‘একজন কবিকে শুধু কবিতার প্রয়োজনে প্রচুর গদ্য লিখতে হয়’- বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি টি এস এলিয়ট তার একটি প্রবন্ধে সম্ভবত এ ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। এই মন্তব্যের ভেতর দিয়ে এলিয়ট একজন প্রকৃত সার্থক কবির দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বিশ্বসাহিত্যে টি এস এলিয়টের মন্তব্যের সার্থক উত্তরাধিকার অনেককে পাওয়া সম্ভব যারা একাধারে কবিতা ও গদ্যের সার্থক সুনিপুণ শিল্পিত খেতাবটিও বেশ তেজে-জোশে অর্জন করেছেন। অবশ্য গদ্যশিল্পী ও গদ্যলেখক শব্দদ্বয়ের মধ্যে বিপরীত ঐক্যের বিদ্যমানতা আছে। একজন গল্পকার গদ্যলেখক এই মন্তব্যের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন করা আপাতত যেমন বৃথা, তেমনি তিনি গদ্যশিল্পী কিনা সেটি পরখ করার জন্য কতক শর্তাবলি পরিপূরণে তিনি দায়বদ্ধ। কী সেই আবশ্যক গুণাবলি? প্রথমে কবুল করা ভালো, গদ্যশিল্পীকে মানসিকভাবে কবি হতে হবে। কবিতা সৃজন না করেও তিনি আপাদমস্তক গদ্যের ভঙ্গি নির্মাণের প্রয়োজনে কবিতাপাঠের মননশীলতাকে রূপদান করবেন। এটি তিনি উপার্জন করবেন ক্রমাগত পরীক্ষাপ্রবণ মানসিকতায় আক্রান্ত হয়ে। তবে শেষ বিচারে সেই গদ্যকে অবশ্যই কবিতামুক্ত হতে হবে।
কবি কেন গদ্য লিখবেন? বিষয়টির মীমাংসা জরুরি হয়ে পড়েছিল। টি এস এলিয়টের ওই মন্তব্যটির সারাৎসার তার একটি মীমাংসিত জবাবও বটে। কবির গদ্যপাঠ আসলে একটি দারুণ উত্তেজক কবিতার মতই দৃপ্ত স্পর্শযুক্ত সুপক্ব ফলের আস¦াদ গ্রহণ করা। এদের গদ্য অবশ্যই কোনো সাধারণীকরণ, জলবৎ-তরল সাংবাদিকী রিপোর্টাজ নয়। কারণ অত্যন্ত সহজ। বিশিষ্ট কবি বস্তুত একজন প্রাজ্ঞ, উপরোক্ত স্তর অতিক্রমের প্রচেষ্টাকে তিনি কর্তব্য ধার্য করে নিয়েছেন।
যৌবনের শুরুতে, আমার অতিশয় প্রিয় লেখক বুদ্ধদেব বসুকে এক সময় এলিয়টের মন্তব্যের উজ্জ্বল উদ্ধার বলে ধরে নিয়েছিলাম। তারপর কবি আবদুল মান্নান সৈয়দকেও আমি এই উদাহরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছি। আবদুল মান্নান সৈয়দ সব্যসাচী লেখক, তিনি আজীবন নিজের সৃজনশীলতাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সচল রেখেছিলেন, লিখেছেনও প্রচুর। তিনি কেন এত গদ্য লিখলেন তার উত্তরে বলা যায়, অন্তত এইভাবে :
ক. কবিতার প্রয়োজনে-
কবি জীবনানন্দ দাশ যখন উভয় বাংলার মধ্যে কোনোভাবেই তেমন আলোচিত হচ্ছেন না, আবদুল মান্নান সৈয়দ তখন তাকে নিয়ে আলোচনায় ব্রতী হলেন। যার ফলাফল হিসেবে প্রকাশিত হয় শুদ্ধতম কবি নামের অনবদ্য সমালোচনা গ্রন্থ। আর এটা প্রমাণ করে কবিতার উপর যথার্থ আলোচনা কেবল কবিরাই করতে পারেন।
খ. মননশীলতার সন্ধানে-
