মার্চের অসহযোগ আন্দোলন এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছে যে পূর্ব পাকিস্তানের সব সরকারী অফিস অচল হয়ে পড়ে। সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে যায়। চলাচলের ব্যবস্থা, সড়ক, রেলথ সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্র-জনতা প্রত্যেকে একাকার হয়ে যাওয়ায় বাংলার প্রতিটি শহর-গ্রাম-গঞ্জ একেকটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। আজাদ আলী তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩য় বর্ষের ছাত্র। এমন পরিস্থিতিতে হল ছেড়ে চলে আসে গ্রামের বাড়ি আড়ানিতে। কুশাবাড়িয়া গ্রামে থেকেই বুঝতে পারে, নিকট দূরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তান্ডব।
আজাদ আলী নিজ এলাকায় গণ-আন্দোলন গড়ে তুলে স্কুল-কলেজের ছাত্র-জনতাকে একত্র করে। গ্রাম থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রশিক্ষণ ও প্রতিবাদ-মিছিল। ০৯ মে হানাদার বাহিনী আক্রমণ করে গোপালপুর চিনিকল। পরিচালনা করে ধ্বংসের লীলা। সরাসরি হত্যা করে চিনিকলের প্রধান আজিম সাহেবকে। এরপর শত্রুরা যাত্রা করে রাজশাহীর পথে। কেউ রেলরাস্তার ধার দিয়ে, আবার কেউ কাঁচা পথে জিপে চড়ে যায়।
পরের দিন সকালে ওরা যখন আড়ানি অতিক্রম করে, আজাদ আলী তখন কয়েকজন সাথীযোদ্ধাসহ কোঁচ-ফলা-বল্লম নিয়ে পাকসেনাদের খতম করতে রেলরাস্তার ধারে পৌঁছে যায়। কিন্তু তাদের সংখ্যা এতোই বেশি ছিলো যে, আক্রমণ থেকে বিরতি দিয়ে রেলরাস্তার নিচে কালভার্টে আশ্রয় নেয়। এদিকে পেছন থেকে পুলিশ বাহিনী এসে পাকসেনাদের উপর আক্রমণ চালায়। আজাদ আলী এবার হুংকার দিয়ে উঠে, বেরিয়ে এসো তোমরা। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। এক পাকিস্তানী সেনা গোপনে গ্রামে গিয়েছিল পানি পান করতে। ভার্সিটি পড়–য়া ছাত্রী নীলুফা কৌশলে কয়েকজন মিলে কোদালের আঘাতে হত্যা করে সেই পাকসেনাকে। দু’জনকে শর্টগান দিয়ে হত্যা করে আজাদের দল। তিনজন পাকসেনা পালিয়ে আশ্রয় নেই ভিতরভাগ গ্রামের গমক্ষেতে। এদেরকে কৌশলে তেল-এর ব্যারেলে পানি পুরে ঐ ব্যারেল দিয়ে হত্যা করা হয়। কিন্তু খবর আর সময় কখনো এক জায়গায় স্থির থাকে না। রাজশাহী সদরে পৌঁছে গেল, আজাদ আলী নামে ভার্সিটি পড়–য়া এক তেজদীপ্ত-তরুণ আড়ানিতে গড়ে তুলেছে প্রতিরোধ-আন্দোলন।
রাজশাহীতে পাকিস্তান আর্মি আবারও ক্ষমতা দখল করায় গ্রামকে নিরাপদ মনে হলো না আজাদ আলীর। তখন শুধু তার চোখের সামনে একটাই নিশানা- প্রশিক্ষণ, অস্ত্র আর যুদ্ধ চাই, যুদ্ধ করে বাঁচতে চাই।
মে মাসের শেষের দিকে পদ্মা পাড়ি দিয়ে আজাদ আলী পৌঁছে যায় ভারত। জুন-এর প্রথম সপ্তাহে যোগ দেয় নদীর ভিটা নামক যুব-ক্যাম্পে। জুলাই মাসের এক তারিখে রাজশাহীর ৪৮ জন কলেজ-ভার্সিটি পড়–য়া ছাত্র উচ্চতর সামরিক গেরিলা প্রশিক্ষণের জন্যে বিহারের চাকুলিয়া সেনানিবাসে যায়। তাদেরই একজন ছিলো আজাদ আলী। এক মাসের কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে আজাদ আলী ৭ নম্বর সেক্টর-এর ৪ নম্বর সাব-সেক্টরে ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দীন এর লালগোলা ক্যাম্পে যোগদান করে। এরপর চলতে থাকে সু-প্রশিক্ষিত আজাদ আলীর দেশ-স্বাধীনতার স্বপ্ন-উড়ান। যুদ্ধ-যুদ্ধ, আর দেশকে রক্ষ করার যুদ্ধ।
