‘সবার জন্য শিক্ষা’- এই স্লোগানের দিন শেষ হয়েছে। এখন শ্লোগান হলো ‘সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা’। আর মানসম্মত শিক্ষার প্রশ্নটি যখন উত্থাপিত হয় তখনই বিবেচনায় নিতে হয় একটি দেশের সকল অধিবাসীকে, সকল নাগরিককে। আর এই অধিবাসীদের মধ্যে আছে সংস্কৃতিগত ভিন্নতা ও ভাষাগত ভিন্নতা। এই ভিন্নতাকে যদি মানসম্মত শিক্ষার বলয়ে নিয়ে আসা যায় তা হলেই মানসম্মত শিক্ষা একটি সার্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করবে। মানসম্মত শিক্ষার এই সার্বজনীনতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন প্রত্যেক শিশুকে তার মাতৃভাষায় শেখার অধিকার নিশ্চিত করা। কেননা, একজন শিশু যতটা স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে এবং আনন্দের সঙ্গে মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভ করতে পারে অন্য কোনো ভাষায় তা কখনই সম্ভব নয়। একই মতামত প্রকাশ করেছে ইউনেস্কো। ÔEducation in a multilangual world’ নামে একটি প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে দ[ … ] research has shown that learners learn best in their mother tongue as a prelude to and complement of bilingual education approaches.’
মাতৃভাষায় শিখন-শেখানোর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আত্মপরিচয় (identity), জাতীয়তাবোধ ও ক্ষমতার বিষয় জড়িত। কোনো শিশুর পড়াশোনা যদি শুরুই হয় অন্য ভাষায় তা হলে তার মধ্যে পরিচয়ের, জাতীয়তাবোধের ও ক্ষমতায়নের সঙ্কট দেখা দেয় এবং শিক্ষার্থীরা সহজাত এক শিখনপ্রক্রিয়ায় শিক্ষালাভ থেকে বঞ্চিত হয়।
দুই.
নির্দিষ্ট কোনো দেশের ভৌগোলিক সীমানায় অনেক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী থাকতে পারে। বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর এই ভাষাবৈচিত্র্যের ধারণা নিঃসন্দেহেই আপেক্ষিক। কেননা, দেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে কোনো ভাষা সংখ্যালঘু এবং অন্য ভাষা সংখ্যাগুরু হলেও বৈশ্বিক বিচারে তা নাও হতে পারে। যেমন মান্ডারিন পৃথিবীর বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষার মধ্যে একটি। ৯০০ মিলিয়ন লোক এই ভাষায় কথা বলেন। চীনে এই ভাষাটি সংখ্যাগুরু মানুষের ভাষা। কিন্তু অন্য দেশে অর্থাৎ যেখানে কিছু সংখ্যক চীনা মান্ডারিন ভাষায় কথা বলেন, আর অধিকাংশ লোক কথা বলেন অন্যভাষায়, সেখানে মান্ডারিন সংখ্যালঘু মানুষের ভাষা। আবার বিশাল দেশে যে ভাষা সংখ্যালঘু ছোট দেশে একই ভাষা সংখ্যাগুরু হতে পারে। কিন্তু সে যাই হোক না কেন পৃথিবীর অধিকাংশ ভাষাই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভাষা এবং অন্ধ ও বধিরদের জন্য তৈরি প্রতীক ভাষা (Sign language) ব্রেইলও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভাষা।
‘সংখ্যালঘু’- এই অভিধাটিও কখনো কখনো দ্ব্যর্থবোধক। জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিপত্য এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কখনো কখনো নি¤শ্রেণির ও অধীনন্থ লোকজনদের বোঝাতে সুভাষিত শব্দ হিসেবে ‘সংখ্যালঘু’ ব্যবহার করা হয়। অথচ সংখ্যার দিক দিয়ে তারা সংখ্যাগুরু কিংবা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী সম্প্রদায়গুলোর চেয়ে পিছিয়ে পড়া।
