প্লেটো-এরিস্টটলের দার্শনিক অবদান মূল্যায়নের তাগিদ, বা তাঁদের চিন্তাবৃত্তির ঐতিহ্য বহনের ইচ্ছায়, আমি প্লেটো-এরিস্টটল পড়ি না। প্লেটো-এরিস্টটল নিজেরা, বা তাঁদের বিষয়ে অন্যেরা, যা বলেছে তা আমার আলোচনায় বর্জিত। তার কারণ, আমি পড়ি ভিন্ন উদ্দেশ্যে, খুঁজি অন্যকিছু। আমি দেখি প্লেটো-এরিস্টটলের চিন্তার মধ্যে কোথায় অসঙ্গতি, কোন্ জায়গায় বিরোধ; তাদের কোন্ চিন্তাটা কাঁহাতক চলে, কোনটাতে গলদ। তাঁদের এক জায়গার কথার সঙ্গে তাঁদেরই অন্য কথা মেলে কি না, সেদিকে আমার খেয়ালটা বেশি এবং সেটাই মূলত আমার বিশ্লেষণের (অর্থাৎ তত্ত্বের, অর্থাৎ ডিকনস্ট্রাকশনের) বিষয়। এভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, প্লেটোর লেখায় অনেক অসঙ্গতি, তাঁর বক্তব্য পরস্পরবিরোধী; যতবার আমি প্লেটোতে বিরোধ-অসঙ্গতি খুঁজি (ডিকনস্ট্রাকশনের জন্যে), ততবারই তা পেয়ে যাই। যেমন একটা লেখায় আমি দেখিয়েছি যে, টিমিয়াস নামক সংলাপে খো’রা সম্বন্ধে প্লেটো যা বলেছেন, তা তাঁর দর্শনের সঙ্গে মিল খায় না। আমার সহকর্মীরা স্ববিরোধী প্লেটোর অসঙ্গতি সম্বন্ধে আমার মতে সমর্থন দেয়।
(জাক দেরিদা, ডিকনস্ট্রাকশন ইন এ নাটশেল ফোর্ডহ্যাম য়ুনিভার্সিটি প্রেস [১৯৯৬] ১৯৯৭: ৯)
আমি সাহিত্য-সমালোচনা লিখি না… সাহিত্য সম্বন্ধেও না… সাহিত্য বলতে আলাদা কিছু আছে বলে আমার জানা নেই। সাহিত্য-সমালোচকেরাই আমার লেখার টার্গেট… আমি তাদের সেইসব লেখা বেছে বেছে আলোচনা করি যার বিরুদ্ধে আমার বক্তব্য আছে। বিরুদ্ধে বলার ব্যাপার না থাকলে সে বই সম্বন্ধে আমি লিখতে যাই না।
(পল দা মান, ভূমিকা, ব্লাইন্ডনেস এন্ড ইনসাইট [১৯৭১] ১৯৮৩: ৮-১০)
ডিকনস্ট্রাকশন বিষয়ে বাকি কথা দেরিদার উদ্ধৃতি (এবং তাঁর বন্ধু পল দা মানের ‘সম্পূরক’ মন্তব্য) দিয়ে শুরু করছি, তবে বাকি কথায় ঢোকার আগে দুটো উদ্ধৃতি আবার পড়ুন; একবার নয়, কয়েকবার। ডিকনস্ট্রাকশনের কিসে আগ্রহ, কি বৃত্তান্ত, কোথায় আগ্রহ, কেন আগ্রহ- তার লক্ষ্য কি, অভিপ্রায় কি, সবই ওতে আছে। তত্ত্ব এবং ডিকনস্ট্রাকশন সম্বন্ধে এ পর্যন্ত যা আমি বলে এসেছি, তার সঙ্গে জাক দেরিদার উক্তি হুবহু মিলে যাওয়ার কথা- কারণ আমি তাত্ত্বিক নই, সমালোচক; আমার লক্ষ্য ফ্যাক্টসের অনুসরণ, ফ্যাক্টসের উদ্ভাবন নয়। জ্ঞাত-অজ্ঞাত ফ্যাক্টসের ভিত্তিতে তত্ত্বের, তাত্ত্বিকতার, এবং তাত্ত্বিক সম্প্রদায়ের একটা অ-তাত্ত্বিক, সহজ-সাবলীল কাহিনী লেখা ছাড়া আমার আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। কাহিনী লেখা হচ্ছে বলে আবারো মনে করিয়ে দিই: এখানে এবং আগের লেখায় তত্ত্ব ও তাত্ত্বিকতা শব্দে বোঝানো হচ্ছে গত পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বৎসরের১ পাশ্চাত্ত্য চিন্তার সকল প্রধান প্রবণতা, স্টাইল, শাখা-প্রশাখা, যদিও আমি ফোন কোম্পানীর ফোন, ওষুধ কোম্পানীর ওষুধের ব্র্যান্ড, বিজ্ঞাপনের মতো আলাদা আলাদা নামে সেসব প্রবণতার উল্লেখ করছিনা- পোস্টমডার্ন, পোস্টস্ট্রাকচারাল, পোস্টকলোনিয়াল, কালচারাল, জেন্ডার, গে-লেসবিয়ান, কুইয়ার স্টাডিজ, ইত্যাদি। ব্রান্ড ভিন্ন হলেও আমরা বুঝি যে, ‘প্যারাসিটামল’ এক বস্তু, একইরকম তিক্ত পদার্থে তৈরি (স্কয়ার, বেস্কিমকো তাতে ডি-এল মেথিওনিন মেশাক না মেশাক তা মিসরির দানা হবে না), সেজন্যে তত্ত্বের নামবৈচিত্র্যে আমাদের কোনো লাভই নেই (নোটলেখকের আছে, আমাদের নেই); আমাদের জানতে হবে বস্তু, বুঝতে হবে তিক্ত পদার্থের মূল উপাদান- ‘প্যারাসিটামলে’র মল আর মিসরির তফাত; ফিরে যেতে হবে তার গোড়ার কথায়, সূচনার ইতিবৃত্তে।
কাজেই তত্ত্ব শব্দের উল্লেখ মাত্রই বুঝতে হবে ‘সমালোচনা’র বিপরীত এবং সৃষ্টিশীলতার বিরোধী বস্তু। সমালোচনা বা ক্রিটিসিজম কি, তার আলোচনা নি®প্রয়োজন- শেলফের ধুলো ঝেড়ে বুদ্ধদেব বসু-আবু সয়ীদ আইয়ুব-সুধীন্দ্রনাথ দত্ত-হুমায়ুন কবির-অমলেন্দু বসু খুলে বসলেই বোঝা যাবে (বিসিএস-এর পরীক্ষার মতো শুধু পুস্তক ঘেঁটে পয়েন্ট স্ক্যান করে গেলে হবে না, তাদের বাক্য-সৃজনের গোপন কলাবিধি, গদ্যের নিহিত স্থাপত্য, টোন-টেক্সচারের অদৃশ্য ব্যাকরণ, কিংবা কালানুক্রম-জ্ঞান ও ক্রিয়াপদ-প্রয়োগে আমাদের মজ্জাগত অচৈতন্য সত্ত্বেও বুদ্ধদেব বসুর বাক্যে ক্রিয়াপদ-বৈচিত্র্য নির্মিত হবার রহস্য, ইত্যাদি অনুধাবনের জন্যে ধ্যানস্থ মনে দম নেয়ার অভ্যাস করা চাই)। এসব আধুনিকের পরে- আগে নয়- ফিরতে হবে বঙ্কিমচন্দ্রে: বঙ্কিমই তুলনামূলক সাহিত্যালোচনার প্রথম শিক্ষক এবং, আমার মতে, প্রধান শিল্পী। বঙ্কিম প্রথম বাক্য লিখেই, এমনকি প্রথম বাক্যেই, সোজা ঢুকে পড়েন তাঁর সুনির্দিষ্ট বক্তব্যে, অথচ সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো পারফেকশনিস্টেরও আসল কথাটা পাড়তে প্রায়ই এক-দুই পৃষ্ঠা লেগে যায়। অন্যদিকে মোহিতলালে তো আসল কোনো কথা খুঁজতে যাওয়াই মূঢ়তা: ‘বড়িশা’য় বসে তিনি ‘বঙ্কিম-বরণ’- ফেনানো সাধু ভাষায়, ‘নর, নারায়ণ, নরোত্তম’ (১৩৫৬: ১) বন্দনার পর, নব নব ‘ইয়া’-প্রত্যয় জুড়ে- বিকট গদ্যে যত লম্বাই করুন, সে নোটবইতে না আছে বঙ্কিম সম্বন্ধে বিষয়ে কোনো কথা, না ব্যবহারযোগ্য কোনো তথ্য, যা আর দশখানা নোটবইতে পাওয়া যায় না। প্রকৃত সাহিত্যের মতো প্রকৃত সমালোচনাও রসসৃষ্টির, সৌন্দর্যসৃষ্টির, প্রেরণাজাত এবং সেজন্যে তারা পরস্পরের পরিপূরক (প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বিরোধী তো নয়ই)। ‘সমালোচনা’ কেন, কিভাবে, কোন্ অর্থে ‘সাহিত্যে’র পরিপূরক, তা উপলব্ধির জন্যে বুদ্ধদেব বসুর জীবনানন্দ-বিষয়ক প্রবন্ধে জীবনানন্দের উপমা সম্পর্কিত পৌনে তিন-পৃষ্ঠার যে আলোচনা আছে (বুদ্ধদেব বসু [১৯৬৬] ১৯৮২: ৯৪-৯৭), তা আরেকবার পড়ে দেখতে অনুরোধ করি।
