কার দোষ? জামানার নাকি আমাদের। কোন দিকে যাবে? যেদিকেই যাবে শুধু অভিযোগ শুনবে। ভ্রুকুটি দেখতে পাবে। সবাই বলে- জামানা বড়োই সঙ্কীর্ণ। ক্ষয়িঞ্চু। অবমাননাকর। সমৃদ্ধি দু®প্রাপ্য। আগের জামানা এর থেকে অনেক ভালো ছিলো। এ জামানায় জালেম হলেও কোনো দোষ নেই। আসলে আমরা জামানার ওপর জুলুম করি। তথাপিও আমরা এসব বলে থাকি। হয়তো জীবনকাঠিন্যে বিরক্ত হয়ে, কিংবা বাস্তবতা থেকে পালাতে গিয়ে, কিংবা অতীত অন্ধকার কল্পনা করে। আসলে অতিরিক্ত আশাই এসব কষ্টের কারণ। এমন ক্ষিপ্ততার কারণ জালাল আফেন্দি রাগিবের ব্যাপারে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা। ৪৬ বছর বয়সেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তার করণিকের চাকরি। আল্লাহ জীবনের একদিকে প্রাচুর্যতা দেন। অন্যদিকে স্বল্পতা। আল্লাহ তাকে ছয়টি সন্তান দান করেছেন। তার ছোটটা মায়ের কোলে আর দ্বিতীয়টির চার বছর। তার বেতন মাত্র সতেরো গিনি। ফলে সংসারের কষ্ট লেগেই থাকে। আবার মজাও পান। সন্তানদের স্কুলের খরচ দিতে হাঁফিয়ে ওঠেন। ছেলেদের বেতন কিংবা সেশন ফি দেবার সময় প্রায়শ বিরক্ত হয়ে বলেন, আমি একজন মানুষ যার ছয় ছয়টা বেটা। দু’জন পড়ে প্রাইমারিতে। দু’জন মাধ্যমিকে। একজন উচ্চমাধ্যমিকে। শেষজন বাড়িতে। তাদের কারো স্ত্রী নেই। অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের কারোর শিক্ষাব্যয় মওকুফ করেনি। কবে ছেলেদের বেতন মওকুফ হবে, কার বেতন মওকুফ হবে? তার মতোই দেশের অধিকাংশ মানুষ ন্যায়বিচার বঞ্চিত। হতাশ। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস- এমন সুযোগ কেউ পায় না। তবে নিকটাত্মীয়, শ্বশুর-জামাই, বন্ধু-বান্ধব থাকলে সেটি আলাদা কথা। এ কষ্ট মোচনের কোনো উপায় নেই। বছরের পর বছর এ কষ্ট চলতেই থাকবে। জীবন নিয়ে বাঁচতে হলে ধৈর্যধারণ করেই বাঁচতে হবে।
এভাবেই তার চলে যায়। আশার আলো সে দেখতে পায় না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ন্যস্ত হন মাননীয় হাদি বেগ শামিল। নিজ কানে সে নতুন মন্ত্রীর নাম শোনে। নামটি তার কানে বাজে। মানসপটে তার ছবি ভেসে ওঠে। তাকে দেখতে পায়। তার তমসাবৃত নিকষ কালো দিগন্তে নতুন প্রত্যাশার আলো ঝকমক করে ওঠে। সে আকস্মিক উচ্চাশায় আন্দোলিত হয়। নিজেই বলে : তার সাথে দেখা করা উচিত। সমস্যা তাকে জানানো প্রয়োজন। সে কি আমার কথা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে? আমি বিশ্বাস করি না। একদিন সে মন্ত্রীর সচিবের কাছে যায়। মন্ত্রীকে তার কার্ড পাঠায়। সচিব কার্ড নিয়ে মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে যায়। আর সে চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করতে থাকে। সচিব দ্রুত ফিরে এসে জালাল আফেন্দিকে জানায় :
– মহামান্য পাশা আজ অনেক ব্যস্ত। দয়া করে আগামীকাল মধ্যাহ্নের আগেই আসবেন।
