে শুরু হয় কাব্যে রোমান্টিকতা। কবি ওমর আলীর কাব্য বিচিত্রতার মাঝে তিনিও একজন রোমান্টিক কবি। তার লিখিত কবিতাগুলো যেমন বিষয় বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ তেমনি শিল্প সুষমায় ভরপুর। কবি ওমর আলীর কাব্য ভাবনা ও বিষয় উপাদানের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণে যে বিষয়টি মূর্র্ত হয়ে ওঠে তা হল প্রেম ও সৌন্দর্য চেতনা, নারী, প্রকৃতি ও নিসর্গ, স্বদেশ প্রেমের অনুষঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা ভাবনা।
ক. প্রেম, সৌন্দর্যচেতনা ও নারী
কবি ওমর আলীর কাব্যে প্রেমের বিচিত্র উপলব্ধির প্রকাশ হলেও তার প্রেম দেহকেন্দ্রিক।
কবির চোখে দেশ, নারীর সরল হাসি, ¯œানের দৃশ্য, সন্তানের মুখ, রান্নার উনুন, সংসার ইত্যাদির সার্থক সন্নিবেশ ঘটেছে। যা তার কবিতার শিল্পগুণে শ্রেষ্ঠতর হয়ে উঠেছে। তার সুবিশাল কাব্যভূমে মহীরুহের ছায়ার মত দাঁড়িয়ে আছে গ্রামীণ মেঠোপথের সহজ সরলা নারী। যার গায়ে লেগে থাকে ভেজা মাটিরস।
বাতাসে সুস্পষ্ট নারীর গন্ধভেজা মাটি থেকে
পথচলা নারীর বুকের পুষ্ট সৌন্দর্য আশুতোষপুরে
যৌবনের গন্ধ আর বাসনার ফুল ফোটে সবুজের ভেতরে চারিদিকে।
(বাতাসে সুগন্ধ : ছবি )
কবি ওমর আলী কবিতায় নারীর সৌন্দর্যের বর্ণনায় মূর্তিমান হয়ে ওঠে শরীরী কামনা। পুরুষের চিত্ত নারীর গায়ের ঘ্রাণ, চুলের গন্ধ, লাল বাকা ঠোঁটের স্পর্শে চঞ্চল হয়ে ওঠে। একটুখানি সুখ খুজে নেয় সে নারীর বুকের সিক্ত আলিঙ্গনে।
চৈত্রের নিদাঘ দুপুরে দগ্ধ পথিকের মত কবি চিত্ত পিপাসার্ত। প্রিয়জনের আলিঙ্গন পিপাসায় সবসময়ই কাতর।
আমার ভেতরে সেই চৌচির তৃষ্ণা কেঁদে ওঠে
শীতল পত্রভরা এখন তোমাকে চাই চাই
ক্রন্দন পাখির মতো আকাশ উপুড় করে
অঝোর ধারায় ভাসাও আমাকে
কিংবা সুগন্ধ অস্থির মৃগনাভি থেকে মুক্তিচাই শুধু
এই মুক্তি তুমি দিতে পারো আমার তৃষ্ণা মুক্তি
তোমার অধীনে…..
