২০১২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রয়াত প্রখ্যাত কথাকার সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ছিলেন সাম্প্রতিককালের বাংলা কথাসাহিত্যের এক উজ্জ্বল, উল্লেখ্য ও স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। ১৯৩০ সালের ১৪ অক্টোবর মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমার খোশবাসপুর গ্রামের এক শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা সৈয়দ আব্দুর রহমান ফেরদৌসী (১৯০৪-২০০৬) এবং মা এম. আনোয়ারা বেগম (১৯১১-১৯৩৮) উভয়েই ছিলেন সাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী। তাঁরা দু’জনেই সাহিত্য চর্চা করতেন। বিশ শতকের তিরিশের দশকে কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রবাসী, ভারতবর্ষ, সওগাত, মোহাম্মদী, গুলিস্তাঁ, নবনূর, সোলতান, মানসী, মোসলেম ভারত, নওরোজ, বিচিত্রা, বঙ্গলক্ষ্মী প্রভৃতি অজস্র পত্রপত্রিকায় তাঁদের লেখা কবিতা, গজল, গল্প, প্রবন্ধ, রম্যরচনা ইত্যাদি প্রকাশিত হতো। এবং সে-সময়ে প্রশংসাও অর্জন করেন। ‘আত্মকথা’ শীর্ষক এক দীর্ঘ রচনার সিরাজ বলেছেন :
ফেরদৌসী দম্পতির এই সাহিত্যনিষ্ঠা তাঁদের প্রথম সন্তানের (অর্থাৎ সিরাজের) মস্তিষ্কে দাঁত বসাতে দেরি করেনি। বাবা ছিলেন বিস্ময়কর ভাবে আধুনিক রুচির মানুষ। আধুনিকতম সাহিত্য শিল্প আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল অব্যাহত। এই পরিবারটির নামে ডাকঘরে তখনতকার তাবৎ পত্রপত্রিকা আসতো। বাবার সংগ্রহ ছিল অসামান্য। অজপাড়াগাঁয়ে কলকাতার নগর সংস্কৃতি গিয়ে এক আশ্চর্য উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল। সেখানেই আমার জন্ম এবং মানসিক বিকাশ।
তাঁর ফলেই হয়তো বা মাত্র ন-বছর বয়সে সিরাজের সাহিত্যচর্চার শুরু। কবিতার মধ্যে দিয়ে প্রথম সাহিত্যচর্চা শুরু করে মধ্য যৌবনে গিয়ে তিনি গল্প-উপন্যাস ইত্যাদি লিখতে থাকেন।
২.
মানুষ-জীবন-ইতিহাস-প্রকৃতি ও সময় নিয়ে সিরাজের মধ্যে অজস্র কথা জমে উঠেছিলা এবং ক্রমশ গদ্যে তার প্রকাশ ঘটতে থাকে। আশৈশব কবিতার মধ্য দিয়েই তিনি তাঁর সমূহ কথা, অনুভূতি তুলে ধরেছেন, এবারে তার কিছুটা যেন ব্যতিক্রম ঘটলো। সিরাজের নিজের কথায় :
প্রথম যৌবন পর্যন্ত নিত্যনৈমিত্তিক জৈবপ্রক্রিয়ার মতো অনর্গল কবিতা লিখতাম, সে ছিল কতকটা আত্মক্ষরণের মতোই। এটা একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছিল। ছাপতে দিতাম না, অথচ লিখতাম। পরে বুঝলাম, আমার অভিজ্ঞতা, আমার বলার কথা আর অনুভূতি মালার বাহন হিসেবে কবিতাকে খুঁজে নেবার সাধ্যি নেই। নেহাৎ বোঝার চেষ্টায় যে, আমি সত্যি কবিতা লিখতে পারছি কি না, কিছু কবিতা সঙ্কোচে প্রথমে শহরের লিটল ম্যাগাজিনে পরে সাহস করে কলকাতার কাগজে পাঠাই। এভাবে কয়েক ডজন কবিতা ছাপা হয়ে আমাকে অবাক করে দিয়েছিল। শেষ কবিতা ছাপা হয়েছিল ‘দেশ’-এ, উনিশশো পঞ্চাশের সেপ্টেম্বরে। কবিতাটির নাম ‘শেষ অভিসার’। তারপর থেকে কবিতা ছাপতে দিইনি, দু-একটি বাদে। কারণ আগেই বলেছি, নিজের জানা ও বলার কথটিকে অন্য কাঠামোয় প্রকাশের একটা চাপ অনুভব করেছিলাম, তাই গল্প লিখতে শুরু করি।
সময়টা ১৯৫৮। গ্রামের বাড়িতে বসেই সিরাজ গল্প লেখা শুরু করেন। উল্লেখ্য যে, তার আগে ১৯৫৬-৫৭ সালের দিকেই তিনি প্রাইভেটে গ্র্যাজুয়েশনটা সম্পূর্ণ করেন।
১৯৫৮তে বহরমপুর থেকে প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটির মাসিক মুখপত্র ‘সুপ্রভাত’ পত্রিকায় সিরাজের প্রথম গল্প ‘কাঁচি’ প্রকাশিত হয় ‘ইবলিশ’ ছদ্মনামে। গল্পটি শহরের সাহিত্যানুরাগী পাঠকদের মধ্যে বেশ সাড়া জাগায়। তবে পত্রিকার পাতায় মফস্বল পাঠকদের অনেক চিঠি বেরোয়। এসব চিঠিতে পাঠকেরা লেখেন, গল্পকার অত্যন্ত শক্তিমান, কিন্তু ইবলিশ ছদ্মনাম কেন? ‘ইবলিশ’ মানে তো শয়তান। শেষ পর্যন্ত লেখক পত্রিকার পাতায় তাঁর বক্তব্য লেখেন। ‘কুতুবপুরের প্রেতিনী’ ও ‘মিঞাপন্ডিত’ নামে আরো দু’টি গল্প পরবর্তী দু’টি সংখ্যায় সিরাজ ওই ‘ইবলিশ’ ছদ্মনামেই প্রকাশ করেন।
এ সময়ই বহরমপুরের ‘কালান্তর’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকায় ‘ইবলিশ’ ছদ্মনামে ‘ভূচর’ এবং ‘বীথিকা’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকায় ‘হিজলের ডাক পুরুষ’ নামে একটি গল্প এবং বহরমপুরের ‘সংকেত’-এ ‘হিজলবিলের গর্ভিনীরা’ ‘ইবলিশ’ ছদ্মনামেই তিনি লেখেন। তা ছাড়া, এ-সময়ে কান্দি থেকে প্রকাশিত ‘বোধিদ্রম’ পত্রিকায়ও দু’টি গল্প সিরাজ লেখেন ‘ইবলিশ’ নামেই।
এরপর ১৯৫৯ সালে কলকাতার দৈনিক ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার রবিবাসরীয় পাতায় প্রকাশিত হয় তাঁর স্বনামেই একটি গল্প। গল্পের নাম ‘একটি রক্তগোলাপের গল্প’। এ-সময়ে তিনি একটি উপন্যাস শুরু করেন। উপন্যাসের নাম- ‘চন্ডালিকার চন্ডাল’। দিনে ও রাত্রে জেগে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের ফসল পাহারা দেয় যারা, তাদের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ‘জাগাল’। এই জাগালদের সুখ-দুঃখ-যন্ত্রণা-ভালোবাসা নিয়েই সিরাজের এই উপন্যাস। উপন্যাসটি ‘কিংবদন্তীর নায়ক’ নামে চার-পাঁচ খানা উপন্যাস প্রকাশের পরে কলকাতার এক প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬০ সালে কলকাতার ‘বিংশ শতাব্দী’ পত্রিকায় ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত হয় দু’টি ছোটগল্প ‘হিজলকন্যা’ ও ‘হিজলবিলের রাখালেরা’। ‘হিজলকন্যা’ নামে পরবর্তী সময়ে একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। ‘হিজলকন্যা’ নামে প্রকাশিত ছোটগল্পের সঙ্গে এই উপন্যাসের বিষয়বস্তুগত কোনো মিল নেই। উপন্যাসের বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ পৃথক।
