শেষমেশ টনক পড়ল ফরিদ মিয়ার। দোষ অবশ্য তার নয়, তার টনকেরও না। উদয়াস্ত খাটাখাটুনির চোটে মিয়ার সময় কোথা দিয়ে কেটে যায় তা টের পাওয়া যায় না। সবাই বলে এবার একটু বিশ্রাম দাও। ছেলেরা বড়ো হয়েছে, নাতিপুতিরাও ইস্কুলে ভর্তি হয়ে হাই ইস্কুল হতে চলল। একটু জিরোও মেয়ের বাড়ি, কি বকখালি দাজির্লিং করে এসো। যাদের সঙ্গে মসজিদে নামাজ পড়ে, সেইসব মুসল্লি বলেন, এবার চিল্লায় সময় দাও, অত সংসার তাংড়ে মরলে হবে! হজ আদায় করে এসেছ, খেয়াল রেখো!
হজ তো আদায় করেছেই ফরিদ মিয়া। সেটাই তো মস্তবড়ো এবাদতের ভাগিদার হওয়ার যোগ্য। তার ওপর চিল্লা, জামাত- এসব কখন করে বলো দেখি! তবে দুঃখ একটাই তাকে কেউ হাজিসায়েব বলে ডাকে না। ওই কারও জানাজার সময় কিংবা নামাজের কাতার সোজা করবার সময় ইমাম সাহেব হয়তো বললেন, হাজি সায়েব এট্টু কাতারটা ঠিক করে নেন, সামনে আসেন, সামনে কাছাকাছি আসেন। ব্যাস। এসব শুনতে শুনতে ইমাম সাহেবের ডাকটাকে আরো এনলার্জ করে দেখলে যেন ফেরেশতার আহ্বান। রাব্বুল আলামিন বোধ হয় তারপরই ডেকে নেবেন কাছে- এসো ফরিদ মিয়া, তোমার প্রতি আমি রাজি হয়ে গেছি! ওঃ গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
কিন্তু এই যে পড়শি, আমজনগণের অশ্রদ্ধা! তাইতে ফরিদের ইচ্ছে হয় না হাজি সেজে বেড়াতে। বরং যতটা পারে ডুবে থাকে জাগতিক কাজে। এভাবেই না দু-কাঠা জমির ওপর নতুন বাড়িটা। তার রঙটা। ওয়েদার কোট- বলেছিল রঙমিস্তিরি।
বড়ো ছেলেও বলেছিল, ওয়েদার কোট দিলে বছরের পর বছর চলল। রঙ ফিকে হবে না। শেষদিকের কথাকটা বোধ হয় ছেলের মুখে বসিয়ে দিয়েছে টিভি চ্যানেল।
-রাখো তোমার বেলেড চাকু, নখকাটা থামাও। ঝামরে উঠল মিয়ার বিবি। নখকাটা পালাচ্ছে? উদিকে দেখো গে, ফলন্ত নেরকোল গাছটার কিরূপ করে কাটছে! দেখলি মায়া লাগবে।
নখকাটা ফেলে রেখে উঠল ফরিদ। এতদিন ধরে গুমরে গুমরে যে কথা রটছিল তা তবে ঠিক হলো! দোতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামল ফরিদ। চপ্পলের চটাস পটাস। উঠোন পেরোল, তারপর বাইরে। সেখানে অনেক মানুষ, মেয়েমদ্দ, বাচ্চাকাচ্চার ভিড়। সবাই থম মেরে রয়েছে। সামনেই বুঝি কালবৈশাখী শুরু হবে। চাচাতো ভাই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের জমিতে। ওইখানে নড়াচড়া করছে যা দুটো মানুষ। তাদের কুড়–ল কোদাল। সঙ্গে সঙ্গে খালিগায়ের দাপটও তড়পাচ্ছে।
কোনদিক থেকে কথাটা শুরু করবে ভাবছিল ফরিদ। ঠিক কথাবার্তা না, একটা প্রচন্ড প্রতিবাদ। যাদের-যাদের ওই প্রতিবাদটুকু করার কথা, তারা কেউ ঠোঁট-মুখ খুলছে না। মনে মনে তারাও কথা সাজাচ্ছে কি না কে জানে। চাচাতো ভাই ফজলুলও কি ঝড়ের আঁচ পাচ্ছে না! সে-ই এখানে তো আসল কালপ্রিট।
ফজলুল হঠাৎ বলে ওঠে, আরে গোড়া সেপটে মারবি তো, দড়িটা এবারে বাঁধ ঠিক করে। সঙ্গে সঙ্গে জিব দিয়ে ঠোঁট চেটে নেয় ফজলুল। তবু নজর তার কোনোদিকে সরে না। ওই গাছের নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়া দেখে তবেই বুঝি শান্তি।
-কার বলে তুই কাটলি গাছটা? কথাকটা বলল ফরিদ। যতটুকু বলার তার চাইতে জোরে বলল, চেঁচিয়ে। তোদের একলার গাছ? না হয় তোর জমিতি পড়েছে। তা বলে কোনো পারমিশন না নিয়ে সক্কাল সক্কাল লোক লাগিয়া দিলি?
