জুনের প্রথমার্ধ। আকাশে মেঘ। টিপ টিপ বৃষ্টি। আমার অল নিপ্পন এয়ারওয়েজ এএনএএর এনএইচ-তেইশ যখন উড়লো গোটা জাপান তখন মেঘে ঢাকা। পশ্চিমে কিছুক্ষণ চলার পর জাপান সাগরের ওপর এসে ধীরে ধীরে উত্তরে মোড় নিলো জাহাজটি। এয়ার হোস্টেস এলো গরম ভেজা তোয়ালে নিয়ে। হাতমুখ মুছে বেশ ফ্রেশ লাগছে। খাবার এলো। আমি ভেজ (ভেজিটারিয়ানের সংক্ষেপ) পরিচয়ে চেক ইন করেছিলাম তাই বেশ আগেভাগেই আমার খাবার ডিশ এসে গেল। সেদ্ধ শামুক আর সয়া-সসের উৎপাত নেই। জাপানের ১ নং ব্র্যান্ড জাপান এযারলাইন্স জেএএল-ও চড়েছি আমি। সবগুলোই বেশ বিলাসবহুল। তবে দূরপাল্লার ফ্লাইট এএনএ একটু বেশিই গোছালো আর গাম্ভীর্যপূর্ণ। আরও চাকচিক্য বেড়েছে এ কারণে যে যাত্রীদের সত্তর শতাংশই জাপানি নাগরিক। হলুদ মুখগুলো গরমের অবকাশে বেড়াতে যাচ্ছেন ইউরোপে, যাদের বেশির ভাগের গন্তব্যই জার্মানি। জাপানের সাথে জার্মানির সখ্য সবার জানা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চরম বিপর্যয়ের পরও ঘুরে দাঁড়ানো এই দু’টি দেশ সত্যি যেন বিস্ময়। অর্থনীতি ও সভ্যতার বর্তমান যে কোন সূচকে এ দু’টি দেশ অবশ্যই ঈর্ষণীয় ও অনুকরণীয়। একই শিবিরের যুদ্ধবিধ্বস্ত দু’টি দেশ, আমার মনে হয়েছে এখনো বন্ধুত্বের পরম বাঁধনে বাঁধা, অন্তত দেশ দু’টির সাধারণ মানুষের অনুভূতি তাই বলে।
জাপান সাগরের ওপর দিয়ে উত্তরে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য খাবারোভস্কের আকাশে ঢুকে পশ্চিমে এগিয়ে চলেছি আমরা। মঙ্গোলিয়ার উত্তরে সাইবেরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি। জানালার পাশে বসে দু’টি চোখ সেই শুরু থেকেই বাইরে রেখেছি। বেলা এগারোটা পঁচিশ মিনিটে যাত্রা করেছি, পৌঁছার কথা ষোলটা পঁয়ত্রিশে। সূর্যের গতিপথের দিকে চলেছি বলেই সময়টা এমন; মনে হচ্ছে ব্যবধানটা পাঁচ ঘণ্টা দশ মিনিটের। অথচ পাকা আট ঘণ্টা আগে পিছে। বারো ঘণ্টায় অতিক্রম করবে ৫,০৬৪ নটিক্যাল মাইল দূরত্ব, যা মাটির ওপর দিয়ে প্রায় দশ হাজার কিলোমিটারের পথ।
বিষুবরেখা অঞ্চলে পৃথিবীর পরিধি ২১,৬০০ নটিক্যাল মাইল বা ২৪,৮৬১.৬ সাধারণ মাইল, যা প্রায় চল্লিশ হাজার কিলোমিটারের সমান। বিষুবরেখা থেকে উত্তরে বা দক্ষিণে গেলে দ্রাঘিমার এই দূরত্বের হিসাব বদলাতে থাকে; ক্রমে কমে যায়। অবশ্য অক্ষরেখা বরাবর সে রকমটি হয় না।
জানালার বাইরে চোখ। নীল আকাশ। অনেক নিচে মেঘ, তারও নিচে মাঠ-ঘাট-প্রান্তর। আবার কখনও মেঘহীন আকাশ থেকে আমাদের ফ্লাইটের ছায়াটি পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মাটির ওপর দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। এমনকি পেছনে জেট ইঞ্জিনের ধোঁয়ার দাগটিও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। সূর্যটা সাথে সাথেই আছে। আমি মানচিত্র দেখতে পছন্দ করি। অক্সফোর্ড অ্যাটলাসের নিখুঁত মানচিত্রে আমি ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থাকি। কোন ক্লান্তি আসে না। আর সেই আমিই দেখছি একদম প্রাকৃতিক মানচিত্র। পাহাড়, জলা, নদী, লোকালয়, কখনও চূড়ায় বরফযুক্ত পর্বতমালা; একটু খেয়াল করলে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, সব দেখা যাচ্ছে। খুব ভালো লাগছে। স্ন্যাক্স এলো। তারপর কি-যেন একটা ঘোষণা দিয়ে আলো কমিয়ে দিলো ককপিট থেকে। জাপানিরা সব জানালা লাগিয়ে দিলো। আমার জানালাটা কেবল ব্যতিক্রম। কেউ আপত্তি তুললো না; আংশিক খোলাই