এই একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে দাঁড়িয়ে সমকালীন দৃশ্যকলার সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপটের মাঝখানে কিছুটা হতমান অবস্থানে থেকে, লোকশিল্প বিষয়ে মনোযোগী অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হওয়া দুরূহ কাজ বৈ কী। সমকালীন নন্দনভাবনায়, যাকে উত্তর-আধুনিক নামেও ডাকা হয়ে থাকে, শিল্পের কুলীন আর লোকজ অস্তিত্বকে আর আলাদা করে না দেখবার একটি প্রয়াস যেমন রয়েছে, শিল্পের জগতে উঁচু-নিচু বিভেদকে অস্বীকারের একটি দৃষ্টিভঙ্গিও তেমনি কাজ করছে। আবার অন্যদিকে একবিংশ শতকের আধুনিকোত্তর দৃশ্যকলা যে রূপ পরিগ্রহ করছে তাতে আলাদা করে লোকজীবনের একেবারেই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নির্মিত এসব শিল্পক্রিয়ার আদৌ কোন ভূমিকা অবশিষ্ট থাকছে কিনা সেটিও ভাববার বিষয় বটে।
লোকশিল্পের সংজ্ঞায়নও বেশ অস্পষ্ট ও ধোঁয়াটে। এর সাথে প্রায়শই আমরা একাকার করে ফেলি আদিবাসী ও উপজাতীয় মানুষের শিল্প, যা আসলে একবারেই ভিন্ন জিনিস। আবার লোকজীবন থেকে পাওয়া শিল্পকর্মের মধ্যে কোনটাকে চারুশিল্পের মর্যাদা দেব আর কাকেই বা শুধুই কারুশিল্পের অভিধাটুকু অর্পণ করব তা নিয়েও বেশ গোলমেলে অবস্থা বিরাজমানই রয়েছে। এসব বিভ্রান্তির অসুবিধাকে কবুল করেও আমরা লোকজীবনের একেবারে ভিতর থেকে উঠে আসা এ শিল্পকে অনুধাবনের প্রয়াস নিতে পারি, বুঝবার চেষ্ট করতে পারি একটি জাতিগোষ্ঠীর শত শত বছর ধরে প্রবাহিত লোকজীবনের প্রাণস্পন্দনকে।
লোকশিল্পের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে অপরিবর্তনশীল স্বনির্ভর গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার মধ্যে। প্রাচীন প্রাকৃত জনসমাজ যখন থেকে আত্মনির্ভরশীল স্থায়ী বসতি ও কৌম গড়ে তোলে তখন থেকেই গ্রামীণ জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে লোকশিল্প ও সংস্কৃতির নানান অভিব্যক্তি রূপ পেতে শুরু করে। প্রথমত এর সম্পর্ক ছিল প্রয়োজনের সঙ্গে। দু’ধরনের প্রয়োজন : একটি প্রাত্যহিক জীবনযাপনের, অন্যটি ধর্মীয় বা সামাজিক আচারাদির। দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাবার তাগিদে গড়ে ওঠে মৃৎপাত্র নির্মাণ, বয়নশিল্প, বাঁশ ও বেতের কাজ, ধাতুর পাত্র ও ব্যবহার্য দ্রব্য নির্মাণ, কাঠের আসবাবশিল্প ইত্যাদি। গ্রাম সমাজে একদল কারিগর তৈরি হয়ে ওঠে যারা বংশানুক্রমে এই ধরনের বিশেষ বিশেষ এক একটি পেশায় দক্ষ হয়ে ওঠে। দক্ষতার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনের উপরি হিসাবে কারিগর তার সৌন্দর্য চেতনারও খানিকটা প্রকাশ এসব ব্যবহার্য দ্রব্যে ঘটাতে শুরু করেন। এর পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক ক্রিয়াকর্মাদির প্রয়োজনে দেবদেবীর মূর্তি নির্মাণ, পট অঙ্কন, আলপনা ইত্যাদির জন্যও একদল দক্ষ কারিগর তৈরি হয়ে ওঠে। এর মধ্যেও দক্ষতা ও নান্দনিক গুণ শিল্পীর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি থেকেই যুক্ত হতে শুরু হয়। গ্রাম সমাজ যখন ক্রমশ থিতু ও সম্পন্ন হয়ে ওঠে, কারিগরের পারঙ্গমতা যখন আরো উন্নত ও পরিশীলিত