পৃথিবীতে বিশটির চেয়ে বেশি দেশ আছে যেখানে একাধিক দাপ্তরিক ভাষা আছে। যেমন ভারতে দাপ্তরিক ভাষা ১৯টি এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ১১টি। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে দাপ্তরিক ভাষা একটি। কিন্তু ওই সব দেশে বহু ভাষাভাষী জনগণ থাকতে পারে যাদের ভাষা দাপ্তরিক ভাষা হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা বা প্রয়োজন নেই। যেমন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা ও দাপ্তরিক ভাষা একমাত্র বাংলা। কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর বসবাস আছে, যারা অন্য ভাষাভাষী। আবার উপনিবেশমুক্ত কিছু দেশ আছে যাদের দাপ্তরিক ভাষা সাবেক ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর ভাষা। যেমন ভারত। ইংরেজি বাংলাদেশের দাপ্তরিক ভাষা বা দ্বিতীয় ভাষা না-হলেও দাপ্তরিক কাজে এ ভাষার বিপুল ব্যবহার লক্ষ করা যায়। আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এ ভাষাটি রাষ্ট্রভাষা বাংলার মতই অবশ্যপাঠ্য বিষয় হিসেবে স্বীকৃত। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতি, ধর্মীয় ও সর্বোপরি অর্থনৈতিক আধিপত্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাষাগুলোই যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে নির্বাচিত হওয়ার প্রাধিকার লাভ করে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। যেমন ইংরেজি, ফরাসি, স্পেনিশ, জর্মন, আরবি, মান্ডারিন ইত্যাদি ভাষায় যারা কথা বলেন তাদের মর্যাদাগত অবস্থান অনেক উঁচুতে নির্ধারিত হয়।
তিন.
শিখন-শেখানো কার্যক্রমে ভাষা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিক্ষাক্রমে নির্ধারিত জ্ঞান, দক্ষতা ও মনোগড়ন তৈরি জন্য অর্থাৎ মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষার্থীদের কোন ভাষায় শেখানো হবে তা নির্ধারণ করা জরুরি। কিন্তু বিষয়টি এমন নয় যে দেশের সকল শিশুর জন্য একটি মাত্র ভাষা নির্ধারিত থাকবে। বরং শিক্ষার শুরুটা হতে হবে শিশুর মাতৃভাষায়। তা হলেই শিশু শিখন-আগ্রহে বিরূপ উপাদানগুলো থেকে মুক্ত হয়ে শিখতে পারবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য এবং আমাদের দেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। ইউনেস্কো উপরিউক্ত প্রতিবেদনে লিখেছে, The expert views is that mother tongue instruction should cover both the teaching of and the teaching through this language
‘মাতৃভাষা’- এই অভিধাটির একটি সার্বজনীন স্বরূপ আমরা বুঝে নিয়েছি। বিশেষ করে বাংলাদেশে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ বিষয়ে একটি সহজ ধারণা আছে। কিন্তু বিষয়টি তত সহজ-সরল নয়। মা যে ভাষায় কথা বলেন শিশুর জন্য সে ভাষাই মাতৃভাষা হবে তা নাও হতে পারে। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে ১. যে ভাষা শিশু প্রথম শিখে ২. প্রতিবেশীদের যে ভাষায় কথা বলতে শোনে ৩. যে ভাষা শিশু খুব ভালো জেনেছে এবং ৪. যে ভাষা ব্যবহার করতে একজন শিশু স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। সুতরাং মাতৃভাষাকে বলা যায় শিশুর প্রথম ভাষা বা প্রাথমিক ভাষা (First language ev primary language)। সুতরাং মাতৃভাষা বলতে যা বোঝানো হয় তার সঙ্গে বাস্তবতার কিছু পার্থক্য আছে। এই সব বিষয় বিবেচনায় রেখে ইউনেস্কো লিখেছে :
[…][…] it is to be noted that the use of the term `mother tongue’ often fails to discriminate between all the variants of a language used by a native speaker, ranging from hinterland varieties to urban-based standard languages used as school mother tongue. A child’s earliest first-hand experiences in native speech do not necessarily correspond to the formal school version of the so called mother tongue.
