সোমত্ত বয়সী মহিলাটি মাথায় গোলাপি রঙের ধরাচূড়া, হাই ওয়েস্ট স্কার্ট আর হাই হিল তোলা জুতো থেকেই বোঝা যায় তার গায়ের পোশাক কেমন হতে পারে। মাথার একটা চুলও বাইরে বেরিয়ে নেই। আমি তার সামনে থেমে তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিশ্চিত হলাম তার মাথার একটা চুল বেরিয়ে নেই। আঙুলের নখগুলো সুচালু হলেও পরিষ্কার ও ছোট। তার গায়ের জামার উপরের দিকের বুকের কাছের কয়েকটা বোতাম খোলা। বোতাম খোলা জামার ফাঁক গলানো ব্রার নিচে তার সুডোল স্তনদুটোর প্রতি আমার চোখ পড়ায় সে সামান্য সচেতন হলো। আমার মনে হল, মেয়েটি ভদ্রবেশী হলেও তাকে তার স্তনদুটো ওই ভাবে প্রদর্শন করা ভালো দেখাচ্ছে না।
প্রথমেই তাকে স্বাগত জানিয়ে আমার পরিচয় দিলাম। বিনয়ের সঙ্গে আমি জবাব দিলেও মেয়েটি কিন্তু আমাকে তার নাম বলতে স্বীকার করল না। সে হাঁটাহাঁটি না করে টেবিলের শেষ প্রান্তে বসে একটা বই পড়ার ভান করল। কেউ আমাকে নজরকাড়াতে পারে না, মেয়েটি বই পড়ার ভান করেও সে কিন্তু তার প্রতি আমার নজরকাড়াতে পারল না।
মহিলাটির স্তনের সাইজ দেখে আমার মনে হলো সে সন্তানকে বুকের দুধ পান করায়। চাকরির সাক্ষাৎকার দিতে এসে সে কিন্তু সন্তানকে সাথে নিয়ে আসেনি। তার বুকের চারদিকের শক্ত করে বাঁধা গিরো দেয়া ব্রা ভেদ করা তার উন্নত স্তনদুটো দৃষ্টিনন্দন। এক সময় সে তার ব্যাগ থেকে পকেট আয়না বের করে মুখে ঠোঁটে গ্রিজ ঘষতে লাগল। ওয়েটিংরুমের আমরা সবাই মহিলাটি আচরণে বিরক্তবোধ করছিলাম। তবে সে খুবই নিশ্চিত এটা ভেবে যে তার প্রস্ফুটিত দেহবল্লরীর জন্য চাকরিটা তার কপালেই জুটবে। আজকের দিনে একটা ভালো চাকরির জন্য এ সব প্রদর্শন করার রেওয়াজ শুরু হয়েছে। এই রেওয়াজটাকে আমি ঘৃণা করি।
আমি আমার ছোট্ট কম্পিউটারটা চালু করে আমার টুইটার বার্তা আপডেট করলাম এটা লিখে: আমি জানতাম একটা চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে উন্নত কুচযুগোল বিশেষ ভূমিকা রাখে। কুচযুগোল প্রদর্শন করে চাকরি পাওয়ার জন্য মহিলাটি জন্মগ্রহণ করেনি। ওয়েটিংরুমের পাশে লম্বা একটা করিডোর, তার পাশেই বড় সাইজের কাঠের দরজা, সেখানেই লিখিত পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হবে। রুমটি একটা গ্লাস স্ক্রিন ও একটা ¯াøাইডিং দরজা দ্বারা আলাদা করা। গ্লাসের বৈশিষ্ট্য মুখ না বাড়িয়েও ভেতর ও বাইরে থেকে মানুষের চেহারা সুরত দেখতে পাওয়া যায়। রুমটা সাজানো গোছানো। কয়েকটা সুন্দর সোফা, রুমের মাঝামাঝিতে কাচ ঢাকা একটা টেবিল, তার উপরে বিজিনেস ম্যাগাজিন আর মিনিস্ট্রির সাক্ষাৎগ্রহণ সংক্রান্ত প্রোফাইল প্যামপ্লেট।
রিসিপশন থেকে আমাদের ছয়জনকে ওয়েটিংরুমটিতে বসতে বলা হয়েছে। আমি প্রবেশ পথের কাছাকাছি বসলাম প্রয়োজনে আমি সহজেই বেরিয়ে আসতে পারি, আর যারা চাকরির জন্য সাক্ষাৎকার দিতে এসেছে তাদেরকে দেখতেও পারি।
প্রথমে প্রোফাইল ফাইলগুলো সামনে নেয়া হবে। আমি অনুমান করলাম প্রত্যেকেই অবশ্যই জানে তারা কোম্পানির জন্য কী কাজ দিতে পারে। কোট পরা একজন ছোটোখাট বৃদ্ধলোক রুমে প্রবেশ করলেন। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চস্বরে বললেন, “প্রত্যেককে সুপ্রভাত। আপনারা সবাই কেমন আছেন?” আমরা সবাই মৃদুকণ্ঠে জবাব দিয়ে আমাদের সৌজন্যমূলক অভিব্যক্তি প্রকাশ করলাম। আমি ভাবলাম, তিনি হয়তো মিনিস্ট্রির পক্ষ থেকে প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ সম্বন্ধে নির্দেশনা দিতে এসেছেন। তিনি সামনে এগিয়ে গিয়ে দ্রুত পায়ে টেবিলের অন্য পাশে বসা লোকদের কাছে উপস্থিত হলেন। লোকগুলো ইতোমধ্যেই তাদের সিটে বসে স্থিতু হয়েছেন। তারা তাদের সিট থেকে উঠলেন না। তিনি টেবিলের বিপরীত দিকে একটা চেয়ারে বসলেন, যা প্রবেশ পথের ঠিক বিপরীত দিকে অবস্থিত। টেবিলের পাশে বসা লোকগুলো একগুচ্ছ কাগজ টেনে নিয়ে ফাইনাল পরীক্ষা নেয়ার জন্য মনোসংযোগ করলেন। বৃদ্ধলোকটির মাথার নজর পড়ায় মনে হলো, তিনি সম্প্রতি তার চুলে কলপ করেছেন। একজন বললেন, “মি. দুদে, আপনি আপনার দাড়ি চেঁছে ফেলেছেন তা হলে আপনাকে তরুণ দেখাতো না।”
বৃদ্ধ লোকটি ছোটোখাট হওয়ায় বড় মাপের একটা কোট গায়ে চড়িয়েছেন। তিনি যখন কাগজগুলো দেখছিলেন তখন মনে হলো মাথায় গোলাপি ধরাচূড়া পরা সোমত্ত বয়সী মহিলাটিকে তিনি চেনেন। মহিলাটি তার কাছে এসে তার পাশের সিটে বসল। তাদের কথাবার্তা থেকে আমি বুঝলাম মহিলাটির নাম লিদিয়া। সে সেখানে বসে তার সাথে আনা খবরের কাগজটা পড়তে লাগল। সে খবরের কাগজের হেড লাইনগুলো পড়ে অস্ফুট স্বরে মন্তব্য করতে লাগল। একজন হাস্যরত ব্যাংক কর্মকর্তা একজন অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর হাতে একটা খেলনা তুলে দেয়ার ছবি দেখে মেয়েটি কৌতুক করতে লাগল। কাগজের উপর মেয়েটির দৃষ্টিপাত ও ছবি সম্বন্ধে তার মন্তব্য বড়সড় কোট পরিহিত বৃদ্ধটির গোচরে এলো।
