তিনটি কাব্যগ্রন্থ নিয়ে বলবো। গ্রন্থগুলো হলো আশির দশকের অন্যতম কবি হাসান আলীমের একটি চেয়ারের গল্প, কবি ও সাহিত্য গবেষক ফজলুল হক তুহিনের উজানে উৎস এবং কবি আবু তাহের বেলালের মায়াবী পালক।
অতীতে যখন গ্রন্থ প্রকাশ কঠিন ছিল, প্রকাশনার নানা জটিলতার কারণে তখন একটি গ্রন্থ প্রকাশের ঘটনা ছিল বিশেষ আনন্দ-সংবাদ। তখন প্রকাশিত গ্রন্থ পাঠ এবং পাঠ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করাও ছিল একটি স্বাভাবিক ঘটনা। পত্র-পত্রিকা কিংবা লিটলম্যাগে প্রকাশিত গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা চলত। পত্র-পত্রিকা লিটলম্যাগগুলোও মনে করতো এটা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এখন তেমনটি দেখা যায় না। বইয়ের স্তূপ জমে গেলেও সম্পাদকরা ফিরেও তাকান না।
এছাড়া প্রকাশিত গ্রন্থ নিয়ে সিনিয়র লেখকরা যেমন জুনিয়রদের লেখা নিয়ে মাতামাতি করতেন। এতে সিনিয়র জুনিয়র নির্বিশেষে এক ধরনের ভাবের মেলবন্ধন সৃষ্টি হতো। এখন এমনটা দেখা যায় না। সিনিয়ররা অনেকটা উন্নাসিক চিন্তায় ভোগেন জুনিয়রদের বই পড়ে কি হবে। জুনিয়ররাও মাড়াতে চান না সিনিয়রদের আঙিনায়। এছাড়া মত পথের বিভাজনতো রয়েছেই। কেউ বাম, কেউ রাম, কেউবা ডান এবং ইসলাম পন্থী। চিন্তার পার্থক্য যুগে যুগে ছিল। কিন্তু ভাবের লেনদেন এখনকার মত বাধাগ্রস্ত ছিল না। এসব মোটেই শুভপ্রদ নয়।
আজ আমার ইচ্ছে তিনজন বিভিন্ন সময়ের কবিকে একটি সময়ের সুতোয় বাঁধব। সময়ের ব্যবধান যাই হোক কাব্যের দূরত্ব সমান্তরাল।
একটি চেয়ারের গল্প
হাসান আলীম শুধু কবি নন-সাহিত্য গবেষক, ছন্দ-বিজ্ঞানী, ছড়াকার ও গল্পকার। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৪০। এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থের সংখা ১৯। আলোচ্য কাব্যগ্রন্থ ১৮তম। সংখ্যা বিবেচনায় ও কথা হাসান আলীম। ১৯৮৩ সালের ছাত্রত্ব থাকাকালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ স্বাপদ অরণ্যে অগ্নিশিশু তিনি এখন নন, বরং একটি দশকের অন্যতম কবি প্রতিনিধি।
হাসান আলীম একজন কেমিস্ট। রসায়ন বিজ্ঞানে তিনি পড়াশোনা করে ঔষধ উৎপাদন শিল্পে কর্মরত ছিলেন। তাই বিজ্ঞানমনস্ক মন ও চোখ রয়েছে তার। কবিতার ভেতর তার প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি কবিতায় বিষয় ও ভাবগত ভিন্ন জগতের এক অনুসন্ধানী ব্রাজক। সর্বদাই নিরীক্ষা প্রবণ তিনি। কি বিষয় কি শব্দ নির্বাচনে ভিন্ন স্বাদ পেতে আগ্রহী।
একটি চেয়ারের গল্প কাব্যগ্রন্থ নতুন কিছু দেখার আনন্দ পাই। ছোটখাট বিষয়, চলমান জীবন। নানা অসংগতি, ব্যক্তিক শ্রদ্ধা, অভিঘাত, প্রাত্যহিকতা ইত্যাদি বিষয় কেন্দ্রিক সহজ সরল প্রকাশরীতিতে কবিতাগুলো উপভোগ্য।
কোন কোন কবিতায় সুকান্তীয় কাব্যের ধারা বেশ চমৎকার উৎরানো লক্ষ্যণীয়। যেমন-
১. ঘরে ঘরে বিপণী বিতানে, সিনেমা হলে প্রার্থনা গৃহে সর্বত্র দুর্দান্ত উড়শ পোকার প্রতিরোধ্য রাজত্ব। (খাটমন)