মান্নান সৈয়দ মনে করতেন, কবি কেবল সৃজনশীল হবেন না, তিনি মননশীলতাকেও পাঠকের কাছে তুলে ধরবেন। তিনি অনালোচিত কবিদের নিয়ে আলোচনা করেছেন, আবার পাশাপাশি তরুণ কবিদের উপরেও আলোচনা করেছেন। এই উদাহরণের তালিকা আবিদ আজাদ, শিহাব সরকার থেকে আরম্ভ করে হাসান আলীম, মোশাররফ হোসেন খান পর্যন্ত বিস্তৃত। পূর্বসূরি থেকে অগ্রজ, তারপর অনুজ, সবাই ছিলেন তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র।
গ. ঐতিহ্যের অনুসন্ধানের আগ্রহে-
কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের কাছে ঐতিহ্য হলো সমগ্র বাংলাসাহিত্য। এই কারণে মীর মশাররফ হোসেন থেকে আরম্ভ করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখের উপর আলোচনার কথা উল্লেখ করা যায়। এই সমস্ত আলোচনায় তিনি এলিয়টের মতই তাদের আমলের দেশকাল ও সাহিত্যিক উৎসভূমির অনুসন্ধান করেছেন। এই দায়িত্বশীলতা তাকে অবশ্যই গদ্য লেখার দিকে অগ্রসর করিয়ে দিয়েছে।
আমি আপাতত তার স্বাতন্ত্র্যময় গদ্যের প্রসঙ্গটি আলোচনা করবো, তবে এটা পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ নয়, প্রবন্ধ সম্পর্কীয় প্রস্তাবনা।
আগেই বলেছি, মান্নান সৈয়দ সব্যসাচী লেখক, অর্থাৎ তিনি গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, এমনকি শিল্পকলার সমালোচনায়ও মাঝে মাঝে নিবেদিত হন। চলিষ্ণু লেখকের মত অত্যন্ত পরিশ্রমী মানসিকতা নিয়ে এসব করেন। যদিও তিনি মনে করেন, তার ‘সমালোচনাও সৃজনশীল’। আমরাও তার এই দাবির মধ্যে একটি তাৎপর্যবান জরুরিময়তা খুঁজে পাই। আমাদের দেশের অধিকাংশ সমালোচক এতটাই নির্বোধ যে তারা লেখার তাৎপর্যগত উপলব্ধির প্রেক্ষাপট খুঁজে বের করার পরিবর্তে বিষয়গত তাৎপর্য খোঁজায় অস্থির থাকেন। ফলত ব্যর্থ লেখকের হুঙ্কার ও গর্জন এখানে বেশি শোনা যায়। হয়ত এই কারণে আবদুল মান্নান সৈয়দ এদের কাছে আখ্যায়িত হয়েছেন ‘কলাকৈবল্যবাদী’ লেখক হিসেবে। যাই হোক, এই সমস্ত প্রাসঙ্গিক তত্ত্ব বাহ্যিকতায় আক্রান্ত, লেখকের কৃতিত্ব বিচারে এগুলো ভূমিকা রাখে না। সেটাই স্বাভাবিক।
আবদুল মান্নান সৈয়দ ষাট দশক, অর্থাৎ তার উত্থানগত সময় থেকে, কবিতার পাশাপাশি গদ্য লিখে আসছেন। শুরুতে তার গদ্য অবশ্যই আরোপিত, এমনকি আভিধানিক প্রচলিত ও অপ্রচলিত শব্দের সংমিশ্রণ। এমনকি তৎসম শব্দের আধিক্যযুক্ত ব্যবহার লক্ষণীয়। এতে গদ্যের চলিষ্ণুতার কমতি হয়েছে সত্য, কিন্তু মেধার কেন্দ্রীয়করণ ঘটেছে আশ্চর্য সংহতিতে, যা অন্তত আমাদের সাহিত্যে নতুন সংযোজন। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের গদ্য তার সামনে তৈরী প্রকরণ হিসেবে থাকলেও তিনি গদ্যের সৃজনতার ক্ষেত্রে অনন্য। অন্য কবি-গদ্যকারদের তালিকা তৈরি করে বিষয়টি বোঝা সম্ভব।
