মাকিদ হায়দার
ঘুড়ি উৎসব
খোলা ছাদে ঘুড়ি উড়াইতে গিয়া
বিপদ হইল।
দুষ্টু ঘুড়ি আকাশে উড়িতে উড়িতে
কেন যে টাল খাইয়া
পাশের বাড়ির ছাদে গিয়া
শুইয়া পড়িল
তাহা বোধগম্য হইবার পূর্বেই
দেখিলাম,
পাশের বাড়ির
খালাম্মা ছাদে দাঁড়াইয়া আছেন।
পাড়ার সকলেই তাহাকে ভয় পাইলেও
আমি কখনই
ভয় পাই নাই।
ঘুড়ির খোঁজে ছাদে গিয়া শুনিতে পাইলাম,
পাশের বাড়ির খালাম্মা আমার ঘুড়িকে বলিতেছেন,
আমার খুব ইচ্ছা করে
আকাশে উড়িতে।
উড়িতে উড়িতে টাল খাইয়া যে কোনো
একদিন আবুল হোসেনের নতুন
ছাদে গিয়া পড়িয়া থাকিব।
আমার মায়ের মৃত্যুর ত্রিশ দিন পরে
বাবা আমকে ছাদে ঘুড়ি উড়াইতে না দিয়া
তিনি তাহার ঘুড়ির সুতোয়
মাঞ্জা দিতে দিতে আমাকে বলিলেন,
আগামীকাল হইতে ছাদে গিয়া ঘুড়ি উড়াইবা
সামনেই তোমার প্রবেশিকা
দিন কয়েক পরই দেখিলাম
বাবা দেখিতে অনেক সুন্দর হইয়াছেন।
অনেক উজ্জ্বল হইয়াছেন।
হাবীবুল্লাহ সিরাজী
শাদা মোজার খোঁজে ছিলাম
আসলে আমি একজোড়া শাদা মোজার খোঁজে ছিলাম
আগুন ধুয়ে যাচ্ছে জলে
আটকে আছে চর
আকাশ দিগম্বর
আমি একজোড়া শাদা মোজা খুঁজছিলাম
সুতো ছিঁড়ে গেলো কলে
ফসকে গেলো পাখি
ফুটপাথে রাখি
একজোড়া শাদা মোজা খুঁজছিলাম
আকার ঝুলে আছে ব’লে
বাজারে চতুর ফিতা
টানে বারবনিতা
শাদা মোজা খুঁজছিলাম
প্রয়োজন যে ঠান্ডার দখলে
ভাবনা টলছে পায়
আনাড়ি শঙ্কায়
আসলেই আমি একজোড়া শাদা মোজার খোঁজে ছিলাম
খালেদ হোসাইন
শহীদদের প্রতি
বিষয়টা নয়
কেবল ‘কথার কথা’র তো!
পারিনি হতে উত্তরসূরি
যথার্থ।
তোমাদের দান
তোমাদের প্রাণ
এখন এ দেশে কী পণ্য?
তোমাদের স্মৃতি
সব উদ্ধৃতি
বিপন্ন।
রক্তসাগরে ডেকেছিল বান
দুরন্ত
সোনালি স্বপ্ন দিকদিগন্তে
উড়ন্ত।
স্বপ্নগুলো ক্রমাগত আজ
নি®প্রাণ
কেননা আমরা করাই ওদের
বিষ পান।
দায়ী আমরাই
হাত কামড়াই
দানা খুঁটি নয়া
প্রভুর তো
কিছু মনে নাই
সব ভুলে যাই
স্মরণীয় সব
মুহূর্ত।
শামসেত তাবরেজী
সাদা-কালো পুঁতির মালা
সাদা-কালো পুঁতির মালা
একের মধ্যে দুই উজালা
হুমকি দিচ্ছে পড়বে ঝরে ধুলায়,
আমি নিরিখ বেন্ধেছি তায়
মরব কখন তারই চিতায়
এরপরও তার ছোবল কি-আর কুলায়?