ফজলুল এসব কথা আশা করেনি। সে জানে শুরু করে দাও তারপর যা হয় দেখা যাবে। এভাবেই না দোতলা বাড়িটা বানিয়ে ফললে করপোরেশনের অ্যাসেসমেন্ট, প্ল্যান ছাড়াই। পুলিশ এলো করপোরেশনের বাবুরা এলো। থমকে গেল কাজ। ফজলুল সোজা চলে গেছিল কাউন্সিলরের বাড়ি, ভোর ভোর। ডেকে বসালেন ভুপেনবাবু।
-কী ব্যাপার রে? কাজকম্মো ঠিকঠাক চলছে?
-কই আর চলছে ভুপেনদা।
-বোস বোস। শোন, কাজটাজ ঠিকমতো না চললে হবে না। এলাকার দায়িত্বটা তার ওপরই না ছেড়ে রেখেছি। তুই হলি ওদের মধ্যে শিক্ষিত মানুষ, বুঝিস তুই…। পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে রাস্তা দেখাতে হবে তো!
-সব বুঝলাম ভূপেনদা, কিন্তু আমার নিজের পায়ের তলার মাটি যে টলোমলো।
-কেন রে? কী হয়েছে?
ফজলুল খুলে বলে সমস্ত ঘটনা। ভূপেনবাবু তাঁর ঘামে ভেজা পাঞ্জাবি নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েন।- ওফ্ কদিন ধরে মিস্তিরির চেষ্টা করছি, তা কোনো ব্যাটার পাত্তা নেই! এই গরমে এসি ছাড়া কাজ হবে কী করে ভগবানই জানে।
-মিস্তিরি-টিস্তিরি পাওয়া এখন যা তা ব্যাপার? ফজলুল নিজের ব্যথা ভুলে ভূপেনদার সহমর্মী হয়ে ওঠে, সবাই এখন চাকরি খুঁজছে, যে-কাজে পয়সা নেই তাতে ভিড়ছে না কেউ, সে আপনার জাত ব্যবসা হলেও-
হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যান কাউন্সিলর এ কথায়। আগের প্রসঙ্গে ফিরে আসেন চটপট, তা তুমি কী করবে? কাজ ওভাবে ফেলে রাখবে?
-আমি বলছি কী, আপনি থেকে কিছু একটা ব্যবস্থা করুন।
-ঠিক আছে। আজ হবে না, দুটো মিটিং রয়েছে। শিলান্যাস অনুষ্ঠানেও থাকতে হবে গোটা তিনেক জায়গায়। এক কাজ কর, কাল দিনটা বাদ দে পরশু, শুক্রবার, তোদের ওই দিনটা শুভ তো-
-আপনি যেদিনই হোক চলুন। নয়তো আমাকে বাঁচানোর কেউ থাকবে না। কতগুলো টাকা ইনভেস্ট করে বসে আছি।
-তা, একটু সরকারের খাতে জমা করার কথা মাথায় আসেনি? চটে উঠলেন ভূপেনবাবু। শোন, নাকে কেঁদে লাভ নেই। ফান্ডে কত দিতে পারবি?