১৯৬২তে কলকাতায় বিমল করের নেতৃত্বে ‘ছোটগল্পে নতুন রীতি’ নিয়ে পঞ্চাশের দশকের গল্পকারদের মধ্যে বেশ আলোড়ন চলছে। এ-সময়ে লালমোহন দাসের সম্পাদনায় ‘ছোটগল্প’ নামে একটি ছোটগল্প পত্রিকা প্রকাশিত হলো। প্রতি সংখ্যায় লিখছেন- দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শংকর চট্টোপাধ্যায়, কৃতি চট্টোপাধ্যায়, মতি নন্দী, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, দিবেন্দু পালিত, রতন ভট্টাচার্য, অমলেন্দু চক্রবর্তী, যশোদাজীবন ভট্টাচার্য প্রমুখ- এঁরা। সিরাজ সে-সময়ে গ্রামে। নতুন রীতির ছোটগল্প সম্পর্কে তখনও অভ্যস্ত না হয়েও না হয়েও ‘তরঙ্গিণীর চোখ’ নামে একটি ছোটগল্প পাঠালেন ‘ছোটগল্প’ পত্রিকায়। ছাপা হয়ে গেল। লেখক নতুন-নতুন বিষয়বস্তু। সম্পাদক আবার গল্প পাঠানোর জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। এবারে শারদীয় ‘ছোটগল্প’তে প্রকাশিত হলো সিরাজের বিখ্যাত ও সার্থক গল্প-‘ইন্তি, পিসি ও ঘাটবাবু’। এই গল্পে ‘ইন্তি হলো শ্রেয় ও প্রেয়ের প্রতীক। ঘাটবাবু হচ্ছে আটপৌরে সত্তাটি, যে প্রকৃতির দিকে ফিরে চাইছে শান্তির জন্য। কিন্তু পারছে না। তার সাধন শ্রেয় ও প্রেয়কে নিয়ে সে প্রকৃতির উৎসে চলে যাবে, যেখানে দ্বন্দ্ব নেই।’
সে-সময়ে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ক্রমান্বয়ে দু’টি গল্প প্রকাশিত হয় ‘বাবলতলির মাঠ পেরিয়ে’, ও ‘একটি সোনালি শামুক’। দু’টি গল্পই সে-সময়ে সাড়া জাগিয়েছিল।
১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষের সময় সিরাজ গ্রামে বসেই সাপ্তাহিক ‘অমৃত’ পত্রিকায় গল্প লিখলেন- ‘সীমান্ত থেকে ফেরা’। গল্পটিতে নেফা ও লাদাখ সীমান্তের বরফাচ্ছাদিত পরিবেশ এবং সেই পরিবেশে সীমান্ত যুদ্ধের নানান ঘটনা-এমন নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছিল, যাতে মনে হয়েছিল লেখক যেন সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সে- সময়ে এই গল্পটিকে কেন্দ্র করে পত্রিকায় প্রচুর সংখ্যক পাঠকের চিঠি প্রকাশিত হয়েছিল।
এর কিছুদিন পরই সিরাজের একটি বিখ্যাত গল্প ‘ভালোবাসা ও ডাউন ট্রেন’ প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায়। এই গল্পে বিশ্বাস ও নিশ্চয়তা, নিঃশ্বাস ও শূন্যতা মিলিয়ে গড়ে উঠেছে বর্ষাস্নাত পরিত্যক্ত প্রায় এটি স্টেশন এবং পলায়ন তৎপর প্রেমিক-প্রেমিকা। গল্প সামান্যই, দু’টি নর-নারীর আসক্তি, পাপবোধ ও ভয়- এছাড়া কিছু নেই। ‘আস্তে আস্তে ডাউন ট্রেনের সময় নিকটবর্তী। যেন বা স্পষ্টতর ছিল তার ধ্বনি দূরে, যেন বা আমার বোধে স্পন্দিত… নরকে… নরকে থেকে নরকে। আমি ভয় পেলাম, গভীর প্রগাঢ় ভয়। ঘৃণা আমার ভালোবাসাকে।’
এই সব গল্প প্রকাশের পর পশ্চিম বাংলার কলকাতাসহ বিভিন্ন জেলায় অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিন থেকে গল্প পাঠানোর অনুরোধ আসতে থাকে। দুই হাতে গল্প লিখতে থাকেন সিরাজ। আর লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে পাঠাতে থাকেন।
কলকাতার কিছু শুভাকাক্সক্ষী মানুষের ক্রমান্বয় আমন্ত্রণ উপেক্ষা করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ১৯৬৪ সালে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ সাহিত্যের আকর্ষণে কলকাতা চলে যান। এবং কলকাতায় ওঠেন সে-সময়ের শক্তিমান তরুণ কবি শেখ আব্দুল জব্বারের বাসায়। জব্বার থাকতেন রাণী রাসমণি রোডের সন্নিকটস্থ ধুকুড়িয়া বাগান লেনে। এবং সে-সময়ে ‘পরিচয়’, ‘চতুষ্কোণ’ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রগতিশীল পত্রপত্রিকায় কবিতা লিখে যথেষ্ট পরিচিত ও প্রশংসা অর্জন করেন।
তাঁর অনুজ কনিষ্ঠ ভ্রাতা বর্তমান লেখকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু জব্বারের আহ্বানেই মূলত সিরাজ কলকাতায় যান। কিন্তু তার ক-দিনের মধ্যেই কলকাতায় শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এলাকাটা তেমন নিরাপদ ছিল না বলেই প্রাণ হাতে করে সিরাজ ফিরে আসেন নিজের গ্রামে। এবং কিছুদিন পরে কলকাতা আবার শান্ত হলে তিনি পুনরায় ফিরে যান। এ-সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পটভূমিকায় ‘অগ্নিবলয়’ নামে একটি আশ্চর্য সুন্দর গল্প তিনি লেখেন। দানবিকতা, পৈশাচিকতা ও সাম্প্রাদিয়কতা-ই যে শেষ সত্য নয়, তার পাশাপাশি রয়ে গেছে মানবিকতা, প্রীতি, প্রেম ও ভালোবাসা সেই শাশ্বত ও চিরন্তর সত্যকেই নানান ঘটনার মধ্য দিয়ে অত্যন্ত যুক্তিনিষ্ঠভাবে গল্পকার সিরাজই গল্পে তুলে ধরেন। সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ও সম্প্রীতিমূলক ওই গল্পটি সে-সময়ে ‘চতুষ্কোণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে আশ্চর্য সাড়া জাগিয়েছিল।
সিরাজের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ পরিচিত শুভাকাক্সক্ষী অগ্রজপ্রতিম শান্তিরঞ্জন দা-সে-সময়ের রাজ্য সমবায় বিভাগের যুগ্ম-নিয়ামক শান্তিরঞ্জন ভট্টাচার্য, রাজ্য সমবায় ইউনিয়নের মুখপত্র ‘ভাস্কর’-এ সে-সময়ে সম্পাদনার চাকরিতে সিরাজকে ঢুকিয়ে দেন।
বছর কয়েক এই চাকরি করার পর সাহিত্যচর্চায় ব্যাঘাত ঘটার কারণে এ-চাকরি সিরাজ ছেড়ে দেন। লেখার ওপর নির্ভর করেই সে-সময়ে সিরাজকে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়েছে। অথচ ইতোমধ্যেই মুর্শিদাবাদ থেকে ফ্যামিলি নিয়ে এসেছেন। এবং বাসাও নিয়েছেন এন্টালি এলাকার ক্যান্টোফার লেনে। পরবর্তী সময়ে অবশ্য তিনি বাসা বদল করেছিলেন গোরাচাঁদ রোডের ৩৭ নং বাড়িতে এবং আমৃত্যু সেখানেই তিনি থাকতেন।
সাপ্তাহিক ‘অমৃতৎ’ পত্রিকায় এ-সময়ে ধারাবাহিকভাবে সিরাজের উপন্যাস প্রকাশ করেছিলেন কবি মণীন্দ্র রায়। তবে বস্তুত লিটল ম্যাগাজিনই সিরাজকে আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে-একথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তিনি ছিলেন লিটল ম্যাগাজিনেরই লেখক। ১৯৬৬-তে লিটল ম্যাগাজিন ‘অয়ন’-এ প্রকাশিত হয় সিরাজের ‘নীলঘরের নটী’ উপন্যাসখানি। এবং সে উপন্যাস ‘নবপত্র প্রকাশন’-এর প্রসূন বসু গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন।