২. মাছিরা এখন রসায়ন বোঝে মানুষ বোঝে না। (মাছিরা বোঝে)
৩. সারিবদ্ধ পিঁপড়েরা সম্মুখে চলছে সীসাঢালা প্রাচীরের মতো। (পিঁপড়েরা)
যখন সরাসরি বার্তা পৌঁছানোর ভাষা থাকে অচল, কবিকে নিতে হয় বিকল্প পথ। প্রতীক ও রূপকের আশ্রয়। চীনে একসময় স্বৈর সরকার প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেই মাঞ্চু সরকারের ভ্রষ্টাচার ও অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন চীনের মহান এক সাহিত্যিক, চিন্তক তথা বিপ্লবী লু শূন (১৮৮১-১৯৩১)। ইতিহাস, ঐতিহ্য, কল্পকথা, প্রতীকী বর্ণনায় মানুষের ভেতরকার সত্তাকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তিনি চীনের সমাজবাদের প্রকৃত রূপকার ছিলেন। ১৯৪৯ এ চীনের লংমার্চ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পটভূমি তৈরি করেছিলেন লু শূন। কাজী নজরুল ইসলাম যেভাবে ব্রিটিশ বিতাড়নের পশ্চাৎপট সৃষ্টি করেছিলেন। এ জন্য তাঁকে কারাভোগ করতে হয়েছিল।
না এঁদের সঙ্গে হাসান আলীমের তুলনা করছি না। শুধু বলতে চেয়েছি কবিরা একটা বিপ্লবের পটভূমি তৈরি করতে পারেন। মনোভূমি তৈরি করে দিতে পারেন আদর্শের ভীত নির্মাণ করতে পারেন।
হাসান আলীম বিপ্লবী নন, ধ্যানী, আত্মানুসন্ধানী ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আকাক্সক্ষী। তার আত্মনুসন্ধানী ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার আকাক্সক্ষী। তার কবিতায় ঘুরে ফিরে নানাভাবে মৌলিক আদর্শ চেতনা ও অনুধ্যান ধরা দেয়। কখনো প্রতীকী আশ্রয়ে, কখনো খুব সরাসরি। যেমন-
১. হে প্রভু আমার শির উঁচু করে দাও মিনারের মত সপ্তাকাশ ভেদ কের আরও উর্ধ্বে আমি যেতে চাই (শহীদ মিনার দেখে দেখে) (সিয়ামের সৌরভ)
২. ইফতারির মুহূর্তে সুনশান ফাঁকা, গাড়িহীন রাজপথ যেন এক গভীর হরতাল নেমেছে। (সিয়ামের সৌরভ)
আগেই বলেছি হাসান আলীম একজন পরিণত কবি। নানা বিষয় আশয় তার কবিতার উপজীব্য। এ গ্রন্থেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। অত্যন্ত সরল ভাষায় তিনি প্রকাশ করেছেন কাব্য ভাবনা। এটা তার একটা গুণ। কবিতাকে অহেতুক দুর্বোধ্য ও জটিলতা থেকে মুক্তি দেয়ার নিপুণ কারিগর তিনি। তার কবিতা প্রকৃত অর্থে সব মানুষের জন্যই।
উজানে উৎসে
এবার কবি ফজলুল হক তুহিনের ৮ম কাব্যগ্রন্থ ‘উজানে উৎসে’ মনোযোগে দিতে চাই। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না আট কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হওয়া কবি ও একজন পরিণত কবি। তিনি ও একটি দশকে চিহ্নিত হওয়ার দাবিদার। প্রথম দশক বলা যায়। তবে এ দশকের মূল্যায়ন এখনও তেমন শুরু হয়নি। যদিও দশক অতিক্রান্ত।
ফজলুল হক তুহিনের ভেতর একটা জীবনানন্দীয় দুঃখ কাতর স্বভাব রয়েছে। কবিতায় তেমনটা ধরা পড়ে। সৌন্দর্য বোধ দৃশ্যমান জগতকে ঘিরে আবর্তিত হয় মান-অভিমানের দুঃখ কাতরতা। ইয়েটস (১৮৬৫-১৯৩৯) যেটাকে ঝবিবঃবংঃ ংড়হম বলেছেন। দার্শনিক শধহঃ বলেছেন ারৎঃঁব ধহফ রহঃবষষবপঃঁধষ ঃৎঁঃয.”