চমকে উঠল ফজলুল। আবার হেসে উঠল অন্তরও। মানে, কাজটা তাহলে মিটে যাবে। তড়িঘড়ি চলল, সে আপনি যা বললেব ভূপেনদা।
এরপর রফা হয়ে গেল।
ফজলুলকে চুপ করে থাকতে দেখে ফরিদের গলা আরেকটু চড়ল। দেখাদেখি অন্যান্য শরিকদের মুখে বোল ফোটে। হ্যাঁ তো, না-বলা কওয়ায় কী করে ফলন্ত গাছটা কাটলি! অ্যাদ্দিন তোর অংশে আমাদের দুটো কাঠকুটো কি ঝাঁকাঝুঁড়ি থাকলি পরে পাড়া মাথায় করতিস, আর এখন কী হলো? ঠিকাচে, এই যখন কথা তখন কোত্থে পাইখানায় যাস দেখব; বন্ধ করে দেব ওই পথ! না না, তোর তো এত রয়েছে, তারপরও খাঁই কিসির?
ফজলুল তবু মুখ খোলে না। ওদিকে তখন কুড়–লের গাছের কান্ডে বারবার গেঁথে যাওয়ার জৈব শব্দ। আবার ছিটকে ওঠা, বাতাসের শরীর কেটে গাঁত গাঁত করে ফিরে আসা সঞ্চয়ী শক্তি নিয়ে। ততক্ষণে মাটিতে পড়তে গাছটির আর সামান্যই দেরি। ফরিদদের বউ ঝি-রা এবার একটু একটু সরব হলো।
ফজলুল প্লাস্টিকের টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। গামছা হাওয়ায় ঝেড়ে মুখে বোলাল একবার। তারপর ধীর গলায় বলল, আমি তো কারও জমির গাছ কাটিনি। তবুও, বেচে পয়সা ভাগ করে নিলেই হলো। অত চেল্লাবার কী হয়েছে?
-বেশ চেল্লাবে, একশোবার চেল্লাবে। ফরিদের মেজো ভাই গিয়াসউদ্দিন এবার গজরায়, এবার যেন আমার সীমানার মধ্যি ওই বালি-সিমিট ফেলতি না দেখি। ঘর বাঁধবে তুমি, আর রাস্তা বন্ধ হবে আমার- ও কল চলবে না।
-পাশাপাশি থাকতে গেলে কারও না কারও জায়গা তো ব্যবহার করতিই হবে। তোরা যে আমার রান্নাঘরের চালে দু-বেলা হাতধোয়া পানি ফেলতিছিস, কিছু বলিছি আমি। তোদের বাচ্চাটা তো রাত্তির বেলা মুতেও দেয় মাঝেমধ্যে।
-না, হাত ধোয়ার পানি, আর খামার আগলে, পথ এটকে বালি-সিমিট ফেলে রাখা এক না।
বেশ- করিচি রেকিচি, ফের রাখব, কী করতি পারিস দেখব। এবার বেশ মেজাজি ঢঙে কথাগুলো বলে ফজলুল। শালা, খালি হিংসাহিংসি খালি দুশমুনি-
শেষের কথাটুকু একটু নিজের মনে বলে ফজলুল, কিন্তু ফরিদের কানে তা পৌঁছোয়। ফজলুল হিংসেহিংসির কথা বলতে পারল? যত ঢিল দেয়, যত মনে করে কিছু বলবে না, তত যেন বেড়ে যাচ্ছে চাচাতো ভাই। কী জন্যে?