পুঁতির মালা সাদা-কালো
ডানবাজুতে ঘর বানালো,
নেত্রকোণে অশ্রু হয়ে নিরীশ্বরে গুলায়।
মনে হচ্ছে নামিয়ে দিই
এক কোপেতে ডান হাতটিই
কালো-সাদার দ্বিধায় কান্দে নুলায়
আমি যাব রে কান্ চুলায়…
সোলয়মান আহসান
আত্মপক্ষ সমর্থনে
বলি দেখা হবে।
কোথায় হবে, কখোন হবে Ñ বলা হয় না।
দেখা হয় না। আমিও যাই না কোথাও।
কোথায় যাবো, সব দ্বারে কলিংবেলের সুইচ লাগানো।
অনুমতি নিতে হবে ভেতরে প্রবেশের।
কোথাও যাই না তাই।
আজকাল বড়ো বেশি একাকী হয়ে গেছিÑ বন্ধনহীন
মানুষের সমাজে বাস করেও মনে হয় আছি বনে
এমন বিজন বন, পশুদের পদছাপ খুঁজে পাওয়া ভার।
সোনালি দুপুর যায় বিকেলের খামারে
সন্ধ্যা হাঁটে রাতের তিমিরেÑ চাঁদ তার সাথী হয়
আকাশে জ¦লে তারকারা, জানান দেয়Ñ
জেগে আছি
জেগে আছি ওরে…
কোন মানব এসে দাঁড়ায় না পাশে, কাছাকাছি
বলে না Ñ সখি, কহ প্রেম Ñ কহ বিরহের গীত…
বলে না প্রণয়ের কোন চিরচেনা সংলাপ Ñ ভালবাসি ভালবাসি
নিদেন পক্ষে জীবনের কড়চা, জমা খরচেরÑ কি পেলাম,
কি পেলাম না;
চাঁদ আমায় ডাকে Ñ আয়
বুকের ভেতর রূপালি ¯্রােত ধায়
বলে Ñ আয় কাছে আয়…
বড়ো একাকী আছি এ রৌদ্র ঝলমলে শহরে
আমার খোঁজ রাখে না কোন স্বজন পাখি
আমিও পারি না ডাকতে আগের মতোÑ শালিক তুমি এসো
বিহঙ্গ তুমি এসো
কাক তুমি ঐ ডালে বসো
ডাকি না আজকাল কোনো নারী ও নিসর্গকেও
বলি না আমাকে নয় আমার কবিতাকে ভালবাস
কবিতার জন্য আমি পথহারা বিবাগী হয়েছি
কবিতার জন্য আমি গৃহ ও গৃহস্থ ছেড়েছি
কবিতার জন্য আমি নীল নয়না প্রেয়সী ও প্রেম ছেড়েছি
আমার কবিতাকে ভালবাসা দাও শুধু।
না, কোন ভালবাসার গল্প বলব না
জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে যাদের আমি নিয়েছি
তারাও হারিয়েছে আমার ঠিকানা
গৃহের আসবাবপত্রের মত আমি পড়ে আছি একা
অথচ একদা আমাকে নিঃশেষ করে
প্রতিটি মুহূর্তে বিলিয়েছি
তোমার সত্তার কাছে,
আজ দারুণ একাকী আমি
শূন্যতায় ভাসছি – ঊর্ধারোহণে
ছায়া ফেলে তোমার আকাশে ভাসছি।
দীলতাজ রহমান
অনুকাব্য
১
ঝরেই প্রমাণ হলো ফুটেছিলো ফুল!
না হলে ধারণামাত্র চিরদিন থেকে যেতো ভুল…
২
খুব বেশি ক্ষতি করোনি!
কিঞ্চিৎ আগুন শুধু দিয়েছো, খামারবাড়ির তুষে…
৩
অধিকার করে রেখেছো যেটুকু সেটুকু ফেরত আনিন!
রাখোনি যেটুকু, সেটুকুই করি ফেরি…
টোকন ঠাকুর
ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে
ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে কারা
তারা কি শুধুই ভিক্ষুক?
ভিক্ষায় কী এত সুখ?
কানোকালে, প্রেমিক ছিল কী না, এরা?
কিম্বা যে ভিখারিনী, একদিন প্রেমিকা ছিল না?
বিছানায় বালিশের পাশে রেখে দিয়েছ তরুণ কবির কাব্য সংকলন
তুমি ঘুমিয়ে পড়লেই, তোমার পাশের লোকটিও শুনবে না
কবিতার মধ্যে শব্দ টু শব্দ, বাক্য টু বাক্য বাড়ি-বাড়ি
হাঁক দিতে গিয়েও কোনো শব্দ না করে কেন চলে যাচ্ছে
নৈঃশব্দের ভেতর দিয়ে ছদ্মবেশী ভিক্ষুকেরা!