ভেতরের লোকগুলো নানা কাজে ব্যস্ত, তাই বৃদ্ধ লোকটি তার সিট থেকে উঠে মেয়েটিকে বললেন, “আমি দেখছি তুমি কাগজ পড়া নিয়ে ব্যস্ত আছ।” লোকটির কথা বলার সময় মেয়েটি তার হাত নেড়ে এমনভাবে জবাব দিল, যাতে আমরা সবাই শুনতে পাই।” আপনিও তো এমনটাই করেছিলেন। তারপর মেয়েটি হাসি হাসি মুখে বলল, “এমজি, আপনার কেমন দিন কাটছে? আমাদের এভাবে মিলিত হওয়া কি বন্ধ করা ঠিক!” মহিলাটির কথা শুনে লোকটি তার পাশে বসলেন। তাদের আলাপচারিতা থেকে আমি উপলব্ধি করলাম বিভিন্ন কোম্পানির ইন্টারভিউয়ের সময় বেশ কয়েকবার তিনি মহিলাটির সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন।
“না, আমরা পার্লামেন্টারি জবে টিকে থাকতে পারছি না। তুমি কি দেখছ না আবেদনপত্রের স্তূপটাকে, যার মধ্যে তোমার আবেদনপত্র কোথায় পড়ে আছে?” তিনি ঘাড় উঁচিয়ে বললেন। আমরা যেখানে বসে ছিলাম সেখানে একজন সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী প্রবেশ করে ঘোষণা করলেন যে সাক্ষাৎকার শীঘ্রই শুরু হবে। আমাদের পাশের কনফারেন্স রুমে যেতে হবে। অন্য আর দু’জন লোক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তাদের ঘড়ি দেখছিল। সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে এটাই প্রতিভাত হলো যে তারা সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য রুমে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।
আমরা পরবর্তী রুমে গিয়ে দ্বিতীয় লিখিত পরীক্ষা দেয়া জন্য ইচ্ছে মতো আসন গ্রহণ করলাম। আমাদের বলা হলো, “স্থানীয় সংসদীয় এলাকার একটা গ্রামীণ জনপদে প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, যাতে দশ জন লোকের প্রাণহানি ঘটেছে এবং শত শত পরিবার ছিন্নমূল হয়েছে। এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীর একটি ভাষণ লিখুন, যাতে বেঁচে থাকা মানুষের কাছে যেয়ে তিনি তাদের সান্ত্বনা ও সহানুভূতির কথা থাকবে।” এটাই হচ্ছে আমাদের প্রথম প্রশ্ন। এই প্রশ্ন আমার মনে আতঙ্ক ও উত্তেজনার জন্ম দিল।
বাবার কথা আমার মনে পড়ল। তার বন্ধুর মাধ্যমে মিনিস্ট্রির কমুনিকেশন অফিসারের চাকরির পদটি পাওয়ার জন্য চেষ্টার কথা বাবা আমাকে বলেছিলেন। আমি সে সময় সোজাসুজি কোন জবাব না দিয়ে আমি মালয়েশিয়ার টেকনোলজি ইউনিভার্সিটিতে ফিরে যাই। আমি সেখান থেকে ব্যাচেলর অফ আটর্স ডিগ্রি নিলাম। লোকজন সব সময়ই এ ধরনের কোর্স সম্বন্ধে নাকসিঁটকোয়। আমি ওই কোর্সটাই করলাম। তৃতীয় বিশ্বের দেশে এ সম্বন্ধে অনেক প্রশ্নই উত্থাপিত হয়, আমরা যদি এ কোর্সগুলো না করি তবে কেমন করে আমরা তৃতীয় বিশ্বের থেকে বের হয়ে প্রথম বিশ্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারব? কেন তৃতীয় বিশ্বের ছাত্রছাত্রীরা তাদের দেশে চাকরির বাজার সীমিত হওয়া সত্ত্বেও এই সব কোর্স পড়তে চায় না?