-বড্ড বড়ো বড়ো কতা বললি ফজলুল, ফরিদ নিজেকে স্থির রাখতে পারে না। ছোটোবড়ো মুখ রেখে কতা বলবি বলে দিলুম। ভেবেছিস নেতারা নাগাড়ে তোরে বাঁচাবে? কী মনে করিস নিজেরে? নেতা! কাপতেন! যতই গাছ কেটে জমি বহাল করো, বিল্ডিং হতি দিচ্ছি না।
ফরিদমিয়া এই অব্দি বলে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেল। তার পরক্ষণেই নারকেল গাছটা তার যাবতীয় অতীতের সহ্যক্ষমতা, বহমানতা, পারম্পর্য ইত্যাদি চুরমার করে সপাটে পড়ে গেল মাটিতে। একছড়া অপরিণত ডাব ছিটকে গেল ডোবার জলে। একজোড়া গিরগিটি তাদের সঙ্গম ভেঙে মাটিতে পড়ে হতবাক আর স্থির হয়ে রইল। এ বাড়ির কচিকাঁচা প্লাস পাশের বাড়ির তাদের বন্ধুরা হই হই চিৎকারে হাততালি দিয়ে উঠল। যাদের ইস্কুলে দিদিমণিরা পড়ায় ‘একটি গাছ একটি প্রাণ’।
দুই
কলকাতার উপকণ্ঠে, যেখানে এখন জমির কাঠা ছ’লাখ আর স্কোয়ার ফুট দু-হাজারে বিক্রি হয় সেখানটায় খানিক জমি আছে ফরিদদের। ফরিদের বাবা কাকা মিলে স্বাধীনতার পরপরই কিনে রেখেছিল সে-জমি। বর্তমানে সেখানে টুকরোয় অবাঙালি গোয়ালাদের বাস। কয়েকটা দোকান। সবই ভাড়ায় দেয়া। জমিটার খাজনা ট্যাক্স বা বর্তমান সময়োপযোগী অ্যাসেসমেন্ট কিছুই যে করা নেই তা ধরে নেয়া যায়। তা হলেও এক প্রমোটর রাজি হয়েছে এটাকে প্রমোট করায়। কিন্তু তার সমস্যা হচ্ছে পদে পদে। শরিকানি সতেরো ফ্যাঁকড়া। মিটমাট করতে নাজেহাল প্রমোটরের লইয়ার। অ্যাগ্রিমেন্ট হয়ে প্রমোটরের পক্ষে মিষ্টান্ন বিতরণ শেষ করে আটকে আছে। যেটুকু কাজ চলছে তা ধীরলয়ে। এর মূল কারণ হলো- একটু পরেই সেকথা জানব।
রাতে শুতে যাবার সময় আগে সন্ধে থেকে জ্বলা লিকুইডেটর বন্ধ করল সায়রা। এতক্ষণে মশারা পালিয় যে-যার মতো। বাকি রাতটা বন্ধ রাখলে সাশ্রয় হয়। ফজলুল এইসময় খবরের কাগজের আগামুড়ো পড়ে ফেলে। আজ তার হাতে পুরোনো ফাইল। ফাইলের ভেতর লালচে দলিল পরচা-দাখিলা ইত্যাদি নিয়ে সে ব্যস্ত। নারকেল গাছ কাটা নিয়ে যে-পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছিল, তা আপাতভাবে মিটে গেলেও ভবিষ্যতের কথা বলা যায় না। তাই এই প্রস্তুতি। এবার ওই জমিতে একটা লম্বা হলঘরের মতো বানাবে। তৈরি হলে ভাড়া দেবে বিয়েবাড়ি উৎসব উপলক্ষে। এটাতে যে শুধু পাবলিকের দায় মিটবে তা নয়, নিজেদের ফ্যামিলির এতগুলো মানুষের বিয়েশাদিতেও কাজে লাগবে। সেক্ষেত্রে ভাড়ার বিষয়টা বিবেচনা করা যেতে পারে। ফজলুল এ-কথা কাকেই বা বোঝায়! তার ধারণা, এই চৌহদ্দিতে থেকে থেকে কোনো নতুন ইনভেনশনে যেতে ভয় পায় বাসিন্দারা। ফজলুল এর অন্যথা করে দেখাতে চায়। দেখাতে চলেছে। অথচ সবাই ভাবে ফজলুলের গরম। পয়সার গরম।
পাশে বসল সায়রা। তাকাল ভালো করে ফজলুলের দিকে। মনমরজি বোঝার চেষ্টা করে। খোলা চুল এবার বেঁধে নেবে সায়রা, শোবার আগে। তেলের বাসি গন্ধ নাকে লাগে ফজলুলের।
-বসলে যে। শোবে না? ফজলুলই কথা শুরু করল।
-তুমিও তো কাজ নিয়ে পড়েছ।
-আমার একটু দেরি হবে। শুয়ে পড়ো।
-একটা কথা ছিল।
মুখের রেখা সামান্য পরিবর্তন হল। তেমনিভাবে বলল ফজলুল, কথার তো শেষ নেই। বলে ফেলো।
-ঠান্ডা তেমন করে পড়লই না। ওদিকে গরম পড়ে গেলে আর হবে না এবার। তাই বলছিলুম দু-কেজি আলো চাল এনোনা কাল সকালে।
-কী করবে আলো চালে?