আফেন্দি কষ্ট পায়। তার কক্ষে ফিরে আসে। দীর্ঘ চাকরিজীবনে সে অনেক নেতা, পাশা, প্রশাসকের ঘনিষ্ঠতা পেয়েছে। তবুও আজ শিক্ষামন্ত্রীর ব্যস্ততা তাকে যারপরনাই কষ্ট দেয়। এ কষ্ট তার যেকোনো কষ্টের চেয়ে বেশি ছিলো। সে নিজেকে জিজ্ঞেস করে। এও কি হয়? তার কাছে যাবারই প্রয়োজন ছিলো না। তবুও সচিবের পরামর্শ মোতাবেক পরদিন মধ্যাহ্নের পূর্বেই মন্ত্রীর কাছে যায়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে। সচিব ডাক দেয় :
– আসুন।
দুরুদুরু মনে দ্রুত ওঠে দাঁড়ায়। প্রহরী দরজা খুলে দেয়। আফেন্দিকে কক্ষের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। কার্পেট, গালিচা বিছানো সুসজ্জিত কক্ষ। মন্ত্রীর আসনের দিকে তাকায়। আসনে মন্ত্রী উপবিষ্ট। গোছগাছ টেবিল। মন্ত্রী কারো উপস্থিতি টের পান। জালাল আফেন্দির দিকে তাকান। হাত বাড়িয়ে দেন। ঠোঁটে মুচকি হাসির রেখা টেনে বলেন:
– আরে তুমি! নামটি শুনেই আমি সন্দেহ করেছিলাম। তুমি এখনো বেঁচে আছো?
এমন তামাশায় জালাল আফেন্দি খুশিই হয়। প্রবোধ পায়। বিনয় ও শ্রদ্ধার সাথে বলে:
– জি! মহামান্য পাশা। আমি এখনো আমার ভাগ্য নিয়ে বেঁচে আছি।
মন্ত্রী প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। পশ্চাতে ঈষৎ ঝুঁকে পড়ে। বিরবির করে বলে:
– আফেন্দি!
জালাল আফেন্দি বলে:
– মহামান্য পাশা আমি আপনার সমীপে এসেছি কিছু অভিযোগ করতে। যা আমি দীর্ঘদিন যাবৎ করে আসছি। আমার পরিবার বেশ বড়ো। ছেলেমেয়েও অনেক। কিন্তু আমার বেতন কম। আমি বাড়তি বেতন কিংবা প্রমোশন চাই না। আমি বিনয়ের সাথে প্রার্থনা করছি- শিবরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আমার দু’ছেলে পড়াশোনা করে তাদের শিক্ষাব্যয় মওকুফ করে দেবেন।
– দু’জন একসাথে পড়ে?
– জি! মন্ত্রী মহোদয়। আপনার বদান্যতা আমার আশার আশ্রয়। আমি আপনার প্রতিবেশী। ছাত্রাবস্থা থেকে আমরা একই মহল্লায় বসবাস করছি। আমার ভাগ্য কি অন্য সবার মতো হওয়া সমীচীন? কারণ আমার আরো চারটি সন্তান রয়েছে আপনি তাও জানেন।
মন্ত্রী মহোদয় বলেন :
– লিখে দাও তো।
আফেন্দি প্রস্তুতই ছিলো। সে পকেট থেকে আবেদনপত্র বের করে। মাননীয় মন্ত্রীকে দেয়। মন্ত্রী চোখ বড়ো করে তাকায়। কলম নেয়। সুপারিশ লেখে। স্বাক্ষর করে। বলেন:
– এবার নিশ্চিন্তে থাকুন।
জালাল আফেন্দি ঈষৎ ঝুঁকে সালাম জানায়। মন্ত্রী তাকে খুশি করেন। হাত এগিয়ে দেন। প্রশান্ত চিত্তে মন্ত্রীর কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে। সচিবালয়ে তার অফিসে যায় না। অবাক হয়ে নিজেই বলে : হামিদ শামিল একটুও পরিবর্তন হয়নি। আগের মতোই আছে। বয়সের ছাপও পড়েনি। যেনো এখনো পূর্ণ যুবক। কেউ কি বিশ্বাস করবে আমাদের দু’জনের বয়সই পঁয়তাল্লিশ। আল্লাহর কসম! আমাকে সবাই তার বাবার বয়সী ভাববে। মন্ত্রীর সাথে তার পুরনো সম্পর্ক নিয়ে চিন্তা করে সে। বাড়ি