রইল। ঘন্টা দুয়েক পর আবার খুলে গেল জানালাগুলো। এলো হালকা পানীয়। ফ্রুটস। তারপর শরীরচর্চার ঘোষণা। যেভাবে ফ্লাইট যাত্রার আগ মুহূর্তে আপদকালীন সতর্কতার প্রশিক্ষণ দেয় এয়ারহোস্টেসরা। কিভাবে মাস্ক পরতে হবে, কিভাবে লাইফ জ্যাকেট পরতে হবে, কোথায় সেগুলো পাওয়া যাবে, কিভাবে এমার্জেন্সি দরজা দিয়ে লাফ দিয়ে বেরুতে হবে- ঠিক সেভাবেই কতকগুলো যোগ ব্যায়াম করিয়ে গেল তারা। ফ্লাইটের প্রায় সব যাত্রীই অংশ নিলো তাতে। আমিও। ভালোই লাগল। এর আগে আমি বিভিন্ন সময় ডজনখানেক ভিন্ন ভিন্ন এয়ার লাইন্সের ফ্লাইট চড়েছি, দূরপাল্লায়ও উড়েছি- কিন্তু এমনটি কখনও দেখিনি। মস্কোর উত্তরে প্রায় বিশ কিলোমিটার দূর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি আমরা। চার-চারটা আন্তর্জাতিক সময় রেখা পার করে বিরতিহীনভাবে পূর্ব থেকে পশ্চিমে উড়ে এসেছি। বাঁদিকে মস্কো আর ডানদিকে সেন্টপিটার্সবুর্গ। ইউরোপের সীমানায় এসে মেঘের আনাগোনা অনেক বেড়ে গেল বলে দু’টি শহরের কোনটাই দেখা গেল না। কয়েক দফা স্ন্যাকসের পর এলো ডিনার। জ্বলন্ত সূর্যে উজ্জ্বল আকাশের নিচে রাতের খাবার। একটু ঘুরে দক্ষিণ-পশ্চিমে এগিয়ে চলছি। বাল্টিক সাগর পেরিয়ে যাচ্ছি। আবার কখনও মুক্ত আকাশে তুলোর মতো মেঘগুলোর ফাঁক দিয়ে পরিষ্কার দেখতে পেলাম এস্তোনিয়া। এরপর লাটভিয়া আর লিথুয়ানিয়ার বাঁকানো উপকূল। জার্মানির আকাশে ঢুকতেই চঞ্চল হয়ে উঠলাম। একবার কোন এক ফ্লাইটে জার্মানির আকাশে ঢুকতেই একজন টেনিস তারকার নাম বলে জানিয়ে দেয়া হলো, আমরা এখন স্টেফিগ্রাফের দেশের আকাশ সীমানায় প্রবেশ করলাম। কী সম্মান একজন তারকা খেলোয়াড়ের!
আকাশে জমাট মেঘ। যখন ফ্রাঙ্কফুর্ট এয়ারপোর্টে নামলাম, তখন স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে চারটা। দু’ঘন্টার বেশি স্টপ ওভার এখানে। ঘন্টাখানেক সময় পাবো ঘুরে বেড়াবার। হেলসিংকির যাত্রী আমি। পেয়েছি শেঙ্গেন ভিসা। প্রায় ছ’বছর আগে ১৯৯৫ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভ করেছে ফিনল্যান্ড। যার মানে ফিনল্যান্ড, জার্মানিসহ ইউরোপের পনেরটা দেশে আমার বিচরণ বৈধ। তাই ফ্রাঙ্কফুর্টে এয়ারপোর্টের বাইরে যেতে বাধা নেই। গোছানো শহর ফ্রাঙ্কফুর্ট। ইউরোপের অনেক শহর আমি দেখেছি। সুইজারল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, লুক্সেমবুর্গ, বেলজিয়াম, হল্যান্ড আর পর্তুগালের অনেক শহরে আমি ঘুরেছি। কোথাও কোথাও কিছুদিন করে থেকেছি। মানুষের সাথে মিশেছি। আমার মনে হয়েছে দেশ-জাতিভেদে সূক্ষ্ম কোন পার্থক্য থাকলেও ইউরোপীয়রা আসলে একই জাতিগোষ্ঠী। এরা ককেশীয় অ্যাংলোস্যাক্সোন নৃগোষ্ঠীর উত্তর-পুরুষ। একই চিন্তা-চেতনার মানুষ। কমবেশি একই মতাদর্শে দীক্ষাপ্রাপ্ত; একই কৃষ্টি আর সংস্কৃতি নিয়ে বেড়ে ওঠা। আর একটা শহর, তার দালান-কোঠা, রাস্তাঘাট, স্থাপনা এবং এসবের অলঙ্করণ তো তাদেরই মনোভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। তাই ফ্রাঙ্কফুর্টে থেকেও স্ট্রাসবুর্গে আছি ভাবলে আমি দোষের কিছু দেখি না। আর বায়োলজিক্যাল নৃবিজ্ঞানের তত্ত্ব খাটালে ফরাসিদের থেকে ইতালির মানুষে, কিংবা জার্মানদেরকে কিছুটা হলেও আলাদা করা যায়, সাথে আরচণটুকু যোগ করলে বোধ হয় পুরোপরি নিশ্চিত হওয়া যায় কে ফরাসি, কে ইতালিয়ান আর কে জার্মান। এ ক্ষেত্রে শুধু বাধা হচ্ছে শঙ্করায়ন। মিক্সড রেস এখন খুবই চোখে পড়ে। ব্যাপারটা আমার কাছে খুব অস্বস্তির। আমি চাই সাদা, কালো আর হলুদ মানুষগুলো আপন আপন বৈশিষ্ট্যে অপরিবর্তনীয় থাকুক। জাতি-বৈচিত্র্যের এ সৌন্দর্যটা অটুট থাকুক। মঙ্গোল, নিগ্রো আর ককেশীয় মুখগুলো একে আরেকের দিকে বিমুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকুক।