আমি পরিষ্কারভাবে স্মরণ করতে পারি ভিডিও গেম শুরু করার দিনগুলোর কথা। সে সময় আমার বয়স ছয় বছর, আমার বাবা বিদেশ থেকে ফিরে আসবার সময় আমার জন্য একট সুপার ম্যারিও ব্রোসগেম নিয়ে আসেন। তিনি আমার জন্য একটা টয় কার আনতে মনস্থ করেছিলেন, কিন্তু যখন তিনি তার আমেরিকান বন্ধুকে ভিডিও গেম প্লেয়ার কিনতে দেখলেন, তখন তিনিও ওটাই কিনতে মনস্থ করেন। তিনি ওটা অপারেট করতে জানতেন না। তাই আমি নিজেই ওটা অপারেট করা শিখলাম। আমাকে এক সপ্তাহ কাছে না পেয়ে মা আমাকে শাপান্ত করতে লাগলেন। আমি কোন প্রকার প্রতিবাদ করলাম না কারণ ভিডিও গেম আমার সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধু, ভিডিও গেমকে আমি মনেপ্রাণে পছন্দ করি। আমার বাবা প্রায় প্রায় বিদেশে যেতেন, আমি তাকে পোশাক-পরিচ্ছদের পরিবর্তে লেটেস্ট ভিডিও গেম আনার অনুরোধ করতাম। দ্য লেজেন্ড অফ জেলদা টিনএজ নিনজা টার্টলস এবং ড্রাগন ওয়ারিয়র ইত্যাদি ভিডিও গেম আনতে বলতাম।
ভিডিওতে জেলদা টিনএজ মুটটান্ট নিনজিয় টার্টলস এবং ড্রাগন যোদ্ধা এর উপকথা দেখতাম এবং আমার বয়ঃসন্ধিক্ষণের দিনগুলো টালমাটাল হয়ে উঠত। সে সময় ভিডিও রেখে আমি আমাদের কাছের প্রতিবেশীর বাড়িতে যেতাম। আমি বাড়িতে থাকলে বেলা নামের একটা মেয়ে আমাদের বাড়িতে আসত সে আমার প্রতি আকৃষ্ট তা আমি বুঝতে পারতাম।
সে সময় আমার বয়স ১৭ বছর। পরে আমি অ্যাসাসিন ক্রিড, ব্লাক ওপস, ব্যাটেলফিল্ড ৩ অন লাইন, মডার্ন ওয়েলফেয়ার ৩ এ পাকা গেমার হলাম। গেমের প্রতি যারপরনাই অনুরাগীও হলাম। বছরের পর বছর কেটে গেল।
মালয়েশিয়াতে থাকাকালে আমি আমার আগ্রহের সাথীদের সঙ্গে মিলিত হতাম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে ফিরে এমন একটা কোর্স করবো, যাতে দেশেই গেমিং অর্কেড তৈরি করতে পারি। আমি প্রত্যেকদিনই আমার পছন্দের অর্কেড তৈরির স্বপ্ন দেখতাম। বাবার কাছ থেকে পরামর্শের জন্য আমার আইডিয়াটা তাকে জানালে তিনি হেসে বললেন যে এটা কখনোই করা সম্ভব হবে না বলে আমার স্কুলের টিউশন ফিস দিয়ে দিলেন। এতে আমি নিশ্চিত হলাম আমি একজন ফরেন স্টুডেন্ট হিসাবে আমার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারব। তিনি অবশ্য আশা করেছিলেন আমি একজন গ্র্যাজুয়েট হয়ে আমার আশা পূরণ করতে পারব। তিনি কখনোই উল্লেখ করতে বিরত থাকেননি কেমন করে আমি উন্নতি করতে পারি এবং তিনি সব সময়ই আমাকে কবিতা লিখতে অনুপ্রাণিত করতেন। আমি স্কুলে কী পড়ছি, তা বাবার বন্ধু জিজ্ঞাসা করলে আমি বাবার আনন্দকে উপভোগ করতাম। তিনি বললেন, “ইঞ্জিনিয়ারিং এ আগ্রহ থাকলেও তুমি কবিতা লেখো ভালো।”