তত্ত্ব যে-কারণে সমালোচনার বিপরীত, ঠিক সে-কারণে তা সাহিত্যেরও বিরোধী। সেজন্যে এ-লেখায় ‘সাহিত্য’ শব্দের উল্লেখ মাত্রই বুঝতে হবে যে আমাদের দৃষ্টিতে ‘সাহিত্য’ সনাতন বা স্বতঃসিদ্ধ হতে পারে, কিন্তু তাত্ত্বিকের কাছে ‘সাহিত্য’ মোটেও তা নয়। সাহিত্যের অস্তিত্ব বিষয়ে নব যুগের তাত্ত্বিক সংশয়ী; সাহিত্যকে ‘আগাছা’র সঙ্গে তুলনা করে তাত্ত্বিক জনাথান কালার (পল দা মানের শিষ্য, দেরিদার অন্তরঙ্গ বন্ধু, এবং ডিকনস্ট্রাকশন-আন্দোলনের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য) একটা পাঠ্যপুস্তকও রচনা করেছেন, লিটারারি থিওরি: এ ভেরি শর্ট ইনট্রুডাকশন (১৯৯৭; দ্বিতীয় সং ২০১১); তার দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে ‘সাহিত্য’ এবং ‘আগাছা’র সম্পর্ক আলোচিত (২০১১: ১৯-৪২)। রসসৃজন ও রূপসৃষ্টির মতো সেন্টিমেন্টাল বস্তু বর্তমান পশ্চিমা তাত্ত্বিকের উচ্চ রুচির অনুপযোগী; পশ্চিমা তাত্ত্বিকতায় ‘সাহিত্য’কে- জনাথান কালারের বইটির মতো- একটা অচল, সেকেলে, সেন্টিমেন্টাল, এমনকি ক্ষতিকর, ধারণা হিশেবে আলোচনা করাই নিয়ম। দেরিদা-দা মান সে রীতির প্রবর্তক: সাহিত্যের ‘আধা-স্বর্গীয় উচ্চাসন’ (সেমিডিভাইন স্টাটাস) নিয়ে পল দা মানই প্রথম ব্যঙ্গের সূত্রপাত ঘটান (ব্লাইন্ডনেস এন্ড ইনসাইট [১৯৭১] ১৯৮৩: ২৭৮), ভক্ত জনাথন সেই গুরুবাক্যকেই, আগাছার উপমায় অলঙ্কৃত করে, বিশদ করেছেন- শুধু এখানে নয়, অন্য বইতেও (যেমন, অন ডিকনস্ট্রাকশন: থিওরি এন্ড ক্রিটিসিজম আফটার স্ট্রাকচারালিজম [১৯৮২] ১৯৮৬: ১৮০-১৮৪)। মোটকথা, সাহিত্যের অস্তি¡ত্ব, উপযোগ, কিংবা রূপসৃষ্টির মূল্য কোনোটাই এখন তাত্ত্বিকতা-কবলিত পাশ্চাত্ত্যের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাহিত্যবিভাগ স্বীকার করেনা: গণিত, পদার্থ, রসায়ণের মতো বিজ্ঞানচর্চার সেকেলে বিভাগগুলো অবশ্য করে, কিন্তু তাদের প্রতিবেশী তত্ত্বচর্চার প্রাগ্রসর সাহিত্যবিভাগগুলো করে না।
কাজেই ‘তাত্ত্বিক’ এবং ‘সমালোচকে’র মধ্যেকার শক্ত, অলংঘনীয়, বিভাজন পাঠকের মনে রাখা চাই, কারণ এই বিভাজন পাশ্চাত্ত্যের সাহিত্যবিভাগে গত পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বৎসর ধরে সুপ্রতিষ্ঠিত (অর্থাৎ সাহিত্যের সব ছাত্রই এখানে তা জানে, এবং সেই জ্ঞান নিয়েই বিএ এমএ পাশ করে); এই পার্থক্য ভুললে, ‘তাত্ত্বিক’কে সমালোচক এবং ‘সমালোচক’কে তাত্ত্বিক ভাবলে, মারাত্মক সর্বনাশ কারণ তাহলে আগের কাহিনীতে যা ছিল এবং পরে যা আসবে, তার কিছুই স্পষ্ট হবার সম্ভাবনা নেই। কাহিনীই লেখা হচ্ছে বটে, তবে সে কাহিনীর বিষয় তো তেমন পরিচিত নয়, ইংরেজি নোটবইতেও নেই, তাছাড়া প্লটেও অনেক প্যাঁচ আছে; সেজন্যে আগের কাহিনী খেয়ালে না রাখলে পরবর্তী আখ্যানবস্তুর সঙ্গে তার যোগসূত্র ধরা সহজ হবে না ।
উপরের উদ্ধৃতিতে জাক দেরিদা কোনোরকম রাখ-ঢাক ছাড়া বলছেন যে, দর্শন পড়ার জন্যে তিনি প্লেটো-এরিস্টটল পড়েন না; তিনি পড়েন ছিদ্রসন্ধানের অভিপ্রায়বশত:। কারণ তিনি তাত্ত্বিক, ডিকনস্ট্রাকশন তত্ত্বের প্রবক্তা। তাত্ত্বিকের কর্তব্য- তাঁর ভাষায়- ‘প্লেটো-এরিস্টটলের চিন্তার মধ্যে কোথায় কোথায় অমিল, অসঙ্গতি, বিরোধ’, তার অনুসন্ধান। দেরিদার উদাহরণ-সম্বলিত উদ্ধৃতির আলোকে ‘ডিকনস্ট্রাকশনে’র আক্ষরিক তর্জমা হয় ‘ছিদ্রান্বেষণ’; তিনি যদি বাংলা ভাষায় লিখতেন, তাহলে ওই একটা শব্দেই কাজ চলত আমাদের, মোটা মোটা পুস্তকে বাই-ফোকাল দিয়ে হাঁড়ির ভেতরের ভাত একটা একটা করে দেখা লাগত না । আর পল দা মান, দেরিদার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু, আরো স্পষ্ট করে বলেছেন যে সাহিত্য তাঁর কাছে মূল্যহীন, তাই (যশস্বী) সাহিত্য-সমালোচকদের বিরোধিতা এবং তাঁদের (বিখ্যাত) বইগুলো টার্গেট করে আক্রমণ করা তাঁর লেখার, অর্থাৎ তাত্ত্বিকতার, একমাত্র তাড়না (‘প্রেরণা’ নয়- সেরকম সেন্টিমেন্টাল বস্তুতে তাত্ত্বিক বিশ্বাস করেন না)। তবে, পল দা মানের কথার সঙ্গে দুটো শব্দÑ ‘যশস্বী’ এবং ‘বিখ্যাত’- আমাকে যোগ করতে হল, কারণ পল দা মানের বইতে আক্রমণের টার্গেট যশস্বী সমালোচকদের কতোগুলো সুবিখ্যাত গ্রন্থ (দ্র ব্লাইন্ডনেস এন্ড ইনসাইট [১৯৭১] ১৯৮৩: ২৫-২৬, ১০৭, ২৬৯, ২৯৬ (নরথ্রপ ফ্রাই); ২৩১-২৩৮ (আই এ রিচার্ডস); ১৭০, ২৪৩-২৪৪ (টি এস এলিয়ট); ১৯৪-১৯৭, ২০৫, ২৬৭-২৬৯ (এম এইচ ‘মাইক’ এইব্রামস)। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কর্ণধার এম এইচ ‘মাইক’ এইব্রামস কর্নেল-এ পল দা মানকে প্রথম চাকরিটা দিয়েছিলেন বলে ‘মাইক’ এইব্রামসকে আক্রমণ ও তাঁর ‘দি মিরর এন্ড দি ল্যাম্প’ (১৯৫৩) নামক মহাগ্রন্থের ছিদ্রান্বেষণ- আগের চাকরির সুবাদে হপকিন্স এবং ইয়েল-এ সরে পড়ার পর থেকে- পল দা মানের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ছিদ্রান্বেষণ দেরিদীয় তাত্ত্বিকতার মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠার গোড়ার কথা আগের লেখায় বলা হয়েছে। জাক দেরিদা উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলেন (বা উপন্যাসের মতো ডায়েরি) সেখানে আমরা দেখেছি, কিন্তু কথাসাহিত্য সৃষ্টির সৃষ্টিশীল প্রতিভা থেকে তিনি- তাঁর নিজের ভাষায়২- ‘বঞ্চিত’ ব’লে তাঁকে ধরতে হয় সৃষ্টিশীলতার বিপরীত পথ। সেই বিপরীত পথের নাম ডিকনস্ট্রাকশন- সৃষ্টিশীলতায় ছিদ্রসন্ধান। উপরের উদ্ধৃতি যদিও প্লেটো বিষয়ে, কিন্তু বুঝতে হবে জাক দেরিদা তাতে ছিদ্রসন্ধানের একটা জেনারেল পদ্ধতি তুলে ধরেছেন, অর্থাৎ প্লেটোর বদলে রবীন্দ্রনাথ হলেও, শরৎ-বিভূতি হলেও, পদ্ধতি অপরিবর্তিত থাকবে। পদ্ধতিটা ‘জেনারেল’ বলে তার প্রয়োগে একটু সাহসী, ইষৎ ইয়ার্কিপটু, হলেই সুরেশচন্দ্র সমাজপতির ‘সাহিত্য’ (১৮৯০) এবং অজ্ঞাতনামা ‘বঙ্কিম মিত্রে’র প্রতিভা নিয়ে বিপিনচন্দ্রের বেগে ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। দেরিদার কথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট: তিনি বলছেন যে, প্লেটোর দর্শন তিনি দর্শন পড়ার ইচ্ছায় পড়েন না, পড়েন তার অসঙ্গতি, গোঁজামিল, গলদ উদঘাটনের ধান্ধায়। একে রুচিগত কারণে মেথড আমরা না বলতে পারি, কিন্তু এই মেথডের ম্যাজিকটা না মেনে গতি নেই। কারণ এই ম্যাজিকাল মেথড প্রযুক্ত হবার পর প্লেটো থেকে হেমিংওয়ে পর্যন্ত অতীতের সকল সাহিত্যিক-দার্শনিক বহুদিন যাবত ধরাশায়ী: সে কাজ সমাধা করে স্বর্গত তাত্ত্বিকেরা এখন ‘ভ্যাটিকান ক্যাসকেটে’ (মসৃণ মেহগনি, মখমল-বিছানা, জিসাসের রঙিন চিত্রপট ও সোনালি হুড়কা-যুক্ত) কুম্ভনিদ্রায় আচ্ছন্ন, অথবা মস্ত পেনশনে অবসরগ্রহণের পর মধুর সূর্যাস্ত দেখছেন মন ভরে, প্রশান্ত মহাসমুদ্রের ¯গ্ধ, নিরুপদ্রব, নাতিশীতোষ্ণ তটবালুকায়। আর সাহিত্য বিভাগের গ্রাজুয়েট ছাত্রেরা? চসার-মিল্টন-শেক্সপীয়রে খামোখা সময় নষ্ট না করে, তারা প্রবল অধ্যবসায়ে মশকো করছে একাডেমিক জার্নালের তৎসম শব্দে আকীর্ণ, ক্রিয়াপদবিরল, বীভৎস তাত্ত্বিক গদ্য। এই কর্মে নিষ্ঠা ও ঐকান্তিকতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার ওপর নির্ভর করছে তাদের ডক্টরেট এবং, তারপর, তাত্ত্বিকের সুপারিশে চাকরি।
ডিকনস্ট্রাকশন যতটা না তত্ত্ব, তার চেয়ে বেশি দলীয় প্রোগাম। ডিকনস্ট্রাকশন একটা মিশন, ইয়েল-ক্যাডারদের সাহিত্য-বিরোধী অপারেশন সার্চলাইট। কেননা প্রোগ্রাম, দল, কর্মসূচী এবং সুনির্দিষ্ট মিশন ছাড়া ছিদ্রান্বেষী মিশন দ্বাপর যুগের গদা ভল্ল কুঠার থেকে যেত, ডেসার্ট স্টর্মের কামান, মর্টার হয়ে উঠতে পারত না কখনোই। তত্ত্বের কেরামতি বুঝতে হলে চোখটা তত্ত্ব থেকে সরিয়ে তাত্ত্বিকদের ঐক্যজোট ও সংঘবদ্ধতায় ফেরানো চাই; এই সংঘবদ্ধতা বাস্তব সত্য, কাল্পনিক ব্যাপার নয়। আমি সাহিত্য বিভাগের একটা বিরাট, নি:শব্দ, বিধ্বংসী, অশ্রুতপূর্ব, বাস্তব যুদ্ধের কাহিনী লিখছি । সাহিত্য বিভাগ তাত্ত্বিকের৩ হুকুমে চলবে না সমালোচকের, কিংবা সাহিত্য বিভাগে সাহিত্য থাকবে না তত্ত্ব- সেই বাস্তব যুদ্ধের স্থায়ী ফয়সালা পল দা মানের মৃত্যুর আগেই সম্পন্ন: কে জিতেছে সেই যুদ্ধে? সাহিত্য না তত্ত্ব, সমালোচক না তাত্ত্বিক? কর্নেলের মাইক এইব্রামস, না ইয়েলের পল দা মান? এইব্রামসের সুলিখিত, অত্যন্ত ‘মৌলিক’, মহাগ্রন্থ দি মিরর এন্ড দি ল্যাম্প (১৯৫৩), না পল দা মানের- ফরাশি-জানা প্যাট্রিশা এবং ইয়েলের বন্ধুদের আনুকূল্যে বুক-রিভিয়্যু, খসড়া রচনা, অনুবাদ ইত্যাদি একত্র করে ছেপে দেওয়া- অপাঠ্য চটিবই ব্লাইন্ডনেস এন্ড ইনসাইট (১৯৭১)? সমালোচক মাইক এইব্রামসের মহাগ্রন্থের বিষয় ছিল দুটি উৎপ্রেক্ষা- দর্পণ ও বাতি, মিরর এন্ড ল্যাম্প: কেন প্লেটো থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত পাশ্চাত্ত্য সাহিত্যে ও চিন্তায় ‘দর্পণ’ উৎপ্রেক্ষাটি পুনরাবৃত্ত এবং, তারপর, অষ্টাদশ শতাব্দীর পর থেকে (পাশ্চাত্ত্যে যাকে রোমান্টিক যুগ ধরা হয়, বঙ্গের রবীন্দ্রনাথ যার বিলম্বিত সন্তান) তার স্থান অধিকার করে ‘বাতি’, তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করার জন্যে সমালোচনাগ্রন্থটি প্রণীত (দ্র ‘ভূমিকা’ দি মিরর এন্ড দি ল্যাম্প ১৯৫৩: ২)। যে সমালোচনা-গ্রন্থের প্রতিপাদ্য এই, সাহিত্যের ছাত্রের জন্যে তার চেয়ে বড় কোনো তত্ত্বের প্রয়োজন হবে না।
দেরিদা-দা মানদের তত্ত্বের কেরামতি তত্ত্বে নেই, যদিও দূরে বসে বিভিন্ন বই ঘেঁটে গেলে তাই মনে হতে পারে। ছিদ্রান্বেষণের ইয়ার্কিতে জটিল সূক্ষ্মতার নমুনা খুঁজে তাকেই, তত্ত্বকেই, তার জোরের ভিত্তি বা শক্তির উৎস মনে করা ছেলেমানুষী। তত্ত্বই যদি তার অন্তর্গত শক্তির কারণে তাত্ত্বিক তান্ডবের উৎস হতো, তাহলে তো প্যারিসের তত্ত্ব প্যারিসেই তা ঘটাতে পারত (দেরিদার ‘স্পিচ এন্ড ফেনমেনা’, ‘গ্রামাটোলজি’, ‘রাইটিং এন্ড ডিফারেন্স’ প্রভৃতি সবই ১৯৬৮ সালের পূর্বেকার, সেখানেই প্রকাশিত৪), কিন্তু প্যারিসে তো একটা পটকা ফোটার শব্দও কেউ শোনে নি। যে দুই ফরাশি মহীরূহকে আক্রমণ ও নস্যাৎ করার লক্ষ্যে ফরাশি তত্ত্বের, ডিকনস্ট্রাকশনের, জন্ম (এবং যা দেরিদার পূর্বোক্ত তিনটি বইতে- স্পিস, গ্রামাটোলজি, রাইটিং- পরিপূর্ণভাবে বিবৃত, তার বাইরে তত্ত্বের আর কিছু নেই), সেই ক্লোদ লেভি-স্ত্রোস (১৯০৮-২০০৯) এবং জাঁ-পল সার্ত্র (১৯০৫-১৯৮০) তার অস্তিত্বও টের পাননি, প্যারিসে-ইউরোপে সর্বত্র ছড়ানো তাঁদের অগুণিত অনুরাগীরাও নয়। শুধু তখন কেন, আমেরিকার পূর্ব উপকূলের সাহিত্য বিভাগগুলো যখন তত্ত্বের তোপধ্বনিতে ক্রমশ প্রকম্পিত, তার ক্ষীণতম রণনও পৌঁছায়নি প্যারিসে; বহু বছর পরে পৌঁছালেও, অন্তত বিশ বছর প্যারিস তা পৌঁছেনি। মৃত্যুর আগে নিঃশেষিত দৃষ্টিশক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করে জাঁ-পল সার্ত্র যখন ফ্লোবেয়ার বিষয়ে পাঁচ খন্ডে ৩ হাজার পৃষ্টার মহাগ্রন্থ- দি ফ্যামিলি ইডিয়ট, গুস্তাভ ফ্লোবেয়ার (১ম খন্ড, শিকাগো ১৯৮১; ২য় খন্ড, শিকাগো ১৯৮৭; ৩য় খন্ড, শিকাগো ১৯৮৯; ৪র্থ খন্ড, শিকাগো ১৯৯১; ৫ম খন্ড, শিকাগো ১৯৯৪)- লিখছেন, তিনি কি কখনো ধারণা করতে পেরেছিলেন যে, যে-নগরী তাঁর নামে উন্মাদ সেই প্যারিসের একটি ইহুদী বিচ্ছু বিদেশে গিয়ে তাঁর লেখা নিয়ে ইয়ার্কি করবে, আর তা শুনে অন্যেরা হি হি?:
[শ্রোতার] প্রশ্ন (ইংরেজিতে): হাইডেগার নিয়ে তো কিছু বলেছিলে, কিন্তু সার্ত্র? সার্ত্রের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক?