-পিঠে।
হাতের কাজ থমকে গেল যেন ফজলুলের। রাতদুপুরে এইসব বাজে কথার কোনো মানে হয়? বলল, কী যা তা খেলে তোমার মাথায়? অ্যাঁ? পিঠে আজকাল কেউ করে এই মহল্লায়?
-করে না বোলো না। আমাদের এই বাড়িটায় কোনো বছর কি বাদ গেছে পিঠে করা? অল্প হলেও হয়েছে কি না, তুমিই বলো।
-না না, ওসব হুজ্জোতি পোষাবে না। কে করবে ওর জোগাড়যন্তর?
-সে তোমার ভাবতে হবে না।
-মানে?
অল্প সময় নেয় সায়রা। অদ্ভুত প্রসন্নতা খেলা করছে তার ফরসা মুখে। হাসি হাসি মুখ হলে, নাকের দু-পাশে ফুলে উঠলে বেশ দেখায়। বলে, হাঁড়িকুড়ি যা দরকার সব এনে দিয়েছে তোমার ফরিদদা। আর আমাদের চুলো ছোটো বলে গিয়াসের বউ তার চুলোয় করতে বলেছে। কাঠকুঠো সব ওরই। আর-
-বুঝেছি বুঝেছি। ফাইলপত্তর এবার বন্ধ করে উঠে পড়ল ফজলুল, তোমাদের ওই শেয়ালের ফিস্টি তো? ওতে আমি নেই। চাল আমি এন দিচ্ছি, কিন্তু আমার সামনে ও জিনিস আনলে টান মেরে ফেলে দেবো সব উঠোনে।
এরপর ফজলুল যা করল তার জন্য রেডি ছিল না সায়রা। ঝপ করে লাইট বন্ধ করে মশারির ভেতর ঢুকে পড়ল ফজলুল। বিছানায় শুয়ে ঘুম আসছিল না নিশার। নিশা, ওদের মেয়ে গুটিসুটি মেরে এক কোণে সরে গেল।
সায়রা চুপচাপ বসে থাকে একই জায়গায়। অন্ধকারে। যে-ভাবনা নিয়ে সে পিঠে তৈরির প্ল্যান করেছিল তা যেন দ্বিগুণ আকার নিয়ে ছেয়ে ফেলে তাকে।
খুব ভোরে উঠত তার দাদিশাশুড়ি। মুখ-হাত ধুয়ে চা নাস্তা খেয়ে সেই যে বসে রইল উঠোনে, কার সাধ্যি তার নজর এড়িয়ে কোনো কিছু করে। সেই ভোরেই বুড়ির বউ-নাতবউরা জড়ো হতো ঢেঁকিশালে। ভেজা আতপ চাল কোটা শুরু হতো ঢেঁকিতে। উঠোনের এদিক-ওদিক মিলে সব ঘরের বাসিন্দাদের তখন সে কী কাজের হুড়োহুড়ি। পার্বণের মেজাজ রচিত হতো বাড়িময়। বাড়ির পুরুষদের যেন সেদিন সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ। রান্নাঘর ঢেঁকিশাল আর ঘরদোরে উঁকিঝুঁকি। কখন গরমাগরম আসকে পিঠে থালায় সেজে আসবে। সঙ্গে জিরেন কাটের পাতলা মধুর মতো গুড়। কী সুবাস সেই গুড়ের! পরদিন শীত অগ্রাহ্য করে তাড়াতাড়ি উঠে পড়া। ওই পিঠে নারকেল দুধে ভিজে সারারাতের পর হয়ে উঠবে অত্যন্ত স্বাদু, দুধ-আসকে।
