একটু আগেও ড্রয়িংরুমের হৈ চৈ-এ নয়েজি ছিল গোটা ফ্ল্যাট বাড়িটা। ছেলে সুমি, বউমা নোভা ওদের দুই ছেলে রিমো আর মিমো- ওরা উত্তরা যাবে তিন-চার দিনের জন্য।
আমার ফেড জিন্সের প্যান্টটা নিয়ো কিন্তু মা। সুমিতের গলা, -বিয়ের দিন মেরুন কালারের পাঞ্জাবিটা পরব, সেটা নিয়ো কিন্তু নোভা।
নোভা ঝাঁঝালো গলায় বলে, আমার শাড়ি-গহনা কিছু নিতে হবে না? তোমাদের ফরমায়েসে তো পাগল হয়ে যাচ্ছি।
টাউস তিনটে ট্রলিব্যাগে কাপড় চোপড় গোছানো হচ্ছে। ওদের কথা মাঝে মিশে আছে কপট রাগ ও আনন্দ ঝংকার, সমরেশের ছোড়দির মেয়ে ঝিনি বিয়েতে যাচ্ছে ওরা। নিউ ইস্কাটন থেকে উত্তরা বাড়িতে থাকবেন শুধু সমরেশ। চাকুরে জীবনে দিব্যি ছিলেন তিনি অসুখ-বিসুখ তাকে কোন দিনও কাবু করতে পারেনি।
রিটায়ারমেন্টের পর পরই হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে, গেল বছর নিউমোনিয়ায় ভোগে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে কয়েকদিন, বিয়ে বাড়ির তেল মশলায় ডুবানো খাবার অনিয়ম, মানুষের ভিড় এখন আর তেমন সহ্য করতে পারেন না সমরেশ, শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়েছে। তিনি বাড়িতেই থাকবেন।
নোভা প্রথমে বলেছে, তা কি করে হয় বাবা একা থাকবেন আপনি? একেবারে একা?
সমরেশ হেসে বলেছেন, মাত্র তিনটে দিন তো, দেখতে দেখতেই কেটে যাবে।
এত কাছের মানুষ, নিজের শরীর সুস্থ থাকলে উৎসবে কত আনন্দ করতেন, অথচ উপায় নেই, কর্তব্যকর্ম বলেও একটা কথা আছে, তাই সুমিত- শোভা ছেলেদের নিয়ে উত্তরা যাবে। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে ঝিনির জন্য। ফ্রিজের নর্মাল চেম্বারে বক্সে করে খাবার গুছিয়ে রেখেছে নোভা। ডিপ ফ্রিজেও রয়েছে গড়া চপ ঔষুধ বিছানার পাশের টেবিলে। শ্বশুরের জন্য নিপুণ হাতে সব কিছু সাজিয়ে রেখেছে নোভা। ওদের যাবার প্রস্তুতির কলরোলে দুপুরের ভাতঘুমটাও চটকে গেছে।
সারা ফ্ল্যাটটি খাঁ খাঁ করছে এখন, নিশ্চুপ হয়ে এসেছে চারপাশ। বাইরের ম্লান গোধূলিকে দাপটে হাতে হটিয়ে দিয়ে জ্বলে উঠেছে হীরের টুকরোর মতো স্ট্রিট লাইট। দু’চারটে রিকশা কার চলে যাচ্ছে বাড়ির সামনে দিয়ে। বড় রাস্তার ওপরে বাড়িটি নয় বলে ধুলোবালি, রাস্তার হট্টমেলা তেমন তীব্র ভাবে আসতে পারে না, তাই বাঁচোয়া। একাকী থাকার এই প্রথম সন্ধ্যা, এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি। আটচল্লিশ বছর আগে কমীলনীর সাথে ফুলের জীবন শুরু হবার পর কখনো একা থাকতে হয়নি। নিজের উজ্জ্বল যৌবন, কর্পোরেট জগতে স্বরব উপস্থিতি, ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী নিয়ে পরিপূর্ণ সংসার সেখানে একাকিত্বের ঠাঁই কোথায়? শুধু অঢেল স্বপ্ন, নামি কোম্পানিকে আরো লাভজনক করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এই ছিল সমরেশের সার্বক্ষণিক ভাবনা দুরন্ত যৌবনে কমালক্ষ্মীর মতো লাবণ্যময়ী মেয়ের আগমন ঘটল জীবনে, অবগুঠনে ঢাকা মুখটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হলো, সেই সব শিহরণ ব্যাখ্যা দিনে-রাতেও উন্নতির উদয় শিখরের মায়াভরা পথ খুঁজছেন। কুমু চিরাচরিত ঘর, মা-বাবা-আত্মীয় স্বজন ছেড়ে এসেছে, স্বামী হিসেবে ওর কাছে থেকে সহমর্মিতাবোধ জানালে নতুন সংসারের আশয়স্থল ওর জন্য নিরাপদ আনন্দের ও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠবে সে বোধটুকু মনে সে সময়টাও তেমন ভাবে জেগে ওঠেনি।