[দেরিদার] উত্তর (ইংরেজিতে): সম্পর্ক? কি সম্পর্ক আবার? (ভক্তকুলের হাস্য); না, কোনো সম্পর্ক নাই; তবে, অবশ্য, যখন খুব ছোট ছিলাম (হাত দিয়ে দেখানো হলো কতটুকু ছোট, ৭ম-৮ম শ্রেণীর বালক), তখন থেকে তো সার্ত্র পড়ে গেছি। আমি যখন তরুণ ছাত্র, সার্ত্র তখন বড় দার্শনিক। কিন্তু না, তার সঙ্গে আমি দেখা করতে যাই নি, তোমার প্রশ্নের মানে যদি তাই হয়। তরুণ-অবস্থায় তীব্রভাবে সার্ত্র পড়েছি, কিন্তু তারপর তাকে ছেড়ে যাই। কারণ আমি বুঝতে পারি যে সে আসলে স্ট্রং ফিলসফার না। .. ..আসলে কি জানো, সার্ত্রের ব্যাপারটা আমার কাছে এখনো একটা ধাঁধা, কারণ সার্ত্র শক্তিশালী দার্শনিকও না, ভাল কোনো লেখকও না- কত কত ভুল যে লোকটা করেছে তার ইয়ত্তা নেই- কিন্তু অথচ এখনো ফ্রান্সে লোক তার নামে পাগল। এখনো ফ্রান্সে সে সব চাইতে জনপ্রিয় ব্যক্তি; খুব জনপ্রিয়, খুব। সে যখন সে মরল (১৯৮০), প্যারিসের রাস্তায় ঢল নামে লক্ষ লক্ষ লোকের- দার্শনিক হিশেবে এটাকে, এই দৃশ্যকে, তার বিরাট সাফল্য বলতে হয় (ভক্তকুলের পুনরায় হাস্য, হি হি)। সার্ত্রের এই জনপ্রিয়তা সত্যিই একটা ধাঁধা, আমার কাছে ।… উদারচিত্ত লোক ছিল, প্রশংসা করি; কিন্তু না, দর্শনে তার কাছে আমার কোনো ঋণ নেই।
(দেরিদা: স্ক্রিন প্লে এন্ড এসেইজ অন দি ফিল্ম, কার্বি ডিক ও এইমি ক’ফম্যান; ‘ছবি নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব, মিনিট ১১০-১১১’ [২০০২] ২০০৫)
২০০২ সালে শুধু নয়, তার অনেক আগে থেকেই এই বিষধর সর্প জাঁ-পল সার্ত্রের বিরুদ্ধে কুৎসিত অপপ্রচারণায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ:
প্রশ্ন: সে সময়েই কি তবে তুমি সার্ত্র পড়া শুরু করেছিলে?
দেরিদা: তারো আগে থেকে। সে আমার কাছে মডেল ছিল তখন। তারপর আমি বুঝতে পারি কতটা জঘন্য এবং কত ধ্বংসাত্মক ছিল সেই প্রভাব।
প্রশ্ন: সার্ত্রের প্রভাব জঘন্য, ধ্বংসাত্মক, বলছ কি! খুব কড়া কথা বলে ফেললে, আমাকে বুঝাও ।
দেরিদা: খুব কড়া, তাই তো, কথাটা রাখবে, না কেটে দেয়া ভাল- কি বল? আচ্ছা থাকুক গে, যাই হোক সে আমাকে গাইড করেছে, যেমন করেছে আরো অনেককে; তার কারণেই আমি হুসার্ল পড়ি, হাইডেগার পড়ি… সেসব থাক এখন, আমার কথা হল, এই যে লোকটা, সার্ত্র, যে তত্ত্ব বোঝে নাই, হাইডেগার, হুর্সেল, মার্কসবাদ, জয়েস, সাইকোএনালিসিস, বেতায়া বোঝে নাই, যা বুঝেছে ভুল বুঝেছে, তাকে কেন লোকে এত পূজা করে, এই লোক কিভাবে সমস্ত সাংস্কৃতিক জগতের এত বড় অধিনায়ক হয়?
(পয়েন্টস: ইন্টারভিয়ুস, ১৯৭৪-১৯৯৪ জাক দেরিদা, স্ট্যানফোর্ড ১৯৯৫: ১২১-১২২)
তত্ত্ব-তাত্ত্বিকতার জটিল মারফতি বোঝা গেল এবার? বাংলা ভাষায় এই জাতের তাত্ত্বিকতাকে কি বলা উচিত? এই তাড়নার (‘প্রেরণা’র নয়) উৎসস্থল কোথায়? হাঁ, অত্যন্ত ইতরপ্রকৃতির হিংসা-বিদ্বেষই তত্ত্বের প্রেরণা এবং ডেস্ট্রাকশনই ডিকনস্ট্রাকশনের লক্ষ্য: হপকিন্সের সম্মেলন (১৯৬৬) থেকে শুরু করে কোথাও বিচ্ছুটি এই দুটি সত্য গোপন করতে পারে নি। অথচ ছোট-বড় চামচা-চাপরাসিদের লেখা বিচিত্র ইংরেজি নোটবইয়ের তত্ত্বালোচনা- চমস্কি যাকে বলেন ‘প’শ্চারিং’, কচকচানি- শুরু হয় সোসুর, সাইন, লঁগ-প্যারোল, ভাষাতত্ত্ব ইত্যাদি দিয়ে! ডিকনস্ট্রাকশন (অর্থাৎ তত্ত্ব) যে ভাষাতত্ত্বের ব্যাপার নয়, তা প্রবীণ পন্ডিত পবিত্র সরকারের পক্ষে সন্দেহ করা কঠিন, কেননা তিনি ভাষাতাত্ত্বিক; কিন্তু আমি তাত্ত্বিকও নই, ভাষাতাত্ত্বিকও নই- আমার নির্ভর কান্ডজ্ঞান এবং ফ্যাক্টস: একটা বিষধর বিচ্ছুর ব্যক্তিগত হিংসা এবং সার্ত্রের বিরুদ্ধে বিষাক্ত বিদ্বেষ ছড়িয়ে সার্ত্রের আসন দখলের লোভকে আমি তত্ত্ব বলি না।
প্যারিসে কেউ পাতে তোলে নি বলে, এবং তত্ত্ব করে সার্ত্র-লেভি স্ত্রোসকে নামানো অসম্ভব বিধায়, দরকার হয়েছিল ডেস্ট্রাকশন প্রোগ্রামের; বড় বড় লেখকের লেখার দোষ বের করে তাকে স্বত:সিদ্ধ বলে প্রচার এবং সত্য হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে দরকার ছিল বিরাট কর্মীবাহিনী, ভক্ত-শিষ্যের দল; সার্ত্র-লেভি স্ত্রোসের প্যারিসে নয়, যুক্তরাষ্ট্রে। সেই প্রোগ্রাম এবং তার উপযোগী স্বেচ্ছাসেবক দল দুটোই তৈরি করেন পল দা মান এবং তা ছড়িয়ে দেন আমেরিকার সমস্ত সাহিত্যবিভাগে। চাকরির দক্ষিণায় চিরকৃতজ্ঞ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীবাহিনীর অক্লান্ত প্রয়াসে সেই প্রোগ্রাম প্রোগ্রাম থাকে নি, তার কর্মীও কর্মী থাকল না: ‘দিকে দিকে’ তত্ত্বের ‘লাল মশাল’ জ্বলে উঠতে দেখার উল্লাসে কর্মী হয়ে উঠলেন নিবেদিতচিত্ত ভক্ত, প্রোগ্রাম রূপান্তরিত হলো প্রতিষ্ঠানে- ঝামাপুকুরের টোল থেকে রাসমণির দক্ষিনেশ্বর, হাওড়ার বেলুর মঠ থেকে নিউ ইয়র্কের বেদান্ত সোসাইটি, সোসাইটির সন্ন্যাসী ‘ফেলো’ (রেসিডেন্ট-ননরেসিডেন্ট), এবং অবশেষে একুশ শতকের ডিজিটাল ‘বিবেক তীর্থ’: ইকো-পার্ক, বিশ্ববাংলা সরণীর ধারে শিকাগোর ‘আর্ট ইনস্টিটিউট’-এর আদলে নির্মাণাধীন রামকৃষ্ণ মিশনের কাটিং-এইজ বিশ্ববিদ্যালয়। রামকৃষ্ণ মিশনের মতো ডিকনস্ট্রাকশন মিশনের বিবর্তনের কাহিনীও তাই, তার প্লটও বেশ পরিচিত, পুরাতন মনে হওয়া উচিত। তবে সাদৃশ্য বোঝার জন্যে দরকার একটুখানি সাহস- রজ্জুকে সর্প না ভাবার সাহস; নোটবইকে নোটবই হিশেবে দেখার এবং আবর্জনাকে আবর্জনারূপে বর্জন করার সাহস।
