
[লেখক এটি লেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের আমন্ত্রণে ‘হরপ্রসাদ-শহীদুল্লাহ্ স্মারক বক্তৃতা’ প্রদানের জন্য। বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয় ১৫ই জুলাই ২০১৯ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে। সেখানে লেখক এটি পাঠ করেন, এবং সুন্দর পুস্তিকা আকারে এটি প্রচারিত হয়। উপযোগিতা বিবেচনা করে এটি এখানে প্রকাশ করা হলো।]
পূর্বসাধকদের সশ্রদ্ধ স্মরণ
আর দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার অস্তিত্বের একশো বছর পূর্ণ করবে। এই সময়ের মধ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা শিক্ষকতা করেছেন, তাঁদের সংখ্যা হয়তো চার হাজারের কম হবে না। এর মধ্যে যাঁরা পাণ্ডিত্য, বৌদ্ধিক চরিত্র (intellectual character), শ্রদ্ধাযোগ্যতা ও স্মরণযোগ্যতার দিক দিয়ে শীর্ষ পর্যায়ের, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁদের অন্তর্গত। বাংলা বিভাগের উৎপত্তি ‘সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগ’ থেকে। এই দুই বিভাগের প্রতিষ্ঠায়ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই দুই মহান শিক্ষকের। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর নানা বাধা-বিপত্তির মধ্য দিয়ে বাংলা বিভাগকে সমৃদ্ধ করার ও প্রগতিশীল ধারায় বিকশিত করার কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন মুহম্মদ আবদুল হাই। ক্লাসিক পর্যায়ের লেখাও এঁদের আছে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রাথমিক ভিত্তি রচনায় তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে।
অতীতের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের ব্যক্তিত্ব ও মহৎ কার্যাবলি স্মরণ করলে নতুন মহৎ কাজ করার ও মহান ব্যক্তিত্ব অর্জনের প্রেরণা সৃষ্টি হয়। পূর্বসাধকদের স্মরণে উত্তরসাধকদের শ্রদ্ধাপূর্ণ অনুষ্ঠান উজ্জ্বল ভবিষ্যত সৃষ্টির সহায়ক।
আজকের এই অনুষ্ঠানে যাঁরা আমাকে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দিয়েছেন তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমি চাই যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সকলের বিবেচনায় আসুক, এবং আগামী একশো বছর উজ্জ্বলতর হোক। অশুভ যা-কিছু আছে, পরাজিত হোক ও পরাজিত থাকুক, আর শুভ যা-কিছু আছে, জয়ী হোক ও জয়ী থাকুক। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র মহান স্মৃতি সকলকে মহত্ত্ব অর্জনে অনুপ্রাণিত করুক।
‘বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগ’ এবং ‘বাংলা বিভাগ’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপ্রধান (minor) বিভাগ ছিল। তবু বাংলা বিভাগ অসাধারণ মর্যাদার অধিকারী ছিল। এর কারণ এই বিভাগের যোগ ছিল জাতির নাড়ির সঙ্গে। বাংলার ভূভাগ, বাংলার মানুষ, বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি জীবন আর কোনো বিভাগেই এত গুরুত্ব পায়নি। প্রায় সব বিভাগেরই দৃষ্টি ইউরোপ-আমেরিকার দিকে। ব্রিটিশ-শাসিত ভারতে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের (১৯০৫-১১) পূর্ব পর্যন্ত রাজনীতি ছিল ইংরেজি ভাষায়, সভাকক্ষের ভেতরে। এই আন্দোলনের সময়ে রাজনীতিতে ব্যবহৃত হতে থাকে বাংলা ভাষা, এবং রাজনীতি চলে আসে সভাকক্ষের বাইরে মাঠে-ময়দানে ও রাস্তায়। বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন অসাধারণ বিক্রমে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ভারতের সকল প্রদেশে রাজনীতিতে তখন থেকে ইংরেজির বদলে প্রাদেশিক ভাষা ব্যবহৃত হতে থাকে এবং জনসভার রাজনীতি আরম্ভ হয়। সে-অবস্থায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার ছাত্র-শিক্ষকেরা জনমনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রগতিশীল চিন্তাধারা ও হিন্দু-মুসলমান মিলনের চেষ্টাও তাঁদের ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ একটি অপ্রধান বিভাগ হলেও এই বিভাগের শিক্ষক ও ছাত্রেরা তখন জাতীয় ব্যাপারে চিন্তাচেতনার দিক দিয়ে ছিলেন অগ্রযাত্রী। শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা-পাশের প্রস্তুতি দানের সঙ্গে দেশপ্রেম ও মহৎ গুণাবলি অর্জনে অনুপ্রাণিত করতেন। তাঁরা শিক্ষক ছিলেন জাতিরও। পাকিস্তানকালেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই ভূমিকা অব্যাহত ছিল। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে তাঁদের ছিল অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারা-নির্যাতন ভোগ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও আনোয়ার পাশা শহিদ হন। বাংলা বিভাগের পাঁচ/ছয় জন ছাত্র ও প্রাক্তন ছাত্রও মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হন। বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য ও বাংলাভাষী জনজীবনের ইতিহাস রচনায়, মধ্যযুগের হাতেলেখা পুঁথি সম্পাদনায়, চিন্তামূলক ও তথ্যমূলক সন্দর্ভ রচনায়, সাহিত্য সমালোচনায় এবং বাংলায় ধ্বনিতত্ত্ব ও ভাষাতত্ত্ব রচনায় এ বিভাগের কোনো কোনো শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। বাংলা বিভাগের ১৯৬৩ সালের ‘ভাষা ও সাহিত্য সপ্তাহ’ জাতির জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রেরণা সৃষ্টি করেছিল।
এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বাংলাদেশে যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে মহান অগ্রযাত্রার জন্য দরকার নতুন কালের স্বরূপ ও সম্ভাবনার উপলব্ধি এবং নতুন সঙ্কল্প ও নতুন কার্যক্রম। অবক্ষয়ক্লিষ্ট পশ্চিমা সভ্যতার অন্ধ অনুসরণ নয়, দরকার নিজেদের উন্নতির উপায় নিজেরা তৈরি করে চলা। তাতে গ্রেকো-রোমান-ইউরো-আমেরিকান সভ্যতার উপনিবেশবাদী ফ্যাসিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী বিষয়গুলো পরিহার করে মহান প্রগতিশীল বিষয়গুলো গ্রহণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত সকলের মধ্যে উচ্চতর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্য দরকার।
ছাত্রদের পরীক্ষা-পাশের শিক্ষা অপরিহার্য। এতে ছাত্র-শিক্ষক কারোরই ঔদাসীন্যের কোনো সুযোগ নেই। চাকুরিতে উন্নতির প্রয়োজনে চাকুরির শর্ত অনুযায়ী শিক্ষকেরা গবেষণা করছেন। শিক্ষকদের গবেষণার পরিমাণ বিপুল। ছাত্রেরা পরীক্ষার ফল ভালো করছে। বিসিএস পরীক্ষায় ও চাকুরিতেও তারা ভালো করছে। কিন্তু এসবের বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের আরও নানা দায়িত্ব পালন করা সমীচীন – কিছু জাতীয় দায়িত্ব, কিছু আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। কেউ কেউ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে গেলে সকলের উচিত তাঁদের সমর্থন করা। এই মানসিকতা ছিল; এখন সেমিস্টার পদ্ধতির চাপে এবং আরো কিছু কারণে ছাত্র-শিক্ষক সকলেই এত ব্যস্ত যে যথার্থ ভালো কোনো কিছুর দিকে কেউ দৃষ্টি দিতে পারছেন না। গবেষণায়, শিক্ষাদানে ও শিক্ষাগ্রহণে সৃষ্টিশীলতা দরকার। পরীক্ষার ফল ভালো করায় কিংবা চাকুরির উন্নতির জন্য গবেষণায় সৃষ্টিশীলতা থাকে না।
বর্তমান বাস্তবতায় আমি বাংলা বিভাগের ছাত্র-শিক্ষকদের বিবেচনার জন্য আশু প্রয়োজনের কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। এগুলো সকলেরই জানা, তবে গভীরতর উপলব্ধির ও অনুশীলনের প্রয়োজন আছে।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য
১. মানুষের জীবন সবসময় সমস্যাপূর্ণ। সমস্যা বাড়তে বাড়তে কখনো কখনো সঙ্কট সৃষ্টি হয়। ব্যক্তিগত ও সম্মিলিতভাবে জেনারেশনের পর জেনারেশন ধরে সমস্যার পর সমস্যার ও সঙ্কটের পর সঙ্কটের সমাধান করে করেই মানুষ জীবনযাপন করে, এবং নিজের ও সকলের জন্য উন্নত ভবিষ্যত সৃষ্টি করে। সমস্যা ও সঙ্কটের সমাধান এবং উন্নত ভবিষ্যত সৃষ্টি সম্ভব – এ বিশ্বাস ব্যক্তি, গোষ্ঠী, জাতি ও মানবজাতিকে আশাবাদী রাখে। নানা কারণে এ বিশ্বাস যখন ক্ষয় পেতে থাকে এবং লোপ পায়, তখন দেখা দেয় নৈরাশ্য ও নৈরাশ্যবাদ। তাতে অন্ধকার যুগ সামনে আসে। তারপর ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত দীর্ঘ চেষ্টায় অন্ধকার যুগেরও অবসান ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এখন দরকার, উন্নত ভবিষ্যত সৃষ্টি সম্ভব – এই উপলব্ধি। দরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহান লক্ষ্য। দরকার বড় কিছু অর্জনের জন্য ছোট কিছু ত্যাগ করার মনোভাব। দরকার উন্নত বৌদ্ধিক চরিত্র ও সৃষ্টিশীলতা। কবি জীবনানন্দের উক্তির রেশ ধরে বলতে পারি – শিক্ষকতা অনেকে করলেও সকলেই শিক্ষক নন, কেউ কেউ শিক্ষক। যাঁরা প্রকৃত শিক্ষক তাঁদের প্রতি সকলের ভক্তি থাকলে পরিবেশ স্বাভাবিক ও উন্নতিশীল থাকে। ভক্তি হল সেবার মনোভাব। উন্নত ভবিষ্যত সৃষ্টি সম্ভব নয় – এই মনোভাব আর অভ্যাসের দাসত্ব অন্ধকার যুগের পরিচায়ক। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের সামনে কোনো মহান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্য না থাকলে সেই বিশ্ববিদ্যালয় আত্মোদরসর্বস্বতা (careerism) চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
২. শিক্ষা বিষয়ে একটি লেখার সূচনাতেই রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি :
যতটুকু অত্যাবশ্যক কেবল তাহারই মধ্যে কারারুদ্ধ হইয়া থাকা মানবজীবনের ধর্ম নহে। আমরা কিয়ৎপরিমাণে আবশ্যকশৃঙ্খলে বদ্ধ হইয়া থাকি এবং কিয়ৎপরিমাণে স্বাধীন। আমাদের দেহ সাড়ে তিন হাতের মধ্যে বদ্ধ, কিন্তু তাই বলিয়া ঠিক সাড়ে তিন হাত পরিমাণ গৃহ নির্মাণ করিলে চলে না। স্বাধীন চলাফেরার জন্য অনেকখানি স্থান রাখা আবশ্যক, নতুবা আমাদের স্বাস্থ্য এবং আনন্দের ব্যাঘাত হয়। শিক্ষা সম্বন্ধেও এই কথা খাটে।
প্রত্যেক বিষয়েই কেবল-অত্যাবশ্যকটুকুর বেশিও অনেক কিছু জানতে হয়, করতেও হয়। কেবল প্রয়োজনীয় অংশ-বিশেষকে জানাই যথেষ্ট নয়, কার্যকর জ্ঞানের জন্য সমগ্রের ধারণাও অর্জন করতে হয় – ইতিহাসও জানতে হয়। কোনো বিষয়ের জ্ঞানই সেই বিষয়ের ইতিহাসের জ্ঞান ছাড়া পর্যাপ্ত ও কার্যোপযোগী হয় না। আর বিশেষ (particular) এবং সাধারণ (general) দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ – কেবল বিশেষ নিয়ে থাকা ঠিক নয়। কার্যকর জ্ঞানচর্চার জন্য উদ্দেশ্যনির্ণয় ও উদ্দেশ্যনিষ্ঠাও অপরিহার্য।
৩. কোনো জাতির জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পকলার উন্নতিশীলতার জন্য সমালোচনা একটি অপরিহার্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তথ্যনির্ণয় ও সত্যের সন্ধানে বিতর্কও খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে তথ্য কিংবা সত্যসন্ধান ছাড়া নিতান্ত জয়-পরাজয়মূলক বিতর্ক কল্যাণকর নয়। মূল্যবিচার ছাড়া জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের উন্নতি সচল থাকে না। সাহিত্যে বিষয়বস্তু গৌণ, রচনারীতি মুখ্য – এই নীতি অবলম্বন করে যেসব কবিতা, গল্প, উপন্যাস রচিত হয় সেগুলো বিনোদনমূলক। বিনোদন গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিনোদনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আরো অনেক কিছু সাহিত্যে অভিপ্রেত। মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রামেন্দ্রসুন্দর, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, রোকেয়া, নজরুল, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবু সয়ীদ আইয়ুব প্রমুখের রচনাবলি – শেক্সপীয়র, মিল্টন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, ডিকেন্স, হার্ডি, গ্যেটে, হুগো, সাঁর্ত, টলস্টয়, দস্তয়ভস্তি, হেমিংওয়ে, ফক্নারের রচনাবলি – বিনোদনসর্বস্ব নয়। সাহিত্যসৃষ্টিতে ও সাহিত্যবিচারে বিষয়বস্তু ও রচনারীতি – দুটোকেই সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করা সমীচীন। মহৎ সাহিত্যে থাকে গুরুত্বপূর্ণ কল্যাণকর নতুন বিষয়বস্তু অবলম্বন করে রচয়িতার সুন্দর প্রকাশ-সামর্থ্যরে পরিচয়।
৪. ১৯৬০-এর দশকে মার্কসবাদী বলে আত্মপরিচয়-দানকারী কোনো কোনো গ্রুপ রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ মনীষীকে ইংরেজের দালাল ও সুবিধাভোগী বলে অভিহিত করে তাঁদের নিন্দা করেছেন। কলকাতায় স্ট্রিট-কর্নারে তাঁরা বঙ্কিম ছাড়া সব মনীষীর ভাস্কর্য ভেঙেছেন। সুভাষ বসুর কোনো ভাস্কর্য স্ট্রিট কর্নারে ছিল কি-না – আমি জানি না। সম্পূর্ণ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাঁরা শ্রদ্ধাযোগ্য প্রায় সবকিছুর বিরুদ্ধে সকলের মনে অশ্রদ্ধা জাগাবার চেষ্টা করেছেন। ঢাকাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতেও এই কর্মকাণ্ডের অনুসরণ দেখা গেছে। এটা ক্ষতির কারণ হয়েছে। ১৯৮০-র দশকের শুরু থেকে যাঁরা মৌলবাদ-বিরোধী আন্দোলন করেছেন তাঁদের মধ্যে গণতন্ত্রের প্রতি কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। তাঁদের কোনো কোনো গ্রুপ ধর্মপ্রবর্তক, ধর্ম ও ধর্মের ইতিহাসের প্রতি জনমনে অশ্রদ্ধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন। এর ফল খারাপ হয়েছে। ইতিহাসের চাকা পেছন দিকে ঘুরেছে এবং ঘুরছে। আরো নানা রকম উগ্রতা ক্ষতির কারণ হয়েছে। এসব ক্ষতিকর কাজ পরিহার্য। ইতিহাসে দেখা যায় -যাঁরা মানবকল্যাণে অসাধারণ বড় কাজ করেছেন, তাঁরা অনেকে ধর্মাবলম্বী এবং অনেকে আদর্শাবলম্বী। ধর্মপ্রবর্তকেরা শ্রদ্ধেয়, আদর্শ-প্রতিষ্ঠাতারাও শ্রদ্ধেয়। তাঁদেরকে শ্রদ্ধা না করলে শ্রদ্ধাযোগ্য নতুন মনীষীর আত্মপ্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়। তাতে কেবল অর্থবিত্ত ও ক্ষমতাই সমীহযোগ্য হয়। বাস্তবে ও ইতিহাসে শ্রদ্ধাযোগ্য মানুষ খুঁজে না পাওয়া দুর্ভাগ্যের ব্যাপার।
প্রসঙ্গত রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তি মনে পড়ছে :
জগতে যত মহৎ আছে হইব নত সবার কাছে,
হৃদয় যেন প্রসাদ যাচে তাঁদের দ্বারে দ্বারে।
রবীন্দ্রনাথ মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখতে বলেছেন, অমানুষের প্রতি নয়।
৫. বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য ও বাংলাদেশ নিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের মূল অধ্যয়ন-অনুশীলন। নতুন সৃষ্টি ও উন্নতির প্রয়োজনে বাইরের জগত থেকেও ভালো নানা-কিছু গ্রহণ করা হয়। তবে কোনো কিছুরই অন্ধ অনুসরণ সমীচীন নয়। বাইর থেকে গ্রহণ করতে হবে বিচার-বিবেচনা করে, সৃষ্টিশীল উপায়ে, প্রগতির ধারায় নতুন সৃষ্টির জন্য। বাংলা ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের ও শিল্প-সাহিত্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য আছে। নতুন নতুন সৃষ্টি দ্বারা সেই ঐতিহ্যকে বিকশিত করতে হবে। বাংলা ভাষার অতীতের শ্রেষ্ঠ লেখকদের সকল বিষয়ের রচনাবলি ভালোভাবে প্রকাশ করতে হবে এবং শিক্ষিত সমাজে সেগুলো নিয়ে চিন্তা ও চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। ঐতিহ্য পরিহার করে চললে সৃষ্টি সম্ভব হয় না। জাতীয়তাবাদ ও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকতাবাদের মর্ম উপলব্ধি করাও দরকার। কেবল চিন্তা দিয়ে হবে না, কাজও লাগবে। চিন্তা ও কাজ দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পরবর্তী আলোচনায় বাংলা ভাষার কথা আছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই এতে ভাষা, রাষ্ট্রভাষা ও রাষ্ট্রের প্রসঙ্গও এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা চায়? বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের প্রতি যত্নবান না হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি গৌরবজনক ভবিষ্যতে উত্তীর্ণ হতে পারবে?