যায়। দুপুরের খাবার খায়। শোয়। সিগারেট জ্বালায়। স্মৃতি হাতড়ায়। ভুলতে বসা অতীত স্মৃতিতে সন্তরণ করে। মনে পড়ে ক্লাসে সে আর হামিদ শামিল পাশাপাশি বসতো। একই আসনে। তাদেরকে আলাদা করা যেতো না। যেনো মানিকজোড়। হামিদ শামিল তার দিকে তাকিয়ে থাকতো। একসাথে স্কুলে যাতায়াত করতো। কালো পোশাক পরতো। সে তার সাথে ছায়ার মতো চলতো। তারা গাড়িতেও বসতো একসাথে। একজন অন্যজনের সাথে আঠার মতো লেগে থাকতো। বন্ধুরা এ নিয়ে ঠাট্টা করতো। কী আশ্চর্য! ছাত্র হামিদ আর মন্ত্রী হামিদের মধ্যে কতো পার্থক্য! ছাত্রাবস্থায় দু’জন একই রকম ছিলো। আরো আর্শ্চযের বিষয়- দু’জন একই আবেগের অনুবর্তী হয়ে চলতো। দুঃখ-কষ্ট ভাগাভাগি করতো। খেলাধুলার প্রতিযোগিতা তাদের মাঝে হতো। তখন তারা হতো দু’জগতের বাসিন্দা। একাডেমিক প্রতিযোগিতা তাদের লেগেই থাকতো। এক্ষেত্রে তাদের জয়-পরাজয় একমুখী হতো না। একবার হামিদ ভালো করলে অন্যবার জালাল। কেউ বরাবর একই রকম রেজাল্ট করতো না। তবে জালালের বিজয়ের পাল্লাই ভারী। ফুটবল খেলার মাঠেও তাই হতো। দু’জনই পরিশ্রমী খেলোয়াড়। ক্রীড়া শিক্ষক তাদের জায়গা বদল করে দিতেন। শেষে জালালই শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেতো। হামিদ শামিল খেলা ছেড়ে দেয়। তাদের প্রতিযোগিতায় দুনিয়া সঙ্কীর্ণ হয়ে যেতো। যেনো তাদের যুদ্ধ সর্বদার। সর্বক্ষেত্রেই তারা প্রতিযোগিতা করবে। চাকরি, খেলাধুলা, প্রশাসন, মন্ত্রণালয় সবখানে। এখন কোথায় তার প্রতিযোগিতা আর কোথায় তার ভাগ্য উন্নয়ন? এও কি সম্ভব-এক আসনের দুই বন্ধু। তাদের একজন মন্ত্রী অন্যজন মশামারা কেরানি। কষ্ট ও প্ররোচনায় তার বুক ভেঙে আসে।
সিগারেট নিভিয়ে দেয়। সিগারেট এস্ট্রেতে ফেলে দেয়। বিরবির করে বলে: আল্লাহর কসম! তার কী যোগ্যতা আছে মন্ত্রী হবার! মন্ত্রীর সচিব বা অন্য কিছু হতে পারতো। কেন সেসব হলো না? কেন সে মন্ত্রী হলো? সে মিথ্যা অপবাদের আশঙ্কা করে। পুরনো বন্ধুত্বের ভয় পায়। নিজেকেই প্রশ্ন করে। মন্ত্রীর জীবনী লিখতে মনস্থ করে। কিভাবে সে মন্ত্রীর চেয়ারে উপবেশন করেছে। দু’জনই মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করে। সে সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। তার পড়াশোনা বন্ধ হবার কথা মনে হলে তার মুখ শুকিয়ে আসে। আর তার বন্ধু আইন স্কুলে ভর্তি হয়। পরে লিসান্স করে। তার বাবা মুহাম্মদ পাশা শামিল ছিলেন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। তিনি তাকে তার একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। এটি ছিলো চাকরিতে তার প্রথম জাম্প। পরে সে সাংবাদিকতা পড়ে। ফ্রান্সে ডেপুটেশনে যায়। সেও জানে না কতো দিন সেখানে ছিলো। সেখানে তার কতোদিনের পারমিট ছিলো। সে ফ্রান্সে যাবার পরপর কারিমা নাম্নীয় এক মহিলাকে বিয়ে করে। তার পিতা প্রয়াত হামিদ পাশা