আলকাপের দল নিয়ে মেলায় দিন-রাত্রি যাপনের সময় বিভিন্ন সার্কাস দলের মানুষ-জনের আলাপ-পরিচয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই ‘নীলঘরের নটী’ উপন্যাসখানি সিরাজ লিখেছিলেন। এই প্রথম উপন্যাসটি প্রকাশের পর বাজারে বেশ চলে, সে কারণে অন্যান্য প্রকাশকদেরও সিরাজ সম্পর্কে আগ্রহ জাগে। ১৯৬৬তে সিরাজের আরো দুটো উপন্যাস ‘পিঞ্জর সোহাগিনী’ ‘আসমানতারা’ প্রকাশিত হয়। ‘পিঞ্জর সোহাগিনী’তে এক গ্রাম্য অভিজাত মুসলিম মহিলার ব্যথা-বেদনা, দুঃখ-যন্ত্রণাকে অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে এ উপন্যাসে বিবৃত করা হয়েছে। অপর পক্ষে, ‘আসমানতারা’ একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। ‘আসমানতারা’ লিখতে গিয়ে সিরাজ সচেতনভাবে ইতিহাসকে ‘জবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ’ করতে চেয়েছেন। তবু এই উপন্যাসে তিনি ‘হিন্দু-মুসলিম ধর্ম সমন্বয়’ ও ‘ভালোবাসার জয়’- এই দু’টি ব্যাপার দেখাতে চেয়েছেন। এক সাক্ষাৎকারে সিরাজ বলেছিলেন, আজমশাহের কন্যা আসমানতারা রাজা গণেশের প্রণয়াসক্ত হলে সমাজের প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল, এই উপন্যাসে তা দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘ধর্ম ও রাজনীতি প্রেমকে হত্যা করে’। ইতিহাস ও সমাজ ছাপিয়ে হৃদয়ের কান্নাতেই তিনি ‘আসমানতারা’য় ফুটিয়ে তুলেছেন।
১৯৬৭তে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় সিরাজের ‘নিশিলতা’ ও ‘হিজলকন্যা’ উপন্যাস দু’টি। রাণীছকের রুদ্রদেবের মেলায় পটভূমিতে ‘নিশিলতা’ উপন্যাসটি রচিত। বিনোদিনী এক পানওয়ালি। অন্যান্য বিক্রেতার মতো সেও মেলায় আসে পান বিক্রি করতে। এটাই তার পেশা। শারীরিক অসমর্থতার কারণে এবারে মেলায় সঙ্গে এনেছে সদ্য যুবতী ভাইজি নিশিলতাকে। গোবরা সমাজবিরোধী, খুনি, জুয়াড়ি। লোকে তাকে ভয় করে। তবু সেই গোবরা, সুদর্শন মস্তান গোবরা অন্তরে ভালোবাসার কাঙাল। তাই তার ঘরে ভোজারি ও বাঁশি এক সঙ্গেই থাকে। মন খারাপ হলে বাঁশি বাজায়। কিন্তু নিশিলতা তার কাছে এলে সে যেন কেমন হয়ে যায়। মনে মনে গোবরা মস্তানি, খুন, লাম্পট্য-সব ছেড়ে দিতে চায়। সে নিজেকে ভাবে- ‘অন্ধকারের মানুষ’। কিন্তু নিশিলতা বলে, ‘অন্ধকার আমার ভালো লাগে’। সেই গোবরা একদিন খুন হয়ে যায়। মেলার সবাই স্বস্তি পায়। কিন্তু নিশি এক বুক যন্ত্রণা ও অস্থিরতা নিয়ে কান্নায় মাতাল হয়। নিশি জানে, গোবরা বাইরে যতই ভয়ঙ্কর থান না কেন, তার মধ্যে ছিল এক অশান্ত প্রেমিক। সিরাজ এই উপন্যাসে নিশিলতার যন্ত্রণা ও নিঃসঙ্গতা অত্যন্ত মমতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
‘হিজলকন্যা’ উপন্যাসেও সিরাজ কান্দি মহকুমার হিজল অঞ্চলের তিন কন্যাÑ রাহেলা, ফুলি ও চুমকির যন্ত্রণা ও নিঃসঙ্গতাকে আশ্চর্য সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘হিজলকন্যা’ বিশেষ অর্থে ‘সাহসিনী’ বোঝায়। লেখকের দেখা কদর আলির মা-র ছায়া আছে রাহেলার মধ্যে। জমির অধিকার বজায় রাখতে বলে, ‘শালোদের মাথা চেঁছে রাজবাড়ি পাঠিয়ে দে।’ গোরা সাহেব তাকে বলে ‘ব্রেভ মাদার’। এই রাহেলাকে বড়ো বাড়ির ছেলে আব্বাস ভালোবেসেছিল, কিন্তু বংশ মর্যাদার কারণে বিয়ে হয়নি। রাহেলা একাকিত্বের নির্মম শিকার হয়। ‘রাহেলা চিরজীবন অন্ধকারে হেঁটে হেঁটে বুড়ি হয়ে গেল।’
আর ফজল সেখের মেয়ে কুলি। এদেশে ইংরেজ কোম্পানি ব্যবসা শুরু করেছে। মোরেল ব্রাদার্সের প্রতিনিধি যুবক রবার্ট মোরেল ফুলিকে ভালোবেসে ফেলে তার দুরন্তপনার জন্য। কিন্তু এক দাঙ্গার সময় ফুলি তার অজান্তে রবার্টকে হত্যা করে ফেলে। তারপরই তার করুণ আর্তি- ‘গোরা সায়ের কেনে তুমাকে আমি মারলাম?’ অতঃপর দুঃসহ যন্ত্রণা ও নিঃসঙ্গতা নিয়ে ফুলি জঙ্গলে কোথায় হারিয়ে গেছে।
বেদের মেয়ে চুমকি ভালোবাসে আকাশ। অথচ চুমকির সঙ্গে আকাশের মেলামেশা করা কারো পছন্দ নয়। চুমকি আকাশকে বশীভূত করার চেষ্টা করে। গন্ধলতার শেকড় শুঁকে দু’জনেই বিহ্বল হয়ে পড়ে এবং চুমকির শরীরের রহস্যে আকাশ মুগ্ধ হয়। ফলে বড় বাড়ির মেয়েকে আকাশ বিয়ে করেনি। অন্য দিকে গ্রামে পন্ডিত হিসেবে পরিচিত আবেদ আলি কথা রাখতে, ঘরে স্ত্রী বানু থাকলেও বড় বাড়ির মেয়েকে বিয়ে করতে যায়। আর আত্মহত্যা করে। রাঢ়ের মাটি নিয়ে লড়াইয়ে অস্ত্র ও লাঠির আঘাতে যতো রক্তপাত ঘটেছে, ভালোবাসার জন্য, নিঃসঙ্গতার জন্য তার চেয়ে যে কম রক্ত ও অশ্রুপাত ঘটেনিÑসিরাজ ‘হিজলকন্যা’ উপন্যাসে তারই সার্থক সাক্ষ্য উপস্থাপিত করেছেন।
১৯৬৮ সালে সিরাজের ‘প্রেমের প্রথম পাঠ’ উপন্যাসখানি ‘হরফ প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত হয়। একজন যুবতীকে কেন্দ্র করে তিনজন কিশোর ও একজন যুবকের মধ্যে যে রোমাঞ্চকর প্রেমের ঘূর্ণাবর্তের সৃষ্টি হয়, তারই বাস্তব রূপায়ণ ঘটেছে এই উপভোগ্য উপন্যাসে।
১৯৬৯ সালে সিরাজের ‘কিংবদন্তির নায়ক’ ও ‘বন্যা-উপন্যাস দু’টি প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ‘কথাশিল্প’ ও ‘বেঙ্গল পাবলিশার্স’ থেকে। ‘কিংবদন্তীর নায়ক’ উপন্যাসখানি সিরাজের প্রথম লেখা উপন্যাস। সম্ভবত ১৯৫৯-৬০ এ গ্রামের বাড়িতে বসে একটু একটু করে দীর্ঘ সময় ধরে লেখা এই উপন্যাসখানি রাঢ়-বাংলার গ্রামাঞ্চলের দিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেতের পাহারাদার, যারা আঞ্চলিকভাবে ‘জাগাল’ নামে পরিচিত তাদের সুখ-দুঃখ, ব্যথা- বেদনা-ভালোবাসা নিয়েই এই উপন্যাস-পূর্বেই এ-সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। সিরাজের এই প্রথম উপন্যাসে কথাকার তারাশঙ্করের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। সিরাজ এই উপন্যাসখানি প্রথমে লিখলেও গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন অনেক বছর পর। ‘বন্যা’ উপন্যাসের নায়িকা লীলা, ছেলেবেলা থেকেই সে বুনো। যেন প্রকৃতির কোলেই সে বেড়ে উঠতে চেয়েছে। রূপপুরের এই বন্য মেয়ের বিয়ের পর কিছুটা শান্ত হয়ে যায়। স্বামী সত্যর বন্ধু সুখেনের স্পর্শ তার কাছে-‘যেন বা বন্যার জলের মতো,- কিছুটা আঁশটে গন্ধে ভরা, হয়তো বা তেমনি ঘোলাটে।’