(আমার ভেতরে তৃষ্ণা কাদে : যে তুমি আড়ালে)
প্রেমিক হৃদয়ে ধন-ঐশ্বর্য, জাতি, ধর্ম বোধ একেবারেই গৌণ। এককালে ব্রিটিশ রাজের উত্তরাধিকার ছেড়ে সিমসনের হাত ধরে প্রাসাদ ছেড়েছিলেন সপ্তম এডওয়ার্ড। কবির কবিতায় তার প্রতিফলন রয়েছে।
আর তোমাকে নিয়ে বসবাস
এর চেয়ে আর কোথাও আমি আনন্দ দেখি না
রাজ সিংহাসন নয় শুধুমাত্র চাই যে তোমাকে
রাশি রাশি রতেœর এবং ঐশ্বর্যের পাহাড় গড়েও সুখ নেই
তুমি না থাকলে পাশে অতএব তোমাকে চাই…।
(শুধুমাত্র চাই যে তোমাকে : রুদ্ধ নিঃশ্বাসে ছিলাম নয় মাস)
তবে শুধু কোমলমতি নারী নয়, তার কবিতায় ফুটে উঠেছে নারীর অন্তরালের বিষধর রূপটি। অন্তর্লোকে নারীর কপট প্রতিচ্ছবি আমাদের চোখের সামনে উদ্ভাসিত করে।
নারীর ভেতরে ফুলে ফেঁপে সুন্দরীর লাশ
মোহিনী স্ত্রীলোকের ভেতরে কদাকার ডাইনী ঢুকে আছে
বিষের ছোবল মরণ যন্ত্রণা আছে জেনেও তবু বিষ ছোবো
প্রাণ সংহারক সাপ ছোবো
সেই মিশরীয় সুন্দরীর মত
গহিনে নিমজ্জিত দুঃখ দহন আছে জেনেও
গহিনে তুমুল তোলপাড়।
(সর্বাঙ্গ পাথর হবো: এখনো তাকিয়ে আছি)
ওমর আলী মূলত প্রেমের কবি। তার এই প্রেম নারীকেন্দ্রিক। কিন্তু অন্যান্য কবিদের মত তিনি পাঠককে বিরহ বিষাদে ভাসাননি। তার অবস্থান নারী-পুরুষের মিলনবিন্দুতে। নারী প্রেমের সাথে তার স্বভাবের সাড়ার মিলনেই জাত হয়েছে তার কবিত্ব ও কবিআত্মা। এ প্রসঙ্গে জনৈক বিখ্যাত সাহিত্যিকের গুরুত্বপূর্ণ উক্তিটি হচ্ছে। অ ঢ়ড়বঃ পধহহড়ঃ ৎিরঃব ঃযব ঢ়ড়বঃৎু যব ধিহঃং ঃড় ৎিরঃব নঁঃ ড়হষু ঃযব ঢ়ড়বঃৎু ঃযধঃ রং রিঃযরহ যরস. অর্থাৎ কোন কবিই তার ইচ্ছেমত কবিতা লিখতে পারে না। কেবল যে কবিতা তার স্বভাবে আছে তাকেই ফুটিয়ে তুলতে সমর্থ হন। সমকালীন বিচারে তার অসামান্য কবিতাগুলো তাকে প্রেমিক কবির অভিধায় অভিষিক্ত করে। কবি লিখেছেনÑ
চামেলী, মালতী, আর রজনীগন্ধার সুরভিতে
তোমার বিত্তল দেহ, সে সুরভি সারা ঘরময়
আর সে সুরভি যেন খেপে ওঠে তোমার নারীতে
রাত্রিতে তোমাকে ছেড়ে একা থাকা- বড় কষ্ট হয়।
(এখন পালাও দেখি : এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি)
খ. ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বদেশপ্রেম
এদেশে মুক্তিযুদ্ধ মানেই এক ভয়ঙ্কর সময়ের নাম। এ যুদ্ধে বিনষ্ট হয় মানবতা। বিধ্বস্ত হয় সভ্যতা। বাংলাদেশ নামক এক রাষ্ট্রের জন্মবেদনায় এদেশ ভেসেছিল রক্তগঙ্গায়। এদেশে যুদ্ধ মানেই কোটি বাঙালির বুকে প্রিয়জন হারানোর বেদনা। তবুও যুদ্ধ মানেই মুক্তির আনন্দ। সর্বোপরি যুদ্ধ মানেই হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ মিলে মিশে একাকার। মুক্তিযুদ্ধ মানেই চিত্তে সুকোমল স্বাধীনতার ছোয়া।