আজ এই নিরালা রাতে একা ঘরে বসে আছেন সমরেশ। দেয়ালে সাঁটা এই ডিস টিভি মৃদু আওয়াজে চলছে। অপলক চোখ মেলে তাকিয়ে আছেন টিভির দিকে। মগজে মৌরী দানার মতো পীতাভ স্মৃতির ভাবনারা আসা যাওয়া করতে থাকে। সুমিতের একা একা লাগছে না তো বাবা? সমরেশ প্রাণ খুলে হাসেন। আমি বাচ্চা ছেলে নাকিরে খোকা? এই তো টিভি দেখছি।
সুমিত তার সোনালির জন্মের দিনগুলো ভেসে আসে দু’চোখের সামনে। সমরেশ সদাব্যস্ত, বিদেশ ট্যুর কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করা এসবের প্ল্যান প্রোগ্রাম নিয়ে দারুণ ব্যস্ত। সুমিত আর সোনালি বড় হয়েছে মায়ের আঁচল ধরে কমলিনীর সেই আদরে, শাসনে। পিপ পিপ করে বেজে উঠল মোবাইল। নোভা মেসেজ পাঠিয়েছে। ‘গরম জল, বোয়াম টি ব্যাগ, ফ্রিজে চিকেন স্যান্ডউইচ রয়েছে, এক্ষুনি চা খাও।’
বউমার কড়া শাসন, পেয়ালায় লিকার, দুটো স্যান্ডউইচ নিয়ে বসেন। একা একা বেশ অন্যরকম লাগে তো! চলে যাওয়া দিনগুলো সুযোগ পেয়ে খুব কাছে চলে আসে। নিরালা-নিঝুম সময়ে স্মৃতিরা বুঝি এমনই করে আসে দোরগোড়ায়। চায়ের পেয়ালায় আয়েশি চুমুক দিতে দিতে ভাবেন, ছেলে-মেয়ে দুটোরই মেলছে কুসুম। একটু একটু করে বড় হয়ে উঠেছে ওরা, কলি থেকে ফুল যেমন বিকশিত হয়ে পাপড়ি মেলে, মানবশিশুর বড় হওয়াও তেমনই সুন্দর রোমাঞ্চকর সেই সব দিনগুলো অবহেলায় তিনি হারিয়েছেন। কোনদিন মনে দুঃখবোধ জাগেনি আজ একা আছেন বলেই কি এত স্মৃতিকাতর হয়ে উঠেছেন? সজল হয়ে উঠেছে বুকের ভেতরটা।
ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠে মোবাইল মিমো বলে, কি করছ দাদু ভাই? একা একা ভয় পাচ্ছ বুঝি?
সমরেশ বলেন, বলছিস কি মিমো? ভয় পাব আমি? জানিস আমি চাকরিজীবনে প্রায় হাজার খানেক মানুষকে হ্যান্ডেল করেছি।
– সে না হয় বুঝলাম দাদু, ভূতের ভয়ও তো করতে পারো। খালি বাড়ি পেলেই নাকি ভূতেরা ঢুঁ মারে। বি কেয়ারফুল দাদু ভাই।
মনটা ফুরফুরে হয়ে যায় মুহূর্তেই। সুমিত আর সোনালির শৈশব-কৈশোর আর মধুর তারুণ্যের সময়টুকু দু’চোখ ভরে তিনি দেখেননি। নাতিদের মাঝে এবার সেগুলো খুঁজে নেবেন। কোম্পানির দায়িত্বভারে তিনি সময় পেয়েছেন কোথায়? তাছাড়া ভেবেছেন, সংসার সন্তান-পালনের জন্য তো কমলিকা রয়েছে। হ্যাঁ সংসারে স্ত্রীর প্রয়োজন রয়েছে শীতের সকালে গরম ধোঁয়া ওড়া কফি, বৈশাখের ঝাঁঝালো দুপুরে ঠান্ডা লেবুর শরবত-সেই তো ভালোবাসা ভরে এগিয়ে দেবে।
এবং বেশি কি কিছুই ছিল না কুমু? বুকের ভেতরটা বেদনায় টনটন করে ওঠে। পাশের ফ্ল্যাটের নিরুপমা গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
– কী করছ সমুদা?