সুখেনের সঙ্গে ক্রমে লীলার অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। স্বামী সত্যর সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। সত্য চলে যায় নিজের গ্রামে এবং তার জীবনে আবির্ভাব ঘটে যমুনার। যমুনার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। এবং যমুনা সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা যায়। লীলার ধাত্রী বাসিনী যমুনার সন্তানকে লালন পালন করতে থাকে। লীলা সুখেনের সঙ্গে শহরে চলে যায়। এবং দু’জনে বিয়ে করা স্থির করে। এ সময়ে লীলা জানতে পারে, সুখেন বিবাহিত এবং একাধিক মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। লীলা যেন বন্যার আবর্তে ঘুরতে থাকে। অবশেষে রূপপুরে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে লীলা চলে যায় গ্রামে ও প্রকৃতির মাঝে শান্তি খুঁজে পেতে। সিরাজের উপলব্ধি- ‘আমাদের প্রকৃতির কাছে ফিরে না গেলে উদ্ধার নেই। … প্রকৃতির থেকে যে যত দূরে যাবে ততই তার সর্বনাশ’ লীলার জীবনে সত্য হয়েই প্রতিভাত হয়েছে।
সিরাজ তাঁর আত্মকথায় বলেছেন :
আমাদের গাঁয়ের কিছু দূরে যে নদী, তার নাম দ্বারকা। গাঁয়ের পশ্চিমে বিমাল ধাপবন্দী মায়ের পর এই নদীর দুই ধারে অববাহিকায় তখন ছিল বিশাল জলা আর দিগন্ত বিস্তৃত খড়ের বন যাকে তৃণভূমি বলা যায়। কাশকুশ ব্যানার জঙ্গল, কোথাও বাবলা হিজল ভাঁট বুনোজাম শেয়াকুল ভাঁড়–লে গায়ের জটলা, মাঝে মাঝে বিল। এলাকার অনেক মানুষ এই তৃণভূমি কুড়িয়েই জীবনধারণ করত। … এই তৃণভূমি নিয়ে পরে উপন্যাসও লিখেছি একই নামে।
১৯৭০ সালে সিরাজ ‘তৃণভূমি’ উপন্যাস প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় রূপরেখা প্রকাশনী থেকে। পরে ১৯৯৬ সালে ওই ‘তৃণভূমি’ উপন্যাস প্রকাশিত হয় করুণা প্রকাশনী থেকে। তারাশঙ্কর ও বিভূতিভূষণ সিরাজকে নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। সিরাজের আঞ্চলিক উপন্যাসগুলিতে তারাশঙ্করের মতো রাঢ় বাংলার মাটি ও মানুষের সুখ-দুঃখ-যন্ত্রণা প্রভাব ফেলেছে। আবার বিভূতিভূষণের প্রকৃতি প্রেম ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা সিরাজকে করে তুলেছে প্রকৃতি ও মানুষের রূপকার। সিরাজের ‘তৃণভূমি’ উপন্যাসের পটভূমি মুর্শিদাবাদের কান্দি মহকুমার দ্বারকা নদী তীরবর্তী দিগন্ত বিস্তৃত খড়ের বন- যাকে সিরাজ তৃণভূমি বলেছেন। যে আদিম বন্যতা, চিরায়ত সবুজ প্রকৃতি সিরাজের অন্বিষ্ট, তাকে এই ‘তৃণভূমি’র মধে সিরাজ রূপ দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিককালের রাজনৈতিক দুর্যোগের পটভূমিতে চাষিদের রাজনৈতিক অধিকারের লড়াই শুরু হলো, চাষ-আবাদের পাশাপাশি ফার্ম গড়ে উঠেছে, তা নিয়ে মালিক-শ্রমিকের সংঘাত ইত্যাদি অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে সিরাজ তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি ‘তৃণভূমি’র আদিনাথ, নিশানাথ, রাখাল কবিরাজ, চন্দনা, সীতা, শুভেন্দু, পরাশর, ঝুমরি, তোরাপ, সৌমেন ইত্যাদি চরিত্রসমূহের সুখ-দুঃখ-কষ্ট দেখিয়েছেন। এইসব মানুষ সিরাজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফসল।
‘তৃণভূমি’ উপন্যাসের নায়ক নিশানাথ। জমিদার আদিনাথের সন্তান হলেও সে প্রকৃতির মধ্যেই বড় হয়েছে। তাই সে খুঁজে বেড়ায়- ‘দিগন্তে দিগন্তে ঘন নীল কুয়াশায় তখনও জমে আছে পৃথিবীর অশেষ রহস্য।’
নিশানাথের মা অগ্নিদগ্ধা হলে বাবা আদিনাথ সরযূকে বিয়ে করেন। সরযূকে নিশানাথ শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু বাবার প্রতি তার কোনো শ্রদ্ধা নেই। বাবা ছিলেন লম্পট ও পরনারী আসক্ত। রাখাল কবিরাজের মৃত্যুর পর তার বিধবা পতœী চন্দনাকে বারবার কুপ্রস্তাব দেন এবং চন্দনাকে পেতে আত্মম্মান ত্যাগ করে চন্দনার ঘরে ছুটে যান। ফলে পুত্র নিশানাথের সঙ্গে সংঘাত বাধে। আর বাবাকে হত্যা করতে যাওয়ার অপরাধে সরযূ নিশানথকে চাবুক দিয়ে আঘাত করে। লজ্জায় ও অপমানে আদিনাথ আত্মহত্যা করেন। নিশানাথ গৃহত্যাগ করে চাষাভুষোদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেখানে ক্রমে সে প্রকৃতিকে অনুভব করে। এবং মাটির মানুষ হয়ে ওঠে। তাই চন্দনার ঘরে মাঝরাতে যেতে পারে। চিড়ে ফলা করতে পারে। আবার তাকেই আলিঙ্গন করতে পারে। কিন্তু নিশানাথ ভালোবাসে অরুন্ধতীকে। চন্দনা ও সীতা নিশানাথের অনুরাগিনী হয়েও ব্যর্থ হয়। আর নিশানাথ অরুন্ধীকে ভালোবেসে অন্য সকলের ভালোবাসাকে অস্বীকার করে। অথচ তার ভালোবাসাও সফল হয় না। তাই নিশানাথ বলতে পারে- ‘ভালোবাসার জন্যই হয়তো মানুষকে বারবার জন্মাতে হয়।’ এই ভালোবাসাকে পাথেয় করে অনেক রক্ত-অশ্রু ও ব্যর্থতার গ্লানি উপেক্ষা করেও নিশানাথ কোনোভাবে হতাশ বা বিষণœ নয়। সে আগামী উজ্জ্বল প্রভাতের জন্য প্রতীক্ষা করে এবং ‘শুধু ভাবে, যেতে হবে, তাকে যেতে হবে অন্য কোনোখানে।’
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের অন্যান্য উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘এখন অন্ধকার’ (১৯৭১), ‘সবুজ ‘নক্ষত্র’ (১৯৭১), ‘নিষিদ্ধ প্রান্তর’ (১৯৭১), ‘উত্তর জাহ্নবী’ (১৯৭৪), ‘মা নিষাদ’ (১৯৭৪), আনন্দ মেলা’ (১৯৭৬), ‘নিলয় না জানি’, (১৯৭৬), ‘তোমার বসন্ত দিনে’ (১৯৭৬), ‘কৃষ্ণা বাড়ি ফেরেনি’ (১৯৭৯), ‘অমৃত ছিল না’ (১৯৭৯), ‘সংশপ্তক’ (১৯৮০), ‘স্বপ্নের মত’ (১৯৮০), ‘আগুনের চারপাশে’ (১৯৮০), ‘নির্জন গঙ্গা’ (১৯৮০), ‘রোড সাহেব’ (১৯৮১), ‘নদীর মতন’ (১৯৮৪), ‘বাসস্থান’ (১৯৮৫), ‘তখন কুয়াশা ছিল’ (১৯৮৫), ‘বসন্ততৃষা’ (১৯৮৬), ‘পাবন’ (১৯৮৭), ‘হেমন্তের বর্ণমালা’ (১৯৮৮), ‘অমৃত প্রেমকথা’ (১৯৮৮), ‘অলীক মানুষ’ (১৯৮৮), ‘জানমারি’ (১৯৮৯), ‘নিষিদ্ধ অরণ্য’ (১৯৮৯), ‘রেশমীর আত্মচরিত’ (১৯৯০), ‘বেদবতী’ (১৯৯২), ‘স্বর্ণচাঁপার উপাখ্যান’ (১৯৯৫), ‘প্রেমের নিষাদ’ (২০০০), ‘স্রোতে ভেসে আসি’ (২০০৫) প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখ্য।