কবিতা লেখা যায় কিনা
তাদের নিয়ে, আমি তা জানি না আমি তা জানি না।
শোয়াইব জিবরান
ধুলোর গাথা
চাকার উপর ক্লান্ত শুয়ে ছিল পথ
চাকা ঘুরাতে ঘুরাতে পথ ফিরছিল বাড়ি।
পথের উপর ছিলাম সামান্য পথিক
ছুটে আসা অশ্বখুর, ধুলো, শত্রুর হল্লা
শব্দ গুণতে গুণতে বিপন্ন অস্থির।
যারা ছিল ঘরে ঘরে পিতা পুত্র মাতা
তারা তুলেছে হাহাকার, ছুটেছে চৌদিকে
রাজা ছিলেন সুরাঘুমে তিনি গেছেন বনে
আর আমি সামান্য শব্দশিকারি
শত্রুর ধুলো গুণে সন্তান করেছি প্রসব
তারা আজ ধুলোর উত্তরাধিকারী।
আলমগীর রেজা চৌধুরী
ঝুলে আছে ঊর্ণনাভ
ঝুলে আছে ঊর্ণনাভ, পীতবর্ণ বিকেলে ছাইরঙ ফসিল।
বিবর্ণ দিগন্তরেখায় হলুদ আভা। এখানে
আকাশ নেই, বাতাসের পাখিরা ভ্রমর গুঞ্জন শেষে
ঘুমিয়ে গেছে। মধ্যদুপুরের সুনসান নীরবতা। শুধু
তুমি ঝুলে আছো। উল্টোভাবে চামচিকে সদৃশ্য।
মুখের কষে শুকিয়ে আছে রক্ত জড়ানো বমি।
টিকটিকির মতোন তোমার শুধু লেজ গজায়নি। তুমি
ঝুলে আছো। পটোলচেরা অক্ষিদ্বয় কোটরাচ্যুত।
নির্মিলিত। পচনের পূর্বে ধ্যানস্থ’ অবলোকন।
কাঠবিড়ালির করুণ আর্তনাত। দানবীয় তান্ডবে
ছিন্নভিন্ন আসবাব। তোমার চৌত্রিশ বক্ষবন্ধনী ঝুলে আছে
ভজনালয়ের গম্বুজে। যেন আলেকজান্দ্রিয়ার চূড়ায়-
উড়ছে মানবতার ব্যঙ্গ নিশান ।
ঝুলে আছে ঊর্ণনাভ, মধ্যপ্রহরে ঘৃণার বিষবাষ্প,
চৌচির অন্তর, প্রেমহীন ধর্ষিত পৃথিবীতে নীলাভ্র
আকাশ। নীলকণ্ঠ গরলে ঘৃণার রশিতে তুমি ঝুলে আছো।
আহারে মাতৃকুল, মমতাহীন পৃথিবী জুড়ে শুধু যন্ত্রণার এপিটাফ।
পৃথ্বীশ চক্রবর্ত্তী
মাঠ-মেঘ
মাঠ বলে, ওহে মেঘ চেয়ে দেখো
দিন দিন কেন যেন রুক্ষ-শুষ্ক হয়ে যাচ্ছি আমি
ফেটে হচ্ছি চির চির, বেড়ে যাচ্ছে জলের তিয়াস
অনাবাদি হয়ে যাচ্ছে মাটি
বহুদিন পাইনি তো লাঙ্গলের ফলার আরাম
ভুলে যাচ্ছি, একদম ফসল উৎপাদনের স্বাদ।
আকাশের বুক দিয়ে শাদা-কালো মেঘ
হেঁটে যেতে যেতে বলে ‘ও’ মাঠ বলো না আর
ক’টা দিন একটু অপেক্ষা করো
তারপর বৃষ্টি হয়ে নেমে এসে ভালো করে ভিজাবো তোমাকে
ঘুচে দেব জলের পিপাসা, মুছে দেব সকল ফাটল
চিন্তা করো না। কৃষক তোমাকে আবার
আগের মতোই করবে আবাদ
সবুজে উঠবে ভরে তোমার শরীর।
দ্বীপ্ত হৃদ মতিন
আমি জমা রেখেছি
আমি ইথারের কাছে জমা রেখেছি
আমার হৃদয়ের যত সুর
তুমি দরদি মনে শুনে নিও।
আমি ফুলের কাছে জমা রেখেছি