– টিভি দেখছি নিরেট। তোমরা কেমন আছ?
– ভালই আছি। অসুবিধা হলে বলো কিন্তু, আমরা তো রয়েছি।
রাজশাহীর সাগরপাড়ায় নিরুপমা ও সমরেশের পাশাপাশি বড় হয়েছেন। দু’টি পরিবারের মাঝে গাঢ় হৃদ্যতা ছিল। পড়াশুনার শেষ পর্যায়ে ও চাকরিজীবনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তিনি ঢাকাতেই আছেন। পাশের ফ্ল্যাটটি নিরুপমার একমাত্র মেয়ে কাঁকনের। নিরুর স্বামী মারা যাবার পর মেয়ের সঙ্গেই থাকে ও। প্রায় ছোটবোনের মতো নিরুর সাথে দেখা হওয়া মিরাক্যাল বৈ কি?
অনেক দিন পর দেখা হওয়ায় খুব খুশি হয়েছিলেন সমরেশ। দুই পরিবারের মাঝে নতুন করে হৃদতা বেড়ে উঠেছে। নোভা খুব পছন্দ করে নিরুপমাকে ছোটখাটো, সমস্যায় পড়লে ওরা আলোচনা করে- নিরুআন্টির সঙ্গে। এখন ‘প্রতিবেশী’ শব্দটিই ফেরারি হয়ে গেছে, এ দু’ পরিবার একে অপরের শুভানুধ্যায়ী, ছুটন্ত এই কালন্তক সময়ে-এইবা কম কি? মোবাইলের মাধ্যমে নোভার মৃদু নির্দেশ।
– পৌনে ন’টা বাজে, এবার নোভার মৃদু নির্দেশ।
ছোড়দি নাতানা-কিছুটা অপেক্ষা-কিছুটা অপেক্ষা করল।
– ঝিনির বিয়েও তুই থাকলি না, খুব খারাপ লাগছে রে খোকা। ভালো থাকিস ভাই।
সুদৃশ্য কনটেইনারে হাতে গড়া ব্রাউন আটার রুটি, মিশেল সবজি, জিরো ক্যাল দিয়ে তৈরি করা সুজির পায়েস। কনটেইনারের ওপর সাঁটা কাগজে লেখা। কোনটা লঞ্চ, কোনটা ডিনারের মেন্যু!
ঠা ঠা করে একা ঘরে হাসেন সমরেশ। পারেও বটে মেয়েটি।
অভেন টাইম সেট করে ফের ভাবতে বসেন। শূন্য ঘরে আজ তাকে ভাবনা পেয়ে বসেছে। মানুষের কলরোল হয়ত স্মৃতির পাখিরা ডানা গুটিয়ে বসতে পারে না, রাতের নিরালায় বুকের ভেতরে স্মৃতিগুলো জোনাকির মত জ্বলে উঠছে বারবার।
গ্লাভস পরে রুটি-তরকারি বের করে আনেন অভেনের ভেতর থেকে। নিজেরই অবাক লাগছে, সাংসারিক কোনো কাজে কোনোদিনই তিনি হাত দেননি। বা দিতে হয়নি। নিজেকে বেশ করিৎকর্মা বলে মনে হচ্ছে- এই মুহূর্তে বাইরের জগতে দীপ্যমান এক সফল পুরুষ, তিনি, সাংসারিক খুঁটিনাটি কাজ, ছেলেমেয়ের ঝুট-ঝামেলা, সে তো কুমু দেখবেই, মেয়েদের কাজই তো এই। সংসারের নিয়মও তাই।
রুটি-তরকারি খাওয়া শেষ। সুজির পায়েস এক চামচ মুখে দেন। তখনই মনে পড়ে যায় পারিবারিক দুঃসময়ের দিনগুলো। বাবা ম্যাসিও হার্ট অ্যাটাকে চলে গেছেন আচমকা, এরপর থেকে মা অসুস্থ। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে বিছানা ছাড়ত কমলিনী।
– এত ভোরে কোথায় যাচ্ছ?