হামিদ। বারবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। ফলে সে খুব দ্রুত একান্ত সচিব-৫ থেকে আইন বিভাগের একান্ত সচিব-৩ এ উন্নীত হয়। কিছুদিনের মধ্যেই তাকে আসওয়ান অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে কানাল অঞ্চলের প্রশাসক করে পাঠানো হয়। এরপর একবারে শিক্ষামন্ত্রী। মন্ত্রীর দায়িত্ব পাবার কয়েক সপ্তাহ না যেতেই দেশের পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন ইত্যাদিতে ফলাও করে তার আইনি দক্ষতা, প্রশাসনিক যোগ্যতা, শিক্ষা-সংস্কার ইত্যাদি ছাপা হতে থাকে। এসব কথা জালাল আফেন্দিকে বিশ্বাস করতে হয়। যদি সে মন্ত্রী মহোদয়ের শিক্ষাজীবনের একাডেমিক উৎকর্ষতার কথা, তার জ্ঞানের কথা, খেলাধুলার পারঙ্গমতার কথা না জানতো তাহলে কথা ছিলো। অথচ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেন হয়তো ইনি শীঘ্র কেবিনেট মন্ত্রী হবেন। এসব বলতে বলতে সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। টিপ্পনী কেটে বলে: “এবার আমি তার আইনি দক্ষতা ও প্রশাসনিক যোগ্যতার রহস্য বুঝেছি।”
জালাল আফেন্দি রাগিব হাই তোলে। বিরবির করে বলে: ‘দুনিয়া’। সে এসব চিন্তা বাদ দেয়। একটা ম্যাগাজিন হাতে নেয়। পাতা উল্টায়। ছবি দেখে। ম্যাগাজিনের বিশেষ পাতা খোলে। মন্ত্রীর সাথে তার স্মৃতি হাতড়ায়। পাতাটি ছিলো মন্ত্রীর সম্মানে। পৃষ্ঠার মাঝখানটায় মন্ত্রীর বড়ো একটি ছবি। ছবি দেখে অবাক হয়। চিৎকার করে ওঠে : ‘হায় হায়! এতো আমাদের ক্লাসের পুরাতন ছবি।’
জালাল আফেন্দি ছবি দেখে। তাকিয়েই থাকে। স্যার পেছনে। প্রথম সারিতে সে দাঁড়ানো। মন্ত্রীর ডানপাশে। সে ছবির চশমার দিকে তাকায়। মুচকি হাসে। প্রত্যয়ী হয়। মন্ত্রী ভ্রুকুটি পূর্ণ। তার ডানপাশের ভ্রুতে একটি মাছি। জালাল আফেন্দি হাসতে থাকে। তার মাছির গল্পের কথা মনে হয়। আসলে মাছিটি তারই কপালে পড়েছিলো। ছবির সৌন্দর্য নষ্ট হবে বলে সে মাছিটা তাড়িয়ে দেয়। আর তা উড়ে গিয়ে তার পাশের বন্ধুর (বর্তমানের মন্ত্রী) কপালে বসে। তার আফসোস হয়। কেনো সে মাছিটিকে তাড়িয়েছিলো। সম্ভবত মাছিটি ভাগ্য বহনকারী মাছি ছিলো। মন্ত্রীর কপালে সে চুপচাপ বসে থাকে। জালাল আফেন্দি ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। সে অতীতে সন্তরণ করে। স্মৃতিরা তার কাছে ফিরে আসে। যৌবনে ফিরে যায়। কপাল ও কপোলের ভাঁজ মিলে যায়। দৃষ্টির প্রখরতা বৃদ্ধি পায়। দুশ্চিন্তা, হতাশা চম্পট দেয়। প্রত্যাশা ও প্রশান্তিতে প্রণোদিত হয়। এবার ছোট ছবিগুলোর দিকে নজর দেয়। নিজেকে জিজ্ঞেস করে: দেখলে তো কিভাবে তারা এমন হলো? এবার শেষ পৃষ্ঠার প্রথম ছবিতে নজর দেয়। চিনতে পারে। তার নাম মনে করে। আব্দুল মালিক হেনা। ছাত্রজীবনে তার কষ্টের কথা মনে পড়ে। শেষত তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। ছবির শেষের লাইনে যারা তাদেরকে