রূপ পায় তখন গ্রামজীবনে কিছুটা অবসরের ফুরসত পাবার পরিস্থিতি তৈরি হয়। পালাগান, পুঁথিপাঠ বা যাত্রা জাতীয় বিনোদন তখন মানুষের অবসরের সঙ্গী হয়ে ওঠে। মৃৎপাত্র নির্মাণের কারিগর অরসর সময়ে বানাতে শুরু করে পুতুল বা খেলনা কিংবা সখের হাঁড়ি। সূচিশিল্প, নকশাদার হাতপাখা বা নকশি কাঁথা এই ধরনের অবসরের শিল্পপ্রকাশ। এমনকি ব্যবহার্য দ্রব্যেও কারিগর তার শিল্পবোধের চিহ্ন আঁকতে প্রয়াসী হয়, তাতে তার কিছু অতিরিক্ত পরিশ্রম হলোই বা। কাঠের আসবাবের আলঙ্কারিক নকশা, বেতের পাটির বুনট নকশা, বাঁশের ঝুড়ির পরিশীলিত সৌন্দর্য, নৌকার গলুই-এর অলঙ্করণ ইত্যাদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সংযোজন, কারিগরের নান্দনিক আকাক্সক্ষার প্রকাশ। এই সঙ্গে এ তথ্যও উল্লেখনীয় যে লোকজশিল্পের একটি বৃহৎ অংশের শিল্পীকুল পল্লী-বাংলার নারীসমাজ। সাংসারিক দায়দায়িত্বের মধ্যেও অবসর সময়ে গ্রামীণ নারী রচনা করেছে প্রয়োজনীয় ও প্রয়োজনাতিরিক্ত বিবিধ দ্রব্য। এসবের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখনীয় একান্তভাবেই বাংলার রমণীকুলের শিল্পকর্ম- নকশি কাঁথা, যার খ্যাতি আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এ ছাড়া আলপনাও বঙ্গনারীর বিশেষ নান্দনিক গুণসম্পন্ন শিল্পকর্ম হিসেবে স্বীকৃত। কুমোর পরিবার অবসর সময়ে পোড়ামাটির যে পুতুল বা খেলনা গড়ে তাও মূলত পরিবারের নারীসদস্যদের কাজ। এই সব শিল্পকর্মে শুধু যে পল্লীর শিক্ষাবিহীন নারীসমাজের অসাধারণ শিল্পচেতনার প্রকাশ ঘটেছে যা আমাদের অভিভূত করে তাই নয়, গ্রামীণ নারীর মনোজগতের গোপন বেদনা-আকাক্সক্ষা-স্বপ্নেরও সূক্ষ্ম আভাস মিশে থেকে এগুলিকে সমাজ নিরীক্ষণেরও এক প্রয়োজনীয় উপাদানে পরিণত করেছে। কোন রকম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণবিহীন পল্লীর এইসব কারিগরের কথাই বলি বা নারীসমাজের কথাই বলি, তাদের এই সৌন্দর্যচেতনা সম্পূর্ণ অসচেতন স্বতঃস্ফূর্ততা থেকে প্রাপ্ত, এটি একটি প্রবহমান জনগোষ্ঠীর শিল্পরূপ যা গোষ্ঠীভুক্ত সকলের প্রত্যক্ষ মানবিক সম্পর্ক, আত্মিক সংযোগ ও গভীর থেকে প্রাপ্ত। এর পরিধি সঙ্কীর্ণ, কিন্তু প্রাণশক্তি প্রবল।
নগর ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে আত্মনির্ভর গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর গাঢ়বদ্ধতা ক্রমে শিথিল হতে থাকে। বিজ্ঞান ও কারিগরি বিদ্যার উন্নতি, শিল্প ও যান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশ, পরিবহন সুবিধার সম্প্রসারণের ফলে যন্ত্র-উৎপাদিত পণ্যের ব্যাপক প্রাপ্তি-সুবিধা হস্তনির্মিত লৌকিক বস্তুর প্রতি গ্রামীণ মানুষকেও ক্রমশ অনাগ্রহী করে তুলেছে। তাছাড়া নগরায়ণ ও জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রসার মানুষের জীবনধারায়ও ঘটিয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আধুনিক জীবনচর্যায় মানুষ হয়ে উঠছে অধিক আত্মকেন্দ্রিক, সামাজিক কর্মকান্ডে তার আগ্রহ কমছে, তার ধর্মবিশ্বাস প্রশ্নের সম্মুখীনÑ ফলত ধর্মীয় ও সামাজিক আচারের উপকরণসমূহেরও চাহিদা কমছে, চাহিদা থাকলেও এসব কাজ এখন চলে যাচ্ছে শহুরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রাপ্ত শিল্পীদের দখলে। কলকারখানায় তৈরি তৈজসপত্রের সহজলভ্যতা ও ব্যবহার-সুবিধার কারণে শহর-পল্লী নির্বিশেষে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সে সবের দিকে ঝুঁকছে। ফলে গ্রামীণ কামার, কুমোর, তাঁতী, বাঁশ-বেতের কারিগর ক্রমশ বাধ্য হচ্ছে তাদের বংশানুক্রমিক বৃত্তি ত্যাগ করে অন্য পেশা গ্রহণ করতে। এভাবে আত্মনির্ভরশীল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঘটছে ব্যাপক পরিবর্তন, সেই সাথে লৌকিক শিল্পনিদর্শনগুলোও ক্রমশ বিলুপ্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তবে পৃথিবীর অন্যান্য বহু দেশের তুলনায় আমাদের দেশ তথা এ উপমহাদেশ এখনো কৃষিনির্ভর এবং গ্রামপ্রধান। এ দেশের বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো নগর সভ্যতার ছোঁয়া বিশেষ লাগেনি এবং সাধারণভাবে ব্যাপক নগরায়ণ ঘটেনি। ফলে আমাদের সমাজের বহু অংশে এখনো প্রাণচঞ্চল গ্রামসমাজ রয়ে গেছে এবং সেই সুবাদে আমােেদর লোকশিল্প এখনো একেবারে লুপ্ত হয়ে যায়নি, কোথাও কোথাও তা যথেষ্ট সজীব। বাংলাদেশে অধিকাংশ পরিবারেই এখনো দু’এক পুরুষমাত্র নগরবাসী হয়েছে, সাধারণভাবে আমাদের নাগরিক সমাজের সঙ্গে এখনো গ্রামীণ জীবন ও তার শিল্পসংস্কৃতির সম্পর্কটি তাই অনেকটাই জীবন্ত। পাশ্চাত্য দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। আমাদের আধুনিক সংস্কতি ও শিল্পচিন্তায় তাই লোক-ঐতিহ্য পাশ্চাত্যের তুলনায় এখনো অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ।
লোকশিল্পের ঐতিহ্যে পৃথিবীর সকল অঞ্চল সমান সমৃদ্ধ নয়। য়ুরোপের লোকশিল্পের যে উদাহরণ আমরা পাই তা তেমন বৈচিত্র্যময় ও উল্লেখযোগ্য নয়। সে তুলনায় আমাদের এ উপমহাদেশ লোকশিল্পের অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও শিল্পগুণসম্পন্ন উদাহরণে সমৃদ্ধ। ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন লোকশিল্পের উদাহরণ। এর কোন কোনটি এত উন্নত শিল্পগুণসমৃদ্ধ যে আজ সেগুলো বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেÑ যেমন, মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি চিত্রকলা, বিহারের মধুবনী চিত্রকলা অথবা বাংলার নকশিকাঁথা, বাঁকুড়ার মৃৎশিল্প ইত্যাদি। ভারত উপমহাদেশের মধ্যে বাংলা আবার সমৃদ্ধ লোকশিল্পের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখিত হবার যোগ্য। বাংলার মৃৎশিল্প, পটচিত্র, নকশিকাঁথা ও আলপনা লোকশিল্পের শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হবার যোগ্য।
বাংলার লৌকিক জীবনে মৃৎশিল্প, অর্থাৎ পোড়ামাটির তৈরি তৈজসপত্র, দেব-দেবীর মূর্তি, পুতুল-খেলনা ইত্যাদি এতটাই অতি অপরিহার্য অঙ্গ ছিল যে সুদূর প্রাচীন কালেও রাজকীয় দরবারি শিল্পশৈলীর উপর এর প্রভাব লক্ষ করা গেছে। পাহাড়পুর ও ময়নামতির সুবৃহৎ বৌদ্ধবিহারগুলোর অলঙ্করণে গ্রামীণ লোকশিল্পীদের নিয়োগ ও লোকজ শৈলীর ব্যবহার একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। পুরোহিত-নিয়ন্ত্রিত ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত একটি সুবিশাল