আমার মনের যত রং
তুমি আঁখি ভরে দেখে নিও।
বাতাসের কাছে জমা রেখেছি
আমার যত সুরভি
তুমি জানালা খুলে দিও।
আমি চাঁদের কাছে জমা রেখেছি
আমার মনের যত কথা
তুমি রুপালি পত্র পড়ে নিও।
আমি বৃষ্টির কাছে জমা রেখেছি
আমার যত অশ্রু
বর্ষণের করুণ সুরের মাঝে
তুমি আমাকে খুঁজে পাবে।
ওমর বিশ্বাস
ধ্রুবতারা
আকাশের বুকে তারা হয়ে জ্বলে আছ তুমি
জোছনার ছাদে দেখি প্রতিদিন ওই মুখ
আমি হতে চাই সারারাত ধরে মিটিমিটি জ্বলা
তোমার চোখের ধ্রুবতারা, সুখ।
দেখব তোমায় আপন ছায়ায়
নিচে নেমে আসো আরো নিচে এই চোখের ভেতর
আলোর দ্যুতিতে রাখি চোখ আমি
চোখ থেকে চোখে ঢুকে যায় যত চোখের তারারা
জানি সে তো ওই তোমারি চোখের শীতল মমতা।
কেন চলে যাও দূর,
দূর থেকে দূরে বহুদূর তবু
পিছে ফিরে আর তাকাবে না বুঝি
আকাশ মেঘলা হলে বুঝি আর পাব না তোমায়
বড় ভয় হয়
তা কি করে হয়!
কি করে কাটাবে বলো একমুঠো বেলা
নিঃসঙ্গতায়, বড় নিঃস্বরে নিঃস্বতা নিয়ে
নিজেকে ঢাকবে আঁধারের কালো পর্দার আড়ালে
দু’চোখের তারা জেগে থাকবে কি এ দু’চোখ ছাড়া!
চাই ওঠো রোজ হৃদয় আকাশে
জ্বলজ্বলে প্রেম ভোরের পাপড়ি ছড়ানো আমার অহমিকা
নেমে আসো তুমি ওই তারা ভরা শরীরের ঘ্রাণ ছুঁয়ে
তুমিই আমার হৃদয়ের প্রেম তুমিই প্রেমিকা।
চন্দনকৃষ্ণ পাল
প্রিয় চাঁদ, প্রিয় জোছনা মালতী
আঁধার ক্রমশ বিস্ফোরিত হচ্ছে আর
আমি নিজেকে হারাচ্ছি সেই ভয়াল অন্ধকারের নিñিদ্র দেয়ালে-
এ এক ল্যাপটানো সময়ের কথা,
শুধুই অশুভ তার ডানা মেলছে চরাচর জুড়ে
যেনো সবকিছু তারই সীমানায়
লুকোনো থাকবে আজীবন…
ডুবতে ডুবতে যেই নাকের ওপর জলবিন্দু রাখে হাত
তখনই একটু দেখি রূপোর ঝলক
তুমি উজ্জ্বল চোখ রাখো গাঢ় অন্ধকারে ….
প্রিয় চাঁদ আমার, প্রিয় জোছনা মালতী
নিঃশ্বাস ফিরিয়ে দেবার জন্য ধন্যবাদ তোমায়।
শিকদার ওয়ালিউজ্জামান
এক একটি দিন সরে যায়
এক একটি দিন সরে যায়
ক্রমশ সঙ্কুচিত হতে থাকে নদীর আয়ু; সৌরবছর
রোজগেরে মানুষের হিসেবি খাতায় শ্রমজীবী ট্রেন-
পেরিয়ে যায় অগণিত জংশন
পাখিদের ডানায় দুপুর পুড়ে শাদা মেঘ ধোঁয়া হয়ে যায়।
আর্য প্রেমিক হাত বাড়ালেই অনার্যার উদরে
পাপের ভ্রণ বাড়তে থাকে
নয়টি সংখ্যার মায়া ক্ষয়ী আসনে বসে শূন্য শূন্য খেলে
আমাদের প্রিয় কাশফুল
রোদের ধারালো নখে রক্ত ঝরায়!