আবেশে চোখ বুজে আসছিল সায়রার। ক’ভাই মিলে বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে শীতের সকালে পিঠে খাওয়ার সেই দৃশ্য বুক ভেঙে নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল সায়রার।
বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। উঠোনের দিকে তাকিয়ে মনে করতে চাইল সেই পুরোনো ছবি। নাঃ। একটা বাল্ব্-এর আলোয় ঝকমকে হয়ে আছে সিমেন্ট বাঁধানো উঠোন। ওটাকে আর বোধ হয় উঠোন বলা যায় না। ওই আলো যেন প্রাচীন মাটির সেই আঙিনার গভীরতাকে শুষে নিয়েছে। কোথাও কোনো রহস্যময়তা নেই একফোঁটা। টুকরো টুকরো ভাগ ভাগ পাঁচিল। খুপরি খুপরি ঘরে যে-যার নিজস্ব জগৎ। পরিবার হয়েও একা! কান্না এসে গেল সায়রার চোখে।
কিন্তু কেন তার এসব মনে হচ্ছে আজ? ভাই-ভাইয়ে কদিন আগে মনকষাকষি হয়েছে বলে? নাকি ফজলুলের দখলি মনোভাবের কারণে অপরাধবোধ জেগেছে? সায়রা কিছুই নির্ণয় করতে পারল না। তার মনটা কেবল হু হু করে উঠল; পুকুরে গা ধুয়ে গিয়ে হাত ফসকে ভেসে পড়া হাঁড়ির টালমাটাল শূন্যতার মতো।
তিন
প্রমোটর ফজলুলকে ডেকে বলল, আপনি আপনার ফ্যামিলির মধ্যে একটু জানেন বোঝেন। তো একদিন সবাইকে নিয়ে আসনু-না আমার অফিসে।
-কেন, সমস্যাটা কী?
-হাজারো সমস্যা মশাই। এক তো দলিলে পারফেক্ট ডিভিশন দেখানো নেই। যে-দলিলটা আপনারা দিয়েছেন, তা ধরে কাজ আরম্ভ করলে আপনার ওই দাদা, হাজি সাহেব উনি তো কোনো অংশই দাবি করতে পারেন না। অন্য দলিলে ওনার অংশ আছে, তবে এতদিন যেভাবে ভোগদখল করে এসেছেন তা থেকে ওটা ডিফার করছে।
-কী হবে তাহলে? ফজলুলের হাত-পা কাঁপতে শুরু করে আর কি!
-কী আর হবে? প্রমোটর জিভ দিয়ে আওয়াজ করে দাঁতের ফাঁকের খাবারকণা বাইরে ফেলে বলে, আইনের ফাঁক-। তবে তার আগে ওই ভাড়াটেদের সঙ্গে কথা বলে ফয়সলা করা দরকার। টুকরো টুকরো এর ভেতর ও ঢুকে বসে আছে। সেদিন রাস্তায় আপনার দাদার সঙ্গে দেখা হতে বললাম কথাটা। শুনেটুনে বলল, ও যেমন আছে থাক। আমার কী দরকার ভাড়াটে তোলবার? বুঝুন!