সময় থাকতেই ঘুরে এলাম। ফিরতি পথে আবার ফ্রাঙ্কফুর্টে নামার কথা আছে, তবে বেড়াবার অবকাশ আর মিলবে বলে মনে হয় না। আর দেশভ্রমণে যদি কোন কিছু দেখার সুযোগ থাকে তা পরবর্তী সুযোগের জন্য ফেলে না রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। সন্ধে সাতটা পঁচিশে ফিনএয়ার-এর একটা ফ্লাইটে হেলসিংকির পথে যাত্রা করলাম। দূরত্ব ৮৮৩ নটিক্যাল মাইল; আড়াই ঘন্টার পথ। সন্ধে বলা হলেও সূর্যটা তখনও জ্বলজ্বলে, আরও সাড়ে তিন ঘন্টা সেটাকে আকাশে পাওয়া যাবে। সময়ের যেটুকু ব্যবধান তাতে হেলসিংকির স্থানীয় সময় প্রায় এগারোটা বেজে যাবে; গল্পে গল্পে জেনেছি পাশের যাত্রীর কাছ থেকে। কথা বলতেই ভালো সাড়া পেয়েছি। ভদ্রলোক জার্মান। হেলসিংকি যাচ্ছেন ব্যবসায়িক ট্যুরে। ভাবলেন আমি একজন গবেষক-ছাত্র। জানতে না চাইলেও তিনি কিছু টিপস দিলেন আমাকে। যেমন- একজন ফিনিশকে জিজ্ঞেস করা যাবে না তাদের দেশটা পোল্যান্ড কিংবা এস্তোনিয়ার মতো কমিউনিস্ট ছিল কি না; কোন ইস্যুতেই সুইডিশদের সাথে ফিনিশদের তুলনা করা যাবে না; তাদের (নরডিক ওয়াক) লাঠি নিয়ে হাঁটার অভ্যেস নিয়ে ব্যঙ্গ করা যাবে না ইত্যাদি। জুতা খুলে ফিনিশদের বাড়িতে ঢুকতে হয়; আর কফি ও বান-রুটি না খেয়ে সেখান থেকে বের হওয়া যায় না। রেস্তোরাঁয় খেলে টিপস দেয়ার কোন নিয়ম নেই, বড়জোর ১৯১ ইউরো বিলের বিপরীতে ২০০ ইউরো দিয়ে চেঞ্জের অপেক্ষা না করে বেরিয়ে পড়–ন। কোন ফিনিশ আপনার বাড়িতে এলে খাওয়ানোর প্রস্তুতি না থাকলে ভদ্রতা করে ‘খেয়ে যান’ কথাটা বলতে যাবেন না; বললে তারা কিন্তু ঠিকই বসে যাবেন, বুঝবেন সত্যিই খেয়ে যেতে বলা হয়েছে। দেখতে চুপচাপ লাজুক স্বভাবের হলেও কথা বললে একজন ফিনিশ খুব ভালো একজন সঙ্গী হয়ে উঠতে পারেন। মুখটা হাসি হাসি করে লোকটা বললেন, ‘প্রেমের ব্যাপারে ফিনিশ মেয়েরা বেশ নির্ভরযোগ্য। বাগিয়ে নিতে পারলে জিতে যাবে’। বললাম, ‘আমি বিবাহিত। তা ছাড়া আমি মুসলিম। একজন মুসলিম স্ত্রীর সাথে বিশ্বস্ত’। মুখময় আরো হাসি ছড়িয়ে দিয়ে তিনি আমাকে জানিয়ে দিলেন অনেক মুসলিমকে চিনেন তিনি যাঁরা তাদের স্ত্রীদের সাথে বিশ্বস্ত মোটেও ছিলেন না।
এগুলো তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। সহজে এসব তথ্য পাওয়া যায় না। এক দেশের বুলি আরেক দেশের গালি। তাই কোন দেশ ভ্রমণে যেতে হলে সে দেশ সম্পর্কে আগে থেকেই যতদূর সম্ভব জেনে যাওয়া ভালো। হেলসিংকি সফরের পরিকল্পনা যখন করেছি তখন বেশ পড়াশোনা করেছি ফিনল্যান্ডের ওপর। এটি নরডিক কান্ট্রি- ল্যাপল্যান্ড, বল্গা হরিণ, আর্কটিক সার্কেল, সাউনা, মেরুজ্যোতি অরোর্যা আর নিশীথ সূর্যের দেশ। গ্রীষ্মে ১৮ ঘন্টা ও শীতে ৬ ঘন্টার দিনের দৈর্ঘ্য, আর দেশটির আর্কটিক সার্কেলে গ্রীষ্মে সূর্য তো অস্তই যায় না, যেমনি শীতে সূর্যোদয়ই ঘটে না কিছুদিন। এক লাখ নব্বই হাজার লেক আর এক লাখ আশি হাজার দ্বীপের দেশ। নিচু ভূমির দেশ, অর্ধেকের বেশি এলাকার গড় উচ্চতা ১০০ মিটার; সর্বোচ্চ পাহাড় ১৩২৮ মিটার উঁচু। মাটির পুরুত্ব ৩-৪ মিটার থেকে ১১০ মিটার পর্যন্ত। তার নিচে শিলাস্তর। খনিজপদার্থ বলতে আয়রন, কপার, নিকেল আর জিংক প্রধান। স্বচ্ছ বাতাসের লীলাভূমি আর বিশ্বের সর্ববৃহৎ আর্চিপেলাগো এটি, যেখানে বিরল প্রজাতির সিলেরা বাস করে। এই দেশের পঁচাত্তর শতাংশ জায়গা বনভূমি, যেখানে বারোশ প্রজাতির হার্ব আর শ্রাব আছে। আছে আটশ প্রজাতির মস, এক হাজার প্রজাতির লাইকেন, সাতষট্টি প্রজাতির স্তন্যপায়ী, তিনশ সত্তর প্রজাতির পাখি, আর সাতাত্তর প্রজাতির মাছ। বল্গা হরিণ পালন আর মাছ শিকার এদের আদি পেশা। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে নব্বই শতাংশ লোক ছিল কৃষিনির্ভর। সত্তরের দশকে শুরু হয়েছে শিল্পের বিকাশ; আনুপাতিক হারে কমেছে কৃষি খামারের সংখ্যা। এখনও বেশ উল্লেখযোগ্য বল্গা হরিণ পালন আর উপকূলে মাছ শিকার। বার্লি, ওট, গম, সুগার বিট, আলু, ঘাস, রাই, এসব জন্মে এ দেশের মাটিতে। গাছ বলতে কনিফার জাতীয়- ওক, লিন্ডেন, এল্ম, অ্যাশ, এসব। বিশ্বের সর্ববৃহৎ কাগজ উৎপাদনকারী দেশও এটি। এর মানুষগুলো বিশ্বের সর্বাধিক কফি আর দুগ্ধপানকারী। ভদ্র মানুষদের জাতি হিসাবে ফিনিশরা পরিচিত। বিশ্বে তারাই মাথাপিছু লাইব্রেরি থেকে সবচেয়ে বেশি বই ধার করেন। দেশটির সরকারও দুর্নীতিমুক্ত। এটি হেভি মেটাল ব্যান্ডের দেশ। এটি হোম অব দি মুমিংস আর বাথ পেস অব দ্য এ্যাংরি বার্ডস। এসব তথ্যই জেনে এসেছি আমি। তবু ধন্যবাদ জার্মান লোকটিকে। তিনি আমাকে তা-ই জানিয়েছেন যা আমার ফিনল্যান্ড সম্পর্কে জানার বাইরে ছিল।
বাল্টিক সাগরের ওপর দিয়ে যাচ্ছি আমরা, কয়েক ঘন্টা আগে যে পথে গিয়েছিলাম। তবে এবার পশ্চিম উপকূল দিয়ে। পশ্চিমে ডেনমার্কের ভূখন্ড রেখে সুইডেনের সীমানার ধার ঘেঁষে উত্তর-পূর্বে যাচ্ছি। বুঝতেই পারছেন আবারো জানালার পাশে বসে আছি। একটা অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য চিন্তা হচ্ছে। এয়ারপোর্ট হোটেলে কিংবা কাছাকাছি কোন হোটেলে বুকিং করিনি আমি। মনে হয়েছিল যানবাহন তো পাবোই; বিলম্বে হলেও ভেনুতে গিয়ে আমার জন্য নির্ধারিত ঘরে ঢুকে পড়ব। প্রথম যখন দেশের বাইরে বের হই তখন সুইজারল্যান্ড ছিল আমার গন্তব্য। জেনেভা এয়ারপোর্টে নেমে আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ বাংলাদেশীদেরকে পেয়েছিলাম। অনেক আদরে তাঁরা আমাদেরকে তাঁদের বাসায় নিয়ে গেলেন। কয়েকদিন সেখানে থাকলাম। ঘুরে ঘুরে দেখলাম জেনেভা শহর। প্লেন থেকে নেমেই যে কারো মনে হবে ‘জেনেভা কই?’ কেননা সেখানে হংকং মোনাকোর মতো আকাশচুম্বী অট্টালিকা নেই। পরে কখনো সুযোগ হলে সে কথা শোনাবো। এখন যা বলছিলাম বলে যাই। জেনেভা থেকে ট্রেনে এলাম লোজান শহরে। ট্রেন থেকে নেমে বাস স্টপ। ১ নং বাসে চড়ে চলে গেলাম মালাদিয়েখ। সেখানে এভিনিউ রোদেনি ৬৪ নং তিন তলা বাড়িটিতে ঢুকে পড়লাম। দ্বিতীয় তলায় উঠে আমার জন্য নির্ধারিত ২২১ নং কামরাটি পেয়ে গেলাম। দরজার গায়ে আমার নাম প্রিন্ট করা কাগজ লাগানো। কোথাও কোনো লোকজন নেই। এদিকে ওদিকে একটু ঘোরাঘুরি করলাম। দরজায় হাত রাখতেই খুলে গেল। ঝকঝকে ঘরটা। ফিটফাট বিছানা। একদিকে ছাদ পর্যন্ত উঁচু জানালা। বিছানার ওপর এক গোছা চাবি। ঘরের দরজা, ওয়্যারড্রোব, লকার, ডেস্ক-ড্রয়ার, সবগুলোর চাবিই পেয়ে গেলাম একসাথে। স্কলারশিপ অফার লেটারের সাথে যে কাগজপত্র ছিল তার মধ্যেই ছিল এ রকম দিকনির্দেশনা যাতে করে কারো সাথে একটা কথা না বলেও ঠিকানা পেতে সামান্য বেগ পেতে হয়নি আমার। সেই ধারণার আলোকেই এভাবে হোটেল বুকিং ছাড়াই চলে এসেছি। কী যে অপেক্ষা করছে আমার জন্য!
