সাহিত্য মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগ অনুভূতির অভিব্যক্তি সম্পন্ন শিল্পোৎকর্ষ হৃদয়গ্রাহী কথামালার নাম। অন্যভাবে বলা যায়, সাহিত্য হচ্ছে যুগ, জগৎ ও জীবনের অনুকৃতি; ভাব, কল্পনা এবং অনুভূতির রূপময় অভিব্যক্তি। সাহিত্য যেহেতু জীবন ও জীবন চেতনার উচ্চারিত, উদ্ভাসিত ও লিপিকৃত আঙ্গিকরূপ সেহেতু সাহিত্যে চিত্রিত জীবনের বাস্তব ও কাম্যরূপ থেকেই বিশেষ দেশের বিশেষ কালের বিশেষ শাস্ত্র-সমাজ-সরকার শাসিত জনগোষ্ঠীর বোধ-বিশ্বাস এবং জীবনালেখ্য খুঁজে পাওয়া যায়। এদিক বিবেচনায় ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর কাব্য সাহিত্যকে যথার্থ বলে বিবেচনা করা যায়। বিশেষত আরাকানের অমাত্য সভার পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত কাব্যসমূহ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক নব অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। এ সময় ইতোপূর্বের গতানুগতিক ধর্মসংশ্লিষ্ট সাহিত্যকে নির্বাসন দিয়ে মুসলিম কবিরা বাংলা সাহিত্যে ফারসি সুকুমার সাহিত্যের আমদানী করে মানবীয় প্রেমকে সাহিত্যের নতুন আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে প্রভূত বৈচিত্রময়তা আনয়ন করেছিলেন। এ সব কবিদের রচনায় মানবীয় প্রেম কেন্দ্রীয় বিষয় হলেও পূর্ব বাংলা, চট্টগ্রাম এবং আরাকানের বোধ বিশ্বাস, ধর্মীয় আচার আচরণ, সামাজিক রীতিনীতি প্রভৃতি নিখুঁতভাবে চিত্রিত হয়েছে। এ দিক বিবেচনায় বাংলা ও আরাকানের অমাত্যসভা কর্তৃক পৃষ্ঠপোষকতা এবং তৎপ্রভাবে রচিত মধ্যযুগীয় সাহিত্যসমূহ সমকালীন সমাজ-সংস্কৃতি ও বোধ বিশ্বাসের মূল্যবান উপাত্ত হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।
প্রাগৈতিহাসিক, প্রাচীন, মধ্যযুগ, আধুনিকযুগ, উত্তরাধুনিক কিংবা খ্রিস্টপূর্ব, খ্রিস্টাব্দ প্রভৃতি শব্দগুলো ইতিহাস বা সাহিত্যের কালবিভাজনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বিশেষ করে ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে কালবিভাজন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শতাব্দী শব্দ দ্বারা কাল বিভাজনের প্রয়াস থাকলেও এটি অতীব খণ্ডিত হবার কারণে উপরোদ্ধৃত মাপকাঠিকে অবমূল্যায়নের সুযোগ নেই। কাল বিভাজনই ইতিহাসকে সঠিক মানদণ্ডে যাচাই করার অন্যতম প্রধান পদ্ধতি। বাংলা সাহিত্য থেকে ইতিহাসের উপাত্ত সংগ্রহ করতে হলে কাল বিভাজনের কোন বিকল্প নেই।
বাংলা সাহিত্যের কাল বিভাজনে তিনটি ধারার প্রচলন লক্ষ্য করা যায়; যথা প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগ। সাম্প্রতিককালে ‘উত্তরাধুনিক যুগ’ বলে আরো একটি ধাপ আলোচিত হলেও উপরোক্ত তিনটি ধারাকেই প্রসিদ্ধ হিসেবে ধরে নেয়া হয়। উপরোক্ত তিনটি ধারা নিয়ে কিছুটা ঐকমত্য থাকলেও এর সময়সীমা সম্পর্কে অনেক বিতর্ক লক্ষ্যনীয়। এ ক্ষেত্রে ড. তামোনাশ চন্দ্র গুপ্ত মনে করেন বাংলা সাহিত্যের সময় খ্রিস্টীয় ৮ম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় ১২’শ শতাব্দী পর্যন্ত প্রাচীন যুগ, ১৩’শ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮’শ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মধ্যযুগ এবং ১৯’শ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান পর্যন্ত আধুনিক যুগ। অর্থাৎ মুসলমানদের বাংলায় আগমন পর্যন্ত আদিযুগ, অবশিষ্ট ছয়শত বছর অর্থাৎ ইংরেজ শাসনের পূর্ব পর্যন্ত মধ্যযুগ এবং বৃটিশ শাসন থেকে অদ্যাবধি আধুনিক যুগ হিসেবে বিবেচিত। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ, ১৩০১ থেকে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মধ্যযুগ এবং এর পরবর্তী সময়কে আধুনিক যুগ বলে অভিহিত করেছেন। সুতরাং তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও ড. তামোনাশ দাস গুপ্তের বক্তব্যের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য পাওয়া যায় না। কিন্তু দেবেন্দ্র কুমার ঘোষ, ড. ভূদেব চৌধুরী, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বাংলা সাহিত্যের কাল বিভাজনে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের উপরোদ্ধৃত মন্তব্যের কাছাকাছি অবস্থান করলেও তারা ত্রয়োদশ চতুর্দশ এমনকি পঞ্চদশ শতাব্দী বিশেষত ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ, নিষ্ফলা যুগ ও শূন্যতার যুগ বলে উল্লেখ করেছেন। কেননা তুর্কী বিজয়ের প্রথম দিকের রচিত তেমন কোন উল্লেখযোগ্য বাংলা কাব্য এখনও পর্যন্ত আবিস্কৃত যায়নি। কিন্তু গবেষকগণ মনে করেন যে, তার অর্থ এই নয় যে, সে সময়ে দেশে কোন রকম সাহিত্যই সৃষ্টি হয়নি। তাই ড. মুহাম্মদ এনামুল হক এ সময়কাল সম্পর্কে তাদের এ মন্তব্যকে খণ্ডন করে বলেন, “এই সময়ে মানুষ তাহার সুখ দুঃখের কোন গান বা গাঁথা নিজেদের ভাষায় একেবারেই প্রকাশ করে নাই, এমন হইতে পারে না।”
বাংলার জলো আবহাওয়া, উঁই, ইদুর, পোকামাকড়ের উপদ্রব এবং সর্বোপরি প্রাচীন কালের রচনাগুলো সংরক্ষণের ব্যাপারে এখানকার জনগণের সর্বাত্মক ও আন্তরিক প্রচেষ্টার অভাবই হয়তো সেকালের রচনাবলী না পাবার মূল কারণ। বাকুড়ার এক ব্রাহ্মণের গোয়ালঘর থেকে শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনের পুঁথি আবিস্কৃত না হলে কিংবা নেপালের রাজ দরবার থেকে চর্যাপদগুলো উদ্ধার না হলে হয়তো সে যুগকেও শূন্যতার যুগ বলা হত। অথচ সে যুগে প্রাণবন্ত মানুষ ছিল, মানুষের অনুভূতি ছিল, সুকুমার প্রবৃত্তি ছিল, সুখ দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেম প্রীতি, ¯েœহভালবাসা সবই ছিল কিন্তু মানুষ তার হৃদয়ের অনুভুতিগুলো কোন গান বা গাঁথার মাধ্যমে নিজেদের ভাষায় একেবারেই প্রকাশ করেনি তা অনুমান করা যায় না। এ ছাড়া ‘শকশুভোদয়া’ এবং রামাই পণ্ডিতের শূণ্যপুরানের অর্ন্তগত ‘নিরঞ্জনের রুস্মা’ ত্রয়োদশ শতাব্দীর রচনা বলে ধারণা করা হয়। এ ধরনের চিন্তা ও খণ্ডিত নমুনা দেখেও অনুমান করা যায় যে, খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতক প্রকৃতপক্ষে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার বা শূন্যতার যুগ নয়। সুতরাং বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ বলতে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত সাহিত্যকেই বুঝানো যেতে পারে।