– বুয়া এসে দরজায় নক করবে তো, বেডরুম থেকে শোনা যাবে না।
অবাক হয়ে সমরেশ বলেছিলেন, ডোর বেল বাজাতে পারে, নক করবে কেন?
শান্তি-স্থিতধী স্বরে কুমু বলেছে- ডোর বেলের আওয়াজে মায়ের ঘুম ভেঙে যায়, সারারাত ঘুমোতে পারেন না। স্ত্রীর সেদিনের সেই স্বরটি ভেসে আসতে থাকে চারপাশ ঘিরে। এত অনুভব করত ও সবার সুখ-দুঃখ? রাত বাড়ছে, টক শো-এর আলোচনা শুনে শুনে ক্লান্তি আসে এক সময়। বাতি নিভিয়ে দেবার পরও কমলিনী ফিরে আসে বার বার। বিছানায় আর কিচেনের বৃত্তে যার অবস্থান ছিল, গভীর এই রাতে কাঙালের মতো পাশের জায়গাটুকুতে হাতড়াতে থাকেন সমরেশ। যদি তার চুড়ি-বালা পরা হাতটি একটু ছুঁতে পান-সেই পরম প্রত্যাশায়।
সেই কোন কাঁচাভোরে ঘুম ভেঙে গেছে, কাচের দরজা খুলে ব্যালকনিতে বসে থাকেন। ধীরে ধীরে আলো ফুটতে থাকে, জেগে উঠতে থাকা নগর জীবন। মা-বাবার সাথে কচি ছেলে-মেয়েদের স্কুলের পথে হাঁটা দেখতে বেশ লাগে। একবার উঠে আনাড়ি হাতে কফি করেন, বেশি দুধ দিয়ে তৈরি করায় খেতে বেশ লাগল, নিজের মনে বেশ কনফিডেন্স এলো- বেশ তো পারি আমি। নোভা ফোন করল, বাবা ব্রেকফাস্ট করে ওষুধটা খেয়ে নিন। বেলা বাড়ছে, বাইরে তেতে উঠছে হেমন্তের রোদ। ডিসিপ্লিনের মাঝে রয়েছেন বরাবর, দুতিন দিন একটু অনিয়ম করলে ক্ষতি কি? পাকস্থলী ভরানো সব উপকরণ ফ্রিজেই রয়েছে অসুবিধের কিছু নেই। ডোর বেল বেজে ওঠে। দরজা খুলে অবাক হলেন, কমলিনীর ছোট বোন কুহেলিকা। বাড়িতে কেউ নেই? নোভা না হয় গেছে, পরের মেয়ে সুমিত থাকতে পারল না? আমিই পাঠিয়েছি ওদেরকে, ঝিনির বিয়েতে না গেলে কি চলে? দুদিন পর চলে আসছে। এখন ও ব্রেক ফাস্ট করেননি-তাইতো? কটা বাজে সে খেয়াল আছে? ফ্রিজে সব আছে। পাউরুটি ডিম টক দই। মেজাজ ঠান্ডা হয়েছে কুহেলিকার। দই না হয় ভাজতে হবে না, ডিম-পাউরুটি তো তৈরি করতে হবে? টোস্টারে পাউরুটি লাফিয়ে ওঠে। ডিমের শুধু সাদা অংশে কুচনো। সবজি মিশিয়ে চমৎকার ওমলেট করে কুহেলিকা। সবশেষে গ্রিন টি। চমৎকার ব্রেকফাস্ট হলো। কোমরে আঁচল গুঁজে ঘর দোর গুছিয়ে, বিছানা পেতে, রাইস কুকারে চলে ধুয়ে সব ঠিকঠাক করে রাখে। এবার যাই সমুদা, তুমি শুধু সুইচটা অন করে দিও। টেবিলে গরম করা তরকারি রইল। ওরা সব পারে। অল্প সময়ের জন্য কুহেলিকা এসে বাড়ির ভোল যেন পাল্টে দিয়ে গেল। অবাক চোখে নিজের চেনা ঘরদোরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মেয়েটা যেন ম্যাজিক স্টিক ছুঁইয়ে দিয়ে গেছে।