আসলে প্রমিত ভাষা ছাড়া মাতৃভাষা বলতে যা বোঝায় এবং যে ভাষায় শিশুরা মায়ের সঙ্গে কথা বলে কিংবা পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ভাব বিনিময় করে সেই ভাষা আর দশটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার মতই স্বতন্ত্র। এর সঙ্গে প্রমিত ভাষা বা শিক্ষা-দীক্ষার ভাষার সঙ্গে মাতৃভাষার সম্পর্ক খুবই সামান্য। যেমন চট্টগ্রামের শিশুদের মাতৃভাষা সঙ্গে প্রমিত বাংলা ভাষার সম্পর্ক। যেসব শিশু চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে তাদের কাছে প্রমিত বাংলা অনেকাংশে একটি বিদেশি ভাষার মতই অপরিচিত। কিন্তু তবুও একই ভাষার প্রমিত রূপের সঙ্গে শিশুরা সহজেই পরিচিত হতে পারে। ভাষা ছাড়া অন্য বিষয়ও আয়ত্ত করা সহজ হয় এবং দ্বিতীয় ভাষা শেখার পথও সুগম হয়।
প্রমিত ভাষা ছাড়া মাতৃভাষায় শিক্ষাদানে কতকগুলো সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়। যেমন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিছু মাতৃভাষার কোনো লেখ্য রূপ নেই; কখনো কখনো এই সব ভাষার একটি গোষ্ঠীগত গ্রহণযোগ্যতা অর্জিত হয় না; শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ায় বিষয়ভিত্তিক পারিভাষিক শব্দ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে; শিখন-শেখানো উপকরণের অপ্রতুলতা থাকে; একই অঞ্চলে অনেকগুলো ভাষা থাকার ফলে প্রতিটি ভাষায় শিখন-শেখানো কার্যক্রম চালানো সমস্যাসংকুল হয়ে ওঠে; প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব দেখা দিতে পারে এবং শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে মাতৃভাষায় শিক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হতে পারে। কেননা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এইসব ভাষার বাজারমূল্য তেমন থাকে না, সামাজিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠায় এসব ভাষার তেমন কোনো ভূমিকা থাকে না। সুতরাং পৃথিবীর অনেক দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিছু লোকের ধারণা হলো ওই ভাষা শেখার মানে হলো সময় ও সম্পদ নষ্ট করা। তাদের বরং একটি নতুন ভাষা শেখানো যেতে পারে যাতে তার জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হতে পারে। কারো কারো মধ্যে এমন ধারণাও আছে যে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এই সব ভাষা বাঁচিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না। এই সব ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে তাদের বরং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যেতে দেওয়াই ভালো। ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের চেষ্টা করা হলে এই সব সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়। সাঁওতালদের নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই। তাদের কেউ কেউ বাংলা বর্ণমালা এবং কেউ বা রোমান বর্ণমালা ব্যবহার করেন। পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করতে গেলে কোনো একটি বর্ণমালায় করতে হবে। কিন্তু কোন বর্ণমালায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত না-হতে পারার জন্য সাঁওতাল ভাষাভাষী শিশুদের জন্য আজ অবধি পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নই করা গেলা না।
চার.
ভাষা শুধু যোগাযোগ স্থাপন ও জ্ঞানার্জনের মাধ্যম মাত্র নয়। ভাষা ব্যক্তি থেকে শুরু করে একটি ভাষা-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ক্ষমতায়নেরও মৌলিক বিষয়। সুতরাং ভাষাকেন্দ্রিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের পথ ধরে বহুভাষিক সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি হয়। আর এই নীতি ও মূল্যবোধের বিষয়টি সব ধরনের ভাষা অর্থাৎ সংখ্যাগুরু, সংখ্যলঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। ফলে যে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের আন্দোলনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ ভাষার অধিকারের প্রশ্নটিকে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরে এবং এই ভাষাকে দাপ্তরিক ও আইনগত মর্যাদা দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে এবং শিখন-শেখানো প্রক্রিয়ায় এই ভাষা ব্যবহারের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এই বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখে শিক্ষা-ক্ষেত্রে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই সব চুক্তির মূলগত বিষয় হলো : গোষ্ঠীগুলোর প্রবল ইচ্ছা অনুযায়ী তাদের ভাষায় শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া শুরু করা; রাষ্ট্র ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করা; আন্তঃসাংস্কৃতিক শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতিকে মর্যাদা দানের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক ভাষায় প্রবেশগম্যতা অবাধ করা ইত্যাদি।