চর্যাপদ তথা বাংলা সাহিত্যের আদিকাল থেকে ঈশ্বরগুপ্তের আবির্ভাবের পূর্ব অর্থাৎ ইংরেজ আমলের আধুনিক সাহিত্য সৃষ্টির পূর্ব পর্যন্ত (দশম শতক থেকে ১৮৪৫ খ্রি. পর্যন্ত) যতো কাব্য-কবিতা হিন্দু কবি দ্বারা রচিত হয়েছে তার সবগুলোই ধর্ম প্রসঙ্গের সীমাবন্ধনীতে আবদ্ধ ছিল। ধর্মের মাহাত্ম কীর্তন বা দেবতার লীলা ও শক্তির পরিচয় প্রদানার্থেই সাহিত্য রচিত হতো। চর্যাপদই হোক, বৈষ্ণবপদাবলীই হোক বা কবিওয়ালাদের পাচালীই হোক সব কিছুর মূল প্রেরণা ছিল ধর্মীয় বিশ্বাস ও চিন্তা চেতনাকে ঘিরে। সুতরাং প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের হিন্দু ধারার মধ্যে মানুষের কাহিনী গৌণ বা আনুষঙ্গিক বিষয় মাত্র ছিল। দেবতাই ছিল কাব্যের নায়ক। নিছক মানুষের সুখ দুঃখ, আনন্দ-বেদনা বা আশা আকাংখা যে সাহিত্যের বিষয়বস্তু হতে পারে এ ধারণা তাদের ছিলনা। এভাবে রামায়ন, মহাভারত, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল প্রভৃতি একই কাহিনী অবলম্বনে অসংখ্য কবি পুনঃপুন কাব্য রচনা করেছেন।
ড. আহমদ শরীফ, ‘মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ধারা’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, “ধর্মকেন্দ্রীক গতানুগতিকতা থেকে বাংলা সাহিত্যকে মুক্তি দিয়েছেন মুসলিম কবিরা। তারাই প্রথম কাল্পনিক ধর্মপ্রেরণাবিহীন মানবীয় কাহিনী অবলম্বনে কাব্য রচনা করেন। নিছক রস সৃষ্টির মধ্যদিয়ে মানবচরিত্র অংকন কিংবা মানুষের বোধ-বিশ্বাস, সুখ-দুঃখের কাহিনী এবং সামাজিক চিত্র বর্ণনার রীতি মুসলমান কবিদের অমূল্য অবদান। এমন কি ময়মনসিংহ বা পূর্ববঙ্গ গীতিকার হিন্দু কবির যে সব রচনা আছে – তাও মুসলিম ধারার প্রত্যক্ষ প্রভাবের ফল।” বৈষ্ণব পদাবলী ধর্ম সম্পৃক্ত হলেও গীতি কবিতার মর্যাদা লাভের যোগ্য এবং এ বৈষ্ণব ধর্ম বা বৈষ্ণব মতবাদ ও ইরানী সুফী মতবাদের পরোক্ষ প্রভাবে উদ্ভুত। সুতরাং সাহিত্যের গতিধারা বিকাশে মুসলিম কবিদের অবদান সর্বাধিক। এছাড়া বাউল, মুর্শিদী, ভাটিয়ালী ও জারি-সারি গানে মুসলমানদের অবদানই সবচেয়ে বেশী।
মধ্যযুগের হিন্দু রচিত সাহিত্য যেমন অনুবাদ সাহিত্য, তেমনি মুসলমানদের সাহিত্যও তাই। হিন্দু কবিরা সংস্কৃত থেকে ধর্মোপাখ্যান অনুবাদ করেছিলেন পক্ষান্তরে মুসলমান কবিরা ভাষান্তরিত করেছিলেন পারস্যের উৎকৃষ্ট রসকাব্যের সাজি। হিন্দু রচিত সাহিত্যে দেবনীলা ও ধর্মের ব্যাখ্যাচ্ছলে পাওয়া যায় ভুত, প্রেত, দেবতা, দানব, রাক্ষস প্রভৃতি আর মুসলমানদের সাহিত্যে রোমাঞ্চকর রূপকথার সুর, পরিবেশ, সামাজিক জীবনের বিশ্বাস, আনন্দ জীবনাচার প্রভৃতির মধ্য দিয়ে পাওয়া যায় জ্বীন-পরী প্রভৃতি। অলৌকিকতা-অস্বাভাবিকতা উভয় ধারার মধ্যেই ছিল কিন্তু আদর্শ ও উদ্দেশ্যগত অনেক পার্থক্য লক্ষ্যনীয়। একটা হচ্ছে ধর্ম শিক্ষা দেবার জন্য আর একটি রস সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষের বোধ-বিশ্বাস ও সামাজিক জীবনের চিত্র উপস্থাপনের জন্য।