সমরেশদের সংসারে ছেলে সন্তান জন্ম নেয়া, যেন সুপারম্যান কিংবা সিক্স মিলিয়ন ডলারম্যান আমার মতো। এখন মনে হতে থাকে কী অদ্ভুত সেই আকাক্সক্ষা, দু’বোনের পর তার নিজের জন্মও ছিল সে রকম। আদরে আদরে ভারিয়ে দিয়েছেন মা-বাবা, স্কুলে টিচার বকুনি দিলে বাড়িতে ফিরে কাঁদত খোকা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। মা বলতেন, – ছেলেরা কক্ষনো কাঁদে না, মন খারাপ করে বসে থাকে না, কাঁদে তো মেয়েরা। ছেলেরা ফুটবল খেলে, ক্রিকেট খেলে, ব্যাটসম্যান হয়। মায়ের বলা কথাগুলো ছেলেবেলা থেকে বুকের ভেতরে ধাক্কা দিয়েছে, এভাবেই শক্ত-পোক্ত হয়ে উঠেছেন তিনি। সন্ধ্যায় টিভি দেখতে দেখতে মনে মনে বলেন, মেয়েরা যা পারে আমি কি তা পারি মা? অল্প ক্ষণের জন্য এসে সব গুছিয়ে দিয়ে গেল কুহেলিকা, ঠিক যেন ম্যাজিশিয়ানদের মতো। রাত ফুরিয়ে গেল, সকাল হলো। বেলা বাড়তে থাকে। দুটো বিস্কুট দিয়ে লিকার চা খেলেন সমরেশ, খবরের কাগজ খুঁটিয়ে পড়ার মাঝে ডাক্তার স্বর্ণদীপ এল। সমরেশের কাজিন, অল্প বয়স ঝকঝকে চেহারা। নোভা বলল তোমাকে দেখে যেতে, একা আছ তো-তাই। একা আর কোথায় রে? রোজই কেউ না কেউ এসে দেখে যাচ্ছে। আজ তুই এলি। দীপ বলল, তুমি এত মেলাংকলি মুডে থাক কেন? তুমি তো সবে ছিয়াত্তর প্লাস। ছিয়াত্তর কি কম-বল? শোন দাদা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুরনো এক রিপোর্ট দেখলাম দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডোরের নোজা প্রদেশ ভিলকাবাম্বা উপত্যকা ঘুরে এসেছেন ডেভিড। ডেভিড মানুষটা কে? স্বর্ণদীপ বলে, দাদা, ড. ডেভিস হলেন একজন জরা বিজ্ঞানী, বয়স্কদের নিয়ে কাজ করেন, তিনিও সে প্রদেশে গেছেন। পুরনো একটি জার্নাল দেখলাম সেখানে তিনি প্রচুর একশ বছর ছাড়িয়ে যাওয়া মানুষকে দেখেছেন। বলিস কি রে? একেবারে তাজ্জব সমরেশ। হ্যাঁ সত্যি বলছি সমুদা বুড়ো হোসে ডেভিড একশ বিয়াল্লিশ বছর বয়সেও দিনভর তামাক ক্ষেতে কাজ করেন। মধ্যদুপুরে হেমন্তের ¯িœগ্ধ রোদের দিকে তাকিয়ে সমরেশ বলেন, একশ বিয়াল্লিশ বছর? আই ওয়ান্ডার দীপ। অবাক হবার কিছু নেই সমুদা। তুমি রিটায়ার করেছ সব শেষ। আসলে তোমার মাঝে কর্মক্ষমতা প্রাণশক্তি সব কিছু বয়ে গেছে, তোমার বুঝতে হবে দিজ ইজ আ সিস্টেম। আমাদের যা হয় আর কি। নাতিকে স্কুলে পৌঁছে দাও, বাড়ি পাহারা দাও- সমরেশের ভাবলেশহীন মুখের দিকে তাকিয়ে কথাটি প্রায় গিলে নিয়ে অন্য কথায় চলে যায় স্বর্ণদীপ। ঝটপট কফি তৈরি করতে করতে বলে, রাশিয়া দেশের ককেশীয় অঞ্চলে একশ একশ, একশ পঁচিশ, একশ তিরিশ বছরের পুরুষ-মহিলা মাইলের পর মাইল ওরা হাঁটে। ওরা কি বলে জানো, বয়সের সঙ্গে যারা বুড়িয়ে যায় তাদের বলে বৃদ্ধ, আমরা হলাম