কলকাতা, আশির দশক। প্রাণচাঞ্চল্যে চিরহরিৎ। মানুষের তুলনায় অপ্রতুল যানবাহনে প্রাণ-হাতে-নেয়া বাদুর-ঝোলা বাস, ততোধিক অপ্রতুল রাস্তার কল্যাণে ট্রাফিক-জ্যাম এবং মেট্রো- রেলপথ নির্মাণের দৌলতে খানাখন্দময় কুশ্রী মুখ। আজকের কলকাতার স্বাচ্ছন্দ্যে অভ্যস্ত প্রজন্ম থেকে অনেকটা দূরে। হঠাৎ অতীতে ফিরে গেলে মনে হতেই পারে, এ কেমন তিলোত্তমা! এ কি অচেনা কোনোও মালভূমি? যেন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সৃষ্টির উন্মেষের নিরন্তর প্রয়াস। অবশ্য ধ্বংসের মধ্যেই সুপ্ত থাকে সৃষ্টির বীজ।
আকাশ জয়পুরিয়া কলেজে ক্লাস ইলেভেন, মাত্র কয়েক মাস ক্লাস শুরু হয়েছে। রামকৃষ্ণ মিশনের ঘেরাটোপ থেকে কো-এড কলেজের পরিমণ্ডলে আসায়, কুয়োর ব্যাঙকে অগাধ সমুদ্রে ছেড়ে দেবার মতো অবস্থা। স্বভাবে লাজুক হওয়ায় কলেজের প্রায় সব অ্যাকটিভিটিরই বাইরে।
বয়সের নিয়মে মনে একটু রঙ ধরলেও চেহারায় তখন পর্যন্ত বাড়ি ও স্কুলের কড়া অনুশাসনের চিহ্ন প্রকট। মাথায় জবজবে সর্ষের তেল, কালো মোটা ফ্রেমের চশমা, আপাদমস্তক একটা ক্যাবলাকান্ত। মেয়েরা সামনে এলেই হাত-পা কাঁপে, গলা শুকিয়ে চোখ-মুখ বিবর্ণ, ফ্যাকাশে। পা দুটো এতটাই ভারী হয়, ছুটে পালানোর অবস্থাও থাকে না।
বলার মধ্যে শুধু এনসিসির পারফরম্যান্স। ওই ব্যাটালিয়নে যে কোনোও বিভাগেই সেরা। ব্যারাকপুরে ‘অ্যানুয়াল ট্রেনিং ক্যাম্প’ হয়ে গেছে। পরবর্তীকালে রবিবারের এনসিসির ক্লাস ছাড়াও হঠাৎ কোনও প্রয়োজনে ফোর্ট উইলিয়ামে যাওয়ার দায়িত্বটা যেচে নিয়েছে। ফলে ক্লাসেও অনিয়মিত। আসলে কাঁচা বয়সের অপরিণত বুদ্ধিতে হিরো হওয়ার সহজ প্রবৃত্তি ছাড়তে পারেনি।
কলেজের ছাত্রসংসদে তৎকালীন বিজয়ী দলে মেধাবী, মার্জিত ছাত্রছাত্রীরা ছিল। অন্যদিকে বিরোধী দলে কলেজের মুষ্টিমেয় দু-চারজন ছাত্রছাত্রীকে বাদ দিলে সকলেই বাইরের, অনেক বেশি বয়স্ক, উদ্ধত। তাদের চেহারা দেখে পড়াশুনার সঙ্গে কোনোদিন কোনও যোগ ছিল বলে মনে হতো না।
বাংলাসাহিত্যের ক্লাস নিতেন অধ্যাপক ড. অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়। খুব রাশভারী, শৃঙ্খলাপরায়ণ। ছাত্রছাত্রীরা কেউ কোনোদিন ওনার হাসি দেখেনি। ক্যাম্পের বেশ কিছুদিন পর, ক্লাসে রোল-কলের সময়ে আকাশ প্রেজেন্স জানানোয়, হঠাৎ থেমে সামনে তাকালেন অসিতবাবু। দেড়শোজন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে চিনতে না পেরে বললেন, “কে? দাঁড়াও।” আকাশ দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার!” আকাশ বুঝতে না পেরে আমতা-আমতা করায় ধমকে উঠলেন। “কোথা থেকে? অ্যাবসেন্ট ছিলে কেন?” “এনসিসির ক্যাম্প ছিল।” “তুমি কি ক্যাম্পেই থাকো? মাঝে মধ্যে ক্যাম্প থেকে ছাড়া পেলে কলেজে ঘুরতে আসো?” ক্লাসের মধ্যে চাপাহাসির গুঞ্জন উঠল। সদ্য প্রকাশোন্মুখ হিরোকে এক ধাক্কায় পর্বতচূড়া থেকে যেন ফেলে দিলেন। মনে মনে মেনে নিতে না পারলেও তারপর থেকে আর ক্লাস মিস করত না।