এহেন পরিস্থিতিতে কবি ওমর আলীর চিত্ত স্বদেশের ব্যথায় ব্যথিত না হয়ে পারে না। চারিদিকে রক্তের হোলি খেলা তার কাছে স্বদেশের মুখে ছোট ভাইয়ের রক্ত বলেই প্রতিভাত হয়।
কবি ওমর আলী একজন সমাজ ও কালসচেতন কবি। দেশবিভাগ, ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। দেশের ক্লান্তিলগ্নে তার ব্যথিত চিত্তের বাণী কবিতা হয়ে ঝরে পড়েছে। তার ‘স্বাধীনতার কবিতা-২০০৯’ কাব্যগ্রন্থের ৭৯টি কবিতাই মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষাকে নিয়ে লেখা। এ ছাড়াও কবির ‘রুদ্ধ নিঃশ্বাসে ছিলাম নয় মাস’ কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতাই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। মুক্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের ধ্বংসের কালো দিনগুলো মূর্ত হয়ে উঠেছে তার বিভিন্ন কবিতায়।
কি ভয়ঙ্কর এই যুদ্ধ একদিকে দস্যু বাহিনীর
প্রতিটি শহর দখলের বেপরোয়া চেষ্টা
পাবনা শহর মনে হচ্ছিলো প্রেতপুরী শ্মশান অথবা গোরস্থান
বাড়ির উঠানে লাশ দোরগোড়ায় লাশ কিংবা ঘরে ঘরে লাশ
কিংবা রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা সব বাংলাদেশী।
(স্বাধীনতা স্বাধীনতা: স্বাধীনতার কবিতা)
আবার কবি ‘বাংলাদেশ-১৯৭১’ কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন-
মানুষের লাশ হাড় পড়ে আছে দেখি যতদূর
শিয়াল, কুকুরের নিত্যকার ভোজ
যাকে ধরে নিয়ে গেল নেই তার খোঁজ
পিতা-পুত্র এবং আত্মীয়দের হত্যাকান্ড একই সঙ্গে কেমন নিষ্ঠুর!
(বাংলাদেশ : ঐ)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “দেশকে ভাল না বাসলে তাকে ভালো করে জানবার ধৈর্য থাকে না, তাকে না জানলে তার ভালো করতে চাইলেও তার ভালো করা যায় না।” কবি ওমর আলী একজন দেশপ্রেমিক। তার অসংখ্য কবিতায় স্বদেশ প্রেমের পরিচয় আমূলিত হয়েছে। –
স্বদেশ আমার জ্যৈষ্ঠ মাসের মিষ্টিসুবাস
স্বদেশ আমার ঘন কালো ফণা ভীষণ আকাশ
স্বদেশ আমার কচুরপাতার টলটলে জল
রক্তিম ঠোঁট সবুজ পাখির মতোন আচল।
স্বদেশ আমার খিলখিল হাসি ভাদ্রের শেষে
জোনাকির সাজে অপরূপ খোঁপা রাত কালো কেশে।
(স্বদেশ আমার : ছবি)
কবির চোখে প্রিয় স্বদেশ পুণ্যবতী নারী। মাতৃসম স্বদেশ ছিল কবির বিমূর্ত ভাবনায়। কবিতায় কবি স্বদেশ মূর্তিমান করেছেন মায়েরই মত।