জাতিসংঘ জন্মলগ্ন থেকেই জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, সংখ্যালঘু, সংখ্যাগুরু, লিঙ্গ ও ক্ষুদ্র-বৃহৎ নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকার সুরক্ষার পক্ষে বিশ্বজনমত তৈরি করার কাজ করছে। ১৯৪৮ সালে ‘Universal Declaration of Human Right এ বিশ্বজনগোষ্ঠীর মৌলিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার নীতি ঘোষণা করা হয়। সেখানে আর্টিকেল ২এ বলা হয়,‘Everyone is entitled of all rights and freedoms set forth in this Declaration, without distinction of any kind, such as […] language’. ভাষা বিষয়ক এই সাধারণ অধিকারকে পরবর্তীতে আরো সুনির্দিষ্ট করা হয়। ১৯৬৬ ঘোষণা করা হয় (‘International covenant on civil and political Rights) এবং ১৯৯২ সালে ‘Declaration on the Rights of Persons belonging to National or Ethnic, Religious and linguistic Minorities’৬৬-র চুক্তিপত্রের ২৭ নম্বর আর্টিকেলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার অধিকার বিষয়ে বলা হয়। ‘to use their own language […] in community with the other members of their groupএবং এখানেই প্রথম ৪র্থ অনুচ্ছেদে সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় শিক্ষা লাভের অধিকার ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৯ সালে আইএলও কনভেনশনে সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় শিশুদের শিক্ষা গ্রহণের অধিকারকে আইনি ভিত্তি প্রদান করা হয়। অনুচ্ছেদ ২৮ এ বলা হয় যে, যেখানেই সম্ভব সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুরা তাদের মাতৃভাষায় অথবা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রচলিত সাধারণ ভাষায় পড়তে ও লিখতে পারার সুযোগ পাবে এবং পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষায় বা দাপ্তরিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করবে। অনুচ্ছেদগুলোতে সংশ্লিষ্ট ভাষাগুলোর উন্নয়নের উপায় বের করারও নির্দেশ প্রদান করা হয়। ১৯৮৯ সালে অনুষ্ঠিত শিশু অধিকার বিষয়ক সম্মেলনে ভাষাকে শিক্ষার আদর্শ ও মূল্যমানের সঙ্গে একত্র করে দেখা হয়। এবং ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়, শিশুশিক্ষা এমন হতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতিগত পরিচয় ও মূল্যবোধকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করতে শিখে।
জাতিসংঘের ঘোষণা ও আইন, বিধিবিধান ও পরিপত্রগুলো সাধারণ চরিত্রের হয়ে থাকে। কিন্তু এর অঙ্গসংগঠনগুলো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। আর শিক্ষা, সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে কাজ করার প্রতিষ্ঠানটি হলো ইউনেস্কো। এই সংস্থাটির সংবিধানের চারটি মূলনীতির চতুর্থটি হলো, ‘[..] Ô[..] The human rights and fundamental freedoms […] are affirmed for the peoples of the world, without distinction of race. sex, language or religion.’
১৯৬০ সালে আনুষ্ঠিত শিক্ষায় বৈষম্যবিরোধী অধিবেশন (Convention against Discrimination in Education) আরো নির্দিষ্টভাবে শিশুশিক্ষায় মাতৃভাষার গুরুত্ব নির্দেশ করা হয়। এছাড়া ১৯৭৬ সালে Recommendation on the development of adult education’ শীর্ষক অধিবেশনে, ১৯৭৮ সালেDeclaration on Race and Racial Prejudice’ শীর্ষক বিধানে, ১৯৯৫ সালে Declaration and Integrated Framework of Action on Education for Peace, Human Rights and Democracy শীর্ষক প্রবিধানে এবং ২০০১ সালে Universal Declaration on Culture Diversity’নামক প্রস্তাবে মাতৃভাষায় শিখন-শেখানো কার্যক্রমের উপর প্রভূত গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক অধিবেশনগুলোতে (ওঈঊ) স্পষ্টভাবে মাতৃভাষা শিক্ষার নির্দেশনা আছে। ২০০১ সালে ৪৬ নং অধিবেশনে বলা হয়েছে,
formal education for pedagogical, social and cultural consideration;
[…] foreign language learning as part of in intercultural education aiming at the promotion of understanding between communities and between nations.