সত্তর দশকের প্রথম দিকে প্রকাশিত উপন্যাসÑ ‘এখন অন্ধকার’। সিরাজ তাঁর এ উপন্যাসে ৩৪ নং জাতীয় সড়কের দু-পাশের মানুষ-জন, তাদের জীবন-যাপন, ঘটনাপ্রবাহ এসবই রূপায়িত করেনে। ‘সংশপ্তক’ উপন্যাসের নায়ক একজন বিপ্লবী-নাম ধ্রুব। সে চেয়েছিল বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বর্তমানের জীর্ণ সমাজব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করতে। কিন্তু তার সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। পুলিশের নির্মম অত্যাচারে বন্দিজীবনে তার পা পঙ্গু হয়েছে এবং ফুসফুস ও হার্ট হয়েছে অকেজো। তবু ধ্রুব হতাশ হয়নি, তার মনোবল বজায় আছে। তার অসীম শক্তির উৎস মাটির নিচে আগেই লুকিয়ে রাখা রিভলবার সে খুঁজে ফেরে।
এরকমই এক সংগ্রামী মনোভাবের পরিচয় মেলে সিরাজের ‘নদীর মতন’ উপন্যাসে। এই উপন্যাসে একটি নদী-দ্বারকা। এই নদীর এপারে ফুলশেখর এবং ওপারে বিপ্রশেখর গ্রাম। ফুলশেখর গ্রামের মহিলা পঞ্চায়েত প্রধান, গ্রামের মানুষের কাছে ‘পঞ্চাত দিদি’ হিসেবেই পরিচিত। আজীবন সে এই গ্রামের মানুষদের আপনজন ভেবেছে, তাদের সুখে দুঃখে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বামী-সংসারের পিছুটান সে ছেড়ে এসেছে, ছেড়েছে সন্তানের স্বপ্ন। তবু গ্রাম্য রাজনীতি, রেষারেষি, লোভ ইত্যাদির কারণে সেই ‘পঞ্চাত দিদি কে আকস্মিকভাবে তীরবিদ্ধ হতে হয়েছে-কিন্তু তার মনোবল ভেঙে যায়নি। হাসপাতালের বেডে শুয়ে তাই ‘পঞ্চাতদিদি’ তার স্বামীকে বলে- ‘তুমি আমার ওপর রাগ করো না। আমি ফুলশেখর ছেড়ে কোথাও গিয়ে থাকতে পারবো না। … মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে খালি আমার মনে কী হয়, জানো? বেঁচে থাকার আনন্দগুলো চারপাশে এতো ছড়ানো ছিল, কিন্তু নিতে জানিনি। এবার দু’হাত ভরে আনন্দ কুড়োবার দিন এলো।’
তখন কুয়াশা ছিল’- আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশিত সিরাজের একটি উপন্যাস। এই উপন্যাসে আমরা পাই একটি গ্রাম্য সরল ছেলেকে-যার সরলতা ও লাজুকতার সুযোগে যাকে ব্যবহার করতো, ফাই-ফরমাস করতো। অথচ তার উপর একটি মেয়ের দায়িত্ব অর্পিত হলে তার পরিবর্তন ঘটে। তার পৌরুষ জেগে ওঠে। সে সাহসী হয়ে ওঠে।
‘বসন্ততৃষা’ সিরাজের আর একটি উপন্যাস। ‘তখন কুয়াশা ছিল’ উপন্যাসের সেই গ্রাম্য সরল ছেলেটির সঙ্গে আমরা ‘বসন্ততৃষা’ উপন্যাসের বেন্দার কিছুটা সাযুজ্য খুঁজে পাই। বেন্দা অলস ও কর্মহীন-মাসীর কাছে থাকে ও খায়। আকস্মিকভাবে সে একদা গ্রামের বোষ্টমী হরিমতীকে দেখে শরীরী ক্ষুধায় পীড়িত হয়। এবং সহায়হীন, সমাপ্ত প্রায় যৌবনা হরিমতীও বেন্দাকে এক রাশ স্নেহ ও ভালোবাসায় আঁকড়ে ধরে। তার ফলে বেন্দারও পরিবর্তন ঘটে। সে সাহসী, পরিশ্রমী সংসারীও হয়ে ওঠে। বয়সে বড়ো অন্ধ হরিমতীকে সেও ভালোবাসে ফেলে। এবং বলে-‘আমার মা বলতেও তুমি, বউ বলতেও তুমি। আর এই সংসারে আমার আছেটা কে?’ ‘হেমন্তের বর্ণমালা’ উপন্যাসে সিরাজ শহর থেকে অনেক দূরের গ্রামবাংলার দুঃসহ পরিস্থিতি ও দুরবস্থার কথা সম্যকভাবে তুলে ধরেছেন। বিজ্ঞানের অতীব উন্নতির যুগে শহর যখন আলোকে আলোকময়, সে-সময়ে অসংখ্য গ্রাম অন্ধকারে ভরে আসে। শিক্ষা, খাদ্য-বস্ত্রের অভাবে গ্রামের মানুষ মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলে। আবার, চিকিৎসার অভাবে হেমন্তের পাতার মতো অকালে ঝরে যায়। ‘হেমন্তের বর্ণমালা’য় এই সব গ্রামীণ মানুষদের দুঃখ, যন্ত্রণা, ব্যথা-বেদনা আশ্চর্যভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ‘কৃষ্ণা বাড়ি ফেরেনি’- একটি জ্বলন্ত সমস্যাকেন্দ্রিক উপন্যাস। বর্তমান সময়ের একটি আশ্চর্য দলিলরূপে উপন্যাসটিক উল্লেখ করা যায়। এই উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র দু’টি স্কুলশিক্ষক ননী ও তার অবিবাহিতা বোন কৃষ্ণা। ননীও অবিবাহিত, কিন্তু সে ভালোবাসে মানু নাম্নী এক মহিলাকে। কৃষ্ণা ততোটা সুশ্রী নয় বলে কৃষ্ণার বিয়ের ব্যাপারে ননীর যতো ভাবনা। ফলে নিজেও বিয়ে করতে পারে না। এমতাবস্থায় একদিন সহসাই কৃষ্ণা নিখোঁজ হয়ে যায়। সারা রাত্রি তার কোনো খোঁজ মেলে না, পরদিন সকালে কৃষ্ণার মৃতদেহ মেলে। বোঝা যায় ধর্ষণের পর কৃষ্ণাকে খুন করা হয়েছে। বোনের এভাবে মৃত্যু ননীকে প্রচন্ডভাবে বিহ্বল করে দেয়। সে প্রকৃত খুনির খোঁজ করতে থাকে এবং অবশেষে জানতে পারে, মানুর ভাই জন কৃষ্ণার খুনি ও ধর্ষণকারী। ননীর কাছে জীবন বিম্বাদ হয়ে ওঠে। তবু কোনো এক সময় মানুর প্রেম ও ভালোবাসা দিয়েই ননীর জীবনকে বাঁচিয়ে তুলতে পারে। প্রেম ও ভালোবাসাই সিরাজের ‘কৃষ্ণ বাড়ি ফেরেনি’ উপন্যাসের মূল উপজীব্য বিষয়, যা মানুষকে সুন্দর করে, মহান করে, আবার জীবনকেও উজ্জীবিত করে।
সিরাজের ‘অলীক মানুষ’ বাংলা সাহিত্যের একটি উজ্জ্বল ও অনন্য উপন্যাস। উনিশ ও বিশ শতকের পটভূমিতে এক পরীর পরিবারের লৌকিক-অলৌকিক কাহিনী এই উপন্যাসের উপজীব্য। লেখক সিরাজ নিজেই বলেছেন :
আসলে ‘অলীক মানুষ’ বলতে আমি বুঝিয়েছি ‘মিথিক্যাল ম্যান’। রক্তমাংসের মানুষকে কেন্দ্র করে যে মিথ গড়ে ওঠে- সেই মিথই এক সময় মানুষের প্রকৃত বাস্তবসত্তাকে নিজের কাছেই অস্পষ্ট এবং অর্থহীন করে তোলে। ব্যক্তিজীবনের এই ট্র্যাজেডি ‘অলীক মানুষ’ এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। … এই আখ্যানে শুধুমাত্র দুটি-ই চরিত্র-ধর্মগুরু বদিউজ্জামান এবং তার নাস্তিক, এনার্কিস্ট ও বিদ্রোহী পুত্র শফিউজ্জামান।..
সিরাজ আরো বলেছেন :
‘অলীক মানুষ’ রচনাও আমি তেমন কিছুই করিনি। এ যাবৎকাল জীবনে যা কিছু পড়েছি বা জেনেছি, সেই অবিন্যস্ত অভিজ্ঞতাকেই বিশৃঙ্খলভাবে ব্যবহার করেছি। এতে শিল্প কতটা হয়েছে জানি না, তবে আমি স্বেচ্ছাচারিতার আনন্দ পেয়েছি।
তবু এ কথা অবশ্যই স্মরণযোগ্য সে, ‘অলীক মানুষ’ উপন্যাসে সিরাজের সমাজচেতনা, ইতিহাস চেতনা ও পান্ডিত্যের যে অসামান্য পরিচয় মেলে, তাতে পাঠক হিসেবে মুগ্ধ ও অভিভূত না হয়ে পারা যায় না। তা ছাড়া, এ উপন্যাসে সিরাজের ভাষা হয়ে উঠেছে আশ্চর্য চিত্রকল্পের দ্যোতনায় মনোমুগ্ধকর। যদিও কাহিনীপাঠের তৃষ্ণা মেটাবার মতো নিটোল গল্প এ-উপন্যাসে নেই। তবু এ এক উন্মোচন, যা নিশ্চিতভাবে আলোকিত করে পাঠকদের। টুকরো টুকরো কোলাজ মিলে যেন সৃষ্টি হয়েছে এক অপরূপ চিত্রলিপি। ‘অলীক মানুষ’ এক মহৎ সৃষ্টি- অস্বীকার করার নয়।
৩.