মনে করতে চেষ্টা করে। অনেকের নাম ভুলে গেছে। তারা এখন কে কোথায় কী করছে জানে না। দ্বিতীয় সারির একজনকে চিনতে পারে। গতকালই তার সাথে কথা হয়েছে। সে জাঁদরেল উপদেষ্টার ছেলে। এ প্রভাবকে সে যথাসম্ভব কাজে লাগাতো। তাকে সবাই সালাম জানাতো। সেও উপভোগ করতো। শিক্ষকরা তাকে ¯েœহ করতো। সে জানতো প্রথমে ভারপ্রাপ্ত বিচারক ও পরবর্তীতে বিচারপতি পদে নিয়োগ পাবে। পেয়েছেও তাই। এ সবই তার মহান পিতার বদৌলতে হয়েছে। বাকিরা অপরিচিত। অখ্যাত। তাদের কেউ কেউ তার সাথে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের করণিক। তারা তার পরিচিত। লাইনের শেষে যে ছেলেটা কটমট করে তাকিয়ে আছে। হাত দুটো বুকে বেঁধে রেখেছে। এ ছেলেটি বড়োই দুর্ভাগা। সে সর্বদা ঝগড়া-বিবাদে লেগে থাকতো। এক স্যারের সাথে বেয়াদবি ও স্যারকে মারার কারণে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে সে গুন্ডামি শুরু করে। বারবার জেলে যায়।
আরো কিছু ছবির ওপর তার নজর যায়। তাদের কাউকে চিনতে পারে না। তবে ড. হেনা আব্দুস সাইয়্যেদকে চিনতে পারে। প্রথম সারির মাঝামাঝি তার ছবি। সে সব থেকে বেশি প্রতিভাবান ছিলো। সে প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত সবসময় প্রথম হতো। পরে আইনে ভর্তি হয়। সে ছিলো প্রচন্ড উদ্যোগী। প্রখর মেধাবী। সে হার্টের অসুখে আক্রান্ত হয়। স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়। পাস করা হয় না। দু’বছর পর স্বাস্থ্য বিভাগের কেরানি হিসেবে কাজে যোগ দেয়। …মন্ত্রীর ভাগ্য থেকে তার ভাগ্য খারাপ ছিলো না। ভাগ্য অনুযায়ী সবাই কাজ পেয়েছে। সবাই ভাগ্য ও প্রচেষ্টার অনুবর্তী হয়েছে। তারা সবাই একই স্কুলের ছাত্র ছিলো। তখন তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিলো না। পরিশ্রম ও অক্ষমতা তাদের মাঝে পার্থক্য নিরূপণ করে। জীবন সংগ্রামে যে যার পথ ধরে। কেউ উপরে ওঠে। কেউ পারে না। ছন্দ-পতন হয়। কেউ বেঁচে যায়। কেউ মারা পড়ে। কেউ দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হয়। আবার কেউ মন্ত্রীর আসন অলংকৃত করে। সবাই ভাগ্যকে মেনে নেয়। মেনে নিতে বাধ্য হয়।
জালাল আফেন্দি ঘড়ির দিকে তাকায়। চারটা বাজতে যাচ্ছে। ছোট ছেলের আসার সময় হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা একে একে আসবে। বাড়ি প্রাণবন্ত হবে। সজীব হবে। আলোকময় হবে। ম্যাগাজিন দূরে ছুড়ে মারে। কুমন্ত্রণা মাথা থেকে ঝেটিয়ে দেয়। সন্তানদের অভ্যর্থনার প্রস্তুতি নেয়। সান্ত্বনা পেতে নিজেকে বলে :
– এটি সমীচীন নয়- যে কেউ অন্যের ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করবে। এটি মানুষকে সঙ্কীর্ণতা ছাড়া আর কিছু দেয় না। বরং এই আমার জন্য যথেষ্ট যে মন্ত্রী মহোদয় আমাকে বলেছেন : ‘যাও নিশ্চিন্ত থাকো’।
[এ গল্পটি তার মুফতারিক আত-তুরুক গল্পের অনুবাদ]