তুহিনের ভেতর একটা সততা আছে। জীবন সম্পর্কে একটা দায়বদ্ধতা সতর্ক করে দেয় তাকে সবসময়। পারিপাট্য সুশৃঙ্খল জীবন প্রণালীর প্রতি পক্ষপাত আছে। সে কারণে তার কবিতা গোছানো এবং পরিমিতির আবর্তনে বাঁধা।
মানুষের দুঃখ-কষ্টকে দেখতে পাওয়া কবির কাজ বটে। তা যদি নিজের মধ্য হতে কখনও, তাও মহত্ব। তুহিন তা দেখার চেষ্টা করেন। যেমন-
১. স্বাভাবিক জীবনের গন্তব্যের নাম সর্বস্ব হারানো অদ্ভুত উদ্বাস্তÍ বাঁচার আপ্রাণ গতিপথ বঙ্গোপসাগরে ভাসমান নৌকায় থেমেছে (রোসাঙ্গ রাজার কবি)
২. হায় একটি দৃশ্যের সঞ্চায়ন
ছিন্ন করে ফেলে সব সম্পর্কের শেকড় বাকল।
(প্রতিদিন একটি দৃশ্যের মাঝে)
টানা গদ্যরীতিতে লেখা, ছন্দের ভেতর থাকা কিংবা নানা ছান্দিক পথে হাঁটার প্রয়াস নিঃসন্দেহে তুহিনের এক ধরনের ক্ষমতা। ঐতিহ্য, ইতিহাস, সমকাল, মান-অভিমান, প্রেম-প্রণয় এসব নানা বিষয় তার কবিতার অনুষদ হয়েছে আত্মীয়ের মত।
ছন্দকে বাদ দিয়ে কবিতা নয়- এ সত্যটি তুহিন স্বীকার করেই কবিতা লিখছেন। অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত-এই তিন ছন্দরীতি কবিতায় প্রয়োগ করতে পিছপা হননি। সনেট আঙ্গিকেও তিনি কবিতা লিখেছেন। তবে ছন্দত শুধুই মাত্রার হিসেব নয়-ছন্দের অন্তর্গত তালটাকে ধরতে হবে। শব্দ তো অনেক সময় ছন্দের ভার বহন করতে অক্ষম হয়। ছন্দকে গভীরভাবে নিজের ভেতর স্থাপন করতে হবে। মিতালী করতে হবে। তবেই ছন্দ প্রয়োগ হবে বিশুদ্ধ এবং সঠিক। এ ব্যাপারে কবিকে সতর্ক হতে হবে। তুহিনের গদ্যরীতিতে লেখা কবিতাগুলো বেশ ফুরফুরে। চারটি গদ্যরীতির কবিতা স্থান পেয়েছে এ গ্রন্থে। সহজসরল ভাবে জীবনের গভীর ভাব প্রকাশ করার প্রয়াস এক কথায় ভাল।
মায়াবী পালক
এবার মনোযোগ দিতে চাই কবি আবু তাহের বেলাল সৃজিত ‘মায়াবী পালক’ কাব্যগ্রন্থ। কবিতা গ্রন্থের নামই বলে দেয় কবি সত্তা কেমন। একাধারে মায়াবী এবং পালক।
মানে কঠিন কিছুর অস্তিত্ব নেই। কোমল এবং প্রেমময় আধার সবকিছু। কবিতা কি বলে?