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন- ‘আমার নিজের মনে হয় যে, ছোটগল্পকার হিসেবে যতটা সার্থক হয়েছি, উপন্যাসে ততটা দিতে পারিনি। প্রবন্ধ লিখেছি এক ধরনের দায় থেকে।’ এ কথা অবশ্যই সত্যি যে, ছোটগল্পকার হিসেবে সিরাজ পাঠকদের একটা আলাদা মনোযোগ ও সম্ভ্রমের দাবি রাখেন। তিনি অসংখ্য গল্প লিখেছেন, সেগুলি বৈচিত্র্যের দিক থেকে বিস্ময়কর। ফলে সিরাজ ছোটগল্পের জগতে এক অনন্য প্রতিবার দীপ্তি নিয়ে একক ও নিঃসঙ্গ।
সিরাজের গোত্রান্তর চিহ্নিতকরণে সহজেই সংশয়াতীত হওয়া সম্ভব। সিরাজ সম্পূর্ণভাবে স্বাশ্রয়ী। তাঁর ভাষাচর্চা ও অনুশীলন স্বীয় ব্যক্তিত্বের মৌলিক ভূখন্ডকে আশ্রয় করেছে। সিরাজের মানুষ-মৃত্তিকা মুহূর্তের চরিত্র আলাদা। সে প্রকৃতি ও যে মানুষরা তাঁর গল্পে ভিড় করে আসে, তাদের সঙ্গে অতি আর্য অতি সংস্কৃতি প্রসাধিত ভাষার আন্তঃবিরোধ আছে। বরং তাঁর গতিশীল আপাত-অযতœ সম্ভব ভাষা হিজল বাংলার প্রাণরূপকে উজ্জীবিত করার ঢের বেশি উপযোগী। আজকাল সাহিত্য ক্ষেত্রে ডায়ালেক্টের বহুল ব্যবহার দেখা যায়। সিরাজ এ-ব্যাপারেও বিশেষ সফল। অবশ্য সৃষ্টির ব্যাপারে সিরাজ গান্ধারীর মতো প্রবল সামর্থ্য সম্পন্ন এবং ক্লান্তিহীন। নানা রসের গল্প, নানা চরিত্রের ও পটভূমির গল্প তিনি লিখেছেন। তা ছাড়া, লেখার অন্যান্য দিকগুলোর মতো তিনি ভাষা ব্যবহারেও ছিলেন অত্যন্ত অস্থিরচিত্ত। নিরীক্ষামুখীন তাঁর গল্পের রাজ্যে ভাষারা বড় বেশি যাতায়াত করে। তবে তাঁর গল্পের প্রধান প্রবাহ গ্রামবাংলাকে নিয়ে, ভাষাও গ্রাম বাংলার।
‘বৃষ্টিতে দাবানল’ একটি একটি ভিন্ন ধরনের গল্প। বিষয়বস্তুগত ভাবে এ-গল্পের মধ্যে তেমন কিছুটা নতুনত্ব থাকলেও ভাষাগত সংযম এ গল্পকে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে। এ-গল্প একজন কামার্ত পুরুষে গল্প। নারাং বনকাপামি বাউরিপাড়ার একজন ক্ষেতমজুর। এখানে ক’দিন ধরেই চলছে টিপ্ টিপ্ করে বৃষ্টি, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘গাজোল’। এই গাজোলে নারাং এর মনে এক ধরনের আলস্য ভাব, এবং একটা নিঃসঙ্গতা বোধ জেগে ওঠে। আর এই নিঃসঙ্গতা বোধ থেকে তার মনে একটা দেগজ কামও জাগে। সে সময় নারাং গ্রামের দাই সরলাই দেখা পেয়ে যায়- যে সলা নামেই পরিচিত। এই সল্লা নিজেকে ‘ছাই ফেতে ভাঙা কুলো’ অথবা ‘জাড়ের রেতে এক মালসা আগুন, ভাবে। এবং শরীর সম্পর্কে তার কোনো কৃপণতা নেই। বড়ো সরল ও লাজুক নারাং, তবু সল্লাকে সে ধরে। সল্লা কিন্তু তাকে দেখে হাসতে থাকে। এবং এক ধাক্কা মারে। কামার্ত নারাং কাদায় পড়ে যায়। সল্লা পালিয়ে যায়। নারাং নিঃসঙ্গতা ও শরীরী ক্ষুধা নিয়ে ঘুরে মরে। শেষ পর্যন্ত সে সল্লার বাড়ি যায়। দেখে, তার মেয়ে জ্যোৎস্না চৌকাঠে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বিষ্টি দেখছে। সল্লা কানে কম শোনে- ‘ঠসী’ আর তার মেয়ে বোবা। তবে দলদলে চেহারা, বড়ো বড়ো চোখ, শাড়ি আঁচল চেবায় অথবা বুড়ো আঙুল চোষে, এবং কষায় অনর্গল লালা ঝরে। নারাং তার সঙ্গে কথা বলে, মেয়েটা হাসে শুধু। নারাং এরপর বোবা মেয়েটিকে ভোগ করে ও পালিয়ে যায়। কিন্তু সল্লা থানায় এসে নারাং-এর নামে ডায়েরি করে এবং নারাং ধরা পড়ে। পুলিশের কাছে প্রচন্ড পিটুনি খেয়ে নারাং-এর নামে ডায়েরি করে এবং নারাং ধরা পড়ে। পুলিশের কাছে প্রচন্ড পিটুনি খেয়ে নারাং হাজতের ফাঁকা ঘরে পড়ে থাকে উপুড় হয়ে। ভাবে, ‘শরীল বিষম গারার। হায় শরীল!’
‘কালবীজৎ’ এক নারীর অনন্ত যৌবনে পিপাসার গল্প। এই গল্পের কুসুম বয়সের মূল্য দিয়ে এই অভিজ্ঞতা লাভ করেছে যে, যৌবন ক্ষুধা অনিঃশেষ, কিন্তু অজেয় সময়ের শত্রুতায় ভোগ বাসনা অতৃপ্ত বয়ে যায়। এই গল্পের নিসর্গ চিত্রাঙ্গন অত্যন্ত জীবন্ত। হিজল প্রান্তরের সজীব বাকপ্রতিমা রচনার সিরাজের অনায়াস সিদ্ধি এই গল্পে বিশেষ ভাবে লক্ষণীয়।
সিরাজের ‘কীটনাশক মহৌষধ’ একটি ভালো গল্প। যৌবন যন্ত্রণার কীট একমাত্র বয়সের মহৌষধই নাশ করতে পারে। গল্পটির বক্তব্য এই। গল্পটি বেশ ঝরঝরে, মনকে টেনে নিয়ে যায়।
মা ও সন্তানের বিচ্ছিন্নতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরস্পরের কাছে যে কী দুঃসহ বেদনাদায়ক ব্যাপার, সে ব্যাপারটাই আশ্চর্য কুশলতায় সিরাজ রূপায়িত করেছেন তাঁর ‘হরবোলা ছেলেটা’ গল্পে। এই গল্পে সাদেরালির বৌ এক সময় দেড় বছরের শিশু সন্তানকে স্বামীর কাছে ফেলে রেখে সুলেমান ঠিকাদারের সঙ্গে ঘর ছাড়ে। দেড় বছরের সেই শিশুসন্তান এখন দশ বছরের বালক। তাকে সবাই বলে ‘হরবোলা ছেলে।’ কারণ, ‘ছেলেটা পাখপাখালি আর জন্তু জানোয়ারের ডাক নকল করতে পারে।’ কখনো ঘুঘুর ডাক ডাকে, আবার কখনো বেড়ালের ঝগড়া অথবা কুকুর-শেয়ালের ডাক ডাকতে পারে। ছেলেটা আগে খোঁড়া বাপ সাদেরালির সঙ্গে এক সঙ্গেই ভিক্ষে করতো, এখন বাপ-ছেলে আলাদাভাবে ভিক্ষে করতে বেরোয়। বিভিন্ন গ্রামে যায়। বাপ সাদেরালির নির্দেশ-ছেলে নাদেরালি কখনো যেন কাঁকরগড়া গ্রামে ভিক্ষে করতে না যায়। কিন্তু বাপের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ছেলেটা একদিন কাঁকরগড়া যায় এবং মার দেখা পায়। মা তাকে তার স্নেহ স্পর্শ মাখানো দুটো টাকা দেয়। সাদেরালি ছেলের প্যান্টের পকেটে সেই দুই টাকার নোটটা দেখতে পায় এবং সন্দেহ করে, নিশ্চয় ছেলে কাঁকরগড়া গেছিল। সে ছেলেকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে, কাঁকরগড়ার একটা মেয়েমানুষ তাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে টাকা দুটো দিয়েছে। ছেলেটা হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে। আর সাদেরালি ছেলেকে বেধড়ক মেরে রক্তাক্ত করে দেয়। বলে, ‘আজ থেকে তুই আমার সঙ্গে ঘুরবি।’ সাদেরালির প্রচন্ড ঘৃণা স্ত্রীর প্রতি। ফলে সেই ঘৃণার প্রতিক্রিয়া ঘটে ছেলের ওপর। কাঁকরগড়ার সোলেমান ঠিকাদারের বৌ হরবোলা ছেলেটার জন্য প্রতীক্ষা করে চালের পুঁটুলি এবং দশটা টাকা নিয়ে। কিন্তু ছেলেটা আসে না। আর তখন দূরের গাঁয়ে মেয়েরা সাধাসাধি করে ছেলেটাকে ঘু ঘু পাখির ডাক ডাকতে। ছেলেটা পাথরের মতো নিশ্চুপ-হরবোলা ডাক সে যেন ভুলে গেছে।