বাবার বন্ধু আমার ইচ্ছেকে প্রতিরোধ করতে চেষ্টা করছিলেন। তিনি আমাকে কম্যুইউনিকেশন অফিসার পদে ভ্যাকান্সির কথা বললেন। এমনকি তিনি বিজ্ঞপ্তির পেপারটাও দেখালেন। এতে অবাক হওয়ার কিছুই ছিল না। বাবা অবশ্যই তার বন্ধুকে বলেছেন যে আমার একটা চাকরি প্রয়োজন। আমি যখন বাবাকে বললাম না তখন তিনি আমার শিশুসুলভ পছন্দের জন্য আমার প্রতি লম্বা একটা বক্তৃতা ঝাড়লেন। তিনি আমাকে বললেন, “তোমার জন্য এটাই বাস্তব সম্মত সময় চাকরির বাজারের সহজলভ্য চাকরি খুঁজে নেয়ার।” আমি যুক্তি প্রদর্শন করলাম যে তারা আমাদেরকে জ্ঞান অর্জনের জন্য পাঠিয়েছেন যাতে আমরা নতুন আইডিয়া লাভ করতে পারি এবং তাদের কাছে আমাদের নিজেদের দেশকে তুলে ধরতে পারি এবং একে একটা উন্নততর স্থানে পৌঁছে দিতে পারি।। আমি তাকে বোঝানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করলাম।
কোনই সন্দেহ নেই যে আমি কাজ করাতে পারবো। আমার প্রয়োজন সম্বন্ধে আমি সব ধরনের রিসার্চ করেছি।
আমি বাবাকে বললাম, “আপনি আমাকে বিনিয়োগ করেন তবে আমি প্রথম ছয় মাসেই সুদসহ তা ফিরিয়ে দেব। আমার ইচ্ছেটা বাবার মনঃপূত হলো না।” “শোন ইয়ংম্যান” তিনি আমাকে বললেন। “তুমি ইতোমধ্যেই অনেক অর্থকড়ি নষ্ট করেছো। আমি আর তোমার ভুল চিন্তাপ্রসূত পরিকল্পনার পেছনে টাকা পয়সা ব্যয় করতে চাই না।” আমি যখন বিদেশে ছিলাম তখন আমার বাবা আমাকে অর্থকড়ি পাঠাতে কার্পণ্য করেননি। তাই আমি মনে করেছিলাম ব্যবসায় তিনি অর্থ বিনিয়োগ করতে দ্বিধা করবেন না।
আমি একজন মহিলার কাছ থেকে ফোন পেলাম। তিনি ফোনের অপর প্রান্ত থেকে আমাকে জানালেন নামবোলিতে একটা চাকরির জন্য আসন্ন লিখিত পরীক্ষার কথা। আমি ওই চাকরির জন্য আবেদন না করলেও আমি লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেয়ার কথা ভাবতে পারি। এ কারণে গ্রীষ্মের এক বুধবারের সকালে নামবোলি স্টেডিয়ামে পরীক্ষায় বসবার জন্য আমি হাজির হলাম একটা চাকরির জন্য একশত প্রার্থীর সাথে। চৌকস দেখায় এমন ধরনের পোশাক আমাদের পরনে। সম্ভবত পুরুষদের কেউ কেউ প্রথমবারের মত তাদের স্যুট কিংবা মেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ প্রথম হিল তোলা জুতো পরে এসেছে। আমি পরীক্ষায় ভালোই করি কারণ এধরনের লিখিত পরীক্ষা দেয়ার অভিজ্ঞতা আমার আগে থেকেই ছিল।
লিখিত পরীক্ষা দেয়ার পর কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে ধারে কাছে অপেক্ষা করতে বলল। আমি কিন্তু ধারে কাছে অপেক্ষা করার পরিবর্তে অফিসগুলোর চারদিকে ঘুরে দেখতে মনস্থ করলাম। আমি তাদের ওয়েটিংরুমে কোনক্রমেই আর অপেক্ষা করতে পারছিলাম না। চারদিকে কিছু সময় ঘোরাফেরা করার পর আমি ওয়াশরুমে হাতমুখ ধুতে গেলাম। ওয়াশরুমের নোটিশগুলো পড়ে আমি সব সময়ই মজা পাই। আমার মনে হয় ওইগুলোর মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ আপনাদেরকে কিছু বলতে চায়। ওয়ালগুলোর একটাতে লেখা আছে: যদি আপনি পানি ছিটান তবে ঠুংঠাং শব্দ হবে, দয়া করে তা থেকে বিরত থাকুন এবং পানি মুছে ফেলুন।