কর্মকান্ডে লোকশৈলীর ব্যবহার কেবলমাত্র বাংলাতেই সম্ভব ছিল। পাল ভাস্কর্যশৈলীর চরিত্র নির্মাণেও আমরা মূলধারার ওপর লৌকিক মৃৎশিল্পরীতির প্রভাব সহজেই অনুধাবন করতে পারি। পাহাড়পুর, ময়নামতি ও মহাস্থানগড়ে লোক শিল্পরীতিতে নির্মিত মৃৎফলকগুলোতে বিষয়বস্তুর যে বৈচিত্র্য, শিল্পীর পর্যবেক্ষণ-ক্ষমতার যে সূক্ষ্ম উদ্ভাস, শৈল্পিক সংস্থাপনের যে চমৎকারিত্ব ও সরল প্রাণশক্তির যে প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় পৃথিবীর খুব কম লোকশিল্প উদাহরণে এমনটি পাওয়া যাবে। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে পোড়ামাটির যে সব পুতুল ও খেলনা এখনো তৈরি হয় সেগুলে সরল শৈল্পিক উৎকর্ষের এক অনুপম উদাহরণ।
লোকচিত্রকলার অসামান্য উদাহরণ বাংলার পটচিত্র। ধর্মীয় ও সামাজিক কাহিনী নিয়ে আঁকা হতো এ জড়ানো পট। কাহিনীর বিস্তার অনুযায়ী ছবিগুলো পর পর সাজানো থাকতো, পটুয়া পট খুলতে খুলতে এক একটি চিত্র দেখাতে দেখাতে কাহিনী বর্ণনা করতেন। পট আঁকবার ব্যাপারে শিল্পী যে কল্পনাশক্তির পরিচয় দিয়েছেন তা বিস্ময়কর। কোন কিছুই প্রায় বাস্তবসম্মতভাবে আঁকবার বা উপস্থাপন করার চেষ্টা হয়নিÑ আকৃতিকে ভেঙে-চুরে, উল্টে-পাল্টে, যথেচ্ছ বর্ণ ব্যবহার করে বিভিন্ন ইঙ্গিত বা সংকেতের মধ্য দিয়ে শিল্পী ভাবটি প্রকাশ করেছেন মাত্র। শিল্পী যে অতিরঞ্জন বা রূপান্তরণের আশ্রয় নিয়েছেন তা আজকের যে কোন আধুনিক শিল্পীরই বিস্ময় ও প্রেরণা জাগরিত করতে পারে। পটচিত্র ছাড়াও লক্ষ্মীর সরা ও সখের হাঁড়ি অলঙ্করণেও বাঙালি লোকশিল্পী তুলির রেখা ও সংক্ষিপ্ত আঁচড়ে দৃশ্যকে পরিস্ফুটিত করতে উল্লেখযোগ্য পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছেন। এই শিল্পীরাই পরবর্তীতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতায় কালিঘাট পট চিত্রের পত্তন করেন যা রেখার সৌকর্যে ও পর্যবেক্ষণ শক্তির প্রখরতায় আজ বিশ্বখ্যাত। চিত্র ও ভাস্কর্য ছাড়াও বাংলা অঞ্চলের বিশেষ উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম হলো নকশিকাঁথা ও আলপনা। বাঙালি রমণীর একান্ত নিজস্ব সৃষ্টি নকশিকাঁথা তার কল্পনাশক্তির বিস্তার, আকৃতির সাবলীললতা এবং রেখার নৈপুণ্যে আজ আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে। ধর্মীয়, পৌরাণিক কাহিনী থেকে শুরু করে জীবজন্তু, সমসাময়িক জীবন উঠে এসেছে এসব কাঁথায় এবং সরল অথচ সাবলীল অতিরঞ্জন ও রূপান্তরণ এবং সার্বিক সংস্থাপনের উদ্ভাবনী কৌশলে নকশিকাঁথা এ ধরনের শিল্পের অঙ্গনে প্রথম সারিতে স্থান পাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠেছে। একইভাবে আলপনাও একান্ত মেয়েলি শিল্প যেখানে দ্বিমাত্রিক আলঙ্কারিক নকশা এক অসাধারণ নান্দনিক মাত্রা অর্জন করেছে। সমতল পৃষ্ঠপটে শুধুমাত্র রেখার টানে আলপনায় বিভিন্ন বস্তু ও মোটিফ এক প্রতীকী ব্যঞ্জনায়
আলো-ছায়ার নকশায় বিধৃত হয়েছে যার সঙ্গে একমাত্র তুলনা করা যেতে পারে উন্নত ক্যালিগ্রাফি বা লিপিশিল্পের। এছাড়া নকশি পাখা, পাটি, নকশি পিঠা, সূচিশিল্প, বয়নশিল্প, কাঠখোদাই, শঙ্খ ও গজদন্ত শিল্প, বাঁশ-বেত, শোলা ও পাটের কারুশিল্প ইত্যাদিতেও বাঙালি কারুশিল্প তার প্রায়োগিক দক্ষতা ও সৌকর্যে সমগ্র উপমহাদেশে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে।