‘মৃত্যুর ঘোড়া’ গল্পটি কিছুটা আত্মজৈবনিক। লেখকের ন-বছর বয়সে তাঁর দাদুর মৃত্যু হয়। এবং সেই মৃত্যু সংবাদ নিয়ে আসে একটা লোক। সেই লোকটা জানায়, দাদুর ইচ্ছানুসারে তাঁর নাতি যেন তার ভিটের কিছুটা মাটি দাদুর কবরে নিয়ে আসে। ঠাকুরমার একটা সুন্দর রেশমি শাড়িতে ভিটের কিছুটা মাটি বেঁধে দেয়া হয় এবং নাতি সেই মাটি নিয়ে দাদুর কবরে দিতে যায়। সেই সংবাদদাতা লোকটা নাতিকে কাঁধে চাপিয়ে হাঁটতে থাকে। তারপর তারা দূর দূরান্তরের গ্রাম-মাঠ-বন-প্রান্তর পেরিয়ে কবরের উদ্দেশে চলে। আর সেই ন-বছর বয়সেই জীবন ও মৃত্যুর পারস্পরিক সম্পর্কটা নাতি টের পেয়ে যায়।
সিরাজের এসব গল্প ছাড়াও আরো অসংখ্য বিখ্যাত গল্প আছে, যা অবশ্যই উল্লেখ ও স্মরণযোগ্য। যেমন- ‘গোঘœ’, ‘সাজ ভেসে গেছে’, ‘সূর্যমুখী’, ‘নাগিনীছন্দ’, ‘উড়োপাখির ছায়া’, ‘মাটি’, ‘সরল প্রকৃতি পাঠ’, ‘মানুষ ভূতের গল্প’, ‘দিওজেনিসের মৃত্যু’, ‘রানীর ঘাটের বৃত্তান্ত’, ‘বর্ণপরিচয়’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘বাদশা’, ‘মিথলজির রাজা’, ‘গাজনতলা’, ‘লালীর জন্য’, ‘বাগাল’, ‘শূন্যের খেলা’, ‘সাপ বিষয়ে একটি উপাখ্যান’, ‘আমি ও বিপাশা’, ‘অঘ্রাণে অন্নের ঘ্রাণ’, ‘জুলেখ’ প্রভৃতি।
সিরাজের রচিত ছোটগল্পের সংখ্যা প্রায় তিনশো। বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে তাঁর শ্রেষ্ঠ গল্প, স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠ গল্প, সাহিত্যের সেরা গল্প, গল্প সমগ্র, কালের প্রহরী ইত্যাদি গল্প সঙ্কলন প্রকাশিত হয়েছে। তা ছাড়া, ছোটদের উপন্যাস, কর্নেল সিরিজের রহস্য উপন্যাস এবং সামাজিক উপন্যাস-সব মিলিয়ে তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা দুশোরও অধিক। এ ছাড়া ইতোমধ্যে তাঁর দুইখানি প্রবন্ধ গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রবন্ধগুলো সিরাজ-এর অসাধারণ পান্ডিত্য ও বৈদগ্ধের পরিচায়ক।
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ বাংলাসাহিত্যের এমন একজন কথাকার, যিনি গ্রামবাংলার বিশাল অভিজ্ঞতা দিয়ে তাঁর সমূহ গল্প ও উপন্যাস বিষয় বৈচিত্র্য ও পটভূমির বিস্তার সমৃদ্ধ করেছেন। ১৯৬৯ সালে সাপ্তাহিক ‘ধ্বনি’ পত্রিকায় সিরাজের ‘পাবন’ শীর্ষক ছোটগল্পটি পাঠ করে সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষ মুগ্ধ ও অভিভূত হন। এবং নিজে থেকেই সিরাজকে ডেকে আলাপ করেন। আর সিরাজ সে-সময়ে লেখার ওপর নির্ভর করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন জেনে তিনি ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত ফিচার লেখার সুযোগ করে দেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩-তে আনন্দবাজার পত্রিকার নিউজ সেকশন-এ সিরাজকে চাকরিতে ঢুকিয়ে দেন সন্তোষকুমার ঘোষ। ১৯৯৩-এ সিরাজ আনন্দবাজার থেকে অবসর গ্রহণ করে স্বাধীনভাবে লেখাকেই জীবিকা রূপে গ্রহণ করেন।
সিরাজ তাঁর ‘অলীক মানুষ’ উপন্যাসের জন্য একই সঙ্গে ভূয়ালকা পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার ও সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এই উপন্যাসখানি ভারতের ১১টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তা ছাড়া, ‘অমর্ত প্রেমকথা’ উপন্যাসখানির জন্য সিরাজ পেয়েছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নরসিংহদাস পুরস্কার। শৈলজানন্দ স্মৃতি পুরস্কার, বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কার, আই আই পি-এর পুরস্কার, এবং দিল্লির ও ইউ এফ সংস্থার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পুরস্কার। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দু’বার গেছেন। ১৯৮০ সালে আমেরিকান আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে একমাত্র ভারতীয় প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমবার তিনি চার মাসের জন্য আমেরিকা যান। এবং ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয়বার তিনি বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনে প্রতিনিধি হয়ে দশদিনের জন্য আমেরিকার টেকসাসের হিউসটনে যান। তা ছাড়া, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে তিনি সম্মান সূচক ডি. লিট উপাধি পান সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য।
সিরাজের কিছু গল্প ও উপন্যাস চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে। যেমন- ‘আনন্দমেলা’ (উপন্যাস), ‘নিশিমৃগয়া’ (উপন্যাস), ‘কামনার সুখ-দুঃখ’ (উপন্যাস- ‘শংখবিষ’ নামে), ‘কৃষ্ণা বাড়ি ফেরেনি’ (উপন্যাস-অšে¦ষণ’), ‘মানুষ ভূতের গল্প’ (‘গল্প-‘ফাঁদ’ নামে) এবং ‘রানীর ঘাটের বৃত্তান্ত’ (গল্প- ‘ফালতু’ নামে)। এ ছাড়া, কিছু গল্প-উপন্যাসও নাটক আকারে মঞ্চে অভিনীত হয়েছে। যেমন : ‘মায়ামৃদঙ্গ’ (উপন্যাস-‘মায়া’ নামে) এবং ‘মানুষ ভূতের গল্প’ (গল্প-‘মানুষ ভূত’ নামে) ও ‘রানীর ঘাটের বৃত্তান্ত’ (গল্প-‘রানীর ঘটের বৃত্তান্ত’ নামে) প্রভৃতি।
৪.
প্রায় পাঁচ দশকের কাছাকাছি এই দীর্ঘ সময় ধরে অনেক দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা ও আশ্চর্য ত্যাগের মধ্যে দিয়ে নিবিড়ভাবে সাহিত্যচর্চায় রত থেকেও জীবনের উপান্তে এসে এক সাক্ষাৎকারে প্রায় দু’শোরও অধিক উপন্যাস, প্রায় তিনশো ছোটগল্প এবং বেশি কিছু সংখ্যক মূল্যবান প্রবন্ধের রচয়িতা হিসেবে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ তাঁর ছোটগল্প এবং বেশি কিছু সংখ্যক মূল্যবান প্রবন্ধের রচয়িতা হিসেবে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ তাঁর সৃষ্টির অতৃপ্তি থেকে মনে করেন- ‘জীবনের সেরা লেখাটা হলো না বলে নিজের ওপর এত বীতশ্রদ্ধ, নিজের ওপর নিজের এত ক্রোধ যে, মাঝে মাঝে আমি খুব হতাশ হয়ে পড়ি। নিজের কাছে একটা প্রশ্ন থেকে যায়, আমি লেখার সুযোগ পেলাম না, নাকি লিখলাম না?’