হে দেশ হে পুণ্যবতী তুমি লাল শালুক ফোটা
স্বচ্ছ সরোবরে ¯œান করে মেঘচুল ভিজিয়ে
গেরস্থ আমগাছের নিচে এসে উঠানে দাঁড়াবে
পূবের বাতাস ও ফিরে আসবে বিপুল শস্যের সম্ভাবনা নিয়ে।
(হে দেশ হে পুণ্যবতী: স্বাধীনতার কবিতা )
গ্রামের প্রতি কবির কী অসাধারণ মমতা। প্রকৃতির সাথে কী অপূর্ব সখ্য। অন্য কবিদের মত শহরে বসবাস করে গ্রামকে দেখেননি। তিনি বাংলার মাটিতে বসবাস করেই ৫৭ বছর একটানা সাহিত্য সাধনা করে গেছেন। তিনি প্রকৃতই ছিলেন পল্লীর এক মৃত্তিকা সন্তান। গ্রাম প্রকৃতির ¯েœহময় স্পর্শে কবির মন পুলকিত ও আবেশিত হয়ে ওঠে-
এবার আমি যাব আম কাঁঠাল নিম জাম শিশু গাছের কাছে
জিজ্ঞেস করব ওরা কেমন আছে
ঘাসের দেয়াল আর মাটির মেঝে খড়ের চালা
আনোয়ারা আপা করিমভাই সাজু ভাই
কেমন চলছে ওদের সংসার।
(এবার আমি যাব: গ্রামে ফিরে যাই)
গ. সংলাপ ও সংবাদধর্মিতা
কবি ওমর আলীর কাব্য বৈশিষ্ট্যের অনন্য দিক হলো গল্পের ছলে কবিতা বলা। গল্প কথার জাদুতে বিকশিত তার কবিতাগুলো অনবদ্য শিল্পশৈলী ধারণ করে। যা ষাটের দশকের কবিদের মধ্যে খুব কমই দেখা যায়। তার ‘অরণ্যে একটি লোক’ কাব্য প্রকাশিত হলে ঐ গল্প বলার ঢঙটি কাব্যমোদীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ ধরনের কবিতায় ভাব দ্যোতনায় অস্পষ্টতা থাকলেও পাঠক হৃদয়ে এক ধরনের স্বপ্নালু আবেশ সৃষ্টি করে। পাঠক গল্পের শেষটা জানতে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। কাব্যের নাম কবিতায় সে কথাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছেÑ
অরণ্যের মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে একদা দুপুরে
দেখলাম একটি লোক বসে আছে দূরে
একটি গাছের নিচে, যতœ সহকারে
কি যেন দেখছে তার হাত দুটো নেড়ে বারে বারে।
পরণে ছিন্নবেশ, এলোমেলো দীর্ঘচুল বিশুষ্ক মাথায়,
অস্থির পুরুষ এক মনে হলো, আমাকে দেখে ইশারায়
ডাকলো নিজের কাছে আদেশের মতো
নিকটে গেলাম আমি, দেখলাম, সে পরীক্ষারত
মৃত মানুষের সাদা হাত, পা, মাথার হাড় নিয়ে,
সবুজ ঘাসের পরে রাখলো সাজিয়ে
বললো, “কবরে শুয়ে ছিল এই রূপবতী নারী
সে যদি জীবিত হয় আমি তাকে ফিরে পেতে পারি।”
(নাম কবিতা: অরণ্যে একটি লোক)
আধুুনিক বাংলা কবিতায় সংবাদধর্মী কবিতা রচনায় কবি ওমর আলীর সার্থকতা পরিদৃষ্ট হয়। কোন ঘটনা, কোন তথ্য, তার কবিতার শরীরে অপূর্ব শৈল্পিকতায় উঠে এসেছে। এ সকল কবিতা ওমর আলী অপূর্ব ব্যঞ্জনায় বাঙময় করে তুলেছেন। তিনি লিখেছেনÑ