পুরুষদের জন্য কোন টয়লেট পেপার আমার চোখ পড়ল না, আমি নিশ্চিত মহিলাদের জন্যও টয়লেট পেপার নেই। অপ্রত্যাশিতভাবে একজন মহিলা আমাকে একটা নোটিশ পড়তে বলল। নোটিশে লেখাটা পড়লাম: সাবধান লোকজন এখানটা ব্যবহার করার পর সেনেটারি টাওয়েল দেখতে পাবেন, ওটা ব্যবহার করার পর সুন্দর করে ভাঁজ করে বাকেটে রাখবেন।
ওয়েটিং রুমে ফিরে আসার পর বলা হলো যে আমাদের চারজনকে মৌখিক সাক্ষাৎকারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এই চারজন হলো মাথায় গোলাপি টুপি পরা লিদিয়া নামের মহিলাটি, আমি নিজে এবং লিখিত পরীক্ষায় আমার ডান পাশে বসা আরো দুজন।বাকিদেরকে রিসিপশন থেকে সোডা কিংবা পানি সংগ্রহ করতে বলে তাদেরকে ধন্যবাদ দেয়া হলো। বড় একটা সাইজের কোট পরা সেই ছোটখাট আকারের বয়স্ক লোক লিদিয়ার সঙ্গে কথা বলছিল। দেখে মনে হলো স্পোর্টসডে-তে তিনি তার কন্যাকে পরামর্শ দিচ্ছেন।
লিদিয়ার ডাক পড়ায় আমরা মনে করিলাম সে বেশ ভালো করবে। অন্যজনের অভিমত জেনে আমরা পরস্পর বন্ধু ভাবাপন্ন হয়ে উঠলাম। আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেক জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।
পরিশেষে একজন এয়ারকনডিশন সম্বন্ধে অভিযোগ করলেন। সহনীয় তাপমাত্রার জায়গায় আমি সরে গেলাম। আমাদের মাঝ থেকে একজন বলল, “তুমি কত বেতনে নিজেকে তাদের কাছে বিক্রি করতে চাও বলে অনুমান করছে? আমরা যা চাই সেই বেতনে আমাদের রাজি হওয়া উচিত।” আমরা সবাই বেতনের প্রশ্নটাকে উপেক্ষা করলাম। প্রার্থী কয়জন তখন পরস্পর বন্ধু হয়ে গেলাম। লিদিয়া ভেতর থেকে বের হয় এলো। আমরা আমাদের নাম শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকলাম। আমাদেরকে ডাকার দায়িত্বে থাকা মহিলাটি বলল, “এবার আমরা ফ্লোরেন্সকে ডাকছি,” গোলাপি টুপি মাথার লিদিয়া নামের মহিলাটি যেন মার্চ করে কনফারেন্স রুমের দিকে চলে গেল। লিদিয়া কাউকে কিছু বলতে চায় না তার চলার গতি থেকে বোঝা গেল।
কয়েক মিনিট পরে মনে হল সে তার মনটা পরিবর্তন করেছে। এবার সে রাগত কণ্ঠে বলল, “ভয়ঙ্কর জায়গা! তোমরা মনে করতে পার আমি অনেকবার এমন জায়গায় গিয়েছি।” ফ্লোরেন্স ওয়েটিং রুমে ফিরে এসে সাবধানে উপবেশন করল। তাকে দেখে মনে হলো তার শরীরটা যেন অসুস্থ। শূন্য দৃষ্টিতে সে অসুস্থ কণ্ঠে বলল, “বর্তমানের আমার বসদের একজন প্যানেলে আছেন।”