বাঙালির উপরিউল্লিখিত লোকশিল্পগুলোর অনেকগুলো প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিছু মৃতপ্রায়, কোন কোনটি আবার যথেষ্ট সজীব ও জীবন্ত। আধুনিক বাঙালির সৌভাগ্য যে লোকশিল্পের সঙ্গে তার সম্পর্কে একেবারে ছেদ এখনো রচিত হয়নি এবং এগুলোকে রক্ষা করা এবং এর থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণের সুযোগ এখনো রয়েছে। বলা যেতে পারে যে বাংলাদেশের শিল্প-ঐতিহ্যের অনুসন্ধানে সকল দরবারি শিল্পরীতির চেয়েও অধিক প্রোজ্জ্বল ও প্রেরণাদায়ী উত্তরাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা যায় এর সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ লোকশিল্পকে।
বিংশ শতাব্দী থেকে আদিম, লোক ও উপজাতীয় শিল্প, তথা অনুন্নত সমাজের শিল্পের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। আধুনিক শিল্পকলা এর থেকে অনুপ্রেরণা পেতে শুরু করে এবং সাধারণ সমঝদার দর্শকশ্রেণীর মধ্যেও এসব শিল্পের প্রতি একটি আকর্ষণ সূচিত হয়। সেটি আবার কখনো কখনো এতটাই আতিশয্যমূলক হয়ে পড়ে যে লোকশিল্পী বা আদিম সমাজের শিল্পী ব্যাপক চাহিদার দ্বারা প্রলোভিত হয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এগুলো উৎপাদন শুরু করে। তার সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্তবিহীন এ কৃত্রিম সৃষ্টিগুলো অচিরেই তার মৌলিকতা হারাতে শুরু করে এবং ক্রমশই নি¤মানের শিল্পপণ্যে পর্যবসিত হয়। আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় কোন কোন দ্বীপে এমনটি ঘটেছে। আমাদের দেশেও নকশিকাঁথা নিয়ে এটি ঘটতে চলছে। ঐতিহ্যমাফিক দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় তৈরি হতো যে নকশিকাঁথা তা কারখানার মত লাগাতার উৎপাদন করতে গিয়ে ইতোমধ্যেই এর বৈশিষ্ট্যের অনেকখানিই নষ্ট হয়ে গেছে। এগুলো অধিক দৃষ্টি আকর্ষক হয়েছে বটে কিন্তু হারিয়ে গেছে এর নান্দনিক উৎকর্ষ। ভারতের মধুবনী চিত্রকলারও ঘটেছে একই পরিণতি। এভাবে অনেকক্ষেত্রে এসব শিল্পের উপকারের উদ্দেশ্য বরং এর ক্ষতিও ডেকে আনছে।
তবে এই আগ্রহ এসব শিল্পের প্রতি একটি নিবিষ্ট অভিনিবেশেও নির্মাণ করেছে। বিংশ শতাব্দীতে আদিম, লোক ও উপজাতীয় শিল্প নিয়ে অনুসন্ধান ও গবেষণা হয়েছে, সহানুভূতি ও উপলব্ধিজাত পুস্তক রচিত হয়েছে, এগুলোর বৈশিষ্ট্য ও ঘরানা চিহ্নিত হয়েছে, এদের পৃথক জাদুঘর স্থাপিত হয়েছে। এসব কর্মকান্ড দ্বারা লুপ্ত ও সজীব উভয় ধরনের শিল্প সম্পর্কে জানবার উপায় ও আগ্রহ বেড়েছে। শিল্পকলার ইতিহাসে বহুদিন অনাদৃত থাকবার পর আদিম, লোক, উপজাতীয় ইত্যাদি অনগ্রসর সমাজের শিল্প আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সভ্য শিল্পের সঙ্গে এক কাতারে প্রশংসিত হবার যোগ্যতা লাভ করেছে। এটি একটি বড় অর্জন নিশ্চয়ই। সমসাময়িককালের শিল্পরূপ নির্মাণে লোকশিল্পের ভূমিকা যদি আর নাও থাকে তবুও আমাদের চিরায়ত শিল্প-ঐতিহ্যের এক বর্ণাঢ্য অংশ হিসেবে এর অপরিসীম মূল্য কালান্তরেও প্রবহমান থাকবে। হ