শরীরে নির্যাতন বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে নারী ফিরে যায়
বাপ তাকে কতোদিন খাওয়াবে আরিচা ঘাটে হোটেলে হোটেলে
রমণী মসলা বাটে রান্না করে পেট ভরে তবু খেতে পায়
প্রায়ই ফিরতে বেশি রাত হয় ঘরে শিশু অভুক্ত
কু-প্রস্তাব দিয়ে ব্যর্থ লম্পটেরা জোর করে আটকায় ময়নাকে
রাতভর শ্লীলতাহানির পরে বস্তাভরে লাশ ঘাটে রাখে।
(যুবতী ময়নার বস্তাবন্দী লাশ: রুদ্ধ নিঃশ্বাসে ছিলাম নয় মাস)
এ ধরনের সংবাদধর্মী কবিতা তিনি প্রচুর লিখেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ‘নিহত গৃহবধূ আলেয়ার জন্য সনেট’, ‘একটি লোক’, ‘পদ্মানদীর বালুচরে’, ‘যুবতী গৃহবধূ শাহীনুরকে হত্যা’, ‘আট টুকরো নিহত লুৎফন নাহার’সহ আরও অনেক কবিতা।
ঘ. সমকালীন ও তুলনামূলক আলোচনা
দেশীয় কবিদের প্রভাব বাংলা কাব্যসাহিত্যে এক শক্তিমান পুরুষ কবি জীবনানন্দ দাশ। রবীন্দ্র- নজরুল কাব্য বলয় ভেদ করে বাংলাকবিতায় আধুুনিকতার সূচনা তারই হাত ধরে। গ্রামীণ প্রকৃতির নিসর্গ বর্ণনায় এবং উপমা ও উৎপ্রেক্ষায় বাংলাকবিতা অসাধারণ ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে তার কবিতায়। কবি ওমর আলীর কবিতায় জীবনানন্দনীয় প্রভাব সতত প্রবহমান। তিনি কখনও বিরহ বা বিচ্ছেদের কবি নন। তিনি পুরোপুরি মিলনের কবি। তিনি কাব্য বিরহে একেবারেই আস্থাহীন। তার দেহজ প্রেম একেবারেই খোলামেলা। কবি ওমর আলী বলেন,
তোমার সমস্ত দেহ এত রূপ লাবণ্য যে, আমি
তোমাকে দু’হাতে বুকে চেপে ধরে পরিতৃপ্ত হই
তুমিও তৃপ্তা হও। এই প্রেম পরিপূর্ণ দামি।
এর কাছে তুচ্ছ সব স্বর্ণ, রৌপ্য, মনি, মুক্তা, বই।
(তুমি সুন্দরী : এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি)
আবার ‘অরণ্যে একটি লোক’ কাব্যে দেখতে পাই
তোমার দু’চোখ দুটি আকাশের তারকা, না হীরে
আমার আলিঙ্গনে হয়তো বা ঝড় বাধা আছে
তোমার বুকের মধ্যে মধু ছন্দে হৃৎপিন্ড নাচে
মধুর গানের সুর শুনি আঁকি তোমার শরীরে।
(সান্নিধ্য: অরণ্যে একটি লোক)
জীবনানন্দ দাশের প্রকৃতি তার কাব্যে কখনও আধার বা আধেয়। নাগরিক জীবনের হতাশা, দুর্দশা, ব্যর্থতা কবিচিত্তে যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে তা প্রশমিত করতে কবি প্রকৃতির কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেন। এ কারণেই তার কাব্যে নিসর্গ প্রকৃতিই কাব্যের রস হিসেবে কবিতার শরীরে জারিত হয়েছে। কিন্তু ওমর আলীর ক্ষেত্রে প্রকৃতি অসাধারণ ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। তিনি ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং জন কিটসের মত প্রকৃতির কবি। প্রকৃতিকে ভালবেসেছেন বলেই গ্রামে কাটিয়েছেন সারাজীবন। তার ফাল্গুনকে কবিতায় প্রকৃতির অকৃত্রিম বর্ণনা পাইÑ