আমার মনে হলো, তার মুখ থেকে যেন কথা সরছিল না। তবুও ফ্লোরেন্স এক সময় বলে উঠল, “তাকে দেখে আমার মুখ থেকে কথা আসছিল না। আমি সকাল থেকে অসুস্থ এ কথা বলে তার কাছ থেকে ছুটি নিয়েছিলাম। আমি অনুমান করলাম তারা এমন কাউকে চাচ্ছিল যার সাংবাদিকতার ব্যাকগ্রাউন্ড আছে।”
প্রথম বারের মত আমার মনে হলো, স্তন্যদানকারী মাথায় গোলাপি টুপি পরা মহিলটি ফ্লোরেন্সের কাছে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করল। আমি জানি না আগে এ ধরনের প্যানেলের মুখোমুখি হয়েছিল কিনা। তারা চাকরি পাবার জন্য লড়াই করে যাচ্ছিল। আমি আগেও প্যানেলের মুখোমুখি কিন্তু হয়েছিলাম। আমি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। তাই আমার এ সব বিষয়ে অভিজ্ঞতা ছিল। আমার বাবা খুশি হন এ জন্যই এখানে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হতাম। আমি এক সপ্তাহ পরে ফোন পেলাম বাবার বন্ধুর অফিসে নতুন কম্যুনিকেশন অফিসার হিসেবে আমাকে চাকরির নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছে। সত্যি সত্যি এবার চাকরির জন্য অপেক্ষার পালা আমার শেষ হলো। হ
[হেলেন নাইয়ানা বর্তমান প্রজন্মের উগান্ডান লেখিকা, সম্পাদক ও ব্লগার। জন্ম আফ্রিকার উগান্ডার কাম্পালায়। তিনি উগান্ডান সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যাঙ্গনে তুলে ধরার জন্য কাজ করেছেন। তাঁর বিয়ের আগের নাম হেলেন নাইয়ানা। তাঁর বর্তমান নাম নাইয়ানা কাকোমা। তিনি ম্যাকাররেরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লিটারেচার ও কম্যুনিকেশনে ডিগ্রি অর্জন করেন। হেলেন উগান্ডার মিডিয়া হাউসে ফ্রিল্যান্স লেখক, সাব-এডিটর এবং কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে তিনি মাধভানী গ্রুপের গ্রুপ ম্যাগাজিনের এডিটর হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি উগান্ডার জিনজা জেলার কাকিরাতে বসবাস করছেন। তিনি তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। ২০১৫ এর ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান রাইটারস ট্রাস্ট অ্যান্ড কমনওয়েলথ রাইটারস কর্তৃক তিনি মোদজাজি বুকের ওপর এডিট্রেরিয়াল ফেলোশিপ অর্জন করেন। তাঁর লেখা প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য ছোটগল্প সংকলনগুলোর মধ্যে “চিফ মোর্নার ইন এ মেমোরি দিজ সাইজ অ্যান্ড আদার স্টোরিস”: তিনি ২০১৩ সালে দ্য কেইন প্রাইজ ফর আফ্রিকান রাইটং এ অংশ গ্রহণ করেন এবং ওই বছরই কেইন প্রাইজ লাভ করেন। ইংরেজি ভাষায় তাঁর লেখা ‘ওয়েটিং’ গল্পটিকে বঙ্গানুবাদ করা হলো। বিশ্বায়নের যুগে চাকরিপ্রার্থীদের সাক্ষাৎকার সংক্রান্ত বাস্তবতা এ গল্পে উঠে এসেছে। বিশেষ অনুষঙ্গে।]