-না না, ওগুলোকে না তুললে এরিয়া কমে যাবে। ফজলুল আঁতকে উঠল, এতদিন ধরে পঞ্চাশ টাকার ভাড়া, মামারবাড়ি নাকি! দিতে হবে, হ্যাঁ এই সুযোগে ছাড়িয়ে নিতেই হবে।
-আমি তো সেই কথাই বলি। যে যার জিনিস বুঝে নিন, তারপর ভাড়াটে চাইলে থাকল নয়তো কিছু লামসাম নিয়ে উঠে যাক।
বাইকে স্টার্ট দেয় এবার প্রমোটর, আপনার ওই দাদাটা যেন কিরকম। একটু গোঁয়ার টাইপের। তাই না? এদিকে টাকা টাকা করে হেদিয়ে মরছে, অথচ কিভাবে তা আর্ন করতে হয়-
ফজলুলের ইচ্ছে হল নিজেকে বিবাদের কথা উদাহরণ হিসেবে আনে। তাতে প্রমোটরের সঙ্গে সঙ্গত করা হয়, নেকনজরে থাকার চান্স পাওয়া যায়। অন্তত বলাই তো যায়, লোকটা সারাজীবন নিজের জামাকাপড়, সাধ-আহ্লাদের দিকে নজরই দিল না। ভালো খাওয়া নয়, কোথাও বেড়াতে যাওয়া নয়, কোনো বিনোদন নয়। শুধু টাকার এপিঠ-ওপিঠ চেটে বেঁচে থাকা। হাজি মানুষ, সে কত উদার হবে! পার্থিব কোনো জিনিসের প্রতি মোহ থাকবে না, তবেই না!
কিন্তু ফজলুল বলে, বয়স হয়েছে তো! সব মানুষ কি সমান হয়! আর হ্যাঁ, ওই ভাগাভাগিটা দীর্ঘকাল ধরে আমরা সবাই জানি ইকুয়াল আছে। ওরমই থাক। আপনি সেভাবেই এগোন-
-তাই হবে। চলি।
চার
রাতে অল্পই খায় ফরিদমিয়া। আজকে এ-কাজ সে-কাজ সেরে ফিরতে রাত হল। খেয়ে উঠে নামাজ আদায় করতে হবে। অন্যসময় খাওয়ার আগে নামাজটা পড়ে নেয়। হাতমুখ ধোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওজু করে নিয়ে বসল মাদুরে। একটা কাচা দস্তরখান পেতেছে বউমা। কোনো বিশেষ আয়োজন হলে এসব করে থাকে। একটু পরে ভাতের বদলে ফরিদের সামনে এলো পিঠে আর গুড়।
-এসব কোত্থেকে এলো। তিরিক্ষি স্বরে বলল ফরিদ।
বউমা উত্তর দিল, সবাই মিলে খাওয়া হবে বলে- আপনার ছেলে সব জোগাড় করেছে, আর-
ভেতরে থেকে ইশারায় শাশুড়ি বাকিটা বলতে বারণ করল। ফরিদ তাকাল বউমার দিকে, আর-?
-আর ঠান্ডা পড়েছে একটু, তাই-
-ও। ফরিদ টেনে নিল থালাটা। বউমা আসার পর থেকে মাঝেমাঝেই এমন সব নতুন নতুন পদের রান্না কপালে জোটে। এ-বাবদ কোনো ভাবনা ফরিদের মনের কোণে ঠাঁই পায়নি। এখন যেন মনে হল, বউমাটা বেশ গুণী হয়েছে। বেশ গুছিয়ে সংসার করতে পারে।
বউমার কথাতে ফরিদেরও যেন শীতভাবটা বেড়ে গেল। বলল, তা জাড় থাকতি থাকতি পিঠে-পায়েস ভালো। আমার অবশ্যি ওই দুধ এক্সেটা মজা লাগে।
-সে-ও হবে আব্বাজি। সকালে একটু দেরি করে বেরোবেন না- হয়।
ততক্ষণে দু-খানা পিঠে শেষ করে ফেলেছে ফরিদ।
-আব্বাজি আরেকটা দেব?