রাষ্ট্রভাষা ও রাষ্ট্র
গোটা ঐতিহাসিক কালব্যাপী সর্বত্রই দেখা যায় – মানুষের জীবনের সঙ্গে তার ভাষার, কিংবা নিজের ভাষার সঙ্গে মানুষের জীবনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ভাষা ছাড়া জীবনযাত্রা চলে না। মানুষের আত্মবিকাশের এক পর্যায়ে তার জীবনের বিমূর্ত অঙ্গ রূপে দেখা দিয়েছে ভাষা। সৃষ্টির ধারায় জীবন আগে না ভাষা আগে – এপ্রশ্নে অবশ্যই জীবনকে আগে পাওয়া যায়।
দেখা যায়, জীবন যেখানে উন্নত ভাষাও সেখানে উন্নত, এবং ভাষা যেখানে উন্নত জীবনও সেখানে উন্নত। ভাষার উন্নতি সাধিত হয় ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির এবং জাতীয় উন্নতির মধ্য দিয়ে। নিজের ভাষাকে উন্নত না করে কোনো ব্যক্তি কিংবা জাতি উন্নতি করতে পারে না। যে-ব্যক্তি ভাষায় নিপুণ, সমাজে তাঁর সাফল্য ও মর্যাদা বেশি।
আরও দেখা যায় – ভাষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান আর জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ভাষা অবিচ্ছেদ্য। সাহিত্য, সংগীত, শিল্পকলা ইত্যাদি সৃষ্টির পেছনেও কাজ করে চিন্তা বা ভাষা। চিন্তা আগে না ভাষা আগে এ-নিয়ে বিতর্ক আছে ভাষা-তাত্ত্বিকদের মধ্যে। আমার ধারণা এ-বিতর্ক অমীমাংসেয়; কারণ চিন্তা ও ভাষা অবিচ্ছেদ্য, একটিকে আগে অন্যটিকে পরে বলার উপায় নেই। মানুষের সব কর্মকাণ্ডেরই মর্মে কাজ করে চিন্তা বা ভাষা। কাজের বেলায় শ্রমশক্তি পরিচালিত হয় চিন্তাশক্তি দ্বারা। চিন্তা ও ভাষা অভিন্ন -অবিভাজ্য।
জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নতির সঙ্গে ভাষার উন্নতি কিংবা ভাষার উন্নতির সঙ্গে জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নতি অবিচ্ছেদ্য। কোনো জাতির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নতি আর ভাষার উন্নতিও অবিচ্ছেদ্য। ভাষাকে উন্নত না করে আত্মনির্ভর স্বাধীন আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক উন্নতি সম্ভব হয় না। মানুষের জীবন ও পরিবেশ বিকাশশীল, ভাষাও বিকাশশীল। উন্নত জাতিগুলো তাদের ভাষার উন্নতির জন্য পরিকল্পনা নিয়ে অনেক কাজ করে। সাম্রাজ্যবাদীরা তৎপর থাকে নিজেদের ভাষার উন্নতি সাধনে এবং দুর্বল জাতিগুলোকে ভাষার দিক দিয়েও নির্ভরশীল রাখতে।
ভাষা ও মানুষের জীবন এবং মানুষের জীবন ও ভাষা নিয়ে যতই চিন্তা করা যায়, তথ্যসন্ধান ও বিচার-বিশ্লেষণ করা যায়, ততই দুয়ের অবিচ্ছেদ্যতা ও উন্নতি সম্পর্কে ধারণা গভীর থেকে গভীরতর হয়। এসব লক্ষ করে বলা যায়, ভাষাকে নতুনভাবে জানা এবং ভাষায় আমরা যতটা গুরুত্ব দিই তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া আমাদের কর্তব্য।
মানুষ ভাষা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না, ভাষা আয়ত্ত করে। ভাষা আয়ত্ত করার এবং ভাষাকে বিকশিত করার সামর্থ্য মানুষের আছে। গোটা ইতিহাস জুড়ে মানুষকে এক অবস্থায় দেখা যায় না। মানুষ হয়ে-ওঠা প্রাণী। এই হয়ে-ওঠার বা উন্নতির প্রক্রিয়া চলমান। পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার, সেই সঙ্গে সামাজের অভ্যন্তরীণ বিরোধের মধ্য দিয়ে মানুষ বর্তমান অবস্থায় উত্তীর্ণ হয়েছে। মানুষের এই হয়ে ওঠার বা উন্নতির মূলে আছে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত জীবনের ইচ্ছাশক্তি, চিন্তাশক্তি ও শ্রমশক্তি। চিন্তাই ভাষা, ভাষাই চিন্তা। চিন্তা ছাড়া ভাষা হয় না, ভাষা ছাড়া চিন্তা হয় না।
আদিতে মানুষের ভাষা ছিল না, মানুষেই ভাষা সৃষ্টি করেছে। আদিম মানুষেরা যৌথ জীবনযাত্রার ও প্রকৃতির সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে, নিজেদের প্রয়োজনে, নিজেদের জৈবিক সামর্থ্যরে বলে, নিজেদের ভাষা সৃষ্টি করেছে, এবং প্রয়োজনের তাগিদেই তারা তাদের ভাষাকে বিকশিত ও উন্নত করে চলছে। কেবল বাক্যযন্ত্রের ক্রিয়া দিয়ে ভাষার মর্ম বোঝা যায় না। ভাষার সঙ্গে মানুষের গোটা অস্তিত্ব ও পরিবেশ জড়িত থাকে। ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত জীবনপ্রয়াসে মানুষের ইচ্ছাশক্তি, চিন্তাশক্তি ও শ্রমশক্তি একসঙ্গে কাজ করেছে ভাষাসৃষ্টিতে। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, রুশ, চিনা, জাপানি, সংস্কৃত, হিব্রু, লাতিন, আরবি, ফারসি, বাংলা, উর্দু প্রভৃতি ভাষার ইতিহাস যতই সন্ধান করা যায় ততই এটা বেশি করে বোঝা যায়। মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীরই ভাষা সৃষ্টি করার মতো জৈবিক সামর্থ্য নেই। মানুষের মতো ক্রমাগত নিজেকে এবং নিজের পরিবেশকে উন্নত করার সামর্থ্যও আর কোনো প্রাণীর নেই।
দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় এমন মাত্র দুইশো ভাষা দুনিয়ায় আছে। এসব ভাষা বিকাশমান। এগুলোর মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের দিক দিয়ে বাংলা ভাষার স্থান এখনো উপরের দিকেই আছে। এগুলো ছাড়া বিভিন্ন মহাদেশে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী আছে; তাদেরও আলাদা আলাদা ভাষা আছে; তাদের ভাষা বিলীয়মান।
বাংলাদেশে পঁয়তাল্লিশটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর পঁয়তাল্লিশটি বিলীয়মান মাতৃভাষা আছে। এই পঁয়তাল্লিশটি জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের সামান্য বেশি। এরা জন্মের পর থেকেই নিজেদের ভাষার মতো বাংলা ভাষাও শেখে। এদেরকে বলা যায় দ্বিভাষিক (bilingual)। বাংলা ভাষাকেই তারা উন্নতির অবলম্বন মনে করে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের এবং বাংলাদেশেরও বিলীয়মান মাতৃভাষাগুলোকে রক্ষা করার চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়। এক্ষেত্রে ইউনেস্কোর প্রচার ও কাজ বাস্তবতা-বিরোধী। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সমূহের লোকেরা জীবনযাত্রার ও উন্নতির প্রয়োজনে নিজেদের ভাষার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রভাষা শিখছে। এর মধ্যে রয়েছে তাদের উন্নতির সম্ভাবনা। বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সমূহের উন্নতির ও মানবজাতির মূল ধারায় আসার সুযোগ সর্বত্র বাড়াতে হবে। তাদেরকে চিরকাল আদিবাসী করে রাখার নীতি বর্জনীয়।
আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা ও উদ্দেশ্য থেকে ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এর দ্বারা রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হচ্ছে এবং রাষ্ট্র রূপে বাংলাদেশের গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও নষ্ট হচ্ছে। বিলীয়মান মাতৃভাষাগুলোর উন্নতির জন্য রাষ্ট্রভাষা বাংলার উন্নতিকে স্থগিত রাখা ঠিক হবে না। নতুন ভবিষ্যত সৃষ্টিতে আমাদের এগুতে হবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ধারা ধরে।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, সিভিল সোসাইটি অর্গেনাইজেশন, এনজিও ও ইউনেস্কো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সমূহের উন্নয়নের জন্য যে পথ প্রদর্শন করে, যেসব পরিকল্পনা ও কার্যক্রম চালায়, অনেক সময় সেগুলো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সমূহের উন্নতির অন্তরায় হয়। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সমূহকে নিজেদের উন্নতির জন্য পার্শ্ববর্তী বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে রাষ্ট্র গঠন করতে হয় এবং রাষ্ট্রভাষা শিখতে হয়। তারা যদি বাইর থেকে কিছুই গ্রহণ না করে এবং কেবল নিজেদের বিলীয়মান মাতৃভাষা ও নিজেদের অভ্যস্ত জীবনযাত্রা নিয়ে চলে, তাহলে তারা কোনো কালেই উন্নতি করতে পারবে না। যে কোনো জনগোষ্ঠীর জন্যই না-নিয়ে, না-দিয়ে নিজেদেরকে নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে রাখার ফল খারাপ হয়। আত্মবিকাশের ও উন্নতির জন্য ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সমূহকে বাইর থেকে ভালো জিনিস গ্রহণ করতে হবে। নিজেদের উন্নতির প্রয়োজনে রাষ্ট্রভাষাকে নিজেদের মাতৃভাষার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে তাদের জীবনব্যাপী আয়ত্ত করা ও বিকশিত করে চলা সমীচীন।
মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রভাষা (state language) দ্বারা কেবল অফিসের ভাষা (official language) বোঝায় না, বোঝায় তার সঙ্গে আরো অনেক কিছু। রাষ্ট্রভাষার মধ্যে অফিস চালানোর ভাষা আছে, সেই সঙ্গে আছে জাতীয় জীবনে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির ভাষা – আছে কোনো জাতির আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভাষা। রাষ্ট্রভাষার উন্নতি হলে রাষ্ট্রের অন্তর্গত জাতির সভ্যতা উন্নত হয়।
কোনো ভাষার অর্থনৈতিক ভিত্তি বিকাশশীল থাকলে সে ভাষা বিকাশশীল থাকে। কোনো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীই তার বিলীয়মান মাতৃভাষা নিয়ে জীবিকার ব্যবস্থা করতে পারে না। সাম্রাজ্যবাদীরা সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে বিলীয়মান মাতৃভাষাগুলোকে রক্ষা করার প্রচার চালিয়ে বাংলা ভাষার আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রিক ভিত্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
আমাদের উপলব্ধি করা দরকার যে, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও উন্নতির জন্য রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষার অস্তিত্ব ও উন্নতি অপরিহার্য। চলমান বহু ঘটনা আছে যেগুলো দেখে বলা যায়, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা না টিকলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ টিকবে না। দেশ থাকবে, মাটি মানুষ গাছপালা পশু-পাখি নদীনালা ও আকাশ-বাতাস থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্র থাকবে না। যারা বাংলাদেশে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার বদলে ইংরেজি চান তাঁরা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে রক্ষা করবেন?
দেশ এবং রাষ্ট্র এক নয়। দেশ প্রকৃতির সৃষ্টি, রাষ্ট্র মানুষের। আমাদের রাষ্ট্র না থাকলে, কেবল দেশ থাকলে, আমরা কি ভালো থাকব? নিজেদের রাষ্ট্র না থাকলে আমরা কি স্বাধীন থাকব? ১৯৭১ সালে কেন আমরা স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলাম? ছয় দফা আন্দোলনে কেন আমরা যোগ দিয়েছিলাম? কেন আমরা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করেছিলাম? কেন আমরা ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলাম? বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্য বাদ দিয়ে চললে এ-সবই অর্থহীন হয়ে যায়।
ভৌগোলিক বাস্তবতা ও বাঙালি-চরিত্র লক্ষ করে, ১৯৭৩ সাল থেকেই কোনো কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তি বলে আসছেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার মতো (viable)) নয়। তাঁরা জোর দিয়েছেন বাঙালি-চরিত্রের নিকৃষ্টতায়। তাঁদের যুক্তি ও মত কখনো আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তাঁরা অনেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় নাগরিকত্ব নিয়েছেন এবং প্রায় সকলেই তাঁদের সন্তানদের ওইসব রাষ্ট্রে নাগরিক করেছেন। আমি সব সময় বাঙালি-চরিত্রের উন্নতি সম্ভব বলে মনে করেছি। আমি সব সময় মনে করেছি এবং এখনো মনে করি, বাংলাদেশকে অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণের প্রগতিশীল রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলা যাবে। সে লক্ষ্যেই আমাদের চিন্তা ও কাজ। জাতীয় হীনতাবোধ বাংলাদেশের ধনী-গরিব, শিক্ষিত-শিক্ষাবঞ্চিত, ক্ষমতাবান-ক্ষমতাবঞ্চিত সব মানুষকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। জনসাধারণ ঘুমন্ত। জাতীয় হীনতাবোধ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হবে। ঘুমন্ত জনসাধারণকে জাগাতে হবে। অবস্থার উন্নতির জন্য যা কিছু করা দরকার সবই আমাদের করতে হবে।