আবু তাহের বেলাল লিখছেন অনেকদিন। কিন্তু এটি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। আল মাহমুদের ভাষায়। নব্বই দশকের অন্যতম দুঃসাহসী কবি। কিন্তু তার কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে ২০১৯ এ। এর আগে গীতি কবিতা তিনি লিখেছেন, যথারীতি সুরারোপ করা হয়েছে। সেভাবে একটা গ্রহণযোগ্যতা তার ছিল। তিনি কোন সময়ের কবি এটা একদিন নির্ধারিত হবে নিশ্চয়ই।
যাহোক আবু তাহের বেলাল বাংলা ভাষার ছাত্র এবং তার কবিতা গানগুলো প্রমাণ করে তার একটা দীর্ঘ প্রস্তুতি পর্ব আছে। তিনি অনুধাবন করেছেন, গান গাইতে হলে সারগাম জানা দরকার, তেমনি কবিতার জন্য ছন্দটা রপ্ত করা জরুরী। তিনি যথারীতি ছন্দজ্ঞান নিয়েই কবিতা লিখছেন। এমনকি কবিতার ধ্রুপদ আঙিনায় পরিভ্রমণে বেশ আগ্রহী। গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ৫০ কবিতার মধ্যে ১৮ সনেট আঙ্গিকে লেখা প্রমাণ করে দুঃসাহসী এ নাবিক। এমনকি সনেটের অপ্রচলিত ছন্দরীতির পথে পা বাড়িয়েছেন।
সনেট সম্পর্কে দু’টো কথা বলা প্রাসঙ্গিক মনে করছি। সাধারণত সনেট দুই ধরনের প্রচলন দেখা যায়। পেত্রার্কীয় ও শেকশপিরিয়। মাইকেল মধুসুধন দত্তের (১৮২৪-১৮৭৩) হাতেই বাংলা সাহিত্যে চতুর্দশপদী নামে পায় সনেট কবিতা। বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ছাড়া সকল প্রধান কবিই সনেট লিখেছেন।
মধু কবি সর্বসাকুল্যে ১০৬ টি সনেট রচনা করেন। এর মধ্যে মাত্র ৮টি বিশুদ্ধ পেত্রাকীয় রীতিতে লেখেন বাকী সবই শেকশপিরিয়। ভাব বিষয় ও আঙ্গিকগত প্রভেদ রয়েছে এই দুই রীতির সনেটের। পেত্রার্কীয় সনেটে যেভাবে নারীপ্রেম, প্রধান উপজীব্য ছিল, শেকশপিরিয় সনেটে তার অনুপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। সেক্সপীয়ার একটি সনেটও লিখেননি পেত্রার্ক কিংবা তার পূর্বসূরীদের অনুসরণে প্রেমিকাকে নিবেদন করে। অন্ত্যমিলের ক্ষেত্রে এই দুইজন কবির ধারা ভিন্ন। মাত্রা ভিন্ন। স্তবক বিন্যাসেও রয়েছে পার্থক্য। ছন্দ শুধু হিসাবের খেলা নয়। সনেটও তাই। একটি সনেট সার্থক হতে হলে আঙ্গিক বিশুদ্ধতা ছাড়াও প্রয়োজন হয় আরো অনেক কিছু। এতোসব বলার উদ্দেশ্য, বেলালের সাহসী যাত্রাকে আরো গতিশীল ও প্রাণবন্ত করতে।
বেলালের কবিতার বিষয়বস্তু মানুষের মনের অন্তর্গত ভাবকে প্রাধান্য দেয়। এটা একজন কবির ভাল গুণ। তার কবিতায় সুন্দর সুন্দর পঙক্তির সমাবেশ ঘটেছে। সুস্বাদু এসব পংক্তির কয়েকটি উদ্ধৃত করছি নীচে-
১. দিগন্তে উড়াই শুধু স্বপ্নের চাদর
২. আকাশের নীল খোঁজে চোখের জলধি
৩. সুবাসিত জোছনার পথে হাঁটো পেছনে থাক গহীন রাত
৪. তুমি যে আমার শব্দ সহচরী চেতনায় দীপ্ত বহমান
সবশেষে বলব নিরীক্ষা এখনই নয়। বিশুদ্ধ সঙ্গীত চর্চা করে একটা পর্যায়ে এসে নজরুল সুরের পরীক্ষা পর্ব শুরু করেন। সেভাবে বাংলা গজল, মিশ্র সুর, রাগ প্রধান গানের জন্ম হয় নজরুলের হাতে।
শেষে বলতে চাই- তিন সময়ের তিনটি কাব্যগ্রন্থ নিয়ে যে সময়টা কাটালাম তা এক কথায় শুধুর ও আনন্দময়। কাব্য মূল্যায়ন নয় কবিদের কাছে টানতে চেয়েছি। তারাও কাব্যভোক্তাদের কাছাকাছি আসুক। দূরত্বটা ঘুচিয়ে দিতে হবে। আলোচ্য তিন কবি আমার খুব প্রিয়। তাদের কাব্য জীবন হোক আরও সার্থক এবং সূর্যস্পর্শী।