ডিকনস্ট্রাকশন প্রোগ্রাম শক্তিশালী কাল্টে উন্নীত হয় সত্তরের শেষার্ধ ও আশির দশকের সূচনায়। দেরিদা যখন বলেন, ‘আমার সহকর্মীরা স্ববিরোধী প্লেটোর অসঙ্গতি সম্বন্ধে আমার মতের সমর্থক ’- তখন বুঝতে হবে তিনি এই বিরাট ভক্তসম্প্রদায়, এই দল, এই কাল্টের কথা বলছেন। কারণ আশ্রম-তুল্য ইয়েল সাহিত্যবিভাগের দীক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীদের কাছে গুরুবাক্য শিরোধার্য হতে পারে, কিন্তু কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, এমনকি ইয়েলের দর্শন বিভাগের কোনো ছাত্র বা অধ্যাপক প্লেটোর ছিদ্র খোঁজার ধান্ধায় প্লেটো পড়েন না; “পাশ্চাত্ত্যের সমস্ত দর্শন প্লেটোর দর্শনের ফুটনোট”- এই চিরন্তন, পরীক্ষিত, সত্যটাই আরো গভীরভাবে অনুধাবনের জন্যে তাঁরা প্লেটো পড়েন। সাহিত্যবিভাগে সংঘবদ্ধ স্বেচ্ছাসেবীর আশ্রম গড়ে ওঠার আগে, ১৯৬৮-১৯৭৫ সালে, দেরিদা-দা মানরা বেইজ্জতির আশংকায় অচেনা পরিবেশে পারতপক্ষে পেপার পড়তে যেতেন না। তবে অক্সফোর্ড-কেমব্রিজ বিষয়ে দেরিদার স্বাভাবিক দুর্বলতা ছিল, ফলে বেইজ্জতির ভয় সত্ত্বেও যাওয়ার লোভ সামলাতে পারেন নি। সে সময় একবার (১৯৬৮ সালে) দেরিদা অক্সফোর্ডে পেপার পড়তে যান, কিন্তু ডিকনস্ট্রাকশন ও ডিফারেন্স নিয়ে ‘বাক-বৈখরি’ শেষ হতে না হতেই বিখ্যাত দার্শনিক, ‘ল্যাংগুয়েজ, ট্রুথ, অ্যান্ড লজিক’ (১৯৩৬)-এর রচয়িতা, এ. (আলফ্রেড) জে. (জুলস) এয়ার (১৯১০-১৯৮৯) এমনই চটে যান (বেনোয়া পিটার্স ২০১৩: ১৮৯) যে দেরিদাকে ‘চুপ কর’ বলাটাই বাকি ছিল (বাকি ছিল কিনা বলা যায় না, কারণ রিচার্ড ররটির মতো কেউ কেউ বলেন যে, এ. জে. এয়ার দেরিদাকে ‘গ্যাডফ্লাই’ বা গো-মাছি নাম দিয়েছিলেন)। অক্সফোর্ডের সভায় অন্য শ্রোতারাও ডিকনস্ট্রাকশনকে একটা কদর্য, বিরক্তিকর, ‘আগ্লি’ (পূর্বোক্ত ২০১৩: ১৮৯) বস্তু ছাড়া আর কিছু মনে করতে পারে নি। সেসময় (১৯৬৮-১৯৭০) পেপার পড়তে গেলে প্যারিসের শ্রোতাদের মধ্যেও একইরকম প্রতিক্রিয়া হতো; যেমন, দেরিদা-উদ্ভাবিত ‘ডিফারেন্স’-শব্দের মধ্যে অনুচ্চারিত ‘এ’ বর্ণ নিয়ে এক সভায় অনেকক্ষণ মারফতি করার পর ব্রিস পারাঁ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠেছিলেন, ‘তুমি তো সেই পুরানা ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লেগে পড়েছ দেখছি’ (পূর্বোক্ত ২০১৩: ১৮৮)। সেই সভায় ব্রিস পারাঁ (১৮৯৭-১৯৭১) দেরিদার ‘ডিফারেন্স’-এর মিস্টিক ভাবকে তুলনা করেন মধ্যযুগের ইহুদী ধর্মবেত্তা মোসেজ মাইমনিডিসের (১১৩৫-১২০৪) সৃষ্টিকর্ত্তা-তত্ত্বের সঙ্গে; ইহুদী ধর্মতত্ত্বের বিখ্যাত গুরু মাইমনিডিস (যাঁর আসল নাম আবু ইমরান মুসা ইবনে মায়মুন, যাঁর তিনটি বিখ্যাত বইয়ের দুইটিই আরবিতে লেখা, এবং কোনো কোনো পাশ্চাত্ত্য পন্ডিতের মতে আরবিভাষী ‘আবু ইমরান’ আসলে মুসলমানই ছিলেন) প্রস্তাব করেছিলেন যে, সৃষ্টিকর্ত্তা বিদ্যমান, কিন্তু যে-অর্থে কোনো কিছুকে আমরা ‘বিদ্যমান’ বলি, বুঝি, সে-অর্থে সৃষ্টিকর্ত্তা বিদ্যমান নন; সে-অর্থে বিদ্যমান ধরলে সৃষ্টিকর্ত্তার সঙ্গে অন্য বিদ্যমান সত্তার তফাত সিদ্ধ হয় না। এই ধর্মতত্ত্ব্রে সঙ্গে দেরিদার ‘ডিফারেন্স’-তত্ত্বের মোক্ষম তুলনা টেনেছিলেন ব্রিস পারাঁ, কারণ ‘ডিফারেন্স’-এর মধ্যে ‘এ’ আছে, অথচ নেই, অর্থাৎ লিখিত হয়, কিন্তু উচ্চারিত হয় না। ব্রিস পারাঁর জিজ্ঞাসা ছিল, তোমার এই রহস্যতত্ত্বের সঙ্গে ধর্মতত্ত্বের তফাতটা কোথায়? কারণ ধর্মতত্ত্বও বলে- ‘সেই রহস্যময় সত্তা যা সমস্ত কিছুর উৎস, অথচ যা মনুষ্যের বোধবুদ্ধির অগোচর’ (পূর্বোক্ত ২০১৩: ১৮৮)। দেরিদার তত্ত্বকথার সঙ্গে ধর্মতত্ত্বের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে অনেকেই আলোচনা করেছেন, এমনকি জেফ্রি হার্টম্যানের মত দেরিদার (এবং পল দা মানের) ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাত্ত্বিকও (মিদরাশ এন্ড লিটারেচার, ইয়েল ১৯৮৬; সেইভিং দি টেকস্ট, জনস হপকিনস ১৯৮১: ১৭-১৯) সেসব কথার পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই। টেকস্ট নিয়ে, শব্দ নিয়ে (যেমন প্লেটোর ফিড্রাস সংলাপে গ্রিক শব্দ ফার্মাকন, ফার্মাকিউস, ফার্মাকস নিয়ে তাঁর দেওবন্দী তফসির, দ্র বারবারা জনসন-অনূদিত ডিসেমিনেশন [১৯৭২] ১৯৮১: ৯৫-১১৬, ১১৭-১১৯, ১২৮-১৩৩) দেরিদার বিপুল উদ্দীপনা মূলত ইহুদী রেবাইদের ‘মিদরাশ’, মাইমনিডিসের ধরনে ভাষ্য-ব্যাখ্যান, জুডাইক-মুসলিম শাস্ত্রচর্চার ধারাবাহিকতায় দেখাই সঙ্গত। প্লেটোর দর্শনের ধারা বা ঐতিহ্য বহনের তাগিদে তিনি প্লেটো পড়েন না (উদ্ধৃতিতে বলেছেন), কারণ তাহলে দর্শনকে ধর্মতত্ত্বে পরিণত করার দায়িত্ব নেবে কে? অক্স-ব্রিজের ‘অ্যানালিটিক ফিলসফি’ কিংবা এ. জে. এয়ারের ‘লজিকাল পজিটিভিজম’ তো নেবে না। এ প্রসঙ্গে ফরাশি সরকারের মন্ত্রীকে লেখা ইয়েলের ‘মোডাল লজিক’ ও ‘বারকান ফর্মূলা’র প্রবর্তক দার্শনিক রুথ বারকান মারকাসের (১৯২১-২০১২) একটি চিঠি থেকে খানিক উদ্ধৃত করি:
দর্শনের ‘কলেজ ইন্টারন্যাশনাল’ প্রতিষ্ঠা করে জাক দেরিদাকে তার ডিরেক্টর বানানোর খবর শুনে মনে হলো এটা একটা বিরাট ঠাট্টা। তারপর মনে হল, আপনি হয়ত ঠাট্টা করতে চান নি, হয়ত লোকটার বিষয়ে আপনার কোনো ধারণা নেই- মন্ত্রী মহাশয় কি শেষমেষ একটা বুদ্ধিমান প্রবঞ্চকের হাতে পড়লেন! দর্শন সম্পর্কে অল্পসল্প খোঁজখবর যাঁদের আছে, তাঁরা সবাই দেরিদা সম্বন্ধে ফুকোর বক্তব্য শুনেছে [আপনি ছাড়া]। মিশেল ফুকোর মতে জাক দেরিদা ‘সন্ত্রাসবাদী তান্ত্রিকতা’র অনুশীলক।
(দেরিদা: এ বায়োগ্রাফি বেনোয়া পিটার্স ২০১৩: ৩৬০; লিমিটেড ইনক, জাক দেরিদা ১৯৮৮: ১৫৮)