সিভিল সোসাইটি অরগেনাইজেশনগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিকে বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাস-অভিমুখী করেছেন। বড় দুই রাজনৈতিক দল জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের কথা না ভেবে দূতাবাসমুখী রাজনীতি নিয়ে চলছে। বাংলাদেশের সব প্রচারমাধ্যম ১৯৮০-র ও ৯০-এর দশকে বিবিসি রেডিওর অন্ধ অনুসারী হয়ে কাজ করেছে। বিরোধী দলগুলোও তাই করেছে। ক্ষমতার বাইরে থাকা কালে বড় দুই রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সাহায্যের আবেদন নিয়ে ক্রমাগত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার, এবং ভারতেরও, স্থানীয় দূতাবাসগুলোতে সাহায্য চাইতে যান। তাঁরা চলে যান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্কে। জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যও কোনো কোনো নেতা নিউইয়র্কে জাতিসঙ্ঘের হেড অফিসে গিয়ে তদবির করেন। সাম্রাজ্যবাদী অর্থসংস্থাগুলো ‘দাতা-সংস্থা’ ও ‘উন্নয়ন-সহযোগী’ নাম নিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে যুক্ত হয়। উচ্চ ও উচ্চমধ্য শ্রেণির লোকেরা – সরকারি ও সরকার-বিরোধী উভয় মহল – তাঁদের ছেলেমেয়েদের যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের নাগরিক করে চলছেন। মন্ত্রিপরিষদ, জাতীয় সংসদ, প্রশাসনব্যবস্থার উচ্চপর্যায়, বিচারব্যবস্থার উচ্চপর্যায়, শিক্ষাব্যবস্থার উচ্চপর্যায় লক্ষ করলেই এটা দেখা যায়। এই ব্যক্তিরাই বাংলাদেশে রাষ্ট্রব্যবস্থার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কর্তৃত্বে আছেন। বাংলাদেশে একদিকে আছে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ব্রিটিশ কাউন্সিল ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত ও-লেভেল, এ-লেভেল, এবং অপরদিকে আছে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নব-প্রবর্তিত ইংলিশ ভার্সন। এ-সবই বাংলাদেশের ভূভাগে জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
নবচেতনা ও নবউত্থান
এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নতুন রেনেসাঁস ও তার ধারাবাহিকতায় নতুন গণজাগরণ সৃষ্টি করে, সেই সঙ্গে উন্নত-চরিত্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টি করে, বাংলাদেশের জনগণ অবশ্যই বাংলাদেশকে নিজেদের প্রগতিশীল রাষ্ট্র রূপে গড়ে তুলতে পারবে। জনগণ ঘুমিয়ে আছে বটে তবে জাগবে। অভীষ্ট নেতৃত্বের জন্য অবশ্যই উন্নত-চরিত্রের রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান দলগুলোও চাইলে তাদের রাজনৈতিক চরিত্র উন্নত করতে পারে। নেতৃত্বের জন্য রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। দলের চরিত্রই নেতৃত্বের চরিত্র। উন্নত চরিত্রের বৌদ্ধিক নেতৃত্বও লাগবে। রাষ্ট্রগঠনের ও রাষ্ট্রীয় উন্নতির সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত ও উন্নত করার সার্বিক আয়োজন লাগবে। রাজনীতির উন্নতির জন্য বাংলা ভাষায় উন্নত রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক দলে তার অনুশীলন লাগবে। ১৯৮০-র দশকের শুরু থেকে নিঃরাজনীতিকরণের যে-প্রক্রিয়া বাংলাদেশে চালানো হচ্ছে তার জায়গায় উন্নত নতুন রাজনীতির সূচনা করতে হবে।
সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্রিটিশ-শাসিত বাংলার জাগরণ, ইতালির সিনকুয়েসেন্টু, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের রেনেসাঁস, জার্মানির রিফর্মেশন, ফ্রান্সের এনলাইটেনমেন্ট ইত্যাদির নবমূল্যায়ন দরকার। ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপ (১৯৯১) পর্যন্ত কালের গণজাগরণ ও গণআন্দোলনেরও নবমূল্যায়ন দরকার। অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিতে হবে। ক্লাসিকের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে এবং নতুন ক্লাসিক সৃষ্টি সম্ভব করতে হবে। নতুন ভবিষ্যত সৃষ্টির প্রয়োজনে ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ অপরিহার্য।
জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনে শিক্ষাখাতে শর্তযুক্ত সব রকম বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য পরিহার করতে হবে। প্রচলিত শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার অপরিহার্য। প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যসূচি, পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক উন্নত করতে হবে। কথিত সৃজনশীল পরীক্ষা-পদ্ধতির জায়গায় অনুসন্ধিৎসামুখী জ্ঞানমুখী পরীক্ষা-পদ্ধতি প্রবর্তন করতে হবে। ইংলিশ ভার্সন বিলুপ্ত করতে হবে। বাংলাদেশে বিদেশি সরকার কর্তৃক পরিচালিত সব স্কুল বন্ধ করতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে বিতর্ক এড়িয়ে চলতে হবে। সর্বজনীন কল্যাণে প্রথমে মূল ধারার বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাকে উন্নত করতে হবে। অনেকে বিশ্বমান অর্জনের কথা বলেন। তাঁরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স প্রভৃতি রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী কর্মনীতি নির্বিচারে অনুসরণ করে চলার কথা বলেন। এটা ঠিক নয়। উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য ও নীতি-বিধি সংস্কার করতে হবে। চলমান শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জাতি ও রাষ্ট্র গড়ে উঠছে না – উঠবে না।
বাংলা উন্নত ভাষা। এর ভিত্তিতে আছে আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাষ্ট্রিক বিরাট সম্ভাবনা। এই ভাষাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে ইংরেজি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করে বাংলাদেশে রাষ্ট্রগঠন সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের উন্নতির জন্য ইংরেজি ও আরো কয়েকটি বিদেশি ভাষা শেখার ভালো ব্যবস্থা অবশ্যই বাংলাদেশে করতে হবে। বর্তমান ব্যবস্থার আমূল সংস্কার দরকার। ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার মাধ্যমে জ্ঞান আহরণ করে তা দিয়ে বাংলা ভাষার জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে হবে। যাঁরা জন্মগতভাবে বাংলাদেশের নাগরিক এবং পছন্দগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের নাগরিক, তাঁদের নেতৃত্বে ও পরিচালনায় বাংলাদেশ কখনো স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে গড়ে উঠবে না।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যত নিয়ে ভাববার সময় চলে যাচ্ছে। সময় থাকতে চিন্তা ও কাজ করতে হয়, সময় চলে গেলে সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়। আজকের মূল প্রশ্ন – বাংলাদেশকে আমরা রাষ্ট্র রূপে গড়ে তুলব কি তুলব না। যদি সিদ্ধান্ত হয় গড়ে তুলব, তাহলে সময় নষ্ট না করে কাজ আরম্ভ করতে হবে। রাষ্ট্র গঠনের জন্য চেষ্টা লাগবে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাষ্ট্র গঠিত হয় না। বাংলাদেশের জনগণের চেতনায় নিজেদের রাষ্ট্র গঠনের মহান লক্ষ্য দরকার। আমি মনে করি, যে-অবস্থা চলছে তাতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের দায়িত্ব অনেক। জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য নির্ধারণে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ অগ্রণীর ভূমিকা পালন করতে পারে।