মধ্যযুগের হিন্দু কবির চেয়ে মুসলমান কবির সংখ্যা, পাণ্ডিত্য এবং কবিত্ব শক্তি কম হবে না। এ যুগের হিন্দু কবি চণ্ডিদাস, গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস, কৃত্তিবান, কাশীরাম দাস, মুকুন্দরায়, বিজয়গুপ্ত, ধনরাম, বৃন্দাবন দাস ও ভারত চন্দ্রের পাশাপাশি মুসলিম কবি শেখ ফয়জুল্লাহ, শাহ মুহাম্মদ সগীর, সৈয়দ সুলতান, কবি জৈনুদ্দিন, দৌলত উজির বাহরাম খান, কবি মোতালেব, কবি সবিরিদ খান, কোরেশী মাগন ঠাকুর, আলাওল, দৌলতকাজী, মুহম্মদ খাঁ, সৈয়দ মর্তুজা, শেখ ভিকন, সার বেগ, আবদুন নবী, মুহাম্মদ কবীর, দোনা গাজী, আবদুল হাকিম, নওয়াজিস খান, মঙ্গল চাঁদ, মুহম্মদ মুকীম প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কেউ কেউ ধারণা করে যে, বাংলা ভাষার লালন ও উৎকর্ষ সাধনে হিন্দু-বৌদ্ধদের অবদানই মুখ্য এবং মুসলমানদের অবদান নিতান্তই গৌণ। প্রকৃতপক্ষে বাংলাভাষার লালন ও শ্রীবৃদ্ধি সাধন করেছেন মুসলমানগণই। শুধু সাহিত্য রচনার মধ্য দিয়ে মুসলমান সাহিত্যিকগণ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন তাই নয় বরং মুসলিম শাসকগণও বিভিন্ন সময় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে বাংলা সাহিত্যের উৎকর্ষতা সাধন করেছিলেন।
শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বাংলা সাহিত্যের উৎসাহ দান ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান পাল শাসকদের সময় শুরু হলেও সেন আমলে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে বরং সাহিত্য চর্চাই পরিসমাপ্তি ঘটে। এমনকি হিন্দু শাসনামলে ধর্মীয় পণ্ডিতদের পক্ষ থেকে ঘোষণাও করা হয় যে, দেশজ ভাষায় অর্থাৎ যে দেবভাষা সংস্কৃত ছাড়া প্রাকৃতজনের বাংলা ভাষায় পুরান ও রামায়ন প্রভৃতির অনুবাদ বা শ্রবণ করবে তাকে পরকালে রৌরব নরকে বসবাস করতে হবে। [অষ্টাদশ পুরানানি রামস্য চরিতানিচ। ভাষায় মানব শ্রুত্বা রৌরাবং নরকং ব্রর্জেৎ] এ আশংকায় কেউ বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনায় সাহস করেনি। দীনেশ চন্দ্র সেনের ভাষায় “জনসাধারণ পালদের সময় নতুন গ্রাম্যগীতি রচনা করিত, রূপকথা, গীতিকথা প্রভৃতি বাংলা ভাষায় রচিত হইত এবং রাজারা তাহা শুনিতেন। কিন্তু সেনদের সময় কি সাধ্য যে জনসাধারণ বাঙলা গান লইয়া রাজদ্বারে প্রবেশ করে।” কাজেই অনুমান করা যায় যে, বৌদ্ধ শাসনামলে বাংলা সাহিত্যের চর্চা শুরু হলেও হিন্দু শাসক সেনদের সময় তা বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর তুর্কীদের সময় তা আবার শুরু হয়ে পরবর্তী সুলতানদের হাতেই বাংলা সাহিত্যের বিকাশ সাধিত হয়েছে। এ জন্য তুর্কী আগমনের পর দেড়শ বছরকে গবেষকগণ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার বা শূন্যতার যুগ না বলে বাংলা