ঠিক সময়ে রানওয়ে ছুঁয়ে দিল প্লেনটা। সব মিলিয়ে ষাটজন যাত্রী। এক ধরনের মাইক্রো টাইপের বাহন পেলাম শহরে যাওয়ার জন্য। ৫-৬ জন করে নিয়ে প্লাটফরম ছেড়ে যাচ্ছে গাড়িগুলো। একজন জানতে চাইল আমি কোথায় যেতে চাই। বললাম ভিটিটি বায়োটেকনোলজি যেতে চাই আমি। রাত এগারোটা হলেও তখনও এক ঘন্টা হয়নি সন্ধ্যার। তবু এক ধরনের থমথমে শহরের মধ্যে ঘুরে ঘুরে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের গাড়িটা। মাঝে মাঝে থামছে। এক দু’জন নামছে। একসময় আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেল ভিটিটি বায়োটেকনোলজি নামক প্রতিষ্ঠানটির সামনে। রাত্রি হলেও বেশ অনেক দূর অবধি দৃষ্টি চলছে। রাস্তার আলো ছাড়াও অদ্ভুত এক আলোতে নিমজ্জিত গোটা শহর। অরোর্যা নয়, হয়ত টুইলাইট হবে; কি জানি!? আওমোরি শীতের জায়গা। তুষারপাতের রাতে আকাশ থাকে উজ্জ্বল। বরফের ওপর বৈদ্যুতিক আলোর প্রতিফলনে ওরকম হয়। কিন্তু এটা গ্রীষ্মকাল। জুনের প্রথম সপ্তাহ। তাই শীতের প্রস্তুতি নেয়ার দরকার মনে করিনি। অথচ পড়েছি শীতের যন্ত্রণায়। ব্রিফকেস খুলে যা কিছু পরার মতো ছিল পরে নিলাম। তারপরও আফসোস হলো এখানকার তাপমাত্রা সম্পর্কে না জেনে আসার জন্য। পরে জেনেছিলাম জুনের এ সময় ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে তাপমাত্রা, যা আমাদের শীতের মৌসুমে সম্ভব।
কড়া নাড়লাম; কলিং বেল বাজিয়ে বাজিয়ে অবশেষে সব আশা ছেড়ে দিলাম। কেউ নেই ভেতরে। এটা গবেষণা প্রতিষ্ঠান। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বিল্ডিং অথবা গবেষণাগার ধরনের। রাতে সেখানে লোকজন পাওয়া যাবে কেন? অদূরে একটা হোটেল রেস্তোরাঁ ধরনের বিল্ডিংয়ের গেটে ভিড় দেখলাম। এগিয়ে গেলাম। মদ খেয়ে মাতলামিরত মনে হলো মানষগুলোকে। একজনকে ডেকে বললাম, আমি ফাইটোকেমিক্যাল সোসাইটি অব ইউরোপের কনফারেন্সে এসেছি। ভেনু রিসোর্টের ঠিকানাটা দেখালাম। একজনকে জানতে চাইলাম, আপনি জায়গাটি চিনেন কি? জবাবে যা বললেন তা আমার বোধগম্য হলো না। তারপর আরেকজনকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি একজনকে নিয়ে এলেন যিনি ইংরেজিতে খুব পারঙ্গম। কিন্তু অর্থহীন এক ধরনের হাসিতে মেতে আছেন লোকটা। বললেন, এখানে ঘুমোবার কোন জায়গা নেই। আবার ফিরে এলাম আগের জায়গায়। ভিটিটি বায়োটেকনোলজির গেটে। তখন রাত ১টা। গাংচিলেরা উড়াউড়ি করছে। বন্যপ্রাণীরা অস্বাভাবিক কোনকিছু খুব তাড়াতাড়ি ধরে ফেলে। আমাকে এ অবস্থায় দেখে ওদের তেমন কোনকিছু হয়ত মনে হয়েছে। তার ওপর চামড়ার রঙটা তো ওখানকার জন্য মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। হতে পারে সে কারণেই ওরা আমাকে নিয়ে মাতামাতি করছে। আমার মাথার ওপর উড়ছে আর গলা ছেড়ে ডাকাডাকি করছে। যারা টার্ন জাতীয় এইসব পাখিকে চিনেন তারা বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবেন। বেশ কিছুক্ষণ পর পর দু-একটা গাড়ি যাচ্ছে। কাছেই ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো কিছু খরগোশ। জোড়া পায়ে লাফাতে লাফাতে একেবারে আমার কাছে চলে এলো বলে। আমি একটু নড়ে উঠতেই অমনি পালিয়ে গেল। বেশ ভালো লাগছিল এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাত জাগতে; গাংচিল আর খরগোশের খেলা দেখতে। হেলসিংকি আমার কাছে মনে হলো একটা জঙ্গলময় শহর। বিভিন্ন দেশের অনেক শহর ঘুরে দেখেছি আমি, আগেও বলেছি। কিন্তু এমন বনবীথিময় অট্টালিকাশোভিত শহর যেন একটিও দেখা হয়নি। প্রশস্ত রাস্তা; হালকা বুনটের বাড়ি সজ্জিত আবাসিক এলাকা; অনেক সময় শহর মনে হতে চাইবে না। তার ওপর গাংচিল আর খরগোশদের এমনধারা বিচরণ। খুব ভালো লাগলো গাছগাছালিময় এমন একটা শহর পেয়ে।