‘আমেরিকান ফিলসফিকাল এসোসিয়েশনে’র সভাপতি রুথ বারকান মারকাস ১৯৭৩ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ইয়েলের দর্শন বিভাগের প্রফেসর ছিলেন বলে ইয়েলের ‘দর্শন বিভাগে’ জাক দেরিদা বা তাঁর ধর্মতত্ত্ব ঢুকতে পারে নি; বৈষ্ণব গোস্বামীদের ধূমায়িত আখড়াটা বন্ধু পল দা মানের সাহিত্যবিভাগেই জাঁকিয়ে বসে। পল দা মানের অকাল মৃত্যু (১৯৮৩) সত্ত্বেও প্রোগ্রামের অসুবিধা হতে পারে নি, কেননা তিন বছরের মাথায় (১৯৮৬) পল দা মানের বিশ্বস্ত ভক্ত জে. হিলিস মিলার দেরিদাকে বগল দাবা করে আরভাইনে নিয়ে যান, ফলে আখড়াটা ইয়েলের শীতার্ত পূর্ব উপকূলে তার জরুরি কর্মসূচী সম্পন্ন করে নবোৎসাহে আরভাইনের নাতিশীতোষ্ণ পশ্চিম উপকূলে বিস্তৃত হয়।
দেরিদার মতো তাঁর গুরুর, অর্থাৎ টোডনাবার্গের ক্যাথলিক হাইডেগারের, পন্থাও ধর্মতাত্ত্বিক: দু’জনেই বিভিন্ন শব্দ নিয়ে তার গ্রিক-ল্যাটিন বুৎপত্তি ধরে কথা শুরু করেন, যা ধর্ম-ধর্মতত্ত্ব আলোচনার প্রাচীনতম রীতি। হিটলার-ভক্ত হাইডেগার নামজাদা নাৎসী, কিন্তু তাঁর ধর্মজাতীয় রহস্যচর্চা ও লোভনীয় অস্বচ্ছতায় দেরিদার আকর্ষণ দুর্মর (ছাত্রী নিয়ে দুজনের চোরের মত গোপন জীবনেও অদ্ভুত মিল)। বাঙালীর ‘অচেতন পদার্থ’ শ্রবণের ক্ষমতা, ‘খাতুরীতে গুপ্ত অবধূত’ ও যশোরে দেখা বাউলদের সূক্ষ্ম ‘শব্দবিচার’- ‘মাছ, জল, বাঁশী, মন, জাল ক্রমে বাঁধা হইয়া যাইত’; ‘অনবরত মন কথাটা লইয়া গম্ভীর’- নিয়ে কমলকুমারের মন্তব্য এক্ষেত্রে মনে পড়তে পারে: ‘শব্দ সম্পর্কে আলোচনা সকল দেশের ধর্ম্মশাস্ত্রেরই বিষয়ীভূত ছিল- আমাদের দেশে ধর্ম্ম আর দর্শন একই’ (ভাব প্রকাশ বিষয়ে ২০০৯: ২৬০)। প্যারিসের জাক দেরিদার লেখায় ধর্ম-দর্শনের ভারতীয় আলামত এ. জে. এয়ার এবং অক্স-ব্রিজের দার্শনিকদের চোখ এড়ানো অসম্ভব; সেজন্যেই কেমব্রিজ দেরিদাকে দর্শনে অনারারি ডক্টরেট দিতে চাইলে (১৯৯২) কেমব্রিজের অধ্যাপকেরা ছাড়াও আঠারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের- সিডনি থেকে হার্ভার্ড, জেনিভা থেকে লস এঞ্জেলেস- আঠারজন নামজাদা দার্শনিক লিখিত বিবৃতিতে তার প্রতিবাদ জানান (দি টাইমস, লন্ডন মে ৯, ১৯৯২)। বিবৃতির চুম্বক অংশ:
মিস্টার দেরিদা নিজেকে দার্শনিক বলে পরিচয় দিতে আগ্রহী, কিন্তু যাঁরা দর্শনচর্চা করেন তাঁদের লেখায় দেরিদার কোনো প্রভাব নেই। ইংরেজি, ফরাশি সাহিত্য, ফিল্ম স্টাডিজ ইত্যাদি বিভাগেই তাঁর সমাদর। কোনো পদার্থবিজ্ঞানীর লেখার প্রভাব যদি পদার্থবিজ্ঞানে না পড়ে সাহিত্য, ফিল্ম ইত্যাদি বিভাগে পড়ে, তাকে কি কেমব্রিজ ডক্টরেট দেবে? যদি না দেয়, কেমব্রিজের দর্শনবিভাগ দর্শনের বাইরের একজনকে দার্শনিক বলতে ব্যগ্র হবার কারণ কি?
সারা পৃথিবীর সকল দর্শন বিভাগে দর্শনের আলোচনায় দুটি বস্তুকে মূল্য দেওয়া হয়: স্বচ্ছতা ও সংহতি। জাক দেরিদার লেখায় এই দুই বস্তুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। স্বচ্ছ দর্শনের বদলে তাতে আমরা দেখি ঠাট্টা-মস্করা ও প্রলম্বিত ইয়ার্কি। যেমন, ‘লজিকাল ফ্যালাসিস’কে তিনি লেখেন, ‘লজিকাল ফ্যালাসেস’। এসব ইয়ার্কিতে হয়ত যথেষ্ট মৌলিকতা আছে, কিন্তু কেমব্রিজের দর্শন বিভাগের সঙ্গে ইয়ার্কির সম্পর্ক কি, তা আমরা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। (এ কো’শ্চেন অফ অনার, দি টাইমস লন্ডন মে ৯, ১৯৯২)
মর্মাহত দার্শনিকদের এই মার্জিত প্রতিবাদ যথাযথ, যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত, হলেও শালীন ভাষার কারণে যথেষ্ট শক্ত হতে পারে নি। প্রতিবাদের ভাষায়, পরে, ধারটা যোগ করেন কেমব্রিজের সাহিত্যবিভাগের প্রফেসর হাওয়ার্ড আর্রসকিন-হিল (১৯৩৬-২০১৪), ‘দি সোশাল মিলিউ অফ আলেজান্ডার পোপ’ (১৯৭৫), ‘দি অগাস্টান আইডিয়া ইন ইংলিশ লিটারেচার’ (১৯৮৩), ‘পোয়েট্রি অফ অপজিশন এন্ড রেভ্যুলুশন’ (১৯৯৬) প্রভৃতি সমালোচনা-গ্রন্থের রচয়িতা। তাতে প্রফেসর আর্রসকিন-হিল বলেন, ‘এই লোককে ডক্টর খেতাব দেয়া মানে একজন পাইরোম্যানিয়াক-কে ধরে এনে চীফ ফায়ারম্যান-এর পোস্টে বসানো’ (বেনোয়া পিটার্স ২০১৩: ৪৪৭)- কেমব্রিজের স্বেচ্ছায় ‘আত্মঘাতী’ হবার সাধ হলে তা সম্ভব (কীথ্ উইন্ডসাটল [১৯৯৬] ২০০০: ৬)। তবে, লন্ডনের ‘অরজারভার’ পত্রিকায় সাংবাদিক টম শোওন প্রতিবাদ না করে দেরিদা এবং তত্ত্ব বিষয়ে একটা তীক্ষè অন্তদৃষ্টিপূর্ণ মন্তব্য করেন, যার তাৎপর্য হিউম্যানিটিজের কেউ তখন বোঝেন নি (এতদিন পরে বুঝে লাভ নেই- আমাদের আছে, পাশ্চাত্ত্যের নেই)। টম শোওন তখন পাশ্চাত্ত্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘অকল্পনীয় ক্ষিপতায় ছড়িয়ে পড়া’ দেরিদার প্রভাব-প্রতিপত্তির প্রকৃত রূপ- তার বিস্তৃতি, গভীরতা- বোঝানোর জন্যে তাকে তুলনা করেন ‘কম্পিউটার ভাইরাস’ (অবজারভার, লন্ডন মে ১৯৯১: ৫৫)-এর সঙ্গে: এই তুলনার মধ্যে, লক্ষ করুন, কোনো কটাক্ষ বা নিন্দা নেই। এখনকার দিনে কথাটা সাধারণ শোনাবে হয়ত, কিন্তু এটি কোনো সাধারণ কথা নয়; সেই সময়ে- ১৯৯১ সালে- এটি একটি অসাধারণ, অভ্রান্ত, পর্যবেক্ষণ। তত্ত্বে আক্রান্ত হয়ে কোন্ প্রক্রিয়ায় কি আসলে ঘটে যাচ্ছিল শুরুর সেই দিনগুলোতে সাহিত্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তা এই ব্রিটিশ সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে, বুঝতে পেরেছিলেন, কিন্তু পাশ্চাত্ত্যের আর কেউ তা বোঝে নি, অনুমানও করতে পারে নি । ‘কম্পিউটার ভাইরাস’ কিভাবে কাজ করে আজকের দিনে ভাল করেই আমরা জানি, কিন্তু সাংবাদিক টম শোওন পাশ্চাত্ত্যে যাদেরকে যথামুহূর্তে বোঝাতে চেয়েছিলেন কথাটা, তারা তা ধরতে পারে নি, যদিও তারা তখন- ১৯৯১ সালে- ‘কম্পিউটার ভাইরাস’ কিভাবে কাজ করে তা খুব ভাল করেই জানতো। জ্ঞানাঙ্গনে দেরিদা হুমকিস্বরূপ, তার তত্ত্বের প্রভাব বেশ ক্ষতিকর, কেমব্রিজের ঘোষণা আত্মঘাতী- এসবই বুঝেছিলেন তাঁরা, তার বেশি বোঝেন নি: কারণ সাহিত্য বিভাগগুলো তো কোথাও চলে যায় নি, বিল্ডিংগুলো তো অক্ষতই ছিল (যেমন আছে এখনো); ভাইরাসে আক্রান্ত হবার পর কম্পিউটারের ওজনও কমে না, তাতে আগুনও ধরে না, টেবিলের ওপর আগের মত অক্ষতই থাকে।