সাহিত্যের উন্মেষ বা প্রস্তুতির যুগ বলে অভিহিত করেছেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কঠিন দুর্দিনে সংস্কৃত অনভিজ্ঞ মুক বাঙ্গালীর রস পিপাসা মিটাবার সুযোগ দিলেন বাংলার মুসলমান সুলতানগণ। তারা বাংলা ভাষায় কাব্য রচনায় উৎসাহ ও কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে বিকশিত করেন। বিশেষকরে সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ বুঘরা খান (১২৮১-১২৮৫ খ্রি.), সুলতান শাসসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৩৫৮ খ্রি.), সুলতান গিয়াস উদ্দীন আযম শাহ (১৩৯৩-১৪১১ খ্রি.) রুকনউদ্দীন বরবক শাহ (১৪৬০-১৪৭৪ খ্রি.), শাসসুদ্দীন ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১ খ্রি.), সুলতান আলাউদ্দীন হুসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রি.), সুলতান নাসির উদ্দীন নসরত শাহ (১৫১৯-১৫৩২ খ্রি.), আলাউদ্দীন ফিরূজ শাহ (১৫৩২-১৫৩৩ খ্রি.) প্রমুখ ছাড়াও সুবেদার পরাগল খান ও ছুটি খান প্রমুখ মুসলিম সুলতান ও সুবাদারগণের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সাহিত্যের পরিপুষ্টি সাধিত হয়। সেই সাথে মধ্যযুগের বাংলার সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ রচনা আরাকান অমাত্যসভার পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত মহাকবি আলাওল, দৌলতকাজী প্রমুখ আরাকানে বসে বাংলা সাহিত্যকে শুধু সমৃদ্ধই করেননি বরং বাংলা সাহিত্যের নতুন গতিধারা বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ড. আহমদ শরীফের ভাষায় – পাড়া আছে, সমাজ আছে, নিজেদের আলাদা ভাষা আছে, স্বতন্ত্র বিশ্বাস-সংস্কার আছে, বিশিষ্ট নিয়মনীতি আছে, আছে রীতি-রেওয়াজও। কাজেই তাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রয়োজন পূর্তির জন্যে, মানস চাহিদা পূরণের জন্যে, মনের রসতৃষ্ণা মিটানোর জন্যে সেখানে গুনীজন দিয়ে গান-গাথা-রূপকথা-প্রেম কথা জানানোর, রসকথা শুনানোর ব্যবস্থা করতে হয়েছে, সৃজনশীল কেউ কেউ নতুন সৃষ্টি দিয়ে তাদের রসতৃষ্ণা নিবৃত্ত করেছে।” মোটামুটিভাবে বড়– চণ্ডিদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে যে মধ্যযুগের সূচনা হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতচন্দ্র, হেয়াত মামুদ, গরীবুল্লাহ প্রমুখ কবির রচনার ভেতর দিয়ে সে মধ্যযুগের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এ দীর্ঘ সময়ে বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ, বৈষ্ণব পদাবলী, চরিত শাখা, মঙ্গলকাব্য, নাথ সাহিত্য, শক্তি পদাবলী, রোমান্টিক প্রণয়োপখ্যান, লোকগীতিকা, মর্সীয়া, দোভাষী প্রভৃতি সাহিত্য শাখার যে পরিচয় পাওয়া যায়, তার মধ্যদিয়ে একথাই প্রমাণিত হয় যে, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের সময়সীমা যেমন দীর্ঘ তেমনি এ সময়ের রচিত বিভিন্ন কাব্য শিল্পোতীর্ণ হয়ে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে যেমন