-না না, দু-চারটে ভাত খাই, নাহলি পরে ঘুম হবে না।
ওদিকে ফজলুল বা গিয়াসউদ্দিনের হেঁশেলেও একই ব্যাপার। সকলের থালায় পিঠে গুড়। রাতের নিঝুমে সেসব পিঠে-গুড় হজম করাতে শীতও যেন হঠাৎ বেড়ে গেল।
পরদিন সকালে ফরিদ ভেবেই পেল না নাস্তার এত দেরি কেন? কোথাও কিছু গোলমালের আঁচ বুঝি পাওয়া যাচ্ছে। গোলমাল, না কোনো ষড়যন্ত্র? বাড়ির মেয়েরা যা যা খেল দেখাচ্ছে, তার থই পাওয়া ভার। গত রাতের পিঠে কিভাবে যে হজম হয়ে ফের বুঝকো থাকতে থাকতে- সেই ফজরের নামাজের সময় থেকে; খিদে জানান দিচ্ছে কে জানে।
এমন সময় ফরিদের বউ এসে খবর দিল, একেনে বসে বসে জাড়ে কুঁকড়ে না-থেকে এট্টু ফাঁকার দিকি যাও না।
-কেন, খেতি দেবে না, না কি? ভেবেছ কী তোমরা?
-দিচ্ছি। এট্টু সবুর তো করতি হবে।
ফরিদ কী আর করে। উঠোনের খুপরি পেরিয়ে খামারে এসে দাঁড়ায়। খামারে চৌহদ্দি পাঁচিলে ঘেরা। একদিকে গেট। গেট নেই, ভেঙে তা একটা গুহাপথের আকার নিয়েছে। খামারের একদিকে খানিকটা শেড; টিনের। তার পরে বেশ খানিকটা অংশ সামান্য উঁচু করে বারান্দা মতো বানানো। ফরিদ আবার দেখল সীমানা তৈরি হওয়া সদ্য আমিনের মাপ করা বাঁশের খোঁটা। ওরই ভাগ নিয়ে ভায়ে-ভায়ে মনকষাকষি।
শেড-এর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল ফরিদ। লম্বা করে মাদুর পাতা। ঠিক যেমনটা কোনো অনুষ্ঠান হলে করা হয়। মনটা কেমন করে উঠল, কতদিন সেই অনুষ্ঠান আসেনি তাদের চলতি জীবনে।
চুপ করে বসে থাকে ফরিদ। মাথায় ভিড় করে আসতে থাকা স্মৃতিগুলোকে পথ দেয়, প্রশ্রয় দেয়। খেয়াল হতেই দেখে কখন যেন পাশে এসে বসেছে ফজলুল গিয়াসউদ্দিন, সালাম, মোবারকরা। থালা হাতে পেছন পেছন আসছে তাদের বউ মেয়েরা। কারও কারও কোলের সামনে সুগন্ধি পিঠের থালা।
-নাও, এবার খাওয়া শুরু করো দিকিনি, চুপচাপ বসে থেকে লাভ নেই। বলে ওঠে ফরিদের বউ। ঠিক বাড়ির বড়োগিন্নির কায়দায়।
-হ্যাঁ হ্যাঁ, হাজিসায়েবের দিয়ে শুরু হোক। বলল ফজলুল। মনটা ভরে উঠল ফরিদের।
-বেশ বানিয়েছে, না দাদা? বলে গিয়াসউদ্দিন।
-এ হল আমার পছন্দের জিনিস। খেতে খেতে বলে ফরিদ।
একসঙ্গে মজা করে রসিয়ে রসিয়ে দুধ-আসকে পিঠে খেতে থাকে পুরো পরিবার। মেয়ে-বউরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। কচিকাঁচারা বসে পড়েছে তাদের বাপ-চাচাদের পাশে।
শীত যেন ঘিরে আগলে ধরেছে সবাইকে। ফজলুল খাওয়া থামিয়ে হঠাৎ বলে বসল, জানিস, আমাদের সামনেটাই শুধু আমরা দেখতে পাই। পেছনে কী কান্ডকারবার চলছে, তা যদি জানতুম!
সবাই শুনল মাথা নাড়ল, ঠিক কথা ঠিক কথা। কিন্তু কেন বলল তার কারণ কেউ খুঁজতে গেল না।
ফজলুলের বউ অনেকটা তফাতে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকল সেই আগের মতো একটা বাড়ি, একদল মানুষজন। কোথাও কোনো শূন্যতা নেই। তার আবেগ সামলানো দায় হয়ে পড়ল। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে সতর্ক চোখে চারদিক তাকাল। কেউ দেখে ফেলেনি তো! হ