দীর্ঘজীবী বৃদ্ধ নই। কফিতে চুমুক দিয়ে সমরেশ বলেন, বাহ্ একেবারে পারফেক্ট। নোভা যাবার পর দুতিন বার কফি বানিয়েছি, জানিস তিতকুটে স্বাদ হয়েছে। কুমু আমাকে একেবারে আনাড়ি বানিয়ে দিয়ে গেছে। নোভাআন্টির হিসেব করে রাখা তরকারি রয়েছে ফ্রিজে। স্বর্ণদীপ বলে, একটু আলু ভাজি করি সমুদা, গরম ভাতের সঙ্গে খাবে। বেশ তো, পরমুহূর্তে বলেন, খাব? সুুগার লেভেল বেড়ে যাবে না তো? একদিন খেলে কিছু হয় না, বরং স্বাদবদল হবে। দীপ দুশ্চিন্তামুক্ত করো। খুব হতাশ হয়ে সমরেশ বলেন, এইতো কত সহজ তুই লাঞ্চের ব্যবস্থা করে নিলি। তোর কুমু বউদি আমাকে একেবারে আনাড়ি আর অলস বানিয়ে রেখেছে। তুই তো এত কিছু জানিস দীপু, শুনেছিস হয়তো জার্মান জরাবিজ্ঞানী প্রফেসর হফেল্যা- বলেছেন, অলসরা কখনো দীর্ঘায়ু হয় না। টেবিলে ভাত-ডাল-সবজি-মাছের কারি সাজিয়ে দীপ বলে, ডোন্ট টক ননসেন্স সমুদা। তুমি ছিলে বিগ বস। বউদি কিভাবে একা সংসারের হাল ধরেছেন তো দেখেছি। সরাটা দুপুর দারুণ কাটল দীপের সঙ্গে। ওর সাথে গল্প করে একটু বেশিই খেয়ে নিয়েছেন। খেতে খেতে মনে হলো, ঠিক আগের জেনারেশনে আমরা ছিলাম শুধুই পুরুষ, বাইরের জগৎটা ছিল একমাত্র উপযুক্ত স্থান। অথচ স্বর্ণদীপ এ যুগের ছেলে, মেডিসিনের ডাক্তার কী চমৎকার ঝটপট রান্না করে নিল, অভেনে গরম করল ফ্রিজের তরকারি। দেখতে দেখতে সমরেশের মনে হয়েছে, রান্না করা এক ক্রিয়েটিভ আর্ট। রান্না এখন আর আগের মত রিজিড নয়। কত ফিউশন, জলপাই তেলে রাঁধা হয় পাবদা পনির, মধু দিয়ে চিকেন, আজ যেমন দীপ পাস্তা দিয়ে পায়েস রেঁধেছে, খেতে বেশ লেগেছে। যাবার সময় বলেছে, তোমার পালস, হার্টবিট, প্রেসার সবই নরমাল সমুদা। কাল তো নোভা চলে আসবে, টিভি দেখো, রেস্ট নাও। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, রিমোট হাতে নিয়ে টিভির স্ক্রিনের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন। নিজে অনুভব করেন তিনি ছিলেন অন্তর্মুখী এক মানুষ, দামি ব্লেজার গায়ে চড়িয়ে, দৃষ্টিনন্দন ড্রেস আপ করে বিদেশি ডেলিগেটসদের সঙ্গে মিটিং করেছেন। সাংসারিক কোনো ব্যাপার হয়তো কখনো কথা বলতে চেয়েছে কমলিনী গলার স্বরে বিরক্ত মেখে তিনি বলেছেন, শোকার এক প্রয়োজন নেই কুমু। প্রফেশন আর সংসার-দু’মেরুতে দু’জন দাঁড়িয়ে ছিলেন। বুক মন্থন করা নিঃশ্বাস ফেলেন তিনি। পর্দা সরিয়ে নিরুপমা এসে দাঁড়িয়েছে। কি গো সমুদা, ভালো আছ তো? সুমিত ওরা কালকেই আসছে তো? কাঁচা-পাকা চুল ওর, তবু চেহারায় এখনও মাখামাখি হয়ে আছে অদ্ভুত লাবণ্য। কাঁকনের ছেলেমেয়ে দু’টি ওকে জড়িয়ে