আবার এসেছো তুমি, প্রাচুর্যের রূপে, হে ফাল্গুন
সাজিয়ে দিয়েছো তুমি দিকে দিকে আরক্তিম ফুলে
মান্দারের শাখা, তুমি গেঁথেছো মালিক সুনিপুণ
সে মালা শোভিত হয় যেন বনরমণীর চুলে।
ওমর আলীর গ্রাম ও প্রকৃতি সম্পর্কে কবি আল-মাহমুদ বলেছেন, ‘আমি আজীবন তোমার কবিতার মুগ্ধ পাঠক। তুমি প্রকৃত কবি। তোমার কবিতায় বাংলাদেশের প্রকৃতির যে গন্ধ পাওয়া যায় তাতে আমার মতো মানুষ বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে।’
ওমর আলীর প্রকৃতি প্রীতি জীবনানন্দ দাশের সাথে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ থাকলেও প্রেমের ক্ষেত্রে একেবারেই বিপরীত। তিনি জসীমউদ্দীন, কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা বন্দে আলী মিয়ার ধারাকে প্রশস্ত করেছেন। এ কথার সত্যতা কবির স্বীকারোক্তিতে পাওয়া যায়। ‘এক হাতে আঁতুড়ে শিশু, অন্য হাতে রান্নার উনুন, নজরুলের সাথে এভাবেই আমার পার্থক্য এবং আমি তার পরবর্তীকালের আধুনিক কবি। বলা যায় জীবনানন্দ এবং জসীমউদ্দীনের ধারাকে প্রশস্ত করেছি।’ (ভূমিকা: শ্রেষ্ঠ কবিতা)
বিদেশী কবিদের প্রভাব
কবি ওমর আলী ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্যে পড়াশুনা করার দরুন তার রচনায় বিদেশী কবিদের প্রভাব লক্ষণীয়। এসব কবির প্রভাবে তার কবিতা হয়ে উঠেছে আরও বেশি সৃজনশীল। পৌঁছে গেছে অন্য মাত্রায়। এতসব কবির মাঝেও তিনি তার সৃজনশীলতা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন। তার কিছু কিছু কবিতা পড়লে মনে হয় ডড়ৎফংড়িৎঃয, ঝযধশবংঢ়বধৎ, ঈড়ষবৎরফমব, ঔড়যহ কবধঃং, ঝযবষষু এর মত বড় কবিদের কবিতা পড়ছি। যেমন কবি ওমর আলীর বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থ ‘এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি’ এর গ্রামে কবিতাটি পড়লে মনে হয় ডরষষরধস ঝযধশবংঢ়বধৎ এর দটহফবৎ ঃযব মৎববহ ড়িড়ফ ঃৎবব’ এবং ঈযৎরংঃধঢ়যবৎ গধৎষড়বি এর দঞযব ঢ়ধংংরড়হধঃব ঝযবঢ়যবৎফ ঞড় যরং খড়াব’ কবিতার কথা।
গ্রামে ওইখানে চলো শুয়ে থাকি সারাদিন সারারাত
যেখানে সুন্দর নদী। শেয়ালের কাঁটা ঘন বন।
বকুলের পাতা ঝরা মাঠ। কিংবা হাওয়ার আঘাত
তৃণশীর্ষে ঝুমকো লতার বুকে আনে শিহরণ