নাহিদা আশরাফী
তেরোই বৈশাখ
নিয়তির জন্য একটা লাল পেড়ে শাড়ি কেনার স্বপ্ন
সেই চৈত্র সংক্রান্তির রাত থেকে।
বৈশাখে এক কৌটো সিঁদুর দিয়েছিলো,
এরপর উলেখ করার মতন কোন উপঢৌকন
কখনই কেনা হয়নি নিয়তির জন্য।
জ্যৈষ্ঠের রাক্ষুসে আগুন মতিলালের দিনগুলো
সেই কবেই পুড়িয়ে ছাই করেছে।
হৃদয়খানাও বাদ রাখেনি।
পাথুরে পথের ধার ঘেঁষে যেমন চিলতে সবুজ জাগে,
মতিলালের পোড়া মন জমিনেও
তেমনি এক স্বপ্ন বেঁচে থাকে- একটা লাল পেড়ে শাড়ি।
চৈত্র থেকে বৈশাখ
বৈশাখ থেকে চৈত্র- বারো মাস কেটেছে।
বারো বছরও বার তিনেক এসে ফিরে গেছে।
তবু কেনা হয়নি বারো হাত লাল পেড়ে শাড়ি।
আশ্বাসে কাটানো দিন,
বিশ্বাসে বাড়ানো ঋণ,
হতাশার বাড়ন্ত গতি,
সব মেনেছে নিয়তি- তবু আশা ছাড়েনি।
নিশ্চিত বিশ্বাসে মেনেছে, মতিলাল একদিন ঠিক
একটা লাল পেড়ে শাড়ি এনে দেবে তাকে।
অবশেষে শাড়ি এলো।
বারোর বেড়াজাল ছিন্ন করলো মতিলাল।
কেনা হলো কাক্সিক্ষত শাড়িটি।
শুধু শাড়ির পাড় আর আঁচল থেকে লাল রঙ ঝরে গেল,
মতিলালের জীবন আর নিয়তির সিঁদুরের মতন।
দিনটি ছিলো তেরোই বৈশাখ।
সাগর শরিফুজ্জামান
কজমোপলিটন-প্রতিদিন-প্রতিরাত
ফুটপাথ-এভিন্যু-ফ্লাইওভার-মার্কেট-হোটেল-বার-শপিংমল-কর্পোরেট ভবন,
ফ্ল্যাট-এপার্টমেন্ট-ইংলিশ মিডিয়াম-কিন্ডারগার্টেন-স্কুল-ইউনিভার্সিটি।
জ্ঞান ও সম্মান আছে, আছে ডেভিড কার্ড-সুতরাং আছে আরাম ও আয়েশ।
আর সারা রাত অসংখ্য লাল-নীল আলো আছে এই কজমোপলিটন শহরের।
সোফার তলায় অথবা কিচেন রুমের করিডোরে, অন্ধকারে তবুও আছে এক জীব-
এক আদিম ইঁদুর-একদম অভ্যস্ত অহোরাত্রির এই শহুরে সঙ্কীর্ণ লাইফস্টাইলে
ম্যাডামের হুকুমে কাজের ছেমড়ি তাই মুদির দোকানে গিয়ে আনে ইঁদুরের বিষ।
মেয়েটার গায়ে পোড়া আছে; আঙুলে সেলাইয়ের দাগ আছে; পিঠের চামড়ায় আছে
ম্যাডামের আঙুলের দাগ। আরো আছে সাহেবের কামড়ের দাগ ওর দুধের বোঁটায়।
নিরুপায় আজ সে, জানা নেই পালানোর পথ-তাই ভাগ বসাতেই হয় ইঁদুরের বিষে।
আর পরদিন এই অখ্যাত গ্রামীণ বালিকা খুব পরিচিতি পায় দৈনিকের প্রথম পাতায়।
অঞ্জন শরীফ
শীতল সমীকরণ
কনকনে থাবায় এখন আর কাবু হয় না পৃথিবী
সয়ে গেছে সব নিদারুণ আচরণ
জেনেছে বারংবার ঠান্ডা হাওয়ার শীতল সমীকরণ
খোলেনি তো জট ঘোচেনি তো কালের ব্যবধান
সারাটা সময় যেনো কুয়াশার ঘোমটাপরা বধূ
ঘোমটার ফাঁকে চেয়ে আছে অসংখ্য হায়েনার চোখ
পরীযায়ী পাখিরা কি সব বার্তা নিয়ে আসে
বোঝা যায় না কিছুই
বুঝতে গেলেই নিজেই শীতল হয়ে যায় পৃথিবী।
রেদওয়ানুল হক
খোঁড়াখুঁড়ি
পৃথিবীর বহু পথ খুঁড়লাম
বহু শিলাপাথর
আলো-অন্ধকার
শুধু তোমাকেই খুঁড়তে পারলাম না
খুঁড়তে গিয়ে বারবার পিছলে পড়ি
লজ্জার শ্যাওলায়।
২.