সময় বয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ যেন আলো ফুটে উঠল। তখন রাত সাড়ে তিনটা। পাঁচটার আগেই উঠে গেল সূর্য। অদূরে একটা বাস স্টপ পেলাম। পুরু কাচের ছাদ। তিন দিকে কাচের দেয়াল। মাঝের বড় দেয়ালটায় শহরের মানচিত্র। তাতে লাল তারকা দিয়ে চিহ্নিত করা আছে এই স্টপেজটি মানচিত্রে কোথায়, অথবা কোথায় আছি আমি? অপর দু’টি দেয়ালে পাবলিসিটি। সামনে একপাশে একটা স্ট্যান্ডে বাসের সময়সূচি, রুটম্যাপ আর বাসের রুট নাম্বার লেখা আছে। এ ধরনের ব্যবস্থা যে খুব ব্যয়বহুল তা নয়। এটা রুচির ব্যাপার। আমাদের দেশের মন্ত্রী- ল’-মেকারেরা বিদেশ ভ্রমণ করেন, এসব দেখেন কিন্তু এসব সুবিধা দেশের মানুষের জন্য আমদানি করেন না। যাত্রীদের জন্য কত সুবিধা দেয়া হয়েছে। তাদের সম্ভাব্য সব ধরনের প্রশ্নের জবাব আছে। একবার তৈরি করে নিতে পারলেই হলো। একটিও কথা বলার দরকার নেই। রাতের জন্য বাতির ব্যবস্থা আছে। টেলিফোন সুবিধাও আছে কাছাকাছি। তবে বাসে চড়ে চালকের হাতেই ভাড়া পরিশোধের নিয়ম। এটি লুক্সেমবার্গেও দেখেছি। এক্ষেত্রে আমার দেখা সুইজারল্যান্ড একধাপ এগিয়ে। বাসস্টপগুলো একই রকম দেখতে হলেও প্রতিটি বাসস্ট্যান্ডে আছে অটোমেটিক টিকিট মেশিন। বাসে চড়ে চালককে বিরক্ত করার কিছু নেই। বাসে কোনো কন্ডাক্টরও নেই। টিকিট চেকিংয়ের জন্য আছে ভ্রাম্যমাণ একটি দল। তাদের সাথে যাত্রীদের দেখা হয় কালেভদ্রে। এত নির্বিঘœ আর পরম নিশ্চিন্ত নগরপরিবহন আর হয় না। আমি বিষয়টা অনেকবার ভেবে দেখেছি। এখানে হেলসিংকিতে চালকের সাথে কথা বলার দরকার হয়। আর ভাড়া পরিশোধ নিয়ে একটু হলেও সময়ক্ষেপণ হবেই। তবু ব্যবস্থাটা বেশ ভালোই বলা যায়। একটি বাস পেলাম যেটা আমার কাক্সিক্ষত রুটে যাবে বলে জেনেছি। চড়ে বসলাম। এগিয়ে যাচ্ছে বাস। কখনও রাস্তা, কখনও সেতুর ওপর দিয়ে, কখনও টানেলের ভেতর দিয়ে। সমুদ্র যে নিকটেই তা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে ছোট ছোট দ্বীপ জোড়া দিয়ে হেলসিংকি শহরের বিস্তৃতি। আগেই বলেছি এটি লাখো দ্বীপের দেশ, লাখো হ্রদের দেশ। জল আর স্থলের বুননীতে অসাধারণ এক ল্যান্ডস্কেপ এই ফিনল্যান্ড।
বাসটি আমাকে নিয়ে এলো হেলসিংকি রেলওয়ে স্টেশনে। সামনে বিশাল চত্বর। জায়গাটা আসলে হেলসিংকি সিটিসেন্টার। এখানে গাছগাছালি কম। জিজ্ঞেস করতেই আমাকে দেখিয়ে দেয়া হলো কিভাবে আমি মেট্রো রেলওয়ে পেতে পারি। চড়লাম মেট্রোতে। সব দেশের মেট্রোগুলো কমবেশি একই রকমের। মাথার কাছে ছাদের কোণে রুট-ডিরেকশন দেয়া আছে। স্টেশনগুলোর নাম লেখা আছে ২-৩টা ভাষায়। ছোট্ট এই দেশে কয়েকটা ভাষা প্রচলিত। কোন কোনটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা খুবই কম। তবু অমর্যাদা করা হয়নি তাদের ভাষার। সমান রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা ভোগ করছে সব ভাষাই। সভ্যতার