ধরেছে। হাই দাদু, বলে হাত নাড়ে টাবলু। কলেজে পড়ে। দু’ কান থেকে দুটি তার ঝুলছে, হাতে আইপড। বাবলি বলছে-দিদার পাশে আমি শোব। বুড়ো ধাড়ি কোথাকার! কান থেকে তার খুলে, টাবলু বলে, কক্ষনো নয় বাবলি। আই অ্যাম জাস্ট এইটিন। নিরুপমা হাসছে। আরে বাবা, থাম থাম, আর জ্বালাস নে। দেখেছ আমার অবস্থা সমুদা। নিরুর কপট বিরক্তি আর নাতি-নাতনি পরিবেষ্টিত অভ্যস্ত জীবনে মায়াবী এক সম্মোহন রয়েছে। সমরেশ দেখতে পান, এক অন্যরকম দৃষ্টিনন্দন আনন্দময় এক ছবি। বুকের অতল গহ্বর করুণ নিঃশ্বাস পতন হয় তার। সকাল বেলা ঘুম ভাঙতেই মনে পড়ে, আজ বিকেলের দিকে সুমিত-নোভা ওরা ফিরবে, আবার চির অভ্যস্ত পারিবারিক কলরোলের মাঝে ডুবে থাকবেন। কথাটি ভেবে বুকের ভেতরটা ফুরফুরে হয়ে ওঠে। বিছানা থেকে উঠে জানালা-দরজা খুলে দিন। কানে ঝমঝম করে বেজে উঠে দৈনন্দিন জীবনের কলরোল। ফ্রিজে হাতে গড়া রুটি, পাউরুটি, ডিম, টকদই সবই মজু; আছে, ভাবনার কিছু নেই আজ ব্রেকফাস্টে গোটা ডিম দিয়ে ওমলেট খাবেন। দীপ বলেছে মাঝে মাঝে আম্মা, ডিমের কুসুম খেতে ক্ষতি নেই। নিজের ভাবনার মাঝে যখন বুঁদ হয়ে আছেন, তখনই পিউ পিউ করে পাখির গানে ডোর বেল বেজে ওঠে। কে এল এখন? দীপ কুহেলিকা না অন্য কেউ। দরজা খুলে অবাক। নিরুপমার মেয়ে নন্দিনী, বাহারি হাউসকোট পরে এসেছে। আংকেল, আপনার ব্রেকফাস্ট। স্নেহমাখা সুরে বলে, আমার সামনে বসে খেতে হবে। কালিতে আঁকা দুটি চোখ, নখে বেবি পিংক রঙের নেইল পালিশ। পলকে টরেন্টোতে থাকা মেয়ে সোনালির কথা মনে পড়ে যায়। হাতে গড়া চারটে ব্রাউন আটার রুটি, সবজি, স্কেওয়ার্সে গাঁথা পোড়া পোড়া চিকেনের টুকরো। ক্যাপসিকাম টম্যাটোর ও পেঁয়াজের টুকরোগুলো বাদামি রঙ ধরেছে। নোভা বউদি আজই চলে আসবেন তো? একা একা চারটে দিন চমৎকার কেটে গেল। কুহেলিকা, স্বর্ণদীপ, নন্দিনী রেখে গেছে মনকাড়া সৌরভ। তাই হয়তো মেন্টাল স্টেস, ডিপ্রেশন কিছুই ছুঁতে পারেনি সমরেশকে। দিনটা কেটে যায় শীতের শিরশিরে হাওয়া গায়ে মেখে। হেমন্ত চলে যাচ্ছে, শীত আসছে। কত পালাবদল প্রকৃতিতে, অবসর নেবার পর থেকে তার জীবন কেমন যেন ফিকে হয়ে এসেছে। একা একা থাকার এই চারদিন যেন কিছুটা অন্যরকম ছোঁয়া বর্ণময় হয়ে উঠেছে। কুহেলিকা, দীপ নন্দিনী-ছড়িয়ে দিয়ে গেছে রঙিন ভাবনা। ছেলে অফিসের কাজ নিয়ে, নোভা সংসারের ঊনকোটি কাজ নিয়ে ব্যস্ত, কমলিকা চলে যাবার পর থেকে সবার মাঝে থেকেও তিনি বড্ড একা। মিমো-রিমো নাতি দুটো ব্যস্ত থাকে কম্পিউটার ক্যাডবেরি, চিপস আর ক্যান্ডি নিয়ে, বয়স্ক মানুষের ছায়াও মাড়াতে চায় না ওরা। ছোড়দির ফোন