মিসেস ম্যালার্ড হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন, বিষয়টি জানার পর খুব সতর্কতার সাথে তাকে তার স্বামীর মৃত্যুর খবর জানানো হয়।
তার বোন জোজে পিন ছিন্নবাক্যে তাকে ঘটনাটি খুলে বলেন, যদিও সেখানে অনেক কিছুই গোপন করা হয়। তার স্বামীর বন্ধু রিচার্ডসও ঐ মুহূর্তে তার কাছেই ছিলেন। যখন রেলওয়ে বিপর্যয়ের খবরটি জানা গেল এবং মৃতদের তালিকায় ব্রেন্টলি ম্যালার্ডের নাম মুখ্য হয়ে উঠল তখন রিচার্ডস্ পত্রিকা অফিসেই ছিলেন। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য দ্বিতীয় টেলিগ্রাম না আসা পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করলেন এবং শোকার্ত সংবাদটি পৌঁছে দিতে তিনি দ্রুত অগ্রসর হলেন যেন কোনো অবহেলা অথবা বন্ধুর প্রতি ভালোবাসার কমতি প্রকাশ না পায়।
তিনি ঘটনাটি সেভাবে শুনতে পাননি যেমনটা অধিকাংশ মহিলাই শুনেছিলেন কেননা তার হৃদয়ের তাৎপর্য অনুধাবনে অক্ষম ছিল। হঠাৎ করেই তিনি তার বোনের কাঁধে হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে একবারের জন্য কাঁদলেন। যখন দুর্দশার ঝড়োহাওয়া আপনা আপনি থেমে গেল তিনি একাই তার রুমে চলে গেলেন। কেউ তাকে অনুসরণ করলো না।
খোলা জানালা বরাবর একটি আরামদায়ক ও প্রশস্ত হাতলওয়ালা চেয়ার বসানো ছিল। তিনি চেয়ারটিতে এমন ভঙ্গিতে বসলেন যেন সমস্ত অবসাদ দেহ অতিক্রম করে আত্মায় গিয়ে পৌঁছাল।
তিনি বাড়ির সামনের খোলা আঙিনায় গাছের উচ্ছ্বসিত ও প্রাণবন্ত শীর্ষগুলো তাকিয়ে দেখলেন। চারিদিকে মনোমুগ্ধকর বৃষ্টিভেজা বাতাস বয়ে চলেছে। পথের ধারে ফেরিওয়ালারা উচ্চস্বরে ফেরি করছে। দূর থেকে ভেসে আসছে কারো গানের মৃদু সুর আর ঘরের ছাঁইচে অগণিত চড়ুই পাখির কিচিরমিচির ধ্বনি।
তার জানালার মুখোমুখি ঐ পশ্চিমের নীলাকাশে কিছু মেঘ মিলিত হলো আর মাঝে মাঝে জমাট বেঁধে গেল। বিষণœ মনে তিনি চেয়ারের গদিতে মাথা রাখলেন। চোখের জল তার কণ্ঠকে ভারী করে তোলে আর হৃদয়কে নাড়া দেয়, ঠিক যেমনটা কোনো শিশু ঘুমন্ত স্বপ্নের মাঝে অনবরত কাঁদতে থাকে।
তিনি ছিলেন যুবতী, তার সুন্দর ও শান্ত মুখের প্রতিটি রেখায় নিপীড়ন এমনকি জোরালো প্রতিরোধের ছবিও ফুটে উঠল। অথচ এখন তার দু’টি চোখ নি®প্রাণ, তার দৃষ্টি যেন দূরের ঐ নিলীমায় স্থির হয়ে আছে। এ যেন কোনো দৃষ্টির প্রতিফলন নয় বরং সুচিন্তার সাময়িক বিরতির বহিঃপ্রকাশ।
তার দিকে কিছু ধেয়ে আসছিল আর তিনি আতঙ্কে সেটার অপেক্ষায় ছিলেন। কী ছিল এটি? তিনি জানতেন না, তবে দুর্বোধ্য আর ছলনাপূর্ণ কিছু। তিনি বিষয়টি অনুভব করতে পারলেন, আকাশজুড়ে গা ছমছমে ভাব; সুর, গন্ধ আর রঙের ছোঁয়ায় পরিপূর্ণ বাতাসে ভর করে তার দিকে ছুটে আসছে।
আবেগে তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল, যা তাকে আচ্ছন্ন করতে চাইছে তিনি সেটাকে স্বীকার করতে শুরু করলেন। আবার নিজ ইচ্ছার সাথে লড়াই করে বিষয়টিকে ফিরিয়েও দিতে চাইলেন, যে ইচ্ছা তার দু’টি সরু শক্তিহীন হাতের মতোই ছিল। যখন তিনি নিজেকে পরিত্যক্ত ভাবতে শুরু করলেন, তার অবসন্ন ভাঁজ হওয়া ঠোঁট থেকে অশ্রুত শব্দই বেরিয়ে এলো।
তিনি বারবার প্রশ্বাসের সুরে বলে গেলেন : ‘মুক্ত, মুক্ত, মুক্ত’। তার শূন্যদৃষ্টি আর ভীত চাহনি যা বিষয়টিকে অনুসরণ করলো তা যেন দুই চোখ থেকে হারিয়ে গেল। তারা হয়ে গেল প্রগাঢ় আর উজ্জ্বল। তার স্পন্দনগতি গেল বেড়ে আর শরীরের প্রতিটি কোষে প্রবাহিত রক্ত উষ্ণ আর নিরুত্তেজ হয়ে গেল।