সিরাজ ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন একজন নির্বিরোধী, শান্ত-শিষ্ট-ভদ্র-নিরহঙ্কার এবং উদার-প্রগতিশীল-বিদগ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক মানুষ। ‘আত্মকথা’য় তিনি বলেছেন :
ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামাইনে। লেখক হিসেবে আমি চরিত্র বেছে নিইনি দরকার অনুযায়ী। হিন্দু মানুষ মুসলমান মানুষ কিছু বুঝি না। মানুষ বুঝি। এই দেশের মানুষ। তাদের ঘনিষ্ঠভাবেই চিনি। আমার কোন শুচিবায়ু নেই। মানুষ আমার কাছে শুধু প্রকৃতির সন্তান। প্রকৃতিই শাশ্বত এবং ঈশ্বর। ….একদা আমার নগ্ন কবর ঢাকতেও তাঁর স্নেহ ঘাস ফুটে উঠবে।
সিরাজ শুধু মানুষ বুঝতেন। হিন্দু মানুষ, মুসলমান মানুষ তিনি বুঝতেন না। এবং এই মানুষকেই তিনি তাঁর সাহিত্যে রূপায়িত করেছেন। তবু কখনো সখনো তথাকথিত কিছু সংখ্যক বুদ্ধিজীবীর নোংরা ‘গ্র“পইজম’ ও ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক চক্রান্তের শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। ফলে, এই প্রতিভাবান ও শক্তিশালী এবং অসাম্প্রদায়িক কথাকারকে অনন্যোপায় হয়ে সোচ্চার হতে হয়েছে মধ্যে মাঝে: ‘অস্তিত্বের খুব সঙ্কটে আছি। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি কে? কেনই বা লিখছি? এতদিন লিখেই বা কী হলো? অথবা, ‘চিরকালই তো আমি কোণঠাসা। এত অ্যাডভার্স অবস্থায় মধ্যে কি করে টিকে আছি, সেটাই রহস্য। এই নৈরাজ্য শুধু উপহাসের পাত্র হয়েই রইলাম। আর পদে পদে প্রতিবাদ করতে গিয়ে একঘরে হয়ে গেলাম।’
তবু সারাজীবন তিনি মেরুদণ্ড সোজা রেখেছেন। কারো কাছে মাথা নত করেননি। এখানেই তাঁর মহান কৃতিত্ব।….
সিরাজ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন- ‘বাংলা সাহিত্যের বিষয় অধুনা নগরকেন্দ্রিক। গ্রামের সঙ্গে শিক্ষিত পাঠকের- যাদের প্রায় বেশিরভাগ নগরবাসী, কোনো যোগাযোগ আর নেই। এত সাহিত্যে কতটা উন্নতি ঘটেছে, জানি না-কিন্তু বিশাল একটা আত্মপ্রবঞ্চনা ঘটেছে। জনসংখ্যার এক প্রকাণ্ড অংশ গ্রামবাসী। স্বাধীনতার পর থেকে গ্রামে প্রচণ্ড রকমের বিপ্লব ঘটে গেছে। তার অনেককে বিচিত্র ভাঙাগড়া ও রূপান্তরের আমি সাক্ষী। তাই স্বভাবতই আমার লেখক ভূমিকায় একটা গুরুত্বর দায়িত্বের প্রশ্ন ওঠে। তা কতটুকু পালন করতে পেরেছি? অন্তত বলবো, চেষ্টা করেছি। নগরকেন্দ্রিক সাহিত্যের বিরুদ্ধে এ একটা সংগ্রামের শামিল। অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। এখানে অনেক সমস্যা পশ্চিমী যন্ত্র সভ্যতার প্রচণ্ড চাপ ও উগ্র ভোগবাদ এ দেশের মানুষকে গ্রাস করেছে। মানুষ ভিড়ের অনুগামী হয়ে পড়েছে। তাৎক্ষণিকতা মানুষকে দার্শনিক বোধ থেকে বিযুক্ত করেছে। সিরিয়াস বলতে জীবনে যেন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। খাঁটি সাহিত্য আসলে জীবনের সিরিয়াস ব্যাপারগুলো নিয়েই। দার্শনিকতাই তার ভিত্তি। পাঠক হিসেবে মানুষ আজ দর্শন ব্যাপারটা জীর্ণ কাঁথার মতো ত্যাগ করেছে। এই পরিস্থিতিতে সাহিত্য আজ ভারি অসহায়। এ ছাড়া অন্য দিকে আমার ব্যক্তি-লেখক হিসেবে আরও সমস্যা আছে। অনেক শিক্ষিত মানুষ মনে করেন, গ্রাম মানেই চণ্ডীমণ্ডপ, এঁদো ডোবা কিংবা শরৎচন্দ্রের পল্লী সমাজ বর্ণিত ব্যাপার। অনেকে ভাবেন, তারাশঙ্কর-বিভূতি তো লিখেই গেছেন, ওই যথেষ্ট। আবার অনেক আধুনিকতামনা বুদ্ধিজীবী ভাবে, গ্রাম বিষয়বস্তু মানেই অনাধুনিক ব্যাপার এবং গ্রামীণ চরিত্র মানেই সরলতা ও আদিমতার সমাহার-যা আধুনিক শিল্পবস্তুর পরিপন্থী এঁদের লেখক লেখেন নিজস্ব অভিজ্ঞতার ওপর দাঁড়িয়ে। নাগরিক জীবনের অভিজ্ঞতা যাঁর আছে, শুধু নিছক অভিজ্ঞতা নয়, যিনি সেই জীবনকে মূল অবধি দেখতে পান তিনি নগরকেন্দ্রিক লেখা লিখবেন। যিনি তার বাইরের ব্যাপারগুলো জানেন, গ্রাম-গঞ্জে যাই হোক, তাই নিয়ে লিখবেন। এতে কোনো শ্রেণী টানা মূর্খতা। প্রকৃত আধুনিকতা থাকে লেখকের মনে। তাঁর চেতনায়-চোখেও মগজে। এবং হৃদয়েও। …. ধর্ম ও সম্প্রদায় নিয়ে আমাকে মাঝে নানাবিধ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু যাঁরা আমার সাহিত্যের নিষ্ঠাশীল পাঠক তাঁরা জানে না, ধর্মের ব্যাপারে আমার মনে বিন্দুমাত্র গোঁড়ামি নেই। হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের জীবন নিয়ে আমি অসংখ্য লেখা লিখেছি, দুই সম্প্রদায়ের মানুষেরই নানাবিধ ঘরোয়া ও সামাজিক সমস্যা যা আমার শিল্প ভাবনাকে আলোড়িত করেছে, সেখানে আমি নিরপেক্ষ ও নিষ্ঠাশীল হতে চেয়েছি।’
৫.
গ্রামের সঙ্গে সিরাজের যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কলকাতা মহানগীর কর্মব্যস্ত জীবন একঘেয়েমি বোধ হলে সুযোগ-সুবিধা মতো তিনি চলে আসতেন নিজের গ্রামে- খোশবাসপুর। কিছুদিন কাটিয়ে যেতেন। কথা ছিল, গত সেপ্টেম্বরের আট তারিখে তিনি গ্রামের বাড়ি আসবেন, কিছুদিন কাটিয়ে যাবেন। কিন্তু তার আগেই সেপ্টেম্বরের চার তারিখে মধ্য কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে আকস্মিকভাবেই তিনি প্রয়াত হলেন। এবং তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর পরদিন নিয়ে আসা হলো গ্রামের বাড়িতে। তিনি আসতেন আট সেপ্টেম্বর, অথচ পাঁচ সেপ্টেম্বর এলো তাঁর নিথর, নিস্পন্দ মৃতদেহ। সেদিন মাঝে মধ্যে ঝিপ্ ঝিপ্ করে বৃষ্টি হচ্ছিল সেই বৃষ্টির মধ্যেই মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও বর্ধমান-এর বিভিন্ন প্রান্তের হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল। তাঁরা অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে একে একে অন্তিম দর্শন করলেন তাঁদের পরমপ্রিয় মানুষ প্রিয় মানুষের সারা শরীর। পরিশেষে, যেটা সবচেয়ে উল্লেখ ও স্মরণযোগ্য ঘটনা-সেটা হলো সমাধিস্থ করার আগে যে ‘জানাজার নামাজ’ অর্থাৎ (আত্মার শান্তি কামনায় শেষ প্রার্থনা) অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে হাজার হাজার হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে জোর হাতে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন। তারপর, বৃষ্টির জল ও চোখের জলের মধ্যেই তাঁকে, সেই প্রিয় মানুষটিকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল।
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ প্রয়াত হয়েছেন, কিন্তু বাংলা সাহিত্যে