এছাড়া একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ইউনেস্কো মাতৃভাষা শিক্ষার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে এবং কতগুলো নীতি নির্ধারণ করে। নীতিগুলো হলো :
১. মাতৃভাষায় শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালনা করে ইউনেস্কো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উন্নয়ন ঘটিয়ে তাদের গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে চায়;
২. শিক্ষার সকল স্তরে দ্বিভাষিক ও বহুভাষিক শিক্ষা প্রবর্তনে সহযোগিতা করে সামাজিক সাম্য, লিঙ্গ-সমতা ও ভাষাগত বৈচিত্র্য নিশ্চিত করে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণ করবে;
৩. আন্তঃসাংস্কৃতিক শিক্ষার একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভাষা। ভাষার মাধ্যমেই বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর স্বরূপ অবগত হওয়া যায় এবং তাদের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার বিষয়ে সম্মান প্রদর্শন করা যায়। এসব ক্ষেত্রে ইউনেস্কো সহযোগিতার হাত প্রসারিত রাখবে।
পাঁচ.
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে আদিবাসীসহ সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য স্ব স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা।’ এই নির্দেশনার আলোকে ২০১৪ সাল থেকে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তক ও অন্যান্য শিখন-সামগ্রী প্রণয়নের কাজ শুরু করে। এ সময় জাতীয় পর্যায়ে একটি এমইলি ফোরাম তৈরি করা হয় যাদের পরামর্শ অনুযায়ী বাংলা দেশের ইতিহাসে প্রথম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় পাঠ্যপুস্তক ও অন্যান্য শিখন-সামগ্রী প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সে অনুযায়ী দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলে ২০১৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক স্তরে চাকমা, মারমা, সাদরি, গারো ও ত্রিপুরাÑ এই পাঁচটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যপুস্তক ও অন্যান্য শিখন-সামগ্রী পৌঁছে দেয় হয়েছে।
বিষয়টি ছিল খুবই জটিল ও স্পর্শকাতর। কোথাও সামান্য ব্যত্যয় ঘটলে শিশুরা তো ক্ষতিগ্রস্ত হবেই তদুপরি এটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে প্রথমেই একটি ব্রিজিং প্ল্যান তৈরি করা হয় যেখানে জাতীয় ভাষায় শিক্ষার সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় শিক্ষার মধ্যে একটি শিক্ষাতাত্ত্বিক সমন্বয় পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রাক-প্রাথকি শ্রেণিতে শিক্ষাকর্যক্রম পরিচালিত হবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায়। এ পর্যায়ে স্ব স্ব ভাষায় গাণিতিক প্রতীকের সঙ্গে পরিচয় এবং পরিবেশ পরিচিতি ও বিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণা দুই ভাষায় দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে থাকবে বাংলা ভাষায় শোনা, বলা ও বর্ণ পরিচয়। প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষাক্রমের আলোকে শোনা, বলা, পড়া ও লেখার দক্ষতা মাতৃভাষায় অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষায় শোনা, বলা, পড়া ও লেখার দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকবে। এভাবে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষায় শিখন-শেখানো কার্যক্রম চলবে। চতুর্থ শ্রেণিতে এসে শিক্ষার্থীরা জাতীয় ভাষায় পড়াশোনা করবে।
প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য আমার বই, এসো লিখতে শিখি, স্বরবর্ণ চার্ট, ব্যঞ্জনবর্ণ চার্ট, ফ্লিপ চার্ট, গল্পের আটটি বইসহ যে সব উপকরণ তৈরি করা হয়েছে তার সবই করেছেন স্ব স্ব ভাষার শিক্ষক ও পন্ডিতজনেরা। এমনকি ছবি আঁকা ও গ্রাফিক্সের কাজও করেছেন ওই সব ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ। কেননা শিক্ষা-উপকরণগুলোতে যেন ওই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জাপিত জীবনের ঘনিষ্ঠ পরিচয় শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে উপস্থাপিত হয় সেই চেষ্টা ছিল নিরবচ্ছিন্নভাবে। এখন প্রয়োজন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও শিখন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার পরিবেশ তৈরি করা এবং শিক্ষা-উপকরণগুলোকে অধিকতর শিক্ষার্থীবান্ধব করে তোলার জন্য শিক্ষাতাত্ত্বিক পথে পরিমার্জনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আর এই ধারাবাহিকতা তো অব্যাহত রাখতেই হবে। হ