ঔখানে চলো শুয়ে থাকি সারারাত, সারাদিন।
এর বিপরীতে আমরা দেখি উইলিয়াম শেকসপিয়ারের টহফবৎ ঃযব এৎববহ ডড়ড়ফ ‘কবিতাটি-
টহফবৎ ঃযব মৎববহ ড়িড়ফ ঃৎবব
ডযড় ষড়াবং ঃড় ষরাব রিঃয সব
অহফ ঃরিহ যরং সবৎৎু হড়ঃব
টহঃড় ঃযব ংবিবঃ নরৎফং ঃযৎড়ধঃ
ঈড়সব যরঃযবৎ, পড়সব যরঃযবৎ, পড়সব যরঃযবৎ
ঐবৎব ংযধষষ যব ংবব হড় বহবসু
ইঁঃ রিহঃবৎ পড়ষফ ধহফ ৎড়ঁময বিধঃযবৎ
ডযড় ফড়ঃয যরময ধসনরঃরড়হ ংযঁহ
অহফ ষড়াব ঃড় ষরব রহ ঃযব ংঁহ
ঈড়সব যরঃযবৎ, পড়সব যরঃযবৎ, পড়সব যরঃযবৎ
ঐবৎব ংযধষষ যব ংবব হড় বহবসু
ইঁঃ রিহঃবৎ পড়ষফ ধহফ ৎড়ঁময বিধঃযবৎ
ঈযৎরংঃড়ঢ়যবৎ গধৎষড়বি এর ঞযব ঢ়ধংংরড়হধঃব ংযবঢ়যবৎফ ঃড় যরং ষড়াব কবিতায় প্রেমিকের মত ওমর আলীর ‘গ্রামে’ কবিতায় প্রেমিকের একই আকাক্সক্ষা ফুটে উঠেছে। যেমন- গধৎষড়বি বলেছেনÑ
ঈড়সব ষরাব রিঃয সব ধহফ নব সু ষড়াব
ডব ধষষ ঃযব ঢ়ষবধংঁৎবং ঢ়ৎড়াব
ঞযধঃ যরষষং, ভরবষফং ধহফ সড়ঁহঃধরহ ুরবষফং
অন্য দিকে কবি ওমর আলী শুধু প্রেম বা প্রকৃতির কবিই নন তিনি ইংরেজি কবি শেলির এবং কাজী নজরুলের মত দেশপ্রেমিক কবি। তার ‘রুদ্ধ নিঃশ্বাসে ছিলাম নয় মাস’ কাব্য গ্রন্থের একটি কবিতা-
মাগো তোমার ভাষা রক্ষার জন্য আমি লক্ষ লক্ষ বার বুকের রক্ত
দিয়ে লাল করে তুলবো পিচঢালা রাজপথ
তোমার ভূমি রক্ষার জন্য প্রাণ দেবো
আমাকে পুড়িয়ে মারা হবে রক্তে রাঙাবো দেহ
তুমি আমাকে লক্ষ লক্ষ বার জন্ম দিও মা …
কবিতাটিতে কবির দেশাত্মবোধ সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন- শেলি বলেছেন ঙফব ঃড় বিংঃ রিহফ কবিতায়-
ও ভধষষ ঁঢ়ড়হ ঃযব ঃযৎড়হং ড়ভ ষরভব
ও নষববফ
অর্থাৎ আমি কাটার মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে রক্তাক্ত হতে চাই। তেমনিভাবে কবি ওমর আলী “বরকত, রফিক, সালাম, জব্বার, বিদ্যাসাগর” কবিতায় হুংকার ছেড়েছেন। এ ছাড়াও ওমর আলীর কিছু কিছু কবিতা ংযবষষু ঙুু সধহফরধং কবিতার মত সংলাপধর্মিতা দেখা যায়। যেমনÑ একদিন একটি লোক কবিতাটি।
একদিন একটি লোক এসে বললো, “পারো”
বললাম, কি?
“একটি নারীর ছবি এঁকে দিতে”, সে বললো আরো;
“সে আকৃতি
অদ্ভুত সুন্দরী দৃপ্ত, নিষ্ঠুর ভঙ্গিতে
পেতে চাই নিখুঁত ছবিতে।”
কেন? আমি বললাম শুনে
সে বললো, “আমি সেটা পোড়াবো আগুনে।” হ
তথ্য সহায়ক
১. কবি ওমর আলী, জীবন ও সাহিত্যকর্ম- ড. আশরাফ পিন্টু ও আজাদ এহেতেশাম
২. শ্রেষ্ঠ কবিতা- ওমর আলী
৩. অরণ্যে একটি লোক-ওমর আলী
৪. রুদ্ধ নিঃশ্বাসে ছিলাম নয় মাসÑ ওমর আলী
৫. যে তুমি আড়ালে- ওমর আলী