দেশ তখন স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষ প্রান্তে। আড়ানি ব্রিজ ধ্বংসের সাফল্যের পর আজাদ সিদ্ধান্ত নেয়, নাবিরপাড়া নামক স্থানে সামরিক টহল ট্রেন উড়িয়ে দেয়ার। আড়ানি ও আব্দুলপুর রেলস্টেশনের মাঝে লোকমানপুর নামে ছোট্ট একটা রেলস্টেশন আছে। এখান থেকে দুই মাইল পূর্বে নাবিরপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়।
২১শে নভেম্বর টিম মিটিং করে দায়িত্ব বন্টন করে দেয়া হয় এবং সিদ্ধান্ত হয়, নাবিরপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই অপারেশনটি পরিচালনা করা হবে। পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী ২২ নভেম্বর রাত ১০টার দিকে অপারেশন স্থলে পৌঁছে মাইনগুলো ৩০ ফুট পরপর রেললাইনের নিচে স্থাপন করা হলো। অতপর কর্ডেক্স বিছিয়ে সংযোগ দেয়া হয়। কর্ডেক্সগুলো মাটির নিচে লুকানোর কাজ শেষ হওয়ার মুহূর্তে নাটোরের দিক থেকে একটি টহল ট্রেন আব্দুলপুরের দিকে আসে। যার ডানদিকের সার্চলাইটের আলোর মধ্যে পড়ে যায় আজাদসহ বেশ কয়েকজন। তাৎক্ষণিকভাবে ওরা রিলিজ সুইচের পিন খুলে সুইচ দুটি ইটের নিচে চাপা দিয়ে তারের শেষ মাথায় চলে যেতে সক্ষম হয়। এবার সকলে গা ঢাকা দেয় আখক্ষেতের মধ্যে। কিন্তু ঐ ট্রেনটি আব্দুলপুরে পৌঁছার পর বেশ কিছুক্ষণ থেমে থাকে। এতে ওরা বেশ কিছুটা সময় হাতে পায়। আখক্ষেত থেকে ছুটে আসে আবার রেলের ধারে। আজাদ ওর সহকারী কমান্ডারকে বলে, সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে।
এবার রিলিজ সুইচ থেকে পুরো সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে কর্ডেক্সগুলো ক্যামোফ্লেজ করে দেয় আজাদ। এরপর আজাদ আলী এবং সহকারী কমান্ডারসহ কয়েকজন ওখানে থেকে, বাকিদের ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সুইচের উপর রাখা ইট দুটোর ক্যামোফ্লেজ নিয়ে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। আজাদ সংযোগ দিতে গেলে সহকারী কমান্ডার দুটো ইটের স্থলে একটি ইট রেখে আখের পাতা দিয়ে ওটাকে ক্যামোফ্লেজ করতে উদ্যত হন। রিলিজ সুইচের ওজন কম হওয়ায় পুরো সিস্টেমটি একসঙ্গে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে।
রেললাইন থেকে প্রায় তিনফুট নিচে থাকায় সবাই বেঁচে গেলেও, ক্ষতিটাও বেশ চোখে পড়ার মতো। কমান্ডার আজাদ আলীর বাম হাতের কব্জি সম্পূর্ণ উড়ে যায়। আর সহ-কমান্ডার-এর উড়ে যায় ডান হাতের মধ্যমা আঙুল। এ সময় স্কুলে থাকা সবাই বিস্ফোরণের শব্দে ছুটে আসে রেলের ধারে। আজাদকে ধরাধরি করে নিয়ে যেতে থাকে স্কুলের পথে। আজাদ তখনো নির্দেশ দিচ্ছিল, যেন কেউ পেছনে পড়ে না থাকে। আবার কোনো অস্ত্রশস্ত্রও যেন মিস না হয়।
আখক্ষেতের মধ্যে হাঁটুপানি ভেঙে এগিয়ে যাবার সময় সবার চোখে পড়লো, রাজশাহীর দিক থেকে দ্রুত বেগে আসা দূর্ঘটনা কবলিত ট্রেনটির দূরবস্থা! অধিকাংশ পাকসেনা এতে মারা যায়। আর বাকিরা সবাই কম-বেশি আহত হয়। ইঞ্জিনটি রেললাইন থেকে প্রায় ২৫০ গজ দূরে ছিটকে পড়ে আছে। আর বগিগুলো অসহায়ের মত পড়ে আছে ৪০০ গজ দূরে।
ওই অপারেশনে আজাদ বাহিনীর পাসওয়ার্ড ছিলো ‘রক্ত গোলাপ’। সেই ‘রক্ত গোলাপ’ ঠিক-ই প্রস্ফুটিত হয়েছিলো, কিন্তু রক্তের বিনিময়ে। হ