হাইডেগার ছাড়া অন্যদের (যেমন প্লেটোর, রুসোর) দর্শনের খুঁত, এবং দার্শনিক বেছে বেছে ইয়ার্কি (শুধু হেগেল, সার্ত্র নয়, ইউসিএলএ-বার্কলির ‘এনালিটিক’ ধারার সমকালীন ও সমবয়সী দর্শন-অধ্যাপক জন সার্লের ‘সার্ল’ নাম নিয়ে গ্রাম্য ইতরের স্টাইলে বই লিখে মস্করা) করে যিনি ‘সাহিত্যবিভাগে’র দার্শনিক- অর্থাৎ যারা দর্শনের কিছু জানে না তাদের মাতব্বর- সেই দেরিদা ষাটে পৌঁছে, সুনির্দিষ্ট কারণবশত, ‘সাহিত্যে’ নোবেল পুরস্কার লাভের আকাক্সক্ষায় দেওয়ানা হয়ে উঠেছিলেন। কলাম্বিয়ার দেখাদেখি কেমব্রিজ এবং অন্যত্র থেকে অনারারি ডিগ্রি, পুরস্কার ইত্যাদি তো জুটেছিলো অনেক, কিন্তু ওসব ‘একাডেমিক’ পদবী-পুরস্কারে মনটা ভরছিল না কিছুতেই, ‘পরানের গহীন ভিতর’ কোথায় যেন একটা প্রচ- কষ্ট: হুমায়ূন আহমদের অতুল্য খ্যাতিতে আমাদের কোনো লোকান্তরিত মনীষীর মনে যেরকম ব্যথা, কিংবা সার্ত্রীয় দর্শন-পরিস্রুত- অল্পপ্রসূ এবং অদ্বিতীয়- কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-হেতু কোনো বহুপ্রসূ দুঃখী সব্যসাচীর অন্ত:করণে যেরকম দহন হতো, দেরিদার দুঃখটাও ছিল সেরকমই সূক্ষ্ম, সংগুপ্ত, গভীর, যদিও তা ভক্ত-সমক্ষে অনুচ্চার্য। নোবেল প্রাইজ ছাড়া আর কোনো প্রাইজে ওই হাহাকার, তাঁর মনে হয়েছে, নিবারিত হবার নয়। হাহাকারের প্রকৃত কারণ উপলব্ধির পর তিনি ‘সাহিত্যে নোবেল প্রাইজে’র জন্যে- পাশ্চাত্ত্যের সাহিত্যবিভাগ ধ্বংসের একক কৃতিত্ব এবং সাহিত্য নিয়ে জীবনব্যাপী ইয়ার্কির স্বীকৃতিস্বরূপ- -প্রতীক্ষা করেছেন বহু বছর, বয়স গুণে গুণে ষাট হবার পর থেকে স্বর্গবাসী হবার পূর্বপর্যন্ত। ‘নোবেলে’র জন্যে হাহাকারের কারণ ‘নোবেল-বিজয়ী’ জাঁ-পল সার্ত্র: কারণ যাকে নিয়ে তিনি ইয়ার্কি করে এসেছেন বছরের পর বছর (“সার্ত্র শক্তিশালী দার্শনিকও না, ভাল কোনো লেখকও না”), সেই দুর্বল লেখক সাহিত্যে, উনষাট-বৎসর বয়সে, নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন (অক্টোবর ১৯৬৪), কাজেই নোবেলটা বাগে আনা গেলে তবেই তো সার্ত্রকে নামানোর প্রোগ্রামটা সম্পূর্ণ হয়।
দেরিদার নোবেল-প্রাপ্তি নিয়ে গুজব ২০০৩ সালেও উঠেছিল, কিন্তু পরের বছর (২০০৪) অক্টোবর মাসে স্ত্রী মার্গারিটের মুখে কথাটা শুনে তিনি সম্পূর্ণ নিশ্চিত হন; ওদিকে বিভিন্ন সূত্র থেকে খবরটা কানে আসায় পত্রিকাগুলোও আগে-ভাগে দেরিদার ওপর বড় বড় লেখা ও প্রচ্ছদ কাহিনীর কম্পোজ-ইলাস্ট্রেশন শেষ করে শুধুমাত্র ৬ই অক্টোবরে পুরস্কার ঘোষণার মুহূর্তটির জন্যে অপেক্ষা করছিল (বেনোয়া পিটার্স ২০১৩: ৫৩৯)। ‘মনে হচ্ছে নোবেলটা এবার তুমি পাচ্ছ’- মার্গারেট বললেন অসুস্থ দেরিদাকে, কবি ও চলচ্চিত্র-নির্মাতা সাফা ফ্যাথির ফোনটা রেখেই; বিনয়ী ভক্ত, বিশ্বস্ত, সাফা ফ্যাথির দেওয়া খবরটা শুনে দেরিদা বললেন, ‘ওরা এখন দেবে, আমি মরে যাচ্ছি ব’লে দেবে’ (পূর্বোক্ত ২০১৩: ৫৩৯)।
৬ই অক্টোবর, বুধবার, সাহিত্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সেবছরের নোবেল পুরষ্কারবিজয়ী ব্যক্তিদের নাম ঘোষিত হয়। তিন দিন পরে, ৯ই অক্টোবর, শনিবার, জাক দেরিদা- হাসপাতালে ‘মৃত-ঘোষিত’ ব্যক্তির দম ফেরার সম্ভাবনা বিষয়ে ইয়ার্কিমিশ্রিত (পূর্বোক্ত ২০১৩: ৫৪০), সর্তকতামূলক, নোট রেখে- শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তাঁর বাসভবনের অদূরবর্তী, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি-সমৃদ্ধ, ওপিতাল কুরে-তে, প্যারিসের । ভিন্ন উপলক্ষ্যে সংগৃহীত আগের লেখাগুলো থেকে যাওয়ায় পত্রিকাগুলোকে নতুন করে লেখা চাইতে হয় নি; যদিও, প্রুফ দেখার সময়, সামান্য তথ্যগত সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছিল।
(চলবে)
উল্লেখসূত্র:
১. জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে (১৯৬৬) জাক দেরিদা (১৯৩০-২০০৪) অত্যাসন্ন ডিকনস্ট্রাকশনী অভ্যুত্থানের ঘোষণা দিলেও মূলত ১৯৭১ সালে, জুইশ অধ্যাপক জেফ্রি হার্টম্যানের (১৯২৯-২০১৬) তদবিরে, কর্নেল ছেড়ে পল দা মানের (১৯১৯-১৯৮৩) ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগদানের পর থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাহিত্য বিভাগে তাত্ত্বিক আগ্রাসনের প্রকৃত সূত্রপাত। পল দা মানের নেতৃত্বে, ১৯৭১ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে, তত্ত্বের ভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রের সকল বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৯৮৭ সালে পল দা মানের নাৎসী অতীতের গোপন কাহিনী আবিস্কৃত হওয়ার আগেই ‘তত্ত্বের সা¤্রাজ্য’ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় (দ্র থিওরি’স এম্পায়ার, ডেফ্নি পেটআই ও উইলফ্রিডো ক’্যর্যাল-সম্পাদিত, কলাম্বিয়া য়ুনিভার্সিটি প্রেস ২০০৫)।
২. ‘একটা গল্প কিভাবে বলতে হয়, তা আমার কখনোই জানা হল না। আমার এই অক্ষমতা, এই দুর্বলতা, আমাকে পীড়িত করেছে সবসময়, কেননা আমার সবচেয়ে ভাল লাগে স্মৃতি- স্মৃতি-রোমন্থনের চেয়ে প্রিয় আর কিছু নেই আমার কাছে । অথচ আমি গল্প বলতে পারি না। কেন পারি না? কেন আমি গল্প বলার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত?’ (দ্র জাক দেরিদা, মেময়ার্স: ফর পল দা মান, জনাথন কালার, সিসিল লিন্ডসি প্রমূখ-সম্পাদিত, কলাম্বিয়া য়ুনিভার্সিটি প্রেস ১৯৮৬: ৩)।