এর ক’দিন পর, ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪। অসিতবাবু ক্লাসে এসেই দরজায় ছিটকিনি দিয়ে দিলেন। যারা দেরি করবে যাতে ঢুকতে না পারে। দুটো পিরিয়ড ধরে টানা ক্লাস। কিছু সময় পরে হঠাৎ দরজায় দুমদাম শব্দ, যেন দরজা ভেঙে ফেলবে। অসিতবাবু দরজা খুললেন। সঙ্গে সঙ্গে হইহই করে চড়াও হয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল বিরোধী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একদল লোক। অসিতবাবুর সঙ্গে এমন ঘটনায়, সেদিনের অপমানের কথা ভেবে আকাশ মনে মনে তাৎক্ষণিক তৃপ্তি পেল। তিনি জানতে চাইলেন “কী ব্যাপার?” ওরা বলল, শিখ-জঙ্গিরা ইন্দিরা গান্ধীকে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে, ক্লাস বন্ধ করতে হবে। তখনো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুসংবাদ ভারতীয় খবরে প্রকাশিত নয়। যদিও ‘বিবিসি’র খবরে ইতোমধ্যেই প্রকাশিত। অসিতবাবু বললেন, “কোনও সার্কুলার আছে কি? এখন ক্লাস চলছে, পরে দেখা যাবে।” কিন্তু ওদের মারমুখী আচরণের সামনে অসিতবাবুর কথা খড়কুটোর মতো ভেসে গেল। ওরা জোর করেই সবাইকে বের করে দিল ক্লাস থেকে। প্রিন্সিপাল ঘোষণা করলেন, দেশজুড়ে দাঙ্গা লেগেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেন যে যার বাড়ি চলে যায়, আর এক এলাকার ছেলেমেয়েরা যেন দলবদ্ধভাবে একসঙ্গে যায়।
বাইরে তখন রণক্ষেত্র। চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। দৌড়োদৌড়ি, ভাঙচুর, মারধর, অগ্নিসংযোগ। মানুষ খেপে গেছে। বাস, ট্রাম, ট্যাক্সি সব বন্ধ। দোকানপাট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। প্রাইভেট গাড়িরও দেখা নেই। দুটো-একটা গাড়ি যা দেখা গেল, ভাঙা কাচ; আতঙ্কিত ড্রাইভার কোনোমতে পালাতে পারলে বাঁচে। ইন্দিরা-প্রিয় কিছু উত্তপ্ত মানুষ সম্পূর্ণ ঘটনা জানার আগেই লোহার রড, বাঁশ, ইট দিয়ে হাতের সামনে যা পাচ্ছে তছনছ করছে। ঝড়ের বেগে তাণ্ডব ছড়িয়ে পড়তে থাকল দ্রুত।
একজন বয়স্ক মানুষ স্কুটার নিয়ে আসছিলেন, লাল-মন্দিরের সামনে তাকে থামিয়ে এলোপাতাড়ি চর-থাপ্পড় মারল, শুধু তাই নয়, তার থেকে স্কুটারের চাবিটা কেড়ে নিয়ে মেট্রো-রেলের খাদে ফেলে দিল। অসহায় বৃদ্ধ ফ্যালফ্যাল করে উন্মত্ত মানুষের ভয়ানক মারণ রূপ দেখে বোবায় ধরা মানুষের মতো চলে গেলেন।
অচিরেই এই তাণ্ডব শিখ-নিধন যজ্ঞে রূপান্তরিত হলো। গোটা দেশজুড়ে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষজন হারিয়ে ফেললেন নিরাপত্তা। আতঙ্কে, প্রাণের মায়ায় নানান জায়গায় শিখ সম্প্রদায়ের অনেকে চুল-দাড়ি কেটে রূপ বদলে ফেললেন রাতারাতি। অনেকেই সপরিবারে ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও কোনও অনাত্মীয় বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে আত্মগোপনে বাধ্য হলেন। ভিন্ন জাতির মানুষ মানবতার বন্ধনে বাঁধা পড়লেন।
যারা নর্থের দিকে থাকত, তারা সব মোটামুটি একসঙ্গেই হাঁটতে থাকল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ দিয়ে রাজবল্লভ পাড়ার দিকে। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, বাঙালি, মাড়োয়ারি, ছাত্রছাত্রীসহ বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন জাতির মানুষ সেদিন একই পথের পথিক হতে বাধ্য হলেন। নিয়তির পরিহাস বোধ হয় একেই বলে!