কাকে ভালোবাসবো বলো
কেউ কি ভালোবাসা বোঝে?
শুধু আসে আর যায় নদীর ঢেউ হয়ে
পাড়ে পড়ে থাকে পাড়ের খড়কুটো
ফেনাল দুঃখবোধ।
৩.
হৃদয় বুনে যদি হৃদয় পেতাম
তবে আর তোমাকে হারাতে চাইতাম না
এক সমুদ্র মেঘ হয়ে বলতাম :
ভালো আছি-বেশ ভালো আছি।
সোহেল মাহবুব
শব্দ
ঘরে রঙ করে আর কী হবে-
দেয়ালে পাপের মানচিত্র এঁকেছে খেঁকশিয়াল
অহেতুক হুঙ্কারে মাতিয়েছে বাগান বাড়ি
টেক্কার টরে-টক্কায় এলোমেলো রোদের প্রজাপতি
ছায়ার ভেতরে বাস! অবশেষে গলা টিপে
ধরে নদীর মৃত্যু নিশ্চিত করে
মাতাল কাচ নিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে
অশুভ জন্ম ঠেকানোর চেষ্টা আর কত?
ট্রেনের বগিতে কত না নতুন শব্দ
এগুলো গড়িয়ে আসে অন্ধকারে
ঘড়ির কাঁটার মত।
ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দে-
কারো কারো চৈতন্য ভাঙে…
কাচ ভাঙলে শব্দ হয় না, নির্জনতা ভাঙলে বিকট শব্দ
তোমার শ্রাবণের জল মাড়িয়ে চৈত্রের ঘুড়ি উড়বে যেদিন
সেদিনই হবে আমাদের জন্ম উৎসব
নাগর হান্নান
বৃষ্টি
বহুদিন ধরে
বৃষ্টিতে ভেজা হয় না
গা থেকে রোদের পারফিউম
ধুয়ে যাবে বলে।
সুপ্রিয় আকাশ :
তুমি একটু মেঘাচ্ছন্ন হও
ধবধবে সাদা পায়রার মতো নেমে এসো
আমাদের নিজস্ব উঠুনে
আজ বড়ো বেশি সখ্য গড়বো
কলাপাতা রং চির সবুজের সাথে
তোমার কাছে সকাতর নিবেদন
একটু নেমে এসো নেমে এসো…
কামরুন নাহার কুহেলী
নিদ্রাহীন রাত
নিদ্রাহীন রাত্রিগুলোতে রোদ মাখিয়ে
প্রতিটি খাঁজ খুলে দেখি-
খন্ড খন্ড করে খুলে রাখি-
ভাঙাচোরা গেরস্থালি।
যতেœ গড়া ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নকশা।
পালকের ফাঁকে ফাঁকে গড়া
জলের আলাপন শুনি;
নেড়েচেড়ে দেখি-
ইচ্ছা-অনিচ্ছাই ফোটা ফুল;
গোপন দেরাজ খুলে গোপনে পোড়া ক্ষত দেখি
দ্বিধাহীন।
কিছু অভিমান, কিছু দ্বিধা
জেব্রা দাগ কেটে যায়। আর
নিশ্চুপ নিঃসঙ্গতা জেগে থাকে
মাছের চোখ মেলে।
ভেজা প্রেম নিয়ে সবুজ ঘাতক নেমে আসে
বাতাসের সিঁড়ি বেয়ে।