‘এত দিনে বিচূর্ণ হলো শান্ত সোনালি সুখদ, বরদ ও শুভদ উনিশ শতক; একটি আস্ত বিশ্বযুদ্ধ যেন পাল্টে দিলো একই সঙ্গে প্রাক্তন ফিজিক্স আর ফিলোসফি। …মুদ্রা আর মাংস, উল্লাস আর সম্ভোগ, হিরের ঝড় আর খুশির চিৎকার ‘কাল ছিলো ডাল খালি, আজ গেল ফুলে ভরে’ (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত : কালো সূর্যের নিচে বহ্ন্যুৎসব, নির্বাচিত প্রবন্ধ)।
উপরের উদাহরণের বাক্যাবলির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে বোঝা যাবে, তিনি কেন বঙ্কিমকে গদ্যের ভাষা-ভঙ্গি নির্মাণে আদর্শ করেছিলেন। সুধীনদত্তের কবিজীবনের অবস্থানগত প্রভাব নির্ণয়ে এতটা বিশ্লেষণ অহেতুক মনে হলেও আমাদের মনে রাখতে হবে মান্নান সৈয়দ আপাদমস্তক কবি, প্রাজ্ঞতাই তাকে শিখিয়েছে- ‘বোধ ও প্রজ্ঞাকে চারিয়ে দিতে উৎসুক, যুক্তির শক্ত গিটের ভেতরে সঞ্চার করতে চাই অনুভূতি’ (আমার গদ্য, আমার বিশ্বাস)।
ফলত আমাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় না তিনি পরিশোধিত করতে চান ভাবনার সারাৎসারকে। তাতে করে এই গদ্যভঙ্গির জন্য মান্নান সৈয়দকে হতে হয়েছে সমালোচনার মুখোমুখি। বস্তুত এটি হয়েছে তার অসামান্য মৌলিকত্বের জন্য। অথচ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার চলো যাই পরোক্ষে গল্পগন্থ পড়ে লিখেছিলেন : ‘যেসব গ্রন্থ পাঠককে শিক্ষিত করে তোলে এটি নিঃসন্দেহে সেই জাতের।’
আপাতদৃষ্টিতে তার গদ্যকে নন্দনসর্বস্ব স্নিগ্ধতার আধার মনে হলেও সেটিই মান্নান সৈয়দের গদ্যের মূল সত্য নয়। কেননা আমাদের দেশের অধিকাংশ গদ্যলেখক পান্ডুর বর্ণের দেহ-মন নিয়ে চলাফেরা করেন, তাতে তথ্যের অনেক প্রয়োজনীয়তা মিটলেও আনন্দময় জগতের মনোহরতা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অথচ এটিই আমরা খুঁজে পাই তার গদ্যে, যাকে একদা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের মত অসামান্য কথাশিল্পী স্বাগত জানিয়েছিলেন।
এখানে অবশ্য একটি প্রশ্ন উত্থিত হতে পারে- এতে করে তার গদ্যটি কি কলাকৈবল্যবাদিতায় আক্রান্ত হয়নি? অবশ্যই হয়েছে। তাতে তার কৃতিত্ব কোনোক্রমেই খাটো হয়ে যায় না। কেননা আমরা আগেই বলেছি, তিনি কেবল গদ্যলেখকই নন বরং তার ঊর্ধ্বে উঠে এই খ্যাতি উপার্জন করেছেন- সেটি হচ্ছে তিনি গদ্যের একজন কারুকার্যময় শিল্পী। আর এটা তো জানা কথা, পৃথিবীর সমস্ত ভাষার সাহিত্যে প্রধান সাহিত্যিক মাত্রেই কলাকৈবল্যবাদী। আমাদের সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথকে উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করলে চলবে।