আকাশের ষোলো বছরের জীবনে এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির প্রথম প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। একটা থমথমে রোমাঞ্চকর পরিবেশ। স্কুলের অভিন্নহৃদয়-বন্ধু দেবাশিষ, অরূপ, আকাশ একসঙ্গেই ছিল। ওদের বাড়ি কাশীপুরে, আকাশের বরানগর। আর ছিল অদিতি। ফরসা, দোহারা, ঢলঢলে মুখ, গভীর-দীঘল চোখ, বেশ মিষ্টি দেখতে। বাড়ি উত্তরপাড়ায়। কারোর আট-কিলোমিটার কারোর বা বারো-কিলোমিটার রাস্তা। শহরাঞ্চলের জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত মানুষের কাছে এতটা রাস্তা হেঁটে যাওয়া মোটেই সহজ নয়, তাও এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে।
মেয়েদের সঙ্গে আকাশ সহজ ছিল না। অদিতি কথা বলছিল। আকাশ হুঁ, হাঁ করছিল। একসঙ্গে হাঁটতে অবশ্য ভালোই লাগছিল। দীর্ঘ পথ চলার ক্লান্তি, দাঙ্গাজনিত ভীতি বদলে গেল অনাঘ্রাত দুই কিশোর-কিশোরীর অপ্রত্যাশিত ভালো লাগায়।
টালা-ব্রিজ দিয়ে গেলে ঘুরপথ হবে বলে ওরা চিতপুর-ব্রিজ ধরল। তখন চিতপুর-ব্রিজের মূল অংশটা ভেঙে কাজ হচ্ছিল ফলে কোনও গাড়ি যাওয়া তো দূরের কথা, মানুষের হাঁটার মতো অবস্থাও ছিল না। ব্রিজের পাশ দিয়ে দু-তিনজন মানুষ হেঁটে যাওয়ার মতো কাঠ ও বাঁশের তৈরি একটি অস্থায়ী সাঁকো ছিল। সেই সাঁকো দিয়ে হাঁটার সময় দেবাশিষ-অরূপ ওদেরকে একা হওয়ার সুযোগ দিয়ে এগিয়ে গেল। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে অনেক কথা বলছিল আকাশ। মনে হচ্ছিল স্বপ্নে দেখা আবছায়ায় ভীষণ ভালো লাগা মায়া-মাখা রাজ্যে মুখ দেখতে না পাওয়া সেই অপরূপা রাজকন্যের সঙ্গে ভ্রমণ করছে সে।
ব্রিজ পেরিয়ে ওরা তখন ঝিল রোডে বিবিবাজারের কাছে। হইহই, ছুটোছুটি, উন্মত্ত জনতা রাস্তার মাঝখানে একটা ট্রাকে আগুন লাগিয়েছে। কিছুতেই হুঁশ নেই তাদের। আকাশরা কী করবে ঠিক করতে পারছিল না। দাঁড়াবে, এগোবে না পিছুবে? এগোনোর মতো অবস্থা নেই, আবার পিছিয়েও লাভ নেই। নিরাপত্তা চাই, বাড়ি ফিরতে হবে। ওরা দোনামনা করছে এমন সময় হঠাৎই জ্বলন্ত ট্রাক থেকে টায়ার ব্লাস্ট করে রবারের জ্বলন্ত একটা টুকরো আগুনের গোলার মতো ছিটকে এসে অদিতির ব্যাগে লাগল। ওড়নার একটা দিক পুড়ে গেল। আতঙ্কে কেঁদে ফেলল অদিতি। আকাশ একটু ইতস্তত করে অদিতির হাত ধরে ভিড়ের মধ্যেই ফাঁক খুঁজে ছুটতে থাকল। ছুটতে ছুটতে অনেকটা পথ পার হয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ একটা জায়গায় দাঁড়ালো। এতটা পথ দৌড়নোর ক্লান্তিতে, ঘামে, তৃষ্ণায় আর পারল না অদিতি। ওর শরীর ছেড়ে দিল, পড়ে যাচ্ছিল, ধরে ফেলল আকাশ। অদিতি অবলম্বন পেল। কাছেই কর্পোরেশনের একটা কল দেখতে পেয়ে আকাশ অদিতিকে নিয়ে সেদিকে গেল। অদিতির চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিল। আঁজলা ভরে জল খেল অদিতি। কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে কেমন করে তাকাল। সে দৃষ্টিতে আর কিছু কি ছিল? যা বজ্রের মতো আকাশকে বিদীর্ণ করে দিল।
কারফিউ জারি হলো। মানুষ সতর্কতার সঙ্গে গোপনে ফিশফিশ… যেন বাক্স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছে। কার্তিকের সূর্য বেলা থাকতেই আবছা-অন্ধকারে কুয়াশায় মুখ লুকোল, শোকে না লজ্জায়? আরো একবার প্রমাণিত হলো মানুষই মনুষ্যত্বের সব থেকে বড় শত্রু।
অদিতিকে এমন পরিস্থিতিতে বরানগর থেকে একলা ছাড়তে পারল না আকাশ। উত্তরপাড়ায় ওদের বাড়ি পৌঁছে দিল। চারিদিকে ধ্বংসলীলার মধ্যে সৃষ্টি কি প্রকাশ-পথের জন্য উন্মুখ ছিল? পাশাপাশি হেঁটে চলা পথে ওদের মধ্যে রচিত হলো কি কোনও অদৃশ্য সেতুবন্ধ? যে বন্ধন জীবনের অনেক বন্ধুর পথকে হাতে-হাত রেখেই পার করে দেবে। হ