৩. জন্মসাল অনুসারে কতিপয় নামজাদা তাত্ত্বিকের নাম: জে. হিলিস মিলার (জ. ১৯২৮), জেফ্রি হার্টম্যান (১৯২৯-২০১৬), রিচার্ড ররটি (১৯৩১- ২০০৭), ফ্রেডরিক জেমিসন (জ. ১৯৩৪), জনাথন কালার (জ. ১৯৪৪), সো’শানা ফেলম্যান (জ. ১৯৪২), গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক (জ. ১৯৪২), বারবারা জনসন (১৯৪৭-২০০৯), ক্রিস্টোফার নোরিস (ব্রিটিশ, জ. ১৯৪৭), পেগি ক্যামফ (জ. ১৯৪৭), হোমি বাবা (১৯৪৯), আভিটাল রনাল (জ. ১৯৫২), জুডিথ বাটলার (জ. ১৯৫৬)। এঁদের অনেকে এখন (কেউ কেউ আগেও) ‘ডিকনস্ট্রাশনিস্ট’ শব্দে আপত্তি করবেন, অস্বীকারও করবেন কেউ কেউ: বলবেন, খাঁটি বাঙ্গালের মত এসব কি বলছ- ‘আমি তো কালচারাল স্টাডিজের, আমি তো পোস্টকলোনিয়াল, আমি তো ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল, আমি তো কুইয়ার থিওরি, অমুক তো নিউ হিস্টরিসিজম, তমুক তো র্যাডিকাল মার্কসিস্ট, জুডিথ তো জেন্ডার… ’, ইত্যাদি (তবে তাত্ত্বিক বললে অন্য কথা, ওই শব্দের বড় প্রেস্টিজ)। সেজন্যেই বলেছি যে, নামাবলী জপ করলে হলে নামগুলোই জানা হবে, কিছু বোঝা যাবেনা; বোঝা দরকার: (১) তাত্ত্বিকতা (২) তাত্ত্বিকতার গোড়া ডিকনস্ট্রাকশন (৩) ডিকনস্ট্রাকশন শব্দটি শুনে যা মনে হয় ডিকনস্ট্রাকশন আসলে তাই, অর্থাৎ ডেস্ট্রাকশন (হাইডেগার-ব্যবহৃত ডেস্ট্রাকশন শব্দ এবং হাইডেগার-প্রস্তাবিত ডেস্ট্রাকশন প্রোগ্রামই তাঁর শিষ্যদের ডিকনস্ট্রাকশন, নাৎসী তাত্ত্বিকের কথাগুলো পড়ে দেখুন: বিইং এন্ড টাইম মার্টিন হাইডেগার; জন ম্যাককোয়াআর ও এডওয়ার্ড রবিনসন-অনূদিত, অক্সফোর্ড ব্ল্যাকওয়েল [১৯২৭] ১৯৬২: ৪১-৪৯)। কাজেই এ কোনো তত্ত্ব নয়, মিশন; দর্শন নয়, দলীয় পোগ্রাম: পল দা মান এবং জাক দেরিদার যৌথ নেতৃত্বে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক ডেস্টাকশন প্রোগ্রাম ছাড়া ইংরেজি-নোটবইতে নানা-নামে চিহ্নিত বহুরূপী তত্ত্বের বিশ্ববিজয় (কারণ তৃতীয় বিশ্বও তাতে আক্রান্ত) দূরে থাক, বিশ্বের কোথাও তার সূত্রপাত ঘটারও সম্ভাবনা ছিল না।
৪. জাক দেরিদার ছিদ্রান্বেষণ যে তিনটি বইতে আলোচিত, তার সবই ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত, কিন্তু সেই ছিদ্রান্বেষণকে, তত্ত্বকে, সাহিত্য বিভাগে সাহিত্যবিরোধী পোগ্রামে রূপান্তরিত করার কৃতিত্ব পল দা মানের। তার মানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, পল দা মানের কারণে, ডিকনস্ট্রাকশন কি ঘটাতে সক্ষম হয়েছে, তার নিরিখে বুঝতে হবে ডিকনস্ট্রাকশনের কাহিনী; প্যারিসের বাংলাবাজার থেকে পূর্বে প্রকাশিত, অজ্ঞাত, অপরিচিত জাক দেরিদার তিন খানা বই দিয়ে নয়। দেরিদার সে বইগুলো হলো: স্পীচ এন্ড ফেনমেনা (প্রথম প্রকাশ, ১৯৬৭), ইংরেজি অনুবাদ: ডেভিড অ্যালিসন ও নিউটন গার্ভার (যুক্তরাষ্ট্র, নর্থওয়েস্টার্ন য়ুনিভার্সিটি প্রেস ১৯৭৩)- তথাকথিত ‘এ’-যুক্ত, অনুচ্চারিত, ‘ডিফারেন্সে’র সব কথা এ বইতেই (পৃ. ১২৯-১৫৮), ১৯৬৭ সালেই, বিবৃত, কিন্তু প্যারিসের সেই ডিকনস্ট্রাকশন প্যারিসে কেউ পোছে নি; অন্য দুটি বইও ১৯৬৭ সালে সেখানেই প্রকাশিত: অফ গ্রামাটোলজি (প্রথম প্রকাশ ১৯৬৭), ইংরেজি অনুবাদ: গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক (যুক্তরাষ্ট্র, জনস হপকিনস, ১৯৭৪), এবং রাইটিং এন্ড ডিফারেন্স (প্রথম প্রকাশ ১৯৬৭), ইংরেজি অনুবাদ: অ্যালান ব’াস (যুক্তরাষ্ট্র, য়ুনিভার্সিটি অফ শিকাগো, ১৯৭৮), কিন্তু সে দুটি ‘উপহার’ও- ডিকনস্ট্রাকশন, তার প্রবক্তার মতে, একটা ‘মিউট, মার্সিলেস গিফট’ (দেরিদা ১৯৯৫: ১৬)- ওখানে নেয় নি কেউ। শুধু তাই নয়, জনস হপকিনসের সম্মেলনে (১৯৬৬) জাক দেরিদা (লেভি-স্ত্রোসের অনুপস্থিতিতে) ক্লোদ লেভি-স্ত্রোসকে আক্রমণ করে যে লেখাটি পড়ে আমেরিকায় ডিকনস্ট্রাকশন নামক দজ্জালÑ দেরিদার নিজের ভাষায় ‘মনস্টার’- জন্মের আগাম ঘোষণা দেন, সেই লম্বা লেজযুক্ত ‘স্ট্রাকচার, সাইন, এন্ড প্লে…’ লেখাটিও শেষোক্ত, ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত, রাইটিং এন্ড ডিফারেন্স বইতে অন্তর্ভুক্ত ([১৯৬৭] ১৯৭৮: ২৭৮-২৯৪), কিন্তু না, প্যারিসের কেউ পোছে নি তারপরও। দীর্ঘজীবী ক্লোদ লেভি-স্ত্রোস (১৯০৮-২০০৯)- দেরিদার মৃত্যুর পাঁচ বছর পরও যিনি জীবিত ছিলেন, প্যারিসেই- তাঁর একশত এক বৎসরের সুদীর্ঘ জীবনে কখনো শোনেন নি হপকিন্সের (১৯৬৬) ওই লেখা বা তার লেখকের, অর্থাৎ অকৃতজ্ঞ ইহুদী বিভীষণের, নাম। বিদ্বেষী বিভীষণ তো- লেভি-স্ত্রোসের ‘ট্রিস-ট্রপিকস’ (১৯৫৫) পড়ে মাথা ঘুরে যাওয়ায়- লেভি-স্ত্রোসকে আক্রমণ করে আস্ত একটা বইই লিখেছেন অফ গ্রামাটোলজি (সেই ১৯৬৭ সালেই প্রকাশিত), কিন্তু সে সময়কার অজ্ঞাত, অকৃতজ্ঞ কুলাঙ্গারের এই খবরটা লেভি-স্ত্রোসের কানে দেয়ার জন্যেও সার্ত্র-লেভি স্ত্রোসের প্যারিসে কোনো সাহসী চন্ডাল মেলেনি (কেউ ওখানে তা জানতও না)। কাজেই ডিকনস্ট্রাকশন প্যারিসে নয়, আমেরিকায় উৎপন্ন- ইয়েলই ভাগিরথী; তবে, দুই প্যারিসীয় মহীরূহকে (সার্ত্র, লেভি-স্ত্রোস) নস্যাৎ করার প্রাথমিক প্রতিজ্ঞায় প্যারিসের বাইরে ডিকনস্ট্রাকশনের জন্ম হলেও, পরে, পরিণত যৌবনে পৌঁছে, গদাধর থেকে পরমহংস এবং রামকৃষ্ণ থেকে রামকৃষ্ণ মিশনের মতো, নানা জাতের নাম-কালামে তার এমনই বিবর্তন ঘটেছে যে এতকাল পরে বান্দর আর মনুষ্য এক কিনা তার তর্কে বান্দরের তপ্ত গন্ডদেশে ‘কদম ফোয়ারা’র মতো ঘাম ছোটে। হ