এই বিশেষ নিদর্শন একসময় আমাদের বিবেচনায় ঠাঁই পায়নি, উল্টো সুললিত এই বাংলা ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জীবন দিতে হয়েছে অনেককে। বাংলাদেশে জীবন দিয়েছেন একজন শিশুসহ ৫ জন আর ভারতের আসামে ১১ জন। আমাদের জবান রক্ষা হয়েছে, স্বাধীন ভূখন্ড লাভ হয়েছে, নির্মম ওই হত্যাকান্ডের দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে পাওয়া হয়েছে। আমাদের এত কিছু অর্জন হলেও ঐ ১১ জনের জীবনের দাম মেলেনি। আসামে অফিসিয়াল ভাষার স্বীকৃতি পায়নি বাংলা ভাষা। মানুষের এই আদিসত্তা নিয়ে ফিনিশদের সহানুভূতির জন্য তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অনেক বেড়ে গেল। মনে হলো আমার সামনে দাঁড়ানো কিংবা বসা সাদা সাদা মানুষগুলো আসলে সাদা মনের মানুষ। একটা করে স্টেশন আসছে, আর ঐ স্থানের নামটির ওপর লাল বাতিটা জ্বলে উঠছে। আবার চলতে শুরু করলে পিটপিট করছে সেটা। আবার পরের স্টেশন এলেই সেটির নামের ওপর লাল বাতিটা জ্বলে উঠল। এভাবে একসময় এলো ভুসারি স্টেশন। বের হয়ে এলাম একটি শপিং মলের সামনে। ব্রিফকেস থেকে কাগজপত্র বের করলাম। যে ঠিকানা আর পথনির্দেশনা দেয়া আছে সে অনুযায়ী আমার গন্তব্যটি আর খুব বেশি দূরে না। মানচিত্র ধরে এগিয়ে চললাম। যেতে হবে কাল্লাহতি এলাকায়। সড়কের নাম কালভিকিন্তিয়ে। ভুসারি, কালাহতি, কালভিকিন্তিয়ে- এই নতুন শব্দগুলোর সঠিক উচ্চারণ আমার জানা ছিল না। তাই কাগজপত্র দেখিয়ে পথ দেখিয়ে নিলাম। একবার প্যারিসের আউটার সার্কেলে যাবো আমি। জায়গার নাম বানান করলে জি ইউ আই আর আই এন; উচ্চারণ করলে হবে ‘গুইরিন’ বা ‘গাইরিন’। লোকজন পাচ্ছি আর জানতে চাচ্ছি এখানে ‘পাস দু দক্তর গুইরিন’ কোনটা? কাউকে আবার জিজ্ঞেস করছি, এখানে ‘পাস দু দক্তর গাইরিন’ কোনটা? দক্তর শব্দটা হয়তো আপনারা বুঝতে পারছেন ডক্টর, মানে কিন্তু ডাক্তার নয় ডক্টর; কারণ ফরাসি ভাষায় ডাক্তার কে বলে মেদেসাঁ। কিন্তু অত সহজে আমার ঠিকানাটা মেলেনি। অবশেষে যখন কাগজে লেখা বের করে দেখালাম, এক বুড়িমা চিৎকার করে বলে উঠলেন, “উই! ‘পাস দু দক্তর গিরাঁ’…সেতেলা বা”। মানে- হ্যাঁ, ডক্টর গিরা-র ভবনটা ঐ যে ওখানে।
এগিয়ে যাচ্ছি ঘন বন সোভিত থমথমে রাস্তা। দুই ধারে ফাঁকা ফাঁকা দু’ একটা বাড়ি। উঁচু উঁচু পাইনের গাছ। দিনের বেলায়ও অন্ধকারের আবেশ। গা ছম ছম করছে। শুনেছি ভল্লুকও আছে। অনেকক্ষণ পর পর হঠাৎ করে দু’একটা গাড়ি চলে যাচ্ছে। আমি যে দিকে যাচ্ছি সেদিকে অথবা তার বিপরীত দিকে। বাড়ি চোখে পড়লেও দরজা-জানালা খোলা আছে মনে হয়নি। ভয় ভয় লাগছে। আমরা বাংলাদেশের লোক। বাংলাদেশ পৃথিবীর এমন একটি দেশ যার জনসংখ্যার ঘনত্ব আর কোনো দেশই অতিক্রম করতে পারবে না। এত অল্প জায়গায় এই বিশাল জনগোষ্ঠী এ বিশ্বে আর কোথাও নেই। আমাদের দেশটিকে তাই বলা চলে একটা বড়সড় হাট। সারাদিন চারিদিকে হইচই কোলাহল। মনে হয় যেন কোন উৎসব চলছে। উৎসব চলছেই, যার কোন শেষ নেই। এই পরিবেশে আমরা এমনই অভ্যস্ত যে- এমন সুনসান শান্ত এক শহরে এসে আমার ভয় ভয় লাগছে। একজন লোকের কথা মনে পড়ছে। তিনি ঢাকায় থাকেন। অফিসিয়াল কাজে রাজশাহীতে এসেছিলেন। আমার শহর রাজশাহী কেমন লাগল আপনার? মুখ ব্যাদান করে বললেন, ‘একদম ভালো