যাই হোক, আমরা মান্নান সৈয়দের গদ্যের প্রাথমিক সৃজনশীলতা থেকে যে উদাহরণ তুলে দিয়েছিলাম শেষ পর্যায়ে তার গদ্যরীতি আর সেই পর্যায়ে থাকেনি। তার গদ্য আগের তুলনায় সহজ হয়ে এসেছে, ফলত, তার সৃজনশীলতায় যে শব্দ-মেধার প্রাচুর্যময়তা ছিলো তা পরবর্তী কালের রচনায় লক্ষণীয়ভাবে অনুপস্থিত। সেটাই স্বাভাবিক। এক সময় তারুণ্যের তেজে-জোশে তার সৃজনশীলতার অলিন্দে অনেক বন্যার পানি প্রবেশ করেছে, পরে আবার তার উৎস হারিয়ে ফেলেছে। আমার যতদূর মনে হয়, তার গদ্য সেই সময় যতটা তত্ত্বসর্বস্ব ছিলো, বিশ্লেষণের দিক থেকে তার চেয়ে পিছিয়ে ছিলো। ফলত তার প্রাথমিক গদ্যে সৃজনশীলতা যতটা মনোনিবেশ দাবি করতো এখন ততটা করে না। তার প্রেক্ষাপটে মান্নান সৈয়দের সচেতন উত্তর : ‘আমার গদ্যে মেধা ঝরিয়ে ক্রমব্যাপ্ত হয়েছে হৃদয় এবং কোমলতার কেন্দ্রীয়করণ;’ (আমার গদ্য, আমার বিশ্বাস)।
ফলত আমাদের কাছে মান্নান সৈয়দের গদ্য হয়ে উঠেছে তরতাজা সুস্বাদু ফলের মত লোভনীয়। তবুও তার গদ্যপাঠ ও কবিতাপাঠের মধ্যে কতকটা সাযুজ্যময়তা থেকে যায়, অনেক সময় সাধারণ পাঠকের কাছে গদ্য ও কবিতার পার্থক্য নিরসন করা মুশকিল হয়ে পড়ে। যেমন : তার কোলকাতা উপন্যাসটির ভেতর দেশের সমস্ত বৈশিষ্ট্যগত চারিত্র্য ‘পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি’ কবিতায় পাওয়া যেতে পারে। তখন এলিয়টের মন্তব্যটির সমর্থনসূচকতার আভাস পাই। অবশ্য এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, আমাদের স্বাতন্ত্র্যময় গদ্যসাহিত্যে তিনি শীর্ষে অবস্থানকারী একক ব্যক্তিত্ব, দশক অতিক্রম করতে তিনি এক লহমার জন্যও বিরাম দেননি। অথচ এই আত্যন্তিক চিন্তাশীল বাক্যবিন্যাসে তিনি আশ্চর্য কোমলতায় আকৃষ্ট করেন আজো। আমরা যারা তরুণ সাহিত্য-শিক্ষানবিশী, তারা তার এই বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত গদ্যকে নিয়ে মাথায় তুলে নাচতে পারি। যে-তিনি সৃজন করতে পারেন এই ধরনের বাক্যমালা : ‘আল মাহমুদের কবিতা তার প্রাক্তন কবিতা থেকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়- তা এক ধারাবাহিকতারই এক মুঠো পিছলে বেরিয়ে-বেরিয়ে যাওয়া টুকরো, তা এক গ্রামের কিনার দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর অংশ, তা একটি গাছের ফুলভারে মৃত্তিকা-চুম্বনকারী ডাল’ (আল মাহমুদের সাম্প্রতিক কবিতা : শিল্পতরু, দ্বিতীয় বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা, ১৯৮৯)। গদ্যে তার মননী হৃদয়ের উৎসারণকে স্বাগত জানাবার জন্য আমাদের সব সময় তৈরি থাকতে হয়। আজকের যুগবিশ্লেষণে আমি অকপটে স্বীকার করতে বাধ্য যে-কথাটি সেটি হলো, বুদ্ধদেব বসুর মত তার গদ্য-পদ্যের ফোঁপানো তালে বিন্যস্ত হয়নি বরং আবদুল মান্নান সৈয়দ তার গদ্যে মেধার ক্রমচারী সারাৎসারকে, অন্তর্জগৎ ও বাহ্যিক জগৎকে, মিশ্রণ করতে সক্ষম হয়েছেন অসামান্য দক্ষতায়। হ