তিনি অনবরত প্রশ্ন করে গেলেনÑ যে আনন্দ তাকে ঘিরে আছে তা অস্বাভাবিক কিনা। একটি স্পষ্ট এবং উন্নত উপলব্ধি তাকে এমন তুচ্ছ বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে বারণ করলো। তিনি জানতেন তিনি আবারো কাঁদবেন যখন তার সদয় ও দরদি হাত দুটো মৃত্যুকে বরণ করে নেবে আর তার মুখ হৃদয়ে জমানো ভালোবাসা ছাড়া অনড় তা, নিরসতা কিংবা মৃত্যুর দিকে তাকাবে না। অথচ তিনি ঐ তিক্ত মুহূর্তগুলোর আড়ালে প্রতিরোধের এক দীর্ঘ যাত্রা খুঁজে পেলেন যা সুনিশ্চিত রূপে তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাই তাদের বরণ করে নেওয়ার জন্য তিনি তার বাহু দুটিকে উন্মুক্ত আর প্রসারিত করে দিলেন।
আসছে দিনগুলোতে টিকে থাকার কেউ রইবে না; তিনি হয়তো নিজের জন্যই বেঁচে থাকতেন। তার অন্ধ অস্তিত্বকে ন্যুব্জ করতে কোনো জোরালো ইচ্ছাশক্তি থাকবে না যেখানে নারী আর পুরুষের বিশ্বাস-তাদের জীবনসঙ্গীর ওপর ব্যক্তিগত ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার তাদের আছে।
এক্ষেত্রে কোনো সদয় কিংবা নির্দয় ইচ্ছাশক্তি বিষয়টিকে অপরাধে রূপ দিতে পারে কেননা তিনি দৃষ্টি আরোপ করেন স্বল্পস্থায়ী সেই আলোকসজ্জার দিকে।
এখনও মাঝে মাঝে তিনি তার স্বামীকে ভালোবাসেন। আবার প্রায়ই বাসেন না। তাতে কী আসে যায়! ভালোবাসা কি পারে, এক অমীমাংসিত রহস্য, আত্মকথার অধিকৃত মুখগুলোকে পরিমাপ করা যা হঠাৎই তিনি সবচেয়ে জোরালো ধাক্কা রূপে স্বীকার করে নিলেন।
‘মুক্ত! মুক্ত শরীর আর আত্মা!’ তিনি গুন গুন করে বলে গেলেন।
জোজে পিন প্রবেশের অনুমতির জন্য চাবির ছিদ্রে ঠোঁট রেখে বন্ধ দরজার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।
‘লুইস, দরজা খোলো! অনুরোধ করছি; দরজা খোলো- তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে। লুইস, কী করছ? ঈশ্বরের দোহাই দরজা খোলো।’
‘চলে যাও। আমি অসুস্থ হবো না।’ না; তিনি অসুস্থ হবেন না। কেননা তিনি ঐ খোলা জানালা দিয়ে জীবনের স্পর্শমণি পান করছিলেন।
তার স্বপ্নগুলো গোলমেলে হয়ে যাচ্ছিল, পাশাপাশি তার দিকে ধেয়ে আসা দিনগুলোও। বসন্তের দিনগুলি, গ্রীষ্মের দিনগুলি, সব রকমের দিনগুলোই যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। তিনি অতি দ্রুত প্রার্থনা করলেন যে জীবনটা আরও দীর্ঘ হতে পারতো। কেবলমাত্র গতকালই তিনি শিহরিত হয়ে ভেবেছিলেন যে জীবনটা আরও দীর্ঘ হতে পারতো।
অবশেষে তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং বোনের জিদের কাছে হার মেনে দরজা খুলে দিলেন। তার দুই চোখে ছিল উচ্ছ্বসিত বিজয়ের ছাপ, আর জয়ের দেবীর মতো অনিচ্ছাকৃতভাবে তিনি নিজেকে বয়ে নিয়ে চললেন। তিনি তার বোনের কোমর আঁকড়ে ধরলেন এবং একসাথে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেন। রিচার্ডস্ তাদের অপেক্ষায় নিচে দাঁড়িয়েছিলেন।
কেউ একজন সামনের দরজার ছিটকিনি খুলছিলেন। ব্রেন্টলি ম্যালার্ড ভেতরে প্রবেশ করলেন, তার শরীরে সামান্য ক্লান্তিভাব, খুব শান্তভাবে তিনি হাতব্যাগ আর ছাতা নিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দুর্ঘটনা থেকে অনেক দূরে ছিলেন, এবং এমনকি দুর্ঘটনার ব্যাপারে তিনি কিছুই জানতেন না। তিনি জোজে পিনের প্রচন্ড কান্না এবং স্ত্রীর দৃষ্টি থেকে তাকে আড়াল করার জন্য রিচার্ডসের দ্রুত সরে যাওয়া দেখে অবাক হয়ে গেলেন।
যখন ডাক্তার এলেন, সকলে বলাবলি করলেন যে মিসেস ম্যালার্ড হৃদরোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন- আনন্দই তার মৃত্যুর কারণ।
[গল্পটি ১৮৯৪ সালের ১৯ এপ্রিল প্রকাশিত আমেরিকান লেখিকা কেইট চোপেনের (১৮৫০-১৯০৪) বিখ্যাত ছোটগল্প The Story of an Hour–এর অনুবাদ]