কেউ কেউ বলে থাকেন – এখন বিশ্বায়নের কাল, বাংলাদেশকে রাষ্ট্র রূপে গঠন করা এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়। সিভিল সোসাইটি অরগেনাইজেশনগুলো নানা কৌশলে এটা প্রচার করছে। আমার ধারণা এই দৃষ্টিভঙ্গি ও মত বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর। বিশ্বসরকার গঠিত হলেও জাতীয় সরকার থাকবে, বিশ্বসরকার হবে জাতীয় সরকার সমূহের ঊর্ধ্বতন এক সরকার। তার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকবে আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। তা হবে জাতিসঙ্ঘের মতো। জাতিসঙ্ঘ বহুলাংশে অকার্যকর; বিশ্বসরকার কার্যকর হতে পারে। রাষ্ট্রের ভেতরকার সব কাজ জাতীয় সরকারকেই করতে হবে। বাংলাদেশকে রাষ্ট্র রূপে গঠন না করার পরিণতি অত্যন্ত খারাপ হবে।
বাংলাদেশকে বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলার এবং বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করার পথে বিরাজিত অন্তরায়গুলো দূর করতে হবে। তার জন্য নতুন সঙ্কল্প দরকার। যাঁরা দ্বৈত নাগরিক, যাঁদের স্ত্রী অথবা স্বামী অথবা সন্তান দ্বৈত নাগরিক কিংবা বিদেশি নাগরিক, তাঁরা যাতে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি, উপমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী, উপসচিব থেকে সচিব, জজকোর্ট থেকে সুপ্রীম কোর্টের বিচারক ইত্যাদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হতে কিংবা অধিষ্ঠিত থাকতে না পারেন, সংবিধানে তার সুস্পষ্ট বিধান রাখতে হবে। বিধান এমন হবে যে, কারো অন্য রাষ্ট্রে গিয়ে নাগরিকত্ব গ্রহণে বাধা থাকবে না; কিন্তু অন্য রাষ্ট্রে নাগরিক হলে (দ্বৈত নাগরিক) কিংবা স্ত্রী বা স্বামী অন্য রাষ্ট্রের নাগরিক বা দ্বৈত নাগরিক হলে কিংবা সন্তান অন্যরাষ্ট্রে নাগরিক হলে কেউ বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হতে কিংবা অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না।
‘আদিবাসী’দের চিরকালের জন্য ‘আদিবাসী’ রূপে রাখার সাম্রাজ্যবাদী নীতি পরিহার্য। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় রেড ইন্ডিয়ানদের এবং অস্ট্রেলিয়ায় আদিবাসীদের শত শত বৎসর ধরে যেভাবে রাখা হয়েছে তা অন্যায়, এবং তা গোটা পৃথিবীর আদিবাসীদের কিংবা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সমূহের জন্য কার্যকর নীতি রূপে থাকা উচিত নয়।
বাংলাদেশে পঁয়তাল্লিশটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর পঁয়তাল্লিশটি বিলীয়মান মাতৃভাষাকে রক্ষা করার জন্য এনজিওগুলো ও সরকার যে চেষ্টা চালাচ্ছে তা সফল হবে না। সরকারকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তার মধ্যে এসব জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সার্বিক উন্নতির ভালো পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। বাঙালি-সন্তানদের মতো তাদের সন্তানদেরও রাষ্ট্রভাষা এবং প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে যে-কোনো পর্যায়ের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তারা যদি চায়, কেবল তা হলেই তাদের মাতৃভাষার মাধ্যমে তাদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তারা অন্য নাগরিকদের মতো সব রকম অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে। বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় তারা স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বিরাজমান অনাস্থা ও অবিশ্বাস দূর করে অবস্থাকে স্বাভাবিক করতে হবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট দিয়ে কোনো কল্যাণ হচ্ছে না। এর উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি পরিবর্তন করতে হবে। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের উন্নতির জন্য বাঙালি জনগোষ্ঠীর উন্নতি স্থগিত রাখা যাবে না।
বিদেশি দূতাবাসমুখী রাজনীতির এবং ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্কমুখী রাজনীতির অবসান ঘটাতে হবে। নৈতিক চেতনা ও জাতীয় চরিত্র উন্নত করার কার্যক্রম চালাতে হবে। রাজনীতির উন্নতির জন্য রাজনৈতিক আদর্শের পুনর্গঠনে ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার-সাধনে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে। সংবিধানে উন্নত-চরিত্রের রাজনৈতিক দল গঠনের কিছু নীতি-বিধি স্পষ্টভাবে নির্দেশিত রাখতে হবে।
রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন পর্যায়ে এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে প্রথম দুই দশকে বাংলা ভাষার উন্নতি এবং রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষার প্রচলন অনেকটুকু হয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সাল থেকে বিদেশি সহায়তায় রাজনীতি যে রূপ নিয়েছে, তাতে রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়নি। বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে এবং বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করার প্রশ্নে সিভিল সোসাইটি অরগেনাইজেশনগুলোর এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব এখন শিথিল। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র – এটাই আর মনে করা হয় না।
চলমান বাস্তবতায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও অন্য সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের এবং দেশের বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের মনোযোগ আশা করে আমার বক্তব্য শেষ করছি :
» বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রচলিত মূল্যবোধের এবং শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নত করতে হবে। উচ্চশিক্ষার ও গবেষণার বিষয়বস্তুতে বাংলাদেশকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে এবং বাংলা ভাষার ব্যবহার ক্রমবর্ধমান রাখতে হবে। গবেষকদের বিচার-বিবেচনার স্বাধীনতা বাড়াতে হবে, স্বাধীন চিন্তাশীলতায় গুরুত্ব দিতে হবে।
» জনগণের পক্ষ থেকে প্রগতিশীল চিন্তকেরা জাতীয় ভাষানীতি প্রণয়ন করবেন। জাতীয় ভাষানীতিতে রাষ্ট্রভাষা, ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা, ধর্মের ভাষা এবং ইংরেজি ও আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি ভাষাকে যথোচিত গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারকে জাতীয় ভাষানীতি অবলম্বন করে কাজ করতে হবে।
» বিচার-ব্যবস্থায় বাংলা চালু করার জন্য প্রচার-আন্দোলন চালাতে হবে। বাংলাদেশের বিচার-ব্যবস্থার অভ্যন্তরে এমন কিছু ব্যক্তি আছেন যাঁরা এ-কাজে অগ্রযাত্রীর ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন। সহযোগীর ভূমিকা সকলেই পালন করবেন।
» ব্যাঙ্কের কাজে বাংলা প্রচলনের জন্য প্রচার-আন্দোলন চালাতে হবে।
» একুশে ফেব্রুয়ারিকে উদযাপন করতে হবে রাষ্ট্রভাষা দিবস রূপে। রাষ্ট্রভাষা দিবস উদযাপনের মধ্য দিয়ে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নবচেতনা সৃষ্টি করতে হবে।
» ১৯৭২ সালে বিলুপ্ত-করা বাংলা উন্নয়ন বোর্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে, এবং একটি স্বতন্ত্র জাতীয় অনুবাদ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
» প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশবিদ্যা বিভাগ (Department of Bangladesh Studies) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এতে ইতিহাসের ধারায় বাংলাদেশ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ের সঙ্গে গ্রেকো-রোমান-ইউরো-আমেরিকান প্রগতিশীল রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও দর্শন অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে।
» জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রকে ব্যর্থ করার ফলে এবং মৌলবাদ-বিরোধী আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় ইতিহাসের চাকা অনেকটুকু পেছনে ঘুরে গেছে এবং ঘুরছে। এ-অবস্থায় একটু পিছিয়ে গিয়ে সামনে চলা আরম্ভ করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরেই এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে চিন্তাচর্চা ও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন চালানো হয়েছিল সেখান থেকে আরম্ভ করা যেতে পারে। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও পরবর্তী সব বৌদ্ধিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাসকে পক্ষপাতমুক্ত সম্মুখদৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে বুঝতে হবে। এখনই তা আরম্ভ করা না হলে পরে আরো পেছনে যেতে হবে।
» রাজনীতির উন্নতির জন্য উন্নত-চরিত্রের রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠার অনুকূলে কাজ করতে হবে। জনগণকে নিজেদের ((of the people, by the people, for the people) রাজনৈতিক দল ও সরকার গড়ে তোলার কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
» সর্বজনীন গণতন্ত্রের আদর্শ এবং দল-ভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সরকার গঠনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হবে, এবং উদ্ভাবিত আদর্শ ও পদ্ধতিকে কার্যকর করার লক্ষ্যে জনমত গঠন করতে হবে। (আমার কোনো কোনো বইতে এবং আটাশ দফা : আমাদের মুক্তি ও উন্নতির কর্মসূচিতে এ-বিষয়ে আমার চিন্তার প্রকাশ আছে।)
এসব লক্ষ্য সামনে নিয়ে কাজ করার জন্য একটি সংগঠন দরকার। রাষ্ট্র, জাতি ও জনগণের কল্যাণে সকল কাজে প্রচার-মাধ্যমের সহায়তা কাম্য।
রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার বিবেচনা বাদ দিয়ে বাংলা ভাষার পক্ষে যে প্রচারকার্য চালানো হয়, তা গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার মতো ব্যাপার। নতুন রেনেসাঁস ও নতুন গণজাগরণের লক্ষ্যে চিন্তা ও কাজের মর্মে দরকার উন্নত চরিত্রবল ও প্রগতিচেতনা। জ্ঞানের সঙ্গে উন্নত চরিত্রবল ও কর্মমুখিতা না থাকলে রেনেসাঁস ও গণজাগরণ হয় না।
আগেকার রেনেসাঁসের লক্ষ্য ছিল মধ্যযুগের গর্ভ থেকে আধুনিক যুগকে মুক্ত করা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ও রাজনীতি-অর্থনীতিকে প্রগতির ধারায় বিকশিত করে চলা। এখন নতুন রেনেসাঁসের লক্ষ হবে আধুনিক যুগের ভ্রান্তি ও অনাচার থেকে মুক্তি এবং নতুন সভ্যতা ও প্রগতির ধারায় অভিযাত্রা। নতুন রেনেসাঁসের অভাবে চলছে ইতিহাসের পশ্চাৎগতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ এবং সকল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগগুলো রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে এবং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে ও উন্নত করতে চেষ্টা চালালে অবশ্যই জনসমর্থন পাবে এবং এগুলো রক্ষা পাবে ও উন্নত হবে।
দীর্ঘ জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের ও স্বাধীনতা-যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে আজ আমাদের কেন্দ্রীয় কর্তব্য স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা, রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করা এবং পর্যায়ক্রমে জনজীবনের সমাধানযোগ্য সমস্যাবলি সমাধান করে চলা। আমার ধারণা, বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করার এবং বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা জাতীয় মুক্তি ও জনমুক্তির আকাঙ্ক্ষায় রূপ নেবে। মুক্তি মানে পরাধীনতা থেকে মুক্তি, সমস্যা থেকে মুক্তি।
আমার শেষ কথা এই যে – এ লেখায় ব্যক্ত মতকে মাত্র একজন ব্যক্তির মত রূপে বিবেচনা করা উচিত হবে। যে-অবস্থা চলছে তাতে গতানুগতির বাইরে কোনো একজনের বক্তব্যের সঙ্গে অনেকেই একমত হবেন – এমনটা আশা করা যায় না। সামনের দিকে এগোবার উদ্দেশ্যে নানাজনের নানামত প্রকাশিত হোক – এখন এটাই কাম্য। অবস্থার উন্নতি সাধনের জন্য অবশ্যই ঐক্যের তাগিদ ও ঐক্য দেখা দেবে। প্রত্যেকের এবং সকলের মঙ্গল হোক।