বাংলার শাসকদের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল তেমনি আরাকানের অমাত্যসভার মুসলিম সদস্যগণেরও উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতার ফলে আরাকানে বাংলা সাহিত্যের বিকাশ ঘটেছিল। আরাকানের রাজসভার প্রধানমন্ত্রী, অমাত্য, সমর সচীব, মন্ত্রী, কাজি বা দেওয়ানী ফৌজদারী বিচারক হিসেবে মুসলমানদের নিয়োগ শুধু ছিলনা, রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের সততা-আন্তরিকতা ও দেশপ্রেমের অনেক সুখ্যাতিও ছিল। তাঁরাই ছিলেন রাজার প্রধান উপদেষ্টা। অভিষেক অনুষ্ঠানসহ রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানসমূহ তাদের দ্বারাই পরিচালিত হতো। যেহেতু তাদের অধিকাংশেরই আদি নিবাস ছিলো চট্টগ্রাম কিংবা সিলেট অঞ্চল। সুতরাং রাজসভায় তাদের প্রতিষ্ঠা-সূত্রে আরাকানে নিজেদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের প্রচার-প্রসারে তারা ব্যাপক সুযোগ পান। গৌড়ীয় মুসলিম সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সভ্যতা আরাকানীদের চেয়ে উন্নত হবার কারণে শাসকদের পক্ষ থেকে কোন বাঁধা না এসে বরং সহযোগীতার পরিবেশ পাওয়া গেছে। তাদের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতার ফলে প্রতিভাবান কবিগণ প্রণয়োপখ্যান ও রূপকথার কাব্য রচনা করে মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের একটি স্বর্ণযুগের সৃষ্টি করেছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের যে মৌলিক ধারার প্রবর্তন হয়েছিল তা ছিল সমৃদ্ধধারারই ইতিহাস। এ ধারায় মুসলিম শাসকদের একান্ত সহায়তায় হিন্দু-মুসলিম কবিগণ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধির পথে টেনে নিয়ে গেছেন। মূলত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস হিন্দু-মুসলিম কবিদের যৌথধারার সৃষ্টি। তবে পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলিম শাসকদের উদার দৃষ্টিভঙ্গি যে ব্যাপকভাবে কাজ করেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ জন্য ড. আহমদ শরীফ যথার্থই মন্তব্য করেন – “সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, মুসলমানগণও হিন্দুদের সাথে সাথে বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি করে গেছেন। এ খবর আমাদের জানা ছিল না বলেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অভিভাবকত্ব আমরা হিন্দুদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। তা’হলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আমাদের অধিকার হিন্দুদের চাইতে কম নয়। বরং মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের উৎসাহদাতা ও এ সাহিত্যে একটা বিশিষ্ট ধারার প্রবর্তক হিসেবে এবং এ যুগের কাহিনী কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবির অন্যতম আলাওলের স্বজাতি বলে বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির গৌরব প্রধানত আমাদেরই প্রাপ্য।” হ