লাগেনি’। বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘মানে’! বললেন, ‘কেমন যেন চুপচাপ, সুনসান, স্থবির… নি®প্রাণ শহর রাজশাহী। মনোটেনাস কেটেছে দুটো দিন’। আমি চুপসে গেলাম। অবাক হলাম। বলেন কি ঢাকার লোকটা!? ঢাকার গমগমে জনবহুল রাস্তা। যে দিকে চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। সবাই ব্যস্ত। মহাব্যস্ত। কোথায় কি যেন হয়েছে? রাস্তার দু’ধারে দুর্গন্ধময় খোলা ড্রেন। মাঝে মাঝে রাস্তার ওপর ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। তার ওপর কান ফাটানো হর্ন বাজিয়ে রাস্তাময় ধেয়ে চলেছে লক্কড় ঝক্কড় বাসগুলো। সহসাই জ্যাম লেগে যায়, ঘামে নেয়ে যায় যাত্রীরা, দমবন্ধ হয়ে আসে। সেই ঢাকা-ই তার স্বর্গধাম! স্নিগ্ধ শান্ত রাজশাহীর জনপদ তার ভালো লাগবে কেন? ধীর-শান্ত সেই রাজশাহীর লোক আমি। আমার কাছে হেলসিংকির উপকণ্ঠ তেমনি গা ছমছমে ভূতুড়ে মনে হচ্ছে। যদিও আমি ফিনল্যান্ডের সবচেয়ে জনবহুল এলাকায় অবস্থান করছি। আমার কোলাহলময় বাংলাদেশের একটা মুহূর্ত যে কত মূল্যবান তা এই নীরব নিথর ফিনল্যান্ডে এসে বুঝলাম। আর বুঝতে পারলাম ঐ ঢাকাবাসীর অনুভূতিটাও। তার ওপর আমার কোন অভিযোগ নেই। মানচিত্র ধরে এগিয়ে যেতে যেতে অবশেষে লোকজনের দেখা পেলাম। আরেকটু এগোতেই আমাদের কনফারেন্সের একটা ব্যানার দেখা গেল। লবিতে পার্টি চলছে। পার্টিতে যোগ দিতেই রেজিস্ট্রেশনের জন্য নির্ধারিত ডেস্কটা চোখে পড়ল। পরিচয় দিয়ে অনুষ্ঠানসূচি, ব্যাগ, স্যুভেনির, নেম-ট্যাগ, লাঞ্চ কুপন, ডিনার কুপন, হোটেল কক্ষের চাবি, সবই পেয়ে গেলাম। কনফারেন্সের সাথী আয়োজন ট্যুর-ট্র্যাভেলেও বুকিং দিলাম। আর ফ্রি অফার পেলাম সাউনা।
সাউনা। আসল উচ্চারণটা মনে হয় ‘ছাউনা’ হবে। এটি নরডিক দেশগুলোতে পাওয়া গেলেও ফিনিশদের এটি বিশেষত্ব; এটি শরীর ও মনোজাগতিক পরিশুদ্ধির জন্য এক অনন্য সাধারণ ব্যবস্থা। কাঠের তৈরি ঘর- যার মেঝে, দেয়াল, ছাদ, সবই কাঠের। অথবা ভেতরটায় কাঠের আস্তরণ দেয়া। মেঝের কোনো এক স্থানে রাখা আছে বড় বড় পাথরের চাঁই। পাথরের চাঁইয়ের মধ্যে হিটার বসিয়ে সেটা গরম করা হয়। কাঠ-কয়লা, গ্যাস বা বিদ্যুৎ যে কোন উপায়ে হোক। উত্তপ্ত সেই পাথরের ওপর জলের ছাঁট দিলে তৈরি হয় গরম বাষ্প। ক্রমাগত জলের ছাঁটে গরম জলীয় বাষ্পে ভরে যায় ঘরটা। ঠান্ডার দেশে উদম শরীরে এই গরম বাষ্পময় কাঠের ঘরে কাঠের বেঞ্চে বসে থাকা যে কী আরামের তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমি একা নই, একসাথে নারী-পুরুষ মিলে সাউনার সেই ঘরটাতে ঠাসাঠাসি করে দশ বারো জন। আমার আদুল গায়ের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ কাপড়ে ঢাকা আছে, আর ইউরোপীয়দের আছে তারও ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ পঁচিশ শতাংশের পঁচিশ শতাংশ। তির তির করে ক্লেদময় ঘাম ঝরে যাচ্ছে; নিজেকে হালকা মনে হচ্ছে। হালকা হয়ে উড়ে যাচ্ছে মনটা। মেডিটেশনের উপযুক্ত আবহ তৈরি হয় সাউনার মধ্যে। এই ফিনল্যান্ডে ৫.৪ মিলিয়ন বাসিন্দার জন্য সাউনা আছে ৩.৩ মিলিয়ন। গড়ে প্রতিটি পরিবারের জন্য একটিরও বেশি। বর্তমান ক্লিনিক ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত শতকরা একশো ভাগ মা-ই সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এই সাউনাতেই। হ