এল। আজকে সন্ধ্যায় ওদের ছাড়িনি মমু, কাল সকালে ব্রেকফাস্ট করে চলে যাবে। কেমন ভাই। তোর অসুবিধে হবে না তোর আজকের রাতটা শুধু। মন খারপ তো নয়ই বরং আনন্দে, উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন সমরেশ। আজকের রাতটা একান্তই। তার নিজের মানুষের নিজস্ব কিছু সময়ের দরকার। অন্তরমহলে ভাবনারা মেঘের মতো এসে জড়ো হতে থাকে, খুব মনে পড়ে আজ মায়ের কথা। পুরুষ বলে, বড় চাকুরে বলে একদিন মনে হয়েছে মা, আমি তো সব পারি। এখন জানো নিরুপমা ওর মেয়ে কাঁকনের সংসারকে আঁকড়ে, নাতি-নাতনিদের মায়ায় জড়িযে অপূর্ব এক জীবন কাটাচ্ছে ও। বুকের গভীরে আত্মধিক্কার জাগে তার, পুরুষ হয়েছি বলে, মালটিন্যাশনাল কোম্পানির বিগ বস ছিলাম বলে গৌরবের কিছুই নেই মা, এখন তো আমি এক সংসার বিচ্ছিন্ন মানুষ। মেয়েরা সব পারে মা। বড়দি-ছোড়দি এখনও ওরা সংসারের কর্তব্য কর্মের সাথে সাথে সুখে-দুঃখে জড়িয়ে আছে, চারপাশের মানুষকে। দুধের সর, ঘন দুধের দই, মাছের নুড়ো কত যতœ করে খাইয়েছ আমাকে, কিন্তু মেয়েরা যে আমৃত্যু সচল থাকে আমরা কি তা পারি মা? নিরুপমার বয়সও তো কম হয় নি, রেঁধে বেড়ে, সামাজিকতা করে এখনও সচল রেখেছে জীবনকে। প্রন পালং রেঁধে, নতুন রেসিপি জেনে মেয়েরা সদাব্যস্ত থাকে। তাইতো ওদের জীবনে একাকিত্ব নেই, মা। গাঢ় অভিমানে বেশ ক বছর আগে চলে যাওয়া মাকে স্মরণ করে বলতে থাকেন, মেয়েরা সব পারে মা। যেমন তুমি পেরেছ, কুমু পেরেছে, যাকে অপার যতেœ-আদরে মাখন-ঘি-মধু ছানা খাইয়ে বড় করেছ, কই আমিতো কিছু করতে পারিনি। অবসর নেবার পর বলতে গেলে বিচ্ছিন্ন এক জীব ছাড়া কিছু নই। মৃদু ¯েœহ, কপট শাসন, রাগ-অভিমানের অপূর্ব এক সঞ্জীবনী সুধায় সংসারটাকে মায়াবী করে তুলতে পারো, তোমরাই মা। দুটি টোস্ট আর এক গ্লাস দুধে চুমুক দিতে থাকেন তিনি। এরপর রয়েছে প্রেসার-ডায়াবেটিসের ওষুধ। রাত বাড়ছে। টিভি অফ্ করে বিছানায় শুয়ে আওড়াতে থাকেন প্রিয় কবিতার পঙক্তি। ‘জুড়ালো যে দিনের দাহ, ফুরালো সব কাজ কাটল সারা দিন সামনে আসে বাক্যহারা স্বপ্ন ভরা রাত সকল কর্মহীন-
অন্ধকারে হাসেন সমরেশ। স্বপ্নভরা রাত কোথায়? বিছানা আর রান্নাঘরের বৃত্তে থাকা যে কমলিনীকে ভাবতেন-আজ তার মনের মাধুরীর আশুপনায় মহিমময়ী হয়ে উঠে সে। যা কোনোদিনও হয়নি, অন্ধকারে চোখ ভিজে যেতে থাকে। এতদিনের লালিত অহমিকাটুকু তার চুরচুর হয়ে যায়। নিরুদ্ধ আবেগ বলতে থাকেন রক্ত করবীর রঞ্জন আর নন্দিনীর মত প্রেম না হলেও আমি তোমাকে ভালোবাসি কুমু। শূন্য ঘরে নিজেকে বড় একা আর নিঃস্ব মনে হতে থাকে সমরেশের। হ